Thursday, July 6, 2017

আমি হিন্দু নই, তুমিও মুসলমান না!

এই মহাবিশ্বের বয়স?

     তা চোদ্দশ কোটি বছর হবে।

 আকার, আয়তন, পরিধি ?

 জানা নেই। আমরা পৃথিবীর বাসিন্দা।   সৌর জগতের মধ্যে একটা ছোট্ট পৃথিবী - ইডেন উদ্যানে পিংপং বল।

আর ওমন কোটি কোটি সৌর জগত আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে। হাবল টেলিস্কোপের চোখ যদ্দুর যায় - এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বে কোটি কোটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আবিস্কার করেছে মানুষ নিজেই! আর দৃশ্যমান মহাবিশ্ব, আসল মহাবিশ্বের কতটুকু? জানা নেই।

   তাহলে আমি কে? আয়ু একশো বছর। পৃথিবীর পাঁচশোকোটি লোকের একজন!  এই মহাবিশ্বের বয়স যদি হয় একশো বছর, তাহলে আমার জীবনকাল এক সেকেন্ডের চেয়েও ক্ষুদ্র!

  ভাবুন - স্থান এবং কালে- এই মহাবিশ্বের চেতনায়, আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অস্তিত্ব। আমার জীবনটা মহাজাগতিক কালে-জাস্ট একটা বুদবুদ।  রাতের আকাশের দিকে তাকান-আর নিজেকে ভাবুন-আপনি কে? মহাসমুদ্রের ধারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জোনাকিরা আমার  ক্ষুদ্রতা দেখে হাঁসবে!

  অথচ আমাদের "আমি" ভাবনা থামে না- আমি হিন্দু, আমি মুসলমান, আমি ধনী, আমার এই নেই, আমার বড় বাড়ি আছে-আমার ছেলে এই-আমার বংশ এই! আমার এই  ডিগ্রী-আমি এই করেছি-"আমি" র লিস্ট মালগাড়ির বগির মতন!

     মানুষের জীবন এতই ক্ষুদ্র-মানুষ সততই ভোলে মৃত্যুর নিমন্ত্রনপত্র নিয়েই সে জন্মেছে। মোমের মতন গলে সেই অহং, যখন একদিন মৃত্যুর সামনে দাঁড়াতে হয়।

  কি আশ্চর্য্য-পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থেই মানুষকে তাই বার বার সাবধান করা হচ্ছে- ওহে তোমার জীবনকাল বড়ই ক্ষুদ্র- বৃথা নষ্ট করো না ঝগড়াঝাঁটি ঈর্ষা খুনোখুনি করে!

   কোরানে মৃত্যু চেতনা আছে প্রায় ৭৩ টি আয়াতে- আল ইমারান (৩/১৮৫ ) এ নাজিল " পৃথিবীর বুকে এই নশ্বর জীবন আসলেই অহংঙ্কারপূর্ন অস্তিত্ব, (কারন সে মৃত্যুর কথা মনে রাখে না)" ।

     উপনিষদের জীবন দর্শনের প্রায় সবটাই মৃত্যুচেতনা থেকে উঠে আসা।  কঠোপনিষদকে এডউইন আর্নাল্ড কবিতায় রূপ দিয়ে লিখেছেন " মৃত্যুর গোপন কথা"।

 কঠোপনিষদে নচিকেতা যমের সম্মুখে --

   যম বল্লেন বর চাও নচিকেতা?

    - হ্যা, প্রভু-যদি আপনি আমার ওপরে প্রফুল্ল, তাহলে দয়া করে বলুন মৃত্যুর ওপারে কি রয়েছে রহস্য?

  - নচিকেতা, মৃত্যু নিয়ে আমায় বিব্রত করো না। অন্য বর চাও। মৃত্যুর রহস্য তোমায় দিতে পারব না।

  - প্রভু দিতে হলে আমাকে এটিই দিন। বলুন মানুষের মৃত্যু রহস্য। কারন আমি জানি, আপনিই কেবল জানেন এই মৃত্যুর রহস্য!

  - নচিকেতা তোমার কি চাই? হাজার বছর আয়ু? কত হাতি, কত সোনা, কত স্ত্রী , কত পুত্র , কত জমি চায় তোমার? সব দিচ্ছি।  কিন্ত আমার কাছে মৃত্যু রহস্য জানতে চেও না। ছেড়ে দাও বাপু-মৃত্যু রহস্য জানার ইচ্ছা!

  নচিকেতা নাছোড়বান্দা।

 -প্রভু এই নশ্বর রাজত্ব, নারী, সম্পদ-সবই ত ক্ষনস্থায়ী, যতক্ষন শ্বাস , ততক্ষন। কোনকিছুই নিত্য না-তাহলে কিসের মোহে মৃত্যুরহস্যের পিছু ছেড়ে এই ক্ষনস্থায়ী ভোগবিলাসে মজি প্রভু?

   যম দেখল, ভবি ভোলার না। নচিকেতা মৃত্যুরহস্য জেনেই ফিরবে!

   মৃত্যুর সামনে মানুষের যে ক্ষুদ্র নশ্বর অস্তিত্ব-এবং তাতেই কুয়োর ব্যঙের মতন আমাদের অহং এর লাফালাফি -প্রতিটা ধর্মই তা বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছে। এই পর্যন্ত ধর্মদর্শনটুকু আমার ভালোই লাগে। কারন অহঙ্কার জ্ঞানের তাপে মোমের মতন গলে।

  ধর্মের সাথে আমার গোল  বাধে এর পরের ধাপে।  হ্যা, এটা মানি, জীবন ক্ষনস্থায়ী-এটা মাথায় রাখলে নিজেকে মোটিভেট করাই মুশকিল।  ফলে একটা বুষ্টিং বর্নভিটা দরকার। জৈন, বৌদ্ধ এবং হিন্দু দর্শনে সেটা পরের জন্ম। পুনঃজন্ম। ইসলাম, খ্রীষ্ঠ ধর্মে স্বর্গের সুরাসরের ধারনা।

    সমস্যা এটাই- যখন সন্ত্রাসবাদিরা এই নশ্বর জীবনকে সত্যি সত্যিই সম্পূর্ন তুচ্ছ ভেবে, স্বর্গের মোহে আত্মঘাতি ভেস্ট বুকে নিয়ে সুইসাইড বোম্বার হয়। মৃত্যুচিন্তা পর্যন্ত সব ধর্মই ঠিক। কিন্ত মৃত্যুপরবর্তী চিন্তাটা সব ধর্মেই রূপকথার মোহজাল এবং তা সুস্থ সমাজের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদীর জন্ম দিতে সক্ষম। তাদের ছোটভাই মৌলবাদিরাও সেই পরকালের মদে বুঁদ।

  সুতরাং যতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হৌক, হোক যতই অকিঞ্চিৎকর-এই ক্ষুদ্রজীবন, তার চাওয়া, পাওয়া ওঠা নামাগুলোকে ভাল লাগা দরকার। জীবনকে যেন প্রতিটা শিশু ভালবাসতে শেখে।  নচেৎ তাদের সন্ত্রাসী হওয়া সময়ের অপেক্ষা।

  যারা বলেন, ইসলাম এখন সব থেকে বেশী সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিচ্ছে-কারন মাদ্রাসা নশ্বর জীবনের মুন্ডপাত করে --বেহস্তে বাহাত্তর হুরের স্বপ্নে তারা বিভোড় -আমি তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই- এই ইসলামেই জন্মে ছিলেন সুফীগুরু জালালুদ্দিন রুমি।  জীবনকে যে এত তীব্রভাবে ভালোবাসা যেতে পারে, সেটা আমরা অনেকে তার কবিতা থেকেই শিখেছি --

( কবিতার ভাষাটি আমার নিজের অনুবাদ, রুমির ভালোবাসার তীব্রতা প্রকাশ করার মতন বাংলা আমি শিখি নি-তাই ক্ষমা মার্জনা চাইছি )

     মানবসত্ত্বা!
    সেত আমার অতিথিগৃহ—
    রোজ সকালে নিত্যনতুন অতিথির আনাগোনা।
এক টুকরো সুখ / একখন্ড হতাশা/ একরাশ ক্ষুদ্রতা,
অপ্রত্যাশিত অতিথির তালিকাটি দীর্ঘ/ ক্ষনিকের অতিথি তারা, এসেছে দুয়ারদ্বারে। 
স্বাগত সবাই/ আমি পা ধুইয়ে দিই তাদের সবাইকে
—যদি তা দুর্বার দুঃখও হয়
যা ওলোট পালট  করে ছুড়ে ফেলে দেয় সাজানো গৃহের সাজানো আসবার 
এরপরেও 
 আন্তরচিত্তে গ্রহণ কর সবাইকে—
হয়তো সে তোমাকে পুরস্কৃত করছে জেনো,
নতুন কিছু আনন্দআগমন উপলক্ষে।
অন্ধকার আশংকা, অপমান, আক্রোশ, ঘৃণা— সবকিছু,
হাসিমুখে এগিয়ে এসো সামনের দরজায়!
জালালুদ্দিন রুমি এগুলো লিখেছেন ত্রয়োদশ শতাব্দিতে, ইরানে। ইসলামের ইতিহাস তখন রক্তাত্ব-এখনকার মতই। উনি ইসলামের সৌর্ন্দয্যকে রাজনীতি থেকে বার করে কবিতায় রূপ দিলেন-কারন সুফীরা তখন ইসলামের  রক্তাত্ব রাজনৈতিক ব্যবহারে বিরক্ত। ঠিক যেমন ভাবে  এখনকার সাধারন মুসলমানরা বিরক্ত হোন যখন রাজনীতিবিদরা ইসলামকে ব্যবহার করেন ভোটের জন্য।

 জালালুদ্দিন রুমি না পড়লে বোঝা যায় না ইসলামিক সংস্কৃতিতেও একদা মানুষ খুঁজেছে চিরন্তন   সৌর্ন্দর্য্য। ওমর খৈয়াম, হাফিজ শিরাজি, খলিল জিব্রান-কার কথা ছেড়ে কার কথা বলি ?

            যেমন উপনিষদ না পড়লে বোঝা অসম্ভব প্রাচীন ভারতের চিন্তার সৌন্দর্য্য-আত্মার মুক্তি। গোরোক্ষা কমিটির হিন্দুএর দেখলে শুধুই মনে হবে হিন্দু ধর্ম আচার-বিচার-জাতফাতের ফিতেই আটকানো পা ভাঙা গরু-শুধু ন্যাদায় গোচনা! কে বলবে এই ধর্মের সর্বোচ্চ উপলদ্ধি উপনিষদের বাণী- যা রবীন্দ্রভাষ্যে  

‘হে মহাপথিক/অবারিত তব দশদিক/তোমার মন্দির নাই, নাই স্বর্গধাম/নাইকো চরম পরিণাম/। তীর্থ তব পদে পদে/চলিয়া তোমার পদে মুক্তি পাই চলার সম্পদে’
 
 তাহলে ক্ষীরটা কি খাইলাম?

  জীবনকে ভালবাসতে হবে- জীবনকে ঘৃণা করা শুরু করলে- ছেলেটা মৌলবাদি নইলে সন্ত্রাসবাদি হবেই।

  জীবনকে ভালবাসিবে কিরূপে? নাচে গানে খাদ্যে সৌর্ন্দয্যে কবিতার ছন্দে?  এখানেই ধর্ম দর্শনের সাথে সংঘাত। কঠোপনিষদ, কোরান-এরা সবাই আমাদের নশ্বর জীবনের আনন্দকে ক্ষনস্থায়ী বলে বাতিল করে দিল!

ঠিক এই কারনেই এই জন্মে আর আমার ধার্মিক হয়ে ওঠা হল না! চলার পথেই যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জেতা হারা-তাই থেকেই যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খুদের মতন ছোট ছোট আনন্দ দুঃখের বারিধারা- তার সিঞ্চনেই আমি খুশী। এটা জেনেই এসবের কোন মানে নেই-জীবনের পরম উদ্দেশ্যও নেই।

বেহস্ত, পরের জন্ম, কমিনিউস্ট রাষ্ট্র-ইত্যাদি বড় বড় লক্ষ্যের পেছনে  দৌড়ানোর ঝামেলাটা এই-তাতে জীবনের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাওয়াগুলো হাওয়া হয়ে উড়ে যায়-আর নৈরাশ্যের নেশায় জেগে ওঠে মৌলবাদি দৈত্য।

 বরং এই গ্লাসে গলায় থাকুক এক টুকরো গালিব

  হামকো মালুম হ্যায় জান্নাত কি হক্বিকৎ লেকিন

দিল কে খুশ রাখনে কো গালিব ইয়ে খ্যয়াল আচ্ছা হ্যায়।












Wednesday, July 5, 2017

বাঙালী পরিচিতিটাই আসল-হিন্দু মুসলমান পরিচিতিটা ইল্যুউশন

ধন্যবাদ আনিস খানকে। কালকেই লিখেছিলাম বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পে জল ঢালতে বাঙালী পরিচয় বা বাঙালী আইডেন্টিটি সামনে আনা জরুরী। এটা দেখে ভাল লাগল, তার মতন একজন শিল্পদ্যোগী, বাঙালী আইডেন্টিটি সামনে আনার দ্বায়িত্ব নিজের পরিসরে পালন করছেন। ঘরে বাইরের নিখিলেশের কথা মনে এল।

হিন্দু বা মুসলমান কোন পরিচয় হতে পারে না। প্রাচীন ভারত, গ্রীস, রোম-কোথাও ধর্মীয় পরিচিতি বলে কিছু ছিল না। মানুষের ধর্মাচরন ছিল, আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা ছিল। সবটাই ব্যক্তিগত।

মুসলমানরা যখন ভারতে প্রথম আসে-তারা ভারতীয়দের জিজ্ঞাসা করত তোমাদের ধর্ম কি? আসলেই ত কোন ধর্ম ছিল না ভারতে-প্রত্যেকের নিজস্ব উপাসনা, নিজের মতন করে সত্যকে খোঁজা। এটাই ভারতীয় দর্শনের শাস্বত বানী। ফলে উত্তর না পেয়ে, মুসলমানরা বললো-ওকে-তাহলে এটা হচ্ছে হিন্দু ধর্ম। কারন পার্শী শব্দে হিন্দু মানে সিন্দুনদের ওপারে যারা থাকে। হিন্দু শব্দটা কোন হিন্দু গ্রন্থে নেই-কারন ওই শব্দটা মুসলমানদের দান। মুসলমানদের দেওয়া সেই হিন্দু আইডেন্টিটি নিয়ে-আজ তাদের সাথেই লড়াই!

রোম সম্রাট কনস্টানটাইন প্রথম খ্রীষ্টান ধর্মের জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতিকে কাজে লাগান উত্তরের উপজাতিগুলোকে রোমান সাম্রাজ্যের বশবর্তী করতে। খ্রীষ্ঠান সাম্রাজ্যবাদের সেই মডেলটাই আরো উন্নতাকারে নিয়ে আসে সপ্তম শতাব্দির আরবের বাসিন্দারা। খৃষ্টান এবং মুসলমান -এই দুই পরিচিতির যুদ্ধ আরো তীব্র হয় তিনটে ক্রশেডের মধ্যে দিয়ে। যেহেতু গত এক হাজার বছর এই দুটো ধর্মই গোটা পৃথিবী দখল করতে চেয়েছে -রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় আস্তে আস্তে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন হয়েছে। ইউরোপে রেনেসাস এবং শিল্প বিপ্লবের ফলে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে হঠানো গেছে ঠিকই-কিন্ত ৫৬ টা মুসলমান দেশ এবং ভারতে ধর্ম আষ্টেপৃষ্টে বেঁধেছে রাজনীতিকে।

বাঙালী একটা লোকের পরিচিতি বা আইডেন্টি হতে পারে-কিন্তু হিন্দু বা মুসলমান কি করে একটা লোকের পরিচিতি হয় -তা আমার বোধগম্য না। সেটা রাজনৈতিক চক্রান্ত ছাড়া কিছু না। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি, বাংলা খাবার খাই-তাই আমরা বাঙালী। আমি মন্দিরে যাই-তাই হিন্দু-বা মসজিদে যাই, ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলি, তাই মুসলিম-এগুলো অবোধের নির্বোধ বুদ্ধি। বা জোর করে ব্রেইন ওয়াশ করে শিশু বয়স থেকে শেখানো হয় ধর্ম গ্রন্থের মাধ্যমে, রাষ্ট্রের সহযোগিতায়। হ্যা-এই ব্রেইন ওয়াশ বন্ধ না হলে, এই যে কোটি কোটি ধর্মান্ধ তৈরী হচ্ছে, তাদের সামাল দিতে পারবে না কোন পুলিশ, কোন মিলিটারি।

কেন হিন্দু, মুসলমান পরিচিতিটা ফেক? ইল্যুউশন? ভ্রুম?

কারন আমি যে বাঙালী পোস্ত খাই, ইলিশ খাই-সেটা সত্য। খাবারের অস্তিত্ব আছে। হিন্দু-মুসলমানরা যেসব জিনিস মানে ধর্মের নামে-তার সবটাই রূপকথা। অতীতের রাজনীতির কারনে সাজানো রূপকথা। এইসব গল্পে বিশ্বাস করে পরিচিতি? এর মানে স্পাইডারম্যানের গল্পে বিশ্বাস করে স্পাইডারম্যান ফ্যান ক্লাবের সদস্য হয়ে ঘোষনা করা- ওটাই আমার পরিচয়! এইসব গাঁজাখুরি গল্প যদি মানুষের পরিচিতির ভিত্তি হয়, একবিংশ শতাব্দিতে, তাহলে গোড়ায় গলদ। সরি, কোন মিলিটারি, কোন বিজেপি আপনাদের বাঁচাতে পারবে না। আরেকবার দেশভাগের মতন দাঙ্গা বাঁধবে। কারন যে পরিচিতির ভিত্তিটাই মানুষের মাথায় টুপি পড়িয়ে, ছোটবেলা থেকে ব্রেইন ওয়াশ করিয়ে তৈরী হয়েছে-তার মিথ্যাচার, মিথটাকে টিকিয়ে রাখতে দাঙ্গা বাধাবেই। আজ না হলে কাল। কাঠকয়লার আগুন-ধিকি ধিকি করে জ্বলে। খড় পরলেই ঘরবাড়ি ব্যাবসা জ্বালিয়ে সাফ করে দেবে।

ধর্ম বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা বা নিজের সন্ধান সবার মধ্যেই ওই সুরসুড়ি আছে। নাস্তিকের ও আছে। আমার ও আছে। আমার বিশ্বাস সততায়, বুদ্ধিতে পরিশ্রমে। ওইটুকুতে বিশ্বাস করেই, বাকী জীবনটা কাটানো সম্ভব। উপনিষদ পড়তে আমার ভাল লাগে-কিন্ত তার জন্যে নিজেকে হিন্দু বলে পরিচিতি দেব কেন? কারন ইমানুয়েল কান্টের ক্রিটিক অব পিউর রিজন, আমার একই রকম ভাল লাগে। এটাত নিজের জানার জন্য ব্যক্তিগত যাত্রা। প্রতিটা মানুষের ধর্ম, সে হিন্দুই হৌক বা মুসলমান হোক, তার ব্যক্তিগত যাত্রা- পারসোনাল জার্নি। সেই জন্যেই ১৬০ কোটি মুসলমানের ১৬০ কোটি ইসলাম। কোন দুজন মুসলমান পাবেন না-যার ইসলাম হুবহু এক। কোন দুজন হিন্দু পাবেন না-যাদের হিন্দু ধর্ম হুবহু এক। কারন ধর্ম একটা ব্যক্তিগত জার্নি-তা কখনোই পরিচিতি বা আইডেন্টিটি হতে পারে না।

কিন্তু দুজন বাঙালী পাবেন -আনিশ খান এবং আশীষ রায়-যারা সর্ষে ইলিশ খেয়ে ঢেঁকুর তুলবে। গাইবে- আমি বাংলায় গান গাই। কারন ইলিশ এবং গান-দুটোই বাস্তব।

Tuesday, July 4, 2017

বাঙালী সংস্কৃতি দিয়েই মৌলবাদি উত্থান ঠেকাতে হবে

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করুন-ইত্যাদি উপাদেয় উপদেশ ভাল-কিন্ত কথাটির মধ্যেই র‍য়ে গেছে-স্ববিরোধিতার বীজ। পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় থাকতে পারে-এটারই যদি বৈধতা থাকে, সাম্প্রদায়িক বৈরিতাও বৈধতা পায়। কারন প্রথম প্রশ্নই উঠবে, বাঙালীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুটো আলাদা সম্প্রদায় কেন? এদের খাওয়া দাওয়া ভাষা কবি নগর শহর-সব এক। তাহলে বাঙালীদের হিন্দু মুসলমানে ভাগ করাটা বৈধ হয় কি যুক্তিতে?

যুক্তি খুব সরল। অধিকাংশ বাঙালী, তার বাঙালী পরিচিতির চেয়েও, তার নিজেদের ধর্মীয় পরিচিতিতে বেশী গুরুত্ব দেয়। অধিকাংশ বাঙালীর নিজের অস্তিত্বে যতনা বাঙালীয়ানা, তার থেকেও বেশী তারা নিজেদের মুসলমান বা হিন্দু ভাবে। বাঙালীর যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক চিন্তা আছে- যা সহজিয়া, আউল বাউল হয়ে লালন রবীন্দ্রনাথে পূর্নতা পেয়েছে -সেই মাটির ধর্ম সম্মন্ধেই অধিকাংশ বাঙালী বিস্মৃত।

বাঙালীর শুধু ভাষা না-তার নিজস্ব ধর্ম আছে-যা হিন্দুত্ব বা ইসলামের থেকে আলাদা-এটাইত অধিকাংশ বাঙালী জানে না!!

যে বাঙালীর রবীন্দ্রনাথ লালন আছে- সে কেন আরব সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদে ( ইসলাম ) বুঁদ হয়ে থাকে? বা ইসলামের আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য কেনই বা তাকে উত্তর ভারতের গোবলয়ের গোচনা সেবন করতে হয়?

আমরা রবীন্দ্রনজরুল বলে অনেক লম্ফ ঝম্ফ দিই বটে-কিন্ত বাস্তবে যখন দেখা যায় এক দুষ্টু বালকের সামান্য ফেসবুক পোষ্টের জন্য বাদুরিয়ার মুসলমানরা দম দেওয়া কলের পুতুলের মতন দাঙ্গা করতে পঙ্গপালের মতন দোকান পাট বাড়ি ঘরদোর ধ্বংস করছে-তখন এটা পরিস্কার, রবীন্দ্রনাথ , নজরুল বা এমন কি লালন --শুধুই শিক্ষিত বাঙালীর ড্রইংরুমে। বাঙালী এলিট লিব্যারাল এবং সাধারন মানুষ-দুই ভিন্ন বাংলার বাসিন্দা।

দেগঙ্গা থেকে বাদুরিয়া-বাংলার যে বলকানাইজেশন চলছে, তা ঠেকাতে মমতা ব্যার্নার্জির সামনে একটাই পথ। বাঙালী সংস্কৃতি দিয়েই হিন্দু মুসলমান বলে যে পৃথক আইডেন্টিটি তৈরী করা হয়েছে, সেটাকে আগে ফিকে করতে হবে। উনি সেটা করেন নি। মুসলমান ভোট ব্যঙ্কে ধরে রাখার জন্য, বাঙালী মুসলমানকে মুসলমান করে রেখেছে সব পার্টিই- কংগ্রেস, সিপিএম, তৃনমূল , বিজেপি।

শরৎচন্দ্রের সেই বাঙালী বনাম মুসলমানের ফুটবল খেলার মতন আজো সমান কনফিউশন-এরা বাঙালী না মুসলমান!! লালন, নজরুল-কেউ সেই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস ঘোচাতে পারেন নি। কারন সরকারি টাকায় মাদ্রাসা, আলেম, হুজুরদের পোষা হচ্ছে-লালন সাঁইকে পৌছে দেওয়া হচ্ছে না। আলেম হুজুররা নিজেদের ধর্ম ব্যবসা টেকাতে-একজন মুসলমানের মুসলমান পরিচিতিই পোক্ত করবে-ফলে বাদুরিয়াতে যখন এই সব ধর্মোন্মাদরা পঙ্গপালের মতন লাঠি নিয়ে তাড়া করে- সেটা প্রশাসনের নীতির ভুল। কারন আলেমদের টাকা না দিয়ে যদি গ্রামে গ্রামে লালন সাই এর শিষ্যদের, বাউল কালচার ছড়িয়ে দেওয়া যেত- তাহলে বাংলা মুখরিত হত, বাঙালীর চিন্তনে!

‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।।

সরকার থেকে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। ফলে মুসলমানকে আরো বেশী মুসলমান বানানো হয়েছে-আর তার প্রতিক্রিয়াতে হিন্দুরা আরো বেশী হিন্দু হচ্ছে।

মধ্যে খান থেকে বাঙালীদের স্পেসটা আরো আরো অনেক ছোট হচ্ছে। অথচ এরা নাকি বাংলার মসনদে।

যে জাতি নিজের সংস্কৃতি, নিজের ঐতিহ্যশালী লোকায়িত সহজিয়া ধর্মকে চেনে না-তাদের মাটির দখল আরব আর উত্তর ভারতের দালালদের দখলে যাবে-সেটাই স্বাভাবিক।



কিন্ত এখনো সময় আছে। সংস্কৃতি প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী-গ্রামে গ্রামে বাংলার সহজিয়া ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিন। ছড়িয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ নজরুলের জীবন দর্শন। যাতে সবাই নিজেদের বাঙালী ভাবতে শেখে আগে। তাদের মুসলমান বা হিন্দু পরিচিতি যেন গৌন হয়। তার বদলে উনি যদি দুধ কলা দিয়ে "ইসলামিক পরিচিতির" বিষ ছড়ানো কালসাপদের পোষেন মাসোহারা দিয়ে, তার ফল হবে বাউরিয়া-এবং সম্ভবত উনিও ক্ষমতা হারাবেন।

Thursday, June 29, 2017

গোলাম সারোয়ারের বামপন্থি কুসংস্কার

রিবিউটাল ঃ https://istishon.com/?q=node%2F24424
প্রথমেই গোলাম ভাইকে ধন্যবাদ জানাই। কারন আমার পনেরো মিনিটে লেখা ব্লগের বিরুদ্ধে উনি চারটি ব্লগে আমার লেখার নিবিড় পাঠ করেছেন। এই ফেসবুকের যুগে কোন লেখকের লেখা যদি এত গভীর ভাবে কেউ পড়ে, এমন দুর্লভ পাঠককে প্রশংসা না করে উপায় নেই। শুধু সমস্যা হচ্ছে গোলাম সারোয়ার এখনো বামপন্থী চিন্তার গোলামিতেই গোসল করছেন-কেন করছেন, তার ক্রনিকলটা সাজিয়ে দিচ্ছিঃ
(১) আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নগ্ন, এবং তার বিরুদ্ধে আমি মুক্তমনাতেই দশটা আর্টকলের সিরিজ লিখেছিলাম। এখানে দেখতে পারেন গোলাম ভাইঃ https://sites.google.com/site/biplabpal2000/home
শুধু তাই না। আমেরিকাতে আদিবাসিদের ওপরে কিভাবে অত্যাচার চলেছে-সেই সুদীর্ঘ ইতিহাস ও লিখেছি বিস্তারিত এই ব্লগে
https://blog.mukto-mona.com/2016/02/18/48489/
শুধু আমি কেন, আমেরিকানরাও আমেরিকার বিদেশনীতিকে গালাগাল দিয়ে থাকে। গোলাম ভাই কি ঢাকায় বসে হাসিনার স্বৈরচারের বিরুদ্ধে লিখতে পারবেন? আমরা আমেরিকাতে বসে আমেরিকার বিরুদ্ধে লিখতে পারি। আর সেই জন্যেই আমেরিকাতে থাকাই পছন্দ।
শুধু বাংলাদেশ কেন। পশ্চিম বঙ্গ বা ভারতের সমস্যা নিয়েও খোলাখুলি লিখতে ভয় হয়। ওখানে বাবা মা আত্মীয় স্বজন আছে। ওখানে, কমিনিউস্টদেশে সবাই আমরা "বোবা সমুদ্রের নোনাজলে" সখ্যাত সলিলে ( একজন কবির থেকে শব্দগুলো ধার করলাম)।
বামপন্থীদের সমস্যা অন্যত্র-অবাস্তব জগতের সন্ধানে তারা। মঙ্গল গ্রহে ত কেউ থাকে না। মার্ক্স কথিত কমিনিউস্ট রাষ্ট্রও কোথাও নেই। সুতরাং শত দোষ থাকা সত্ত্বেও আমেরিকাতে থাকাই শ্রেয় বলে মনে করি।
(২) সাম্রাজ্যবাদের ও কি সবটাই বাজে?আলেক্সজান্ডারের সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া গ্রীক জ্ঞান বিজ্ঞান কিভাবে ছড়াত বিশ্বে? ইসলামিক সাম্রাজ্যবাদ না এলে আরবে বিজ্ঞান চর্চা হত কিভাবে? আর সেটা না হলে কোপার্নিকাস , নিউটনের জন্ম হত কি ভাবে? এই যে ইন্টারনেটের এত সুবিধা নিচ্ছেন গোলাম ভাই, সেটার জন্মও আমেরিকার মিলিটারির প্রয়োজনে (আরপানেট প্রজেক্ট) ।
সাম্রাজ্যবাদের সাফাই গাইছি না। কিন্ত মুক্তমনের পরিচয়, যতই অপ্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকুক না কেন, লোকের মন রাখতে লেখা উচিত না। নিষ্ঠা থাকা উচিত সত্যের প্রতি। সেই জন্যেই আমি এই লেখায় দেখিয়েছি কি ভাবে সাম্রাজ্যবাদের জন্য বিজ্ঞান প্রযুক্তি এগিয়েছে।
দেখুন নিজেকে মহান দেখানোর জন্য সাম্রাজ্যবাদকে অজস্র গালাগাল দেওয়া যায়। যা আমি ওই ১১ টা খন্ডে দিয়েওছি। কিন্ত সাম্রাজ্যবাদের জন্য যে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি-সেটাও সমান সত্য। সেটা লেখার জন্য যদি আমাকে কেউ বলে আমি সাম্রাজ্যবাদের সাফাই গাইছি, তাহলে আমি পাত্তা দেব না। কারন এগুলো বাঙালী সুল্ভ নিম্নগোত্রের চুলকানি।
৩) বিজ্ঞানের গবেষনা এবং প্রযুক্তির মধ্যে গুলিয়েছেন গোলাম ভাই। উদাহরন দিচ্ছি । ইলেক্ট্রিসিটি। হ্যা মাইকেল ফ্যারাডে থেকে গ্যাল্ভানিক সেল-সব কিছুই ছিল ল্যাবেটরিতে। কিন্ত এডিসন এবং টেসলার দ্বৈরথেই আমেরিকার মানুষ প্রথম জেনারেটর পায়।কর্মাশিয়াল ভাবে ইলেক্ট্রিক কারেন্টকে কাজে লাগানো হয়। একটা ছোট্ট তথ্য দিই । বিজ্ঞানের গবেষনা লদ্ধ ফলের ১% ও প্রযুক্তির কাজে আসে না। কারন টা এই যে ল্যাবেটরি থেকে প্রোডাকশনে আনতে বিপুল ইনভেস্টমেন্ট লাগে। এবং তার জন্যে দরকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার -বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, ব্যঙ্কার, ভিসি-অনেক কিছু এক করলে একটা ল্যাবেটরী প্রোডাক্ট মার্কেটে আসে। এই ইনফ্রাস্টাকচার বহুদিন শুধু আমেরিকা, বৃটেন এবং জার্মানিতেই ছিল-এখন ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিন কোরিয়াতে ও আছে। কিন্ত আমেরিকার তুলনায় তা কিস্যু না। ধরুন স্যোশাল মিডিয়া। ১৯৯০ সাল থেকেই কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে পেটেন্ট ফাইল করেছেন, প্রচুর পাবলিশ করেছে। কিন্ত সোশাল মিডিয়া বলতে আজকে- ফেসবুক, ইউটিউব এং টুইট্যার। তিনটিই আমেরিকার।
ভারতে ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অব টেকনোলজীতে প্রচুর ভাল গবেষনা হচ্ছে। আমি নিজের ব্যবসার খাতিরেই গত পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করছিলাম যদি কোন গবেষনালদ্ধ কাজকে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতে বা বিশ্বে আনা যায়। কিন্ত বিধি বাম। ভারতে সেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই।
বই আর ল্যাবেটরির মধ্যে আবদ্ধ বিজ্ঞানে কিজনগনের কোন উপকার হয়? কিস্যু হয় না। যতক্ষন না পর্যন্ত তা মানবকল্যানে ব্যপকভাবে কাজে আসছে। আর সেই প্রসেসটা বহুদিন যাবত শুধু আমেরিকাতেই ছিল। যার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ান বিজ্ঞানের জন্য আমেরিকার থেকেও বেশী খরচ করেছে ঠিকই-কিন্ত তার পরেও তাদের দেশের লোক অনাহারে থেকেছে। কি লাভ সেই বিজ্ঞান খরচায়, যা করার পরেও দেশের লোক অনাহারে থাকে, কারন সেই বিজ্ঞান জনগণের কাছে পৌঁছায় না?
৪) সোভিয়েত ইউনিয়ানে সাহিত্য? অক্টবর বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়া সাহিত্য ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। চেকভ, টলস্টয়, ডস্টভয়েস্কি। ১৯১৭ সালের পরে সেই মানের সাহিত্য কোথায় রাশিয়াতে? ছিলেন গোর্কি। তাও স্টালিনের ভয়ে বিশেষ কিছু লেখেন নি বিপ্লব পরবর্তি রাশিয়াতে। সোভিয়েত থেকে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন বরিস পাস্তারনেক । তিনি তা পেয়েছেন কমিনিউজমের সমালোচনা করেই। পেয়েছেন আলেক্সান্ডার সলজেনিস্তিন। যাকে গুলাগ বা লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়েছিলেন কমিনিউস্টরা। অভিজিত রায়ের লেখা আছে তার ওপরে-কিভাবে কমিনিউস্টরা হত্যা করতে চেয়েছিল শতাব্দির এক সেরা প্রতিভাকে। আর নোবেল পেয়েছেন মিখাইল সকোলভ। ইনিই একমাত্র স্টালিনের সুনজরে ছিলেন, ১৯৩৭ সালে সুপ্রিম সোভিয়েতের সদস্যও ছিলেন।
৫) সোভিয়েত ইউনিয়ানের বিজ্ঞান ? গোলাম ভাই লিখেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ান থেকে ১০০ জন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন! বাস্তবে নাম্বারটা ৭। এদের মধ্যে অনেকের কাজের সাথে আমি বিস্তর পরিচিত ( ল্যান্ডাউ, চেরেনকভ, ক্যাপিসজা, প্রিগোনিন )। ল্যান্ডাউএর লেখা থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স পড়েই ছাত্র অবস্থায় বড় হয়েছি। উনি আমার প্রিয় বিজ্ঞানী। কিন্ত গোলাম ভাই কি জানেন এই অসামান্য প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে সাইবেরিয়াতে গাছ কাটটে পাঠিয়েছিল স্টালিন জমানা? নেহাত, লান্ডাউ এর বস কোন রকমে এক বছর বাদে, অর্ডার রভার্সাল করতে সক্ষম হন। এরকম কত শত ল্যান্ডাউ স্টালিনের পার্জে মারা গেছেন তা কি গোলাম ভাই জানেন?
ল্যান্ডাঊ একবছর সাইবেরিয়াতে গাছ কাটার পরে, মস্কোতে ফিরে শোনা যায় মৌনব্রত পালন করতেন। কারুর সাথে কথা বলতেন না। পাছে তাকে আবার সাইবেরিয়াতে পাঠানো হয়!
বাই দ্যা ওয়ে গোলাম ভাই-আরেকটা ছোট তথ্য জানুন। নোবেল প্রাইজ দেওয়া শুরু হয়েছে ১৯০১ সাল থেকে। অক্টবর বিপ্লব ১৯১৭ সালে। এই ১৬ বছরের মধ্যেই, প্রাক বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় ( যা কমিনিউস্টদের মতে নাকি কিছুই ছিল না), তিনজন নোবেল পেয়েছেন বিজ্ঞানে। ইভান পাভ্লভ (১৯০৪-মেডিসিন), মেটচিনকভ ( মেডিসিন ১৯০৮), অস্টোয়াল্ড ( কেমিস্ট্রি, ১৯০৯)। আর সোভিয়েত বেঁচেছিল ৭৪ বছর। সেই ৭৪ বছরে এসেছে ৭ টি নোবেল।
বিপ্লবের আগে যে রাশিয়াতে মেন্ডেলীভ, পাবল্ভ, ওস্টোওয়াল্ড, টলস্টয়, চেকভ, ডস্টভয়েস্কিরা জন্মেছে -সেই রাশিয়া খুব অনুন্নত ছিল? আরেকটু পড়াশোনা করুন। ১৮৬৫ সাল থেকে কিভাবে আস্তে আস্তে সংস্কারের মাধ্যমে ১৯০৫ সালের মধ্যেই রাশিয়া বৃটেন, জার্মানির সমকক্ষ শিল্প শক্তি হয়ে ওঠে সেসবের ইতিহাস ত কিছু জানেন না। শুধু লালমার্কা চটি বই ভিত্তি করে বিতর্ক হয়?
৬) আসলে গোলাম ভাই এর সমস্যা অন্যত্র। উনিও সেই রূপকথায় বিশ্বাস করেন লেনিনের অক্টবর বিপ্লবের ( পড়ুন প্রতিবিপ্লব -কেন ? সেটাও লিখেছি এখানে https://blog.mukto-mona.com/2008/11/08/136/) এর আগে রাশিয়ার অবস্থা ছিল পুরাই দুরাবস্থা!
অহ কি অসাধারন গল্পই না ফেঁদেছিলেন কমিনিস্টরা? গোলাম ভাই কি জানেন ১৯১৭ সালের বিপ্লবের আগে রাশিয়া শিল্প উৎপাদনে ছিল বৃটিশ,জার্মানী এবং ফ্রান্সের পরেই? আর কি গল্প জানেন গোলাম ভাই? যাই হোক কমিনিউস্টরা যে রাশিয়ার ইতিহাস একদম পড়ে নি-সেটা আমি ভাল করেই জানি। আর সেই জন্যেই তারা যেসব গালগল্পে বিশ্বাস করে তার লিস্ট ও একটা দিয়েছিলাম (https://blog.mukto-mona.com/2009/12/10/3648/)
রাশিয়া এতই পিছিয়েছিল যে বিপ্লব পূর্ব রাশিয়াতে টলস্টয়, চেকভ এবং ডস্টভয়েস্কি জন্মাল? কোন ধরনের ব্রেইন ওয়াশড কমিনিউস্টরা এই টাইপের ঢপে বিশ্বাস করবে?
এই রিবিউটাল দীর্ঘ করার কোন ইচ্ছা নেই। কারন এটা আমার কাছে পরিস্কার গোলাম ভাই সোভিয়েত ইউনিয়ানের ইতিহাস বা রাশিয়ার ইতিহাস নিয়েই কিছুই পড়েন নি। প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের মধ্যে গুলিয়েছেন।
৭) এই বার কিউবার প্রসঙ্গে আসি। সবাই কিউবায় যায় হয় হেলথ ট্যুরিজমের জন্য , নইলে সেক্স টুরিজমের জন্য। এটা ওপেন সিক্রেট। প্রশ্ন হচ্ছে যে সিস্টেমে একজন মেয়ে অভাবের তাড়নায় বেশ্যাবৃত্তি নেয়, সেই রাজনৈতিক সিস্টেম কি ভাল? বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গের অসংখ্য মেয়ে দারিদ্রের কারনে দেহ ব্যবসাতে আসে। মুম্বাই, কলকতার ব্রথেলে বাঙালী মেয়ে গিজগিজ করছে।
কেন সেখানে গুজরাটি, মারাঠী নেই? কারন তাদের অর্থনীতি ভাল।
আমি জানি কমিনিউস্টরা ছেঁড়া জাঙিয়ার বুক পকেট বানানোর চর্চা করে। কিন্ত এইটুকু সামান্য জিনিস বুঝতে কি সেক্সিস্ট ইত্যাদি আজগুবি তথ্যের অবতাড়না করতে হয়?
একটা দেশ এবং সিস্টেম-শুধ্য কিছু পুঁথি দিয়ে জানা যায় না। তার জন্যে সেই দেশে যেতে হয়। সেই দেশের লোকেদের সাথে কথা বলতে হয়। তাদের সাহিত্য সংস্কৃতিকে জানতে হয়।
রাশিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়ানকে নিয়ে আমার অবশেসন আছে । কারন আমি রাশিয়ান সাহিত্যের ভক্ত। রাশিয়ান বিজ্ঞানের ভক্ত। প্রচুর রাশিয়া বিজ্ঞানী আমার বন্ধু, যারা ওই সিস্টেমে বড় হয়েছেন কিন্ত তারপরেও আমার লেখাটির প্রতিটা কথা সত্য। কারন সব বাজেট যেত অস্ত্র এবং মহাকাশ গবেষনাতে। লোকে খেতে পাচ্ছে না-অথচ কৃষিবিজ্ঞানের গবেষনাতে বাজেট থাকত না। আরো অনেক লিখতে পারি-হয়ত লিখতাম এইসব নিয়ে একদিন। কিন্ত পশ্চিম বঙ্গে এখন আর বামেরা নেই । ৫৩% ভোট, এখন ১৪% এ। ফলে সময় নষ্ট করার মানে হয় না।
কারনটা বুঝতে গোলাম সারোয়ারকে এখনো অনেক পড়াশোনা করতে হবে।

ট্রায়াসিক যুগের অভিভাবক

সকালে উঠেই দেখি ফেসবুক ফিড ফেস্টুনে ছয়লাপ -প্রাথমিকে পাশফেল ফিরিয়া আনিতে হইবে! নাহইলে ধর্মঘট, সহ আরো অনেক কিছুর ঘনঘটা!

আচ্ছা পশ্চিম বঙ্গের অভিভাবকরা কি ট্রায়াসিক যুগের ডাইনোসর?

ছাত্রছাত্রীরা শিখছে কি না, তার মুল্যায়ন সবসময় দরকার। কিন্ত পাশফেল নিয়ে মাথাব্যথা কেন?
আমাদের সময় প্রাথমিকে পাশফেল ছিল এবং কোন সন্দেহ নেই পাশফেল প্রাথমিকে রাখা শুধু অবৈজ্ঞানিকই না-শিশু মনের জন্য অত্যন্ত খারাপ। আমি দেখতাম ফেল করে মূলত খুব প্রান্তিক ফ্যামিলি থেকে শিশুরা-যাদের প্রথম প্রজন্ম স্কুলে আসছে। দুই একবার ফেল করার পরে, তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হত, তোর দ্বারা কিছু হবে না- তোর বাবা মুনিশ, তুই স্কুলে সময় নষ্ট না করে মুনিশ খাটতে যা!! কোথায় এই প্রথম প্রজন্মের ছেলেমেয়েগুলোকে উৎসাহ দেওয়া দরকার যাতে তারা এগিয়ে যেতে পারে, তার বদলে প্রথমেই তাদের বলে দেওয়া হচ্ছে পড়াশোনা তোদের জন্য না! এই সব কান্ডজ্ঞান আউলা অভিভাবক দেখে গুরুদেবের কথাই প্রথমে মনে আসে -

যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাধিবে ষে নিচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে ।
অজ্ঞানের অন্ধকারে আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান ।

আমেরিকা সহ সব উন্নত দেশই পাশফেল বহুদিন তুলে দিয়েছে। এখানে কোন ছেলে মেয়ে অঙ্কে পিছিয়ে থাকলে, তাদেরকে আলাদা ক্লাস দেওয়া হয়-যাতে মেক আপ করতে পারে। আবার কেউ অঙ্কে এগিয়ে থাকলে, তাদের গিফটেড এবং ট্যালেন্টেড বলে আলাদা ক্লাস দেওয়া হয়।

যাইহোক ধরেই নিচ্ছি অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় চৌচির। তারা কি এটা ভেবেছেন, ভবিষ্যতে অটোমেশনের যুগে পুঁথিবিদ্যা শিক্ষার জন্য কোন চাকরি নেই? ভবিষ্যতে দরকার সৃজনশীল মস্তিস্ক এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা। স্কুলে এর কোন শিক্ষাটা এখন দেওয়া হয়?

সৃজনশীলতা নিয়ে আগে লিখেছি, আজ লিখছি নেতৃত্ব প্রসঙ্গে।

নেতা ত আকাশ থেকে পড়ে না- জিনেও থাকে না। অন্যান্য আরো অনেক স্কিলের মতন, নেতৃত্বও ছোটবেলা থেকেই একটা " সামাজিক স্কিল"- যা পরিচর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

তো বাচ্চারা নেতৃত্বের শিক্ষাটা পাবে কি করে?

উত্তর সোজা। হয় খেলার মাঠে, নইলে নাটকের ঠেকে। আমরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছি কত! ক্রিকেটের একজন ক্যাপ্টেনকে যেভাবে ব্যাটিং অর্ডার , বোলিং , ফিল্ডিং চেঞ্চ করতে হয়- প্লেয়ারদের গোঁসা ভঞ্জন করতে হয়- কর্পরেটে একজন ম্যানেজার ও ঠিক সেই ভাবে, তার রিসোর্স প্ল্যানিং করে। রিসোর্স ম্যানেজ করে! নো স্যার, এম বি এ করে ম্যানেজমেন্ট শেখা যায় না-ছোটবেলা থেকে যাদের মাথায় প্ল্যানিং, স্ট্রাটেজি ইত্যাদির চর্চা নেই -হঠাৎ করে এম বি এতে দুটো পাওয়ার পয়েন্ট শিখে কেউ ম্যানেজার হয়ে উঠবে-এ আশা শুধুই ধোঁয়াশা!

কংক্রিটের জঙ্গলে বড় হওয়া, সাত আটটা করে টিউশনি করা আজকের ছেলেমেয়েরা মাঠ কি সেটাই জানে না। খেলা অনেক দূরের কথা। এরা কি করে ভবিষ্যতে কাজে নেতৃত্ব দেবে?

শুধু তাই না, নেতাকে অভিনেতাও হতে হয়। টীমকে ইন্সপায়ার করে লিডার। তার জন্য অভিনয়ের প্রাথমিক স্কিলটাও দরকার। আমারদের সময়ে ছোটবেলায় কত নাটকের চর্চা ছিল পাড়ায় পাড়ায়। এখন শুধু টিউশুনি। বাচ্চারা তাহলে কি করে শিখবে কমিউনিকেশন স্কিল?

শুধু তাই না। সত্যিকথা বলতে কি কংক্রিটের জঙ্গলে বড় হওয়া অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই মানসিক অবসাদ এবং চাপের শিকার। কারন খেলাধূলা করে না-ফলে শরীর এবং মন দুটোই দুর্বল। এরা ত পেশাদারি জগতে কাজে চাপ সামলাতেই পারবে না। সাংসারিক কলহের মোকাবিলা অনেক দূরের রহস্য

বরং বাংলায় গ্রামের দিকে ছেলেমেয়েরা এখনো অনেকটা ফ্রি টাইম পায়। খেলা ধূলা করে-পুকুরে সাঁতার কাটে। তাদের দ্বারা যদিও কিছু হবে, কংক্রীটের জঙ্গলে বড় হওয়া এই সব কীটপতঙ্গের কারখানার প্রোডাক্টদের দ্বারা কিস্যু হবে না।
বাস্তবে শিশু শিক্ষার বদলে শিশুদের পঙ্গুত্বের সাধনায় মগ্ন অভিভাবক সমাজ। সর্বনাশের সব থেকে বড় কান্ডারী তারাই।

Saturday, June 24, 2017

বাঙালী ব্যবসা বিমুখ-দায়ী রবীন্দ্রনাথ ?

বাঙালী ব্যবসা বিমুখ।  সমস্যাটা সবাই স্বীকার করে-বিবাদ এর কারন নির্নয়ে। কে দায়ী?

       প্রবাসী এবং এলিট বাঙালীদের মধ্যে একটা চালু ধারনা ( মানে ওই উইকেন্ড প্রবাসী পার্টি ) -বাঙালীর ব্যবসার গুষ্টি উদ্ধার করেছেন দুজন- রবীন্দ্রনাথ এবং কার্ল মার্ক্স!

      প্রথমজন বাঙালীকে এমন ভাবে গান, কবিতায় মজিয়েছেন -তার থেকে বাঙালী জাতির উদ্ধার নেই! অনেকেই আমাকে বলেন যদ্দিন ওই দাড়িওয়ালা বাঙালীর দ্বিতীয় ঈশ্বর, এই জাতিকে উদ্ধার করা প্রথম ঈশ্বরের পক্ষেও অসম্ভব।

       দ্বিতীয় জন "নাকি" শিখাইয়াছে  পুঁজি এবং ব্যবসা চৌর্য্যবৃত্তি!  বাঙালীর বামমনোবৃত্তিতে লক্ষ্মী চঞ্চলা।

  অধিকাংশ পার্টিতেই  ব্যবসার জগতে বাঙালীর ব্যর্থতা নিয়ে আলোচন হয়- মূল নির্যাস- এই দুজন বাঙালীর জীবনে আফিং এবং হিরোইন!! এর থেকে নাকি উদ্ধার নেই!

        মুশকিল হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ এবং মার্ক্সকে বুঝতে ব্যর্থ হওয়াটা বাঙালীর জীবনের সব থেকে বড় ঐতিহাসিক ট্রাজেডি।

    প্রথমে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আসি।

    রবীন্দ্রচর্চা কি ব্যবসা চর্চার অন্তরায়?
 
     আমি মনে করি উল্টোটা।  ব্যাবসার সব থেকে গুরুত্বপূর্ন ফাংশান মার্কেটিং। যেখানে একটা গুছিয়ে গল্প বলতে হয়।  গুছিয়ে গল্প বলার ক্ষমতা না থাকলে, কারুর ব্যবসাতে আসাই উচিত না। ক্লায়েন্টের মাথার মধ্যে গল্পের মাধ্যমে ঢুকতে, বেশ ভালোই কমিউনিকেশন লাগে।  সাহিত্যচর্চা সেই কাজের সহায়ক। অন্তরায় কেন হবে?

    আসলে বাঙালীর সমস্যা দুটো ক্ষেত্রে।
   
    প্রথমে তারা দেখে সফল ব্যবসায়ী মানেই মারোয়াড়ি। যাদের রবীন্দ্রসংগীত নেই, কবিতা নেই। এতে অনেক বাঙালীর বদ্ধমূল ভূল ধারনা ব্যবসায়ী হতে গেলে সংস্কৃতি বিরোধি হনুমান চল্লিশা হতে হইবে।

খুব ভুল ধারনা। ব্যবসা দু ধরনের-ডিস্ট্রিবিউটশন বা ট্রেডং এবং প্রোডাউসার বা যারা কোন প্রোডাক্ট বানায়।  যারা শাড়ি তৈরী করছে, বা কিছু তৈরী করছে-তারা সবাই শিল্পী। ডিজাইন সেখানে মুখ্য। প্রযুক্তি জাস্ট একটা টুল।  শিল্প সংস্কৃতি যা বাঙালীর রক্তে, তা ব্যবসার সহায়ক। ভুলে গেলে চলবে একদা বাঙলার মসলিন গোটা পৃথিবীতে যেত।

  পেশার প্রয়োজনেই আমেরিকাতে মাঝারি বা ছোট ব্যবসায়ীদের সাথে আমার ওঠাবসা বেশি। তাদের অধিকাংশই বেশ ভাল লেখক-এবং তাদের শিল্প চেতনাও উন্নতমানের।

  সাহিত্য, শিল্পচর্চার সাথে ব্যবসার বিরোধ নেই।

  আসলে প্রিন্স দ্বারকানাথের নাতিপুতিরা ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়ার কারন নির্নয় করতে গিয়ে অনেকেই বলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ  একদিকে ব্যবসা অন্যদিকে নাটক করতে গিয়ে ব্যবসা ডুবিয়েছেন।  এটাও ভুল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আসলে জাহাজ ব্যবসায় আসাটাই উচিত ছিল না।  হ্যা, এই প্রশ্ন উঠবেই যে যে ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাপুরুষ ভারতের প্রথম আন্তারপ্রেনার প্রিন্স দ্বারকানাথ, সেই ঠাকুর ফ্যামিলি টাটা হাউস না হয়ে ঠাকুরবাড়ি কেন হল ? দেবেন্দ্রনাথের কোন ছেলে কেন জামসেদজি টাটা হল না?

  এর উত্তর দেবেন্দ্রনাথ নিজে। প্রিন্স দ্বারকানাথ যেখানে ভারতে আধুনিক ব্যবসার সূচনা করেছেন। প্রথম কয়লাখনি, স্টীমার এমন কি স্টিম ইঞ্জিন তৈরীর ফ্যাক্টরী করছেন হাওড়াতে, দেবেন্দ্রনাথ যেকোন কারনেই হৌক আধ্যাত্মিক মোহে চালিত হয়ে বাবার স্পিরিট পান নি।  সংসার তাকে টানে নি। ফলে দ্বারকানাথের কোন নাতির মধ্যেই, তার ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টি ছিল না। থাকলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জাহাজ ব্যবসায় নামতেন না। সেই সময় স্টিল, টেক্সটাইল, জুট্মিল আস্তে আস্তে প্রসার লাভ করছিল। আচার্য্য প্রফুল্ল রায় প্রায় বিনা সম্বলে বাড়ির বারান্দায় বেঙ্গল কেমিক্যাল দাঁড় করিয়েছেন তখন।  জ্যোরিরিন্দ্রনাথের যদি দেবেন্দ্রনাথের মতন ব্যবসায়িক বুদ্ধি থাকত, উনি ব্যবসাটা ঠিক ঠাক নির্বাচন করতেন।

   এবার আসি মার্ক্স প্রসঙ্গে।

   মার্ক্সবাদের চর্চা কি বাঙালীর ব্যবসার সব থেকে বড় কালাপাহাড়? যাদবপুরে কাছে আজকে যেখানে সাউথ সিটি মল-একদা সেখানে ছিল উষামার্টিন। তার চারপাশে ছিল আরো চারটে বিখ্যাত ফ্যাক্টরী। যার মধ্যে ছিল সুলেখা কালি।  জ্যোতিবসুর সিটুর শ্রমিক আন্দোলনের দাপটে ওই এলাকার সব ফ্যাক্টরীর গঙ্গাপ্রাপ্তি হয় ১৯৯০ সালের আগেই!

  সুতরাং মনে হতেই পারে কার্লমার্ক্সই সেই কালাপাহাড় যার চর্চা  বাঙালীর শিল্প, ব্যবসাকে ধ্বংস করেছে!!

  আসল সমস্যাটা মার্ক্সবাদ চর্চার না-মার্ক্সের লেখার বদ হজমে। বাঙালী কমরেডদের মার্ক্স পড়ার মতন বিদ্যা পেটে নাই।  মার্ক্সের লেখা সবটাই ধনতন্ত্রের বিশ্লেষনে-মার্কেটের বিশ্লেষনে-পুঁজির বিশ্লেষনে। বরং মার্ক্স পড়লে ব্যবসা এবং মার্কেট কিভাবে চলে, তা আরো ভাল করে বোঝা উচিত। সেটা ব্যবসা বুঝতেই সাহায্য করে।

  বদহজম হলে অবশ্য অন্যকথা। কমিনিউজম বলতে যা বাজারে চলে, তা লেনিনবাদ-যিনি অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ন ক্ষেত্রে মার্ক্সের একশো ডিগ্রি বিপরীতেই ছিলেন। সব থেকে বড় কথা তার লেখায় দ্বান্দিক বস্তুবাদ, বা মার্ক্সিয় বিশ্লেষন কিছুই পাওয়া যায় না। হ্যা তার লেখার মধ্যে মার্ক্স এবং দ্বান্দিক বস্তুবাদের প্রচুর জার্গন পাবেন- কিন্ত পদ্ধতিটা পাবেনা। পাতি ইন্টেলেকচুয়াল ডিজহনেস্টি।

 যার জন্য আমেরিকার একাডেমিক সার্কলে  লেনিনকে কেউই মার্ক্সিয় রাজনীতির ধারক বলে মনে করেন না। বরং চমস্কি সরাসরিই লিখেছেন লেনিন বামপন্থী আন্দোলনের কলঙ্ক।  আরেক ধরনের ফ্যাসিবাদ।

সুতরাং মার্ক্সীয়চর্চা না, মার্ক্স চর্চার অভাবের কারনেই বঙ্গজ বামেরা লেনিনবাদের খপ্পরে পরে ব্যবসা বিরোধি অবস্থান নেয়।  মার্ক্স ও মালিক শ্রেনীর বিরোধি ছিলেন-ধর্মঘটের পক্ষেও ছিলেন। কিন্ত সেই মার্ক্স এক্টিভিস্ট মার্ক্স-যিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তার এই এক্টিভিস্ট পজিশন, তার বিশ্লেষনের সাথে খাপ খায় না। এক্টিভিস্ট মার্ক্স নিজেই স্বীকার করতেন-তিনি মার্ক্সবাদি নন!!  কমিউনিস্ট এক্টিভিস্ট মার্ক্সকে তার সমাজবিজ্ঞানএর সাথে মেশালে ঐতিহাসিক মুশকিল আছে-মার্ক্সের ভূত তাতে সায় দেবে না।


কিন্ত মার্ক্সবাদের অন্যধারাও আছে ইউরোপে। যাদের কাউন্সিল কমিনিউস্ট বলে। এরা কিন্ত কমিউনিটি ভিত্তিক ব্যবসার কথা বলেন, যেখানে ফ্যাক্টরি কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার কথা বলা হয়। চীনের অনেক বড় বড় ব্যবসা ফ্যাক্টরি কাউন্সিল অর্থাৎ ইলেক্টেড শ্রমিক মেম্বারদের দিয়েই চলে।
 
 মোদ্দা কথা ফ্যাক্টরী অচল করে দিলে যে শ্রমিক শ্রেনীই টিকবে না-এই টুকু বাচ্চাদের বুদ্ধিও যাদের মাথায় নেই, তাদের যদি দেওয়া হয় রাজার রোল -তাহলে কি দুর্দশা হতে পারে-সেটা পশ্চিম বঙ্গ দেখেছে ৩৪ বছর।

 সারবক্তা। আসলে অলসতাই মূল কারন ব্যবসাতে না আসার ।


























 
             

না বোঝার বোঝা !

ভারতীয় সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে আমেরিকানদের সব থেকে বড় হতাশা- হ্যা বনাম না এর ধোঁয়াশা। বেচারারা কি আর করবে-স্কুলে পড়া মুখস্থ করে না আসলে বেঞ্চে কান ধরে দাঁড়ানোর অভ্যেস-বা বুঝতে না পারলে একটা শেমিং ছোটবেলা থেকেই এদের ব্রেইনে ঢুকিয়েছে। ফলে না বুঝলে, লজ্জায় কেউ স্বীকার করতে চায় না-এটা বোঝে নি। পাছে লোকে তাকে ব্যাকবেঞ্চার ভাবে।
বড় হয়ে এই সব গুডি গুডি ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের যাই বল না কেন-সব কিছুতেই হ্যা। প্রথম প্রথম কোন আমেরিকান, যারা ভারতীয় সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ার দেখে নি-খুব লাফাতে থাকে-বা কিসুন্দর পোলাপান-যা বোঝালাম মুহুর্তের মধ্যে ঘার আর ল্যাজ নাড়তে নাড়তে সব বুঝে গেল। দুদিন বাদেই তাদের মোহভঙ্গ হয় ডেলিভারির সময়। যখন শিবের বদলে বানর ডেলিভারি হয়। তখন হায় হায় রব ওঠে। বুঝিস নস ত আগে বল-তাহলে সময় নষ্ট হয় না!!
কিস্যু করার নেই।
স্কুল থেকে দেখে আসছি কেউ বলে না-বোঝার প্রথম ধাপ- পরিস্কার ভাবে বোঝা-এটা বুঝি নি। এই যে বুঝছি না বা বুঝিনি-এটা পরিস্কারভাবে বুঝতে পারলেই, কেল্লা ফতে।
ভারতে ছোটবেলা থেকেই "না বোঝা" মানেই লজ্জার-এর ঘেলু কম ইত্যাদি। ফলে না বুঝলেও বোদ্ধার ভান করাটাই সংস্কৃতি।
এতে ক্ষতি হচ্ছে বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর। পরিস্কার ভাবে না বোঝাই যে গভীর ভাবে বোঝার প্রথম ধাপ-এটা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীরাই শেখে না। আমার ছাত্রজীবনে দেখেছি-সব থেকে সফল ছাত্রছাত্রীদের প্রথম এবং অন্যতম গুন-যেটা বোঝে না-সেটা খুব পরিস্কার ভাবে বোঝে। বোঝার ভান এবং ভনিতা না করা। তাতে প্রচুর ক্ষতি।
ভারতে সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের গড় মান বেশ কম। এদের স্কিল শিক্ষা সবই আছে। বেশীই আছে। কিন্ত চিন্তাশক্তি এবং বোধ শক্তির অভাবে অনেক পিছিয়ে আছে।
একদম স্কুল লেভেল থেকে বোদ্ধার ভান করার কুঅভ্যেসগুলো না ছাঁটলে, আখেরে খারাপই হচ্ছে।