Sunday, January 21, 2018

হিন্দুত্ববাদিদের নতুন জোকার নায়েক-সত্যপাল সিং

সত্যপাল সিং ভারতের মানবসম্পদ রাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবী ডারউইনের বিবর্তন তত্ব ভুল, গোঁজামিল। স্কুল সিলেবাস থেকে তুলে দেওয়া উচিত। মানবসম্পদকে মানবআপদ বানানোর এমন ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রকাশ করে মন্ত্রীমশাই এখন সংবাদ শিরোনামে।

অন্যকোন গোনন্দন বাহন এমন উক্তি করলে, পাত্তা না দিলেও চলত। কিন্ত উনি হচ্ছেন মানবসম্পদ মন্ত্রী-স্কুল সিলেবাস থেকে ডারুইনকে তোলার চেষ্টা করতেই পারেন। এবং করবেনই না বা কেন। আমেরিকাতে গত দশকে রিপাবলিকান অনেক রাজনীতিবিদ, যাদের ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রীষ্ঠানদের ভোটে জিতে আসতে হয়- তারা অসংখ্যবার চেষ্টা করেছেন আমেরিকার স্কুল সিলেবাস থেকে ডারুইনকে মুছে দিতে। তবে তারা প্রতিবার অসফল-কারন আমেরিকার ধর্মনিরেপেক্ষ সংবিধান তাদের বিরুদ্ধে ঢাল হিসাবে দাঁডিয়ে গেছে। অসংখ্য মামলা মকদ্দমার পরে, অসংখ্য বিজ্ঞানীরা আদালাতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য প্রমান দেবার ফলে আমেরিকাতে ধর্ম উন্মাদরা আপাতত আর ডারুইনকে নিয়ে ঘাঁটায় না।

পাকিস্থান এবং বাংলাদেশের সেই সৌভাগ্য হয় নি। অধিকাংশ মুসলিম দেশের ছাত্রছাত্রীদেরই সেই সোভাগ্য নেই-কারন মুসলমান দেশগুলির অধিকাংশই ইসলামিক রাষ্ট্র। ফলে "কোরানের সাথে সাংঘার্ষিক" এই অজুহাতে মুসলিম দেশগুলিতে স্কুল সিলেবাসে ডারুইন বাতিল । মনে রাখা উচিত, বায়োলজির সব থেকে গুরুত্বপূর্ন সাবজেক্ট হচ্ছে বিবর্তনবাদ। সেটা না শিখেই মুসলিম দেশগুলি থেকে ছেলেমেয়েরা বায়োলজির ডিগ্রি পায়-তারা যে কি শেখে আল্লা মালুম! এবং সুশিক্ষিত মুসলমানরাও এই ব্যপারে নীরব-কারন বাকী সবার মতন তারাও ইষ্ট হ্যাপী জনগণ-নিজের পেট, সংসার নিয়েই বেশী ব্যস্ত- সন্তান ধর্মীর শিক্ষার কারনে ব্রেইন ওয়াশড হচ্ছে-ফলে ভবিষ্যতে আই সিস প্রচারকের খপ্পরে এসে সন্ত্রাসবাদি হয়ে উঠতে পারে-সেই টুকু বুদ্ধিও তাদের নেই। কারন এই ধরনের সন্ত্রাসবাদিদের বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তিবাদি মনই বিরোধিতা করতে পারে। আর বিবর্তন স্কুল থেকে তুলে দেওয়া মানে ছাত্রছাত্রীদের যুক্তির মাজাটাই ভেঙে দেওয়া।

ডারুইনের ওপরে কোরান, বাইবেল সবার রাগ। কারন বিবর্তন বিজ্ঞান একবার কেউ জানলে, আব্রাহামিক ধর্মগুলো তার কাছে রূপকথার গল্প বলে মনে হবে। ধর্মান্ধ খ্রীষ্ঠান এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভ্রান্ত যুবকেরা ইন্টারনেট ভর্তি করে দিয়েছে বিবর্তনের বিরুদ্ধে অজস্ত্র অভিনব "গবেষনা পত্রে" । যদিও বাস্তব সত্য হল এই সব শিক্ষিত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আমেরিকার বিজ্ঞান সমাজ একসময় রুখে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যদি বিবর্তনের বিরুদ্ধে কারুর কিছু প্রমান থাকে তাহলে তারা সেটা বিজ্ঞানের জার্নালে পাঠাক। সেটা হবার না। কারন বিবর্তন এতটাই সুপ্রতিষ্ঠীত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব-যে তার বিরুদ্ধে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষনা পত্র কেওই দিতে পারবে না। কেউ পারেও নি। এদের সব "ডারউইন বিরোধি গবেষনা ইন্টারনেটেই পাওয়া যায়"-কোন বিজ্ঞানের জার্নালে পাবেন না।

মনে রাখতে হবে বৈজ্ঞানিক সত্য কখনোই পরম সত্য না । বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেই সত্যে ভেজাল থাকবেই-কিন্ত সেই ভেজালকে আস্তে আস্তে কমানোই বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক কাজ। ডারউইনের তত্ত্ব ব্যতিক্রম না। বিবর্তনের ওপরে এখনো অনেক কাজ চলছে-ডারুইন যে বৃক্ষশাখায় বিবর্তনের ধাপ গুলো দেখেছিলেন-নব্য গবেষনাতে নতুন বৃক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। কিন্ত তার মানে বিবর্তন বিজ্ঞান ভুল না-তার মানে এই যে প্রতিদিনই এই শাখাটি আরো উন্নত এবং সঠীক জ্ঞানের সন্ধানে রত। আরেকটা আবদার অনেক মিসিং লিংক নেই। খুবই অশিক্ষিত ধরনের যুক্তি। কারন বর্তমানের বিবর্তন চর্চা -ডি এন এ নির্ভর। যেহেতু ডি এন এ সিকোয়েন্সিং থেকেই যেকোন প্রানীর বিবর্তন বৃক্ষটী খুব ভাল করে বোঝা যায়।

আমি বহুদিন থেকেই লিখছি, হিন্দুত্ববাদ মানে হচ্ছে হিন্দু ধর্মকে ইসলাম-২ ভার্সনে রুপান্তরিত করা। এদ্দিন পর্যন্ত হিন্দুত্ববাদিরা অন্তত ডারুইনের বানরের লেজ টানেন নি। ওদের মধ্যে একটা জাকির নায়েকের কমতি ছিল যে মানুষের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে , তার নিজের ধর্মের লোকেদের অন্ধকূপে ফেলবে। জাকির নায়েকের একটা হিন্দু ভার্সন না পাওয়া গেলে, হিন্দুত্ববাদিদের ইসলাম-২ তে রূপান্তর সম্পূর্ন হচ্ছিল না- সত্যপাল হতে পারেন হিন্দু ধর্মের সেই জোকার ফিগার।

তবে আশার কথা, ফেসবুকে দেখলাম, আমার পরিচিত অনেক শিক্ষিত বিজেপিই সত্যপালকে গাল দিচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে ভাল দিক। তবে গুজরাতের স্কুল সিলেবাসে হিটলার এবং নাজিদের প্রশংসা করে যেসব চ্যাপ্টার আছে-তার বিরুদ্ধে ইনারা নীরব। অবশ্য এব্যাপারে শুধু হিন্দুত্ববাদিদের দোষ দিই না। পশ্চিম বঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই লেনিন-স্টালিন নামে শতাব্দির দুই কুখ্যাত খুনীর ভজনা, তাদের নামে রাস্তা ধূপজপ সবই চালু আছে।

আমি এই প্রসঙ্গ এই জন্যেই তুললাম যে স্কুলে ছাত্র অবস্থা থেকে বাচ্চাদের মাথার দখল নিতে উদ্যত অসংখ্য রাজনীতি-ধর্ম ব্যবসায়ী। এর বিরুদ্ধ সংহত প্রতিবাদে সাধারন মানুষকেই অংশ নিতে হবে। সতপাল সিং এর বিরুদ্ধে সাধারন বুদ্ধিমান মানুষ প্রতিবাদে ফাটছে-অথচ কংগ্রেস নীরব-ধর্মীয় ভোট হারানোর ভয়! গুজরাতের সিলেবাসে হিটলারের প্রশংসার বিরুদ্ধেও নীরব কংগ্রেস! সুতরাং সাধারন মানুষের প্রতিবাদই একমাত্র ভরসা।

Sunday, December 31, 2017

অস্তিত্ববাদের দৃষ্টিতে আরেকটি বছর

এই মহাবিশ্বের বয়স ১৩৭৭ কোটি বছর। পৃথিবীর জন্ম ৪৫৪ কোটি বছর আগে। মানুষ এল সেইদিন - খুব বেশী হলে দুই লাখ বছর আগে।

এই অনন্ত চক্রে ২০১৮ আরো একটি এডিশন- কি যায় আসে! কিন্ত আমাদের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়ার কুয়োর মহাবিশ্বে, একটা বছর অনেকটাই। সেই অনুন্নত প্রযুক্তির যুগে মাত্র এক বছরেই গোটা গ্রীসকে একত্রিত করেছেন আলেক্সজান্ডার। পরের বছর জয় করেছেন মিশর, পারস্য। সেই কালেও এক বছর ছিল অনেক। মুশকিল হচ্ছে আমরা আলেক্সান্ডার নই- ভাঙা গড়ার সুতীব্র ইচ্ছা আমাদের নেই- আছে শুধু গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে পিঁপড়ের জীবন মৃত্যুচক্রে একটা ফুঁটকি হয়ে বেঁচে থাকা।

এক্সিস্টেন্সিয়ালিজম বা অস্তিত্ববাদের সমস্যা সবাইকেই নাড়া দেয়। কখনো জ্ঞাতে অজ্ঞাতে। জীবনের আসলেই ত কোন পরম উদ্দেশ্য নেই। তাহলে কিসের জন্য বেঁচে থাকা? মৃত্যু আসবেই, এই ভেবেত আর বেঁচে থাকা যায় না। পরম বিশ্বাসীদের এই সমস্যা নেই-তাদের জন্য আছে জন্নত, স্বর্গ, পরজন্মের হাতছানি। আমাদের মতন নিধার্মিকদের সেই আশা ভরসার জায়গাটাও নেই-এটাই জীবন - এই জীবনেই যতটুকু পাওয়া তার চেষ্টা করে যেতে হবে।

আলটিমেটলি জীবনটাই হচ্ছে সেই তালা খোলার চেষ্টা করা যার চাবি আমার কাছে নেই। কিন্ত চেষ্টাটা করে যেতে হবে, কারন নইলে সময় কাটবে না। শুধু আশাটা রেখে যেতে হবে- তালাটা খুললেও খুলতে পারে কোনদিন। ঠিক এই কারনেই কমিনিউস্ট, হিন্দুত্ববাদি বা ইসলামিস্টরা ক্রমশ র‍্যাডিক্যাল হয়ে ওঠেন- কারন তাদের দৃঢ় ধারনা- তাদের দর্শনে ওই চাবিটা আছে-বাকী কারোর দর্শনে নেই! আর যতই তারা হতাশাই ভুগতে থাকেন যে চাবিটা কিন্ত পাওয়া যাচ্ছে না- তারা বুঝতে চান না, চাবিটাই নেই-তারা আরো র‍্যাডিকাল বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যে বিশ্বাসের গভীরতাই সেই চাবি আসিবে। কিন্ত না, আসে না। আসে মৃত্যু। আসে ধ্বংশ। আসে হতাশা।

সবটাই ছলনা। শ্রী রামকৃষ্ণের যত মত তত পথের আসল মানে হল- যত মত তত পথে ভুলিয়া থাক-চাবি আসিবেই। যত মত তত আলেয়ার আশা- চাবি মিলিবেই।

Saturday, December 16, 2017

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি

বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যারা স্বাধীনতার পরে, মুক্তিযুদ্ধের প্রামান্য ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করে নি বহুদিন। আমরা ভারতীয়রা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানি না-এটা যদি লজ্জার হয়-তাহলে ভাবুন ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত, সরকারি ভাবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা প্রায় বন্ধ ছিল-যা চলত তাও সরকারি ভাবে বিকৃত। বাংলাদেশে যারা বড় হয়েছে ঐ সময়টাতে, তারাও জানেনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। কারন সরকারি বইগুলো এমন ভাবে লেখা হত, যাতে শেখ মুজিবর রহমান, আওয়ামী লীগের ভূমিকা এবং ভারতের মিলিটারি ও ইন্দিরা ভূমিকা সম্পূর্ন অজ্ঞাত থাকে।

আমি মাস খানেক আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অবদান নিয়ে একটা পোষ্ট দিই। বিষয়টা এই, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অতি সক্রিয় ছিলেন। এতটাই যে আমেরিকার নির্দেশে সৌদি আরব, জর্ডন এবং ইরান পাকিস্তানকে ফাইটার প্লেন দিয়ে সাহায্য করছিল- ইরান ত তার বিমান ঘাঁটিও ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। শুধু তাই না নিক্সন চিনকে সঙ্গে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ানের ওপরে চাপ সৃষ্টি করেন জাতি সঙ্ঘে-তাতে কাজ না হলে ইন্দিরাকে ফোন, ফ্যাক্স হুমকি কিছুই বাকী রাখেন নি। একসময় সোভিয়েত ও ভারতে জানিয়ে দেয়, আমেরিকা ভারত আক্রমন করবে বাংলাদেশ ইস্যুতে । তবে তারাও নৌবহর পাঠাচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধী জেনারেল ম্যকেনশকে প্রশ্ন পর্যন্ত করেছিলেন আমেরিকা আক্রমন করলে কি হবে? ম্যাকেনশর উত্তর ছিল, তার আগেই বাংলাদেশ মুক্ত হবে। চীন এবং আমেরিকার সাঁড়াশি আক্রমনের মুখে নার্ভ ঠিক রেখে ইন্দিরা গান্ধী গোটা পৃথিবী চষে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের সমর্থনে। জানাচ্ছিলেন কিভাবে খুন ধর্ষন এবং জেনোসাইড চালাচ্ছে খান সেনারা। ইউ টিউবে তার অসংখ্য ইন্টারভিঊ পাওয়া যাবে কখনো বিবিসি, কখনো ফরাসী টেলিভিশনকে দেওয়া ( যা ফ্রেঞ্চেই দিয়েছিলেন ইন্দিরা) । পুরো ব্যপারটা পড়ার পরে আমার মনে হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধী না থাকলে বাংলাদেশের রক্তক্ষয় হত আরো বেশী- হয়ত বাংলাদেশ স্বাধীন হত-কিন্ত রক্ত ঝড়ত আরো আরো অনেক। শেখ মুজিব যদি জাতির পিতা, ইন্দিরাকে বাংলাদেশ নামক জাতির মাতা বললে ভুল হবে না। এটা শুনে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী আমাকে জানালেন, আমি নাকি ইতিহাস ফ্যাব্রিকেট করছি বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধকে ছোট করার জন্য! আসল সত্যটা হচ্ছে এই-এরা সেই ১৯৭৫-৯৬ এর বাংলাদেশের প্রোডাক্ট। যেখানে আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, ইন্দিরা, ইন্ডিয়া সব কিছুই অস্বিকার করা হত।

১৯৮৫ সালের একটা ঘটনা বলি। তখন রাজশাহী রিলে স্টেশনের দৌলতে মুর্শিদাবাদ নদীয়াতে বাংলাদেশের সরকারি টিভি চ্যানেলের সব অনুষ্ঠান আমরা দেখতে পেতাম। ১৬ ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে ভারতের দূরদর্শনে এমনিতেই অনেক কিছু হয়। আমাদের আশা ছিল বাংলাদেশে দূরদর্শনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ডকুমেন্টারী দেখাবে। করিমপুরের মতন ভারতের এক প্রান্তিক মফঃশহরে টিভি তখন সবে এসেছে। পাড়ার বয়স্ক লোকেরা একাত্তর নিয়ে অনেক কিছু জানতেন। কারন একাত্তরের যুদ্ধে গোটা করিমপুরেই আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় চার লাখের বেশী শরনার্থী। অনেক আশা নিয়ে ১৬ ই ডিসেম্বর তারা বাংলাদেশ টিভির সামনে বসেছিলেন।

অহ-কোথায় কি। টিভিতে দেখায় শুধু জেনারেল এরশাদের কবিতা। বাংলাদেশে তখন এরশাদের ডিক্টেটরশিপ। এই এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাও নন। একাত্তরের যুদ্ধে তার পোস্টিং ছিল পাকিস্তানে। ফলে পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৭৩ সালে সিমলা যুক্তির জন্য মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে আসেন। তাকে মিলিটারীতে উচ্চ পজিশনে পুনঃবাসন দেন শেখ মুজিব নিজে।

অথচ এই এরশাদ মালটা নিজের ডিক্টেটরশিপের সময়,এই ১৬ ই আগস্ট বিজয় দিবসে টিভিতে শুধু কবিতা চালাত-সাথে যুদ্ধের ফটো ভিডিও। দেখে মনে হতে পারে জাস্ট এরশাদের শব্দের জোরে স্বাধীনতা এসেছে। ব্যাচারা কিই বা আর করবে! কারন ওই দিন ইতিহাস ঘাঁটলে গেলে দেখা যেত, এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাই না! কে আর টিভিতে নিজের প্যান্ট খোলে! না ওই সময় বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধের চর্চা প্রায় নিশিদ্ধই ছিল। শুধু তাই না। যদিও বা কখনো সখনো মুক্তযুদ্ধের সিনেমা আসত বাংলাদেশ টিভিতে- সেখানে সিনেমার চরিত্ররা যদি কখনো সখনো মুজিবের নাম মুখে আনতেন, সেখানে অডিও সাইলেন্স করা হত। এই সময়টাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস মোছার সব চেষ্টা হয়েছে যঘন্য ভাবে।

এটা এখন কিছুটা বদলেছে। শেখা হাসিনার শাসনকালে স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আবার ফেরানো হয়। অনেক ব্লগার ইতিহাস রক্ষায় সচেতন হয়ে অনেক নতুন দলিল তৈরী করেছেন। ফলে এখন গুগল করলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কিছুই আমরা জানছি।

আমি অবশ্য বই এর অভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে জেনেছি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেই। আমেরিকাতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা অভিবাসন নিয়েছেন। তাদের সাথেই নানান পার্টিতে গল্প করে জেনেছি কিভাবে তারা জেলে সেজে নৌকা নিয়ে রেইড করতেন -কিভাবে থানা রেইড হত। খান সেনারা ভয়ে সেনা ছাউনির বাইরে ট্যাঙ্ক ছাড়া বেড়ত না। এত বীরত্ব এবং আত্মহুতির গল্প আমি নিজেই জানি সেগুলো লিখলে ডজন খানেক সিনেমার স্ক্রিপ্ট তৈরী। আমার ধারনা, মুক্তিযুদ্ধের নানান ঘটনাগুলো যদি সেলুলয়েডে বন্দি করার চেষ্টা হয়- অন্তত দুশো সিনেমা নেমে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে এখনো হলিউড ফি বছর তিনটে চারটে সিনেমা নামাচ্ছে। কিন্ত বাংলাদেশে কালে ভদ্রে একটা আধটা সিনেমা নামে মুক্তি যুদ্ধের ওপরে। আমার কোন সন্দেহই নেই মুক্তিযুদ্ধই বাঙালীর ইতিহাসের সব থেকে গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়। মুক্তযুদ্ধে ঘটনা সিনেমা বন্দী না করলে, আবার এরেকটা এরশাদ আসবে না কে বলতে পারে?

Friday, December 8, 2017

হ্যাজব্যান্ড নামক হ্যাজটার ল্যাজ রেখে হবেটা কি?

ডিসেম্বর বিয়ের মাস-ফেসবুক ফিড খুলতেই বিয়েবাড়ির ফ্যাশনে হাসিখুসি মুখের রোশনাই। এর মধ্যে কটা বিয়ে পাঁচ বছর অব্দি টিকবে জানি না-তবে ডিভোর্স রেট সর্বত্রই এত বেশী, এই প্রশ্নটা সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভাবে তোলাই উচিত- একবিংশ শতাব্দিতে "বিয়ে" নামক ইন্সটিটুশনটা আর কদ্দিন ?

যেহেতু কৃত্রিম গর্ভে সন্তানের জন্ম হতে এখনো ত্রিশ চল্লিশ বছর বাকী- সেহেতু প্রশ্ন উঠতেই পারে, সন্তান মানুষ করতে বিবাহ নামক সেই বাতিল প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় কি? ফ্রান্স সহ ইউরোপে পোষাকি বিয়ে প্রায় উঠে গেলেও -সেখানে লিভ টুগেদার করাকে বিয়ের লিগ্যাল স্টাটাস দেয় রাষ্ট্র। নাগরিকের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্রই কোলাপ্স করবে- বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের চিকিৎসার খরচ চালাতে তরুন সমাজকেই ট্যাক্স দিতে হয়। সুতরাং ভারত চীনের মতন জন সংখ্যায় জর্জরিত হাতে গোনা কিছু দেশ বাদ দিলে, উন্নত বিশ্বে যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসারের সাথে সাথে "মা" হওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে- সেখানে রাষ্ট্রকে প্রচুর খরচ করতে হয় মা হওয়ার জন্য ঘুঁশ দিতে। ইউরোপের কমবেশী সবদেশেই এটা সমস্যা -এর মধ্যে রাশিয়ার জন সংখ্যা কমছে এত দ্রুত হারে ২০০৬ সালে পুতিন পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য তারা "মায়েদের" প্রচুর ইন্টেন্সিভ দেবেন। রাশিয়াতে যেসব মেয়েরা তিনটি সন্তান নেয়, রাষ্ট্র তাদের বিনা পয়সায় ফ্ল্যাট এবং গাড়ি দেয়। এতে অবশ্য লাভ হয়েছে সামান্যই। রাশিয়ার ফার্টালিটি রেট 1.34 থেকে বেড়ে এখন 1.46. অর্থাৎ অধিকাংশ মেয়েরাই ফ্ল্যাট গাড়ির লোভের থেকে চাইল্ডলেস থাকাই পছন্দ করছেন বেশী।

অধিকাংশ ডিভোর্সের ক্ষেত্রে, মেয়েদের নিজস্ব কেরিয়ার সংক্রান্ত চাহিদাটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেহেতু শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী আমরা সংসার কেন্দ্রিক থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কেরিয়ার কেন্দ্রিক অবজেক্টিভ গুলিকেই রাজনৈতিক এবং সামাজিক ভাবে মেনে নিচ্ছি- সেহেতু অধিকাংশ চাকুরীজীবি বিবাহিত মহিলারাই প্রশ্ন তুলছেন একটা হ্যাজবান্ড রেখে হ্যাজ ছাড়া জীবনে পাচ্ছি টা কি? সন্তান নেওয়া এর অনেক পরের ব্যপার। আসলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা, তার সাথে বলিউডের আফিঙে বড় হওয়া এই নতুন প্রজন্মের মেয়েরা প্রায় সবাই বিবাহিত জীবনে অখুশী। যেহেতু স্বামীর রোজগারের দরকার এদের নেই, অধিকাংশই একটা "কারন" থেকেই ডিভোর্স করছে। একটা অচেনা ছেলে, যার ওপর ডিপেনডেন্ট ও নই, তার জন্য আমরা কেরিয়ার বিসর্জন দেব কেন?

মুশকিল হচ্ছে বিবাহিত জীবনে রোম্যান্স কোন কালেই ছিল না-সাধে কি বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেম মানেই পরস্ত্রীর সাথে পরকিয়া! কিন্ত এই শারুখ খান, আমির খান, ঋত্বিক রোশনের মতন রোম্যান্টিক নায়কদের যুগে কোন মেয়ে বিশ্বাস করতে রাজী না- বিয়ে সংসারের অধিকাংশটাই কর্তব্য-বাকীটা মায়াময়।

এই বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির সংজ্ঞা নিয়েও নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে একাধিক মতানৈতক্য। বিবাহে স্বামী এবং স্ত্রীর অধিকার ঠিক কি কি হবে, কি কি হওয়া উচিত-সেই নিয়ে কোন কোনসেন্সাস নেই কোন দেশে, কোন সংস্কৃতিতে। শুধু ডিভোর্স আইনের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও অধিকাংশ রাষ্ট্রের ঐক্যমত -ইহা মৌলিক অধিকার হতে পারে না। পৃথিবীর সব থেকে লিব্যারাল কোর্ট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের সুপ্রীম কোর্ট ও মেনে নিয়েছে, ডিভোর্স মৌলিক অধিকার হতে পারে না।

তবে আসল সমস্যার দিকে ফিরি। মূল সমস্যা এটাই আজকে মেয়েরা যেখানে কেরিয়ারে এগোতে চাইছে-খুব স্বাভাবিক ভাবেই মা হতে গেলে তাদের কেরিয়ারে স্যাক্রিফাইস করতে হচ্ছে। খাস ভারতেই ২৭% মহিলা আই টি ইঞ্জিনিয়ার শুধু মা হওয়ার জন্য কেরিয়ার বিসর্জন দেন। যারা টিকে যান, তারাও কেরিয়ার কম্প্রোমাইজ করেই টেকেন। যারা কম্প্রোমাইজ করতে চান না-তারা ডিভোর্স করে বেড়িয়ে আসেন। কিন্ত এর কোনটাই কি সমাধান?

খুব অদ্ভুত হলেও সত্যি- মেয়েদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রকে যে সন্তান পালনের দ্বায়িত্ব নিতে হবে, এটা প্রথম কার্যকর করেন লেনিন- অক্টবর বিপ্লবের সাথে সাথেই। রাশিয়াতে বিয়ে প্রায় তুলে দেওয়া হয়, আবর্শণ আইন শিথিল হয়-এবং সাথে সাথে সরকারি ক্রেশ বা সন্তানালয় গড়া হয়। কিন্ত কমিনিউস্ট রাষ্ট্র ত- এরা যত পরিকল্পনা করে-বাস্তবে হয় তার উলটো। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। সরকারি কেয়ারটেকার সংস্থা গুলোতে দেখভালের অভাবে শুধু ১৯১৯-২৩ সালের মধ্যেই ৫ লাখ শিশুর মৃত্যু হয়। ফলে স্টালিন ক্ষমতা হাতে পেয়েই দেখলেন, লেনিনের আদর্শবাদি কার্যকলাপে রাশিয়ার জনসংখ্যা কমছে। মিলিটারিতে লোক পাওয়া সমস্যা হতে পারে। ১৯২৫-২৯ একাধিক ডিক্রি জারী করে স্টালিন আবার লোকজনকে বিয়ে করতে বাধ্য করলেন। আবর্শন প্রায় বন্ধ হল। রাষ্ট্রীয় শিশুপালন সংস্থা বন্ধ করে, মেয়েদের মায়ের দ্বায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করলেন স্টালিন। ইনফ্যাক্ট ১৯৩৪ সালের মধ্যেই রাশিয়াতে বিভিন্ন উচ্চ পজিশনে মেয়েদের সংখ্যা কমে আসে-সেন্ট্রাল কমিটিতে বোধ হয় মোটে দুজন ভদ্রমহিলা ছিলেন-কারন তখন লেনিনের "নারীবাদ" বাতিল করে সর্বত্র স্টালিনের "মাতৃবাদের" ভজনা চলছে। সোভিয়েত ইউনিয়ানের ইতিহাসের এই দিকটা অনেকেই জানে না-- যে নারীর সমানিধিকার সংক্রান্ত সব থেকে বড় পরীক্ষাটি এক শতাব্দি আগেই ব্যর্থ হয়েছে।

অর্থাৎ এই মৌলিক সমস্যা-যে ছেলে মেয়ে মানুষ করার ক্ষেত্রে মেয়েদের অনেক বেশি দ্বায়িত্ব নিতে হয়-এটার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত- ডিভোর্স কিন্ত বাড়তেই থাকবে।

তবে সবটাই দিশাহীন না। আমেরিকাতে ১৯৮০ সালে ডিভোর্স রেট ছিল হায়েস্ট। আস্তে আস্তে সেটা কমেছে। এখন প্রায় ৭০% সম্ভাবনা যে একটা বিয়ে ১০ বছর টিকবে। যেটা ১৯৮০ সালে ছিল ৪৮%। এটা কি করে হল?

আসলে ভুল থেকেই সবাই শিক্ষা নেয়। এখন আমেরিকাতে বিয়ের আগে ছেলে মেয়েরা "আবেগ" এবং "প্রেম" বাদ দিয়ে, প্রাক্টিক্যাল কন্সিডারেশন গুলোকে সামনে রেখেই বিয়ে করে। ইহার্মোনির মতন ডেটিং সাইট, এখন ডেটাসায়েন্স ম্যাচিং করাচ্ছে-অর্থাৎ একজনের কাছ থেকে প্রায় সাতশো আটশো রকমের প্রেফারেন্স জেনে, জানিয়ে দিচ্ছে কোন পার্টনার তার জন্য স্টেবল। প্রেমের থেকে প্যার্টান ভিত্তিক বিয়ের দিকেই এগোচ্ছে আমেরিকান সমাজ, যার সুফলও মিলছে কম ডিভোর্স রেটে। ভারতে এখনো এটা আসে নি। হয় এরেঞ্জড মেরেজ না হলে লাভ মেরেজ। দুটোই আসলে ডিজাস্টার। হওয়া উচিত ডেটা সায়েন্স ভিত্তিক মেরেজ-যেখানে আগে থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব-এই পার্টনারশিপ চলবে কি না।

অর্থাৎ সমাধান সেই বিজ্ঞানের পথেই। আবেগ, আইন, প্রেম -কোন কিছুই বিবাহ নামক এই অচলায়তনকে বাঁচাতে পারবে না।

Wednesday, October 4, 2017

বাংলা সংস্কৃতির ওপর ত্রিফলা আক্রমণ

পূজোর কটাদিন ভাবসাব দেখে মনে হয় বাংলা সংস্কৃতি শত পুস্পে বিকশিত। কিন্ত বাস্তব এটাই পশ্চিম বাংলার বাংলা সংস্কৃতি এখন বিপন্ন। ইসলামিক, উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসন এবং কমিনিউস্টদের দৌড়াত্মে, আমাদের শত শত বছরের পুরাতন বাংলা সংস্কৃতি- যা বৌদ্ধ, চৈতন্য, লালন , রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের উদার আবহে বটবৃক্ষের মতন ছড়াচ্ছিল, তার বিপন্ন জরাজীর্ন হাল।

আসল সমস্যা বাঙালী জাতির অলস্যে। যে জাতি কঠিন এবং সৎ পরিশ্রমে বিশ্বাস রাখে না। এই জাতি আস্থা রাখে চিট ফান্ডে, বিট কয়েনে। একবার ও বোঝে না, অর্থনীতির নিয়মেই সস্তায় না খেটে বড় লোক হওয়া যায় না, ভাল থাক যায় না। ঠিক এই ধরনের অলস চিন্তা ধরেই বাংলার এক বিশাল অংশের তরুন বিপথে- তাদের ধারনা কমিনিউজম, হিন্দুত্ববাদ বা ইসলাম তাদের সমাজ এবং দেশকে উদ্ধার করবে। বিভিন্ন রকমের হতাশা থেকেই তাদের এই বিপথযাত্রা। কিন্ত বটম লাইন সেই এক- সৎ ভাবে খেটে , সৎ ব্যবসা, আন্তারপ্রেনারশিপের মাধ্যমে বাংলার পরিবর্তন হবে-এই বিশ্বাস বা দৃঢ়তা আমি বাংলার নতুন প্রজন্মে দেখছি না। শুধু দেখা যাবে বিজাতীয় আদর্শবাদের প্রতি ঝোঁক।

পেট্রো ডলার ঢুকিয়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে মাদ্রাসার চাষ করে, বাঙালী মুসলিমদের বাংলার মূল শ্রোত থেকে সরানোর কাজ ভাল ভাবেই সম্পন্ন। তাদেরকে ভাবানো হচ্ছে তারা বাঙালী না মুসলমান। ফল হাতে হাতে টের পাচ্ছেন মীর বা নূরের মতন বাঙালী মুসলিম অভিনেতা অভিনেত্রীরা। ফেসবুকে দূর্গাপূজোর শুভেচ্ছা যদি কোন মুসলিম অভিনেতা অভিনেত্রী জানাচ্ছেন মৌমাছির ছাঁকের মতন দাঁড়িয়ালা মুসলিমরা ভন ভন করছে। অথচ, দূর্গাপূজো, ঈদে পারস্পারিক শুভেচ্ছা জানানো বাঙালীর শত শত বছরের ঐতিহ্য। এই সব বাঙালী মোল্লারা হঠাৎ করে আবিস্কার করেছে, বাঙালী না তাদের পিউর এবং আন ডাইল্যুটেড মুসলমান হতে হবে। তারা তাদেরকে আর বাঙালী মনে করে না-তাদের অস্তিত্বে এখন আন্তর্জাতিক ইসলামিক ব্রাদারহুড! এবং এর পেছনে প্যাট্রোনাইজেশন আছে ভারতের সব রাজনৈতিক দলের।

ইসলামিক মৌলবাদের উত্থান ঠেকাতে বাঙালী বুদ্ধিজীবি সমাজ কিস্যু করে নি। ফলে ভীত একদল বাঙালী হিন্দু যুবক- উত্তর ভারতের হিন্দুত্বের আশ্রয় চাইছে। পশ্চিম বাংলায় রাম নবমী, ধণতরেশ, হনুমান চল্লিশা-এসব ছিল না। কিন্ত দ্রুত ঢুকছে। নীরব প্রশয় এক বিশাল অংশের বাঙালী হিন্দুদের। এসবই ইসলামিক মৌলবাদের উত্থানের রিয়াকশন -কিন্ত ফল এই যে বাংলার উদার সংস্কৃতি এখন বিপন্ন উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে। ফলে এই যে বাংলাকে আরো দাঙ্গা দেখতে হবে আগামী সময়ে।

এবার আসি বাংলার বাম বুদ্ধিজীবি এবংহরেক রকমের কমিনিউস্টদের নিয়ে। এদের কাছে বিদ্যাসাগর কলোনিস্ট এবং বু্জোয়া। রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি। স্টালিন, লেনিন, মাওএর মতন কুখ্যাত খুনীরা এদের আরাধ্য দেবতা আজো। এদের ৩৪ বছরের শাসনের তান্ডবে বাংলা ছাড়া হয়েছে বাংলার সব কৃতী সন্তান। যাদের কেউ আজকেও ঘরে ফিরতে চাইছে না। ফলে বাংলায় একটা বিরাট ক্রাইসিস ইন্টেলেকচুয়াল লিডারশিপের। বাংলায় যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবি বলে দাবী করে তাদের কারুর কোন আইডিয়াই নেই কিভাবে প্রযুক্তি পালটে দিচ্ছে বা দিচ্ছে গোটা পৃথিবী। তারা স্বপ্নের রাজনীতি ফেরি করে ( সেটা সোভিয়েত কমিনিউস্ট সমাজই হোক বা শরিয়াই হোক ), বাঙালী যুবকদের বোকা বানায়। কারন বাঙালী যুবকরা একে অলস-তারপরে হতাশ। ফলে সস্তায় রাজনৈতিক বাজিমাতের ভাল ভাল কথা শুনে এরা আকৃষ্ট।

বাংলার বুদ্ধিজীবীদের কাউকে বলতে শুনিনি যে একটা জাতির উন্নতির একটাই উপায়। পরিশ্রম এবং সৎ ব্যবসা । প্রকৃত কারিগড়ি শিক্ষা। তারা নিজেরা গর্দ্ভব এবং আরো কিছু গর্দ্ভভ অনুসারী পেয়ে কলা ঝোলাচ্ছে কখনো কমিনিউস্ট স্বর্গের, কখনো বৈদিক সমাজের , কখনো খিলাফতের। এই ভিসিয়াস সাইকল থেকে বাঙালী বেড়োতে না পারলে বাংলা সংস্কৃতির ভবিষ্যত নেই।

এখন দরকার একটা বাঙালী জাতিয়তাবাদি আন্দোলনের। যেখানে নতুন করে মুল্যায়ন করা হৌক বিদ্যাসাগর , প্রফুল্ল চন্দ্র এবং স্যার রাজেন মুখার্জিকে। কারন বাংলার ইতিহাসে এই গুটিকয় ব্যক্তিকেই আমি পেয়েছি, যাদের চরিত্র ছিল ইস্পাত সম। ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং আন্তারপ্রেনারশিপকে যারা গুরুত্ব দিয়েছিলেন জীবন দিয়ে। বিদ্যাসাগর বলতেন পথে বসে আলু পটলের দোকান দেবেন, কিন্ত বৃটিশদের অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবেন না। আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রসায়নকে ল্যাবে আটকে রাখলেন না। বাড়ির বারন্দায় তৈরী করলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল। স্যার রাজেন মুখার্জি দেখিয়েছেন বাঙালীরাও পারে আন্তর্জাতিক মানের ইঞ্জিনিয়িরিং বিজনেস। শুধু দরকার সদিচ্ছা এবং পরশ্রমের।

আমেরিকান গান কালচার

মানুষের বিশ্বাস বড়ই কঠিন ঠাঁই। ইসলামিক বিশ্বাস, হিন্দু বিশ্বাস, ক্রিষ্ঠান বিশ্বাস, কমিনিউস্ট বিশ্বাসের সাথে আরেকটা সংযোজন -আমেরিকানদের বন্দুক বিশ্বাস। হ্যা, সেই ১৭৯১ সালে যখন সেকন্ড এমেন্ডমেন্ট লেখা হল, তখন থেকেই আমেরিকানরা বিশ্বাস করে বন্দুকের নলই স্বাধীনতার উৎস। মানে কি না, জনসাধরনের কাছে অস্ত্র থাকাটা আমাদের আমেরিকাতে ফান্ডামেন্টাল রাইট। এর কারন আছে। আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদাররা ছিলেন রাজনৈতিক দিকপাল। ইতিহাস ঘেঁটে উনারা দেখেছিলেন, নির্বাচিত সরকারের মধ্যেই টেন্ডেন্সি থাকে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠায়। এর ফলে জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার হারায়। ফলে সেই ১৭৯১ সালে আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদাররা ভাবলেন জনগণের কাছে বন্দুক থাকাটাই একমাত্র রোধ করতে পারে স্বৈরাচারের উত্থান। বা বিদেশী শক্তির আক্রমন। ফলে অস্ত্র রাখা আমেরিকাতে মৌলিক অধিকার।

একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, সেই অষ্টাদশ শতাব্দিতে পলাশি থেকে বক্সারের প্রান্তরে যখন ভারতীয় নবাব এবং সেনারা ক্ষুদ্রতর বৃটিশ সৈন্যদের কাছে আত্মসমপর্ন করেছে বা হেরেছে, আমেরিকার স্বাধীনতা যোদ্ধারা বৃটিশ সেনাদের মেরে তাড়িয়েছে। এর পেছনে আমেরিকানদের গান কালচারের ভূমিকা আছে। অস্ত্র সম্ভারে আমেরিকান পেট্রিয়টরা বৃটিশদের থেকে এগিয়েই ছিলেন। ফলে আমেরিকার স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে একটা বিশ্বাস তৈরী হয়-- জনগণের বন্দুকই স্বাধীনতার উৎস । এই পরিবেশেই পাশ হয়, সেকন্ড এমেন্ডমেন্ট যেখানে বন্দুক রাখা আমেরিকাতে মৌলিক অধিকার। সেই ইতিহাসটা ভুলে গেলে কিন্ত চলবে না। যে দেশটার জন্মই হয়েছে বন্দুকের জোরে এবং সেই বন্দুক ছিল জনগণের হাতে।

কিন্ত ২০১৭ সাল ত আর ১৭৯১ না। এখন গাদা বন্দুক চলে না- চলে মেশিনগান। স্টিফেন প্যাডক এখন একাই ১০ টা মেশিনগান চালিয়ে ৫৯জনকে খুন এবং ৫৫০জনকে আহত করার ক্ষমতা রাখে। এত আর ১৭৯১ সালের গাদা বন্দুক না। এই নিয়ে আমেরিকাতে বহুবার সুপ্রীম কোর্টে সওয়াল হয়েছে-অন্তত মেশিন গান, অটোমেটিক ওয়েপন রাখা নিশিদ্ধ হৌক। কিন্ত সুপ্রীম কোর্ট মানে নি। কারন সেকন্ড এমেন্ডমেন্টের নোশনই হচ্ছে জনগনের আর্মি যেন সরকারের আর্মির সমতুল্য অস্ত্র রাখতে পারে। নইলে জনগণ স্বৈরাচারী সরকারকে রুখবে কি করে??

সুতরাং কংগ্রেস এবং সেনেট সংবিধানের সেকেন্ড এমেন্ডমেন্টের পরিবর্ধন না করলে, এই গেরো থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

আর সেকেন্ড এমেন্ডেমেন্টের বিরুদ্ধে বলার মতন একজন রাজনীতিবিদ ও আমেরিকাতে নেই। যারা বলছেন, তারা বলছেন সেকেন্ড আমেন্ডমেন্ট ঠিক, কিন্ত গান কন্ট্রোল দরকার। অনেকটাই সেই পুরাতন লেবু কচলানো- হিন্দু, ইসলাম ধর্মে সমস্যা নেই- ভক্তবৃন্ধের সমস্যা। আর এদিকে গুচ্ছ গুচ্ছ আমেরিকান আছে যাদের বাড়িতে এক গুচ্ছের বন্দুক। আমার এক প্রতিবেশীর বাড়িতেই আছে চারটে বন্দুক। এগুলো এদের অবশেসন । এদিকে আমাদের পাড়াতে ডাকাত ত দূরের কথা, চুরির কথাও কেউ কোন দিন শোনে নি। অর্থাৎ গান কালচার শ্রেফ একধরনের ধর্ম বিশ্বাস।

এই সব ভাবের ঘরে চুরি কদ্দিন চলে দেখা যাক। মধ্যেখান থেকেই ধরেই নিয়েছি বন্দুকের গুলিতে পরকাল প্রাপ্তির সম্ভাবনা ( নেক্সট ত্রিশ বছরে ) - ১ ইন মিলিয়ান। ক্যান্সারে মৃত্যুর সম্ভাবনা সেখানে ১ ইন ১০০। সেই ভেবেই শান্তনা নিই। যে বন্দুকের গুলিতে মরার আগে, রোগে মরব।

কি আর করা যাবে। এই একবিংশ শতাব্দিতেও হরেক রকমের বিশ্বাসের জিম্মি হয়েই কাটাতে হবে।

Tuesday, September 26, 2017

প্রযুক্তি ও ইতিহাস- পর্ব-৩, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ (১৯৭১), বাংলাদেশের স্বাধীনতা

অন্যান্য ইতিহাসের মতন '৭১ এর যুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিবীরত্ব, শৌর্য্য এবং স্ট্রাটেজির কথাই আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। স্ট্রাটেজির গুরুত্ব যেকোন মিলিটারী ক্যাম্পেইনের ক্ষেত্রেই সর্বাধিক-কিন্ত তা সত্ত্বেও কি আজকের যুদ্ধ, কি আলেক্সান্ডারের সময়- যুদ্ধাস্ত্র যদি সেকেলে হয়, কোন স্ট্রাটেজি, কোন বীরত্বই কিন্ত শেষ রক্ষা করতে পারে না।

     ভারত-পাকিস্তানের '৭১এর যুদ্ধকে সেই অর্থে ব্যপক যুদ্ধ বলা চলা না। পাকিস্থানি মিলিটারির যুদ্ধের কোন ভাল প্রস্তুতি ছিল না- যুদ্ধক্ষেত্রেও  যুদ্ধ করার ইচ্ছা একদমই ছিল না। হারা যুদ্ধ কে আর যেচে লড়ে?

             পাকিস্তানের নেতৃত্বকে এক্ষেত্রে দোষ দেওয়া চলে না। তারা জানত যুদ্ধ হলে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকাতে গেলে ভারতকে আটকানোর একটাই উপায় আছে। সেটা হচ্ছে আমেরিকা এবং চীনকে যুদ্ধে জড়ানো। ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব, নতুন সরঞ্জাম কেনার বদলে, সব টাকা খরচ করে ওয়াশিংটনের লবিস্টদের পেছনে- আমেরিকান সেনেটের এবং কংগ্রেসম্যানদের লিগ্যাল ঘুঁশ দিতে ( সে কেচ্ছা পরে হবে )। ইনফ্যাক্ট এতে তারা প্রায় সফল ও হয়। কারন তখন ঠান্ডা যুদ্ধের আবহে ভারত-রাশিয়া অবিচ্ছেদ্য এক্সিস। তার মধ্যে বাংলাদেশ চলে এলে, ভারত মহাসাগরে সোভিয়েত আধিপত্য বাঁধা। ফলে বাংলাদেশের জন্ম ঠেকাতে পাকিস্তানের থেকেও আন্তর্জাতিক মার্কেটে বেশী সক্রিয় ছিল আমেরিকা। শুধু রাশিয়ার হুমকিতে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় নি। বাদবাকি সব কিছুই করেছে। তখন পাকিস্তানের বিমান বাহিনীকে সাহায্য করতে সৌদি আরব, জর্ডন, সিরিয়া, ইরাণ সবাই অত্যাধুনিক বিমান দিয়ে, বৈমানিক দিয়ে সাহায্য করেছে। মনে রাখতে হবে, এই সব ইসলামিক দেশগুলি তখন সবাই আমেরিকার দাসানুদাস।  তার ওপরে তারা মনে করেছিল, বাংলাদেশের জন্ম মানে, ইসলামের  ভ্রাতৃত্বের ওপর আঘাত। ফলে একটি মুসলিম দেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য ত করেই নি-বরং চারটি ইসলামিক দেশ ( সৌদি, জর্ডন, সিরিয়া এবং ইরান)  পাকিস্তানকে অত্যাধুনিক প্লেন দিয়ে সাহায্য করেছে। এটা জেনেও যে পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছে।

যুদ্ধের কদিন বাদেই ভারত পাকিস্তানের সব রানওয়ে ধ্বংস করে। ফলে ইরানের বিমান ঘাঁটি থেকে পাকিস্তানের যুদ্ধ বিমান উড়ে যেত বা লুকিয়ে রাখা হত।

 তবে হ্যা আমেরিকার তুলনায় তা নগন্য। কারন নিক্সন তখন একবার চীনকে ভারত আক্রমণ করতে প্ররোচনা দেয় -আবার ইরান এবং জর্ডনের মাধ্যমে যুদ্ধ বিমান পাঠায়। সাথে সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ানকে হুমকি। হ্যা, একবার না, তিনবার ব্রেজনেভকে ফোন করে ছিলেন নিক্সন। তিনবারই ব্রেজনেভ বলেন-আরে মশাই যুদ্ধ থামাতে হবে ত, শেখ সাহেবের নেতৃত্ব স্বীকার করে নিতে পাকিস্তানের মিলিটারি জুন্টাকে চাপ দেন নি কেন? আসলে তখন সোভিয়েত-পাকিস্তান সম্পর্ক খারাপ ছিল তাও না। সোভিয়েত ইউনিয়ান এবং চীন -কিন্ত বাংলাদেশ আসলে চায় নি। তারা চেয়েছিল  শেখ মুজিবরের প্রধানমন্ত্রীত্ব পাকিস্তানের মিলিটারি শাসক মেনে নিক। একমাত্র  হেনরী কিশিঞ্জার তাবেদারি করেছে পাকিস্তানের যঘন্য মিলিটারী শাসকদের।  ইউ এন এ সিনিয়ার বুশ পারলে প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ বিরতির রিজল্যুউশন আনতেন। আর সোভিয়েত ইউনিয়ান ভেটো দিত।  প্রক্সি ওয়ার ( ইরান/জর্ডন), ব্রেজনেভকে হুমকি, চীনকে উস্কানি ভারত আক্রমনের জন্য, ইউ এনে যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব, ভারত মহাসাগরে ইউ এস টাস্কফোর্স এবং ইউ এস এস এন্টারপ্রাইজ পাঠানো ভারতের নৌবাহিনীকে ভড়কানোর জন্য-আমেরিকা বাংলাদেশের জন্ম আটকানোর জন্য ওই সময় পুরো মরিয়া। সত্যি কথা বলতে কি-বাংলাদেশের জন্ম আটকাতে পাকিস্তানের সেনা বাহিনীও আমেরিকার নেতৃত্বের মতন আন্তরিক ছিল না!

  সমস্যা হচ্ছে এর পেছনে ঠান্ডার যুদ্ধের কারন ত ছিলই, পাকিস্তানের প্রচুর টাকা ওয়াশিংটনের লবিস্টদের কাছেও গেছে। শোনা যায় ( এটা ভেরিফায়েড হিস্ট্রি না, আমি ওয়াশিংটনের কিছু ওল্ড টাইমারদের কাছে কানাঘুঁশো শুনেছি ) পাকিস্তান তখন এত টাকা খরচ করেছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশের রাজনীতিবিদদের কিনতে , তারা কিন্ত তাদের নৌবাহিনী বা বিমান বাহিনী আধুনিকরনে সেই ভাবে টাকা ঢালে নি।  এর ফলে পাকিস্তানের সমর সজ্জা ভারতের থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে। আমি মূলত ইতিহাসের সেই দিকটাই তুলে ধরব।

         প্রথমেই নৌযুদ্ধে আসি। বলতে গেলে যুদ্ধ শুরুর দুদিনের মধ্যেই গোটা ভারত মহাসাগরের দখল ভারতের নেভির হাতে আসে।  করাচি এবং চিটাগং-দুটো বন্দরই অবরুদ্ধ করে রেখেছিল ভারত।

  এবার এই প্রসঙ্গে মজার তথ্য দিই । করাচি পোর্ট অবরোধের প্রথম দিনই পাকিস্তানের  ডেস্ট্রয়ার পি এন এস খাইবার ডুবিয়ে দেয় ভারতের ওশা মিসাইল বোট।  পি এন এস খাইবার আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৃটিশ ডেস্ট্র্যয়ার যা ১৯৪৩ সালে প্রথম যুদ্ধে নামে। ১৯৫৬ সালে বৃটেন তা পাকিস্তানকে বেচে দেয়। অর্থাৎ প্রায় ২৮ বছরের পুরাতন প্রযুক্তি-তাও পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে-যাদের স্পেয়ার স্পার্টস দুর্নীতির জ্বালায় আদৌ কোন কিছু মেইনটেইন হত কি না কে জানে। সেখানে ওসা মিশাইল বোট  অত্যাধুনিক বৃহৎ টর্পেডো বোট ।  লেটেস্ট রাশিয়ান টেকনোলজি। ভারতের নেভিতে এসেছে ১৯৭১ সালে। পরের দিন পাকিস্তানের আরো দুটো যুদ্ধজাহাজ ডোবে- পি এন স সাহজাহান এবং পিন এস মুহাফিজ। ঘাতক সেই আই এন এস ভীর-যা অত্যাধুনিক মিসাইল বোট।  এর মধ্যে পি এন এস সাহজাহান আসলে বৃটিশ নেভির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের ডেস্ট্র্যয়ার -সেই ১৯৪৩ এর তৈরী। এস মুহাফিজ তৈরী হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। সেখানে আই এন এস ভীর ভারতের নেভিতে এসেছে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে।

 এবার আপনারাই বুঝে দেখুন।  মাত্র তিনটে রাশিয়ান ওশা মিশাইল ক্লাস বোট নিয়েই ভারত পাকিস্তানের ডেস্ট্রয়ার দের একদম দফারফা করে দেয় ( অপারেশন ট্রাইডেন্ট) । মনে রাখতে হবে এই সব বোট গুলি ডেস্ট্র্যারদের থেকে অনেক ছোট ( ১/১০ ভাগ হবে হয়ত)।  কিন্ত বোট গুলি ছিল অত্যাধুনিক। সেখানে  পাকিস্তান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাতিল নৌবহর নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল।

 '৭১ এর নৌ যুদ্ধে পাকিস্তান একটাই সাফল্য পায়। সেটা হচ্ছে পাকিস্তানের সাবমেরিন পি এন এস হাঙ্গর আই এন এস খুকরীকে ডুবিয়েছিল। এর কারন ও সেই এক। পি এন এস হাঙ্গর কমিশণ হয় ১৯৬৯ সালে-মানে একদম অত্যাধুনিক সাবমেরিন সেটি। সেখানে  আই এন এস খুকরী, পুরাতন ফ্রিজেট-কমিশন বয়সকাল ১৯৫৬। পাকিস্তানের আরেক সাবমেরিন পি এন এস গাজি, বিশাখাপত্তনম বন্দরে বিস্ফোরনেই ডুবে যায়। শোনা যায়, নিজেদের পাতা মাইনে নিজেরাই মরে। এই গাজি ও অতি প্রাচীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকান সাবমেরিন। তবে ইলেক্ট্রিক ক্লাস হওয়ার কারনে এর প্রযুক্তি সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের সব থেকে এগিয়ে ছিল। কিন্ত ১৯৭১ এ তা ছিল অচল সিকি।

 বাংলাদেশে নৌ যুদ্ধ কিছু হয় নি। পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের হাতে ছিল মোটে ৪ টে গানবোট। যুদ্ধ জাহাজ একটিও ছিল না। ইচ্ছা করেই রাখনি পাকিস্থান। কারন তারা জানত পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ জাহাজ রাখা মানে ওটা যুদ্ধের পরে বাংলাদেশে হাতে যাবে। পাকিস্তানের এই গানবোটগুলো মূলত ব্যবহৃত হয়েছে নির্বিচারে বাংলাদেশের নিরীহ লোকদের মেশিনগানের গুলিতে মারার জন্য। যুদ্ধ শুরু হলে, যুদ্ধের ছদিনের মধ্যেই চারটি গানবোটই ডুবে যায় ভারতের বিমান আক্রমনে  ।

 এবার আসি আকাশ যুদ্ধে। '৭১ এর যুদ্ধে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী লড়তেই চায় নি। যেটুকু উড়েছে, প্রায় সবটাই পাকিস্তানের আকাশে ভারতের আক্রমন ঠেকাতে। পাকিস্তানের বিমান ও ছিল পুরোনো- এফ -৬ -যা মিগ-১৯ এর চৈনিক ভার্সন । এবং কানাডিয়ান সাবরে। সেখানে ভারতের হাতে '৭১ সালে তুলনায় অত্যাধুনিক মিগ-২১, সু-৭  -এই দুটী ফাইটার প্লেন তখন সোভিয়েত ইউনিয়ানের ও মুখ্য ফাইটার প্লেন । সাথে ছিল বৃটিশ হান্টার-যা অবশ্য সাবরের মতন পুরোনো।

যদিও জর্ডন এবং সৌদি আরব আমেরিকান এফ সিরিজের প্লেন পাকিস্তানে পাঠিয়ে ছিল-কিন্ত এর কোন কিছুই তখন মিগ-২১ বা সু-৭ এর সমতুল্য ছিল না।  আসলে আমেরিকার আইন অনুযায়ী আমেরিকা তার বন্ধু দেশকেও অত্যাধুনিক ফাইটার প্রযুক্তি দিতে পারে না-এক ধাপ পেছনের প্রযুক্তি দিতে তারা বাধ্য। সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ান ভারতকে দিয়েছে, তাদের লেটেস্ট ফাইটার প্লেন মিগ-২১ ও সু-৭।  ফলে জর্ডন, সৌদি ইত্যাদিদের দিয়ে প্রক্সি যুদ্ধ করিয়েও আমেরিকা সুবিধা করতে পারে নি-কারন মিগ-২১ ঠেকাতে গেলে তাদের নিজেদের যুদ্ধে নামতে হত। এই সত্য জানা ছিল পাকিস্তানের ও । ফলে তারা যুদ্ধ না করে অধিকাংশ সময় ইরানের বিমান ঘাঁটিতে ফাইটার প্লেন লুকিয়ে রাখাই শ্রেয় বলে মনে করত।

  যুদ্ধের ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের আকাশ সম্পূর্ন ভাবে ভারতের দখলে চলে আসে।

  অর্থাৎ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে নৌবাহিনী তৈরী হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাতিল  নৌজাহাজ সস্তায় কিনে।  কোন আধুনিকরন করেনি '৭১ এর যুদ্ধ আসন্ন জেনেও। বিমান বাহিনীতেও একই অবস্থা।  তারা টাকা খরচ করেছে বড়দা আমেরিকাকে মাঠে  নামিয়ে। স্ট্রাটেজি হিসাবে খুব ভুল কিছু না। কিন্ত যুদ্ধ শুরু হলে যে তারা কয়েকদিন ও টিকবে না-এটা প্রথম থেকেই তাদের জানা ছিল।

 সেইজন্যই আমি মনে করি বাংলাদেশের আসল জন্মদাত্রী জননী ইন্দিরা গান্ধী। উনি যেভাবে দশহাতে আমেরিকা+ ন্যাটো + ৫০ টি মুসলিম দেশ + চীনের বিরুদ্ধে ডিপ্লোম্যাটিক লড়াই এ নেমেছিলেন, তা এক কথায় একটি এপিক। মনে রাখতে হবে সুহৃদ সোভিয়েত ইউনিয়ান ও পাকিস্তান ভাগ চায় নি-কারন পাকিস্তানের সাথে সোভিয়েতের সম্পর্ক মোটেও খারাপ ছিল না।  সেই অবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়ানকে নিজের হাতে রাখাও খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্ত ইন্দিরা পেরেছিলেন। তার অসাধারন বুদ্ধি এবং বাগ্মীতা দিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ান ইউ এন রিসোলিউশনে ভিটো না দিলে,  আমেরিকা ইউ এনের শান্তিবাহিনীর ছাতার তলায় ইউ এস এস এন্টারপ্রাইজকে নামিয়ে দিত।

ইনফ্যাক্ট একবার ইউ এন যুদ্ধ বিরোধি  রিসোলিউশন পাশ করাতে পারলে, ভারতের বিরুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধে নামার সীলমোহর পেয়ে যেত ইউ এন পিস কিপিং ব্যানারে। তবে ম্যাকেন শর ইন্টারভিউতে শুনেছি, আমেরিকা যুদ্ধে নামবে, এটা ধরেই উনি স্ট্রাটেজি ঠিক করেছিলেন। তার মধ্যে একটা হচ্ছে ডিসেম্বরের শীতে আক্রমন । যাতে উত্তর থেকে বরফ পেরিয়ে চীন বেগ দিতে না পারে। না হলে ম্যাকেনশর মতে অক্টবরেই তারা তৈরী ছিলেন আক্রমনের জন্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা চলে যেত বিশ বাঁও জলে।