Monday, March 13, 2017

বামজনতা কহিলা বিষাদে!

(১)

বলছিলাম–
না, থাক্ গে!
কী আসে যায় হাতে নাতে
প্রমাণ এবং সাক্ষ্যে।

মোড়লেরা ব্যস্ত বেজায়
যে যার কোলে ঝোল টানতে।
সারটা দেশ হাপিত্যেশে,
পান্তা ফুরোয় নুন আনতে। ( সুভাষ মুখোপাধ্যায়)


 আমেরিকাতে ট্রাম্প, ভারতে মোদি। লিব্যারালদের এবড় কঠিন সময়, গভীর দুঃখের দিন। 

 বামজনতা, লিব্যারাল জনতার এমন করুণ অবস্থা কেন-সেটা বিশ্লেষন করা জরুরী।

 উদাহরন দিয়ে শুরু করি। 

 দুদিন আগে মোদি কোন একটা জনসভায় বলেছিলেন, হার্ভাডের ডিগ্রির থেকে হার্ড ওয়ার্ক জরুরী। ভারতের অর্থনীতির দিক ঘোরাতে, বুঝতে। যথারীতি এলিট শ্রেনী কটাক্ষ শুরু করে।  মোদির উদ্দেশ্য ছিল অমর্ত্যসেনের বক্তব্যর বিরুদ্ধে।  অমর্ত্য সেন সহ অনেক অর্থনীতিবিদই মন্তব্য করেছিলেন ডিমনেটাইজেশনের ফলে ভারতের অর্থনীতির ক্ষতি হবে।

 অমর্ত্যসেন তার বক্তব্য রাখতেই পারেন। সমস্যা হচ্ছে এই যে অর্থনীতি গণিতের দৃষ্টিতে একটি জটিল সিস্টেম-এবং অর্থনীতির ভবিষ্যতবানী হাজারটা নোবেল লরিয়েট একসাথে বসে অঙ্ক করলেও বলতে পারবে না।  ভারতের মতন এমন জটিল একটা অর্থনীতির দেশে ওই ভাবে কোন ভবিষ্যতবানী কি করে উনি করলেন, কেন করলেন জানি না। উনি বলতেই পারতেন এই এই কারনে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হবে-কিন্ত এই এই কারনে উলটে লাভ ও হতে পারে।  আমি এই জন্যেই এটা লিখছি যে একটা জটিল সিস্টেম কি ভাবে এগোবে-তার একটা না অনেক পথ থাকতে পারে। উনার মতন একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ যখন ক্রিটিক্যাল দৃষ্টীভঙ্গী বাদ দিয়ে, সরাসরি ডিমনেটাইজেশনকে দুশলেন -সেটা মোটেও একাডেমিক সুল্ভ কোন বক্তব্য ছিল না। সেটা রাজনৈতিক দৃষ্টীভঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।

 কারন ব্ল্যাকমানি ভারতের প্রগতির জন্য বিরাট সমস্যা। কোলকাতা সহ সব মেট্রোতেই হাজারে হাজারে ফ্ল্যাট উঠছে - ফ্ল্যাটের দাম একটা শহরের মধ্যবিত্তদের মিডিয়ান ইনকামের ত্রিশ গুন ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে হওয়া উচিত পাঁচ গুনের কাছাকাছি।  একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিলে যা পাওয়া যায়, তা ফ্ল্যাটের দা্মের দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ। ভারতের যা ইন্টারেস্ট রেট, তাতে এটা হওয়া উচিত বারো শতাংশের ওপরে ( আমেরিকাতে আট )।  অর্থাৎ সবটাই ফাটকা মার্কেট।  ভারতের রিয়াল এস্টেট অন্তত চার থেকে পাঁচগুন বেশী ইনফ্লেটেড। জমির দাম ও তাই। পশ্চিম বঙ্গে বড় রাস্তার কাছে জমি চোদ্দ থেকে কুড়ি লাখ টাকা বিঘে যাচ্ছে। সেই টাকার সুদ দুলাখ ত হবেই। এদিকে বছরে তিনবার ধান চাষ করলে সেই জমি থেকে হার্ডলি ষাট হাজার টাকার ফসল আসে। নীট লাভ কুড়ি।  সব্জি কলা চাষ হলে সেটা চল্লিশ পঞ্চাশ হয়। দু লাখ হয় না। তাহলে এই ফাটকা দাম আসে কোত্থেকে?

 ইনফ্যাক্ট মোদি ডিমনেটাইজেশন করে বেলুনটা ডিফ্লেট না করলে ভারতের অর্থনীতি বিরাট ক্রাশ করতে পারত।  নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুধু কোলকাতার রাজারহাটেই জমির দাম কমেছে ৪০%। আরো অনেক কমবে।  মহারাষ্ট্রের ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৫০%। 

ব্ল্যাকমানির কুফল অনেক-সেসব কূটকাচালিতে যাচ্ছি না। শুধু দুটো পয়েন্ট বলি কি ভাবে এই ব্ল্যাক মানি ভিত্তিক রিয়াল এস্টেটের জন্য ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যর সাংঘাতিক ক্ষতি হচ্ছিল। যার ফলে লং টার্মে ভারতের ব্যবসার বিশাল ক্ষতি হত। 

 কোলকাতায় রাস্তার ধারে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ স্কোয়ারফুট দোকান কিনতে লাগে প্রায় আশি থেকে নব্বই লাখ টাকার সেলামী ( ভদ্র জায়গায়)।  সুতরাং মালিককে প্রায় মাসে ষাট হাজারটাকা লাভ রাখতে হবে রিয়াল এস্টেটের দাম মেটাতে। ফলে কোলকাতা ব্যঙ্গালোর সর্বত্রই ভদ্র ভাবে বসে খাওয়ার রেস্টূরেন্টগুলোর সাংঘাতিক দাম। যে দামের ৭০% যাচ্ছে রিয়াল এস্টেটের দায় মেটাতে। ফলে দাম এখন আমেরিকার  থেকে বেশী। সেক্টর ফাইভে বালীগঞ্জ প্লেসে থালির দাম প্রায় ছশোটাকা বা নয় ডলার।  এদিকে আমি আমেরিকাতে আমার বাল্টীমোর অফিসের কাছে মাত্র ছ ডলারে ওর থেকে ভাল চাইনিজ খাই।  এর ফলে যেখানে ১০০ টা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করতে পারত -করছে হয়ত মোটে পাঁচটা।

 ভারতের সব ব্যবসাতেই জমি বা রিয়াল এস্টেট একটা বড় সমস্যা। ওপারেটিং ইনকামের একটা বড় অংশ শুষে নিচ্ছে রিয়াল এস্টেট। 

 দ্বিতীয় সমস্যাটা আরো গভীরে।  ভারতের সব পুঁজি ছুটছে জমির পেছনে।  আমি ডিসেম্বর মাসে পুনের এক ফ্যাক্টরি মালিকের সাথে বসে কথা বলছিলাম। সেকন্ড জেনারেশন মারোয়াড়ি, আমেরিকাতে শিক্ষিত।  নতুন টেকনোলজিতে প্রচুর উৎসাহ।  এদিকে ফ্যাক্টরিটার দিকে তাকালে বোঝা যায় ফ্যাক্টরিটা জীর্ন-কিন্ত প্রচুর উৎপাদন দিচ্ছে। আমি বলেই ফেললাম, আপনি ফ্যাক্টরিতে যথেষ্ঠ রিইনভেস্ট করেন?

 উনি বল্লেন, ইচ্ছা ত থাকে কিন্ত কেন করবো বলুনত ?  ফ্যাক্টরি থেকে যে ইনকাম হয়, তা জমিতে ঢালা অনেক বেশী লাভজনক। ফ্যাক্টরিতে দুকোটি টাকা ইনভেস্ট করলে মার্কেটে বিক্রি হলে তবে পাঁচ বছরে হয়ত চারকোটি  উঠবে।  যদি ভাগ্যভাল থাকে। সেখানে ঠিক ঠাক জমিতে ইনভেস্ট করলে দুকোটি থেকে দশকোটি হবেই কয়েক বছরে। গ্যারান্টিড!    

ইনফ্যাক্ট গোটা ভারত জুরে এক অবস্থা। ব্যবসা, ম্যানুফাকচারিং এর সব লাভের  টাকা শুষে নিচ্ছিল রিয়াল এস্টেট। এমনিতেই চীনের উৎপাদিত পন্যের সামনে ত্রাহি ত্রাহি রব-সেখানে ম্যানুফাকচারিং এ ইনভেস্ট না করে ভারতীয় মালিকরা জমি বাড়ি কিনে গেছে। এটা বন্ধ করতে না পারলে, ভারতের অর্থনীতি লাটে উঠত। নেহাত ১৫০ বিলিয়ানের আই টি আউটসোর্সিং আছে বলে এই দৈন্যদশা বোঝা যায় না। কিন্ত আউটসোর্সিং এ বাঁশ দিলে, যা ট্রাম্প সবে দেওয়া শুরু করেছেন, কঙ্কালের ওপরে যে রাজার আলখাল্লা আছে, তা খসে একদিনে কঙ্কালটা বেড়িয়ে যাবে!

 মোদি এই অবস্থা ঠেকাতে দুটো জিনিস করলেন। এক কালো টাকার ওপর সার্জিকাল স্ট্রাইক। দুই মেইড ইন ইন্ডিয়া।  ডিমনেটাইজেশনের ফলে কোলকাতায় ফ্ল্যাটের দাম জমির দাম এত দ্রুত কমছে এদের মারোয়ারী মালিকরা প্রচুর সস্থায় বিক্রি করতে  এখন বাধ্য হচ্ছেন। যাতে লস ঠেকাতে পারেন। আর যাইহোক আগামী দশ বছরে ফ্যাক্টরি মালিকরা জমি বাড়ির ওপর ইনভেস্ট করবেন না এটা নিশ্চিত।  এর সাথে মেইড ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের জন্য ভারতের মিলিটারি থেকে অনেক জায়গাতেই দেশী  যন্ত্রাংশ চাওয়া হচ্ছে। ফলে ম্যানুফাকচারিং শিল্পে যদিও ভাঁটার টান ( এবং এখনো ডিক্লাইনিং), কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। 

 প্রশ্ন হচ্ছে, অমর্ত্য সেন ডিমনেটাইজেশনের খারাপ দিকগুলোই বলে গেলেন। ভালদিকটা ত বল্লেন না।  না কি অর্থনীতি সাবজেক্টটাই এমন জালি, তার নোবেল লরিয়েট ও জালিই হবে?  আমার ত বরাবরই মনে হয় পানের দোকানের মালিকের মাথায় যেটুক কমন সেন্স আছে, অধিকাংশ অর্থনীতির অধ্যাপকের মাথায় সেটুকুও নেই।  অমর্ত্য সেন জালি লোক নন।  তার পান্ডিত্য প্রশ্নতীত। কিন্ত  ডিমনেটাইজেশন নিয়ে তার বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রানোদিত, একাডেমিক না। 

     আমার বরাবরই মনে হয় বাম রাজনীতির সব থেকে দুর্বল দিক এই সব জালি সাবজেক্টের অধ্যাপকগুলোকে বেশী পাত্তা দেওয়া।  একজন রাস্তার ব্যবসায়ীও ভারতের অর্থনীতি নিয়ে যেটুকু বোঝে এই সব বোদ্ধা অর্থনীতির পাবলিকগুলো সেটুকুও বোঝে না। 

 (২)
  ধর্ম নিয়েও লিব্যারাল সেকু মাকুদের রিএসেমেন্ট দরকার।

 ল্যাটিন আমেরিকার বাম নেতারা কেউ মার্ক্স লেনিনের নাম মুখে আনে না। হুগো শাভেজ থেকে ইভো মরালেস-তার বামপন্থাকে যীশুর পদর্শিত বামপন্থা বলেন।  তাদের প্রো পুওর রাজনীতিকেই যীশুর পথ বলে দাবী করেন বাইবেল থেকে।  ইভো মরালেস একটা ইন্টারভিঊতে পরিস্কার বলে ছিলেন, লেনিন স্টালিনের যে বামপন্থা তা আমাদের না-কারন তা হিংস্র, খুনে। কোটি কোটি মানুষ সেই কাল্টে খুন হয়েছে। আমাদের পথ যীশুর দেখানো ভালোবাসার বামপন্থা। অথচ আমাদের বামপন্থীরা শ্রী চৈতন্যের মধ্যে সেই ভালোবাসার বামপন্থা খুঁজে পেলেন না! 

 ভারতের বামপন্থিরা গণবিচ্ছিন্ন। শাক্যজিত দেখলাম মোদির জয়ে কান্ডজ্ঞান হা্রিয়ে লিখেছে,  প্রতিষ্ঠানিক হিন্দু ধর্ম নাকি কোনদিন প্রতিষ্ঠান বিরোধি না। 

      প্রথমত কোন "প্রতিষ্ঠানিক" ধর্ম বা রাজনীতি কখনো প্রতিষ্ঠান বিরোধি হয়? এগুলো গাঁজা খেয়ে লেখা না?

     দ্বিতীয়ত সমস্ত প্রতষ্ঠান বিরোধি আন্দোলন সে ধর্ম বা রাজনীতি যাইহোক না কেন, ক্ষমতা পেলে তা প্রতিক্রিয়াশীল হয়। ইসলাম, বৌদ্ধ খীষ্ঠান সব ধর্মের শুরু প্রতিবাদি হিসাবে-কিন্ত আস্তে আস্তে তা সাম্রাজ্যবাদি প্রতিক্রিয়াশীল হয়েছে।

  তৃতীয়ত শাক্য কি শ্রীচৈতন্যের নাম শোনে নি? উনি জাতপাতের বেড়া ভাঙেন নি? গরীব ধনীর পার্থক্য ঘোচান নি?  ট্যাক্স কালেক্টরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন নি? 
   
 মহাভারতের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠানিক, প্রতিবাদি দুই চরিত্রই আছে।  বিদুর যুধিষ্ঠীরকে রাজ্য চালনার প্রথম ধাপ হিসাবে কি বলেছিলেন?

   "ধনের অসাম্যেই মূলত রাজনৈতিক অশোন্তোষ তৈরী হয়। এতেব এ রাজন, তোমার প্রথম কর্তব্য ধনীদের থেকে বেশী ট্যাক্স কালেক্ট করে, সেই টাকায় জনকল্যান মূলক কাজ কর "

  এই স্যোশ্যালিস্ট রাষ্ট্রের ধারনা ত মহাভারত বহুদিন আগেই দিয়েছে। অথচ ভারতের বামেরা ভারতের সংস্কৃতি এবং দর্শনকে বামপন্থার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! 

  কারন শাক্যজিত ভারতীয় বামপন্থার কোন বিচ্ছিন্ন ব্যামো না-এদের বাপ ঠাকুর্দারাও আসলেই কোনদিন ভারতীয় দর্শনকে গভীর ভাবে জানার চেষ্টা করে নি। ফলে গুন্ডাগর্দি করে পশ্চিম বঙ্গের অলস বাঙালীর মধ্যে ৩৪ বছর টিকেছিল বটে-কিন্ত জনগণের মধ্যে এদের ভিত যে কত দুর্বল ছিল, সেটা ক্ষমতা থেকে সরার পরে বোঝা যাচ্ছে। 

 ইভো মরালেস এবং হুগো শাভেজ থেকে আরো দুটো জিনিস শেখার আছে। এরা ওইসব জালি অর্থনীতিবিদদের হেগো পোঁদ চেটে আঁতলামো করে নি।  ইভো মরালেস বিকল্প অর্থনীতি, কোয়াপরেটিভ অর্থনীতির ওপরে জোর দিয়েছিলেন বেশী। তার পার্টির সবাই কোয়াপরোটিভের সাথে জড়িত। কেরালায় বামপন্থীদের সাফল্যের পেছনে মূলত কোয়াপরেটিভ।  সেখানে সিপিএম, কংগ্রেস আপ -এদের ত কোন বিকল্প অর্থনীতি নেই । শুধু  সামাজিক প্রকল্পর মাধ্যমে লোককে ঘুঁশ দেওয়ার ধান্দা। তাতে আমার আপত্তি নেই। ওটা ধনের বন্টন। কিন্ত লোকেদের ব্যবসা বানিজ্যর সুবিধা করে দেওয়ার কোন রূপরেখা সেখানে নেই।      বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থার দিশা না থাকলে লোকে এদের বিশ্বাস করবে কেন?

      (৩)

  তৃতীয় সমস্যা ইসলাম নিয়ে অবস্থানে।  আজকে চীন, জাপান, রাশিয়া, আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স-সবাই জিহাদিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে যেখানে গোটা বিশ্ব অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে সেখানে ভারতের সেকু মাকুরা ইসলামের বিরুদ্ধে বলতে ভয় পাচ্ছে। ভোট হারানোর ভয়।   ইসলাম কোন ধর্ম না। ইসলাম আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক মতবাদ।  তাতে আলাদা রাষ্ট্রনীতি, আইন সব কিছুই রয়েছে। যা আধুনিক রাষ্ট্রের পরিপন্থী।  সুতরাং ইসলাম আধুনিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় হুমকি। এগুলো কি চাপা সম্ভব? সুতরাং আমি ইসলামি তামাকু সেবন ও করব, আবার মোদিকে লিব্যারালিজম শেখাতে যাব, সেটাত জনগন মানবে না।  ইসলাম নিয়ে সঠিক অবস্থান না নিতে পারলে হিন্দু ভোট একত্রিত হবেই।  আজ উত্তর প্রদেশে যা হয়েছে, কাল পশ্চিম বঙ্গেও হবে। শুধু নেতার অপেক্ষা।  এবং ধর্মীয় আবেগে এটা হচ্ছে না। শ্রেফ নিজেদের জমি জায়গা ব্যবসা বাঁচানোর জন্য এটা হবে। কারন সামনে রয়েছে বাংলাদেশ। কোন দেশে বা রাজ্যে মুসলিমরা সংখ্যাগুরু হলে কি হয় তার জন্য পাকিস্তানে যেতে হবে না, কাশ্মিরে যেতে হবে না, হাতের সামনে রয়েছে বাংলাদেশ।  যেখানে হিন্দুদের জমি ব্যবসা সব থেকে বেশী লুঠপাট করে কোন ইসলামিস্ট পার্টি না-তাদের মধ্যেকার তথাকথিত মডারেট পার্টি।  এটুকু বোঝার ক্ষমতা সাধারন হিন্দুর রয়েছে। বাম-সেকু বিগ্রেডের নেই। এরা যদি ইসলামিক মৌলবাদ আটকাতে মাঠে না নামে, হিন্দু ভোট কনসলিডেশনের সামনে শ্রেফ ভ্যানিশ হয়ে যাবে । যা হয়েছে আসামে এবং উত্তর প্রদেশে।




























     








Sunday, January 15, 2017

দিদির বাংলা যেমন দেখলাম

                                                                                   (১)    
যদিও কোলকাতায় আসি বছরে বেশ কয়েকবার, কাজের চাপে, গ্রাম বাংলা বা কোলকাতা কোনটাই ঘোরা হয়ে ওঠে না।  বহুবছর বাদে, এবার বেশ প্ল্যান করেই এসেছিলাম-ক্রিসমাসের সময়টা গ্রাম মফঃশহরে ঘুরবো। তৃনমূল জমানায়, বাংলার লোকজন কেমন আছে, জানার চেষ্টা করব।

 শীতের ওই দিনগুলো এমনিতেই উৎসবের পালা পর্বন। তারপরে দিদির নির্দেশে এই সময়টাতে ব্লকে ব্লকে উৎসব। পিঠেপুলি, ভ্রমন, চুনোমাছ। দিদি আক্ষরিক অর্থেই বাংলাকে উৎসবমুখর করেছেন। রাস্তায় যেতে যেতে কতশত উৎসবের পোষ্টার, ফেস্টুন। এর মধ্যে কালনার পর্যটন উৎসবে নিজে গেলাম একরাত। রাত বারোটার সময়ও দশহাজার ছেলেমেয়েরা নিরাপদে উৎসবের ইমেজে গানবাজনা উপভোগ করছে। মোদ্দা কথা দিদির বাংলায় ছেলেপুলেরাযে উৎসবের আমেজে আছে সেই নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্ত শব্দদূষনের সমস্যা আছে। যত্রতত্র যখনখুশি পিকনিক হচ্ছে। সেটা আনন্দের কথা। কিন্ত ইদানিং পিকনিকের সাথে জেনারেটর চালিয়ে হাজার ওয়াটের স্পিকার বসিয়ে নাচাগানা হয় সর্বত্র।  এই একটা দৃশ্য কালনা, করিমপুর, ফলতা সর্বত্র চোখে এল। লোকজন বিরক্ত । রাতে শোয়া দায়। কিন্ত কারুর সাহস নেই এদের বিরুদ্ধে বলার। তৃনমূলের নেতা বিধায়কদেরএই দ্বায়িত্বটাও নিতে হবে।  উৎসব অবশ্যই ভাল-কিন্ত তার জন্য হাজার ওয়াটের স্পিকার বসিয়ে লোকজনকে উত্তক্ত করার মানে হয় কি?

 পাশাপাশি সব শহরেই দেখলাম নাট্যউৎসব চলছে।  সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল এখন অনেক মুক্ত।  সেইসব উৎসবে লোকও হচ্ছে অনেক।


                                                          (২)

 রাস্তাঘাটের অবস্থা গ্রামের দিকে বেশ ভাল। রাজ্য সরকগুলির এখন তখন ( সিপিএম জমানা) মনে করলে, স্বর্গ নরকের তুলনা হয়।  করিমপুর কৃষ্ণনগর, কৃষ্ণনগর কালনার রাস্তাগুলোতে অনায়াসে এখন একশো কিলোমিটার স্পিডে গাড়ি চালানো যায়। তবে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা এবং ট্রাকের সংখ্যা এখন অনেক অনেক বেশী। ফলে রাস্তা ভাল থাকা স্বত্বেও রাত ছাড়া স্পীডে চালানো যায় না।  এবং ছোট ছোট শহরগুলোতে টোটোর এত দৌড়াত্ব, এই শহরগুলোতে বাইপাস না থাকলে, একটা ছোট শহর ক্রস করতেও গাড়ীগুলো আধঘন্টা টোটো ট্রাফিকে আটকাচ্ছে। এই সরকারের নেক্সট স্টেপ হওয়া উচিত, বড় বড় শহরগুলোতে বাইপাস বা ওভারব্রিজের ব্যবস্থা করা-যাতে এক্সপ্রেস ট্রাফিক শহরের বাইরে দিয়ে চলে যেতে পারে। আমেরিকাতে এটা বহুদিন ধরে আছে।  এক্সপ্রেস ট্রাফিক শহরের বাইরে দিয়ে অর্ধচন্দ্রাকারে বার করে দেওয়া হয়। আশা করব, দিদি যখন এতটাই করেছেন, এই নেক্সট স্টেপটাও আগামী দশ বছরে আসতে চলছে।

 এবার আসি টোটোর কথায়। গ্রাম এবং জেলাশহরগুলিতে এখন টোটো হচ্ছে ডিফল্ট ট্রান্সপোর্টেশন। ব্যাটারি চালিত রিক্সা। ফলে শব্দ দূষন, বায়ুদূষন নেই। অনেক বেকাররা করে খাচ্ছে। সিম্পল টারিফ সিস্টেম-চড়লেই দশটাকা-যেকোন দুটো পয়েন্টের মধ্যে।  টোটোগুলো সারাদিনে ৫০০-২০০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার করছে। ব্যাটারি মেইন্টেনেন্সের দরকার ছমাসে একবার।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালকই মালিক। মাসে দশ হাজার থেকে পনেরো হাজার টাকা রোজগার।

কিন্ত সমস্যা হচ্ছে টোটোর সংখ্যা বেড়েছে অসম্ভব।  রাস্তায় হাঁটা দায়।  কোন রেগুলেটরি অথোরিটি নেই। তবে দূষনমুক্ত এই নিঃশব্দ বিপ্লবকে স্বাগত। আমি  মনে করি প্রযুক্তিই মুক্তির আসল উপায়। কিন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা দরকার।


                                                                              (৩)

সিপিমের ভবিষ্যত পশ্চিম বঙ্গে শুন্য। অধিকাংশ পার্টি অফিস খুলছেই না। তালাবন্ধ।  শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ, কঅর্ডিনেশন কমিটি সব মৃত।  নেতার মুখ বন্ধ করে বসে আছেন-কারন মুখ খুললেই ট্রান্সফার হবে আরামের শহর থেকে অনেক দূরে।  জনগণ এদের বহুদিন আগেই রিজেক্ট করেছিল-শুধু  হার্মাদদের দিয়ে ভোট করিয়ে ভাবত জনগন এদের সাথে। এখন পরিস্কার জনগন খুব পরিস্কার ভাবেই বুঝেছে, সিপিএম আদতে কর্মনন্য নেতাদের আখরা। সিপিএমের নেতারা তুলনামূলক ভাবে সৎ হতে পারে কিন্ত সিপিএমের আমলে আডমিনিস্ট্রেশনকে যেভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল, তার ফল দেখেছে রাজ্যবাসী।

 প্রথমে স্কুলের কথা আসি। আমি দুজনের সাথে কথা বল্লাম। একজন হাইস্কুলের হেডমাস্টার, অন্যজন প্রাইমারী স্কুলের। জন্ম ইস্তক এদের দেখে আসছি। সিপিএম ফ্যামিলি। ডিএ নিয়ে খুশী না হলেও শিক্ষার জন্য, তৃনমূল যা করছে, তার জন্য তারা খুশী।

 প্রথমে প্রাইমারী স্কুলের কথায় আসি। আগে সর্বশিক্ষা মিশনের টাকা বারোভূতে খেত। এখন ঠিক ঠাক খরচ হচ্ছে।  আমি যে গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম, সেখানে ছিল তিনটে ঘর, বাকি গাছের তলায় আমাদের পড়াশোনা হত। সিপিএম আমলে শিক্ষকদের বেতন বাড়ছিল, কিন্ত স্কুলের কোন উন্নতি হয় নি। ফলে গ্রামের দিকেও প্রাইমারী স্কুলে ছেলে মেয়েদের না পাঠিয়ে প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের রমরমা শুরু হয় সিপিএম জমানাতে। এখন আস্তে আস্তে সেটা বদলাচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলগুলোতে সর্বশিক্ষা মিশনের টাকাতে টাইলস বসানো বাথরুম। পানীয় জলের ব্যবস্থা।  পর্যাপ্ত ঘর, চেয়ার টেবল সব কিছুই হয়েছে। এগুলো নিজের চোখেই দেখলাম। সরকার পাঠ্যপুস্তকগুলোও অনেক ভাল করেছে। রিপোর্টিং কম্পুটারাইজড । ফলে আস্তে ইংলিশ মিডিয়াম থেকে আবার সরকারি প্রাইমারী স্কুলের ওপরে ভরসা বাড়ছে।  সিপিএম সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ন ধ্বংস করে দিয়েছিল। শুধু শিক্ষকদের মাইনে বাড়িয়ে স্কুলগুলো বাঁচানো যেত না। দরকার ছিল পরিকাঠামো। সেই খাতে সিপিএম একদম খরচ করে নি। মমতা ব্যার্নার্জি আস্তে আস্তে সরকারি স্কুলগুলোকে পথে আনছেন।

 হাইস্কুলের অবস্থা এখন অনেক ভাল।  সিপিএমের আমলে গ্রামের স্কুলের শহরের শিক্ষকরা সপ্তাহে দুদিনের বেশী স্কুলে যেতেন না। শিক্ষিকারা আবার আসতেনই না প্রায়! এবিটিএর কাছে নাকখঁত করা হেডমাস্টারমশাইরা কিছু বলার সাহসই পেতেন না। এখন স্কুলে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সপ্তাহে ছদিনই দেখা যাচ্ছে। কারন স্কুল কমিটিগুলোই এখন স্কুল চালাচ্ছে-যেখানে অভিভাবকদের কথাই শেষ। হতে পারে তারা তৃনমূলের লোক। কিন্ত অভিভাবক ত  বটে। সিপিএম আমলে পিটিএ বা স্কুল পরিচালন পর্ষদ ছিল ছুঁচোজগন্নাথ। শিক্ষকরা এবিটিএর শিল্ডিং পেত। এখন তা আর নেই। তৃনমূলের লোকজনের চাপেই এটা হয়েছে। অনেকেই বলছেন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ। কিন্ত কি লাভ হত শিক্ষক নিয়ে যারা স্কুলেই আসতেন না? বা স্কুল বিল্ডিং এর এত দূরাবস্থা ছিল, সবাই ইংলিশ মিডিয়ামে পাঠাত ছাত্রদের ?  স্কুল পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ না করে, শিক্ষক নিয়োগ করে কিই বা লাভ হয় জনগনের যেসব শিক্ষকরা স্কুলেই আসেন না?  এছাড়া এখন সব বই সরকার দিচ্ছে। ফলে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সিপিএম আমলে যে বিশাল ব্যবসা হত, তা বন্ধ এখন।

 স্কুল ছাত্রদের সাইকেল নিয়ে অনেক কথা শুনেছিলাম ফেসবুকে। অনেক ছাত্র ছাত্রীদের সাথে দেখা হল। নাহ, সেসব সাইকেল চলে এবং ছেলেমেয়েরা সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে না মোটেও । স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সাইকেলটা একটা নিঃশব্দ বিপ্লব।

 বিডিও এবং ব্লক পরিচালন অফিসারদের ও এখন চেয়ারে পাওয়া  যায় ঠিক সময়ে। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে একটা নিয়মানুবর্তিতা এসেছে-যা আগে ছিল অনুপস্থিত। কলকাতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়েও কাজ করানো কঠিন। পশ্চিম বঙ্গের ওয়ার্ক কালচার এতটাই খারাপ করে ছেড়েছিল সিপিএম।  সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোটা মমতা ব্যানার্জির সব থেকে বড় সাফল্য। কোলকাতায় লোকজনদের দিয়ে কাজ করানো কি কঠিন-সেটা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। সেখানে মমতা ব্যানার্জি সরকারি কর্মচারিদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন-সেটাযে কত কঠিন কাজ তা আন্দাজ করতে পারি।

 মোদ্দা কথা যা দেখলাম, তাতে পশ্চিম বঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আশা করা যায়। যা সিপিএম আমলে প্রায় সম্পূর্ন ধ্বংসের পথে ছিল।



                                                                          (৩)

 তবে বাচ্চাদের অবস্থা খারাপ। সেটা অবশ্য পরিকাঠামোর জন্য। বাচ্চদের খেলার গা ঘামানোর জায়গা নেই।  খাচ্চে দাচ্ছে, মোটা হচ্ছে, পাঁচটা সাতটা করে প্রাইভেট টিঊটর। খেলাধূলা না করার জন্য সামান্য পড়াশোনার চাপও নিতে পারছে না। অনেকের সাথেই দেখা হল, মাধ্যমিক দেওয়ার আগেই নার্ভাস ব্রেকডাউনে।  আগামি দিনের নাগরিকরা শৈশবেই মানসিক বৈকল্যের কবলে পড়লে,  আগামী প্রজন্মের কি হবে?

 ছোটবেলায় যেখানে সেখানে একছটাক মাঠ ছিল-এখন সেখানে বহুতল। গোটা ভারত জুরেই প্রায় এক অবস্থা। একমাত্র যারা ধনী-ক্লাবের মেম্বার-তাদের জন্য টেনিস, ব্যাডমিন্টন কোর্ট আছে।  জায়গার অভাবে নিদেন পক্ষে যোগ ব্যায়াম অন্তত চলুক।

  কোলকাতায় একমাত্র সল্টলেক, রাজারহাট, নিউটাউন এরিয়া প্ল্যান্ড সিটি। সেখানে মোটামুটি ভাল পার্ক, হাঁটার জায়গা আছে।  সাউথ কোলকাতায় লেকের ধারে ছাড়া হাঁটার জায়গা কোথাও নেই।

এর সাথে জুড়ুন মাত্রারিক্ত শব্দ এবং বায়ুদূষন।  উবের ওলার দৌলতে ইয়োলো টাক্সির সংখ্যা কিছু কমেছে। সেটা ভালর দিক। কোলকাতায় অটোবন্ধ করে ইলেক্টিক অটো বা টোটো চলুক। বাসগুলোও ইলেক্ট্রিকবাস হোক আস্তে আস্তে। জ্বালানী পোড়ানো বন্ধহৌক।  সবার রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে নিশ্চয় হবে।

 কোলকাতা এখন রাতে অনেক সুন্দর। রাস্তার দুধারে মায়াবী নীল আলোতে সুন্দরী কলকাতা যেন সত্তরের দশকের বলিউডি হেলেন।   এটলিস্ট একটা ভদ্র আধুনিক শহর বলে মনে হয়।  সাথে সাথে যদি পরিবেশটাও পরিস্কার রাখা যায়, কোলকাতা এগোবে আরো বেশী।

                                             (৪)

সাম্প্রদায়িকতা বিশাক্ত সাপের মতন ফনা তুলছে। প্রতিটা হিন্দু ফ্যামিলিতে ধূলাগড় নিয়ে আলোচনা। কতশত লাশ নাকি রাস্তায় পড়ে আছে। অবশ্য এক্সাক্টলি কি করে কেউ এসব জানল, সেটা নিতে প্রশ্ন করলে, উত্তর নেই।  সাম্প্রদায়িক গুজবের ফানুস বাতাসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র আবেগে তৃণমূল সিপিএম বিজেপি ভেদাভেদ নেই। মুসলমান বিরোধিতার ভোটটা শুধু বিজেপির বাক্সে পড়ছে না-কারন বিজেপির নেতা নেই। তাছাড়া ওটা এখনো উত্তরভারতীয় গোবলয়ের পার্টি বাঙালীদের কাছে।  ফলে বিজেপি এখনো মমতার কাছে সেই অর্থে কোন থ্রেট না। কিন্ত বিজেপির উত্থানের সব মশালা প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত। অপেক্ষা শুধু ভাল নেতার। "স" মার্কা দিলীপ ঘোষ মার্কা নেতা দিয়ে বঙ্গ বিজয় হবে না। অন্তত একজন ভাল বাঙালী নেতার দরকার বিজেপিতে-যা তাদের নেই এই মুহুর্তে।

  মমতা ব্যানার্জির সব ভাল কাজ জলে যাবে যদি না তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে কড়া হাতে দমন করতে ব্যর্থ হন। অপারেশন বর্গার ফলে অনেক সম্পন্ন হিন্দু পরিবার মুসলমান ভাগচাষিদের কাছে জমি বেচতে বাধ্য হয়েছিল। সেই রাগটা ছিলই। এখন নানান গুজবে, প্রচারে সাম্প্রদায়িকতার বিশাক্ত সাপ ফোঁস ফোঁস করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার যা চিরকাল ধরেই হয়ে এসেছে-ফেসবুকের কল্যানে এখন তা ঘরে ঘরে। এর সাথে মুসলমা জঙ্গি, আইসিসিস ইত্যাদির হাত ধরে পোলারাইজেশন খুব বাজে জায়গায়। আগে হিন্দুদের একটা অংশ মুসলমানদের দেখতে পারত না।  সাম্প্রদায়িকতা  বিরোধি প্রচুর হিন্দু ছিল। যাদের অধিকাংশই ছিল সিপিএম।  এখন প্রায় পুরো অংশটাই মুসলমান বিরোধি। এদের অনেকেই আদি সিপিএম। বিজেপির খাতায় নাম লেখাতে বাকী আছে শুধু।

সিপিএমের ভাঙন অব্যহত থাকলে হিন্দু ভোট আস্তে আস্তে বিজেপিতে জড় হবে-যদিও সেটা কঠিন করে তুলেছে, বিজেপি নিজেই-যাদের ক্যাডাররা ভীষন ভাবেই অসন্তুষ্ট দিল্লীর ওপরে।

 এই পোলারাইজেশনটা আজ না হলে কাল হতই। এখন বেশ দাঙ্গার আবহে বিরাট আকার নিয়েছে, যদিও এই ধরনের হিন্দুরা ভোট টা এখনো মমতা ব্যানার্জিকেই দিচ্ছেন। কারন আর যাইহোক দিদি কাজ করবেন এই আস্থাটা এখনো আছে। কিন্ত সিপিএম সম্পূর্ন ধ্বংশ হলে আখেরে লাভ বেশী বিজেপির, ক্ষতি তৃনমূলের।

 সিপিএম যে সম্পূর্ন অপদার্থ ছিল, সেটা দিদি হাতে নাতে করে দেখিয়েছেন। কিন্তু সেটাই না আবার তৃণমূলের কাল হয়। কারন সিপিএম ধ্বংশ হলে, সেই ভোট টার অধিকাংশ যাবে বিজেপিতে।  আমি শুনলাম সেটা নাকি তৃনমূল বুঝেছে। তাই তারাই তাগদা দিচ্ছে সিপিএমের লোকেদের পার্টি অফিস খুলতে। অহ, এই দিনটা আসতই।





                               


Friday, December 23, 2016

জলের সংকট

গত দুসপ্তাহ ভারতের নানান শহরে চরকির মতন ঘুরছি। আশঙ্কা ছিল ডিমনেটাইজেশনের বাজারে, ক্যাশ সংকটে ভুগিতে হইবে। কিন্ত তেমন কিছু হল না-বরং দেখলাম কোলকাতা বাদ দিলে, অন্য মেট্রোগুলোতে ক্যাশ ছাড়া বাঁচা সম্পূর্ন সম্ভব। অন্তত ট্রাভেলারদের পক্ষে।

কিন্ত যেটা আশংকাজনক বলে মনে হল-সেটা হচ্ছে সারফেস ওয়াটার রিজার্ভ। নদী, নালা, পুকুর-ভারতের সর্বত্র যাতা অবস্থা। এটা জানা ছিল গত ত্রিশ বছরে ভারতে নদীর জল ধারন ক্ষমতা কমেছে ৫৪%। আমারত দেখে শুনে মনে হচ্ছে ওটা ৯০% এর কাছাকাছি হবে।

ব্যাঙ্গালোর থেকে মাদুরাই গেলাম একদম আমেরিকান কোয়ালিটির এক্সপ্রেস ওয়েতে। পথে কাবেরী থেকে আরো কিছু নদীনালা। কোত্থাও কোন জল নেই।

কালনার কাছে গঙ্গা বড়াবর অনেকটা ঘুরলাম মটর সাইকেলে। চারিদিকে চড়া গজিয়েছে। ছোটবেলায় দেখতাম কালনা ভর্তি থাকত পুকুরে। এখন প্রতিটা পুকুরকে ইচ্ছা করে মজাচ্ছে তাদের মালিকরা। যাতে চড়াদামে বেচতে পারে। কারনে শহরে আর কোন জমি নেই।

পুনে শহরের বুকচিরে আছে অনেক নদী, ক্যানাল। কোথাও জল নেই। জলের স্তর নেমে গেছে আশঙ্কা জনক ভাবে। পুনে শহরে জলের সংকট বেশ তীব্র।

ব্যঙ্গালোরের লাইফ-লাইন অনেকগুলো লেক। একটা সেন্সর প্রোজেক্টের কর্মসূত্রে শহরের মধ্যের একটা লেকে গেলাম -নামটা বোধ হয় বেলান্দুর লেক। জলের অবস্থা বেশ খারাপ। শুনলাম ব্যাঙ্গালোরের প্রায় কুড়িটা ছোটবড় লেক বোঁজানো হয়েছে।

এত যা দেখছি ভারতে উন্নয়নের নামে আত্মহত্যা চলছে। চারিদিকে ঝকমকে মল। রাস্তাঘাট ভাল হচ্ছে। হাই রাইজ উঠছে। কিন্ত নদী, নালা জলের সোর্সগুলোকে যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তাতে আর জাস্ট দশ বছর বাদে অধিকাংশ শহরে পানীয় জলের সাপ্লাইএর তীব্র সংকট দেখা দেবে। দিতে বাধ্য।

পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে, পরিবেশ ধ্বংশ করে ফুটে যাওয়ার লিস্টিটা ছোট না।

পরিবেশ নিয়ে চিন্তাভাবনা আছে। মোদি সরকার দেখছি ঠুটো জগন্নাথ পল্যুউশন বোর্ডকে একটু হলেও নাড়িয়েছে। ২৩০০ কোম্পানীর কাছে ক্লোজার নোটিশ গেছে। কালনা শহরেও শুনলাম, তৃনমূল এসে পুকুর বোঁজানো বন্ধ করেছে, যা সিপিএম আমলে ছিল বেশ র‍্যামপ্যান্ট। সবটাই শোনা কথা যদিও। এগুলো আশার কথা। আমি আশাবাদি।

ডিমনেটাইজশনের ফলে আশা করি জমি, বাড়ির উদ্ভট দাম ধ্বসে যাবে। এগুলো হলে হাই রাইজ তোলা বন্ধ হবে। ট্রাম্প বাবাজি যদি আউটসোর্সিং এ কার্পেট বম্বিং করে, তাহলে ব্যাঙ্গালোরের বাকি লেকগুলো অন্তত খাসি হওয়ার হাত থেকে বাঁচবে।

কখনো সখনো মনে হয়, এই উন্নতি না হলেই হয়ত দেশটা বেঁচে যেত।

Sunday, November 27, 2016

নির্মোহ দৃষ্টিতে ফিদেল ক্যাস্ত্রো

Blog link :  http://biplabbangla.blogspot.com/2016/11/blog-post_27.html

কমিনিউজম এবং ধর্ম, দুটোই দাঁড়িয়ে রূপকথা এবং তার অলীক সত্যের প্রচারের ওপরে। গুচ্ছ গুচ্ছ মিথ্যে জনগণকে খাইয়ে তৈরী হয় কমিনিউস্ট বা ধর্মীয় প্রফেটদের বিগার দ্যান লাইফ চরিত্র।

 আমি কিউবাতে যায় নি-যাওয়ার ইচ্ছা এখনো আছে ষোলআনা, বিশেষত ক্যারিবিয়ান দীপপুঞ্জ আমার প্রিয় টুরিস্ট ডেস্টিনেশন। আগে আমেরিকা থেকে কিউবা যাওয়া সহজ ছিল না। ইদানিং ওবামা-রাউল চুক্তির দৌলতে এখান থেকে সরাসরি হাভানা যাওয়া যাচ্ছে। তবে আমার চেনাশোনা যেসব টুরিস্ট কিউবাতে গেছে, তাদের কাছ থেকে যা শুনেছি- হাভানাতে খাবারের শর্টেজ আছে এমনকি টুরিস্টদের জন্যও। তবে বেশ্যাদের রমরমা। মাত্র দশ ডলারেও শুতে রাজী হয়ে যায় যেকোন মেয়ে। কারন সবার বাড়িতেই খাবার দাবার থেকে বেসিক জিনিসের টানাটানি। কিউবান ইমিগ্রান্টদের কথা ছেড়ে দিলাম-তারা ত কাস্ট্রোর ওপর এমনিতেই খাপ্পা তাদের জীবন এবং পরিবার ধ্বংসের জন্য।


এবং মনে রাখবেন, আমি অন্যদের কথা বলছি না। বলছি ফিদেল কাস্ত্রোর মেয়ে আলিনা ফার্নান্ডেজের কথা। যিনি ৩৭ বছর বয়সে কিউবা থেকে স্পেনে পালান (১৯৯৪)। সেখান থেকে মিয়ামিতে । এখন মিয়ামিতে এক্সাইল কিউবান রেডিও শো হোস্ট করেন। উনি লিখেছেন উনার বাবার লেগ্যাসি - Castro's Daughter: An Exile's Memoir of Cuba।

     এলিনার লেখা থেকে যে ফিদেলকে পাওয়া যায় তা অনেক বিশ্বাসযোগ্য। বাবা সম্মন্ধে খারাপ কথা কোন মেয়েই বলবে না। এলিনাও বলেন নি। শুধু তার লেখায় যে ফিদেলকে পাওয়া যায় -সেই ফিদেল কোন বাবা না- একজন আদর্শবাদি নেতা। গোটা লেখাটাই একজন কন্যা তার পিতাকে খুঁজছেন, কিন্ত ফিরে পাচ্ছেন এক নেতাকে। 
লেখাটি খুবই বিশ্বাযোগ্য যখন দেখি কাস্ত্রো তার মেয়েকে ফেমিনিজমের শিক্ষা দিচ্ছেন এই ভাবে -তোমার মায়ের মত হয়ো না। সি ইজ টু নাইস ট্যু মি। ডোন্ট বি সো নাইস ট্যু এ ম্যান! 

   এলিনার লেখা থেকে পরিস্কার ফিদেল কমিনিউস্ট আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি। প্রেসিডেন্টের কন্যা বা স্ত্রী-কোন আলাদা সুবিধা পায় নি হাভানাতে। এখন কমিনিজম রাষ্ট্রের জন্য একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক আদর্শ-সেটি অন্য প্রশ্ন।

  এবার আসা যাক ফিদেলকে নিয়ে গড়ে ওঠা মিথ প্রসঙ্গে। সত্যিই কি কিউবাতে চিকিৎসাব্যবস্থা এত ভাল? 

   দুদিককার বক্তব্য শুনে যেটা পরিস্কার-কিউবা অনেক বেশী ডাক্তার তৈরী করতে সমর্থ হয়েছে-কিন্ত দেশে না আছে মেডিসিন, না আছে আধুনিক মেডিক্যাল ফেসিলিটি। অত্যাধুনিক ফেসিলিটি একমাত্র আছে টুরিস্ট এবং নেতাদের জন্য। সেটা ডলার কামানোর ধান্দায়। একজন সাধারন লোকের পক্ষে এন্টিবায়োটিক পাওয়া দুস্কর। কিন্ত তাও কিউবার লাইফ এক্সপেক্টেন্সি আমেরিকার থেকে ভাল। কিন্ত সেই তথ্যও কমিনিউস্ট গুপি কি না, তাই নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন [১] । 

  কিউবার খাদ্য সিকিউরিটি নিয়েও একই কথা। ৭০% খাদ্য আমদানি করতে হয়। কারন দেশের কৃষিকর্ম একদম প্রাচীন যুগের। এর একটা বড় কারন কিউবা সাসটেনেবল কৃষিতে বিশ্বাসী। কিন্ত সেটা করতে গিয়ে দেশটার খাদ্য উৎপাদন একদম তলানিতে। ইম্পোর্টই ভরসা। [২]

 ফিদেলের আগে কিউবা অনুন্নত ছিল এগুলো রূপকথা। কমিনিউস্ট বিপ্লবের আগে [৩]

  1.           কিউবার সাক্ষরতার হার ছিল ৭৮%
  2.           পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিল উত্তর আমেরিকার মধ্যে পঞ্চম
  3.            লাইফ এক্সপেক্টেন্সিতে তৃতীয়
  4.             গাড়ী এবং টেলিফোন ওনারশিপে আমেরিকা, কানাডার পরেই ছিল কিউবা


 মোদ্দা কথা কিউবা নিয়ে বলতে উঠলে, বাঙালী বামেরা উচ্ছাসিত হয়ে ওঠেন। যদিও বাস্তব এটাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রতি মাসে কিউবানরা বোটে করে ফ্লোরিডাতে পালাচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকার কজন কিউবা কোন দেশ সেটা জানে কি না সন্দেহ। আর যদি বাম বাঙালীর প্রশ্ন তোলেন, তারাও ডলারের লোভে আমেরিকান এম্নাসীতেই লাইন দিয়ে থাকেন-কিউবাতে পড়াশোনা করতে গেছেন, এমন বাম বাঙালীর সন্ধান কেউ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কারন কিউবাতে সবা্র  ইনকাম ওই মাসে ২০ ডলার বা ১৫০০ টাকার কাছাকাছি। ওইকটা টাকার জন্য কোন বাম বাঙালী এখনো কিউবার ছাত্র হওয়ার দৌড়ে নাম লেখান নি-যদিও তারা ফিদেল এবং তার অলীক কিউবা নিয়ে ফেসবুক গরম করে থাকেন। তবে কি না অর্থ মর্হাঘ্য বস্তু-তা আদর্শবাদিদের ও ছাড়ে না। 

[১]http://www.nationalreview.com/article/432680/myth-cuban-health-care
[২]https://www.wfp.org/countries/cuba
[৩]http://www.nationalreview.com/corner/442483/cuba-castro






Friday, November 25, 2016

সুখের সন্ধানে

থ্যাঙ্কস গিভিং থেকেই আমেরিকাতে ছুটি ছুটি আবহে ঢিলেমি দিয়েই কাজ চলে। নির্বান্ধব প্রবাসে, এই ডিসেম্বর মাসটা আমার খুব প্রিয়। বাইরে সাদা বরফ। কাজের চাপ নেই। ফলে চিন্তাভাবনার অবকাশ অনেক। সাথে প্রিয় হুইক্সি থাকলে বিশ্বব্রহ্মান্ডের ভাবনা ঠেকায় কে!

আমার অনেক দিনই মনে হয় বেঁচে থাকাটা বেশ কঠিন কাজ। সেই সুকুমার রায়ের ফকিরের মতন। বাবা-মা-বৌ-বাচ্চা-প্রতিবেশী-প্রেমিকা-বস-কোম্পানী-অদ্য ফেসবুকের বন্ধু। প্রত্যাশার শেষ নেই। আর প্রত্যাশা মানেই কাজ। শুধু কাজ না-অনেক অনেক কাজ। তার মধ্যে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। নৌকা বেশ চলছিল-হঠাৎ হঠাৎ চোরা শ্রোত, ঝড় এসব আছেই। এতকিছু ভাবার অবকাশ পেলেই আমি অবাক দাঁড়কাক। বেঁচে থাকাটা সত্যিই বিড়াম্বনা।

এমনিতে জীবনের কোন উদ্দেশ্য নেই। এই মহাবিশ্বের বয়স তের বিলিয়ান বছর। আকারে অসীম। এর মধ্যে স্থান কালের ভিত্তিতে আমরা সবাই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু। সেই রবীন্দ্রনাথ ও এক বিন্দু-এক ভিখারী যে জীবনে কিছু দিয়ে যেতে পারে নি-সেও আরেক বিন্দু। তাহলে এত খেটে লাভ কিসের? আলটিমেটলি কোনই লাভ নেই। বরং এত বাদ বিবাদে বিড়াম্বনা নিয়ে কষ্টেই বেঁচে থাকা।

সুতরাং কষ্ট নিয়ে বেঁচে থেকে লাভ নেই। বেঁচে থাকতে গেলে, আনন্দে মস্তিতে বেঁচে থাকার তাও মানে আছে। সুতরাং যেকদিন আছি, সুখের সন্ধান- পারস্যুট অব হ্যাপিনেসটাই আসল। বাকী সব কিছুই গৌন। দর্শন শাস্ত্রে এর একটা পোষাকি নাম আছে। হেডোনিজম। তবে হেডোনিজমে একটা টুইস্ট আছে। এরা মনে করে ভাব্বাদি সুখ না, বস্তুবাদি সুখ-যা সেন্সুয়াল প্লেজার থেকে আসে, সেটাই আসল। আমি অবশ্য বস্তুবাদি আর আধ্যাত্মিক-দুই ধরনের প্লেজারেই আনন্দ পাই।

সুখের সন্ধান ব্যপারটা নতুন কিছু না। আমেরিকান সংবিধানের প্রেনেতা থমাস জেফারসন ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষনায়, কোন স্বর্গের সন্ধান বা অলীক জাতিয়তাবাদকে আশ্রয় করে আমেরিকার স্বাধীনতা দাবী করেন নি। সংবিধান এবং আমেরিকান রাষ্ট্রের ভিত্তি সেই পারস্যুট অব হ্যাপিনেস ।


সুতরাং কি কি জিনিস আনন্দ দেয়, তার একটা লিস্ট করা যেতে পারে। তবে যাহাই আনন্দ, তাহাই বিষাদের কারন ও বটে। সুস্বাথ্য ছাড়া কোন ভাবেই সুখী হওয়া সম্ভব না। সুতরাং স্বাস্থ্য সবার আগে। আর স্বাস্থ্য ভাল রাখা ম্যাজিক না। এর জন্যে খাটতে ত হবেই-সাথে সাথে খাওয়া দাওয়া নিয়ন্ত্রনে রাখতে হয়। অর্থাৎ কিছু কিছু সেন্সুয়াল প্লেজার না কমালে সুখী হওয়াটা বেশ কঠিন।

সুখী সুখী ভাবটা-অবশ্যই বায়োলজিক্যাল। হর্মোন এবং জেনেটিক্স প্রভাবিত। রিসার্চ বলছে সুখী থাকার ৫০% জেনেটিক্স। আমি একমত না। আমার পিতা অধিকাংশ সময় খুশীর থেকে অখুশী থাকেন বেশী। আমি কিন্ত বেশ খুশ মনেই থাকি অধিকাংশ সময়।

হার্ভাডের দীর্ঘ ৭৬ বছরের গবেষনা বলছে, সুখী থাকার সব থেকে শ্রেষ্ঠ উপায় সবার সাথে ভাল সম্পর্ক রাখা। বিশেষ করে যারা ছোটবেলায় বাবা-মায়েদের সাথে স্ট্রং বন্ডিং এর সুযোগ পেয়েছে, তারাই পরবর্তীকালে সুখী বেশী। সুতরাং একটা সুখী ফ্যামিলিই সুখী থাকার প্রথম এবং মুখ্য ধাপ।

টাকা পয়সা খরচ করেও সুখ কেনা যায়। তবে নিজের জন্য জামা কাপড় কিনে বা রেস্টুরেন্টে গিয়ে না। টাকা পয়সা যদি অন্যের দুঃখ দারিদ্র ঘোচাতে খরচ করা হয়। এটা বিবেকানন্দ রচনাবলীতে একাধিবার এসেছে। আশার কথা এই যে হার্ভাড বিজনেস স্কুলের গবেষনাও এক কথা বলছে। সুখী হতে চাইলে টাকা পয়সা দিয়ে চ্যারিটি করা অনেক বেশী কার্যকরী-নিজের পেছনে খরচ করার থেকে।

সাইক্রিয়াটিস্ট মার্টিন সেলিগ্যাম সুখী থাকার পাঁচটা ডাইমেনশন দিয়েছেন ঃ
  1. প্লেজার-খাদ্য, যৌন সুখ, আরামপ্রদ ঘুম। এর মধ্যে খাদ্য গুরুত্বপূর্ন। একাধিক স্টাডি প্রমান করেছে যারা ফল্মূল ভেজিটেবল বেশী খায়, তারা সুখী বেশী। ননভেজ খাওয়া দোষের না-কিন্ত সাথে সাথে যথেষ্ট ভেজিটেবল না খেলে বা ফল না খেলে, খাওয়ার ফলে সুখের থেকে দুঃখ বেশী হবে।
  2. এনগেজমেন্ট মডেল ঃ হাইকিং, দৌড়ানো, খেলাধূলা করা
  3. জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া-যতই ভুঁয়ো,ফলস হৌক, ধর্ম, কমিউনিজম এগুলো মানুষএর জীবনকে একটা বৃহত্তর অর্থ দেয়। ফলে এরা অনেক আপাত দুঃখেও সুখী থাকে।
  4. সাফল্য- সামনে কিছু পেশাদার বা অপেশাদার টার্গেট যাই থাকুক না-কেন-সেগুলো পূরন হলে সাময়িক সুখ আসে। এই জন্য সামনে বড় টার্গেট রাখতে নেই। ছোট ছোট ধাপ। নেক্স ২৪ ঘন্টার মধ্যে আমি এই এই করব। এবং সেই ছোট ছোট কাজগুলো সাফল্যের সাথে হলেই মনে তৃপ্তি আসে।
  5. সম্পর্ক -নিঃসন্দেহে জীবনের সুখের মূল হচ্ছে বাবা মা ছেলে মেয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যের সম্পর্ক। এই সম্পর্কগুলো সুখী না হলে, সুখী জীবন অসম্ভব।

বিভিন্ন স্টাডিতে এটাও স্পষ্ট ধার্মিক লোকেরা নির্ধামিকদের থেকে মনের দিক দিয়ে বেশ কিছুটা বেশী সুখী থাকে। তবে এটাও নানান স্টাডিতে দেখা গেছে, এখানে ধার্মিক মানে যারা নামাজি, পূজারি, মন্দিরে মসজিদের যাচ্ছে-সেই টাইপের লোক না। ধার্মিক তারাই এইসব স্টাডিতে যারা ধর্মে বিশ্বাস করে নানান ধরনের চ্যারিটি করছেন কমিটেড ভাবে, মানুষের উপকারের সাথে জড়িত-তারা সাধারনত নির্ধামিকদের থেকে বেশী সুখী। আবার যেসব নির্ধামিকরা যেমন কমিনিউস্টরা ওউ একই রকম একটা জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিয়েছেন , সাধারন মানুষের জন্য কাজ করেন- তারাও খুশী। সুতরাং জীবনের একটা উদ্দেশ্য সেটা যাইহোক না কেন-সেটা না দাঁড় করতে পারলে, জীবনে সুখ অধরাই থেকে যাবে।

সুখই জীবনের অন্তিম লক্ষ্য এটা নিৎসে মানেন নি। তার মতে বিরাট কিছু প্রাপ্তি ভীষন কষ্ট এবং সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই আসে। এখন মোদি যেমনটা বলছেন-কালো টাকা শুন্য ভারত গড়তে জনগণকে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হবে!

তবে যে যাই বলুক, যে যতই চাক তার ধর্ম, তার রাজনৈতিক আদর্শ পৃথিবী রাজ করবে-সেটি হবে না। কারন আস্তে আস্তে পৃথিবীব্যাপি "হ্যাপিনেস" সাবজেক্টটাকে আর সাবজেক্টিভ রাখা হচ্ছে না। অনেক গবেষনা চলছে। এতে আস্তে আস্তে অর্থনীতি , সমাজনীতি, আইন, খাদ্যভ্যাস এমন করে গড়া যাবে যাতে লোকেদের সুখের সন্ধান সহজ হয়। এই ব্যাপারে বিগ ডেটা আনালাইটিক আস্তে আস্তে স্টেজে অবতীর্ন। ফলে ধর্মের প্রভাব কমতে বাধ্য। কারন আস্তে আস্তে ধর্ম বাদ দিয়ে, সুখের সন্ধানের বিজ্ঞানই সামাজিক ও রাষ্ট্রের আইনের ভিত্তি হবে বা হতে বাধ্য।

আমি উদাহরন দিচ্ছি। যেমন ডিভোর্স আইন। হিন্দু ধর্মে ত ডিভোর্স আইনই নেই-ইসলামে যা আচ্ছে তা পুরুষকে খুশি রাখতে পারে, কিন্ত তা নারী বিদ্বেশী এবং মধ্য যুগীয়। বৃটিশ আইন ও এট ফল্ট ডিভোর্স-যা আদৌ ভাল না। অন্যদিকে কড়া টাইপের মনোগ্যামি আইনে অধিকাংশ নারী পুরুষ বিবাহিত জীবনে প্রায় জেল খানায় কাটায়। এবার পারস্যুট অব হ্যাপিনেস যদি আমাদের সমাজের সুপ্রীম অবজেক্টিভ হয়-তাহলে বিবাহ বা ডিভোর্স কিভাবে হওয়া উচিত?

এটি জটিল প্রশ্ন । কারন এই নিয়ে যথেষ্ট নৃতাত্ত্বিক গবেষনা হয় নি। ফলে এমন সব পারিবারিক আইনের আওতাই আমরা আছি, যাতে সুখের সন্ধান ত দূরের কথা, কোন রকমে ঝগড়া ঝাঁটি ছাড়া দিন গুজরান হলেই সবাই বাঁচে!

আমার ধারনা এই বিগডেটা এনালাইটিক অনেক কিছু নতুন দিশার সন্ধান দেবে স্যোশাল সায়েন্সের গবেষনাতে-যার থেকে আমরা আস্তে আস্তে বুঝতে পারব, বিবাহ ব্যাপারটা আউটডেটেড কি না-এখন যেভাবে ছেলে মেয়ে মানুষ হচ্ছে, সেটা ঠিক কি না। সেদিন এখনো আসে নি।






Thursday, October 27, 2016

বুড়িমার চকলেট বোম -অন্নপূর্ণা দাস ঃ বাঙালীর ব্যবসায়িক মানসিকতার ব্যবচ্ছেদ

বুড়িমার চকলেট বোম ছাড়া কালীপূজো, দূর্গোপূজো ?    আমরা মতন যারা আট বা নয়ের দশকে বেড়ে উঠেছি, পূজোতে বুড়িমার বোম ছিল সব থেকে বড় ব্র্যান্ড।  এই বুড়িমা কে নিয়ে কৌতুহল অনেকদিনের  -কিন্ত কোনদিন উনাকে নিয়ে কোন লেখা চোখে পড়ে নি। আজ প্রথম জানলাম উনার জীবন।  উনার সংগ্রাম। অদ্ভুত, অভূতপূর্ব বললে কম বলা হয়।

   উনার আদি বাড়ি ফরিদপুরে। অন্নপূর্ণা দাস।  ১৯৪৮ সালে উদবাস্তু হয়ে উত্তর দিনাজপুরে যখন ক্যাম্পে উঠলেন সাথে দুই ছেলে মেয়ে। স্বামী নেই। শাক সব্জি, ঘটি বাটি যা পারেন, তাই বেচে কোন রকমে সংসার চালিয়েছেন। অভুক্ত থেকেছেন অধিকাংশ সময়।

     সেই কঠিন পরিশ্রমের মধ্যেই বিড়ি বাঁধা শিখলেন সনাতন মন্ডলের কাছে। অভাবের চাপেই শিখেছিলেন কিভাবে বেচতে হয়। আস্তে আস্তে গড়ে তুললেন বিড়ি বাঁধার কারখানা।

   এরপরে বেলুড়ে মেয়ে জামাই এর কাছে এসে,  হরকুসুম গাঙ্গুলীর কাছ থেকে শিখলেন আলতা সিঁদুর বানানোর কাজ। আস্তে আস্তে অন্নপূর্ণা আলতা সিঁদুর ব্রান্ড ও তৈরী হল।

     অবশ্যই তার রাজ্যজোড়া খ্যাতি বুড়িমার চকলেট ব্রান্ডে।  এখানে তার গুরু বাজি বিশেষজ্ঞ আকবর আলি। পেয়ারীমোহন মুখুজ্যে রোডে তার তৈরী বাজির কারখানা এখন শিবকাশির বাজির সাথে পাল্লা দিচ্ছে। উনি শিবকাশিতেও কাটিয়েছেন বহুদিন বাজি তৈরী শেখার জন্য।

   যে ব্যবসাতে হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন। না তার আই আই টি, আই আই এমের কোন ডিগ্রি ছিল না। ম্যাট্রিক পাশ ও না উনি। ব্যবসায়িক পরিবারে জন্ম-তাও না। নেহাত অন্ন সংস্থানের চাপে ফেরি করা শুরু। তাহলে কোন জাদুবলে সফল বুড়ি মা?

 যে কারন বিল গেটস বা মার্ক জুকারবার্গ সফল-ঠিক সেই কারনেই সফল বুড়ি মা। সোজা কোথায় ১০০% হ্যান্ডস অন। যা কিছু করেছেন-সেই তৈরী করা থেকে বেচা-নিজের হাতে। আজকাল কিছু কিছু আধুনিক ডিগ্রি সজ্জিত বাঙালী আন্তারপ্রেনারের সাথে সাক্ষাত হয়। তাদেরকে যখন তাদের নিজেদের প্রোডাক্ট নিয়েই জিজ্ঞেস করি -প্রযুক্তি থেকে বেচা-সব ব্যাপারেই দেখি, তারা কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল। এরা বেশীদূর এগোবে না বলাই বাহুল্য।

 সাথে সাথে আরো একটা কথা না বললেই না। বাংলাতে "প্রোডিউসার ক্লাস" টির কোন সন্মান নেই। এই বাংলাতেই আইরন ওয়ার্ক্সের জন্য বিখ্যাত ছিল কর্মকাররা। তাঁতি, কুমোর, কর্মকার-একদা এদের দক্ষতায় বাংলার প্রোডাক্ট বিক্রি হত অন্য দেশে, অন্য রাজ্যে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, আধুনিক টেক্সটাইল কল, প্ল্যাস্টিকের উদ্ভব  এবং সাথে সাথে ক্যালকেশিয়ানদের কলোনিয়াল ক্যঙ্গোভারের দৌলতে, বাংলায় প্রডিউসার ক্লাসটিকে ইতিহাস এবং সমাজ নেহাতই অন্ত্যজ শ্রেনী হিসাবে অন্ধকূপে ফেলেছে। ফলে একজন কামার, বা কুমোর সে নিজের পেশাতে খুব সফল হলেও, তার ছেলেমেয়েকে সে নিজের পেশাতে না দিয়ে, চাকুরিজীবি করে তোলে। আমেরিকাতে গ্রামে গ্রামে এইসব প্রোডিউসার ক্লাসের লোকেরা একদা ছোট ছোট ফ্যাক্টরি গড়েছেন। চীনের হাতে মার খাওয়ার আগে, এইসব ছোট ছোট ফ্যাক্টরীগুলোই ছিল, ম্যানুফাকচারিং এর নার্ভ সেন্টার। এই ট্রান্সফর্মেশনটা পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্রেও কিছুটা দেখেছি। কিন্ত জমিদারিপ্রথা, আঁতেলেকচুয়াল এবং বামপন্থী মনোভাবের কুম্ভীপাকে ্বাঙালী প্রোডিউসার ক্লাশ প্রায় অন্তর্জলি যাত্রায়।

 ফলে বিখ্যাত বাঙালীর লিস্টে অন্নপূর্না দাসের স্থান হবে না কোথাও। সেখানে জ্বলজ্বল করবেন কথা ভেজে  খাওয়া, মাথায় আদর্শবাদি টুপি পড়া  শাসক শ্রেনীর হেগোপোঁদ চাটা বাঙালীকুশীলবরা। ঠিক সেই কারনেই বাঙালীর ভিখারিত্ব এবং মারোয়ারি শ্রেনীর দাসত্ব থেকেও মুক্তি নেই।







Saturday, October 22, 2016

বৈবাহিক জীবনের একঘেঁয়েমি-মনোগ্যামিশ সম্পর্ক

                                                                          (১)

ধরুন আপনি জানলেন, প্লেন ক্র্যাশের সম্ভাবনা ৫০%। তাহলে কি আপনি প্লেনে চড়বেন?

      কিন্ত আপনি বিয়ে করবেন-এটা জেনেও বর্তমানে যেকোন বিবাহে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার সম্ভাবনাই বেশী। আর সব ব্যর্থতাই যে ডীভোর্সে  গড়াচ্ছে- তাও না। অধিকাংশ ব্যর্থ বিবাহই রিফিউজি নিচ্ছে সেক্সলেস ম্যারেজ-অথবা ম্যারেজ অব কনভেনিয়েন্সে। শুধু ছেলেমেয়েকে মানুষ করার কারনে স্বামী স্ত্রী হিসাবে অভিনয় করে টিকে আছে অসংখ্য দম্পতি।

       এই অসুখ নতুন না। নেনা ওনিল এবং জর্জ ওনিল ১৯৭২ সালে তাদের বেস্ট সেলার "ওপেন ম্যারেজ" বইতে,  বিবাহ নামক অসুখের ব্যবচ্ছেদ করেন আদ্যপান্ত। তারা সিদ্ধান্তে আসেন-বিয়েটা সমস্যা না। মূল সমস্যা এই মনোগ্যামাস ম্যারেজের মনোটনাস  কমিটমেন্টে। উনাদের উপস্থাপনা ছিল এই যে বিবাহ বহির্ভুত যৌন জীবন মোটেও বৈবাহিক জীবনের অন্তরায় না। বরং স্বামী স্ত্রী উভয়েই যদি সজ্ঞানে তাদের পার্টনারদের নিজস্ব স্পেস দেন-তাহলে বরং অনেক বিয়ে বেঁচে যায়।  এই স্পেস দেওয়া মানে, মেনে নেওয়া  যে বৈবাহিক একঘেঁয়েমি কাটাতে তাদের পার্টনাররা "লিমিটেড" পরকিয়াতে লিপ্ত হবেন-কিন্ত সেটা তারা করবেন সংসারের প্রতি কোন অবহেলা না করেই!

    তবে ওনিল দম্পতির ওপেন ম্যারেজের ধারনা ধোপে টেকে নি-অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল বুঝে ওপেন ম্যারেজ বলতে লোকেরা বুঝতে থাকে, এর মানে স্বামী স্ত্রী একজন থাকবে বটে-কিন্ত সেটা নেহাত সামাজিক কমিটমেন্ট। সেক্সের ক্ষেত্রে সম্পূর্ন নন-কমিটেড লাইফ স্টাইল। খুল্লাম খুল্লা পরকীয়া।

     ওপেন ম্যারেজেরও অনেক শ্রেনীবিভাগ সম্ভব। যেমন সুইঙ্গার লাইফ স্টাইল।  যেক্ষেত্রে স্বামী এবং স্ত্রী দুজনেই সম্মতি ক্রমে পার্টনার পাল্টায় যৌন উত্তেজনার খোঁজে।  আরেক ধরনের ওপেন ম্যারেজে,  স্বামী এবং স্ত্রী দুজনেই জানেন, তাদের পার্টনারের একাধিক যৌন সঙ্গী বা সঙ্গীনী আছেন-কিন্ত তারা সেই নিয়ে মাথা ঘামান না। দুজনেই দুজনকে স্পেস দিতে পছন্দ করেন।

 প্রশ্ন উঠবে যৌন উত্তেজনা বা যৌনতার মাধ্যমেই যখন সুখ খোঁজা হচ্ছে -তাহলে একসাথেই বা থাকা কেন?   এর মূল কারন অবশ্যই সন্তান পালন।  ছেলেমেয়ে মানুষ করার জন্য-কমিটেড পার্টনারশিপ দরকার। কিন্ত তার মানে কি যৌনতার ক্ষেত্রেও কমিটটেড পার্টনার হয়ে থাকতে হবে? ইমোশোনাল কমিটমেন্ট এবং সেক্সুয়াল কমিটমেন্ট কি একই সূত্রে বাঁধা?



                                                                     (২)


ওপেন ম্যারেজের ধারনা আমেরিকাতে গত অর্ধ দশক ধরে চললেও, তা মোটেও ব্যর্থ ক্লান্ত বৈবাহিক জীবনের সমাধান হয়ে উঠতে পারে নি। আমেরিকাতে খুব বেশী হলে ১-৫% নরনারী কোন না কোন সময়ে ওপেন ম্যারেজে ছিলেন। ওপেন ম্যারজে তাদের যৌন জীবন অনেক বেশী সুখী ছিল-তাই নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্ত সমস্যা এই যে -জেলাসি বা ঈর্ষার চক্করে প্রচুর পারিবারিক সমস্যা তৈরী হয়েছে-যার পরিণতি ডিভোর্স।

   এর সমাধানে সেক্সোলজিস্ট ড্যান  স্যাভেজ মনোগ্যামিশ ম্যারেজ বলে একটি নতুন ধারনা দেন ২০১০ সালে। উনি একজন সেক্সোলজিস্ট এবং সেই সূত্রে  দেখেন যে অনেক  ক্ষেত্রেই সাইক্রিয়াটিস্টরা একটু  আধটু  ম্যারিটাল ইনফিডালিটি বা পরকিয়া তার পেশেন্টদের জন্য রেকোমেন্ড করেন । ক্লিনিক্যাল সাইক্রিয়াটিস্ট মহলে, বহুদিন থেকেই কনসেনসাস এই যে  আসল সমস্যাটা মনে। দেহে অতটা না। অর্থাৎ একজন নারীর যে একাধিক যৌনসঙ্গী দরকার-সেই চাহিদাটা নেহাৎ ই মানসিক। অতটা দৈহিক না। সুতরাং বিবাহ বর্হিভুত  একটু আধটু ফ্লার্টিং, প্রেমালাপ-বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্যই দরকার।  কিন্ত দৈহিক সম্পর্কে জড়ালে, তা অবশ্যই সুখী যৌন জীবন দেবে -কিন্ত ডিভোর্সের চান্স ও বাড়বে যা ওপেন ম্যারেজের ক্ষেত্রে প্রমানিত।

 মনোগ্যামিশ ব্যপারটা এখন অনেক ম্যারেজ কাউন্সিলর রেকোমেন্ড করছেন দম্পতিদের। যারা সেক্সলেস  ম্যারেজ  ওই টাইপের ঝুলে থাকা সংসার ধর্মের বলদ হয়ে টিকে আছেন কোন রকমে।

                                                            (৩)

এবার আসল সমস্যাতে আসা যাক। বিয়ে করাটা কি প্রাসঙ্গিক ? রাষ্ট্রের দরকার সন্তান।  তার জন্যে দরকার বিবাহের। সেই কারনেই সন্তান মানুষের জন্য বাবা-মাকে একসাথে থাকতে বাধ্য করে সমাজ। সেটাকে বলে বিবাহ। ফ্রান্স বা আমেরিকাতেও একসাথে থাকা যেকোন দম্পতিকে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ দম্পতির সমান বলেই গণ্য করা হয়।  সন্তান মানুষ করা ছাড়া, দুজন নারী পুরুষের একসাথে থাকার কোন দরকার নেই। সিঙ্গল থাকলেই বরং তাদের যৌন জীবন অনেক বেশী সুখের হবে।

 কিন্ত সন্তান মানুষ করার জন্য-এই বাবা-মায়ের কনসেপ্টটাই বা এলো কোত্থেকে? রাষ্ট্র, বা সমাজ বা পেশাদার সংস্থার মাধ্যমে  কেন সন্তানের পালন পোষন সম্ভব না?

  ইনফ্যাক্ট এই চেষ্টা প্রথম হয় সোভিয়েত ইউনিউয়ানে-যার প্রথম আইডিয়া ছিল লেনিনের। লেনিন মনে করতেন, আইডিয়াল কমিউনিস্ট স্টেট এবং নারীর সমানাধিকারের জন্য "কমিউনিটি পেরেন্টহুড" জরুরী।  ১৯১৭-২২ এর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ানে অনাধ ছেলে মেয়ের সংখ্যা ছিল ৭০ লক্ষ। এর একটা কারন অবশ্যই গৃহযুদ্ধ -অন্যকারন এই যে নভেম্বর বিপ্লবের আগুনে বিবাহ নামক পুরুষতান্ত্রিক প্রথাকেও পোড়ানো হয়।  এখন বিয়েকে উড়িয়ে দেওয়া সহজ-কিন্ত যৌন কামনাকে ত আর ওই ভাবে রিভোলোউশনারী হ্যান্ডল মেরে হস্তমৈথুনে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। ফলে ওই পিরিয়ডে প্রায় কুড়ি লক্ষ  পরিতক্ত্য সন্তানের জন্ম হয়েছে কুমারী মায়ের গর্ভে-কারন নতুন বিপ্লবী রাষ্ট্র বিয়েটাই তুলে দিতে চাইছিল।  এই সকল অনাথ সন্তানদের বলা হত Besprizornye বা বাস্টার্ড শব্দটির রাশিয়ান।

লেনিন এদের দ্বায়িত্ব নিতে চাইলেন-ফলে তৈরী হয় পৃথিবীর প্রথম কমিউনিটি অরফানেজ। কিন্ত প্রতিটা কমিউনিস্ট দেশে যা হয়-এখানেও তাই হল। প্রায় ৫ লাখ শিশু সন্তান এইসব অর্ফানেজে প্রথম দু বছরে মারা যায়। কারন না ছিল রিসোর্স-না ছিল কর্মীদের সদিচ্ছা। এর মধ্যে স্টালিন ক্ষমতায় এসেছেন। উনি লেনিনের মত  তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন না । উনার পা ছিল মাটিতে। ফলে এইসব কমিউনিটি অরফানেজ বাতিল করে এই সব সন্তানদের দত্তক নিতে বাধ্য করেন স্টালিন। শুধু তাই না-১৯৩৭ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ানে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হয়-আবর্শন করতে গেলে স্পেশাল পারমিশন লাগত-এবং ডিভোর্স আইন ও কঠোর করা হয়। মোদ্দা কথা লেনিনের কমিউনিটি ভিত্তিক বিবাহ এবং সন্তান পালনের বৈপ্লবিক কর্মসূচীকে কবরে পাঠান স্টালিন যেহেতু তা অসংখ্য শিশু মৃত্যুর কারনে, রাষ্ট্রের ভিত টলিয়ে দিচ্ছিল। 

এর পরে আর কোন রাষ্ট্র কমিউনিটি পারেন্টিং নিয়ে পরীক্ষা চালায় নি। শুধু চালিয়েছিলেন গুরু রজনীশ-তার ওরেগাঁও আশ্রমে। যেখানে প্রায় ৭০০ শিশু, ওশো কমিউনিটিতে মানুষ হত। যাতে তাদের বাবা-মারা মুক্ত যৌন জীবন জাপন করতে পারে। কিন্ত সেখানেও ঈর্ষার কারনে, না তাদের ওপেন ম্যারেজ সিস্টেম সফল, না সফল হয়েছে কমিউনিটি পারেন্টিং। 

 ফলে আমরা যে তিমিরে -সেখানেই। মনোগ্যামিশ ম্যারেজই একমাত্র ভরসা!