Friday, September 22, 2017

প্রযুক্তি এবং ইতিহাস-১

স্কুল লেভেল থেকেই ইতিহাস ভাষ্যের ( ন্যারেটিভ) দখল নেওয়ার কাজটা সব পার্টিই করে। কারন ভবিষ্যতের ক্যাডার তৈরীর জন্য, ওটা প্রথমে দরকার। রাজনৈতিক পার্টির অন্ধ সাপোর্টার বেস তৈরী করার ওটাই প্রথম ধাপ। আর সেই কারনে পৃথিবীর সব দেশেই ইতিহাসের ভাষ্য ভীষন ভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রানদিত। অর্থাৎ ইতিহাসের গল্পে হিরো-ভিলেন থাকে-এবং তাদের নির্মান করা হয় গল্পের মাধ্যমে । প্রয়োজন মাফিক। যদিও আমি যেটুকু ইতিহাস ঘাঁটি, তাতে এটাই আমার কাছে পরিস্কার হয়, ইতিহাসের আসল গল্পের হিরো কিন্ত কারিগড়রা। প্রযুক্তিবিদরা।

এই লেখাটাই বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করব- যেখানে ইতিহাসের গল্পটা, রাজনৈতিক প্রয়োজনে অন্যভাবে আমাদের জানানো হয়েছে ছোটবেলা থেকে।


ধরুন পলাশীর যুদ্ধ। মিরজাফর বিশ্বাসঘাতক, ক্লাইভ ভিলেন, সিরাজ ট্রাজিক হিরো। এটাই ভারতের ইতিহাসের মেইনস্ট্রিম ন্যারেটিভ। এবার ব্যপারটাকে একটু অন্যভাবে দেখি।

২৩শে জুন ১৭৫৭, রাত একটার সময়, ক্লাইভ, তার সেনাপতি মেজর কিলপ্যাট্রিক, মেজর কোটে এবং মেজর গ্রান্ট পলাশীর আম্রকুঞ্জে আশ্রয় নেন। সাথে মেরে কেটে ৩০০০ সেনা। কোন ঘোরসওয়ার ( ক্যাভেলারী) নেই। মোটে ৮ টা কামান, তার মধ্যে দুটো হাউতজার ( যা উচ্চ উচ্চতায় ছুড়ে অনেক দূরে গোলা ফেলা যায়)। কামানগুলোও ছোট ছোট-গোলার ওজন মোটে ছ পাউন্ড বা তিন কিলো। যেখানে নবাবের কামান ৫৩ টি-গোলার ওজন ১৮, ২৪ এবং ৩২ পাউন্ড। বিশাল বড় বড় কামান। প্রতিটা কামান টানতেই লাগত ত্রিশ থেকে চল্লিশটা মোষের গাড়ি।

২২ শে জুন থেকেই পলাশীর প্রান্তরে ক্যাম্প করে আছে নবাবী সেনা। তাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছা বিশেষ নেই। কারন তাদের মাইনে হয় নি। ১৯ শে জুন মুর্শিদাবাদ থেকে অনেকেই আসতে চাই নি। শেষে প্রচুর বোনাস দিয়েই তাদের আনতে হয়। সিরাজের মিসম্যানেজমেন্ট আরো সুবিধা করে দেয় মিরজাফরের চক্রান্ত-কারন সেনারাই যখন যুদ্ধে ইচ্ছুক না- মিরজাফরের চক্রান্তের বিরুদ্ধে তার সেনারা দেশপ্রেমের কারনে বিদ্রোহ করবে, তার লেশমাত্র নেই।

নবাবের বাহিনী বিশাল। মিরজাফরের কম্যান্ডেই আছে ১৪ হাজার ঘোড়াসওয়ার ৩৮ হাজার পদাদিক । মীর মদন মোহনলালের কমান্ডে আছে ৬ হাজার ঘোরসওয়ার, সাত হাজার পদাদিক। ৫৩ টি কামানের গোলন্দাজ বাহিনী আলাদা। এর সাথে ফরাসী গোলন্দাজ মসিয়ে ফ্রেজের আছে পঞ্চাশ জন গোলন্দাজ এবং ৬ টি কামান। মোদ্দা কথা মীরজাফরের সেনারা কিছু না করলেও মীর মদনের হাতে যে সেনা, ঘোড়া এবং কামান আছে-তাই দিয়েই জেতা উচিত।

এদিকে ক্লাইভ আছেন দোটানায়। মীর জাফর কি করবেন বলা যাচ্ছে না। কোন ঘাটের জল খাচ্ছেন বা খাবেন কেউ জানে না। দুদিন আগে মীর জাফরের প্রাসাদ ঘিরে তাকে বন্দী করেন সিরাজ। কারন তার কাছে খবর ছিল, মীর জাফর বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন। মীর জাফর কোরান স্পর্ষ করে প্রতিজ্ঞা করেছেন সিরাজের কাছে, বিশ্বাসঘাতকতা তিনি করবেন না। সেই খবর পৌছে গেছে ক্লাইভের কাছে। মীর জাফর যদি ক্লাইভের দিকে যুদ্ধ না করেন, শ্রেফ মীর মদনের ছ হাজার ঘোর সওয়ারই কচুকাটা করে দেবে তাদের।

সকাল আটটায় যুদ্ধ শুরু হয়। ফরাসী গোলন্দাজরা এবং নবাবের গোলন্দাজরা আগুয়ান ক্লাইভ বাহিনীর দিকে গোলা ছুড়তে থাকে। আধ ঘন্টায় ক্লাইভের প্রায় পঞ্চাশ জন মারা যায়। বেগতিক বুঝে ক্লাইভ পিছিয়ে এসে আম বাগানে লুকালেন। এতে নবাবের গোলার থেকে বেঁচে গেল কোম্পানীর সেনারা। সিরাজ ইনফ্যান্ট্রি ( পদাদিক ) পাঠালেন হাজার দশেক। কিন্ত এবার ক্লাইভের গোলন্দাজরা এবং বন্দুকবাজরা গুলি গোলা চালিয়ে তিন ঘন্টা আটকে রাখল তাদের। নবাবের প্রায় শ দুয়েক পদাদিক ঘায়েল-কিন্ত বৃটিশ ক্যাম্পে কেউ ঢুকতে পারল না।

মাত্র আটটা কামান দিয়ে কি করে এত বড় ইনফ্রান্ট্রি আটকানো সম্ভব-তার কারন ও উন্নত বৃটিশ প্রযুক্তি। কোম্পানীর সেনাদের কাছে ছিল ক্যানিস্টার শেল বা গ্রেপ শট। অর্থাৎ এই গোলা গুলির মধ্যে থাকে ছোট ছোট লোহার বল। যখন ফাটে -তখন এক সাথে ডজনে ডজনে গুলির মতন চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। এই ক্যানিস্টার শেলের জোরেই হুগলিতে নবাবের চল্লিশ হাজার সেনাকে আটকে দিয়েছিল মাত্র হাজার খানেক কোম্পানীর সিপাই আর দুটো কামান। যার জেরে সিরাজ দৌল্লা আলিনগরের সন্ধি করতে বাধ্য হোন।

সকাল এগারোটার সময় পলাশীর যুদ্ধের আসল ঘটনা ঘটে। মুশল ধারে বৃষ্টি নামে। নবাবের কামান ঢাকার কোন ব্যবস্থা নেই। কোম্পানীর লোকেরা তখন ত্রিপলের ( ট্রিপলিন ) ব্যবহার জানে কারন তা বৃটেনেই সদ্য আবিস্কৃত। ট্রারপলিন কথাটা এসেছে তার কারন প্রথম ত্রিপল যখন আবিস্কার হয়, তখন কাপড়ের ওপরে টার লাগিতে তা তৈরী হত। তখনো প্লাস্টিক আবিস্কার হয় নি। টারই ছিল বৃষ্টিনিরোধক। বৃষ্টির সময় নবাবের সব গোলা যখন ভিজে অকেজো-কোম্পানীর গোলাগুলি বা কামানের কিছু হল না। তা ছিল ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। মুশকিল হচ্ছে, কোম্পানীর সেনাদের কাছে যে ত্রিপল দিয়ে ঢাকার মতন প্রযুক্তি আছে -সেই খবরটাও পর্যন্ত পৌছায় নি নবাবের ক্যাম্পে। যার ফলে ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন মীরমদন ।

এদিকে বৃষ্টি যখন মুশলধারে, ক্লাইভ তার জেনারেলদের ডাকলেন। জিজ্ঞেস করছেন এই বৃষ্টির মধ্যে পালাই না এই ভাবেই চলুক? কারন মিরজাফর তখন ও দাঁড়িয়ে। ক্লাইভের দিকে তার সাহায্য না আসলে কচুকাটা করবে নবাব বাহিনী। সবাই গঙ্গা দিয়ে পালানোর দিকেই রায় দিলেন। ক্লাইভের সাথে আছে ২০০ বড় নৌকা। কাজটা কঠিন না। মীরজাফর কথা না রাখলে, পালাতে হবে-সেটা জেনে, দুশো নৌকাকে খুব কাছেই বেঁধে রেখেছেন ক্লাইভ। মেজর প্যাট্রিক বেঁকে বসলেন। প্যাট্রিক বল্লেন, বৃষ্টিতে ওদের কামান অকেজো হবে। ফলে ওরা পালাবে। ক্লাইভ সহ সবার মনে ধরল যুক্তিটা। দেখাই যাক। যদি নবাবের কামান অকেজো হয়ে থাকে বৃষ্টিতে তাহলে জয় নিশ্চিত।

বৃষ্টি থামে বেলা একটা নাগাদ। মীর মদন ভাবলেন এটাই সুযোগ ঘোড়া ছুটিয়ে কোম্পানীর সেনাদের কচুকাটা করার । কারন মীর মদন ভেবেছিলেন যেহেতু ক্লাইভের কামানগুলো নেতিয়ে গেছে জলে ভিজে, ক্যাভেলারি চার্জ আটকানোর ক্ষমতা নেই ক্লাইভের। একমাত্র ক্যানিস্টার চার্জের ভয়েই যুদ্ধের প্রথম তিন ঘন্টা কোন ক্যাভেলারি চার্জ করেন নি মীরমদন।

মীর মদনের ভুল সিদ্ধান্তে মাত্র কয়েক মিনিটেই যুদ্ধের ভাগ্য গেল ঘুরে। মীর মদন প্রায় দুহাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে কোম্পানীর কামান গুলোর দিকে ছুটে গেলেন। কিন্ত উনি জানতেন না ওগুলো কাজ করছে। ফলে শীঘ্রই কামানের ক্যানিস্টার শটে মীরমদন সহ সমগ্র ঘোরসওয়ার বাহিনীই আহত হয়।

মীর মদনকে আহত অবস্থায় দেখে সিরাজ মীর জাফরের কাছে টুপি খুলে অনুরোধ করলেন বৃটিশ দের আক্রমন করতে। মীরজাফর একদিকে সিরাজকে আসস্ত করলেন, অন্যদিকে ক্লাইভের কাছে খবর পাঠালেন সিরাজের দিক -যা ছিল রাইট ফ্ল্যাংক, আক্রমণ করতে।

ততক্ষনে ক্লাইভ বুঝে গেছেন নবাব পক্ষের একটাও কামান কাজ করছে না। ফলে মীর জাফর কি করবে সেই আশায় বসে থেকে লাভ নেই। ক্লাইভের সেনারা মিরজাফরের সেনাদের ও আক্রমণ করে। এমন অবস্থায় বেলা দুটোর সময় সিরাজ দু হাজার ঘোরসওয়ার সহ পালিয়ে যান মুর্শিদাবাদে।

এই সময় কিন্ত মীর জাফর সহ নবাবের সব সেনারাই যুদ্ধে নেমে গেছে। তারা গাদা বন্দুক হাতে আম গাছে আড়াল থেকে গুলি ছুঁড়েছে। কিন্ত তাই দিয়ে ক্যানিস্টার শেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতা সম্ভব না। একেতে যুদ্ধ করার তাগিদ এমনিতেই তাদের কম যেহেতু মাইনে নিয়ে অসন্তোষ আগে থেকে ছিলই। ওই সব দেশপ্রেম বলে তাদের কিছু ছিল না। তাদের কাছে নবাব ও বিদেশী, ক্লাইভ ও বিদেশী। ফলে নবাবের সেনারা আস্তে আস্তে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে যায়। বেলা পাঁচটার মধ্যেই ক্লাইভের জয় নিশ্চিত হয়ে যায়।

রাতের বেলায় মীরজাফর চিঠি পাঠান ক্লাইভকে যে তিনি দেখা করতে চান। ২৩শে জুন সকালে ক্লাইভ মিরজাফরের সাথে দেখা করেন এবং নির্দেশ দেন মুর্শিদাবাদে দ্রুত ফিরে সিরাজকে হত্যা করতে, যাতে সিরাজ তার ধণরত্ন নিয়ে না পালাতে পারে।

কিন্ত এরকম ইতিহাস লিখলে ভারতীয়দের মধ্যে দেশত্মবোধ জাগবে কি করে? ফলে ভারতের জাতিয়তাবাদের উত্থানের সময় মীরমদনের লড়াইকে দেখানো হল বীররসে

নবীন চন্দ্র সেন লিখলেন - ( কবিতা-পলাশীর যুদ্ধ )
" 
অকস্মাত্‍‌ একেবারে শতেক কামান 
করিল অনলবৃষ্টি 
ভীষণ সংহার দৃষ্টি। 
কত শ্বেত যোদ্ধা তাহে হল তিরোধান। "

 
মুশকিল হচ্ছে, শত কামান না, বৃটিশদের ছিল মোটে আটটি কামান। খুব পরিস্কারভাবেই নবীন সেন, এমন ভাবে লিখেছেন যেন ক্লাইভের ছিল প্রচুর সেনা এবং কামান-তার বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে দেশপ্রেমী নবাবের সৈন্যরা। না তেমন কিছু হয় নি। মুষ্টিমেয় কিছু কোম্পানী সৈন্যর সামনে, পালানোর প্রথম সুযোগেই নবাবের সেনারা পালিয়েছিল। এবং মিরজাফর যুদ্ধে নামলেও সিরাজ হারতেন ই। কারন সেই প্রযুক্তি। নবাবের সমর প্রযুক্তি ছিল নেহাতই আদ্যিকালের। বৃষ্টিতে কামান ঢাকার মতন নুন্যতম প্রযুক্তিও তাদের হাতে ছিল না।

ইতিহাসের এই নব মুল্যায়ন এই জন্যে গুরুত্বপূর্ন, ভারতীয় সমাজে বর্ণবাদের জন্য কারিগড়দের সমাজে উচ্চস্থান দেওয়া হয় নি। যতসব আটভাট গুলমারা ধর্মীয় দর্শন যারা কপচাতে পারে, ভারতীয় সমাজে উচ্চস্থান তাদের। মুসলমানরা আসাতে ভারতের বর্ণবাদ ত কমেই নি, বরং মুসলমান শাসকরাও ভারতের বর্ণবাদ টেকাতেই সচেষ্ট ছিলেন। কারিগড়, কৃষক বা উৎপাদকশক্তির যারা ধারক ও বাহক- তাদেরকে পায়ের নীচে রেখে, গুলবাজ দার্শনিকদের মাথায় বসানো ভারতে ট্রাডিশনে পরিণত। পশ্চিম বঙ্গের বাম শাসনকাল ও একই দোষে দুষ্ট। অনুৎপাদক বাম বুদ্ধিজীবিদের উৎপাদক শ্রেনীর মাথায় বসিয়ে বাঙালী জাতির সর্বনাশ করা হয়েছে । এবং এই সব সর্বনাশের শুরু হয় সেই সব ন্যারেটিভ থেকে যেখানে ইতিহাসে বা মানব সভ্যতায় কারিগড়ি বিদ্যার গুরুত্ব অগ্রাহ্য করে কখনো বাম, কখনো ডান চশমায় ইতিহাসকে দেখানো হয়।

পরে কিস্তিতে আরেকটা গল্প লিখছি।













Saturday, September 9, 2017

গৌরী লঙ্কেশ এবং হিন্দুত্ববাদি

(১)
গৌরী লঙ্কেশের নাম আগে শুনিনি। কন্নডভাষি কোন পত্রিকার সম্পাদকের নাম কেউ না জানতেই পারে। ব্যাঙ্গালোরে উনাকে কালকে গুলি করে মারা হয়। উনি একজন বাম লিব্যারাল ঘরানার সম্পাদক। হিন্দুত্ববাদিদের বিরুদ্ধে লিখতেন। আবার কংগ্রেসকেও গালাগাল দিতেন। উনার পত্রিকা লঙ্কেশ পত্রিকে। তবে ইদানিং কালে উনার সাথে সাপে নেউলে সম্পর্ক ছিল ব্যাঙ্গালোর বিজেপির। কে খুন করেছে এখনো পুলিস জানে না-কিন্ত অনুমান করা শক্ত না।
কন্নড় ভাষার এই রাজনৈতিক সাপ্তাহিকটি গোটা ভারতেই ব্যতিক্রম। এর প্রতিষ্ঠাতা গৌরীর পিতা পি লঙ্কেশ। ছাপা হয় কয়েক লাখ। কোন বিজ্ঞাপন এরা নেন নি কোনদিন। কারন বিজ্ঞাপন নিলেই দেহবিক্রি আবশ্যক। কোন রাজনীতিবিদকেই ছেড়ে কথা বলে না লঙ্কেশ পত্রিকে। কারুর তাবেদারি করে না। ফলে নীতিগত কারনে তারা কোনদিন বিজ্ঞাপন নেয় না। লসেই চলে পত্রিকা। কিন্ত ওদের পাবলিকেশন হাউসে বেশ কিছু কেরিয়ার সংক্রান্ত লাভ জনক প্রকাশনাও আছে।
পি লঙ্কেশের মৃত্যুর পরে পত্রিকার হাল ধরেন তার কন্যা। এখানেও ইতিহাস বর্ণময়। পি লঙ্কেশ কন্নড জাতীয়তাবাদি। উনিই বলেছিলেন হৃদয়ের কথা একমাত্র মাতৃভাষাতেই লেখা সম্ভব। গৌরী কিন্ত ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছাত্রী। মিডিয়া কমিউনিকেশনে ডিগ্রি নেওয়ার পরে বাবার পত্রিকাতে আসেন নি- জাতীয় লেভেলেই সাংবাদিকতা করেছেন কুড়ি বছর। এই কুড়ি বছর বাবার পত্রিকাতে একটিও লাইন লেখেন নি।
বাবার মৃত্যুর পরে যখন কর্পরেট হাউস ছেড়ে এই ঐহিত্যবাহী কন্নড় পত্রিকার হাল ধরেন গৌরী-উনি অকপটে স্বীকার করেন, এর আগে পর্যন্ত শুধুমাত্র মালিকপক্ষের জন্য লিখেছেন। নিজের পত্রিকা হাতে পাওয়ার পরে, কোন কম্প্রোমাইজ না করেই ভ্রষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেন গৌরী লঙ্কেশ। পরিনতি মৃত্যু।
কোন সন্দেহ নেই, ভারত এবং আমেরিকাতেও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এখন আগ্নেয়গিরির লাভাশ্রোত। শাসক দলের মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই, তাকে পিটিয়ে দাও, গালাগাল দাও। বেশী জ্বালালে মেরেই দাও!!
রাজনৈতিক অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ। জৈন ধর্মে আমরা শিখি অনেকান্তবাদ। অর্থাৎ একই বাস্তবতার অনেক রূপ থাকতে পারে। কেউ বামপন্থী, কেই দক্ষিনপন্থী দৃষ্টিতে তার সমাজ, রাষ্ট্রকে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক। তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি, বিবাদ সব কিছুই হতে পারে। কিন্ত সেই বিতর্কের জায়গাটা না থেকে যদি তারা দাবী করে দক্ষিন পন্থী জাতিয়তাবাদই একমাত্র পথ, বা বামপন্থাই পথ-তাহলে দুদলই ফ্যাসিজমের শব সাধক।
গৌরী লঙ্কেশ একজন বামপন্থী। উনার লেখা সাবেকি বাম ঘরানার। মাওবাদিদের সমর্থনেও উনি লিখেছন। কিন্ত রাজনৈতিক ভাবে উনার বিরোধিতা না করে যখন, বুলেট দিয়ে কলম থামাতে হয়, সেটা সুস্পষ্ট ভাবেই ফ্যাসিজমের প্রতিধ্বনি।
তবে আমি আশাবাদি। আস্তে আস্তে অর্থনীতি ক্রমশ হাতুড়ে অর্থনীতিবিদদের হাত থেকে সলিড বিগ ডেটা মডেলে আসছে। যার মানে খুব নিকট অতীতেই, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও চালিত হবে ডেটা সিম্যুলেশন এবং এলগোরিদম থেকে। সেখানে বামপন্থা, বা দক্ষিনপন্থা রাজনীতির ভূমিকা থাকবে কম- গণিতের ভূমিকা থাকবে বেশী। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যত বেশী ডেটা সিম্যুলেশন, গেম থিওরীর সাহায্য নেওয়া যাবে-দেশ এবং দশের তত সুদিন আসন্ন। বামপন্থা, দক্ষিনপন্থা ইত্যাদির রাজনৈতিক আইডিওলজির ওপর দেশ চালাতে গেলে, ভরাডুবি সময়ের অপেক্ষা।
একবিংশ শতাব্দিতে বিংশ শতাব্দির রাজনৈতিক আদর্শ অচল নয়া পয়সা। অথচ ভারত, আমেরিকাতে সেই বাতিল আদর্শেরই আজ রমরমা।
আমি অফিসে ঢুকে আমেরিকান কোম্পানীর জন্য অত্যাধুনিক কোডিং করব, বাড়িতে ঢুকে হনুমান চল্লিশা- আর রাজনীতির বেলায় আদ্দিকালের জাতীয়তাবাদি, ধর্মবাদি, ধর্মঘটবাদি, টুপিবাদি ইত্যাদি বাতিল রাজনৈতিক তত্ত্বের চর্চা-খুব বেশীদিন এতগুলো স্ববিরোধিতা একত্রে চলতে পারে না।
(২)
গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুতে স্যোশাল মিডিয়াতে একদলের পৈশাচিক উল্লাশ। ট্রলের ঢল টুইটারে। নতুন কোন অভিজ্ঞতা না। অভিজিতের মৃত্যুতে যেমন ফেসবুকে উৎসব করেছিল কিছু বাঙালী মুসলমান, আজ গৌরীর মৃত্যুতে প্রকাশ্যে উল্লাসিত কিছু কট্টরপন্থী হিন্দু। গৌরী লঙ্কেশের "অপরাধ" উনি হিন্দু ধর্মের কট্টর সমালোচক ছিলেন! অভিজিতের অপরাধ, সে ইসলামের সমালোচক ছিল!
২০০৭ সালে ষষ্টি দুলে বলে একজন তৃনমূলীকে, তার সাত বছরের ছেলের সামনে চোখে উত্তপ্ত রড ঢুকিয়ে হত্যা করেছিল সিপিএমের হার্মাদ বাহিনী। সেই সময় স্যোশাল মিডিয়াতে সিপিএমের হার্মাদ ট্রলরা একই দাবী করে-ষষ্টি নাকি ছিল ফরেদারদের দালাল-শ্রেনী শত্রু-তাই তার নৃশংস হত্যা জায়েজ। আমি ওই ঘটনার পর থেকে অনেক ভদ্রবেশী সিপিএম সমর্থককেও আনফ্রেইন্ড করতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেটা অর্কুটের যুগ।
অভিজিতের মৃত্যুতে কিছু বাংলাদেশী মুসলমানদের উল্লাসে এটা পরিস্কার ছিল, ধর্ম এদের মানুষের বদলে অমানুষ বানিয়েছে। তবে তারা আমার ফ্রেইন্ড লিস্টের লোক না। ফলে আনফ্রেইন্ড করার ঝামেলা নিতে হয় নি। আজকে ফ্রেইন্ডলিস্টের বেশ কিছু হিন্দুত্ববাদিদের আনফ্রেইন্ড করতে বাধ্য হলাম। ঠিক যেভাবে ষষ্টিদুলে হত্যার পরে, অর্কুট জমানাতে কিছু ফ্রেইন্ড লিস্টে থাকা কিছু সিপিএমকে আনফ্রেইন্ড করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
যারা মানুষের জীবনের থেকে, নিজের ধর্ম, জাতি, রাজনীতিকে বেশী গুরুত্বপূর্ন মনে করে- এতটাই বেশী গুরুত্ব দেয় যে তার জন্য খুনকেও সমর্থন করে গর্বিত পশু হতে চাইছে-তাদের এই অধপতনকে যদি নাগরিক সমাজ নীরবে প্রশয় দিতেই থাকে, একদিন না একদিন সেই ঘৃণার বিষবাস্পে সমাজে বসবাস করাই অসম্ভব হবে।
কোন ধর্ম, কোন রাজনৈতিক আদর্শই মানুষের জীবনের থেকে বড় হতে পারে না। ধর্ম, রাজনীতি সবকিছুই মানুষের জন্য-সুতরাং মানুষ মেরে যদি কেউ ভাবে তার ধর্ম, তার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পাবে-সে মূর্খ। লেনিন, স্টালিন কোটি কোটি লোক খুন করে তাদের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন?? বরং ইউরোপীয়ান ইউনিয়ানে আইন এনে স্টালিনকে হিটলারের সম পর্যায়ের খুনী বলে স্বীকার করা হয়েছে হলডোমার জেনোসাইডের হোতা হিসাবে।
ঠিক তেমনি ভাবে বাংলাদেশে ১০০% ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্য, প্রতিদিনই দেখি কিছু হিন্দুকে হত্যা করা হচ্ছে, ঘরবাড়ি পোড়ানো হচ্ছে।
ভয় দেখিয়ে ভারতে পাঠানো হচ্ছে। এতে কি বাংলাদেশে ১০০% ইসলাম আসবে? সেসব কিছুই হবে না। পাকিস্তানের মতন জঙ্গীরাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ যে উনি অন্তত বেশ কিছু জঙ্গী সাফ করে কিছুটা হলেও উঠোন পরিস্কার করেছেন।
ভারতেও এখন যারা হিন্দুত্ববাদের সেন্ট্রাল থিমকে চ্যালেঞ্জ করছে, তাদের নানান ভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে। এক্সট্রিম কেসে মেরে ফেলাও হচ্ছে। মহত্মা গান্ধীর খুনী নথুরাম গডসে মূর্তি বসিয়ে পূজা হচ্ছে!! এই ভাবে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে? শ্রীচৈতন্যের আমলে অনেক ধর্মান্তরিত মুসলমান, আবার বৈষ্ণব ধর্মের প্রেমের আঁচলে ফিরে আসে। তাকে তার জন্যে খুন খারাপি গোরক্ষা কমিটি বানাতে হয়েছিল?
জাতি, ধর্মের কারনে হত্যা নতুন কিছু না। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম দিন থেকেই এগুলো ছিল। বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতেও আমাদের সেই মৃত্যুভয়ে কাটাতে হবে ?
অথচ প্রাচীন ভারতেই ছিল মুক্ত চিন্তার স্বাধীনতা। গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর-এরাও হিন্দু ধর্মকে, বেদকে চ্যালেঞ্জ করেছেন- কেউ কি তাদের হত্যা করেছে সে দিন ?
তাহলে কিকরে এটা সম্ভব, গৌতম বুদ্ধ যে মুক্তমনের স্বাধীনতার পরিবেশ আড়াই হাজার বছর আগে পেয়েছিলেন, একবিংশ শতাব্দির ভারত, তা গৌরী লঙ্কেশ, এম এম কুলবর্গী, গোভিন্দ পানসেরকে দিতে অক্ষম?

ধংসযজ্ঞের ঘৃতাহুতি

এই সপ্তাহটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘনঘটা। রবিবার ফ্লোরিডাকে দুরমুশ করবে ক্যাটেগরী-৫ হারিকেন ইরমা। এখন সে কিউবার উত্তরে। ফ্লোরিডার প্রায় সব বাসিন্দারাই থাকে এর নয়নাভিরাম সৈকত শহরগুলিতে। সেখান থেকে সবাইকে আপাতত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রায় এক কোটি লোক, নিজের বাড়িঘর ছেরে অন্যত্র-দেখছেন রবিবার দুপুরে ইরমা তাদের বাড়ির আস্ত রাখবে কি না।

শুধু ইরমা না। ইরমার উত্তর দিকে আরেকটা ক্যাটেগরী-৪ হারিকেন এগোচ্ছে- হারিকেন হোসে। সেটাও ক্যাটেগরী ফাইভ হয়ে পূর্ব উপকূলে ঝাঁপাতে পারে আগামী সপ্তাহের বুধ বৃহস্পতি নাগাদ।

আটলান্টিকের ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে দুটী হারিকেনের একত্রে উদ্ভব- বিরল ঘটনা। হয়ত গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জন্য, এটাই এখন বারে বারে ঘটবে। আরো বেশী ঝড়, বৃষ্টি। এবং ধ্বংসলীলা বা মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিশোধ।

সেপ্টেম্বার মাসটাকে আমেরিকাতে বলে হ্যারিকেন সিজন। এই সময়টাতে ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে অনেক সাইক্লোন তৈরী হয়-এর মধ্যে গুটিকয়েক আস্তে আস্তে উষ্ণবাস্প সংগ্রহ করে আরো বেশী গতিবেগে হারিকেন হয়ে ঝাঁপিয়ে পরে মূলত আমেরিকার দক্ষিনপূর্ব উপকূলে।

আমেরিকান হারিকেনের সাথে প্রথম সাক্ষাত ২০০২ সালে। সেপ্টেম্বের এর ঠিক এই সময়টাতেই সেবার পূর্ব উপকূল তছনচ করেছিল হারিকেন গুস্তাভ। তবে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে সে যখন নিউ জার্সিতে পৌঁছায়, তখন সে দুর্বল ক্যাটেগরী ওয়ান হারিকেন। তাতেই গাছের ডাল ভেঙে এমন অবস্থা, রাস্তা ঘাট অনেক জায়গায় আটকে যায়। দুদিন বাড়িতে কারেন্ট ছিল না। আর আমেরিকাতে পাওয়ার না থাকলে কি বিভৎস অবস্থা হয়, সেই অভিজ্ঞতাও প্রথম। ফ্রিজ থেকে মাছ মাংস ফেলে দিতে হয়েছিল।

দ্বিতীয় এবং সর্বাধিক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ২০১২ সালে, মেরীল্যান্ডে। হারিকেন স্যান্ডি সেবার ক্যাটেগরী-৩ হারিকেন। সাইক্লোনের চোখ আমার বাড়ি থেকে ১৫০ মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে-কিন্ত তাতেই গাছের ডালের অজস্র আঘাতে বাড়ির ছাদ এবং দেওয়ালের প্রচুর ক্ষতি হয় সেবার। ছয়দিন থাকতে হয়েছে পাওয়ার ছাড়া-কারন, লাইন ছিন্নভিন্ন। অবস্থা এতই খারাপ ছিল, পাওয়ার লাইন মেরামতের জন্য, গোটা আমেরিকার অন্যান্য পাওয়ার কোম্পানী ৫০,০০০ লোক পাঠায় বাল্টিমোর পাওয়ারকে। এই ঘটনায় বাল্টিমোর পাওয়ার ইলেক্ট্রিক কোম্পানীর এত দুর্নাম হয়-ওরা এর পরের থেকে সব ট্রান্সমিশণ পাওয়ার লাইন, আন্ডার গ্রাউন্ড বানানো শুরু করে।

এই সপ্তাহে আরো তিনটে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে বা ঘটার ইঙ্গিত আছে।

ইয়োলোস্টোন ন্যাশানাল পার্কে ঘন ঘন ভূমিকম্পের আভাস মিলেছে। ইয়োলোস্টোন ন্যাশানাল পার্ক বসে আছে এক সুপার ভলকানোর ওপরে-যার পাঁচ মাইল নীচে আছে নিউয়ার্ক সিটির তিনগুন বড় জ্বলন্ত লাভা চেম্বার। প্রতি ৬৪০,০০০ বছর বাদে একবার করে হয়েছে সুপার ভলকানিক ইরাপশন। সেই পিরিয়ড অনেকদিন হল পেরিয়েছে, বিজ্ঞানীরা জানেন একটি বড় সুপার ভলকানিক ইরাপশন এখন অপেক্ষা মাত্র। তবে তা এখনই হবে না আরো হাজার হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে, তা জানা নেই। সুপার ভলকানিক ইরাপশন , এক্সটিংশন লেভেল ইভেন্ট। ভলকানিক ইরাপশন থেকে আরাই ট্রিলিয়ান টন ছাই এবং গ্যাস বেরোবে। দশ বছর গোটা পৃথিবীর আকাশ ঘিরে থাকবে ছাই। ফসলের উৎপাদন ধ্বংস হবার ফলে প্রায় পৃথিবীর প্রায় ৯০% লোক অনাহারে থাকবে, ধ্বংস হবে আমেরিকার ৯৫% শহর জনপদ। তবে আশার কথা বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ভূমিকম্পের ফলে ম্যাগমা চেম্বারের পরিবর্তন এখনো তারা দেখছেন না। যদি এই ভূমিকম্পের ফলে ম্যাগমা চেম্বার একটুও নড়ে, গোটা পৃথিবীর স্টক মার্কেটে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠবে।

কাল মেক্সিকোতে বিরাট ভূমিকম্প হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগর বরাবর। কিন্ত জনবহূল এলাকাতে না হওয়াতে ক্ষয় ক্ষতি কম।

গত বুধবার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এসেছে, এই দশকের সব থেকে শক্তিশালী সৌড়ঝড়। সূর্য্যের করোনার একটি বড়সর বিস্ফোরন থেকে তৈরী এই প্লাজমা ঝড় পৃথিবীর রেডিও কমিনিউকেশন স্তব্ধ করেছে প্রায় এক ঘন্টা।

যেটা দেখা যাচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ই হোক বা লুমিং সুপার ভলকানিক ইরাপশন -অনেক কারনেই মানুষের ভবিষ্যতের সামনে প্রশ্ন চিহ্ন। এগুলোর সমাধান ট্রিলিয়ান ডলারের রিসার্চ এবং প্রযুক্তি দাবি করে। যেমন নাসা, একটি ওপেন প্রোজেক্ট দিয়েছে এবার-কি করে ইয়োলোস্টোনের লাভাকে আস্তে আস্তে ডিফিউজ করা যায়। বর্তমানে তাত্ত্বিক সমাধান-যখন দেখা যাবে প্রাক্টিক্যাল কিছু সম্ভব-হয়ত মেগা প্রোজেক্টে হাত দেবে সরকার। কিন্ত ইয়োলোস্টোনের তলায় শুয়ে থাকা টাইম বোম্বকে ডিফিউজ করতে না পারলে, গোটা পৃথিবীর সভ্যতা ধ্বংশ হতে পারে যেকোন সময়।

অন্যদিকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং কমানোর জন্য বাতাসের কার্বন ডাই ওক্সাইড কি করে রক বা পাথরে শুষে নেওইয়া যায় তার জন্যেও আবিস্কৃত হচ্ছে অনেক প্রযুক্তি।

মুশকিল হচ্ছে এখনো এই সব গবেষনাতে শুধুই সরকারি ফান্ড। অথচ এখানেই দরকার সব থেকে বেশী টাকা না হলে মানুষ বলে এই প্রজাতিটাই পটল তুলবে। সেটা না করে সব দেশেই সব থেকে বেশী টাকা যায় মিলিটারীর পেছনে। মিলিটারি প্রযুক্তির পেছনে।

আমি বহুদিন আগে লিখেছিলাম, মানব সভ্যতার সামনে ইয়োলোস্টোনের মতন ক্রাইসিস থাকা ভাল। কারন সেক্ষেত্রে সবাই যুদ্ধাস্ত্রের পেছনে খরচ কমিয়ে, একত্রে মানব সভ্যতাকে বাঁচানোর জন্য গবেষনায় টাকা ঢালবে। তাতে এই তেলের জন্য যুদ্ধ, জিহাদি, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি কমবে। ক্রাইসিসের সামনে শ্রেফ বাঁচার জন্য মানুষ জাতীয়তাবাদি, সাম্রাজ্যবাদি, ধর্মবাদি এজেন্ডাগুলোকে পেছনে রেখে, আন্তর্জাতিক হবে-কারন এই ধরনের বিরাট বৈজ্ঞানিক সমাধানের জন্য পৃথিবীর প্রতিটা বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদকে দরকার।

আমাদের উদবৃত্ত পুঁজি( ট্যাক্স ডলার) যদি ধ্বংসের যজ্ঞের ( যুদ্ধ) ঘি হিসাবে না ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই টাকায় এই সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আটকানোর জন্য প্রযুক্তির উদ্ভাবন সম্ভব।

আমাদের রাজনীতি এবং সভ্যতা-দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ। শুধুই এই কারনে যে কি করে একটি উন্নত প্রজাতি নিজেদের বাঁচানোর জন্য গবেষনা না করে, নিজেদের মৃত্যু সাধনার গবেষনায় টাকা ঢালে?

Sunday, September 3, 2017

ভবিষ্যতের জন্য বাচ্চাদের তৈরী করুন

আজ সকালে একজনের সাথে কথা হল। বেচারা প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিটেকের পরে এম টেক, এম বিএ সব কিছু করে ফেলেছে। এর পরেও চাকরি মেলে নি-এখন একটা ছোট্ট প্রাইভেট ফার্মে মোবাইল ডেভেলেপার হিসাবে হাজার পনেরোই কাজ করছে। যে কাজের জন্য ক্লাস এইট পাশ বিদ্যাই যথেষ্ট।

মফঃশহরগুলোতে ঘরে ঘরে ছেলে মেয়েরা এম এ, এম এস সি , বি এড পাশ করে বসে আছে কবে এস এস সি হবে! অনেকেরই বয়স আস্তে আস্তে বাড়ছে। যাদের ফ্যামিলিতে অপেক্ষা করার অবস্থা না, তাদের অনেকেই প্যাথোলজি, ট্রাভেল টুরিজমে ইত্যাদি টেকনিক্যাল কোর্স করে ভারতের অন্যত্র চাকরি পেয়ে চলে যাচ্ছে। একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা ঘরে ঘরে।

উলটো চিত্রও আছে। গত ছবছর পশ্চিম বঙ্গে ধর্মঘট নেই। ফলত, কোলকাতার আশেপাশের ছোট ছোট ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটগুলো কিন্ত আস্তে আস্তে বাড়ছে। তারা ওয়েল্ডিং, ফিটিং এর জন্য অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান পাচ্ছে না। আমি এমন প্রোডাকশন ম্যানেজার ও জানি দুবার কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েও লোক পাচ্ছে না। লাল জমানার শিল্প শ্মশান বাংলা ছেড়ে, ফ্যাক্টরি টেকনিশিয়ানরা পশ্চিম বঙ্গের বাইরে বহুদিন হল চলে গেছে। বাংলা তথা পশ্চিম বঙ্গের ওপরে ভরসা নেই অধিকাংশ প্রবাসী বাঙালীর। ফলে অবস্থার উন্নতি হলেও কেউ ফিরতে চাইছে না! আই টি প্রোগ্রামিং এর ক্ষেত্রেও এক অবস্থা। একটু এডভান্সড প্রোগ্রামার দরকার হলেই কোলকাতায় কাউকে পাওয়া যায় না। যত উচ্চকোটির বাঙালী প্রোগ্যামার পাবেন, সব প্রবাসে। কেউ কোলকাতায় ফিরতে চাইছে না। অথচ কোলকাতা এখন ব্যাঙ্গালোর পুনের চেয়ে ভাল শহর। কিন্ত চাকরি হারালে অন্য চাকরি নাও পেতে পারে বলে, কেউ ফিরতে চায় না কোলকাতায়। ৩৪ বছরের সিপিএম জমানায় কি ক্ষতি হয়েছে বাংলার বলে বোঝানো মুশকিল। বাম-মোহ-মদে একটা ইন্টেলেকচুয়াল প্রজন্ম সম্পূর্ন হারিয়েছি আমরা ।

সমস্যাটা কোথায়? আজকে যারা ক্লাস সেভেন এইটে পড়ছে-তারা জব মার্কেট ঢুকবে ২০২৭-২০৩০ সাল নাগাদ। তখন কিসের জব বাজারে চলবে কেউ জানে না। বাপ-দাদারা যে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছে, সেই জীবিকাটাই থাকবে না। প্রযুক্তি এবং অটোমেশনের গতি এখন এতটাই দ্রুত। এমন কি যাদের বাপের দোকান আছে, তারাও নিরাপদ না। ইকর্মাস ছোবল মেরেছে সেখানেও। আমার চেনা এক গড়িয়াহাটের এক দোকানি জানালেন পুজোর মরশুমে বিক্রি কমেছে অন্তত ৩০%। কারন ইকর্মাসে জিনিসপত্র অনেক সস্তা।

তাহলে আমাদের বাচ্চাদের কোন পথ দেখাবো? তথ্যই এখানে সহায়ক। গত চার বছরের ট্রেন্ড যা-তাতে চারটি স্কিল স্কুল থেকে আয়ত্ব করলেই বাচ্চাদের ভাল। ১) পাইথন /জাভা স্ক্রিপ্ট কোডিং ২) ওপেন সোর্স ইলেকট্রনিক্স, যেমন র‍্যাসবেরী পাই এর ওপর কোডিং ৩) স্টাটিস্টিক্স বা সংখ্যাতত্ব এবং সেই সংক্রান্ত কোডিং ও এলগোরিদম ৪) ক্রিয়েটিভ কমিনিউকেশ স্কিল-পাতি কথায় গল্প বলার ক্ষমতা। যা বেচতে এবং মার্কেটিং এ লাগে।



স্কুল কলেজের সিলেবাস, শিক্ষক, পরিবেশ, পদ্ধতি এই মুহুর্তে সম্পূর্ন ইউজলেস। কারন ভারত এবং বাংলায় যারা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত তাদের কারুর আইডিয়া নেই জব মার্কেট নিয়ে। হয়ত সেটা সম্ভব ও না। কারন পৃথিবী এবং প্রযুক্তি বদলাচ্ছে দ্রুত।