Sunday, June 18, 2017

ব্লক চেইন- প্রযুক্তির মাধ্যমে কি মানবসাম্য সম্ভব?

( আমি আগের লেখা গুলোতে দেখিয়েছি কিভাবে আধুনিক প্রযুক্তির গতি আসাম্যের অস্থিরতা ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। আজকে লিখছি আরেকটা যুগান্তকারী প্রযুক্তি- ব্লকচেন নিয়ে-যা এই মানব অসাম্য দূর করার ক্ষমতা রাখে। সুতরাং টানেলের শেষে কিছু আলো এখনো অবশিষ্ট আছে )

(১)

ধনের ধর্মই অসাম্য। প্রযুক্তি যেহেতু বর্তমানে ধনের সৃষ্টিকর্ত্তা, খুব স্বাভাবিকভাবেই উন্নত প্রযুক্তির আগমনের সাথে সাথে ধনী দরিদ্রের পার্থক্যও ক্রমবর্ধমান। বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক  অস্থিরতার সেটাই মূলকারন। ১% লোকের হাতে বিশ্বের ৫৬% সম্পত্তি।

      ইসলামিক বা মাওবাদি সন্ত্রাসবাদও উপোরক্ত ন্যারেটিভের বাইরে নেই। ইসলাম সহ প্রায় সব ধর্মের উত্থান সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি আন্দোলন হিসাবে।  বর্তমান রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারন মানুষ সর্বত্র এতই অসন্তুষ্ট-সে বাস্তবতার থেকে  রূপকথার কল্পরাজ্যে বাস করতে চাইছে!  কখনো ইসলামি খিলাফত, কখনো বিংশ শতাব্দির লুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়ান-কখনো বা বৈদিক সমাজের ফেরিয়াওয়ালাদের কথায় সে আজ আকৃষ্ট!  যুবসমাজের মধ্যে অসাম্য এবং তজ্জনিত রাজনৈতিক হতাশাই জন্ম দিচ্ছে চরমপন্থী রাজনীতির ।  সন্ত্রাসবাদি বোমার আঘাতে আপনার বা আমার ভবলীলা ফুটে যাওয়াটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আমরা বারুদের ওপর বসে-শুধু অন্ধ হয়ে কালবৈশাখীর ঝড়ের আগমন বার্তাকে উপেক্ষা করছি মূর্খের মতন।

   আমি বহুদিন থেকে দেখেছি, নিধার্মিক লোকেরা একটা প্যারাডক্সের উত্তর দিতে ব্যর্থ।  সেটা এই যে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে দ্রুত। সুতরাং আরো  দ্রুত এবং ব্যপকভাবে লোকেদের বোঝা উচিত ধর্ম এবং তাদের অবতাররা রূপকথার চরিত্র।  আমেরিকা এবং ইউরোপে এমনটা হলেও-বাকী বিশ্বে ফল উলটো।  লোকজনের ধর্মচর্চা বেড়েই চলেছে। এই প্যারাডক্সের সমাধান কি?  আমার মনে হয় এর মূল কারন - জীবনে নিরাপত্তার অভাব! আর এটা বেড়েই চলেছে। হটাৎ দেখি চারিদিকে বাবা লোকনাথের রমরমা।

      কারন?  এই লোকনাথ বাবা একদম বুলস আইতে হিট করেছেন-নিরাপত্তা, নিরাপত্তা, নিরাপত্তা। মানুষ যখন বাস্তবে রাজনৈতিক সিস্টেমের কাছে নিরাপদ আশ্রয় পেতে ব্যার্থ-অগত্যা ভরসা সেই অলীক ধর্মীয় আশা-সরকারের পুলিশ না বাঁচালেও বাবা লোকনাথ বাঁচাইবেন!

ভাবছেন ব্লকচেন প্রযুক্তির আলোচনায়, কেন বাবা লোকনাথকে নিয়ে টানছি?

  ব্লক চেইন প্রযুক্তির কার্যকারিতা বুঝতে প্রথমে    জীবনে নিরাপত্তার ভূমিকা নিয়ে   একটা গ্রাউন্ড রিয়ালাইজেশন দরকার-  "নিরাপত্তা" এবং "বিশ্বাস"-এই দুটি আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতি সবকিছুর ভিত্তিভূমি।

 রাষ্ট্রের উদ্ভব, রাজার উদ্ভব-সব কিছুর পেছনে বাণিজ্যের নিরাপত্তা।  পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্র এবং রাজার জন্ম মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়। তামার খনি থেকে তামার কারিগরদের কাছে কাঁচামাল আসত ২০০ মাইলের পাহাড়ি রাস্তা ধরে। তার নিরাপত্তা দিতে প্রথম রাষ্ট্রের সূচনা হয় পৃথিবীতে প্রায় চার হাজার বছর আগে।

 উলটো দিক দিয়ে ভাবুন। ধরুন পৃথিবীর সব লোক সৎ। আপনি যার সাথে যা চুক্তি করছেন, ঠকে যাওয়ার কোন ভয় নেই! চুরি ডাকাতি রাহাজানির ভয় নেই। সেই পৃথিবীতে কি গর্ভমেন্টের দরকার হত ? দরকার হত ব্যঙ্কের? পুলিশ বা মিলিটারির? উকিল আদালতের?  ভারত পাকিস্তানের? ধর্মের?

 এই ব্যপারটা বোঝা দরকার। আমাদের জীবনে নিরাপত্তার অভাব-কারন মানুষ সম্পূর্ন ভাবে সৎ না। ফলে সরকার, ব্যঙ্ক, আদালত -ইত্যাদি থার্ড পার্টি বা  ইন্সটিটিউশনাল মিডলম্যান ( সংগঠিত দালাল) দরকার । সরকার এক অর্থে বৃহত্তম দালাল-যে একটা বিরাট ট্যাক্স নেওয়ার বিনিময়ে আইন, ইনফ্রাস্টাকচারের নিরাপত্তা দেয়।  বাবা লোকনাথ এবং সরকারের টিকি -একজায়গায় বাঁধা।

নিরাপত্তার সন্ধানে উদ্ভ্রান্ত মানব।

(২)

  এবার ধরুন আমদের ট্রান্সজাকশনগুলো যখন ডিজিট্যাল হচ্ছে-তখন এমন কিছু করা সম্ভব যে থার্ড পার্টি-ওই সে সরকার বা পেটিএমকে হঠিয়ে আপনার এবং আমার মধ্যে যা ডিল হচ্ছে তাতে দালাল থাকবে না? আমি আপনাকে যখন পেটিএম দিয়ে ১০০০ টাকা পে করছি-সেখানেও কিন্ত থার্ড পার্টি দালাল আছে। সে হচ্ছে পেটিএম। প্রতিটা ট্রান্সাকশনে একটা টাকা খাচ্ছে।  সে কমিশন খাক। সেটা সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে এই যে আপনার আমার মধ্যে ফাইন্যান্সিয়াল ট্রান্সজাকশনের জন্য একটি থার্ড পার্টি লাগছে-এর মানে গর্ভমেন্ট ও ইনভল্ভড।

 অথচ দেখুন ডিমনেটাইজেশনের যুগে গ্রামে আদিম বিনিময় অর্থনীতি ফিরে এসেছিল । অনেক গ্রামেই টাকার অভাবে চালের বদলে তেল বিনিময় হয়েছে। সেই বিনিময়ে কিন্ত কোন "থার্ড পার্টি"  সরকার বাহাদুর নেই। এই বিনিময় অর্থনীতি বদলে যখন টাকা দিয়ে আপনারা দুজন জিনিস কিনছেন তখন কিন্ত সরকার বাহাদুর হাজির! কারন টাকা ছাপায় সরকার বাহাদুর! আপনারা দুজনেই বিশ্বাস করছেন "টাকার ভ্যালুকে"-টাকার নিরাপত্তাকে। কারন টাকার মালিক সরকার!

 সুতরাং সরকার, ব্যাঙ্ক, পেটিএম, আদালত ইত্যাদি থার্ড পার্টি বিলুপ্ত করতে প্রথমেই যে প্রশ্নটা করা দরকার-এমন কিছু প্রযুক্তি সম্ভব-যা শুধু মাত্র নিজেদের মধ্যে বিনিময় অথচ--১০০% নিরাপদ?

  ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় পৃথিবীর সব বড় বড় ব্যাঙ্কগুলিও প্রায় ফেইল করতে বসেছিল।  অর্থাৎ থার্ড পার্টির নিরাপত্তাও খুব কাজে আসছিল না। থার্ড পার্টিকেও যখন বিশ্বাস করা কঠিন-এমন অবস্থায় জাপানের এক কম্পুউটার বিজ্ঞানী সাকাসি নাকামোতো একটি পেপারে দেখালেন-ডিজিটাল কারেন্সি সম্ভব "ব্লক চেইন" বলে একধরনের ক্রিপ্টগ্রাফিক প্রযুক্তির মাধ্যমে। ২০০৯ সালে কিছু সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়াররা তৈরী করে ফেললেন পৃথিবীর প্রথম ক্রিপ্টোগ্রাফিক কারেন্সি বিটকয়েন। যা কোন সরকারের না। দেশের বাউন্ডারী মানে না। এর ভ্যালুয়েশন যারা ব্যবহার করছে এই কারেন্সি-তাদের কাছেই।

 বিটকয়েনের থেকেও গুরুত্বপূর্ন এর প্রযুক্তি ব্লকচেইন।  যা শুধু কারেন্সি না-আইডেন্টি, রিয়াল এস্টেট রেজিস্ট্রেশন, গান, পেটেন্ট, সিনেমার কপিরাইট-মোদ্দা কথা "ওনারশিপ" বা মালিকানা বলতে যা বোঝায়, তাতে কাজে লাগানো যায়।

 আমি ব্লক চেইন কিভাবে কাজ করে সেই প্রযুক্তিগত জটিলতায় ঢুকলাম না, শুধু এর স্যোশাল ইম্প্যাক্ট নিয়েই লিখছি।

  প্রশ্ন হচ্ছে এতে নতুন কি?  আগে রাষ্ট্র নিশ্চিত করত ধনী লোকেদের মালিকানা-এখন তা নিশ্চিত হচ্ছে ব্লক-চেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে!  এতে সাম্যের গন্ধ লাগালেই ত হল না?

  এই খানে আরেকটু গভীরে ভাবতে হবে। আমি তত্ত্বে না গিয়ে বাস্তবের একটা উদাহরন দিই।  আমি যে শ্রম দিই-তার মালিক এবং বিক্রেতা যদি আমি হই, তাহলেই ধনী দরিদ্রের পার্থক্যের অনেকটা স্বাভাবিক নিয়মেই ঘুচে যাবে। যেমন ধরুন যে গায়ক।  হেমন্ত, জর্জবিশ্বাসের যুগে এরা একেকটা এলবামের জন্য তখনকার দিনেও দশ বিশ হাজার টাকা পেতেন। রেকর্ড কোম্পানী রয়াল্টি বাবদ দিত। বর্তমানে কোন রেকর্ড কোম্পানী তাদের কত দিত? এক টাকাও না। কারন গান বেড়োলেই পাইরেটেড হয়ে ইউটিউবে চলে আসবে।  ব্লকচেইন সিস্টেমে গান রিলিজ করলে এটি হবে না-গান বেচা থেকে গানটি যাতে কেউ কপি করে ইউটিউবে না তুলে দিতে পারে, তার সব সুরক্ষা ব্লক চেইনে হাজির।

 এতে লাভ সেই গায়কের ( যে আসলেই নিজেই নিজের প্রডিউসার)। সে নিজেই নিজের প্রডাকশন কোম্পানী চালাতে সক্ষম-কারন বিক্রি, থেকে বেচার নিরাপত্তা-সবটাই ব্লক চেইনে সে পাবে। এই ব্যপারটা যে কোম্পানীর একজন সাধারন কর্মী-তার জন্যেও সম্ভব। এখন একজন সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ার মাইনে পাচ্ছে। ব্লক চেইনের যুগে যে যতটুকু সফটোয়ার লিখবে তা এক বা একাধিক কোম্পানিকে বিক্রি করতে সক্ষম হবে ব্লক চেইন সিস্টেমে-কেউ ঠকাতে পারবে না।

 তবে হ্যা-মধ্যে খানে যে ব্যপারটা অব্যক্ত থাকল-তা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। এই সিস্টেমে যারা দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত-তারা সবাই নিজেদের ব্যবসা খুলে ফেলবে। কিন্ত বাকিদের কি হবে? এই জন্যে আমি বারবার করে বলছি নিজের ছেলে মেয়েদের টিউটরের কাছে না পাঠিয়ে মোবাইল এপ, আর্ট ডিজাইন, কোডিং, কবিতা, গান ইত্যাদি শিখতে পাঠান।


 কমিনিউস্ট বিপ্লব নামক গণহত্যা, রক্তপাত ছাড়াই, একজন শ্রমিক তার শ্রমের মালিক হবে। ব্লক চেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ভাল ভাবেই সম্ভব। সেই দিন ও সমাগত।














Saturday, June 17, 2017

প্রযুক্তি এখন কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়

মানুষ আঁকতে শুরু করেছে সম্ভবত কুড়ি হাজার বছর আগে। দশহাজার বছর আগে কৃষিকাজের শুরু। ভাষার উৎপত্তি পাঁচ হাজার বছর। স্টিম ইঞ্জিন, যন্ত্র সভ্যতা -আড়াইশো বছর। ইলেক্ট্রিসিটি টেলিকম, জাস্ট একশো বছর। কম্পিউটার, সিলিকন চিপ- পঞ্চাশ বছর। ইন্টারনেট পঁচিশ বছর। স্মার্টফোন, স্যোশাল মিডিয়া , দশ বছর!
প্রযুক্তিই, প্রযুক্তির গতিকে ত্বরান্বিত করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সস্তার সিলিকন চিপের যুগলবন্দি যেসব প্রযুক্তির জন্ম দিতে পারে-যে ভাবে বদলে দিতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবন-তার সম্ভাবনা কল্পবিজ্ঞান কে হার মানাবে!
ইনফ্যাক্ট আজকাল অবস্থা এমন-কেউ যদি ২০৫০ সালের জন্য কোন কল্পবিজ্ঞান লেখে, ২০৫০ সালের সভ্যতা আজকের কল্পবিজ্ঞানের থেকে অনেক এগিয়ে থাকবে!
স্মার্টফোন, স্যোশাল মিডিয়া আমদের জীবনযাত্রা যেটুকু বদলেছে-তা বলতে গেলে কিছুই না! ধরুন কৃত্রিম গর্ভ প্রায় চলেই এল ( হয়ত, আর কুড়ি বছর! )- সেক্ষেত্রে বিবাহ, সংসার এগুলো কি টিকবে? সমাজ বিজ্ঞানের নিয়মেই উচিত না। কারন প্রতিটা মানুষ সেক্ষেত্রে প্রজননের ক্ষেত্রে স্বয়ংভূ। ভাবুন একশো বছর বাদে বাবা মা -সন্তান এই সব কিছুই অবান্তর ঐতিহাসিক শব্দ! ভাবা যায়?
এই বছরের শেষে সার্গেও ক্যানেভারো প্রথম মানুষের মাথার ট্রান্সপ্ল্যান্ট অপারেশন করবেন। অর্থাৎ একজনের মাথা কেটে অন্যের দেহে বসিয়ে দেবেন! সফল কদ্দুর হবেন জানা নেই-কিন্ত এটা বোঝা যাচ্ছে, সেদিন আর দেরী নেই মানুষ অমরত্বের কাছাকাছি। বয়স বাড়লে মাথাটা কেটে অন্যের যুবক যুবতীর দেহে বসিয়ে দিলেই হল!
অন্যদিকে ডিন এন এতে এজিং জিন বা যা বয়স বাড়ায়, তা ধরে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। সেই জীনটাকে টুক করে বাদ দিলে, অনন্ত যৌবন হাতের মুঠোয়। শুধু তাই না-সাথে সাথে ধর্মের ও ইতি। কারন মানুষের ধর্মকর্মের পেছনে সব থেকে বড় কারন অমরত্বের আশা-যে মরিলেও আত্মা বাঁচিবে। হয় পুনঃজন্ম বা স্বর্গে ভাসিবে! এই সব গাঁজাখুরি মানুষে বিশ্বাস করে কারন পৃথিবীর এই সত্তর আশি বছরের জীবনটা বড্ড ছোট। ফলে ধর্মে বিশ্বাস করে, মানুষ একটু শান্তি পায়। এখন অনন্ত যৌবন যদি হাতের মুঠোয় চলে আসে-কে আর অলীক অমরত্ব, আত্মা বা স্বর্গের সন্ধানে ধর্মকম্মো করবে?
মোদ্দা কথা-পৃথিবীর পরিবর্তন হতে চলেছে দ্রুত। এত দ্রুত, আমরা তৈরী না।

কেন বাচ্চারা কবিতা লেখা শিখবে?

দীর্ঘদিন থেকেই লিখছি, প্রযুক্তি দ্রুত এগোচ্ছে, অথছ সেই অনুপাতে শিশুশিক্ষা বা স্কুল কলেজের পরিকাঠামো বা সিলেবাস কিছুই এগোচ্ছে না। এই মুহুর্তে পৃথিবীর প্রায় সব চাকরিই -জ্ঞান বা স্কিল ভিত্তিক। কিন্ত আমরা দ্রুত সেই দিনের দিকে এগিয়ে চলেছি, যেখানে "জ্ঞানের" জন্য না, কল্পনাশক্তির জন্যই মানুষের জীবিকা টিকে থাকবে। একটা ছোট সিঙ্গলবোর্ড কম্পিউটার রাসবেরীপাই এর মধ্যেই প্রায় গোটা উইকিপেডিয়া ঢুকিয়ে দেওয়া যায়!
জ্ঞানে কম্পিউটারকে হারানো অসম্ভব-কিন্ত কল্পনাশক্তি?
মানুষের যা নিজস্ব-সেটা তার কল্পনাশক্তি-যার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ কবিতা, গান, সাহিত্য, আঁকাতে। তাত্ত্বিক বিজ্ঞানে-যেখানে শ্রেফ লিফটে মানুষের ওঠা নামা দেখে আইনস্টাইন স্পেস-টাইমের বক্রতা অনুমান করতে পারেন । এই যে এত হাজার হাজার মোবাইল এপ প্রতিদিন বাজারে আসছে-এর মধ্যে শুধুমাত্র হাতে গোনা কয়েকটিই টিকে যায়। দেখা যাবে শুধু সেইগুলিই টিকছে, যেগুলির ডিজাইন খুব সুন্দর এবং সহজ। ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু মাত্র টুলস। লোকে কিন্ত কেনে সেই ভাল ডিজাইনটাই-অর্থাৎ মানুষের কল্পনা।
খুব কম বাচ্চাই আজকাল কবিতা লেখে-কি আমেরিকাতে , কি ভারতে! কবিরা চিরকালই ঝোলাআউলা অকাজের ফেরিওয়ালা--্যেহেতু তাহা পেশা না, কবিতা শেখানোর কোন স্কুল নেই !!
স্কুলে বাচ্চাদের এইসব সৃজনশীল কাজে উৎসাহী করার বদলে বাবা-মায়েরা আটজন নজন করে টিউটরের কাছে পাঠাচ্ছে! যদি কোন রকমে জয়েন্টে একটা রাঙ্ক লাগিয়ে, প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কোন রকমে বিটেক ডিগ্রি নিয়ে-আইটিতে ঢুকে পরলেই মধ্যবিত্ত স্বপ্নের আলাদিনের প্রদীপ হাজির!!
মুশকিল এই যে, ওই ক্লার্ক গোত্রীয় ইঞ্জিনিয়ারদের সুদিন শেষ-না তাদের আর কোন চাকরি নেই। এই নয় যে ইঞ্জিনিয়ারিং এ চাকরি নেই- আছে, অনেক আছে। তবে যারা সৃজনশীল। যারা কল্পনায় ডানা মেলে উড়ে যেতে পারে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের কল্পরাজ্যে।
আমি কবিতা বা সাহিত্যের প্রশ্ন কেন তুললাম? সার্থক কবিতা বা সার্থক সাহিত্যের প্রথম লক্ষণ, শব্দের "নন-কনটেক্সুয়াল" ব্যবহার। অর্থাৎ ধরুন গোলমরিচ আমজনতার কাছে-শুধু ঝাল মশলা। কিন্ত একজন কবি যখন লেখেন " গোলমরিচ রোদ" -শুধু একটা শব্দের অপ্রচলিত ব্যবহারে নতুন দৃশ্যকল্প তৈরী-যা আমাদের নতুন একটা অনুভূতির জন্ম দিতে সক্ষম।
এটা কম্পিউটার পারবে না-কারন সে শুধু শব্দের কনটেক্সট মিনিংটাই জানে।
শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই নির্মম সত্য-আগামি দিনে চাহিদা থাকবে তাদের-যারা এই "নন-কনটেক্সসুয়াল" কল্পনায় এগিয়ে। আমি শুধু কবিতার উদাহরন দিলাম-কিন্ত এই আউট অব বক্স চিন্তা পদার্থবিদ্যা, কেমিস্ট্রি, ইঞ্জিনিয়ারিং সর্বত্রই লাগে। ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটা দিক বিজ্ঞান, অন্যদিকটা কিন্ত আর্টস।
অথচ, বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থায়, শিশুমনের যে অসাধারন কল্পনা শক্তি-তাকে কবরে পাঠানোর সব আয়োজন পূর্ণ! বাচ্চাদের আরো বেশী করে কবিতার রাজ্যে, ঠাকুরমার ঝুলির রাজ্যে পাঠানোর বদলে, তাদেরকে বলা হচ্ছে যাও আলিপুর জেলে টিউটরের কাছে দুঘন্টা পাথর ভেঙে এস !
তবে সব রাষ্ট্রই মুর্খ না। ফিনল্যান্ড প্রথাগত শিক্ষার দুর্বলতা সবার আগে বুঝেছে। ওখানে এখন বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা মানে সৃজনশীলতার পিকনিক। সিলেবাস তারা তুলে দিয়েছে। আমার হাসি পায় এই ভেবে যে বাংলা বা ইংরেজির ক্লাসে কোন গল্প বা কবিতা থেকে "প্রশ্ন" দেওয়া হত। প্রশ্ন উত্তর সবকিছুই ধরাবাঁধা! এখনো তাই চলছে!! তাহলে ছেলেমেয়েরা সাহিত্যের রসটাই বা পাবে কি করে-বা সাহিত্যের যে একটা বড় কাজ, মস্তিস্কের সৃজনশীলতা, কল্পনা বা অনূভূতিগুলোকে বাড়ানো- সেটাও হচ্ছে না। অথচ এটাই আগামীদিনের কেরিয়ারের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ন শিক্ষা।
এটাকে আমার আষাঢ়ে চিন্তা ভাববেন না। চীনের সরকার দুই দশক আগে সমীক্ষা করে- আমেরিকার সমতুল্য হতে গেলে, আমেরিকার মতন আবিস্কার ভিত্তিক সমাজ হতে গেলে, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কি পরিবর্তন দরকার?
সেই সৃজনশীলতা আসবে কোত্থেকে? চীন সরকার তাদের বিজ্ঞান, অঙ্ক বা ভূগোলের কোর্স বাড়ায় নি। তারা তাদের সাহিত্য শিক্ষাকে সম্পূর্ন অন্য লেভেলে নিয়ে গেছে। যাতে একদম ছোটবেলা থেকে, প্রাইমারী স্কুল থেকেই বাচ্চারা আউট অব কনটেক্স ভাবতে পারে। ইনফ্যাক্ট চীনারা এমনিতেই কবিতা ভালবাসে, কবিতার মধ্যে দিয়েই তারা বাচ্চাদের সৃজনশীলতার প্রসারে নেমেছে।
বাংলায় কবির অভাব নেই-কিন্ত কবিদের অভাব আছে। প্রাইভেট টিউটরের বদলে, আপনার সন্তানকে কবিদের কাছে পাঠালে-আখেরে কেরিয়ারের ক্ষেত্রেও কিন্ত আপনার সন্তানের লাভই বেশী।

Wednesday, June 14, 2017

রাজনৈতিক হিংসা এবং অটোমেশন

রাজনৈতিক হিংসা, শুধু রাজনীতির কারনে খুনোখুনি ভারতে জলভাত, কিন্ত আমেরিকাতে "কিছুটা" বিরল। আজ সকালে এক বার্নির এক চরমপন্থী ভক্ত, রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যানদের বেসবল প্রাক্টিসে গুলি চালায়। গুলি চালানোর সময় সে জিজ্ঞেস করছিল-রিপাবলিকান না ডেমোক্রাট? গুলিতে অনেকেই আহত, রিপাবলিক্যান কংগ্রেসম্যান স্টিভ স্ক্যালিজ গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুমুখে। রাজনৈতিক খুনোখুনি সত্তরদশকের আগে এখানে ভালোই ছিল-কিন্ত আস্তে আস্তে আমেরিকার রাজনীতি গুন্ডামোমুক্ত হয় সত্তরের দশক থেকে।
আমি আমেরিকাতে আসি ২০০১ সালে। আমাকে ড্রাইভিং শেখাত এক বেকার আইনজীবি। নিউজার্সিতে সেই ভদ্রলোক, রাজ্যের গর্ভনরের নাম পর্যন্ত জানত না। অধিকাংশ আমেরিকানদের সেই সময় রাজনীতিতে কোন উৎসাহ ছিল বলে দেখি নি।
আমেরিকাতে জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশা যত বেড়েছে, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এদেশেও রাজনীতি ততই উত্তপ্ত হতে দেখেছি। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময়, আমেরিকাতে প্রথম রাজনৈতিক জনজাগরনের সাক্ষী হই-ওবামাকে ভোট দিতে সেইদিন রেকর্ড সংখ্যক লোকেরা বুথে হাজির হয়। ওইদিন বুথে বুথে গিয়ে অনেক ভিডিও তুলে ছিলাম। রাত আটটার সময় ও অনেক বুথে লোক উপচে পড়ছিল।
ওবামার শপথ গ্রহণের দিন ওয়াশিংটন ডিসিতে পা দেওয়ার জায়গা ছিল না-নিমন্ত্রন পত্র থাকা সত্ত্বেও ত্রিশ লাখ লোকের ভীরে ক্যাপিটল এরেনাতে ঢুকতেই পারি নি। সেই দিন শপথ গ্রহনের পরে, বাড়ি ফিরছিলাম মেট্রো ধরে। স্টেশনে ঢুকতেই পারছি না। পাশে মিসিসিপি থেকে আসা এক স্কুল শিক্ষক । সাথে বছর দশকের যমজ ভাইবোন। ওবামা না জিতলে সে নাকি আমেরিকা ছেড়ে কানাডায় চলে যেত!! আমেরিকাতে এই ধরনের তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরন কিছুদিন আগেও অপ্রত্যাশিত ছিল।
ওবামার আট বছরে রাজনৈতিক মেরুকরন কিছু কমে নি। বেড়েছে। কারন জনগণের দুর্দশাও বেড়েছে। একদিকে অটোমেশন, অন্যদিকে ভারত এবং চীনে আউটসোর্সিং এর যুগ্ম যাঁতাকলে আমেরিকাতে ভাল চাকরির সুযোগ কমেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে-ফলে এখানের শিক্ষিত শ্রেনী রাগে ফুঁসছিল। ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট করে , আসলেই তারা দেশের পলিটিক্যাল ক্লাসকে সজোড়ে থাপ্পর মারে। জনগনের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারনে বার্নির নেতৃত্বে বামপন্থী উগ্রপন্থা এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বে দক্ষিনপন্থার উত্থানের সাক্ষী হয় ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্টিয়াল ইলেকশন।
আমেরিকাতে কিন্ত মোটেও অর্থনৈতিক মন্দা নেই। বরং আমেরিকান কর্পরেট-আমাজন, গুগল, ফেসবুক, আপল, নেটফ্লিক্সের মুনাফা রেকর্ড হারে বেড়েছে। এর মূল কারন অবশ্য মোটেও শ্রমিকদের ওপর শোষন না- এই সমস্ত কোম্পানীগুলিই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে যুগান্তকারী কাজ করেই মুনাফার পাহাড় গড়েছে। সমস্যা হচ্ছে সেই যে আমাজনের জন্য আমেরিকাতে অন্তত লাখে লাখে ছোট ব্যবসা লাটে উঠেছে। এবার আমাজনের যে মুনাফা সেটা যাচ্ছে কোথায়? আমাজন সেটা আরো উন্নত প্রযুক্তি তৈরীতে ঢালছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করে তাদের মাইনে বেড়েছে সাংঘাতিক- কিন্ত সাধারন জনগনের ইনকামের পথ রুদ্ধ।
এর ফলে আমেরিকাতে মধ্যবিত্ত শ্রেনী আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে- যারা বুদ্ধিমান তাদের ইনকাম বেড়েই চলেছে, যারা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে, তারা একই সাথে তিনটে চাকরি করেও সংসার চালাতে পারছে না। সোমবার নিউজার্সিতে এক ভদ্রমহিলা ছিল আমার উবের ড্রাইভার। সে ভোর পাঁচটা থেকে দুপুড় বারোটা পর্যন্ত উবেরের ড্রাইভার। দুপুর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বার্ন্স ন্ড নোবেলে কাজ করে। উইকেন্ডে আরেকটা কাজ করে। শুধুমাত্র মা আর মেয়ের সংসার চালাতে তাকে তিনটে কাজ করতে হয়! এত কিছু করার পরেও ভদ্রমহিলার দুঃখ মেয়েকে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবার সামর্থ্য নেই! এটাই আসল আমেরিকা!!
সাধারন জনগনের এই দুর্দশা থেকেই ট্রাম্প এবং বার্নির দক্ষিনপন্থী এবং বামপন্থী পপুলিস্ট মুভমেন্টের উদ্ভব। দুজনার কাছেই কোন সমাধান নেই-আছে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি। যাতে আসল সমস্যার কোন সমাধান নেই। মূল সমস্যা অটোমেশন এবং প্রযুক্তি। অথচ ট্রাম্প গালিগালাজ দিচ্ছেন চাকরি খাচ্ছে ভারতে এবং চীনে। আর বার্নি দুষছেন কর্পরেটকে। যেখানেই যুক্তির অভাব, আবেগ বেশী সেখানেই উগ্র সমর্থক তৈরী হবেই। এবং আজকে যে বার্নি সমর্থক ( জেমস হার্ডকিন্স ) গুলি চালালো , সেও আসলেই ব্রেইন ওয়াশড। অটোমশন হচ্ছে অলীক শব্দ-রাজনীতির বাজারে খাবে না। বরং ভারতীয়, মেক্সিকান, চৈনিক, কর্পরেট এদের দেখা যায়। এদের এনিমি লাইনে দাঁড় করলে ভোট বাক্স ভাসে!!
আমি আগেও বহুদিন থেকে লিখছি, প্রযুক্তি অগ্রগতির সাথে সাথে ধণবৈষম্য তীব্র আকার নিচ্ছে। উদ্ভ্রান্ত জনগন কখনো খ্রীষ্ঠান, কখনো মুসলমান, কখনো হিন্দু কখনো বাম সন্ত্রাসবাদি।
যুধিষ্ঠির ইন্দ্রপ্রস্থের নতুন প্রাসাদে সেদিন কুরুবংশের সবাই আমন্ত্রিত। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বল্লেন, যাও বিদুরের কাছ থেকে রাজনীতির পাঠ নাও। বিদুর ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে বিদায় কালে যুধিষ্ঠিরকে প্রথম যে রাজনৈতিক শিক্ষা দেন- রাজার সর্বপ্রথম কাজ প্রজাদের মধ্যে যেন ধনের প্রবল অসাম্য তৈরী না হয়। কারন ধনের অসাম্য থেকেই প্রজাবিদ্রোহ হয় এবং তা রাজা ও রাজবংশকে ধ্বংশ করে। এতেব হে রাজন, সর্বপ্রথম যে রাজকর্তব্য, তা হচ্ছে ট্যাক্স চাপিয়ে, দান করে ধনবৈষম্য কম করা। মহাভারতের যুগেও এইটুকু রাজনৈতিক জ্ঞান ছিল যে অসম ধনবৈষম্যে কোন রাজত্বই টেকে না।

Tuesday, June 6, 2017

প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং সাম্প্রদায়িকতার ভবিষ্যত


   ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদিদের উত্থানে সবাই আতঙ্কিত। দেখেশুনে মনে হতেই পারে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে কোথায় ধর্ম সম্প্রদায় উবে যাবে-কিন্ত বাস্তবে হচ্ছে উলটো। সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেশ কমার লক্ষন নেই-বরং ফেসবুকের মাধ্যমে ফেক নিউজ ছড়িয়ে আরো বেশী করে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।

  প্রশ্ন হচ্ছে এমনই চলবে? নাকি আরো বিশ বছর বাদে ভালো কিছুর আশা আছে?

 না কোন আশাবাদ না, একদম নির্মোহ দৃষ্টিকোন থেকে যদ্দূর অদূর ভবিষ্যত দেখা যায়-তাতে পরিস্কার দেখছি, এই ধর্ম এবং সাম্প্রদায়িকতার জঞ্জাল দূর হল বলে।  প্রযুক্তিই একমাত্র সমাজ বদলাতে সক্ষম- সেই মার্ক্সীয় মোক্ষম বাণী এখানে না খাটার কোন কারন নেই।


  মূলত তিনটে কারনে ভবিষ্যতে ধর্মীয় পরিচয় এবং সাম্প্রদায়িকতা লোপ পাবে।

 প্রথম কারন নতুন প্রযুক্তির সামনে মিথ বা ধর্মভিত্তিক রূপকথার অবসান।  প্রতিটা ধর্মের ভিত্তিই রূপকথা ।  মহম্মদ, কৃষ্ণ, যীশু এরা সবাই রূপকথার চরিত্র। যদিও যীশু এবং মহম্মদকে তাদের ধর্মের লোকেরা ঐতিহাসিক  চরিত্র বলে মানে, ঐতিহাসিকরা কিন্ত মানেন না-কারন সত্যিকারের ঐতিহাসিক প্রমান বলতে যা বোঝায়, তা নেই। না দয়া করে আকাশ থেকে পড়বেন না-গুগলে হিস্ট্রিসিটি অব জেসাস বা মহম্মদ বলে সার্চ দিলেই সব তথ্য পেয়ে যাবেন, কতটা রূপকথা গুলে খাওয়ালে ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। শুধু ইসলাম বা খ্রীষ্ঠান ধর্ম না। কমিনিউস্ট সম্প্রদায় ও সোভিয়েত বিপ্লব নামক এক রূপকথা প্রসবের মাধ্যমেই প্রচুর বাচ্চা এবং যুবার মাথা খেয়েছে।  প্রশ্ন হচ্ছে এসব সত্য না রূপকথা,  ইন্টারনেট জমানায় এখনই তা পাওয়া যায়। তাহলে বর্তমানে কেন নিধার্মিকদের সংখ্যা বাড়ছে না? বরং হিজাব, বোরখা, দাড়ি, শনির মন্দির সবই বাড়ন্ত!

 আসলে একটা নিঃশব্দ বিপ্লব এসেছে ইন্টারনেটের হাত ধরে -সেটা ভারতে এখনো না এলেও পাশ্চাত্যে খুব ভাল ভাবেই এসেছে। ইউরোপে অনেক উন্নত দেশেই নাস্তিকদের সংখ্যা বর্তমানে খৃষ্ঠানদের থেকে বেশী। আমেরিকাতে ১৯৮০ সালে নাস্তিকদের সংখ্যা ছিল মোটে ৮%।  বর্তমানে আমেরিকাতে ২০ বছরের নীচে নাস্তিকদের সংখ্যা ৪০% বা তার বেশী। অর্থাৎ যে জেনারেশন ইউটিউব, গুগল, উইকি দেখে ছোটবেলা থেকে বড় হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই উন্নত বিশ্বে নির্ধামিক। ইনফ্যাক্ট সবথেকে গোঁড়া ধার্মিক বলে পরিচিত আমেরিকান মুসলিমদের ছেলে মেয়েদের মধ্যেও সংখ্যাধিকই নাস্তিক বা আজ্ঞেয়বাদি বা মানবতাবাদি।  ভারতে এই ব্যপারটা আসে নি দুটো কারনে। এক, এখানে ছেলেমেয়েদের স্বাধীন চিন্তা করার অবকাশ কম। দুই,  এখানে ছেলেমেয়েদের ওপর তাদের বাবা মায়ের খবরদারি বেশী। ফলে ভয়ে অনেকেই উলটো দিকে হাঁটে না।

দ্বিতীয় বড় কারন সাম্প্রদায়িকতার চালিকা শক্তি-রাজনীতির ভোলবদল হতে চলেছে।  সবাই "কেজো" নেতাকে দেখতে চাইছে।  নরেন্দ্রমোদি বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের মধ্যে লিব্যারালরা সাম্প্রদায়িকতার ধাবার গন্ধ পেলেও বাস্তব এটাই এদের লোকে ভোট দিয়েছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশায়। যাতে ধান্দা, চাকরি বাকরি ভাল হয়।  যদ্দিন লিব্যারালরা নরেন্দ্রমোদিকে সাম্প্রদায়িক, ট্রাম্পকে রেশিস্ট বলে গালাগাল দেবেন -কিস্যু হবে না। এরা জিততেই থাকবেন। ইনফ্যাক্ট কংগ্রেসের সোল্কড সংখ্যালঘু তোষনের রাজনীতিই অনেক বেশী সাম্প্রদায়িকতার জন্মদাত্রী।  মমতা ব্যার্নাজির জেতার মূল কারন তার কাজ, সাম্প্রদায়িক তোষন না। লিব্যারাল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম যদি "কেজো" নেতার জন্ম দিত, তারাই জিতত।  গোটা বিশ্ব জুরে আজ যাদের নেতৃত্ব-পুতিন, ট্রাম্প, মোদি-এদের লিব্যারালরা ঘৃণা করেন বটে-কিন্ত বাস্তব হচ্ছে এরা কাজের লোক। এবং অটোমেশনের দৌলতে যত চাকরির সংস্থান কমবে, ততই জনগন সেই ধরনের নেতা চাইবেন যারা চাকরি সৃষ্টিতে সক্ষম। ভাল অর্থনীতি দিতে সক্ষম।  লিব্যারাল প্ল্যাটফর্ম যদি সেই আশা দিতে পারে, তারাই জিতবেন। মুশকিল হচ্ছে এই ধরনের নেতারা জাতিয়তাবাদি প্ল্যাটফর্ম থেকেই আসছেন-ফলে জাতিবিদ্বেশের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।  কিন্ত এটা যতটা জাতিয়তাবাদি রাজনীতির সাফল্য, তার থেকে বেশী লিব্যারাল রাজনীতির ব্যররথতা-তারা জনগনের পালস বুঝতে ব্যর্থ।  আমার ধারনা লিব্যারাল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলি দ্রুতই বুঝবে, তাদের রাজনীতি আর লোকে খাচ্ছে না-এবার কাজের গপ্পো লোকে শুনতে চাইছে-তারাও বদলাবেন।

তৃতীয় কারন-অর্থনৈতিক । অর্থাৎ একজন ধার্মিক ব্যক্তি অর্থনৈতিক ভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য হবেন। ভবিষ্যতে। খেয়াল রাখতে হবে, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বা টিকিয়ে রাখতেই অধিকাংশ লোক ধর্মকম্ম দেখান। উন্নত বিশ্বে আমরা ধার্মিক লোকেদের পেশাদারি ক্ষেত্রে এখুনি এড়িয়ে চলি। কারন সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে অসুবিধা। আউটলুক মেলে না।  পেশাদারি ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে ধার্মিক লোকেদের গ্রহনযোগ্যতা কমবে। ইনফ্যাক্ট কাজের ক্ষেত্রে সবাই "গর্বিত ধার্মিক" দের ভয় পায়। আমি কত বড় হিন্দু বা মুসলমান-এই বিজাতীয় আইডেন্টি ক্রাইসিসে ভোগা মানসিক রুগীরা, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাতিল হলে-সেটা দেশ এবং দশের মঙ্গল।

অবশ্য এর মানে এই না, যা মানুষের সার্বিক খোঁজ, বা নিজের প্রতি নিজের অনুসন্ধান-সেটা আধ্যাত্মিকতাই বলুন বা বিশ্বমানব মাঝে নিজের সন্ধানই বলুন-সেটা বদলাবে। আমি কি বা আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি সেই চিরন্তন প্রশ্ন থেকেই যাবে। শুধু এইসব প্রশ্নের "মেইড ইজি উত্তর" আছে মার্কা গুরু এবং ধর্মগুলোর উৎপাত কমবে।  তবে সেটাও ভারতে নতুন কিছু না। চন্দ্রগুপ্ত মোর্য্য বিয়াল্লিশ বছর বয়সে জৈন ধর্মে সন্ন্যাস নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন জীবনের উত্তর খুঁজতে। সেই অতীতে কোন ধর্ম, দর্শন, গুরুবাবারা জীবনের এইসব গুরুতর প্রশ্নের উত্তর দিত না। প্রত্যেকটা লোককে তার নিজের মতন করে উত্তরটা খুঁজতে হত সারাজীবন। গীতা, কোরান, বাইবেলের মেইড ইজি সেখানে পাওয়া যেত না।  সেইখানেই আমরা ফিরছি দ্রুত।





         

Friday, June 2, 2017

অটোমেশন এবং চাকরিতে ছাঁটাই ঃ সত্যিই কি চিন্তার কোন কারন আছে?

(১)
অটোমেশন ১৯৬১ সাল থেকেই উন্নতবিশ্বে "লো ওয়েজ" চাকরি রিপ্লেস করে চলেছে। ইনফ্যাক্ট ১৯৯০ সালে আমেরিকাতে ফ্যাক্টরিতে যত লোক কাজ কর‍ত এখন তার ১০% ও নেই। অথচ ইন্ডাস্ট্রিয়াল আউটিপুট এই ত্রিশ বছরে বেড়েছে প্রায় আড়াইগুন।  তাহলে এই ৯০% লোক গেল কোথায়?  ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল অটোমেশনের দৌলতে বহুদিন থেকেই আস্তে আস্তে এখন শিল্প শ্রমিক বলতে যা বোঝায়, সেই ওহেনরীর হাতুড়ি ধরা টাইপ-আজকে আর নেই আমেরিকাতে।  আমি পেশার প্রয়োজনেই  প্রচুর ফ্যাক্টরি ভিজিট করি আমেরিকাতে।  অনেক ফ্যাক্টরীই এত অটোমেটেটড সেখানে কোন শ্রমিকই থাকে না-সেখানে ভারতে সমমাপের ফ্যাক্টরীতে ফ্লোরে শ্রমিক গিজগিজ করছে!!

    অটোমেশনের জন্য চাকরি ছাঁটাইএর সাথে আমেরিকানরা অভ্যস্থ থাকলেও ভারতীয়দের অভিজ্ঞতা হচ্ছে সম্ভবত এই প্রথম। কারন এই বছর খুব সম্ভবত দুই লাখ সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ার ছাঁটাই হবে ভারতের সেরা আইটি কোম্পানীগুলো থেকেই। আগামী পাঁচ বছরে সেই ট্রেইন্ড আরো দ্রুত বাড়বে। আমি অবাক হব না যদি শুনি ২০১৮ সালে ছাঁটাই এর সংখ্যা ২ লাখ থেকে বেড়ে পাঁচ লাখ হয়েছে।  আগামী পাঁচ বছরে সম্ভবত ভারতের অর্ধেক সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিই যাবে-অর্থাৎ কুড়ি লাখের মতন। তবে নতুনদের ভয় নেই।  তাদের জন্য নতুন চাকরিও তৈরী হবে!

এটা শুধু সফটোয়ার না-সব ক্ষেত্রেই আসবে। সরকারি চাকরি, শিক্ষকতা, উকিল, ডাক্তার, গবেষনা-ইনফ্যাক্ট সবকিছুই সফটোয়ার মানুষের থেকে অনেক ভাল পারবে।  সারা জীবনে আপনি কজন ভাল শিক্ষক দেখেছেন? সারা জীবন কটা ভাল ডাক্তার দেখেছেন? একটা ছোট তথ্য দিই। আমেরিকাতে শুধু ভুল চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর মারা যায় চার লাখ লোক। সেখানে আই বি এমের ওয়াটসন এখনই দেখাচ্ছে, তাদের ডায়াগোনিসের ভুল মানব ডাক্তাদের ১%!   ল ক্লার্কদের একটা বড় কাজ কনট্রাক্ট রিভিউ করা- এটা এখন প্রমানিত সফটোয়ার ওই কাজ অনেক ভাল পারে এবং আমেরিকার বড় বড় কোম্পানীগুলো এখন আর আগের মতন উকিল নিচ্ছে না।  সফটোয়ার দিয়েই রিভিউ করাচ্ছে। সরকারি চাকরি অটোমেট করা সব থেকে সহজ-তাতে দুর্নীতি অনেক কমে। কিন্ত রাজনৈতিক কারনে সেটা করা হয় না।

 আপনি হয়ত ভাবছেন তাহলে এই যে এত এত প্রোগ্রামিং করতে হবে, কম্পিউটার সায়েন্টিস্টদের চাকরি অন্তত থাকবে? সেগুড়ে বালি সেখানেও। গুগলের ডীপ ব্ল  বা আধুনিক ডিপ লার্নিং সিস্টেম নিজেই নিজের কোড লিখে নেবে!!



(২)
 মোদ্দা কথা আপনার পেশা যাইহোক না কেন, ৫০ বছরের মধ্যে "চাকরি" বস্তুটির অস্তিত্ব থাকবে না। আপনি যতই বকুন না কেন, যখন দেখবেন আপনার প্রতিবেশীর ছেলে একটি আধুনিক ই-লার্নিং সিস্টেমে অঙ্ক শিখে, অঙ্কে তুখোর হচ্ছে, আপনি টিউটরের কাছে না পাঠিয়ে, তার থেকেও কম খরচে, ছেলেকে ইলার্নিং সিস্টেমেই দেবেন। মার্কেটই ঠিক করে দেবে, "ভুলে ভর্তি মানুষের" চাকরি নেই!! যেমন আমেরিকাতে উকিলরা চাকরি পাচ্ছে না কর্পরেট-কারন আইবিএম ওয়াটসন অনেক কম খরচে তাদের কাজ করে দিচ্ছে-এবং তা নির্ভুল ও বটে।

তাহলে মানুষ কি করবে? চাকরি না করলে খাবে কি?

কোন সন্দেহ নেই আমাদের রাজনৈতিক সিস্টেম বদলাবে। আলরেডি উন্নত দেশগুলিতে উনিভার্সাল বেসিক ইনকামের দাবী তীব্র হচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র সবাইকে প্রতিমাসে একটা মাসোহারা দেবে যাতে সবাই খেতে পড়তে পারে।  থমাস পাইন বহুদিন আগে এমন হবে ভেবেছিলেন। গত ত্রিশ বছরে, এই নিয়ে সোশ্যাল সায়েন্সে অনেক গবেষনা এবং নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রেজাল্ট পজিটিভ।  তবে এটাকে কমিউনিজম ভাবার কোন কারন নেই-যদিও আল্টিমেটলি সুপার অটোমেটেড সোসাইটিতে কমিনিউজমের ধারনা গুলো এমনিতেই আসবে। কোন আন্দোলন লাগবে না। কারন এই মুহুর্তে ফ্রীডম্যানের মতন ক্যাপিটালিস্ট ইকনমিস্টরাই উনিভার্সাল সোশ্যাল ইনকামের কথা বলছেন।

 ব্যপারটা সিম্পল। মানুষকে চাকরি করতে হবে কেন?  চাকরি করা ত দাসত্ব! ড্রাজারি। মানুষ কবিতা লিখবে, গান বাঁধবে, ছবি আঁকবে, প্রেম করবে। এসব বাদ দিয়ে দাসত্ব করবে কেন মানুষ? চাকরি করা ত সিস্টেমের দ্বাসত্ব।  চাকরি করবে মেশিন-রোবট।  পৃথিবীর অধিকাংশ লোকই চাকরি করে পেটের দায়ে। সংসার চালানোর দায়ে।

 তবে আগামী পঞ্চাশ বছরে সবার চাকরি যাচ্ছে না। যারা অঙ্ক বিজ্ঞান ভাল করে শিখেছেন তারা আরো কিছুদিন টিকবেন-কারন পৃথিবীতে প্রচুর সমস্যা-সুতরাং গবেষনার কাজে এখনো অনেক অনেক লোক লাগবে।

 চাকরি টিকবে শুধু এন্টারটেইনারদের। কবি, গায়ক, নায়ক, খেলোয়াড়রা টিকে গেলেন। কারন মানুষের হাতে প্রচুর সময় থাকবে। ফলে ভবিষ্যতে সিনেমা, খেলা গানের চর্চা আরো বাড়বে, কমবে না।  সাহিত্যর ব্যপারে সিউর না। কারন আস্তে আস্তে  সব কিছুই অডিওভিস্যুয়ার হয়ে যাচ্ছে। পাঠ ভিত্তিক ফিকশনের পাঠক থাকবে কি না সন্দেহ আছে-কিন্ত  কালজয়ী সাহিত্য ছাড়া, কালজয়ী সিনেমা হয় না। ফলে ভাল সিনেমার জন্য ভাল সাহিত্য টিকে যাবে হয়ত। অসম্ভব না। আজকাল নিউয়ার্ক বা লস এঞ্জেলেসের ভবঘুরে লেখক সঙ্ঘের প্রায় সবাই দেখি নিজের পান্ডুলিপিএর জন্য প্রযোজক খোঁজে-বেস্ট সেলার হতে চাইছে না কেউ। সবাই জানে টাকা সিনেমাটিক  এডোপশনেই।



 সুতরাং চাকরি চলে যাবে বলে আতঙ্কিত হওয়ার কারন নেই। বরং আনন্দ করুন। মানব দাসত্বের দিন শেষ হতে চলেছে।  এবার প্রান খুলে কবিতা লিখুন, গান শুনুন-খেলাধূলো করুন। মানবমুক্তির সেই সুদিন খুব শীঘ্রই আসিতেছে।