Saturday, July 15, 2017

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং স্কুল লেভেল থেকেই শেখা ভাল

 আমার আগের লেখাটার ( ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরির ভূত ভবিষ্যত) পরিপ্রেক্ষিতে এটা ক্ল্যারিফিকেশন নোট। অনেকেই জানিয়েছেন, “কোর” ইঞ্জিনিয়ারদের ভবিষ্যত কি ( যেন তাদের প্রোগ্রামিং জানার দরকার নেই) বা ছোটবেলা থেকে কম্পুটার ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে কি হবে?

বাচ্চাদের  ছোটবেলা থেকে কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ কেন শেখানো উচিত -আমার এই সিদ্ধান্তে পেছনে, অবশ্যই আমার নিজের অভিজ্ঞতা।  আমেরিকাতে এখন সরকারি স্কুলগুলোতে ক্লাস সেভেন থেকে শেখাচ্ছে-তবে তা ইলেক্টিভ।

(১) আমি যতটুকু শিশুমনের সাথে পরিচিত-ওরা নিজেরা কিছু করতে ভালবাসে- যা এবস্ট্রাক্ট না-নিজেরা খেলার ছলে পরীক্ষা করে দেখতে পারে। প্রোগ্রামিং শেখালে ওরা নিজেরাই নিজেদের মতন করে নানান খেলা তৈরী করতে পারবে।  বাচ্চাদের প্রোগ্রামিং শেখানো হয় এখন ওই গেম তৈরী খেলার ছলেই।  চোখের সামনেই ওরা দেখে ওদের “সৃষ্টি” কেমন আলাদিনের প্রদীপের মতন “ম্যাজিক” দেখাচ্ছে।
এমনিতেই আজকালকার বাচ্চারা ভিডিও মোবাইল গেমে প্রচুর সময় নষ্ট করে, যা তাদের মানসিক বিকাশের সহায়ক ত নয়ই, বরং নেশাটা ড্রাগ এডিক্টের মতনই খারাপ। ওদের একটা খেলা দরকার, যা খেলে, ওরা শিখবে।
প্রথম কারনটা অবশ্যই পজিটিভ ইনভল্ভমেন্ট।

(২) বাচ্চাদের সামনে আপনি রোল মডেল হিসাবে কাকে তুলে ধরবেন? আমি যেহেতু আন্তারপ্রেনার, আমার সামনে রোল মডেল নিঃসন্দেহে বিল গেটস, স্টিভ জবস, মার্ক জুকারবার্গ।  পৃথিবীকে এরাই বদলেছেন বেশী গত ত্রিশ বছরে। এদের বায়োগ্রাফিতে অনেক জিনিস কমন 
     -কেউ পড়াশোনা বা ডিগ্রি কমপ্লিট করেন নি-এদের সবাই ড্রপ আউট। এরা এই পোষাকি ব্যাচেলর, মাস্টার্স বা পিএইচডি ডিগ্রির ধার ধারেন নি।
    - এবং সবাই ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, প্রসেসর প্রোগ্রামিং শিখেছেন -এবং সেগুলোই ছিল এদের বাল্যকালের “অবশেসন”।  ছোটবেলায় ইলেকট্রনিক্স এবং কম্পিঊটারের সাথে এদের শুধু পরিচিতিই ছিল না-এরা ছিলেন খুদে মাস্টার। স্টিভ জবস যখন ক্লাস এইটে, বিশ্ববিখ্যাত জেরক্স কোম্পানী তাকে ইনটার্ন হিসাবে নিয়েছিল মাইক্রোপ্রসেসর সারানোর জন্য! মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে বিল গেটস কম্পুটার প্রোগ্রামিং এ তুখোর ছিলেন যখন গোটা আমেরিকাতেই কম্পুউটারের সংখ্যা হাতে গোনা যেত। 
     এরা যে অনায়াসে হার্ভাডের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের ( হার্ভাডের র‍্যাঙ্কিং গোটা বিশ্বের নাম্বার ওয়ান-যেখানে ভারতের কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম একশোতেই নেই!)  কম্পিউটার সায়েন্সের বিটেক ডিগ্রিকে লাথি মারতে পেরেছেন-তার কারন একটাই।  এরা কম্পুটার সায়েন্স এতটাই ভাল জানতেন, ডিগ্রির দরকার ছিল না এদের। চাকরির ও না। পাশ আউট করার আগেই বিল গেটস, নিজের ওপারেটিং সিস্টেম লিখে সেটা বেচেও দিয়েছেন একটা বড় কোম্পানীকে।

 ছোট বেলা থেকে প্রোগ্রামিং না শিখলে, এসব হত না।

(৩)  আমার নিজের অভিজ্ঞতাটা লিখি। কর্মসূত্রে অসংখ্য ছোট ছোট স্টার্টাপের ফাউন্ডারদের সাথে আমার আলাপ। আধুনিককালে  আমেরিকাতে “সফল” টেক স্টার্টাপের সংখ্যা যদি দেখি, তাদের ফাউন্ডারদের অধিকাংশই নিজেরা খুব ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারে দক্ষ। যারা শুধু ব্যবসায় সাফল্য পেয়েছেন, তারা ব্যবসাটা ছোট বেলা থেকেই করছেন।
 পরের দিকে এসে শিখে, লোকে সফল হয় নি এমন না। তবে সংখ্যাটা কম।

 আমি নিজে প্রোগ্রামিং শিখেছি পিএইইচডির শুরুর দিকে, মানে তেইশ বছর বয়সে। এই নয় যে বেশী বয়সে ওটা শেখা যায় না। অবশ্যই যায়। কিন্ত সেটা প্রশ্ন না। প্রশ্ন হচ্ছে কোন লেভেলে শিখলে সে নিজেই নতুন কিছু করার ক্ষমতা রাখবে?
 ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার তিনটে লেভেল আছে।

   এক চাকরির জন্যে শেখা-যেখানে খুব বেশী না শিখলেও চলে।
 দুই পড়ানোর জন্য বা শিক্ষকতার জন্য শেখা-সেখানে আরেকটু বেশী শিখতে হয়,

  তিন -নিজে প্রোডাক্ট বানানোর জন্য শেখা।  লেভেল এক দুই এর সাথে তিনের পার্থক্য আকাশ পাতাল।

 লেভেল থ্রিতে পৌছাতে গেলে, কম্পুটার প্রোগ্রামিং ছোটবেলা থেকেই শুরু করতে হবে।

(৪) অনেকে বলছেন যারা বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী বা “কোর ইঞ্জিনিয়ারিং” এ যাবে তাদের ও শিখতে হবে? উত্তর হচ্ছে হ্যা। কারন এটা একটা  নতুন ভাষা শিক্ষা, যার প্রয়োজন সর্বত্র। আমি নিজেও কোর ইঞ্জিনিয়ারিং এই কাজ করি-এবং সেখানেও নতুন যা কিছু হচ্ছে, তা সিম্যুলেশন এবং অটোমেশন নির্ভর। সেখানে প্রোগ্রামিং এবং ম্যাথেমেটিক্স ছাড়া গতি নেই। ব্যবসাও আস্তে আস্তে বিজনেস আনালাইটিক্স নির্ভর । সেখানেও ভাল অঙ্ক না জানলে কিস্যু হবে না।

অনেকেই কোর ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার ছলনায়, প্রোগ্রামিং শিখতে চায় না। এটা ভুল পদক্ষেপ।  সিমুলেশন এবং অটোমেশনের দৌলতে কোর ইঞ্জিনিয়ারিং এখন প্রোগ্রামিং নির্ভর।

প্রযুক্তির কাঁধে ভর দিয়ে দিন বদলাচ্ছে দ্রুত। আপনারা যেভাবে করে খাচ্ছেন, আজ থেকে দশ বিশ বছর বাদে, নতুন প্রজন্ম সেই ভাবে টিকবে না।  আস্তে আস্তে  টিসিএস, ইনফি ইত্যাদি বড় বড় কর্পরেশনের অস্তিত্বই থাকবে না-যদিও থাকে, তা থাকবে শুধু মাত্র  টেকনোলজি ইন্ট্রিগ্রেটর হিসাবে-যেখানে কর্ম সংস্থান হবে কম, খুব কম। অধিকাংশ  ছেলেমেয়েরা নতুন নতুন প্রোডাক্ট এবং সার্ভিস ডিজাইন করেই জীবিকা নির্বাহ করবে। এটা ভাল দিক। কিন্ত সেই ক্ষেত্রে যারা ছোটবেলা থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখেছে বনাম যারা মুখস্থ করে ডিগ্রি নিয়েছে, তাদের পার্থক্য অনেক।

 আর এটা ভবিষ্যত না বর্তমান। আমেরিকা এবং ভারতে আমি সেই সব আন্তারপ্রেনারদের দেখা পাচ্ছি, যারা ছোট বেলা থেকেই কোম্পানী খুলে বসে আছে, প্রোডাক্ট বানাচ্ছে। অনেকেরই কোন ডিগ্রি নেই। আর তাদের হয়ে কাজ করছে ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়াররা।

শিক্ষিত- সেত বাজারে মেলে ভুরিভুরি।
প্রতিভা- সেটাও বাজারে অনেক।

সাফল্যের রসায়ন দুটো- প্যাশন এবং পারসিভ্যারেন্স ( কোন কিছু ভালবেসে করা এবং লেগে থাকা)। 

শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং কেন-কবিতা, সাহিত্য, সিনেমা বানানো, ডাক্তারি, ওকালতি কোন কিছুই নিবিড় চর্চা ছাড়া হয় না। ৫% প্রতিভা, ৯৫% গায়ের ঘাম ঝড়াতে হয়।


এগুলো শিশু বয়সে বাচ্চাদের মধ্যে ঢোকাতে গেলে, তাদের এমন কিছু দিতে হবে, যাতে তারা এই দুটো গুনের অধিকারী হয়। 

Saturday, July 8, 2017

ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরির ভূত ভবিষ্যত!

(১)
 ভারতের আই টি শিল্পে কর্মী ছাঁটাই অব্যহত। এখন যা হচ্ছে, তা হিমশৈলের ভাসমান অংশমাত্র। আমেরিকাতে আমার যেসব বন্ধু সার্ভিস সেলসে আছেন-তাদের অনেকের কাছ থেকেই শুনছি ট্রাম্প জমানা আসাতে অনেক ডিল হয় বাতিল, না হলে পেছোচ্ছে-নইলে  কাজ পাচ্ছে স্থানীয় আমেরিকান কোম্পানী। সেলস পাইপলাইন শুকানোর দিকে। এখনো বড়সর কিছু লে-অফ হবে না। কিন্ত আস্তে আস্তে আই টি ইঞ্জিনিয়ারদের ওপরে অটোমেশন এবং ট্রাম্পের গিলোটিন ঝপাৎ করে নামার অপেক্ষায়।

  ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং পেশাটার ভবিষ্যতই প্রশ্নের মুখে। অনেক বাবা মা যাদের ছেলেমেয়েরা উচ্চমাধ্যমিক দিচ্ছেন তারাও আমাকে জিজ্ঞেস করছেন। আবার যাদের ছেলেমেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, তাদের কপালেও চিন্তার খাঁজ। টিসিএস, ইনফি এরা ক্যাম্পাসিংএ না এলে, ফ্রেশার না নিলে কি ছেলেটার ভবিষ্যত কি?  যারা এই পেশাতে আছে, তারাও আমাকে ইনবক্স করছেন। ফলে বহুদিন থেকেই ভাবছিলাম এই ব্লগটা লিখব। বিশেষত আমরা যখন উচ্চমাধ্যমিকে, ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা নিয়ে স্বচ্ছ ধারনা ছিল না কারুর। এখনো অবস্থার পরিবর্তন হয় নি। সব থেকে বড় কথা, এখন যে কাজগুলো করে আমরা খাচ্ছি, সেইসব পেশার অস্তিত্বই ছিল না তখন। ইঞ্জিনিয়ারিং এ এটাই সব থেকে বড় কথা। প্রযুক্তির গতি এখন তীব্র। প্রতি দুই তিন বছরে বদলে যাচ্ছে টেকনোলজি প্ল্যাটফর্ম। ট্রেন ধরতে লেট করলেই ভোকাট্টা ঘুরির মতন মার্কেট থেকে  আছড়ে  মাটিতে।

 তবে এর মধ্যেও শান্তনা এটা যে ভাল ইঞ্জিনিয়ারের অভাব এখনো সুতীব্র। ভারতে প্রতি কুড়িটা ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে একজন পাতে দেওয়ার যোগ্য। একশো জনে একজন পাওয়া যায়, যাকে আন্তর্জাতিক মানে ডিস্টিংশন দেওয়া যায়। ফলে যারা খুব খেটে প্যাশনেটলি কোডিং শিখছে, নিজের সাবজেক্ট শিখছে, নানান প্রোডাক্ট ডিজাইনে অংশ নিচ্ছে-তাদের কোন চিন্তা নেই। কিন্ত যারা বিটেকের চারটে বছর গায়ে হাওয়া দিয়ে ঘুরে আগে ক্যাম্পাস নামিয়ে দিত-দুর্দিন তাদের।


  (২)
  এবারে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা এবং তার হালচাল নিয়ে কিছু ধারনা করা যাক। প্রযুক্তি মানেই যন্ত্রের সাহায্যে মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো সহজ, সুন্দর এবং নিরাপত্তা দেওয়া। এর বাইরে কিছু হয় না। এই পেশাতে সব কিছুই লাগে-বিজ্ঞান, গণিত, আর্টস, ডিজাইন, অর্থনীতি, একাউন্টিং।  ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা বলে আলদা কিছু নেই-এটাও ডাক্তারদের মতন অভিজ্ঞতাবাদ বা এম্প্রিরিসিজম। অভিজ্ঞতা লদ্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগানো।

   ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার সেই অর্থে কোন গ্ল্যামার ছিল না।  পাবলিক সেক্টরে ভাল মাইনের চাকরি পেলেই অনেকেই বর্তে যেত। ১৯৯১ সাল থেকেই চাকা ঘোরে। মনমোহন সিংহের উদারনীতির জমানায় ভারতে ঢোকে একাধিক আমেরিকান কোম্পানী। এর সাথে সাথে আমেরিকাতে শুরু হয় কম্প্যুটার ইন্ড্রাস্ট্রির বুম। ১৯৯৫ সাল থেকে সিলিকন ভ্যালিতে শুরু অসংখ্য ইকর্মাস স্টার্টাপ। এরা এমন সব মাইনে দেওয়া শুরু করল, যা নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ভারতে কেউ ভাবতেও পারত না আগে।  আমার মনে আছে সেই ১৯৯৩-৯৫ সালে কেডেন্স, সান সিস্টেম এরা আই আই টি ক্যাম্পাসে বছরে সাত লাখ টাকার প্যাকেজ নিয়ে আসে। যা তখন ছিল অকল্পনীয়। কারন আই আই টির সিনিয়ার অধ্যাপকদের বার্ষিক বেতন তখন পাঁচ লাখের নীচে।

   এর পরে আমেরিকাতে আই টি শিল্পের চাহিদা যত বেড়েছে-ভারতের আই টি কোম্পানী গুলি ফুলে ফেঁপে উঠেছে । কারন আমেরিকাতে অত আইটি কর্মী ছিল না-এখনো নেই। ১৯৯৩ সাল নাগাদ ক্লিনটন গ্যাট চুক্তি সাইন করেন। প্রেসিডেন্ট  ক্লিনটন গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ছিলেন। ফলে উনার আমলে আই টি কর্মীদের আমেরিকাতে নিয়ে আসা সহজ করতে এইচ ওয়ান বি ভিসা চালু হয়। যার অধিকাংশ পেয়েছে ভারতীয়রা।

 ১৯৯৫-২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় আই টি শিল্পের স্বর্নযুগ।  পৃথিবীর সব দেশেই ভারতীয় আই টি কর্মীদের চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। আই টি শিল্পের সাপ্লাই লাইন বজায় রাখতে ভারতে গজিয়ে ওঠে অসংখ্য প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। সাথে সাথে বেড়েছে মাহিনাও। বিশেষত যারা অভিজ্ঞ। এন্ট্রি লেভেল মাইনে একই থেকেছে।

  আমেরিকাতে ২০০৭-৮ এর অর্থনৈতিক মন্দায় ভারতীয় আই টি প্রথম ধাক্কা খায়। যদিও আমেরিকা প্রচুর ধার করে, অর্থনীতি ফিরিয়ে নিয়ে আসে আগের যায়গায়, আই টি শিল্পের জগন্নাথ রথ পাঁচ টি গাড্ডায় হোঁচট খায়।
   
            -- অর্থনৈতিক মন্দার আগে, আমেরিকাতে শিক্ষিত লোকজন এত ভারতীয় বিদ্বেশী ছিল না। ভারতীয়রা চাকরি নিয়ে যাচ্ছে এটা রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিনত হয় নি। এর কারন আছে। ২০০১-২০০৭ পর্যন্ত আমেরিকার রিয়াল এস্টেট বাড়ছিল হুহা করে। ফলে বাড়ির দাম, স্টকের দামের হুহু করে বাড়তে থাকায়, মোদ্দা কথা পকেট ভারী থাকায়, ভারতীয়রা চাকরি নিয়ে গেলেও কেউ আন্দোলনে নামে নি।। নিজেদের ফূর্তির টাকা এসে গেলে আমেরিকানরা খুশ-কিন্ত না এলেই তারা ভয়ংকর।  অর্থনৈতিক মন্দার পরে, আমেরিকার অর্থনীতি স্বাভাবিক হল-কিন্ত যাদের চাকরি গেছিল-অনেকেই চাকরি ফিরে পেল না। জবলেস রিকভারি। এরাই আস্তে আস্তে সংগঠিত হতে থাকে ভারত এবং চীনে আউটসোর্সিং এর বিরুদ্ধে। গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এই রাগ কাজে লাগিয়ে এলেন ট্রাম্প-ফলে আউটসোর্সিং এর পক্ষে যেতে ভয় পাচ্ছেন আমেরিকান সিইওরা।

   - দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং লাইফসাইকল। যেকোন ইঞ্জিনিয়ারিং জিনিস যখন মার্কেটে আসে-প্রথমে প্রচুর স্কোপ থাকে। আস্তে আস্তে সব কিছু স্টান্ডার্ডাইজ করা হয়। এর ফলে পুরো জিনিসটা একদম ছকে ফেলে প্রোডাক্ট-অটোমেশন করা সম্ভব। যে কাজের জন্য ২০০৫ সালে পঞ্চাশ জন লাগত, এখন লাগে তিন জন। কিন্ত তারপরেও অসুবিধা নেই। নতুন নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোডাক্ট বা প্রযুক্তি বাজারে আসতেই থাকে। নতুন ইঞ্জিনিয়ারদের সেই নতুন প্রযুক্তিতেই সংস্থান হয়।

  -  তৃতীয় সমস্যাটা এই নতুন প্রযুক্তি থেকেই উদ্ভুত। ২০১২ সালের মধ্যে বলতে গেলে আমেরিকা এমন কি ভারতেও সব বিজনেসে কোন না কোন আই টি প্ল্যাটফর্ম আছে। সেসব চালাতে বেশী লোক লাগে না।  মার্কেটের নতুন দাবী হচ্ছে এই যে এত ডেটা আসছে সেটা কাজে লাগিয়ে বিজনেসটা বাড়াও। মানে সেলস বাড়ানোর জন্য তথ্য বিশ্লেষন কর। সাপ্লাইচেইন ভাল করার জন্য ডেটা সায়েন্স। ইত্যাদি।  সেখানেই এখন প্রজেক্ট বেশী।  মুশকিল হচ্ছে, ভারতের অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ার এই ধরনের কাজের জন্য তৈরী না। কারন এরা অঙ্ক, কম্পুটার সায়েন্সের গভীর ফান্ডামেন্টাল এবং পরিসংখ্যানবিদ্যা বা স্টাটিসস্টিক্স শেখে না ভাল করে কলেজে। ফলে তাদেরকে এই কাজের জন্য রিস্কিলিং করা দুঃসাধ্য। সেটাই মূল সমস্যা এখন।

  -চতুর্থ সমস্যার উৎ্পত্তি তৃতীয় সমস্যা থেকেই। ভারতে  শিক্ষার মান নিম্নগামী। এর কারন শিক্ষার বেসরকারিকরন। আমেরিকাতে যেখানে অধিকাংশ ছাত্ররা সরকারি স্কুলে যায়, ভারতে মেট্রোশহরগুলোতে সব প্রাইভেট স্কুল। সেখানে না আছে ভাল টিচার-না হয় পড়াশোনা। শুধু মার্কস ওঠে। আর এই যে এনালাইটিক্যাল কাজের বিরাট মার্কেট তৈরী হয়েছে, সেখানে চিন্তাশীল ছাত্রছাড়া জাস্ট গাঁতানো লোকজন দিয়ে কিস্যু হবে না। কারন প্রতিটা পরিস্থিতি আলাদা। ্পরিস্থিতি বুঝে সমাধান করার অভ্যেস ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের একদম নেই।

 মোদ্দা কথা ইঞ্জিনিয়ারিং এমন একটা পেশা যেখানে আজ একটা প্রযুক্তি, কাল অন্য প্রযুক্তি আসবে। এবং নতুন প্রযুক্তিতেই নতুন ইঞ্জিনিয়ারদের সংস্থান হবে। এটাই নিয়ম। কিন্ত সেখানে অসুবিধা হচ্ছে কারন এখন এই নতুন প্রযুক্তি বোঝার মতন যে ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার, সেটা অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রছাত্রীদের নেই।

 - আর শেষ সমস্যাটা ম্যানেজারদের নিয়ে। ভারতের সমাজে বর্ণবাদের প্রভাব খুব গভীরে। ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজাররা ছড়ি ঘোরাতে ভালবাসে, নিজেরা একবার ম্যানেজার হয়ে গেলে নিজেদের ব্রাহ্মন আর অধীনস্থদের শুদ্রভাবে। ফলটা এই যে-নিজেরা প্রযুক্তি শেখা ছেড়ে দেয়। যার জন্য ভারতের মিডল ম্যানেজারদের একবার চাকরি গেল , নতুন করে তাদের চাকরি পাওয়া মুশকিল। কারন তারা ইঞ্জিনিয়ারিং সব ভুলে গেছে।  ইঞ্জিনিয়ারিং পেশাতে ওটা নৈবচ।

 (৩) তাহলে উপায় ?

 যারা ইঞ্জিনিয়ারিংকে পেশা হিসাবে নিতে চাইছে, তাদের প্রথম কর্তব্য এটা বোঝা, শিক্ষাব্যবস্থা, নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং চাহিদার জন্য সম্পূর্ন ফেলিওর। সুতরাং প্রস্তুতি এই ভাবে নিতে হবে

            - মিডল স্কুল ( সিস্ক সেভেন )  থেকে কোডিং শিখতে হবে
           -স্টাটিস্টিক্স, ম্যাথ এবং এলগোরিদম শিখতে হবে ক্লাস ফাইভ থেকেই । খান একাডেমি থেকে অনেক সংস্থাএখন ফ্রিতে কোডিং এবং এলগোর কোর্স দিচ্ছে।
            -সাথে সাথে কম্পুটারাইজড ডিজাইনের -যেমন এডব ফটোশট ইত্যাদি শেখা ভাল।
            - ক্লাস এইট নাইন থেকে ছোট ছোট আই টি কোম্পানী গুলির সাথে যুক্ত হয়ে পা্ট টাইম
   ইনটার্নশিপ শুরু করা ভাল।
     -ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ঢুকলে, সেখানে যে সাবজেক্টটাই নাও, সেটা ভাল করে শেখা উচিত। আগে দরকার ছিল না। এখন আছে। স্টাট, ম্যাথ, কম্পুটার সায়েন্স, ইলেকট্রনিক্স, ফিজিক্স-এই সাবজেক্ট গুলো যারা নেবে এবং "শিখবে" -তাদের এডভ্যান্টেজ।

 বর্তমানে যেভাবে ছেলেমেয়েরা আট নটা টিউশুনি করতে দৌড়াচ্ছে মার্কস তোলার আশায়-তারা এইসব কি করবে জানি না। তবে না করলে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিছিয়ে যাবে। কারন তারা যখন মার্কেটে আসবে, প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হবে।

   (৪)
 ইঞ্জিনিয়ারিং পেশাতে সংকট নেই। গোটা পৃথিবী চলছে প্রযুক্তির চাকায়। প্রচুর টাকা এখন ইঞ্জিনিয়ারিং এ। আমেরিকা সহ পৃথিবীর সব থেকে লাভ করা প্রথম পাঁচটা কোম্পানীর জন্ম হয়েছে গত কুড়ি বছরে ( আমাজন, গুগল, আপেল, নেটফ্লীক্স, ফেসবুক)।  সুতরাং ইঞ্জিনিয়ারিং পেশাতে মাইনে চক্রবৃদ্ধি হারে  বেড়েছে এবং বাড়বে। স্টার্টাপ করে ধনী হওয়ার সুযোগ ও বেশী।  সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ঢোকানো, শিল্পের কদর এখানে সম্ভব।  পেশা হিসাবে নতুন যুগের ইঞ্জিনিয়ারিং আগের যুগের থেকে অনেক বেশী চিত্তাকর্ষক, উদ্ভাবনমুখী এবং বৈভবশালী।

 সংকট এবং সমস্যা একটাই-এত দুর্বল শিক্ষা নিয়ে এই পেশাতে আসলে। নতুন যুগের ইঞ্জিনিয়ারিং এ কিস্যু হবে না। চাকরিই পাবে না। কেউ নেবে না।

  দুদিন আগেও রাম শ্যাম যদু মধু-সবাই ইঞ্জিনিয়ারিং এ চাকরি পেত। কারন যেটুকু শিখতে হত, তা একজন ক্লার্ককেও শিখতে হয় না । সেসব কাজ এখন অটোমেটেড।  হয়ে গেছে বা হবে। সুতরাং দরকার সৃজনশীল ইঞ্জিনিয়ারদের। আর সেটা আটটা টিউশনি পড়ে হবে না। সৃজনশীলতাও চর্চা করতে হয়।


















     

Thursday, July 6, 2017

আমি হিন্দু নই, তুমিও মুসলমান না!

এই মহাবিশ্বের বয়স?

     তা চোদ্দশ কোটি বছর হবে।

 আকার, আয়তন, পরিধি ?

 জানা নেই। আমরা পৃথিবীর বাসিন্দা।   সৌর জগতের মধ্যে একটা ছোট্ট পৃথিবী - ইডেন উদ্যানে পিংপং বল।

আর ওমন কোটি কোটি সৌর জগত আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে। হাবল টেলিস্কোপের চোখ যদ্দুর যায় - এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বে কোটি কোটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আবিস্কার করেছে মানুষ নিজেই! আর দৃশ্যমান মহাবিশ্ব, আসল মহাবিশ্বের কতটুকু? জানা নেই।

   তাহলে আমি কে? আয়ু একশো বছর। পৃথিবীর পাঁচশোকোটি লোকের একজন!  এই মহাবিশ্বের বয়স যদি হয় একশো বছর, তাহলে আমার জীবনকাল এক সেকেন্ডের চেয়েও ক্ষুদ্র!

  ভাবুন - স্থান এবং কালে- এই মহাবিশ্বের চেতনায়, আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অস্তিত্ব। আমার জীবনটা মহাজাগতিক কালে-জাস্ট একটা বুদবুদ।  রাতের আকাশের দিকে তাকান-আর নিজেকে ভাবুন-আপনি কে? মহাসমুদ্রের ধারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জোনাকিরা আমার  ক্ষুদ্রতা দেখে হাঁসবে!

  অথচ আমাদের "আমি" ভাবনা থামে না- আমি হিন্দু, আমি মুসলমান, আমি ধনী, আমার এই নেই, আমার বড় বাড়ি আছে-আমার ছেলে এই-আমার বংশ এই! আমার এই  ডিগ্রী-আমি এই করেছি-"আমি" র লিস্ট মালগাড়ির বগির মতন!

     মানুষের জীবন এতই ক্ষুদ্র-মানুষ সততই ভোলে মৃত্যুর নিমন্ত্রনপত্র নিয়েই সে জন্মেছে। মোমের মতন গলে সেই অহং, যখন একদিন মৃত্যুর সামনে দাঁড়াতে হয়।

  কি আশ্চর্য্য-পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থেই মানুষকে তাই বার বার সাবধান করা হচ্ছে- ওহে তোমার জীবনকাল বড়ই ক্ষুদ্র- বৃথা নষ্ট করো না ঝগড়াঝাঁটি ঈর্ষা খুনোখুনি করে!

   কোরানে মৃত্যু চেতনা আছে প্রায় ৭৩ টি আয়াতে- আল ইমারান (৩/১৮৫ ) এ নাজিল " পৃথিবীর বুকে এই নশ্বর জীবন আসলেই অহংঙ্কারপূর্ন অস্তিত্ব, (কারন সে মৃত্যুর কথা মনে রাখে না)" ।

     উপনিষদের জীবন দর্শনের প্রায় সবটাই মৃত্যুচেতনা থেকে উঠে আসা।  কঠোপনিষদকে এডউইন আর্নাল্ড কবিতায় রূপ দিয়ে লিখেছেন " মৃত্যুর গোপন কথা"।

 কঠোপনিষদে নচিকেতা যমের সম্মুখে --

   যম বল্লেন বর চাও নচিকেতা?

    - হ্যা, প্রভু-যদি আপনি আমার ওপরে প্রফুল্ল, তাহলে দয়া করে বলুন মৃত্যুর ওপারে কি রয়েছে রহস্য?

  - নচিকেতা, মৃত্যু নিয়ে আমায় বিব্রত করো না। অন্য বর চাও। মৃত্যুর রহস্য তোমায় দিতে পারব না।

  - প্রভু দিতে হলে আমাকে এটিই দিন। বলুন মানুষের মৃত্যু রহস্য। কারন আমি জানি, আপনিই কেবল জানেন এই মৃত্যুর রহস্য!

  - নচিকেতা তোমার কি চাই? হাজার বছর আয়ু? কত হাতি, কত সোনা, কত স্ত্রী , কত পুত্র , কত জমি চায় তোমার? সব দিচ্ছি।  কিন্ত আমার কাছে মৃত্যু রহস্য জানতে চেও না। ছেড়ে দাও বাপু-মৃত্যু রহস্য জানার ইচ্ছা!

  নচিকেতা নাছোড়বান্দা।

 -প্রভু এই নশ্বর রাজত্ব, নারী, সম্পদ-সবই ত ক্ষনস্থায়ী, যতক্ষন শ্বাস , ততক্ষন। কোনকিছুই নিত্য না-তাহলে কিসের মোহে মৃত্যুরহস্যের পিছু ছেড়ে এই ক্ষনস্থায়ী ভোগবিলাসে মজি প্রভু?

   যম দেখল, ভবি ভোলার না। নচিকেতা মৃত্যুরহস্য জেনেই ফিরবে!

   মৃত্যুর সামনে মানুষের যে ক্ষুদ্র নশ্বর অস্তিত্ব-এবং তাতেই কুয়োর ব্যঙের মতন আমাদের অহং এর লাফালাফি -প্রতিটা ধর্মই তা বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছে। এই পর্যন্ত ধর্মদর্শনটুকু আমার ভালোই লাগে। কারন অহঙ্কার জ্ঞানের তাপে মোমের মতন গলে।

  ধর্মের সাথে আমার গোল  বাধে এর পরের ধাপে।  হ্যা, এটা মানি, জীবন ক্ষনস্থায়ী-এটা মাথায় রাখলে নিজেকে মোটিভেট করাই মুশকিল।  ফলে একটা বুষ্টিং বর্নভিটা দরকার। জৈন, বৌদ্ধ এবং হিন্দু দর্শনে সেটা পরের জন্ম। পুনঃজন্ম। ইসলাম, খ্রীষ্ঠ ধর্মে স্বর্গের সুরাসরের ধারনা।

    সমস্যা এটাই- যখন সন্ত্রাসবাদিরা এই নশ্বর জীবনকে সত্যি সত্যিই সম্পূর্ন তুচ্ছ ভেবে, স্বর্গের মোহে আত্মঘাতি ভেস্ট বুকে নিয়ে সুইসাইড বোম্বার হয়। মৃত্যুচিন্তা পর্যন্ত সব ধর্মই ঠিক। কিন্ত মৃত্যুপরবর্তী চিন্তাটা সব ধর্মেই রূপকথার মোহজাল এবং তা সুস্থ সমাজের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদীর জন্ম দিতে সক্ষম। তাদের ছোটভাই মৌলবাদিরাও সেই পরকালের মদে বুঁদ।

  সুতরাং যতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হৌক, হোক যতই অকিঞ্চিৎকর-এই ক্ষুদ্রজীবন, তার চাওয়া, পাওয়া ওঠা নামাগুলোকে ভাল লাগা দরকার। জীবনকে যেন প্রতিটা শিশু ভালবাসতে শেখে।  নচেৎ তাদের সন্ত্রাসী হওয়া সময়ের অপেক্ষা।

  যারা বলেন, ইসলাম এখন সব থেকে বেশী সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিচ্ছে-কারন মাদ্রাসা নশ্বর জীবনের মুন্ডপাত করে --বেহস্তে বাহাত্তর হুরের স্বপ্নে তারা বিভোড় -আমি তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই- এই ইসলামেই জন্মে ছিলেন সুফীগুরু জালালুদ্দিন রুমি।  জীবনকে যে এত তীব্রভাবে ভালোবাসা যেতে পারে, সেটা আমরা অনেকে তার কবিতা থেকেই শিখেছি --

( কবিতার ভাষাটি আমার নিজের অনুবাদ, রুমির ভালোবাসার তীব্রতা প্রকাশ করার মতন বাংলা আমি শিখি নি-তাই ক্ষমা মার্জনা চাইছি )

     মানবসত্ত্বা!
    সেত আমার অতিথিগৃহ—
    রোজ সকালে নিত্যনতুন অতিথির আনাগোনা।
এক টুকরো সুখ / একখন্ড হতাশা/ একরাশ ক্ষুদ্রতা,
অপ্রত্যাশিত অতিথির তালিকাটি দীর্ঘ/ ক্ষনিকের অতিথি তারা, এসেছে দুয়ারদ্বারে। 
স্বাগত সবাই/ আমি পা ধুইয়ে দিই তাদের সবাইকে
—যদি তা দুর্বার দুঃখও হয়
যা ওলোট পালট  করে ছুড়ে ফেলে দেয় সাজানো গৃহের সাজানো আসবার 
এরপরেও 
 আন্তরচিত্তে গ্রহণ কর সবাইকে—
হয়তো সে তোমাকে পুরস্কৃত করছে জেনো,
নতুন কিছু আনন্দআগমন উপলক্ষে।
অন্ধকার আশংকা, অপমান, আক্রোশ, ঘৃণা— সবকিছু,
হাসিমুখে এগিয়ে এসো সামনের দরজায়!
জালালুদ্দিন রুমি এগুলো লিখেছেন ত্রয়োদশ শতাব্দিতে, ইরানে। ইসলামের ইতিহাস তখন রক্তাত্ব-এখনকার মতই। উনি ইসলামের সৌর্ন্দয্যকে রাজনীতি থেকে বার করে কবিতায় রূপ দিলেন-কারন সুফীরা তখন ইসলামের  রক্তাত্ব রাজনৈতিক ব্যবহারে বিরক্ত। ঠিক যেমন ভাবে  এখনকার সাধারন মুসলমানরা বিরক্ত হোন যখন রাজনীতিবিদরা ইসলামকে ব্যবহার করেন ভোটের জন্য।

 জালালুদ্দিন রুমি না পড়লে বোঝা যায় না ইসলামিক সংস্কৃতিতেও একদা মানুষ খুঁজেছে চিরন্তন   সৌর্ন্দর্য্য। ওমর খৈয়াম, হাফিজ শিরাজি, খলিল জিব্রান-কার কথা ছেড়ে কার কথা বলি ?

            যেমন উপনিষদ না পড়লে বোঝা অসম্ভব প্রাচীন ভারতের চিন্তার সৌন্দর্য্য-আত্মার মুক্তি। গোরোক্ষা কমিটির হিন্দুএর দেখলে শুধুই মনে হবে হিন্দু ধর্ম আচার-বিচার-জাতফাতের ফিতেই আটকানো পা ভাঙা গরু-শুধু ন্যাদায় গোচনা! কে বলবে এই ধর্মের সর্বোচ্চ উপলদ্ধি উপনিষদের বাণী- যা রবীন্দ্রভাষ্যে  

‘হে মহাপথিক/অবারিত তব দশদিক/তোমার মন্দির নাই, নাই স্বর্গধাম/নাইকো চরম পরিণাম/। তীর্থ তব পদে পদে/চলিয়া তোমার পদে মুক্তি পাই চলার সম্পদে’
 
 তাহলে ক্ষীরটা কি খাইলাম?

  জীবনকে ভালবাসতে হবে- জীবনকে ঘৃণা করা শুরু করলে- ছেলেটা মৌলবাদি নইলে সন্ত্রাসবাদি হবেই।

  জীবনকে ভালবাসিবে কিরূপে? নাচে গানে খাদ্যে সৌর্ন্দয্যে কবিতার ছন্দে?  এখানেই ধর্ম দর্শনের সাথে সংঘাত। কঠোপনিষদ, কোরান-এরা সবাই আমাদের নশ্বর জীবনের আনন্দকে ক্ষনস্থায়ী বলে বাতিল করে দিল!

ঠিক এই কারনেই এই জন্মে আর আমার ধার্মিক হয়ে ওঠা হল না! চলার পথেই যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জেতা হারা-তাই থেকেই যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খুদের মতন ছোট ছোট আনন্দ দুঃখের বারিধারা- তার সিঞ্চনেই আমি খুশী। এটা জেনেই এসবের কোন মানে নেই-জীবনের পরম উদ্দেশ্যও নেই।

বেহস্ত, পরের জন্ম, কমিনিউস্ট রাষ্ট্র-ইত্যাদি বড় বড় লক্ষ্যের পেছনে  দৌড়ানোর ঝামেলাটা এই-তাতে জীবনের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাওয়াগুলো হাওয়া হয়ে উড়ে যায়-আর নৈরাশ্যের নেশায় জেগে ওঠে মৌলবাদি দৈত্য।

 বরং এই গ্লাসে গলায় থাকুক এক টুকরো গালিব

  হামকো মালুম হ্যায় জান্নাত কি হক্বিকৎ লেকিন

দিল কে খুশ রাখনে কো গালিব ইয়ে খ্যয়াল আচ্ছা হ্যায়।












Wednesday, July 5, 2017

বাঙালী পরিচিতিটাই আসল-হিন্দু মুসলমান পরিচিতিটা ইল্যুউশন

ধন্যবাদ আনিস খানকে। কালকেই লিখেছিলাম বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পে জল ঢালতে বাঙালী পরিচয় বা বাঙালী আইডেন্টিটি সামনে আনা জরুরী। এটা দেখে ভাল লাগল, তার মতন একজন শিল্পদ্যোগী, বাঙালী আইডেন্টিটি সামনে আনার দ্বায়িত্ব নিজের পরিসরে পালন করছেন। ঘরে বাইরের নিখিলেশের কথা মনে এল।

হিন্দু বা মুসলমান কোন পরিচয় হতে পারে না। প্রাচীন ভারত, গ্রীস, রোম-কোথাও ধর্মীয় পরিচিতি বলে কিছু ছিল না। মানুষের ধর্মাচরন ছিল, আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা ছিল। সবটাই ব্যক্তিগত।

মুসলমানরা যখন ভারতে প্রথম আসে-তারা ভারতীয়দের জিজ্ঞাসা করত তোমাদের ধর্ম কি? আসলেই ত কোন ধর্ম ছিল না ভারতে-প্রত্যেকের নিজস্ব উপাসনা, নিজের মতন করে সত্যকে খোঁজা। এটাই ভারতীয় দর্শনের শাস্বত বানী। ফলে উত্তর না পেয়ে, মুসলমানরা বললো-ওকে-তাহলে এটা হচ্ছে হিন্দু ধর্ম। কারন পার্শী শব্দে হিন্দু মানে সিন্দুনদের ওপারে যারা থাকে। হিন্দু শব্দটা কোন হিন্দু গ্রন্থে নেই-কারন ওই শব্দটা মুসলমানদের দান। মুসলমানদের দেওয়া সেই হিন্দু আইডেন্টিটি নিয়ে-আজ তাদের সাথেই লড়াই!

রোম সম্রাট কনস্টানটাইন প্রথম খ্রীষ্টান ধর্মের জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতিকে কাজে লাগান উত্তরের উপজাতিগুলোকে রোমান সাম্রাজ্যের বশবর্তী করতে। খ্রীষ্ঠান সাম্রাজ্যবাদের সেই মডেলটাই আরো উন্নতাকারে নিয়ে আসে সপ্তম শতাব্দির আরবের বাসিন্দারা। খৃষ্টান এবং মুসলমান -এই দুই পরিচিতির যুদ্ধ আরো তীব্র হয় তিনটে ক্রশেডের মধ্যে দিয়ে। যেহেতু গত এক হাজার বছর এই দুটো ধর্মই গোটা পৃথিবী দখল করতে চেয়েছে -রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় আস্তে আস্তে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন হয়েছে। ইউরোপে রেনেসাস এবং শিল্প বিপ্লবের ফলে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে হঠানো গেছে ঠিকই-কিন্ত ৫৬ টা মুসলমান দেশ এবং ভারতে ধর্ম আষ্টেপৃষ্টে বেঁধেছে রাজনীতিকে।

বাঙালী একটা লোকের পরিচিতি বা আইডেন্টি হতে পারে-কিন্তু হিন্দু বা মুসলমান কি করে একটা লোকের পরিচিতি হয় -তা আমার বোধগম্য না। সেটা রাজনৈতিক চক্রান্ত ছাড়া কিছু না। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি, বাংলা খাবার খাই-তাই আমরা বাঙালী। আমি মন্দিরে যাই-তাই হিন্দু-বা মসজিদে যাই, ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলি, তাই মুসলিম-এগুলো অবোধের নির্বোধ বুদ্ধি। বা জোর করে ব্রেইন ওয়াশ করে শিশু বয়স থেকে শেখানো হয় ধর্ম গ্রন্থের মাধ্যমে, রাষ্ট্রের সহযোগিতায়। হ্যা-এই ব্রেইন ওয়াশ বন্ধ না হলে, এই যে কোটি কোটি ধর্মান্ধ তৈরী হচ্ছে, তাদের সামাল দিতে পারবে না কোন পুলিশ, কোন মিলিটারি।

কেন হিন্দু, মুসলমান পরিচিতিটা ফেক? ইল্যুউশন? ভ্রুম?

কারন আমি যে বাঙালী পোস্ত খাই, ইলিশ খাই-সেটা সত্য। খাবারের অস্তিত্ব আছে। হিন্দু-মুসলমানরা যেসব জিনিস মানে ধর্মের নামে-তার সবটাই রূপকথা। অতীতের রাজনীতির কারনে সাজানো রূপকথা। এইসব গল্পে বিশ্বাস করে পরিচিতি? এর মানে স্পাইডারম্যানের গল্পে বিশ্বাস করে স্পাইডারম্যান ফ্যান ক্লাবের সদস্য হয়ে ঘোষনা করা- ওটাই আমার পরিচয়! এইসব গাঁজাখুরি গল্প যদি মানুষের পরিচিতির ভিত্তি হয়, একবিংশ শতাব্দিতে, তাহলে গোড়ায় গলদ। সরি, কোন মিলিটারি, কোন বিজেপি আপনাদের বাঁচাতে পারবে না। আরেকবার দেশভাগের মতন দাঙ্গা বাঁধবে। কারন যে পরিচিতির ভিত্তিটাই মানুষের মাথায় টুপি পড়িয়ে, ছোটবেলা থেকে ব্রেইন ওয়াশ করিয়ে তৈরী হয়েছে-তার মিথ্যাচার, মিথটাকে টিকিয়ে রাখতে দাঙ্গা বাধাবেই। আজ না হলে কাল। কাঠকয়লার আগুন-ধিকি ধিকি করে জ্বলে। খড় পরলেই ঘরবাড়ি ব্যাবসা জ্বালিয়ে সাফ করে দেবে।

ধর্ম বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা বা নিজের সন্ধান সবার মধ্যেই ওই সুরসুড়ি আছে। নাস্তিকের ও আছে। আমার ও আছে। আমার বিশ্বাস সততায়, বুদ্ধিতে পরিশ্রমে। ওইটুকুতে বিশ্বাস করেই, বাকী জীবনটা কাটানো সম্ভব। উপনিষদ পড়তে আমার ভাল লাগে-কিন্ত তার জন্যে নিজেকে হিন্দু বলে পরিচিতি দেব কেন? কারন ইমানুয়েল কান্টের ক্রিটিক অব পিউর রিজন, আমার একই রকম ভাল লাগে। এটাত নিজের জানার জন্য ব্যক্তিগত যাত্রা। প্রতিটা মানুষের ধর্ম, সে হিন্দুই হৌক বা মুসলমান হোক, তার ব্যক্তিগত যাত্রা- পারসোনাল জার্নি। সেই জন্যেই ১৬০ কোটি মুসলমানের ১৬০ কোটি ইসলাম। কোন দুজন মুসলমান পাবেন না-যার ইসলাম হুবহু এক। কোন দুজন হিন্দু পাবেন না-যাদের হিন্দু ধর্ম হুবহু এক। কারন ধর্ম একটা ব্যক্তিগত জার্নি-তা কখনোই পরিচিতি বা আইডেন্টিটি হতে পারে না।

কিন্তু দুজন বাঙালী পাবেন -আনিশ খান এবং আশীষ রায়-যারা সর্ষে ইলিশ খেয়ে ঢেঁকুর তুলবে। গাইবে- আমি বাংলায় গান গাই। কারন ইলিশ এবং গান-দুটোই বাস্তব।

Tuesday, July 4, 2017

বাঙালী সংস্কৃতি দিয়েই মৌলবাদি উত্থান ঠেকাতে হবে

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করুন-ইত্যাদি উপাদেয় উপদেশ ভাল-কিন্ত কথাটির মধ্যেই র‍য়ে গেছে-স্ববিরোধিতার বীজ। পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় থাকতে পারে-এটারই যদি বৈধতা থাকে, সাম্প্রদায়িক বৈরিতাও বৈধতা পায়। কারন প্রথম প্রশ্নই উঠবে, বাঙালীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুটো আলাদা সম্প্রদায় কেন? এদের খাওয়া দাওয়া ভাষা কবি নগর শহর-সব এক। তাহলে বাঙালীদের হিন্দু মুসলমানে ভাগ করাটা বৈধ হয় কি যুক্তিতে?

যুক্তি খুব সরল। অধিকাংশ বাঙালী, তার বাঙালী পরিচিতির চেয়েও, তার নিজেদের ধর্মীয় পরিচিতিতে বেশী গুরুত্ব দেয়। অধিকাংশ বাঙালীর নিজের অস্তিত্বে যতনা বাঙালীয়ানা, তার থেকেও বেশী তারা নিজেদের মুসলমান বা হিন্দু ভাবে। বাঙালীর যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক চিন্তা আছে- যা সহজিয়া, আউল বাউল হয়ে লালন রবীন্দ্রনাথে পূর্নতা পেয়েছে -সেই মাটির ধর্ম সম্মন্ধেই অধিকাংশ বাঙালী বিস্মৃত।

বাঙালীর শুধু ভাষা না-তার নিজস্ব ধর্ম আছে-যা হিন্দুত্ব বা ইসলামের থেকে আলাদা-এটাইত অধিকাংশ বাঙালী জানে না!!

যে বাঙালীর রবীন্দ্রনাথ লালন আছে- সে কেন আরব সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদে ( ইসলাম ) বুঁদ হয়ে থাকে? বা ইসলামের আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য কেনই বা তাকে উত্তর ভারতের গোবলয়ের গোচনা সেবন করতে হয়?

আমরা রবীন্দ্রনজরুল বলে অনেক লম্ফ ঝম্ফ দিই বটে-কিন্ত বাস্তবে যখন দেখা যায় এক দুষ্টু বালকের সামান্য ফেসবুক পোষ্টের জন্য বাদুরিয়ার মুসলমানরা দম দেওয়া কলের পুতুলের মতন দাঙ্গা করতে পঙ্গপালের মতন দোকান পাট বাড়ি ঘরদোর ধ্বংস করছে-তখন এটা পরিস্কার, রবীন্দ্রনাথ , নজরুল বা এমন কি লালন --শুধুই শিক্ষিত বাঙালীর ড্রইংরুমে। বাঙালী এলিট লিব্যারাল এবং সাধারন মানুষ-দুই ভিন্ন বাংলার বাসিন্দা।

দেগঙ্গা থেকে বাদুরিয়া-বাংলার যে বলকানাইজেশন চলছে, তা ঠেকাতে মমতা ব্যার্নার্জির সামনে একটাই পথ। বাঙালী সংস্কৃতি দিয়েই হিন্দু মুসলমান বলে যে পৃথক আইডেন্টিটি তৈরী করা হয়েছে, সেটাকে আগে ফিকে করতে হবে। উনি সেটা করেন নি। মুসলমান ভোট ব্যঙ্কে ধরে রাখার জন্য, বাঙালী মুসলমানকে মুসলমান করে রেখেছে সব পার্টিই- কংগ্রেস, সিপিএম, তৃনমূল , বিজেপি।

শরৎচন্দ্রের সেই বাঙালী বনাম মুসলমানের ফুটবল খেলার মতন আজো সমান কনফিউশন-এরা বাঙালী না মুসলমান!! লালন, নজরুল-কেউ সেই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস ঘোচাতে পারেন নি। কারন সরকারি টাকায় মাদ্রাসা, আলেম, হুজুরদের পোষা হচ্ছে-লালন সাঁইকে পৌছে দেওয়া হচ্ছে না। আলেম হুজুররা নিজেদের ধর্ম ব্যবসা টেকাতে-একজন মুসলমানের মুসলমান পরিচিতিই পোক্ত করবে-ফলে বাদুরিয়াতে যখন এই সব ধর্মোন্মাদরা পঙ্গপালের মতন লাঠি নিয়ে তাড়া করে- সেটা প্রশাসনের নীতির ভুল। কারন আলেমদের টাকা না দিয়ে যদি গ্রামে গ্রামে লালন সাই এর শিষ্যদের, বাউল কালচার ছড়িয়ে দেওয়া যেত- তাহলে বাংলা মুখরিত হত, বাঙালীর চিন্তনে!

‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।।

সরকার থেকে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। ফলে মুসলমানকে আরো বেশী মুসলমান বানানো হয়েছে-আর তার প্রতিক্রিয়াতে হিন্দুরা আরো বেশী হিন্দু হচ্ছে।

মধ্যে খান থেকে বাঙালীদের স্পেসটা আরো আরো অনেক ছোট হচ্ছে। অথচ এরা নাকি বাংলার মসনদে।

যে জাতি নিজের সংস্কৃতি, নিজের ঐতিহ্যশালী লোকায়িত সহজিয়া ধর্মকে চেনে না-তাদের মাটির দখল আরব আর উত্তর ভারতের দালালদের দখলে যাবে-সেটাই স্বাভাবিক।



কিন্ত এখনো সময় আছে। সংস্কৃতি প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী-গ্রামে গ্রামে বাংলার সহজিয়া ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিন। ছড়িয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ নজরুলের জীবন দর্শন। যাতে সবাই নিজেদের বাঙালী ভাবতে শেখে আগে। তাদের মুসলমান বা হিন্দু পরিচিতি যেন গৌন হয়। তার বদলে উনি যদি দুধ কলা দিয়ে "ইসলামিক পরিচিতির" বিষ ছড়ানো কালসাপদের পোষেন মাসোহারা দিয়ে, তার ফল হবে বাউরিয়া-এবং সম্ভবত উনিও ক্ষমতা হারাবেন।

Thursday, June 29, 2017

গোলাম সারোয়ারের বামপন্থি কুসংস্কার

রিবিউটাল ঃ https://istishon.com/?q=node%2F24424
প্রথমেই গোলাম ভাইকে ধন্যবাদ জানাই। কারন আমার পনেরো মিনিটে লেখা ব্লগের বিরুদ্ধে উনি চারটি ব্লগে আমার লেখার নিবিড় পাঠ করেছেন। এই ফেসবুকের যুগে কোন লেখকের লেখা যদি এত গভীর ভাবে কেউ পড়ে, এমন দুর্লভ পাঠককে প্রশংসা না করে উপায় নেই। শুধু সমস্যা হচ্ছে গোলাম সারোয়ার এখনো বামপন্থী চিন্তার গোলামিতেই গোসল করছেন-কেন করছেন, তার ক্রনিকলটা সাজিয়ে দিচ্ছিঃ
(১) আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নগ্ন, এবং তার বিরুদ্ধে আমি মুক্তমনাতেই দশটা আর্টকলের সিরিজ লিখেছিলাম। এখানে দেখতে পারেন গোলাম ভাইঃ https://sites.google.com/site/biplabpal2000/home
শুধু তাই না। আমেরিকাতে আদিবাসিদের ওপরে কিভাবে অত্যাচার চলেছে-সেই সুদীর্ঘ ইতিহাস ও লিখেছি বিস্তারিত এই ব্লগে
https://blog.mukto-mona.com/2016/02/18/48489/
শুধু আমি কেন, আমেরিকানরাও আমেরিকার বিদেশনীতিকে গালাগাল দিয়ে থাকে। গোলাম ভাই কি ঢাকায় বসে হাসিনার স্বৈরচারের বিরুদ্ধে লিখতে পারবেন? আমরা আমেরিকাতে বসে আমেরিকার বিরুদ্ধে লিখতে পারি। আর সেই জন্যেই আমেরিকাতে থাকাই পছন্দ।
শুধু বাংলাদেশ কেন। পশ্চিম বঙ্গ বা ভারতের সমস্যা নিয়েও খোলাখুলি লিখতে ভয় হয়। ওখানে বাবা মা আত্মীয় স্বজন আছে। ওখানে, কমিনিউস্টদেশে সবাই আমরা "বোবা সমুদ্রের নোনাজলে" সখ্যাত সলিলে ( একজন কবির থেকে শব্দগুলো ধার করলাম)।
বামপন্থীদের সমস্যা অন্যত্র-অবাস্তব জগতের সন্ধানে তারা। মঙ্গল গ্রহে ত কেউ থাকে না। মার্ক্স কথিত কমিনিউস্ট রাষ্ট্রও কোথাও নেই। সুতরাং শত দোষ থাকা সত্ত্বেও আমেরিকাতে থাকাই শ্রেয় বলে মনে করি।
(২) সাম্রাজ্যবাদের ও কি সবটাই বাজে?আলেক্সজান্ডারের সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া গ্রীক জ্ঞান বিজ্ঞান কিভাবে ছড়াত বিশ্বে? ইসলামিক সাম্রাজ্যবাদ না এলে আরবে বিজ্ঞান চর্চা হত কিভাবে? আর সেটা না হলে কোপার্নিকাস , নিউটনের জন্ম হত কি ভাবে? এই যে ইন্টারনেটের এত সুবিধা নিচ্ছেন গোলাম ভাই, সেটার জন্মও আমেরিকার মিলিটারির প্রয়োজনে (আরপানেট প্রজেক্ট) ।
সাম্রাজ্যবাদের সাফাই গাইছি না। কিন্ত মুক্তমনের পরিচয়, যতই অপ্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকুক না কেন, লোকের মন রাখতে লেখা উচিত না। নিষ্ঠা থাকা উচিত সত্যের প্রতি। সেই জন্যেই আমি এই লেখায় দেখিয়েছি কি ভাবে সাম্রাজ্যবাদের জন্য বিজ্ঞান প্রযুক্তি এগিয়েছে।
দেখুন নিজেকে মহান দেখানোর জন্য সাম্রাজ্যবাদকে অজস্র গালাগাল দেওয়া যায়। যা আমি ওই ১১ টা খন্ডে দিয়েওছি। কিন্ত সাম্রাজ্যবাদের জন্য যে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি-সেটাও সমান সত্য। সেটা লেখার জন্য যদি আমাকে কেউ বলে আমি সাম্রাজ্যবাদের সাফাই গাইছি, তাহলে আমি পাত্তা দেব না। কারন এগুলো বাঙালী সুল্ভ নিম্নগোত্রের চুলকানি।
৩) বিজ্ঞানের গবেষনা এবং প্রযুক্তির মধ্যে গুলিয়েছেন গোলাম ভাই। উদাহরন দিচ্ছি । ইলেক্ট্রিসিটি। হ্যা মাইকেল ফ্যারাডে থেকে গ্যাল্ভানিক সেল-সব কিছুই ছিল ল্যাবেটরিতে। কিন্ত এডিসন এবং টেসলার দ্বৈরথেই আমেরিকার মানুষ প্রথম জেনারেটর পায়।কর্মাশিয়াল ভাবে ইলেক্ট্রিক কারেন্টকে কাজে লাগানো হয়। একটা ছোট্ট তথ্য দিই । বিজ্ঞানের গবেষনা লদ্ধ ফলের ১% ও প্রযুক্তির কাজে আসে না। কারন টা এই যে ল্যাবেটরি থেকে প্রোডাকশনে আনতে বিপুল ইনভেস্টমেন্ট লাগে। এবং তার জন্যে দরকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার -বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, ব্যঙ্কার, ভিসি-অনেক কিছু এক করলে একটা ল্যাবেটরী প্রোডাক্ট মার্কেটে আসে। এই ইনফ্রাস্টাকচার বহুদিন শুধু আমেরিকা, বৃটেন এবং জার্মানিতেই ছিল-এখন ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিন কোরিয়াতে ও আছে। কিন্ত আমেরিকার তুলনায় তা কিস্যু না। ধরুন স্যোশাল মিডিয়া। ১৯৯০ সাল থেকেই কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে পেটেন্ট ফাইল করেছেন, প্রচুর পাবলিশ করেছে। কিন্ত সোশাল মিডিয়া বলতে আজকে- ফেসবুক, ইউটিউব এং টুইট্যার। তিনটিই আমেরিকার।
ভারতে ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অব টেকনোলজীতে প্রচুর ভাল গবেষনা হচ্ছে। আমি নিজের ব্যবসার খাতিরেই গত পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করছিলাম যদি কোন গবেষনালদ্ধ কাজকে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতে বা বিশ্বে আনা যায়। কিন্ত বিধি বাম। ভারতে সেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই।
বই আর ল্যাবেটরির মধ্যে আবদ্ধ বিজ্ঞানে কিজনগনের কোন উপকার হয়? কিস্যু হয় না। যতক্ষন না পর্যন্ত তা মানবকল্যানে ব্যপকভাবে কাজে আসছে। আর সেই প্রসেসটা বহুদিন যাবত শুধু আমেরিকাতেই ছিল। যার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ান বিজ্ঞানের জন্য আমেরিকার থেকেও বেশী খরচ করেছে ঠিকই-কিন্ত তার পরেও তাদের দেশের লোক অনাহারে থেকেছে। কি লাভ সেই বিজ্ঞান খরচায়, যা করার পরেও দেশের লোক অনাহারে থাকে, কারন সেই বিজ্ঞান জনগণের কাছে পৌঁছায় না?
৪) সোভিয়েত ইউনিয়ানে সাহিত্য? অক্টবর বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়া সাহিত্য ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। চেকভ, টলস্টয়, ডস্টভয়েস্কি। ১৯১৭ সালের পরে সেই মানের সাহিত্য কোথায় রাশিয়াতে? ছিলেন গোর্কি। তাও স্টালিনের ভয়ে বিশেষ কিছু লেখেন নি বিপ্লব পরবর্তি রাশিয়াতে। সোভিয়েত থেকে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন বরিস পাস্তারনেক । তিনি তা পেয়েছেন কমিনিউজমের সমালোচনা করেই। পেয়েছেন আলেক্সান্ডার সলজেনিস্তিন। যাকে গুলাগ বা লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়েছিলেন কমিনিউস্টরা। অভিজিত রায়ের লেখা আছে তার ওপরে-কিভাবে কমিনিউস্টরা হত্যা করতে চেয়েছিল শতাব্দির এক সেরা প্রতিভাকে। আর নোবেল পেয়েছেন মিখাইল সকোলভ। ইনিই একমাত্র স্টালিনের সুনজরে ছিলেন, ১৯৩৭ সালে সুপ্রিম সোভিয়েতের সদস্যও ছিলেন।
৫) সোভিয়েত ইউনিয়ানের বিজ্ঞান ? গোলাম ভাই লিখেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ান থেকে ১০০ জন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন! বাস্তবে নাম্বারটা ৭। এদের মধ্যে অনেকের কাজের সাথে আমি বিস্তর পরিচিত ( ল্যান্ডাউ, চেরেনকভ, ক্যাপিসজা, প্রিগোনিন )। ল্যান্ডাউএর লেখা থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স পড়েই ছাত্র অবস্থায় বড় হয়েছি। উনি আমার প্রিয় বিজ্ঞানী। কিন্ত গোলাম ভাই কি জানেন এই অসামান্য প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে সাইবেরিয়াতে গাছ কাটটে পাঠিয়েছিল স্টালিন জমানা? নেহাত, লান্ডাউ এর বস কোন রকমে এক বছর বাদে, অর্ডার রভার্সাল করতে সক্ষম হন। এরকম কত শত ল্যান্ডাউ স্টালিনের পার্জে মারা গেছেন তা কি গোলাম ভাই জানেন?
ল্যান্ডাঊ একবছর সাইবেরিয়াতে গাছ কাটার পরে, মস্কোতে ফিরে শোনা যায় মৌনব্রত পালন করতেন। কারুর সাথে কথা বলতেন না। পাছে তাকে আবার সাইবেরিয়াতে পাঠানো হয়!
বাই দ্যা ওয়ে গোলাম ভাই-আরেকটা ছোট তথ্য জানুন। নোবেল প্রাইজ দেওয়া শুরু হয়েছে ১৯০১ সাল থেকে। অক্টবর বিপ্লব ১৯১৭ সালে। এই ১৬ বছরের মধ্যেই, প্রাক বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় ( যা কমিনিউস্টদের মতে নাকি কিছুই ছিল না), তিনজন নোবেল পেয়েছেন বিজ্ঞানে। ইভান পাভ্লভ (১৯০৪-মেডিসিন), মেটচিনকভ ( মেডিসিন ১৯০৮), অস্টোয়াল্ড ( কেমিস্ট্রি, ১৯০৯)। আর সোভিয়েত বেঁচেছিল ৭৪ বছর। সেই ৭৪ বছরে এসেছে ৭ টি নোবেল।
বিপ্লবের আগে যে রাশিয়াতে মেন্ডেলীভ, পাবল্ভ, ওস্টোওয়াল্ড, টলস্টয়, চেকভ, ডস্টভয়েস্কিরা জন্মেছে -সেই রাশিয়া খুব অনুন্নত ছিল? আরেকটু পড়াশোনা করুন। ১৮৬৫ সাল থেকে কিভাবে আস্তে আস্তে সংস্কারের মাধ্যমে ১৯০৫ সালের মধ্যেই রাশিয়া বৃটেন, জার্মানির সমকক্ষ শিল্প শক্তি হয়ে ওঠে সেসবের ইতিহাস ত কিছু জানেন না। শুধু লালমার্কা চটি বই ভিত্তি করে বিতর্ক হয়?
৬) আসলে গোলাম ভাই এর সমস্যা অন্যত্র। উনিও সেই রূপকথায় বিশ্বাস করেন লেনিনের অক্টবর বিপ্লবের ( পড়ুন প্রতিবিপ্লব -কেন ? সেটাও লিখেছি এখানে https://blog.mukto-mona.com/2008/11/08/136/) এর আগে রাশিয়ার অবস্থা ছিল পুরাই দুরাবস্থা!
অহ কি অসাধারন গল্পই না ফেঁদেছিলেন কমিনিস্টরা? গোলাম ভাই কি জানেন ১৯১৭ সালের বিপ্লবের আগে রাশিয়া শিল্প উৎপাদনে ছিল বৃটিশ,জার্মানী এবং ফ্রান্সের পরেই? আর কি গল্প জানেন গোলাম ভাই? যাই হোক কমিনিউস্টরা যে রাশিয়ার ইতিহাস একদম পড়ে নি-সেটা আমি ভাল করেই জানি। আর সেই জন্যেই তারা যেসব গালগল্পে বিশ্বাস করে তার লিস্ট ও একটা দিয়েছিলাম (https://blog.mukto-mona.com/2009/12/10/3648/)
রাশিয়া এতই পিছিয়েছিল যে বিপ্লব পূর্ব রাশিয়াতে টলস্টয়, চেকভ এবং ডস্টভয়েস্কি জন্মাল? কোন ধরনের ব্রেইন ওয়াশড কমিনিউস্টরা এই টাইপের ঢপে বিশ্বাস করবে?
এই রিবিউটাল দীর্ঘ করার কোন ইচ্ছা নেই। কারন এটা আমার কাছে পরিস্কার গোলাম ভাই সোভিয়েত ইউনিয়ানের ইতিহাস বা রাশিয়ার ইতিহাস নিয়েই কিছুই পড়েন নি। প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের মধ্যে গুলিয়েছেন।
৭) এই বার কিউবার প্রসঙ্গে আসি। সবাই কিউবায় যায় হয় হেলথ ট্যুরিজমের জন্য , নইলে সেক্স টুরিজমের জন্য। এটা ওপেন সিক্রেট। প্রশ্ন হচ্ছে যে সিস্টেমে একজন মেয়ে অভাবের তাড়নায় বেশ্যাবৃত্তি নেয়, সেই রাজনৈতিক সিস্টেম কি ভাল? বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গের অসংখ্য মেয়ে দারিদ্রের কারনে দেহ ব্যবসাতে আসে। মুম্বাই, কলকতার ব্রথেলে বাঙালী মেয়ে গিজগিজ করছে।
কেন সেখানে গুজরাটি, মারাঠী নেই? কারন তাদের অর্থনীতি ভাল।
আমি জানি কমিনিউস্টরা ছেঁড়া জাঙিয়ার বুক পকেট বানানোর চর্চা করে। কিন্ত এইটুকু সামান্য জিনিস বুঝতে কি সেক্সিস্ট ইত্যাদি আজগুবি তথ্যের অবতাড়না করতে হয়?
একটা দেশ এবং সিস্টেম-শুধ্য কিছু পুঁথি দিয়ে জানা যায় না। তার জন্যে সেই দেশে যেতে হয়। সেই দেশের লোকেদের সাথে কথা বলতে হয়। তাদের সাহিত্য সংস্কৃতিকে জানতে হয়।
রাশিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়ানকে নিয়ে আমার অবশেসন আছে । কারন আমি রাশিয়ান সাহিত্যের ভক্ত। রাশিয়ান বিজ্ঞানের ভক্ত। প্রচুর রাশিয়া বিজ্ঞানী আমার বন্ধু, যারা ওই সিস্টেমে বড় হয়েছেন কিন্ত তারপরেও আমার লেখাটির প্রতিটা কথা সত্য। কারন সব বাজেট যেত অস্ত্র এবং মহাকাশ গবেষনাতে। লোকে খেতে পাচ্ছে না-অথচ কৃষিবিজ্ঞানের গবেষনাতে বাজেট থাকত না। আরো অনেক লিখতে পারি-হয়ত লিখতাম এইসব নিয়ে একদিন। কিন্ত পশ্চিম বঙ্গে এখন আর বামেরা নেই । ৫৩% ভোট, এখন ১৪% এ। ফলে সময় নষ্ট করার মানে হয় না।
কারনটা বুঝতে গোলাম সারোয়ারকে এখনো অনেক পড়াশোনা করতে হবে।

ট্রায়াসিক যুগের অভিভাবক

সকালে উঠেই দেখি ফেসবুক ফিড ফেস্টুনে ছয়লাপ -প্রাথমিকে পাশফেল ফিরিয়া আনিতে হইবে! নাহইলে ধর্মঘট, সহ আরো অনেক কিছুর ঘনঘটা!

আচ্ছা পশ্চিম বঙ্গের অভিভাবকরা কি ট্রায়াসিক যুগের ডাইনোসর?

ছাত্রছাত্রীরা শিখছে কি না, তার মুল্যায়ন সবসময় দরকার। কিন্ত পাশফেল নিয়ে মাথাব্যথা কেন?
আমাদের সময় প্রাথমিকে পাশফেল ছিল এবং কোন সন্দেহ নেই পাশফেল প্রাথমিকে রাখা শুধু অবৈজ্ঞানিকই না-শিশু মনের জন্য অত্যন্ত খারাপ। আমি দেখতাম ফেল করে মূলত খুব প্রান্তিক ফ্যামিলি থেকে শিশুরা-যাদের প্রথম প্রজন্ম স্কুলে আসছে। দুই একবার ফেল করার পরে, তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হত, তোর দ্বারা কিছু হবে না- তোর বাবা মুনিশ, তুই স্কুলে সময় নষ্ট না করে মুনিশ খাটতে যা!! কোথায় এই প্রথম প্রজন্মের ছেলেমেয়েগুলোকে উৎসাহ দেওয়া দরকার যাতে তারা এগিয়ে যেতে পারে, তার বদলে প্রথমেই তাদের বলে দেওয়া হচ্ছে পড়াশোনা তোদের জন্য না! এই সব কান্ডজ্ঞান আউলা অভিভাবক দেখে গুরুদেবের কথাই প্রথমে মনে আসে -

যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাধিবে ষে নিচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে ।
অজ্ঞানের অন্ধকারে আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান ।

আমেরিকা সহ সব উন্নত দেশই পাশফেল বহুদিন তুলে দিয়েছে। এখানে কোন ছেলে মেয়ে অঙ্কে পিছিয়ে থাকলে, তাদেরকে আলাদা ক্লাস দেওয়া হয়-যাতে মেক আপ করতে পারে। আবার কেউ অঙ্কে এগিয়ে থাকলে, তাদের গিফটেড এবং ট্যালেন্টেড বলে আলাদা ক্লাস দেওয়া হয়।

যাইহোক ধরেই নিচ্ছি অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় চৌচির। তারা কি এটা ভেবেছেন, ভবিষ্যতে অটোমেশনের যুগে পুঁথিবিদ্যা শিক্ষার জন্য কোন চাকরি নেই? ভবিষ্যতে দরকার সৃজনশীল মস্তিস্ক এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা। স্কুলে এর কোন শিক্ষাটা এখন দেওয়া হয়?

সৃজনশীলতা নিয়ে আগে লিখেছি, আজ লিখছি নেতৃত্ব প্রসঙ্গে।

নেতা ত আকাশ থেকে পড়ে না- জিনেও থাকে না। অন্যান্য আরো অনেক স্কিলের মতন, নেতৃত্বও ছোটবেলা থেকেই একটা " সামাজিক স্কিল"- যা পরিচর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

তো বাচ্চারা নেতৃত্বের শিক্ষাটা পাবে কি করে?

উত্তর সোজা। হয় খেলার মাঠে, নইলে নাটকের ঠেকে। আমরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছি কত! ক্রিকেটের একজন ক্যাপ্টেনকে যেভাবে ব্যাটিং অর্ডার , বোলিং , ফিল্ডিং চেঞ্চ করতে হয়- প্লেয়ারদের গোঁসা ভঞ্জন করতে হয়- কর্পরেটে একজন ম্যানেজার ও ঠিক সেই ভাবে, তার রিসোর্স প্ল্যানিং করে। রিসোর্স ম্যানেজ করে! নো স্যার, এম বি এ করে ম্যানেজমেন্ট শেখা যায় না-ছোটবেলা থেকে যাদের মাথায় প্ল্যানিং, স্ট্রাটেজি ইত্যাদির চর্চা নেই -হঠাৎ করে এম বি এতে দুটো পাওয়ার পয়েন্ট শিখে কেউ ম্যানেজার হয়ে উঠবে-এ আশা শুধুই ধোঁয়াশা!

কংক্রিটের জঙ্গলে বড় হওয়া, সাত আটটা করে টিউশনি করা আজকের ছেলেমেয়েরা মাঠ কি সেটাই জানে না। খেলা অনেক দূরের কথা। এরা কি করে ভবিষ্যতে কাজে নেতৃত্ব দেবে?

শুধু তাই না, নেতাকে অভিনেতাও হতে হয়। টীমকে ইন্সপায়ার করে লিডার। তার জন্য অভিনয়ের প্রাথমিক স্কিলটাও দরকার। আমারদের সময়ে ছোটবেলায় কত নাটকের চর্চা ছিল পাড়ায় পাড়ায়। এখন শুধু টিউশুনি। বাচ্চারা তাহলে কি করে শিখবে কমিউনিকেশন স্কিল?

শুধু তাই না। সত্যিকথা বলতে কি কংক্রিটের জঙ্গলে বড় হওয়া অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই মানসিক অবসাদ এবং চাপের শিকার। কারন খেলাধূলা করে না-ফলে শরীর এবং মন দুটোই দুর্বল। এরা ত পেশাদারি জগতে কাজে চাপ সামলাতেই পারবে না। সাংসারিক কলহের মোকাবিলা অনেক দূরের রহস্য

বরং বাংলায় গ্রামের দিকে ছেলেমেয়েরা এখনো অনেকটা ফ্রি টাইম পায়। খেলা ধূলা করে-পুকুরে সাঁতার কাটে। তাদের দ্বারা যদিও কিছু হবে, কংক্রীটের জঙ্গলে বড় হওয়া এই সব কীটপতঙ্গের কারখানার প্রোডাক্টদের দ্বারা কিস্যু হবে না।
বাস্তবে শিশু শিক্ষার বদলে শিশুদের পঙ্গুত্বের সাধনায় মগ্ন অভিভাবক সমাজ। সর্বনাশের সব থেকে বড় কান্ডারী তারাই।