Saturday, February 10, 2018

নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড !

ডস্টভয়েস্কির "নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড" -খুব সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম অস্তিত্ববাদি উপন্যাস।

প্রসঙ্গত অস্তিত্ববাদি দর্শন দুলাইনে বোঝানোর চেষ্টা করি। অস্তিত্ববাদের মূল ভিত্তি- জীবনের পরম উদ্দেশ্য বলে কিছু হতে পারে না ( কারন মৃত্যু অবধারিত, যাইকিছু করনা কেন, এই শরীর, মন, কীর্তি-একদিন না একদিন শেষ হবেই। ) আবার জীবনের উদ্দেশ্য না থাকলে, বাঁচার ইচ্ছাও থাকে না!  সুতরাং এই আমার এই অস্তিত্বটাই আসল! আমি কেন বাঁচছি, কিসের জন্য বাঁচছি, এই নিরন্তর জীবন সংগ্রাম-এসব কিছুই মায়া। সুতরাং যদি এটা আমরা জেনেই করি যে যা কিছু করছি, যেসব সাফল্যের জন্য এত লাফাচ্ছি-তার সব কিছুই মায়া, তাহলে, বেশ লিল্যাক্সড করেই জীবনকে উপভোগ করা যায়।  সেক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রশ্নে জীবনকে না বেঁধে ( এই যে এটা করা ঠিক, এটা বেঠিক-এসব ল্যাঠার মধ্যে না গিয়ে ), অনেকটা স্বাধীন ভাবেই জীবনের গুটিগুলো সাজানো সম্ভব।

 ফরাসী দার্শনিক আলবার্ট কামুস- ডস্টভয়েস্কির প্রায় এক শতক বাদে অস্তিত্ববাদি দর্শনের আরেকটি ধারা শুরু করেন-যেটাকে এখন আমরা এবসার্ডিজিম বলে জানি।  অর্থাৎ বেঁচে থাকার চেষ্টাটাই এবসার্ড-কারন সারা জীবন  ধরে একটা মানুষ বেঁচে থাকার পরম উদ্দেশ্য খুঁজছে-কিন্ত পাচ্ছে না।

 ধার্মিক লোকেদের কথা আলাদা। গোটা ধর্মটাতত্বই আসলে অস্তিত্ববাদের একটা শাখা।  ধর্মগুরুরা মানুষের এই এবসার্ডিজমকে এক্সপ্লয়েট করে।  ধর্মগুরু/ প্রফেটরা জানে প্রতিটা মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজছে-কিন্ত পাবে না- কারন সেই এবসার্ডিজম ! এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা দাবী করে, ভগবান তাদের কানে ফিস ফিস করে জীবনের উদ্দেশ্য কি বলে গেছে!  এতেব হে বোকা পাঁঠার দল, সব কিছু ত্যাগ করে আমার স্বরণে এস! মানুষও পিল পিল করে দৌঁড়ায়-কারন মানুষ মাত্রই সবাই এত জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত, এবসার্ডিজম বোঝার মতন ক্ষমতা অধিকাংশ মানুষের নেই। ফলে তারা নিজের মধ্যের স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশকে ধ্বংশ করে - ধর্মানুরাগী ধর্মভীরু মানুষ হিসাবে "এবসার্ডিজমের" ধারে কাছে যেতে ভয় পায়।

 বৌদ্ধ বা জৈন ধর্মে ঈশ্বর নেই।  জীবনের উদ্দেশ্য সেখানে পুনঃজন্মে।

তবে ইন্টারেস্টিং হলেও এটা ঠিক, উপনিষদে বা বৈদিক দর্শনে এবসার্ডিজম এসেছে "মায়া" র রূপে। বেঁচে থাকার জগত, এই আমরা যে বাস্তবতায় বাস করে আহার মৈথুনে ব্যস্ত -তা যেসবটাই মায়া!  হিন্দু দর্শনে মায়ার বহু ইন্টারপ্রেটেশন বা স্কুল থাকলেও, আদি শঙ্করের ত্রৈত্রীয় উপনিষদ ভাষ্যে "এবসার্ডিজমের" প্রশ্নটি আলবার্ট কামুর বহু শতক আগে, শঙ্করই তুলে ছিলেন তার ভাষ্যে এই রূপে -" নিজেকে জানার বা জীবনের পরম উদ্দেশ্য ( ব্রহ্ম  )  জানার  চেষ্টা করাটা আবসার্ড"। এর পরেই অবশ্য কামুর সাথে শঙ্করের বা ভারতীয় ভাষ্যের বিচ্ছেদ। কারন অই কিছু নাই, বলে ছেড়ে দিলে সাধারনে খাবে না। তাই শঙ্করভাষ্যে এটাও ঢোকে নিজেকে বাস্তবতার, প্রতিদিনের জ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা বৃথা , আবসার্ড কারন "আসল" জ্ঞান "মায়ার" কম্বলে ঢাকা!  ভারতীয় দর্শন এখানেই "এনালাইটিক বা র‍্যাশানাল" ডোমেন ছেরে আধ্যাত্মিক ডোমেনে ঢুকেছে ! সেখানে পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদের ক্ষেত্রে ডস্টভয়েস্কি, কিয়ার্ডগার্ড, সাত্রে বা কামু-এরা সবাই " এনালাইটিক" ডোমেনেই থেকেছেন- ভাবের জগতে ডোবেন নি।  ফলে অস্তিত্ববাদি পাশ্চাত্য দার্শনিকরা -যেমন নিৎসে বা সাত্রে বা কামু-সবাই এই অস্তিত্ববাদের সংকটকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মন এবং মরালকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।

 আমি আবার নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে ফিরে আসি।  এই জন্যেই এত কথা লিখলাম, অনেকেই দর্শন চর্চা সময়ের অপচয় বলে মনে করেন। কারন সেই এবসার্ডিজম! কারন এত ভেবে কি হবে? দিনের শেষে হাতে রইবে সেই পেন্সিল- এবাসার্ডিজম!

ওয়েল-এর একটা বিশাল প্রাক্টিক্যাল দিক আছে। ওই নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে ডস্টভয়েস্কি এই অস্তিত্ববাদের সূত্র ধরেই মানব সম্প্রদায়কে বিরাট সাবধানবানী শুনিয়েছিলেন। উনার সময়টা ইউটোপিয়ান স্যোশালিস্টদের যুগ। উনি লিখছেন এই যে মানুষের জন্য "আদর্শ সমাজের ধারনা" -যেখানে মানুষটা, সিস্টেম, সমাজ, রাজনীতিবিদ, বিচার ব্যবস্থা-সব কিছু পারফেক্ট হতে হবে-এই ধরনের যেসব আদর্শবাদ আস্তে আস্তে তখন সবে রাশিয়াতে ঢুকতে শুরু করেছে- তার ফল হবে মারাত্মক। কারন ডস্টভয়েস্কি লিখেছেন,  ধরুন মানুষ একটা অমন নিঁখুত সমাজ পেল। কিন্ত সে থাকবে কি করে? কারন সে ত সব সময় নিজেকে প্রকাশ করতে চাইছে। যদি এমন সমাজে তাকে ফেল , যেখানে এ টু জেড, তাকে গঁতে বেঁধে কথা বলতে হবে, প্রতিটা কাজ আইন মেনে করতে হবে-তার মানব সত্ত্বাই ত বিকশিত হবে না! ফলে সে বিদ্রোহ করবেই!

 উনি এটা লিখেছিলেন উনবিংশ শতকে (১৮৬৪)।  বিংশ শতকের শুরু থেকেই  নিঁখুত  "ইউটোপিয়ান পলিটিক্যাল সিস্টেম গড়ার লক্ষ্যে"  কমিউনিজিম, ফ্যাসিজম, নাজিজম ইত্যাদির জন্ম হল। এগুলো সবই স্যোশালিস্ট আন্দোলন।  বামপন্থীরা নিজেদের ইতিহাস থেকে হিটলার বা মুসোলিনীকে বাদ দিতে চান-কিন্ত চাইলেই ত হবে না। হিটলার এবং মুসোলিনী দুজনেই স্যোশালিস্ট আন্দোলনের ফসল। হিটলারের পার্টিটার নাম ন্যাশালিস্ট স্যোশালিস্ট ওয়ার্কারস পার্টি। শুধু তাই না মেইন ক্যাম্পে বেশ অসংখ্য স্থলে হিটলার আমেরিকান ক্যাপিটালিজমের সমালোচনা করেছেন-পুঁজির সমালোচনা করেছেন-এবং কিভাবে পুঁজিবাদি সমাজের জন্য শ্রমিক শ্রেনী বেকারত্বের জ্বালায় ভোগে, তার সম্পূর্ন বর্ননা দিয়েছেন। মুসোলিনিও তাই। ১৯২১ সালে মুসোলিনী ছিলেন ইটালিয়ান স্যোশালিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য -লেনিনের বলশেভিক পার্টির, লেনিনের প্রশংসা করে ভাষন দিতেন ( পরে অবশ্য মার্ক্স ছেড়ে উনি নিৎসের দর্শনের ওপর ভিত্তি করে বাম আন্দোলন গড়ে তোলেন)।  এগুলো আমাদের বামপন্থী ভাইরা লজ্জায় চেপে যায়।  ইতিহাস সামান্য পড়লেই বুঝবেন হিটলার এবং মুসোলিনী ছিলেন হার্ডকোর বামপন্থী । হ্যা তারা কমিনিউস্টদের হত্যা করেছেন। কিন্ত সেটা ওই বামপন্থী লাইন কার ঠিক, সেই  নিয়ে ঝামেলা। যেমন পশ্চিম বঙ্গে মাও বনাম সিপিএম। তাতে তারা দক্ষিন পন্থী হয়ে যান না।  ক্ষমতায় আসার পরে হিটলার, মুসোলিনী যেমন দক্ষিনপন্থী হয়ে ওঠেন-ঠিক তেমনই লেনিন, স্টালিনও ক্ষমতায় আসার পরে  শ্রমিক এবং প্রজাবিরোধি দক্ষিনপন্থী। কোন পার্থক্য নেই ।

 বিংশ শতাব্দিতে নাজি, ফ্যাসিবাদ এবং কমিউনিজমের স্টিমরোলারে কত মানুষকে খুন করা হয়েছে, কত গণহত্যা হয়েছে সেই প্রসঙ্গ বাদ দিচ্ছি। যেটা আমার কাছে খুব ভয়ংকর লাগে, এই একবিংশ শতাব্দিতেও  আমার আশে পাশের লোকেরাও সেই আদর্শ নিঁখুত হিন্দু রাষ্ট্র, নইলে ইসলামিক রাষ্ট্র, নইলে কমিনিউস্ট রাষ্ট্রের প্রশ্নে বিভোর।  এদের কে পড়াবে দস্তভয়েস্কির নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড? কে বোঝাবে মানুষ চাইছে স্বাধীনতা-তাকে ওই ভাবে আদর্শ কোন সিস্টেমে বাঁধা সম্ভব না!

আরেকটা উদাহরন দিচ্ছি। আজকাল অধিকাংশ বাবা-মা " তার ছেলে মেয়েদের" জন্য আদর্শ নিঁখুত জীবন ভেবে রেখেছেন - ছেলে কোন স্কুলে পড়বে, কত মার্কস পেতে হবে, ইঞ্জিনিয়ারিং না ডাক্তারি পড়বে- কত মাইনে পাবে, কি টাইপের চাকরি পাবে, কি টাইপের বৌমা  ঘরে আনবে-একদম জন্ম থেকেই ভেবে রেখেছেন বাবা মায়েরা!   অনেকটা কমিনিউস্টরা যেমন দেশের গরীবদের জন্য, হিন্দুত্ববাদিরা হিন্দুদের জন্য, ইসলামিস্টরা গোটা পৃথিবীর জন্য-ইত্যাদি ইত্যাদি । আজকাল দেখি প্রতিটা বাবা মা, তাদের সন্তানের প্রতিটা মিনিট (ঘণ্টা না) নিয়ন্ত্রন করছেন। প্রতিটা গৃহই আজকের শিশুদের জন্য গুলাগ ( রাশিয়ান লেবার ক্যাম্প যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা রুটিন মেনে কাজ করতে হত )।  সে ত নিজের সত্ত্বাকে বোঝার সময়ই পাচ্ছে না!  পাবে কি করে? মানুষ নিজের সত্ত্বাকে খুঁজে পায়, যখন যে কবিতা লেখে, নইলে গান বাঁধে বা নাটক করে বা ছবি আঁকে।  আটটা টিউশুনির পরে এসব করার সময় বাচ্চাদের কোথায়? ছবি টবি আঁকলে সেই কম্পিটিশনের জন্য-নিজের জন্য কখন আঁকে?  বাড়ির আইন ভাঙাও বাচ্চাদের দরকার মাঝে সাঝে, নইলে সে চিরকাল অন্যের দাস হয়েই কাটাবে। নিজের অস্তিত্বই বিকশিত হবে না।  এই জন্যেই কৃষ্ণ বাল্যকালে নটঘট নন্দদুলাল। সেই আদিকালেও লোকজন বুঝত বাল্যে শিশুদের বেশী শাসন করতে হয় না-দৌরাত্বেই তাদের বিকাশ ঘটে দ্রুত। আর এখন ত সম্পূর্ন উল্টোরথ।

আর এর ফল?   এই সব ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে মুক্তচিন্তার মানুষ হয়ে উঠবে না। তারাও আল্টিমেটলি সেই হিন্দুত্ববাদি, না হলে ইসলামিজম বা কমিনিজম, মহিলা হলে ফেমিনিজম - আর রাজনীতি ভাল না লাগলে রবিশঙ্কর বা রামকৃষ্ণমিশন বা ইস্কন -কোন না কোন বন্ধনে বেঁধে নিজের সত্তাকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে আরো মিহিয়ে যাচ্ছে!

করুন অবস্থা হে করুণাময়!















Saturday, February 3, 2018

হিন্দু মুসলমান বিবাহ এবং অনর কিলিং

মুসলমান সাজিয়ার সাথে প্রেম করার জন্য হিন্দু অঙ্কিত সাক্সেনাকে তার প্রেমিকার ভাই এবং বাবা দিল্লীর রাস্তায় সবার সামনে কুপিয়ে খুন করেছে। লোকেরা সেই দৃশ্য মোবাইলে তুলতে ব্যস্ত ছিল-কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে বাঁচাতে। স্পষ্টতই তিন বছর আগে ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকার বুক ফেয়ারে অভিজিত রায়ের খুনের ঘটনা মনে এল। সেও খুন হয়েছিল প্রকাশ্যেই-কেউ এগিয়ে আসে নি। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে।

হিন্দু-মুসলমান প্রেমের ঘটনায় ফ্যামিলির হাতে খুন, অনার কিলিং ভারত-বাংলাদেশে স্বাভাবিক ঘটনা। প্রতি সপ্তাহেই ঘটে। হিন্দু -মুসলমান যুবক খুন হয়। মাঝে মাঝে মোমবাতি মিছিল হয়। হলে হবে কি? যেখানে ভারতের রাজনীতি, মিডিয়া ব্যস্ত হিন্দু-মুসলমান আলাদা সম্প্রদায় এই দ্বিজাতি তত্ত্বের পুঃনপ্রতিষ্ঠায়, সেখানে সাম্প্রদায়িকতার বিশাক্ত ছোবলে অসংখ্য প্রেমিক প্রেমিকার প্রাণ যাবে-তা আর আশ্চর্য্য কি!
প্রাচীন ভারতের গোষ্ঠি অবশ্য ছিল, কিন্ত "ধর্মীয় পরিচিতির" ভিত্তিতে গোষ্ঠী -এই ধারনা ভারতে এসেছে ইসলামের মাধ্যমে। বৃটিশ আমলে তা পরিপোক্ত ধারনা নেয়। প্রাচীন ভারতে "ধর্ম" মানে মানুষের ব্যক্তিগত উত্তরোনের জায়গা। ধর্মের মাধ্যমে গোষ্ঠি বানানো ব্যপারটা মধ্যপ্রাচ্যের-প্রথমে ইহুদি, পরে খ্রীষ্ঠান এবং ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক অভিলাষের মধ্যে দিয়ে বিজয়ী গোষ্ঠিগুলির রাজনৈতিক এবং সামাজিক নীতি একেশ্বরবাদি ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। বিজিত জনগণ অবশ্য সেই গোষ্ঠিবাজির ধর্মকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সুপ্রীম ইচ্ছা বলেই আফিম সেবনে রত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা অধিক পাকে কোকেন হিরোয়িন হয়ে সন্ত্রাসবাদির ও জন্ম দেয়।

মেয়ের বিয়ে নিয়ে গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে সংঘর্ষ ইতিহাস জুরে। প্রাচীন ভারতের রীতিনীতির প্রামান্য যদি মহাভারত হয়, তাহলে কিন্ত পরিস্কার প্রাচীন ভারতে, মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়ার রীতি ছিল না।

মহাভারতে পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কন্যাহরণ করে বিয়ের উদাহরন অনেকগুলো- এর মধ্যে বিখ্যাত দুটি অবশ্য কৃষ্ণের রুক্কিনী হরন এবং অর্জুনের সুভদ্রাহরণ। এই দুই ইলোপ এপিসোড মাইক্রোস্কোপের তলায় ফেললে দেখা যাবে, প্রাচীন ভারতে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের ইচ্ছাকে সর্বদাই গুরুত্ব দেওয়ার রীতি ছিল।

এই দুটি বিখ্যাত ইলোপের ঘটনার সাথে জড়িত দ্বারকা রাজ্য এবং তার দুই রাজকুমার বলরাম এবং বাসুদেভ কৃষ্ণ। দ্বারকা একই সাথে বন্দর এবং নগর রাষ্ট্র। বন্দর নগররাষ্ট্রগুলি পৃথিবীর ইতিহাসে শুধুই মালামালের আমদানী রপ্তানীর জন্য বিখ্যাত ছিল না- সেখানে দেশ বিদেশের বণিকেরদের মধ্যে দর্শন এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ও হত। খুব স্বাভাবিক কারনে দ্বারকাবাসীরা মভাভারতের যুগে "প্রগ্রেসিভ" এক জনগোষ্ঠি।

কৃষ্ণ রুক্ষিনীর কাছ থেকে পত্র পেলেন তার পিতা বিদর্ভরাজ ভিষ্মক , শিশুপালের সাথে তার বিবাহ স্থির করেছেন-কিন্ত রুক্কিনী ভালোবাসেন কৃষ্ণকেই। সুতরাং কৃষ্ণ যেন তাকে উদ্ধার করেন।

রুক্ষিনীকে নিয়ে বিদর্ভ থেকে পালানো সহজ ছিল না। রুক্কিনীর সাথে শিশুপালের সম্মন্ধ নিয়ে বিদর্ভরাজের কাছে এসেছেন স্বয়ং জরাসন্ধ্র । মগধরাজ জরাসন্ধ্র তখন গোটা ভারতের রাজচক্রবর্ত্তী সম্রাট হওয়ার অভিলাসী। ছেদির যুবরাজ শিশুপাল জরাসন্ধ্রের ডানহাত। সেই যুগে অন্য রাজ্যকে, স্বীয় ক্ষমতার ছত্রতলে আনার দুটোর উপায় ছিল- যুদ্ধ অথবা বিবাহ। রাজকন্যারা ছিলেন রাজনীতির বোরে। জরাসন্ধ্র তখন সব থেকে শক্তিশালী সম্রাট এবং তিনি বিদর্ভকে নিজের ক্ষমতার বৃত্তে আনার জন্য শিশুপাল ও রুক্কিনীর বিয়ে ঠিক করলেন। সেই রাজনৈতিক বিয়ে ভেঙে কেউ যদি রুক্কিনীকে হরণ করে, তার ব্যাকলাশ কিহবে, তা সহজেই অনুমেয়। জরাসন্ধ্রের রক্তচক্ষু, দ্বারকার মতন এক ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রের জন্য আপদ ত বটেই!

বলরাম সবই জানতেন। রুক্কিনীর পত্র দেখা মাত্র ঠিক করলেন তিনি বিদর্ভ আক্রমণ করবেন । ঠিক হল কৃষ্ণ রুক্কিনীকে মন্দির থেকে রথে তুলে পালাবেন। বলরাম বিদর্ভের রাজধানী অবরোধ করে রাখবে, যাতে কোন সেনা কৃষ্ণের পেছনে না আসতে পারে।

এই পর্বে বলরামের একটা উক্তি মহাভারতে খুবই উল্লেখযোগ্য- বিদর্ভরাজকে সভ্যতা সেখানো দরকার! অর্থাৎ যেসব গোষ্ঠি তাদের কন্যাকে স্বয়ংবরের সুযোগ দেয় না, তাদের অসভ্য বললেন বলরাম!

কিন্ত এই বলরামই আবার অর্জুনকে খুন করতে উদ্যোত হলেন যখন শুনলেন অর্জুন তার বোন সুভদ্রাকে নিয়ে পালিয়েছে! অর্জুন দ্বারকায় এসেছিলেন সন্নাস্যীর ছদ্মবেশে। বলরাম কৃষ্ণের ছলনা না বুঝে সুভদ্রাকে পাঠিয়েছিলেন সেই তরুন সন্ন্যাসীর পদসেবা করতে। পাশাপাশি চলছিল সুভদ্রার সাথে দুর্যোধনের বিয়ের তোরজোর। কারন দুর্যোধন ছিলেন বলরামের প্রিয়তম শিষ্য। তার সাথে হস্তিনাপুর যুবরাজ। যখন শুনলেন অর্জুন সুভদ্রাকে নিয়ে পালিয়েছে, বলরাম সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থে পর্যন্ত ধাওয়া করে অর্জুন বধের হুঙ্কার দিলেন!

কি আশ্চর্য্য এই বলরাম! যিনি ইচ্ছার বিরুদ্ধে কন্যার বিবাহের জন্য বিদর্ভরাজকে অসভ্য বলেছিলেন, তিনিই কিনা নিজের বোনের হরনকারী অর্জুনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুললেন? যদিও কৃষ্ণ বলরামকে নিরস্ত করেন!

কিন্ত এখনো অব্দি ভারতের হিন্দু মুসলমানদের আচরন সেই বলরাম লেভেলেই। যখন তাদের নিজের ধর্মের ছেলেরা অন্য ধর্ম থেকে কন্যা আনছেন-তখন সেটি সভ্যতা, উচ্চমার্গ। যখন নিজের ধর্মের মেয়েটি অন্য ধর্মে বিয়ে করতে উদ্দ্যত, তাহা লাভ জিহাদ। ত, সেই লাভ জিহাদের রাস্তাত চওড়া করে খুলে দিয়েছেন স্বয়ং বাসুদেভ কৃষ্ণ! অর্জুন যখন জানলেন সুভদ্রা তাকে ভালোবাসেন ( এবং তিনিও সুভদ্রার প্রেমে বিভোর) , কিন্ত তার বিবাহ দুর্যোধনের সাথে- কৃষ্ণের কাছে মার্গ দর্শন চাইলেন পার্থ। কৃষ্ণ বল্লেন এই ক্ষেত্রে ক্ষত্রিয় মার্গ একটিই ! সুভদ্রাকে নিয়ে পালাও! রথ পাঠিয়ে দিচ্ছি!

অদ্ভু! যতই মহাভারত এবং প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটি-একটা ব্যপার বেশ পরিস্কার এবং স্পষ্ট। প্রাচীন ভারতে যেটুকু ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং উদারতা ছিল, বর্তমানে তা নেই। ফলে শুধু ধর্মে ধর্মেই না, অন্য জাতে, অন্য গোষ্ঠিতে বিয়ে করার জন্যও খুন হচ্ছে অসংখ্য তরুন তরুনী।

Saturday, January 27, 2018

আলাউদ্দিন খিলজি, নায়ক না ভিলেন

ভারতের ধারাবাহিক ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরের।  খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভারতে ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা কম-ওটা আমেরিকা/জার্মানী  এখন চীনে দের হাতে।  অনর্থক  মারামারি ইতিহাসের দখল নিয়ে। বিশেষত যদি তা ভারতের ইসলামিক ইতিহাস হয় তাহলে বহু তর্কে বহু বিতর্কে তা ঘেঁটে ঘ। 

এই অধ্যায়ের নতুন সংযোজন আলাউদ্দিন খিলজী। পদ্মাবৎ সিনেমার ভিলেন চরিত্র। সারাদিন সর্বত্র তর্ক বিতর্ক-সুলতান খিলজী কি খল নায়ক?  নাকি, মোঙ্গল আক্রমন সফল ভাবে প্রতিরোধ করে তিনি নায়ক? এই নিয়ে অনেক লেখাই দেখলাম। সবই সংক্ষিপ্ত নোট। তাই দিয়ে আলাউদ্দিন চরিত্রের নির্মোহ বিশ্লেষন সম্ভব না।

 ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে আলাউদ্দিন খিলজি নিঃসন্দেহে পিভটাল চরিত্র।  কারন তিনিই প্রথম বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিনে ইসলামিক শাসনকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হোন। তার আগে দিল্লী সুলতানেদের দখলে ছিল ছোট একটা সাম্রাজ্য-যা বাংলার থেকেও ছোট।


 হিন্দু কৃষকদের  ওপর তিনি ৫০% ট্যাক্স চাপান- সেটাই চলে এসেছে বহুদিন পর্যন্ত-বৃটিশ আমল অব্দি।  ধর্মপাল, দেবপাল, হর্ষবর্ধনদের পরে ভারতে দীর্ঘ তিন শতাব্দি তেমন কোন শক্তিশালী সাম্রাজ্য আসে নি। অসংখ্য ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ বিভক্ত তখন ভারত। কিন্ত বাণিজ্য কৃষিজ উৎপাদন কমে নি। তন্ত্র মন্ত্র ভ্রান্ত ধর্মের অনাচারে ক্ষত্রিয় শক্তি ক্ষীনমান। সেই পটভূমিতেই উদ্ভব আলাউদ্দিনের। যার মিলিটারী স্ট্রাটেজি এবং ট্যাক্সের স্টিম রোলারের সামনে অসংখ্য সমৃদ্ধ হিন্দু রাজ্য, দরিদ্র দুর্ভীক্ষ পীড়িত রাজ্যে পরিণত হয়।

 আলাউদ্দিনের কাকা এবং শশুর  জালাউদ্দিন খিলজী নৃশংস ছিলেন না। নারী সুরাতেই কাটত তার দিন।  কিন্ত তারা জামাতা  আলাউদ্দিন খিলজীর মতন নৃশংস শাসক ভারত না কখনো দেখেছে এর আগে, না দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারত এমন  নরাধাম শাসক সম্ভব। তবে তার নৃশংস নিষ্ঠুর চরিত্রের উৎস- তাদের উপজাতিক ঐতিহ্য, ইসলাম না। ইতিহাসের নানান দলিল ঘাঁটলে এটাই পরিস্কার আলাউদ্দিনের ছিলেন গর্বিত মামলুক উপজাতির লোক ( যদিও তার জন্ম বাংলার বীরভূমে) -বিশ্বাস করতেন সেই পাহাড়ি ঐতিহ্যে-যেখানে অন্য সর্দারকে যুদ্ধ হারিতে তাদের নারী সন্তান গাভীর দখল নেওয়াটাই গর্বিত ঐতিহ্য।  মনে রাখতে হবে এই মধ্য এশিয়ার ট্রাইবগুলো মোটেও  ওইসব সতী সাবিত্রী নারী, বিয়ের পবিত্র বন্ধনে বিশ্বাস করে না। তাদের কাছে ক্ষমতা যার নারী তার-নারী কোন পুরুষের না, শাসকের।

 আলাউদ্দিন-মিলিটারী জেনারেল ঃ

 আলাউদ্দিন চরিত্র বুঝতে হলে, বুঝতে হবে মিলিটারি জেনারেল হিসাবে তার উচ্চাশাকে। উনি আলেক্সান্ডারের ন্যায় বিজয়ী হতে চেয়েছিলেন-ফলে পদবী নেন  সিকান্দার সানি, দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার। কল্পনা করতেন তার লেগাসি হবে আলেক্সান্ডার বা চেঙ্গিস খানের মতন। সেটা করতে গিয়ে তিনি মিলিটারির আমূল সংস্কার করেন।  তার আগে ভারতে বা কোথাও স্থায়ী সেনা বাহিনী ছিল না। তিনিই প্রথম সম্পূর্ন বেতনভোগী সেনা বাহিনী তৈরী করেন ভারতে। আসলে সামন্তরাজা বা ভেসেল স্টেট গুলির উপর তার বিশ্বাস ছিল না। কারন তার শশুর এবং কাকা জালাউদ্দিন খিলজিকে সরাতে, এই সব সামন্ত শক্তিকে ঘুঁশ দিয়েই কাজ হাঁসিল করেন আলাউদ্দিন। ফলে একবার যখন ক্ষমতা সম্পূর্ন হাতে পেলেন, রাজদরবারের সমস্ত মালিকদের ডানা ছাঁটাই করেন।  যারা জালালুদ্দিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তার দিকে যোগ দিয়েছিল গোপনে, তাদের খুন করেন।  তার উদ্দেশই ছিল ক্ষমতার দ্বিতীয় কেন্দ্র যেন তৈরী না হয়! মুশকিল হল, তার স্থায়ী মিলিটারির খরচ চালাতে গিয়ে ৫০% ট্যাক্স ধার্য্য করেছিলেন আলাউদ্দিন। যার ফলে কৃষিকাজই উঠে যাবার উপক্রম হয়। তার আমলে ভারতে অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। কৃষি, বাণিজ্য ধ্বংস হয়। সুতরাং তিনি মোঙ্গল আক্রমণ আটকেছেন-এটা কোন গৌরবের কথা না। কারন মোঙ্গলরা ভারতে যা ধ্বংসলীলা চালাত, তার থেকেও বেশী ধ্বংসলীলা তিনি নিজে চালিয়েছেন ভুল অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে।

 সাম্প্রদায়িক আলাউদ্দিন?

 এবার আসা যাক সব থেকে বিতর্কিত প্রশ্নে। আলাউদ্দিন কি সাম্প্রদায়িক ছিলেন? হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যমুলক আচারন করেছেন?

 এটা অস্বীকার করার যায়গা নেই, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের অধিকাংশ হিন্দু কৃষক আলাউদ্দিনের আমলে চূড়ান্ত দারিদ্রের সম্মুখীন হয়। উত্তরের মোঙ্গল আক্রমন ঠেকানোর জন্য, জমির ওপরে ৫০% কর ধার্য্য হল। এর সাথে জিজিয়া সহ অন্যান্য বিধর্মী কর ত ছিলই। অনাদায়ের শাস্তি ছিল রাষ্ট্র  কৃষক এবং তার সমস্ত পরিবারকে দাস হিসাবে বিক্রি করে দেবে। ফলে আলাউদ্দিনের শাসনের মাত্র দশ বছরের মধ্যেই তার রাজ্যে অর্ধেকের বেশী দাসে পরিনত হয়। এদের সবাই ছিল হিন্দু কৃষক। এদের গৃহিনীরা মুসলমান মালিক ( রাজকর্মচারী) দের যৌনদাসীতে পরিণত হয় কর দিতে না পারায়। এই সব যৌনদাসীদেরই বলা হত লন্ডি-যা  হিন্দিতে গালি হিসাবে এখনো চালু।

 মনে রাখতে হবে আলাউদ্দিনের নির্দেশ ছিল পরিস্কার। হিন্দুদের এমন দারিদ্রের মধ্যে ফেল যেন তাদের ঘোড়া কেনার পয়সাও না থাকে-যাতে কোন ভাবেই সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার দুঃসাহস না দেখায় কেউ।

  কিন্ত এটা কি সাম্প্রদায়িক না স্ট্রাটেজিক সিদ্ধান্ত?  আলাউদ্দিন ধর্মপ্রান মুসলমান ছিলেন না। মামলুকরা কেইই ধর্মপ্রান মুসলমান না। প্রচন্ড মদ্যপায়ী ছিল ।  তারা ইসলামের চেয়ে তাদের পাহাড়ি সংস্কৃতিতেই বিশ্বাস করতেন বেশী। আলাউদ্দিন জীবনে দুবার নিজের ধর্ম প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। এই ব্যপারে তার অনুপ্রেরণা ছিল চেঙ্গিস খান।

 এটা আরো পরিস্কার হবে উত্তর বনাম দক্ষিনের হিন্দু রাজাদের জন্য তার স্ট্রাটেজি ছিল আলাদা।  গুজরাটের ভাগেলা, রাজস্থানের রনথন্মর চিতোর ইত্যাদি রাজ্য নিজে জিতে তছনচ করেছেন, ওই সব রাজ্যের রানী সহ সব মহিলাদের হারেমে ঢুকিয়েছেন। শুধু চিতোর অভিযানেই ৩০ হাজার হিন্দু হত্যা করেন।  কিন্ত দক্ষিন ভারতে দেবগিরি ওরাঙ্গাল কাকাটিয়া হোসালা -ইত্যাদি রাজাদের পরাজিত করে তাদের করদ রাজ্যে পরিণত করেছেন। তাদের সাথে  বন্ধুত্ব স্থাপন করেন।   তাদের ধ্বংশ করেন নি কেন?

 এখানেই আমরা বিচক্ষণ আলাউদ্দিনকে দেখতে পাব।  ১৩০৩ সালের আগস্ট মাসে মোঙ্গলরা তার আমলে চতুর্থবারের মতন  দিল্লী আক্রমণ  করে। এর আগে তিনবার তিনি মোঙ্গলদের মেরে ভাগিয়েছেন। ১৩০৩ সালের আগস্ট মাসে মোঙ্গলরা দিল্লী ধ্বংশ করে। ৫০,০০০ নিরীহ স্ত্রী পুরুষ খুন করে মোঙ্গলরা। যদিও এবারো মোঙ্গলদের মেরে তাড়িয়েছিলেন আলাউদ্দিন-তদ্দিনে দিল্লীর যা ক্ষতি হওয়ার হয়েই গেছে।

 আসলে সেবার ওরাঙ্গাল অভিযানে ছিলেন আলাউদ্দিন। যখন তার কাছে খবর এল মোঙ্গলরা আসছে-উনি সেনা নিয়ে দিল্লীর দিকে আবার এগোলেন। কিন্ত তখন দক্ষিন থেকে দিল্লী আসতে দু-সপ্তাহ সময় লাগত।  দিল্লীতে সেনা নিয়ে পৌঁছানোর আগেই দিল্লী ধ্বংশ করে মোঙ্গলরা। এর থেকেই আলাউদ্দিন বোঝেন দক্ষিনে লুঠ করা যায়, কিন্ত সেখানে সেনা রেখে শাসন করতে গেলে মোঙ্গল আক্রমন ঠেকানো যাবে না। ফলে দক্ষিনের হিন্দু শাসকদের প্রতি বন্ধুত্বের নীতি নেন আলাউদ্দিন, যেখানে উত্তরের হিন্দু শাসকদের মেরে ধরে তাড়িয়েছেন। পুরো রাজবংশকে ধরে ধরে হারেমে ঢুকিয়েছেন।

 এবার আসা যাক হিন্দু রানীদের হারেমে ঢোকানো নিয়ে তার লেজেন্ডারী কেচ্ছা।  প্রথমেই আসবে কমলা দেবীর কথা। কমলা দেবী ছিলেন ভাগেলা রাজা কর্নের সুন্দরী স্ত্রী।  কমলা দেবী আসলে ছিলেন কর্নের মন্ত্রী মাধবের স্ত্রী।    তবে হ্যা, রাজা কর্নও কমলা দেবীকে ছিনিয়ে নেন তার মন্ত্রী মাধবের কাছ থেকে।  মাধব পালিয়ে যান আলাউদ্দিনের কাছে এবং তাকে রাজা কর্নকে আক্রমণ করার জন্য উস্কাতে থাকেন। ১২৯৯ সালে আলাউদ্দিনের সেনাপতি উগা খান কর্নকে পরাস্ত করে কমলা দেবীকে বন্দী করে আলাউদ্দিনের হাতে তুলে দেন।   দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র অবশ্য তার কন্যা জাত্যপালিকে আলাউদ্দিনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হোন সন্ধির শর্ত হিসাবে।  মধ্যযুগে এসব চলত- এর মধ্যে হিন্দু মুসলমান খোঁজা হাস্যকর। উদাহরন চান? আমির খশরু, আলাউদ্দিনের জীবনীকার লিখছেন কমলাদেবী আসলেই রাজা কর্নকে ঘৃনা করতেন কারন, রাজা কর্ন তার স্বামীর কাছ থেকে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন। ফলে কমলাদেবী আলাউদ্দিনের হারেমে থেকে কর্নের ছিন্ন মস্তক দাবী করেছিলেন। কিন্ত কর্ন গোটা ভারতে পালিয়ে বেঁচেছিলেন।

   আলাউদ্দিন অতীব নিষ্ঠুর ছিলেন-কিন্ত সেই যুগে যেখানে সুলতানের বিরুদ্ধে প্রতিদিন অজস্র ষঢ়যন্ত্র বিদ্রোহ হত, নিষ্ঠুরতা ছাড়া কোন শাসকে টেকার কোন চান্স ছিল না। উনি একদিনে ৩০,০০০ মোঙ্গল মেরেছেন, যারা দিল্লীতে নতুন বাসা বেঁধেছিল থাকার জন্য। এরা সবাই ছিল মুসলমান। শুধু মাত্র সন্দেহের বশে এতজনকে খুন করেছিলেন আলাউদ্দিন। নিজেরা কাকা এবং শশুর জালাউদ্দিনকে মুন্ডু কেটে নিজের শালার কাছে পাঠিয়েছিলেন ভয় দেখাতে।  আরেক শালা ছিল মুলতানের শাসক- জালাউদ্দিনকে হত্যার পরে, তার চোখ উপড়ে, নিজের শাশুড়িকাছে তার কাটা মাথা পাঠান। কারন তার এই শাশুড়ি এবং জালাউদ্দিনের বিধবা স্ত্রী খুব জ্বালিয়েছিলেন আলাউদ্দিনকে। যেখানে নিজের শশুর, শালা, শাশুড়িদেরই নৃশংস ভাবে খুন করেছেন আলাউদ্দিন -সেখানে হিন্দু প্রজাদের প্রতি প্রেম দেখাবেন, এতটা ভাবাই পাগলামো।

 আলাউদ্দিন যা কিছু করেছেন, তা ভারতীয় সভ্যতার দৃষ্টিতে নৃশংস, বর্বরতা। কিন্ত আলাউদ্দিনের উৎস,  মধ্য এশিয়ার আদিবাসীদের কাছে আলাউদ্দিনের নৃশংসতাটাই স্বাভাবিক আচরন। মধ্য এশিয়ার এই সব আদিবাসিদের মধ্যে জোর যার মুলুক তার, নারীও তার।  আলাউদ্দিনকে খুঁজতে গেলে সেই মামলুকদের সংস্কৃতিতেই  তাকে খুঁজতে হবে। এর মধ্যে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আসা আহাম্মকি।

 আজকে ভারতের ইতিহাস নিয়ে হিন্দুত্ববাদি বনাম সেকুলারবাদিদের লড়াই কেন?  কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল, মুসলমান শাসকদের নৃশংসতার ইতিহাস চেপে দেওয়া হয়েছে। সেটার দরকার ছিল না। কারন সেই নৃশংসতার পেছনে ছিল তাদের মধ্য এশিয়ার সংস্কৃতি, রাজনীতি। ইসলামের ভূমিকা সেখানে নগন্য । ফলে আজকে সেই ভ্যাকুয়ামের দখল নিচ্ছে হিন্দুত্ববাদি রাজনীতিবিদরা। এই জন্যে ইতিহাসে স্পেডকে স্পেড বলাই ভাল।









গ্লোবালাইজেশন এবং জাতি গৌরব

রাণী পদ্মাবতী মালিক মহম্মদ জায়সীর কল্পনার রাণী-সুতরাং তাকে নিয়ে বানানো সিনেমা নিয়ে দেশজুরে এত হানাহানি কেন - এই প্রশ্ন তুললে, এটাও ঊঠবে যীশু, কৃষ্ণ, মহম্মদ এরাও কেউ বিশুদ্ধ
ঐতিহাসিক চরিত্র নন । তারা বিরাজমান ভক্তের কল্পনায়, ভয়ে ভালোবাসায়। তাদের নিয়ে হানাহানির চোটে ত গোটা বিশ্বটাই এখন বারুদের ওপরে। সুতরাং এ আর নতুন কি?

পদ্মাবতী সিনেমা নিয়ে আপত্তি এই যে খিলজি একজন রাজপুত নারীর সাথে নাচাগানা করছেন স্বপ্নে-সেই সিনেমাটিক লিবার্টি নেওয়া যাবে না? কারন রাজপুত নারীর সাথে মুসলমান পুরুষ নাচলে রাজপুত নারীর মর্যাদা হানি হবে? ইতিহাস কি বলে তাহলে?

মেবারের শিশোদিয়া এবং রনথোম্বরের হাদাস বংশ ছাড়া এমনকোন রাজপুত রাজ বংশ নেই যারা নিজেদের মেয়ের বিয়ে মুঘল বংশে দেন নি। রাজ্যবাঁচাবার দায়ে, রাজ্যবাড়াবার দায়ে মুঘল সম্রাট এবং রাজপুত্রদের কন্যাদান করার জন্য রাজপুত রাজবংশগুলি লম্বা লাইন দিয়েছে এক সময়। আকবরপত্মী চম্পাবতী বা জোধাবাই ( মারিয়াম ), জাহাঙ্গীর পত্মী গোসাইনি -এই ভাবে লিস্ট চালালে, মুঘল হারেমে প্রায় তের জন বেগমের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা রাজপুত কন্যা ছিলেন।

আসলে সবটাই ছিল রয়াল পলিটিক্স।

শাহজাহানের মতন মুঘল সম্রাটরা সেই অর্থে আসলেই ৩/৪ ভাগ রাজপুত ( কারন তার ঠাকুমা এবং মা দুজনেই রাজপুত), ১/৪ ভাগ মুঘল। ইসলামিক আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য রাজপুত মেয়েদের জহরব্রত ঐতিহাসিক কোষ্ঠকাঠিন্য-আসল সত্য এই যে রাজপুত রাজারা নিজেদের গদি বাঁচানোর জন্য, রাজত্ব সুরক্ষার জন্য বরাবরই দিল্লীর মসনদে তাদের রাজকন্যাদের রানী করে পাঠিয়েছেন। এখন এক কাল্পনিক পদ্মাবতীকে নিয়ে টানাটানি করে জহরব্রতর রূপকথাকে লালশালু দিয়ে ঢেকে বাচ্চাদের বাস পুড়িয়ে রাজপুত গৌরব বাড়বে?

মুশকিল হচ্ছে এসব কিছুই সেই অস্তিত্ববাদের সংকট। আসলে এই গ্লোবালাইজেশনের জাদুকাঠিতে রাজপুত, বাঙালী-মাই "খাঁটি আমেরিকান" -সব কিছুইত অবলুপ্তির পথে। ফলে কোথাও এক পদ্মাবতীর কল্পনাকে ঘিরে রাজপুত অভিমানের বেঁচে থাকার চেষ্টা। আমরা বাঙালীরাই কি খুব কম যায় না কি? নেতাজির জার্মান পত্মীকেই অধিকাংশ বাঙালী মেনে নিতে পারে নি ( বিসিরায়
ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে এমিলি শেঙ্কলকে টাকা পাঠিয়েছেন খুব গোপনে )। প্রিয়ংকা চোপড়া রবীন্দ্রনাথ-আন্না তারকরের প্রেম কাহিনী নিয়ে ছবি করবেন-তাই নিয়ে বিশ্বভারতী অসন্তুষ্ট। শোনা যাচ্ছে অনেক চুম্বন দৃশ্য কাটতে বাধ্য করেছে বিশ্বভারতী। বাঙালী পুরুষ ওই ভাবে প্রেম করতে পারে না কি! ছি!! সিনেমাতে আন্না তারকেরকে চুমু খেলে রবীন্দ্রনাথের জাত যাবে ! আপদ কি শুধু রাজপুতরা ? বাঙালীরা না ?

এসবই গ্লোবালাইজেশনের যুগে অস্তিত্বের সংকট! আসলেই আগামী শতাব্দিতে এইসব জাতি-ফাতির আলাদা কোন অস্তিত্ব আর থাকবে না।

সেই যুগের সুপ্রিয়া

আমাদের আগের জেনারেশনটা- মানে আমাদের মা-মাসি, কাকিমাদের গ্যাং উত্তম-সুচিত্রা, উত্তম সুপ্রিয়ার জন্য পাগল। সেই নব্বই দশকে, হ্যাফপ্যান্ট পড়া টিনেজে দূরদর্শনের মাধ্যমে যখন একের পর এক সুপ্রিয়ার সিনেমা গুলো দেখানো হত, মোহমুগ্ধের মতন আমরা তাকে দেখতাম। সুচিত্রার গ্ল্যামার নেই, সেই ষাটের দশকের সিনেমাগুলোতে চড়া মেকাপ ও নিতেন না। কিন্তু তার কমলাক্ষি চোখের বানের হিরন্ময় নীরবতায় শুধুমাত্র নায়কদেরই বিঁধতেন না- তীর হয়ে তা হৃদয়ে ঢুকত আমাদের মতন উঠতি সদ্য গোঁফ গজানো কিশোরদের ও। মেকাপহীন নেক্সট ডোর গার্ল - পাশের বাড়ির সুপ্রীয়া। আশেপাশে সমস্ত মেয়েদের ভীরেই তাকে দেখেছি কখনো!

এর মধ্যেই ক্লাস নাইনে, দূরদর্শনে দেখানো হল ঋত্বিক রেট্রোস্পেক্টিভ। ঋত্বিকের বারোটা সিনেমা নিয়ে। সেই প্রথম পরিচয় মেঘে ঢাকা তারা নীতার সাথে। আসলে উত্তরায়ান বা দুই মনের সুপ্রিয়ার প্রেমে মজা যায়, কিন্ত নীতার চরিত্রটা পশ্চিম বাংলার এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। ওপার বাংলা থেকে উঠে আসা চিন্নমূল পরিবারগুলো কি অভাবে কি যন্ত্রনায় কাটিয়েছে পঞ্চাশ আর ষাটের দশক- সেই দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ কলোনিতে বড় হয়ে ওঠা বাঙাল ফ্যামিলিগুলোর দুই দেওয়ালে কান রাখলেই শুনতে পাবেন। তার ভাল দিক ও ছিল। অভাবের তাড়নায় মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল ফ্যামিলিগুলো বাধ্য হল মেয়েদের অফিস আদালতে কাজ করা মেনে নিতে। তখন অনেক উদবাস্তু ফ্যামিলিতে মেয়েরাই প্রিন্সিপ্যাল ব্রেইড আর্নার। তাদের আয়েই চলে বড় সংসার। তাদের নিজস্ব প্রেম ভালোবাশা আহ্লাদ কিছুই থাকতে নেই-তারা শুধুই সেই সংসারের কূর্ম অবতার।

নায়িকা যতটা নিজের, তার থেকে বেশী ডিরেক্টরের ও। নীতার প্রতিটা ফাইন টেক, ঋত্বিকের আঁকা। সুপ্রিয়া সেখানে যন্ত্রী, ঋত্বিক যন্ত্র। সুপ্রিয়ার ইন্টারভিউতেই শুনেছিলাম, কতটা চোখে জল আনতে হবে, কোন আঙ্গলে আনতে হবে, কিভাবে মুখ ঝটকা দিতে হবে, কতক্ষন তাকাতে হবে, তার সেকেন্ড বাই সেকেন্ড প্ল্যানিং ঋত্বিক তাকে দিতেন। সুপ্রিয়া দশ মিনিট মনে মনে অনেকগুলো অপশন ভেবে, যেটা নিজের ভাল মনে হত, সেটাই করতেন। আসলে রিটেকের পয়সা ছিল না ঋত্বিকের।

ভাবাই যায় না, কোমল গান্ধারের মতন ছবি করার জন্য কোন পরিচালক পাচ্ছিলেন না ঋত্বিক। মাঝা সাঝে একজন এসে কিছু টাকা দেন, শুটিং চলে দুই-পাঁচদিন, তারপরে আবার বন্ধ। কখন টাকা পাবেন তার ঠিক নেই, সুতরাং সুপ্রিয়ার মতন ব্যস্ত অভিনেত্রীকে ডেট দেবেন কি করে ঋত্বিক? সেসবের বালাই ছিল না। কোমল গান্ধারের দুদিনের শুটিং করার টাকা জুটলেই পরের দিন সকালে সোজা সুপ্রিয়ার কাছে হাজির হোতেন ঋত্বিক। সে তিনি শুটিং এর জন্য যেখানেই থাকুন না কেন। শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে ঋত্বিকের সাথে হাওয়া হয়ে যেতেন সুপ্রীয়া। এই ভাবে অনেক কষ্ট দারিদ্রের মধ্যে বানানো ছবি কোমল গান্ধার-অথচ গোটা ছবিটাই ভীষন পজিটিভ। ভাবুন কাল শুটিং করার পয়সা নেই-অথচ কোমলগান্ধারের নাটকের দল পিকনিক মুডে কোরাস গাইছে। কে বলবে মাঝা মাঝে হাতে যা টাকা পেতেন, তাই দিয়ে কোমল গান্ধার বানিয়েছিলেন ঋত্বিক-আর অন্য প্রযোজকদের শুটিং এর ক্ষতি করে, নিজের দুর্নাম হবে জেনেও শুধু ঋত্বিকের জন্যই সব কিছু করতে রাজী ছিলেন সুপ্রিয়া!

উত্তম সুপ্রিয়ার সিনেমাগুলো ষাটের দশক থেকে আশির দশক প্রায় ৭৮ সাল পর্যন্ত ন্যস্ত। একটা অদ্ভত ক্রনোলজি দেখি। সিনেমাগুলোকে তাদের রিলিজ সাল ধরে দেখতে থাকুন। দেখবেন আস্তে আস্তে চড়া হয়েছে সুপ্রিয়ার মেক-আপ, সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উত্তমের ভুঁড়ি। সন্ন্যাসী রাজার উত্তম-সুপ্রিয়ার সাথে শুন বরনারীর উত্তম-সুপ্রিয়ার একযুগের তফাৎ। তবে হ্যা, বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুপ্রিয়ার গ্ল্যামার-আর সেখানে উত্তম কুমার ক্রমশ বেঢপ টাইপের একটা ফিগার নিয়ে সিনেমা করেছেন শেষ বয়সে।

অভিনেত্রীদের মৃত্যু নেই। একটা সময়কে ধরে রেখেছেন সুপ্রিয়া। ভাবী কালের বাঙালী প্রজন্ম হয়ত সুপ্রিয়ায় ঢুব দেবে না-কিন্ত তাদেরও জানা দরকার, কিভাবে বড় হয়েছে তাদের দাদু দিদিমারা।

Sunday, January 21, 2018

হিন্দুত্ববাদিদের নতুন জোকার নায়েক-সত্যপাল সিং

সত্যপাল সিং ভারতের মানবসম্পদ রাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবী ডারউইনের বিবর্তন তত্ব ভুল, গোঁজামিল। স্কুল সিলেবাস থেকে তুলে দেওয়া উচিত। মানবসম্পদকে মানবআপদ বানানোর এমন ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রকাশ করে মন্ত্রীমশাই এখন সংবাদ শিরোনামে।

অন্যকোন গোনন্দন বাহন এমন উক্তি করলে, পাত্তা না দিলেও চলত। কিন্ত উনি হচ্ছেন মানবসম্পদ মন্ত্রী-স্কুল সিলেবাস থেকে ডারুইনকে তোলার চেষ্টা করতেই পারেন। এবং করবেনই না বা কেন। আমেরিকাতে গত দশকে রিপাবলিকান অনেক রাজনীতিবিদ, যাদের ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রীষ্ঠানদের ভোটে জিতে আসতে হয়- তারা অসংখ্যবার চেষ্টা করেছেন আমেরিকার স্কুল সিলেবাস থেকে ডারুইনকে মুছে দিতে। তবে তারা প্রতিবার অসফল-কারন আমেরিকার ধর্মনিরেপেক্ষ সংবিধান তাদের বিরুদ্ধে ঢাল হিসাবে দাঁডিয়ে গেছে। অসংখ্য মামলা মকদ্দমার পরে, অসংখ্য বিজ্ঞানীরা আদালাতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য প্রমান দেবার ফলে আমেরিকাতে ধর্ম উন্মাদরা আপাতত আর ডারুইনকে নিয়ে ঘাঁটায় না।

পাকিস্থান এবং বাংলাদেশের সেই সৌভাগ্য হয় নি। অধিকাংশ মুসলিম দেশের ছাত্রছাত্রীদেরই সেই সোভাগ্য নেই-কারন মুসলমান দেশগুলির অধিকাংশই ইসলামিক রাষ্ট্র। ফলে "কোরানের সাথে সাংঘার্ষিক" এই অজুহাতে মুসলিম দেশগুলিতে স্কুল সিলেবাসে ডারুইন বাতিল । মনে রাখা উচিত, বায়োলজির সব থেকে গুরুত্বপূর্ন সাবজেক্ট হচ্ছে বিবর্তনবাদ। সেটা না শিখেই মুসলিম দেশগুলি থেকে ছেলেমেয়েরা বায়োলজির ডিগ্রি পায়-তারা যে কি শেখে আল্লা মালুম! এবং সুশিক্ষিত মুসলমানরাও এই ব্যপারে নীরব-কারন বাকী সবার মতন তারাও ইষ্ট হ্যাপী জনগণ-নিজের পেট, সংসার নিয়েই বেশী ব্যস্ত- সন্তান ধর্মীর শিক্ষার কারনে ব্রেইন ওয়াশড হচ্ছে-ফলে ভবিষ্যতে আই সিস প্রচারকের খপ্পরে এসে সন্ত্রাসবাদি হয়ে উঠতে পারে-সেই টুকু বুদ্ধিও তাদের নেই। কারন এই ধরনের সন্ত্রাসবাদিদের বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তিবাদি মনই বিরোধিতা করতে পারে। আর বিবর্তন স্কুল থেকে তুলে দেওয়া মানে ছাত্রছাত্রীদের যুক্তির মাজাটাই ভেঙে দেওয়া।

ডারুইনের ওপরে কোরান, বাইবেল সবার রাগ। কারন বিবর্তন বিজ্ঞান একবার কেউ জানলে, আব্রাহামিক ধর্মগুলো তার কাছে রূপকথার গল্প বলে মনে হবে। ধর্মান্ধ খ্রীষ্ঠান এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভ্রান্ত যুবকেরা ইন্টারনেট ভর্তি করে দিয়েছে বিবর্তনের বিরুদ্ধে অজস্ত্র অভিনব "গবেষনা পত্রে" । যদিও বাস্তব সত্য হল এই সব শিক্ষিত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আমেরিকার বিজ্ঞান সমাজ একসময় রুখে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যদি বিবর্তনের বিরুদ্ধে কারুর কিছু প্রমান থাকে তাহলে তারা সেটা বিজ্ঞানের জার্নালে পাঠাক। সেটা হবার না। কারন বিবর্তন এতটাই সুপ্রতিষ্ঠীত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব-যে তার বিরুদ্ধে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষনা পত্র কেওই দিতে পারবে না। কেউ পারেও নি। এদের সব "ডারউইন বিরোধি গবেষনা ইন্টারনেটেই পাওয়া যায়"-কোন বিজ্ঞানের জার্নালে পাবেন না।

মনে রাখতে হবে বৈজ্ঞানিক সত্য কখনোই পরম সত্য না । বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেই সত্যে ভেজাল থাকবেই-কিন্ত সেই ভেজালকে আস্তে আস্তে কমানোই বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক কাজ। ডারউইনের তত্ত্ব ব্যতিক্রম না। বিবর্তনের ওপরে এখনো অনেক কাজ চলছে-ডারুইন যে বৃক্ষশাখায় বিবর্তনের ধাপ গুলো দেখেছিলেন-নব্য গবেষনাতে নতুন বৃক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। কিন্ত তার মানে বিবর্তন বিজ্ঞান ভুল না-তার মানে এই যে প্রতিদিনই এই শাখাটি আরো উন্নত এবং সঠীক জ্ঞানের সন্ধানে রত। আরেকটা আবদার অনেক মিসিং লিংক নেই। খুবই অশিক্ষিত ধরনের যুক্তি। কারন বর্তমানের বিবর্তন চর্চা -ডি এন এ নির্ভর। যেহেতু ডি এন এ সিকোয়েন্সিং থেকেই যেকোন প্রানীর বিবর্তন বৃক্ষটী খুব ভাল করে বোঝা যায়।

আমি বহুদিন থেকেই লিখছি, হিন্দুত্ববাদ মানে হচ্ছে হিন্দু ধর্মকে ইসলাম-২ ভার্সনে রুপান্তরিত করা। এদ্দিন পর্যন্ত হিন্দুত্ববাদিরা অন্তত ডারুইনের বানরের লেজ টানেন নি। ওদের মধ্যে একটা জাকির নায়েকের কমতি ছিল যে মানুষের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে , তার নিজের ধর্মের লোকেদের অন্ধকূপে ফেলবে। জাকির নায়েকের একটা হিন্দু ভার্সন না পাওয়া গেলে, হিন্দুত্ববাদিদের ইসলাম-২ তে রূপান্তর সম্পূর্ন হচ্ছিল না- সত্যপাল হতে পারেন হিন্দু ধর্মের সেই জোকার ফিগার।

তবে আশার কথা, ফেসবুকে দেখলাম, আমার পরিচিত অনেক শিক্ষিত বিজেপিই সত্যপালকে গাল দিচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে ভাল দিক। তবে গুজরাতের স্কুল সিলেবাসে হিটলার এবং নাজিদের প্রশংসা করে যেসব চ্যাপ্টার আছে-তার বিরুদ্ধে ইনারা নীরব। অবশ্য এব্যাপারে শুধু হিন্দুত্ববাদিদের দোষ দিই না। পশ্চিম বঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই লেনিন-স্টালিন নামে শতাব্দির দুই কুখ্যাত খুনীর ভজনা, তাদের নামে রাস্তা ধূপজপ সবই চালু আছে।

আমি এই প্রসঙ্গ এই জন্যেই তুললাম যে স্কুলে ছাত্র অবস্থা থেকে বাচ্চাদের মাথার দখল নিতে উদ্যত অসংখ্য রাজনীতি-ধর্ম ব্যবসায়ী। এর বিরুদ্ধ সংহত প্রতিবাদে সাধারন মানুষকেই অংশ নিতে হবে। সতপাল সিং এর বিরুদ্ধে সাধারন বুদ্ধিমান মানুষ প্রতিবাদে ফাটছে-অথচ কংগ্রেস নীরব-ধর্মীয় ভোট হারানোর ভয়! গুজরাতের সিলেবাসে হিটলারের প্রশংসার বিরুদ্ধেও নীরব কংগ্রেস! সুতরাং সাধারন মানুষের প্রতিবাদই একমাত্র ভরসা।

Sunday, December 31, 2017

অস্তিত্ববাদের দৃষ্টিতে আরেকটি বছর

এই মহাবিশ্বের বয়স ১৩৭৭ কোটি বছর। পৃথিবীর জন্ম ৪৫৪ কোটি বছর আগে। মানুষ এল সেইদিন - খুব বেশী হলে দুই লাখ বছর আগে।

এই অনন্ত চক্রে ২০১৮ আরো একটি এডিশন- কি যায় আসে! কিন্ত আমাদের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়ার কুয়োর মহাবিশ্বে, একটা বছর অনেকটাই। সেই অনুন্নত প্রযুক্তির যুগে মাত্র এক বছরেই গোটা গ্রীসকে একত্রিত করেছেন আলেক্সজান্ডার। পরের বছর জয় করেছেন মিশর, পারস্য। সেই কালেও এক বছর ছিল অনেক। মুশকিল হচ্ছে আমরা আলেক্সান্ডার নই- ভাঙা গড়ার সুতীব্র ইচ্ছা আমাদের নেই- আছে শুধু গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে পিঁপড়ের জীবন মৃত্যুচক্রে একটা ফুঁটকি হয়ে বেঁচে থাকা।

এক্সিস্টেন্সিয়ালিজম বা অস্তিত্ববাদের সমস্যা সবাইকেই নাড়া দেয়। কখনো জ্ঞাতে অজ্ঞাতে। জীবনের আসলেই ত কোন পরম উদ্দেশ্য নেই। তাহলে কিসের জন্য বেঁচে থাকা? মৃত্যু আসবেই, এই ভেবেত আর বেঁচে থাকা যায় না। পরম বিশ্বাসীদের এই সমস্যা নেই-তাদের জন্য আছে জন্নত, স্বর্গ, পরজন্মের হাতছানি। আমাদের মতন নিধার্মিকদের সেই আশা ভরসার জায়গাটাও নেই-এটাই জীবন - এই জীবনেই যতটুকু পাওয়া তার চেষ্টা করে যেতে হবে।

আলটিমেটলি জীবনটাই হচ্ছে সেই তালা খোলার চেষ্টা করা যার চাবি আমার কাছে নেই। কিন্ত চেষ্টাটা করে যেতে হবে, কারন নইলে সময় কাটবে না। শুধু আশাটা রেখে যেতে হবে- তালাটা খুললেও খুলতে পারে কোনদিন। ঠিক এই কারনেই কমিনিউস্ট, হিন্দুত্ববাদি বা ইসলামিস্টরা ক্রমশ র‍্যাডিক্যাল হয়ে ওঠেন- কারন তাদের দৃঢ় ধারনা- তাদের দর্শনে ওই চাবিটা আছে-বাকী কারোর দর্শনে নেই! আর যতই তারা হতাশাই ভুগতে থাকেন যে চাবিটা কিন্ত পাওয়া যাচ্ছে না- তারা বুঝতে চান না, চাবিটাই নেই-তারা আরো র‍্যাডিকাল বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যে বিশ্বাসের গভীরতাই সেই চাবি আসিবে। কিন্ত না, আসে না। আসে মৃত্যু। আসে ধ্বংশ। আসে হতাশা।

সবটাই ছলনা। শ্রী রামকৃষ্ণের যত মত তত পথের আসল মানে হল- যত মত তত পথে ভুলিয়া থাক-চাবি আসিবেই। যত মত তত আলেয়ার আশা- চাবি মিলিবেই।