Tuesday, July 4, 2017

বাঙালী সংস্কৃতি দিয়েই মৌলবাদি উত্থান ঠেকাতে হবে

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করুন-ইত্যাদি উপাদেয় উপদেশ ভাল-কিন্ত কথাটির মধ্যেই র‍য়ে গেছে-স্ববিরোধিতার বীজ। পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় থাকতে পারে-এটারই যদি বৈধতা থাকে, সাম্প্রদায়িক বৈরিতাও বৈধতা পায়। কারন প্রথম প্রশ্নই উঠবে, বাঙালীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুটো আলাদা সম্প্রদায় কেন? এদের খাওয়া দাওয়া ভাষা কবি নগর শহর-সব এক। তাহলে বাঙালীদের হিন্দু মুসলমানে ভাগ করাটা বৈধ হয় কি যুক্তিতে?

যুক্তি খুব সরল। অধিকাংশ বাঙালী, তার বাঙালী পরিচিতির চেয়েও, তার নিজেদের ধর্মীয় পরিচিতিতে বেশী গুরুত্ব দেয়। অধিকাংশ বাঙালীর নিজের অস্তিত্বে যতনা বাঙালীয়ানা, তার থেকেও বেশী তারা নিজেদের মুসলমান বা হিন্দু ভাবে। বাঙালীর যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক চিন্তা আছে- যা সহজিয়া, আউল বাউল হয়ে লালন রবীন্দ্রনাথে পূর্নতা পেয়েছে -সেই মাটির ধর্ম সম্মন্ধেই অধিকাংশ বাঙালী বিস্মৃত।

বাঙালীর শুধু ভাষা না-তার নিজস্ব ধর্ম আছে-যা হিন্দুত্ব বা ইসলামের থেকে আলাদা-এটাইত অধিকাংশ বাঙালী জানে না!!

যে বাঙালীর রবীন্দ্রনাথ লালন আছে- সে কেন আরব সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদে ( ইসলাম ) বুঁদ হয়ে থাকে? বা ইসলামের আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য কেনই বা তাকে উত্তর ভারতের গোবলয়ের গোচনা সেবন করতে হয়?

আমরা রবীন্দ্রনজরুল বলে অনেক লম্ফ ঝম্ফ দিই বটে-কিন্ত বাস্তবে যখন দেখা যায় এক দুষ্টু বালকের সামান্য ফেসবুক পোষ্টের জন্য বাদুরিয়ার মুসলমানরা দম দেওয়া কলের পুতুলের মতন দাঙ্গা করতে পঙ্গপালের মতন দোকান পাট বাড়ি ঘরদোর ধ্বংস করছে-তখন এটা পরিস্কার, রবীন্দ্রনাথ , নজরুল বা এমন কি লালন --শুধুই শিক্ষিত বাঙালীর ড্রইংরুমে। বাঙালী এলিট লিব্যারাল এবং সাধারন মানুষ-দুই ভিন্ন বাংলার বাসিন্দা।

দেগঙ্গা থেকে বাদুরিয়া-বাংলার যে বলকানাইজেশন চলছে, তা ঠেকাতে মমতা ব্যার্নার্জির সামনে একটাই পথ। বাঙালী সংস্কৃতি দিয়েই হিন্দু মুসলমান বলে যে পৃথক আইডেন্টিটি তৈরী করা হয়েছে, সেটাকে আগে ফিকে করতে হবে। উনি সেটা করেন নি। মুসলমান ভোট ব্যঙ্কে ধরে রাখার জন্য, বাঙালী মুসলমানকে মুসলমান করে রেখেছে সব পার্টিই- কংগ্রেস, সিপিএম, তৃনমূল , বিজেপি।

শরৎচন্দ্রের সেই বাঙালী বনাম মুসলমানের ফুটবল খেলার মতন আজো সমান কনফিউশন-এরা বাঙালী না মুসলমান!! লালন, নজরুল-কেউ সেই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস ঘোচাতে পারেন নি। কারন সরকারি টাকায় মাদ্রাসা, আলেম, হুজুরদের পোষা হচ্ছে-লালন সাঁইকে পৌছে দেওয়া হচ্ছে না। আলেম হুজুররা নিজেদের ধর্ম ব্যবসা টেকাতে-একজন মুসলমানের মুসলমান পরিচিতিই পোক্ত করবে-ফলে বাদুরিয়াতে যখন এই সব ধর্মোন্মাদরা পঙ্গপালের মতন লাঠি নিয়ে তাড়া করে- সেটা প্রশাসনের নীতির ভুল। কারন আলেমদের টাকা না দিয়ে যদি গ্রামে গ্রামে লালন সাই এর শিষ্যদের, বাউল কালচার ছড়িয়ে দেওয়া যেত- তাহলে বাংলা মুখরিত হত, বাঙালীর চিন্তনে!

‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।।

সরকার থেকে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। ফলে মুসলমানকে আরো বেশী মুসলমান বানানো হয়েছে-আর তার প্রতিক্রিয়াতে হিন্দুরা আরো বেশী হিন্দু হচ্ছে।

মধ্যে খান থেকে বাঙালীদের স্পেসটা আরো আরো অনেক ছোট হচ্ছে। অথচ এরা নাকি বাংলার মসনদে।

যে জাতি নিজের সংস্কৃতি, নিজের ঐতিহ্যশালী লোকায়িত সহজিয়া ধর্মকে চেনে না-তাদের মাটির দখল আরব আর উত্তর ভারতের দালালদের দখলে যাবে-সেটাই স্বাভাবিক।



কিন্ত এখনো সময় আছে। সংস্কৃতি প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী-গ্রামে গ্রামে বাংলার সহজিয়া ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিন। ছড়িয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ নজরুলের জীবন দর্শন। যাতে সবাই নিজেদের বাঙালী ভাবতে শেখে আগে। তাদের মুসলমান বা হিন্দু পরিচিতি যেন গৌন হয়। তার বদলে উনি যদি দুধ কলা দিয়ে "ইসলামিক পরিচিতির" বিষ ছড়ানো কালসাপদের পোষেন মাসোহারা দিয়ে, তার ফল হবে বাউরিয়া-এবং সম্ভবত উনিও ক্ষমতা হারাবেন।

No comments: