Sunday, May 14, 2023

জীবন এবং জীবিকা-7 ঃ চ্যাট জিপিটি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সের দুনিয়ার নতুন চাকরি

(১)  

এই মহুর্তে অনেক শিক্ষকই চাইছেন না, ছাত্রছাত্রীরা স্কুলের এসাইনমেন্টের জন্য চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করুক। এটা ভুল পদক্ষেপ। ছাত্রছাত্রীরা কোডিং বা এসাইনমেন্টের ক্ষেত্রে চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করা না শিখলে- চাকরির বাজারে আরো পিছিয়ে পড়বে। 

 আমি চ্যাটজিপিটির পেশাদার ভার্সন ফেব্রুয়ারী মাস থেকে সাবসক্রাইব করছি। বর্তমানে আমার নানাবিধ কাজের জন্য চ্যাট জিপিটি ৪ বহুল পরিমানে ব্যবহার করি। এর থেকে একটা জিনিস খুব পরিস্কার ভাবে বলছি- চ্যাট জিপিটির কাছ থেকে ভাল রেজাল্ট, বা ভাল আউটপুট পেতে গেলেও অনেক অনেক জানতে হবে। অনেক বুদ্ধিমান এবং স্ট্রাটেজিস্ট হতে হবে। 

যারা ভাবছেন, চ্যাট জিপিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শেখার আর কি আছে? শুধু প্রশ্ন করলেই হল!  তারা চ্যাট জিপিটি ভাল করে ব্যবহার করা জানেনই না। 

চ্যাট জিপিটির সাহায্য নিয়ে কোন কিছু শিখতে গেলে, প্রথমেই শিক্ষার ক্ষেত্রে বুদ্ধের দর্শনের আশ্রয়ে আশা ভাল। শিক্ষক বুদ্ধের গল্পটা বলে নিই আগে 

"এ গল্প বৈশালী নগরে এক পন্ডিত শাস্ত্রজ্ঞর। তিনি ভারতের নানান প্রদেশের নানান গুরুদের কাছে বেদ বেদান্ত শিক্ষা করেছিলেন। স্থানীয় মহলে পন্ডিত হিসাবে তিনি ছিলেন সুখ্যাত।

গৌতম বুদ্ধ বা শাক্যমুনির দর্শন তখন দাবানলের মতন ছড়িয়েছে সর্বত্র । পন্ডিতজী ভাবলেন গৌতম বুদ্ধ যখন বৈশালী নগরে আসবেন, তখন পরম জ্ঞানী বুদ্ধের কাছে তিনি তার দর্শন শিখবেন।
বুদ্ধ সাধারনত বর্ষাকালে বড় শহরে কাটাতেন। সব সময় তার সাথে দু চার হাজার সন্ন্যাসী । খুব বড় শহর ছাড়া , বর্ষাকালের দীর্ঘ সময় ধরে অতজন সন্ন্যাসীর ভিক্ষা জোগার করা অসম্ভব ।
এক বর্ষায় বুদ্ধ বৈশালী নগরে আশ্রয় নিলেন। খবর পেয়ে, নগরের সেই পন্ডিত শাস্ত্রজ্ঞ বুদ্ধের সাথে দেখা করতে এলেন। অভিলাশ বুদ্ধে যদি তাকে ছাত্র হিসাবে গ্রহন করেন! তার দু হাতে প্রচুর ফুল। অন্যান্য গুরুদের সাথে প্রথামাফিক প্রনাম করার জন্য ফুল নেন উপহার হিসাবে। সেটাই ভারতের প্রথা।
তাকে দুই হাতে ফুল সহ আগুয়ান দেখে বুদ্ধ বল্লেন- উঁহু সব ফেলে আমার কাছে এস!
সেই ব্যক্তি ঠিক বুঝলনা! ফুলে আবার দোষ কি? অহ হয়ত বাঁহাতে ফুল আছে বলে বুদ্ধ রাগ করেছেন। ফলে বাঁ মুষ্টির ফুল ফেলে শুধু ডানহাতে ফুল নিয়ে তিনি বুদ্ধের দিকে আরেক পা এগোলেন,
বুদ্ধ আবার বল্লেন উঁহু-সব ফেলে আমার কাছে এস
এবার সেই পন্ডিত ভাবলে, তাহলে ফুলেই সব দোষ। সে বেচারা সব ফুল ফেলে দিল!
বুদ্ধ আবার বল্লেন উঁহু-সব ফেলে আমার কাছে এস
এবার পন্ডিতজী থতমত। যাকে বলে এট টোটাল লস। বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন-প্রভু আমার দোষটি কোথায় যদি দয়া করে বলেন?
বুদ্ধ আবার বল্লেন দোষ কোথায়-সব ফেলে আমার কাছে এস..
আমি তোমায় ফুল ফেলতে বলেছি কি? বলেছি সব কিছু ফেলে আমার কাছে আসতে! তোমার জ্ঞানের অহংকার খুব ভারী। তুমি অনেক কঠিন ধারনার মধ্যে বদ্ধ। আগে সেটা ফেলে হাল্কা হয়ে নাও। মনকে মুক্ত কর। মুক্তমন ছাড়া নতুন কোন ধারনা মাথায় ঢুকবেই না! আমার শিক্ষা সাধারনের জন্য সাধারন শিক্ষা। যাকে বলে কমন সেন্স। "

(২)
মরাল অব দ্যা স্টোরি হচ্ছে -চ্যাট জিপিটিকে প্রশ্ন করার আমি কিছুই জানি না- এই মনোভাবে এসে- একদম বেসিক থেকে চ্যাট জিপিটিকে প্রশ্ন করতে হবে। ধাপে ধাপে ভেঙে, প্রশ্ন করে , সেরা উত্তর বার করতে হবে।

চ্যাট জিপিটি আপনার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

আমি একটা উদাহরন দিচ্ছি। ধরুন আপনি নিউটনের বলবিদ্যা বা নিউটনিয়ান মেকানিক্সের সূত্রগুলি শিখতে চান।

এখন স্কুলে সবাই নিউটনের গতিসূত্র পড়েছে। সবার ধারনা তারা নিউটনের গতিসূত্র ভালোভাবেই জানে। আসলে কিন্ত ৯৯% ছাত্রই এই বেসিক টুকুও ভাল করে শেখে নি। ইনার্শিয়াল আর নন-ইনার্শিয়াল ফ্রেম অব রেফারেন্স কেন লাগে, কেন তা নিউটনের মেকানিক্সে গুরুত্বপূর্ন অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই তা ঠিকঠাক শেখে না। কারন তারা সূত্রগুলো মুখস্থ করে কিছু ফর্মুলা মার্কা অঙ্ক শিখেছে।

চ্যাট জিপিটির মতন মহান শিক্ষক পাবেন না। চ্যাট জিপিটির কাছে শিখতে গেলে, প্রথম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন- আমি কেন নিউটন্স ল অব মোশন শিখব?

এর এ উত্তর পাবেন, সেটা ১০% বোঝার ক্ষমতা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীদের নেই। এর পরে প্রশ্ন করুন, নিউটন্স ল অব মোশন শেখার জন্য, কি কি বিষয় শেখা জরুরী ? এবং সেই বিষয় গুলি কোন বই, কোন সাইট থেকে শিখতে পারেন? এখানে চ্যাট জিপিটি আপনাকে শিক্ষকদের থেকেও ভাল রেফারেন্স দেবে। কোথা থেকে কি শেখা উচিত সেটাও বলে দেবে।

এবার চ্যাট জিপিটি যা শিখতে বলেছে-তা একটার পর একটা বিষয় তুলে জিজ্ঞেস করুন এই জিনিসটা কোন বই, কোন ভিডিও, কোন সাইটে ভাল শেখা যাবে। চ্যাট জিপিটি সব দিয়ে দেবে। এরপর যদি কোন ডাউট থাকে কনসেপ্ট নিয়ে, সেটাও চ্যাট জিপিটিকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।

আমি বুদ্ধের ভাষায় বলতে চাইছি। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছ থেকে ভুল্ভাল শেখে। কারন অধিকাংশ মানব শিক্ষকের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা অনেক। তাই যেকোন টপিকে একদম ফ্রেশ মাইন্ডে- আমি কিছুই জানি না এই মনোভাব নিয়ে চ্যাট জিপিটিকে প্রশ্ন করা শুরু করুন- যে কি কি শিখব, কেন শিখব, কোথা থেকে শিখব। শেখার পর কিছু বুঝতে না পারলে প্রশ্ন করুন। সব ভুলে নতুন করে শিখুন।

ভবিষ্যতে চ্যাট জিপিটি বা সমমানের আর্টিস্ফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টুল দিয়েই চলবে গোটা পৃথিবী। সেই টুল ব্যবহার করা সহজ না। যার মন যত বেশী শিখতে ইচ্ছুক- যে যত বেশী ভাল প্রশ্ন করতে পারবে, সেই সব থেকে ভাল উত্তর বার করতে পারবে।

প্রশ্ন করতে স্কুলে শেখায় না। স্কুল শেখাচ্ছে রট আন্সার। মুখস্থ করে বমি। তাতে চলবে না। যারা স্কুলের শিক্ষাকে বেশী গুরুত্ব দেবে -তারা কিন্ত পিছিয়ে পড়বে। যারা চ্যাট জিপিটিকে প্রশ্ন করা শিখবে।চাকরির মার্কেটে তারাই এগিয়ে থাকবে।