Saturday, April 3, 2021

বামপন্থী আমলের ট্যালেন্ট এক্সোডাস- কিভাবে বাম আমলে ধ্বংস হয়েছে কোলকাতার তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যত ?

 

বামপন্থী আমলের ট্যালেন্ট এক্সোডাস- কিভাবে বাম আমলে ধ্বংস হয়েছে কোলকাতার তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের  ভবিষ্যত ?



- বিপ্লব পাল, ৪/২/২১



কোলকাতার বাম রাজত্বের ৩৪ বছরের সব থেকে বড় ক্ষতি, বাংলার সব "ইঞ্জিনিয়ারিং ট্যালেন্ট" ব্যাঙ্গালোর, পুনে ইত্যাদি প্রযুক্তির নয়া শহরে, নইলে বিদেশে চলে গেছে। বিশ্বযায়নের যুগে , গ্লোবালাইজেশনের নতুন সুযোগ নিতে, বাঙালীর এই বিদেশে বা অন্যরাজ্যে চলে যাওয়াটা খারাপ না। ভাল। কারন বিদেশে বা অন্যরাজ্যে গিয়ে তারা নতুন কর্মসংস্কৃতি, নতুন স্কিল শিখছে। টাকা উপার্জন করছে। কিন্ত খারাপের দিকটা?  কোন ট্যালেন্ট ফিরতে পারছে না। কারন কোলকাতায় উন্নত প্রযুক্তির কোম্পানী প্রায় নেই। ফলে টেকনোলজির  ইকোসিস্টেম তৈরী নেই। আর ইকোসিস্টেম না আসলে দক্ষ কর্মী বা নতুন প্রযুক্তির কর্মসংস্থান কোনটাই সম্ভব না।





সিলিকন ভ্যালি বা ব্যাঙ্গালোরের ইকোসিস্টেম কিভাবে তৈরী হল, সেটা জানলেই পরিস্কার হবে, কোলকাতায় কি হতে পারত -আর কি হয় নি। কেন হয় নি। বা কেন হচ্ছে না।



তার আগে "দক্ষ শ্রমিক" বা "ট্যালেন্ট" এই শব্দগুলির সেম্যান্টিক পরিস্কার হওয়া দরকার।

ট্যালেন্ট মানে পরীক্ষায় ভাল মার্কস, আই আই টি, আই এস আই এর ছাত্র-এসব ইন্ড্রাস্ট্রি মনে করে না। ইন্ড্রাস্ট্রিতে কাজ, কাজের গুনমান, উদ্ভাবনী ক্ষমতা- মোদ্দা কথা যারা ভাল কাজ শিখেছে, ইন্ডাস্ট্রিতে তারাই ট্যালেন্ট।  তারা প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আই আই টি, এন আই টি যেখান থেকে খুশি আসতে পারে।  প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের প্রতি আই আই টিয়ান বা সরকারি কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের স্মবারি আছে। কিন্ত আমার অভিজ্ঞতায় যেটা দেখেছি, প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অনেক ছাত্রছাত্রীই কোডিং এবং প্রোগ্রামিং এ আই আই টিয়ান থেকেও অনেক এগিয়ে গেছে। এবং এদের মধ্যে যারা খুব  ভাল, তারা তাদের  কেরিয়ারের  ৫-১০ বছরের মধ্যেই ৯০% আই আই টিয়ানদের থেকে স্যালারি এবং পজিশনেও এগিয়ে যায়। সুতরাং ট্যালেন্টের প্রশ্নে- স্কুল জীবনে কে কটা সার্টিফিকেট আর জয়েন্টে  কি র‍্যাঙ্ক করেছে বা  কোন কলেজে পড়াশোনা করেছে, তা ইম্যাটেরিয়াল-অপ্রয়োজনীয়। নতুন আই টি শিল্পে যেটা দরকার হয়-- একজন ছেলে বা মেয়ে কাজে ঢুকে কতটা নতুন প্রযুক্তি, কতটা নতুন স্কিল শেখার স্কোপ পাচ্ছে-এবং সে সেই সুযোগের সম্পূর্ন সদ্বাব্যবহার নিতে পারছে কি না। ইন্ডাস্ট্রিতে ট্যালেন্ট এই ভাবেই তৈরী হয়। তার জন্যে দরকার হয় সেই সব কোম্পানীতে কাজ করা, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে কাজ করার ভরপুর সুযোগ আছে। দরকার হয়, সেই কোম্পানীতে কাজ করা সিনিয়ার ট্যালেন্টদের মেন্টরশিপ, যারা কাজ শেখাবে বা কাজ শিখতে সাহায্য করবে।  সেই জন্যে কেরিয়ারের শুরুতেই যারা টি সি এস, ইনফোসিস বা আই বি এম ইত্যাদি বড় কোম্পানীর আই টির কাজে ঢোকে, তাদের অধিকাংশের ক্যারিয়ার গ্রোথ খুব স্লো।  কারন এইসব আউটসোর্সিং কোম্পানীতে অধিকাংশ কাজ প্রমানিত এবং পুরাতন প্রযুক্তির ওপর। এবং তাও অধিকাংশ সময় মেইন্টেটানান্স এবং টেস্টিং এ।  এইসব কাজ ও স্কিলের কাজ-কিন্ত লো আই টি স্কিল।

ঠিক  এই  জন্যেই যে কোন শহরের ট্যালেন্ট গ্রুমিং এর জন্য, সেই শহরের আধুনিক প্রোডাক্ট এবং স্টার্টাপ কোম্পানীগুলি গুরুত্বপূর্ন। কারন এরা সব সময় নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ওপর জোর দেয়। এইসব জায়গায় প্রচুর শেখার স্কোপ থাকে। ফলে অধিকাংশ ডিমান্ডিং স্কিলের লোকজন এই সব কোম্পানী থেকেই তৈরী হয়।

 

 এবার উদাহরনে আসি। কি ভাবে তৈরী হল আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি বা ভারতের ব্যাঙ্গালোর।  ১৯৫০ সালে সান ফ্রান্সিসকো, সান হোসে শহরগুলিতে ( যাকে বর্তমানের সিলিকন ভ্যালি বলে)  কোন প্রযুক্তি কোম্পানীই ছিল না। আমেরিকার সব প্রযুক্তি কোম্পানী ছিল বোস্টন, নিউয়ার্ক শহরে।  ১৯৫৬ সালে উইলিয়াম শকলে, প্রথম সিলিকন ট্রান্সিস্টর তৈরীর জন্য মাউন্টেন ভিউতে ( সিলিকন ভ্যালির আরেক শহরে ) খোলেন ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর,। ওই বছরই ট্রান্সজিস্টর আবিস্কারের জন্য ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন উইলিয়াম শকলে। কিন্ত মুশকিল হল,  তখন মাউন্টেন ভিউ ধবধবে গো্বিন্দপুর। তার সহযোগীদের কেউ ইস্টকোস্টের উন্নত টেক ইকোসিস্টেম ছেড়ে  ওয়েস্টকোষ্টের মাউন্টেনভিউতে  যেতে রাজী হল না। কিন্ত তিনি নোবেলজয়ী বিখ্যাত শকলে। তিনি তার আটজন তরুন গবেষক ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে এলেন মাউন্টেন ভিউর কোম্পানীতে। ইতিহাস বলে কালক্রমে এই আটজনই হবেন সিলিকন ভ্যালির ফাউন্ডিং ফাদার  ( যাদের বলাহয় ট্রেটারাস এইট)  । যারা ফেয়ার চাইল্ড সেমিকন্ডাক্টের কাজ শিখে আরো নতুন নতুন ইলেকট্রানিক্স কোম্পানী খুলবেন। তারপরে নিজেরা নতুন কোম্পানী খুলে প্রচুর ধনী হয়ে, নতুন ট্যালেন্টদের কোম্পানীতে ইনভেস্ট করে , গড়ে তুলবেন প্রযুক্তির স্বর্গরাজ্য সিলিকন ভ্যালি।

 

অর্থাৎ এই ইকোসিস্টেম তৈরীর খেলাটা এক চক্রে চলে।

 

প্রথম ধাপ >> উদ্ভাবনী নতুন প্রযুক্তির কোম্পানীতে কাজ শিখে তৈরী হয় “টেক  ট্যালেন্ট” যারা নতুন স্টার্টাপ খোলার সামর্থ রাখে

 দ্বিতীয় ধাপ >>> এই নতুন স্টার্টাপ খুলে, টেক ট্যালেন্টরা প্রচুর টাকার মালিক হয়।

 

 তৃতীয় ধাপ >> প্রচুর টাকার মালিক হওয়ার পর, তারা অন্য ট্যালেন্টদের স্টার্টাপে ইনভেস্ট করে।

 

 অর্থাৎ টেক   ইকোসিস্টেমের লাইফসাইকল গড়ে উঠতে তিনটে ধাপ লাগে।

 

 এবার খুব সংক্ষেপে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়—

 

কোলকাতায় আই বি এম বা টিসিএস আছে। তাহলে সেখান থেকে কেন  এই ট্যালেন্ট গ্রুমিং হচ্ছে না? উত্তর আগেই দিয়েছি। এইসব আউটসোর্সিং কোম্পানী কোলকাতায়  রিসার্চ ওরিয়েন্টেড নতুন প্রযুক্তির কাজ বিশেষ করে  না -পুরো স্কিলই তৈরী হচ্ছে মেইনটেনান্স বা ইমপ্লিমেন্টশনে। যা টপ টেক ট্যালেন্ট তৈরী করতে পারেনা।  সেইসব চাকরির মাইনেও বেশী না, স্কিল ও পুরাতন-ফলে টপ ট্যালেন্ট নেই। গুগুল, ফেসবুক আমাজন  সহ সিলিকন ভ্যালির ইন্ডিয়ান ইউনিটে যারা কাজ করছেন, সেখানে টপ ট্যালেন্ট গ্রুমিং পসিবল। কারন তারা মাইনে দেয় বিশাল। কাজ শেখার স্কোপ একদম টপ লেভেলে। ফলে সেখানেই সব টপ ট্যালেন্ট জড় হয়। একে বলে ট্যালেন্ট এট্রাক্ট মোর ট্যালেন্ট। আর এই সব কোম্পানীই বর্তমানে ব্যাঙ্গালোর, পুনে আর হাইদ্রাবাদে।

 

দ্বিতীয় প্রশ্ন -কেন টপ ট্যালেন্ট দরকার? কেন আমি প্রাইমারি স্কুলের চাকরি, হাইস্কুলের চাকরি নিয়ে ইস্যু তুলছি না? বা সাধারন আইটি জবের ব্যাপারে নিরুত্তর? 

 এই প্রশ্নের উত্তর এইভাবে  ভাবুন,

 ইকোসিস্টেম বানাতে টপ টেক লিডার দরকার। যা সিলিকন ভ্যালি তৈরীর উদাহরন থেকে দিলাম।  ৯৯% জাস্ট আসবে যাবে কাজ করবে। কিন্ত আমার দরকার ওই ১% যারা প্রযুক্তি তৈরীতে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখবে, যাদের জন্য নতুন আইডিয়াতে নতুন কোম্পানী তৈরী হবে- যাদের কোম্পানীতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা ইনভেস্ট করবে। পরে তারাই ইনভেস্টর হয়ে ইকোসিস্টেমকে সমৃদ্ধ করবে। যা এখন ব্যাঙ্গালোরে হয়েছে।

 

এইসব লিডার কেন গুরুত্বপূর্ন ? তাহলে ভাবুন চেঙ্গিস খানের আগে না মঙ্গোলদের কোন ইতিহাস ছিল, না চেঙ্গিস খান মারা যাওয়ার তিন প্রজন্মের পর কোন ইতিহাস রয়ে গেছে। অথচ চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মাত্র এক প্রজন্মেই পাহাড়ি আদিবাসি  মোঙ্গলরা হয়ে উঠেছিল গোটা পৃথিবীর প্রভু। যাদের কেউ চিনতই না!   অথবা আলেক্সান্ডার দি গ্রেট।  এথেন্সের জন্মেছে গ্রীসের সব মহান দার্শনিকরা। স্পার্টা গ্রীসের সব বীরের জন্মস্থান। ম্যাসেডোনিয়াকে গ্রীকরা বলত গন্ডগ্রাম। অথচ এখানে জন্মানো আলেক্সান্ডারের পিতা ফিলিপএর নেতৃত্বেই গ্রীস প্রথমবারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হল। গ্রীস গোটা বিশ্বকে জয় করল। গ্রীসের সভ্যতা ছড়িয়ে গেল গোটা বিশ্বে। সবটাই ম্যাসেডেনিয়ার জন্য যেখানে গ্রীসের কোন বিখ্যাত দার্শনিক জন্মায় নি। কিন্তু জন্মেছে লিডার। ফিলিপ এবং আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট।

ঠিক সেইভাবে আজ উইলিয়াম শকলি মাউন্টেন ভিউতে ফেয়ার চাইল্ড সেমিকন্ডার তৈরীর কোম্পানী না খুললে সিলিকন ভ্যালিই তৈরী হত না। সিলিকন ভ্যালি কোন সরকারি পলিসির দান না। এক বিখ্যাত  টেক লিডারের ( যিনি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জনক) একটি গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্তের ফসল।

 

কিন্ত কোলকাতার এই দুর্দশার জন্য আমি বামেদের দুষছি কেন? কেন মমতা ব্যানার্জির দশ বছরে এই অবস্থার পরিবর্তন হল না? বিজেপি আসলে কি এই অবস্থার পরিবর্তন হবে?

যেহেতু এগুলো রাজনীতির প্রশ্ন, এড়িয়ে যেতে পারলেই ভাল হত। কিন্ত সাফ সাফ নিরেপেক্ষ উত্তর দেওয়া দরকার।

প্রথম কথা ব্যবসার জন্য পরিবেশ লাগে। কাজের পরিবেশ । ইনফ্রাস্টাকচার। বাকীটা ব্যবসা নিজের প্রফিটের স্বার্থেই  বুঝে নেয়।  সিপিএমের ৩৪ বছরে সব থেকে বড় সমস্যা—পার্টিটা মানুষ মার্কেটে ব্যবসা সব কিছু নিয়ন্ত্রন করতে গেছে-কালেক্টেভিজমে বিশ্বাস করে। সেই নিয়ন্ত্রনের প্রমান দিতে গিয়ে বন্ধ , মিটিং, মিছিল হয়ে উঠেছিল নিয়ম। ফলে অধিকাংশ ব্যবসা পুঁজি পশ্চিম বঙ্গে ছেড়েছে। ভারতের প্রথম কম্পিউটার ছিল আই এস আইতে। কোলকাতাতেই ভারতের প্রথম আই টি শিল্প গড়ে ওঠার কথা। কিন্ত হয় নি। কারন কেরানীদের চাকরি বাঁচাতে গিয়ে  জ্যোতি বসু এবং সিপিএম কম্পিউটার বসানোর বিরোধিতা করেছেন। ফলে ব্যাঙ্গালোর হয়ে উঠেছে আই টি হাব।  সিপিএমের এই ধারনা যে ভুল ছিল, তা  পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বাবুই স্বীকার করেছিলেন। যার জন্য তিনি সেক্টর ফাইভ গড়তে উদ্যোগ নেন। কিন্ত সেক্টর ফাইভ বিন্দুতে সিন্ধু। হায়দ্রাবাদ বা ব্যাঙ্গালোরের একটা বিল্ডিং এ ওর থেকে অনেক বেশী ভ্যালুয়েবল কোম্পানী আছে।  ২০১১-১২ সালে সিপিএম যখন ছেড়ে গেছে অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল, কোলকাতারতে পিসিবি তৈরীর সব কারখানাগুলো ( যা ইলেকট্রনিক শিল্পের খুব বেসিক) হায়দ্রাবাদে চলে গেছে। সিটুর ভয়ে। এগুলো বাস্তব। সেইসব মালিকদের অনেকেই কোলকাতায় থাকেন। আমি নিজেই কথা বলেছি। কোন মালিক শ্রমিকদের চোখ রাঙানি সহ্য করে কোলকাতাকে ভালবেসে কোলকাতায় পড়ে থাকবেন না। এগুলো সাধারন জনগনের বোঝা দরকার। পুঁজি এসব পোঁচে না। মিনেসোটা, পিটসবার্গের মতন আমেরিকান শিল্পাঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেছে শ্রমিক আন্দোলন এবং বামেদের উৎপাতে। পুঁজি আমেরিকার উন্নত শিল্পাঞ্চলগুলিকেই ছেড়ে পালিয়েছে শ্রমিক আন্দোলনের ভয়ে- সেখানে কোলকাতা ত বিশ্বমানচিত্রে একটা বিন্দুও না।

 

সিপিএম নেতৃত্বের মূল সমস্যা ভারতের সফটোয়ার ইঞ্জিনায়ারদের মতন। এরা জানে না, এরা কি জানে না। ফলে এরা যে ভুল করছে, সেটা বোঝার অভিজ্ঞতা বা প্রজ্ঞা এদের নেই। কারন সিপিমের নেতৃত্ব চলে সোকোল্ড সার্টিফিকেট ধারী শিক্ষিতদের নিয়ে। যাদের ব্যবসা বা কোম্পানী চালানোর অভিজ্ঞতা নেই।  ফলে কম্পুউটার তুলে দেওয়ার আন্দোলনই বলুন, আর ক্লাস সিক্স থেকে ইংরেজি শেখানোর প্রকল্পই বলুন-সবই কিন্ত এই উচ্চশিক্ষিত সিপিএম নেতৃত্বের মাথা থেকেই এসেছে! এই জন্যেই আগেরদিন লিখেছিলাম একজন চালচোর জোচ্চর রাজনীতিবিদ যা ক্ষতি করতে পারে - অশোকমিত্রর মতন একজন উচ্চশিক্ষিত  বাম মৌলবাদি তার থেকে বেশী ক্ষতি করতে পারে। সেই জন্যে দেখুন ফেসবুকে সিপিএম শুধু তাদের পার্থীরা কত উচ্চশিক্ষিত, সেটাই প্রচার করছে!! কিন্ত বাস্তব হচ্ছে এই সব উচ্চশিক্ষিত সিপিএম নেতাদের অশিক্ষিত সিদ্ধান্তেই পশ্চিম বঙ্গ গাড্ডায় গেছে। কারন এই সব উচ্চশিক্ষিত সিপিএম নেতারা আসলেই অশিক্ষিতের ও অশিক্ষিত। নইলে সিপিএমের মতন বাতিল আদর্শের পথে জনগনের সেবা করতে যায় না। যারা নিজেদের ভাল বোঝার ক্ষমতাটুকুই নেই-তারা অন্যের , রাজ্যের কি ভাল করবে ?

 

প্রশ্ন হচ্ছে মমতা ব্যানার্জি গত দশ বছরে কি করেছেন?  না উনিও এস ই জেডের গোঁ ধরে অনেককিছুই পলিসিগত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে রাজ্যের এখনো ক্ষতি হচ্ছে। কিন্ত উনি দুটি গুরুত্বপূর্ন কাজ করেছেন। যার জন্য প্রায় নেগেটিভ দশা থেকে একটু একটু করে হলেও পশ্চিম বঙ্গে আধুনিক শিল্প আস্তে আস্তে বাড়ছে। উনার প্রথম ভাল সিদ্ধান্ত, শ্রমিক ইউনিয়ান ভেঙে দেওয়া। কোলকাতার কোন শিল্পই এখন শ্রমিক ইউনিয়ানের সমস্যা ফেস করে না। যার জন্য হাওড়া, উলুবেড়িয়ার শিল্পগুলোতে সামান্য হলেও রক্ত সঞ্চার হয়েছে। তারা আস্তে আস্তে প্রোডাকশন বাড়ানোর সাহস পেয়েছেন।  আমার কথাকে বিশ্বাস করবেন না। প্লিজ নিজে গিয়ে দেখে আসুন। আমি এসব শিল্পাঞ্চলে ঘুরেছি।  এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, অবস্থা দশ বছর আগের থেকে অনেক বেশী ভাল। তারা আস্তে আস্তে এক্সপ্যানশন করেছেন। সেক্টর ফাইভে অনেক প্রবাসী বাঙালীরা ছোট ছোট কোম্পানী খোলার সাহস পেয়েছেন। কারন রাজ্যের পরিবেশ যথেষ্টই শিল্প বান্ধব। শুধু ট্যালেন্টের অভাব। লিডার পাওয়া যায় না। বাঙ্গালোর পুনে থেকে কোন বাঙালী ট্যালেন্ট কোলকাতায় ফিরতে চায় না। এটাই যে বিশেষ সমস্যা এখনো কোলকাতায়।

 

 বুদ্ধবাবু শিল্প আনতেন, এইসব অনেক শুনছি ফেসবুকে। কিন্ত কেউ লিখছে না- আসলে অনেক ছোট ছোট শিল্প মালিক হায়দ্রাবাদ গুজরাতে মহারাষ্ট্রে পালিয়ে গেছিল বাম জমানায়। কারন বাম আমলে একজন ক্লাস এইট পাশ টেকনিশিয়ান মালিককে ধমক দিয়ে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। মালিকরা এই বিশ্বায়নের যুগে তাহলে কেন কোলকাতায় পড়ে থাকবে ? সবাই ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে বা ইনভেস্টরদের পয়সাতেই ব্যবসা চালায়। টাকা ফেরত না দিতে পারলে, কোন ব্যবসা চলে না। বুদ্ধর শিল্পায়ন ছিল শ্রেফ গিমিক। আসলে ছোট ছোট শিল্প, ইউনিয়ানের চাপে তার অনেক আগেই অন্যরাজ্যে চলে গেছে। আর আজ এই বামেরাই নাকি যুবকদের চাকরি কথা শুধু ভাবছে।  কশাইদের ছাগলপ্রেম দেখে হাঁসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না।

 

দ্বিতীয় যে জিনিসটা দিদির শিল্পের পক্ষে করেছেন। সেটা হচ্ছে বন্ধ বন্ধ খেলা বন্ধ করা। বাম জমানায় পশ্চিম বঙ্গে গড়ে ১৭-২৫ টা করে বছরে বন্ধ হয়েছে। এই বন্ধের সিদ্ধান্ত কারা নিত? ওই সিপিএমের উচ্চশিক্ষিত নেতারা। কারা ভুগত? সাধারন শ্রমিকরা-যারা কারখানায় না গেলে মজুরী পায় না। হকাররা, যাদের একদিনের ইনকাম লস ছাড়া ওইসব বন্ধ আর কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করে নি। ফলে পশ্চিম বঙ্গের সাধারন জনগন এখন এইসব উচ্চশিক্ষিত বামপার্থীদের ভোট দিচ্ছে না। দেওয়া উচিত না। কারন এই সব উচ্চশিক্ষিত বামপার্থী, বামনেতারা এতটাই নির্বোধ, এরা রাজ্যবাসীর ক্ষতি করা ছাড়া, অন্যকিছু করার ক্ষমতা রাখে না। সেটা সাধারন জনগন ভালোই বুঝে গেছে।  

 

বিজেপি আসলে কি ভাল কিছু হবে? আমি জানি  না। কারন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বর ফোকাস মূলত সাম্প্রদায়িক মেরুকরনে।   তারা রাজ্যের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নেবেন-এমন আশা করা কি ঠিক? সেটা সময় বলবে। বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্য যে পশ্চিম বঙ্গ থেকে অনেক ভাল কিছু করছে এমনটা ডেটা বলে না। দক্ষিনের রাজ্যগুলো পশ্চিম বঙ্গের থেকে অনেক ভাল করছে। কারন যেখানকার রাজ্যবাসী এবং নেতারা অনেক পেশী পেশাদার। বেসিক্যালি বাংলার নেতারা সিপিএম থেকে তৃনমূল সেখান থেকে বিজেপিতে গেছেন। নেতার কোয়ালিটি এক থাকলে, বেশী ভাল কিছু হবে এমন ভাবার মধ্যে  অন্ধ আশা আছে, যুক্তি নেই।

তবে বিজেপি বামেদের মতন ব্যবসার জন্য ক্ষতিকারক হবে না , এটা বলা যায়। কিন্ত তৃনমূলের চেয়ে ভাল কিছু করবেন কি না,  সেটা বলার মতন ডেটা আমার হাতে নেই। শুধু এটা বলতে পারি, বিজেপি তখনই তৃনমূলের চেয়ে রাজ্যে ভাল কিছু করতে পারে, যদি সেই ক্যালিবারের নেতা তাদের হাতে থাকে।  সেই উচ্চতার নেতা রাজ্য বিজেপিতে এখনো দেখছি না। সুতরাং এখনই আশার কোন কারন দেখছি না।


Saturday, March 27, 2021

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য মোদির সত্যাগ্রহ এবং বিরোধিদের দুর্ভাগ্যজনক প্রতিক্রিয়া

 বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য মোদির সত্যাগ্রহ এবং বিরোধিদের দুর্ভাগ্যজনক প্রতিক্রিয়া

-বিপ্লব পাল ২৭ শে মার্চ, ২০২১
(১)
আমি মোদিভক্ত বা বিজেপি ভক্ত নই। কিন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে মোদির বক্তব্যের বিরুদ্ধে যেভাবে মোদিবিরোধিরা মিম এবং ব্যাঙ্গচিত্র নামাতে শুরু করেছে, তাতে খুবই পরিস্কার, মোদি বিরোধিরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সেই সময় ভারতের রাজনীতি নিয়ে সম্পূর্ন ভাবে নিরক্ষর।
মোদি দাবি করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন জনসঙ্ঘের একজন সাধারন ক্যাডার। বয়স ছিল ২০-২২। এবং সেই সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে জেলে গেছেন।
এই ব্যাপারে অনেকেই ঠাট্টা করছেন, কারন আমি জানি, অধিকাংশ ভারতীয়র ধারনা, ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষেই ছিল। তাহলে কোন ভারতীয় রাজনৈতিক দলের ( জনসঙ্ঘ) কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনের দরকার হল?
ঠিক এই ইতিহাসটাই অনেকে জানেন না। কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের যোগদানের ক্ষেত্রে ভারতের সব বিরোধি পার্টির বিরাট ভূমিকা ছিল-এবং আমি সেটাই সংক্ষেপে লিখব। যদিও আসল ইতিহাস আরো দীর্ঘ।
তার আগে আরো একটা লাইন লিখি। ২০১৫ সালে মোদি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকা সেবার অটল বিহারি বাজপেয়ীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকার জন্য স্বীকৃতি দেয়। সেই পুরস্কারের মঞ্চেও, সেদিন ও মোদি একই দাবী করেছিলেন। গুগুল করলেই দেখতে পাবেন। কিন্ত তখন কোন জল ঘোলা হয় নি-কারন দেখবেন, তখন বাংলাদেশ সরকার ও উল্লেখ করেছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আন্দোলনে অটলজীর অতুলনীয় ভূমিকার কথা- মাঠে, ময়দানে এবং পার্লামেন্টে। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে যাতে ভারত স্বীকৃতি দেয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে তার জন্য জনসঙ্ঘ ১-১১ই আগষ্ট, ১৯৭১ সালে সত্যিই দেশজুরে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিল। ১২ই আগষ্ট পার্লামেন্টের সামনে তারা বিক্ষোভ দেখায়। এবং তারজন্যেই অনেক সঙ্ঘী জেলে যান। যাদের মধ্যে নরেন্দ্রমোদিও ছিলেন। কিন্ত যেখানে ভারতের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য গোটা বিদেশ চষে ফেলছেন-তখন ভারতে কেন বাংলাদেশের জন্য আন্দোলনের প্রয়োজন হয়েছিল? উল্লেখ্য এই যে শুধু জনসঙ্ঘ না। ভারতের কমিনিউস্ট পার্টিও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারতে মিটিং মিছিল করেছে। কেন এমন ইতিহাস? এই প্রশ্নটা অধিকাংশ ভারতীয় মাথায় ঢোকে নি। কারন তারা ভেবেছেন ইতিহাস খুব সহজ এবং এক রৈখিক। বা তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস কিছুই জানেন না। তাতে দোষ নেই। আমিও এককালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে কিছুই জানতাম না। কারন বাংলাদেশের ভূতপূর্ব স্বাধীনতাবিরোধি সরকার তাদের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পূর্ন চেপে দিতে চেয়েছিল। ফলে ভারতীয় কেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকজন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জানত না বহুদিন।
তাই আসুন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তাতে ভারতের বিরোধি রাজনৈতিক দলে ভূমিকা নিয়ে একটু জানি।
(২)
আমি এবার ইতিহাসটা অন্যভাবে লিখি। একেবারে সময় তারিখ না দিয়ে ব্যক এন্ড ফোর্থ স্টাইলে লিখব-যাতে সবাই কার্য-কারন সম্পর্ক বুঝতে পারেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয় ২৫শে মার্চ, ১৯৭১। যেদিন রাত্রি ১১-৩০ এ পাকিস্তানি মিলিটারি অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে। অপারেশন সার্চ লাইট হলোকাস্টের মতন আরেক কুখ্যাত গণহত্যা। যেদিন একরাতে শুধু ঢাকাতেই মিলিটারির হাতে প্রায় ৩০,০০০ নাগরিককে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ঢাকার জগন্নাথ হলের ৬০০-৭০০ হিন্দু ছাত্রও ছিল। সবাইকে মেশিনগানের সামনে দাঁড়িয়ে গুলি করা হয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই ৫০০০ লাশ পড়ে। এই ঘটনা ভিডিও করতে সক্ষম হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল উল্লাহ। যা পরে বিবিসির মাধ্যমে গোটা বিশ্ব দেখবে। ওই রাতেই বাংলাদেশে প্রায় সব শহরেই পাকিস্তানি মিলিটারি চড়াও হয় এবং নির্বিচারে সাধারন জনগণকে হত্যা করা শুরু করে । গোটা বাংলাদেশে একরাত্রে তিন লাখ লোক পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে খুন হয়। যার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ছিল। কিন্ত হিন্দুদের সংখ্যা ছিল বেশ বেশী। কারন বেছে বেছে হিন্দু অধ্যুশ্যিত এলাকাগুলোর ওপর পাকিস্তানি সেনা বেশী বেছে বেছে বেশী খুন করছে। কারন তারা মনে করত বাংলাদেশের হিন্দুরাই পাকিস্তানের মুসলিম ঐক্যের ফাটলের জন্য দায়ী।
প্রশ্ন হচ্ছে - বাংলাদেশে ২৫শে মার্চ এত বড় গণহত্যা চলছে যা ইতিহাসে শুধু ইহুদি নিধনের ফাইনাল সল্যুউশনের সাথে তুলনীয়-তখন ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী কি করছিলেন???
(১) তখন মুজিব কোথায়?
(২) বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষনা দিল কিভাবে? কবে বাংলাদেশ নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলে ঘোষনা করল? কবে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অফিশিয়ালি স্বীকৃতি দিল?
(৩) কিভাবে তৈরী হল মুক্তিবাহিনী?
(৪) ইন্দিরা গান্ধী কি করছিলেন?
(৫) কবে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে মিলিটারি সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?
শুধু টাইম লাইন গুলো দেখে নিই। তাতেই অনেক ইতিহাস পরিস্কার হবে।
অপারেশন সার্চ লাইট-পাকিস্তানের মিলিটারির গণহত্যা -২৫ শে মার্চ
কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দিলেন মেজর জিয়া -২৭ শে মার্চ। এই খবর বাংলাদেশের বাইরে এল জাপানী এক জাহাজের রেডিওর মাধ্যমে- বিবিসি প্রচার করে ২৮ শে মার্চ।
কিন্ত ২৬শে মার্চ থেকেই ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা আসাম মেঘালয়ে স্বরনার্থীর ঢল নেমেছে। ভারতের ইন্টালিজেন্সের কাছে খবর পৌছে গেছে বাংলাদেশে কি হয়েছে ২৫ শে মার্চ।
কিন্ত?
বাংলাদেশকে মিলিটারি সাহায্য করা উচিত না এক্সাক্টলি কিভাবে ভারত সরকার এই ক্রাইসিস ডিল করবে, সেই নিয়ে প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠক হল ২৮শে এপ্রিল। একমাস বাদে। এই বৈঠকে ম্যাকেনশকে দ্বায়িত্ব দেওয়া হল সেনা প্রস্তুতি নিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র সাহায্য দেওয়ার জন্য।
ইন্দিরা গান্ধী নিজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য ব্যাটিং শুরু করেন জুলাই ১৯৭১। কারন জুন মাসে এন্থনি মাসকরনেস বাংলাদেশে যে পাকিস্তান বিরাট স্কেলে গণহত্যা চালাচ্ছে তার বিরাট রিপোর্ট গোটা বিশ্বের সামনে ফাঁস করেন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এর আগে স্বাধীন বাংলাদেশের অনূকুলে ছিল না। কারন সবাই মনে করছিল, এসব কিছুই ভারতের প্রপাগান্ডা।
এবং ভারত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ৪ ই ডিসেম্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনার প্রায় ৯ মাস বাদে। কেন এদ্দিন লাগল? যেখানে ২৭ শে মার্চই ভারতের উচিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া?
পাকিস্তানের গণনিধন থামাতে ২৬-২৭ মার্চ কেন ভারত মিলিটারি নামালো না? কেন সেটা ৪থ ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াল ? ইন্টারেস্টিং ২৫ শে মার্চ কিন্ত বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের শক্তি ডিসেম্বর মাসের থেকে অনেক অনেক কম ( প্রায় ছ ডিভিসন কম সেনা)! তাহলে?
(৩)
আসুন এবার বেশ কিছু বিতর্কিত ইতিহাস জানা যাক।
মুজিব দিয়েই শুরু করি। ২৫ ই মার্চ সন্ধ্যা সাতটাই মুজিবের সাথে দেখা করতে এলেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন। উদ্দেশ্য দুটি। যাতে মুজিব ভারতে পালিয়ে যান। দুই তিনি স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র চারিদিকে ছড়িয়ে দেন। তখনো পাকিস্তানি মিলিটারি সেনা ছাউনি থেকে বেড় হয়নি। কিন্ত যেভাবেই হোক, তাজউদ্দিনের কাছে খবর এসেছে ক্রাকডাউন হবে।
মুজিব তখন রাজী হোন নি। রাত দেড়টাই তাকে পাকিস্তানি মিলিটারি গ্রেফতার করে । কিন্ত তার আগে তিনি তার সাঙ্গপাঙ্গদের টেলিগ্রাম পাঠাতে সক্ষম হোন, গোটা দেশ যেন পাকিস্তানি মিলিটারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে ।
প্রশ্ন হচ্ছে ২৫ শে মার্চ মুজিব দ্বিধায় ভুগছিলেন কেন? এই জন্যে মুজিব বিরোধিরা এই প্রশ্ন বারবার তুলেছে ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানি নিধন যজ্ঞের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের কোন যুদ্ধ প্রস্তুতিই ছিল না। সম্পূর্ন অপ্রস্তুত ছিল বাংলাদেশ। কেন?
আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। এবং মোদিকে কেন সত্যাগ্রহ করতে হয়েছিল, তার সমাধান ও, এই প্রশ্নের উত্তরেই আছে।
এর মূলকারন মুজিব ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে সম্পূর্ন গ্রীন সিগন্যাল পান নি। চেষ্টা করেছেন ভারত সরকারকে বোঝাতে। ভারতের কাছে গ্রীন সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা হত মুর্খামী। সুতরাং মুজিব ঠিক কাজই করেছেন ২৫ শে মার্চ।
কিন্ত ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে মিলিটারি অভিযানে কোন মতেই রাজী ছিলেন না মার্চ মাসে। এপ্রিলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তাও নমাস বাদে মাঠে নামার জন্য। কিন্ত কেন?
মূলত দুটি কারন ছিল।
ইন্দিরা গান্ধী সবে ইলেকশন জিতে ক্ষমতা এসেছেন। ২৫ শে মার্চ তার প্রধানমন্ত্রীত্বের বয়স দু সপ্তাহ। গরিবী হঠাও ছিল তার পাখীর চোখ। তার আগে ১৯৬৯ সালে কংগ্রেস দুই ভাগ হয়েছে। একদিকে বিরোধি দলে জনসঙ্ঘে অটলজীর মতন নেতা। কংগ্রেস বিভক্ত। অন্যদিকে নক্সাল এবং মাওবাদিদের উৎপাত। তিনি নিজেই কাঁটার সিংহাসনে বসে আছেন! প্রতিদিন ঘরে বাইরে রাজনৈতিক যুদ্ধ করছেন, নিজের ক্ষমতা টেকাতে। সে আরেক বিশাল গল্প। এই অবস্থায় বাংলাদেশ তার প্রায়োরিটি হতে পারে না। বিশেষত রিফিউজি ইনফ্লাক্সের জন্য তার গরিবি হটাও আন্দোলন মায়ের ভোগে।
আরেক সমস্যা ভারতের মিলিটারির দুর্বলতা। পাকিস্তানি মিলিটারি তখন চীন এবং আমেরিকা থেকে সাহায্য প্রাপ্ত। ভারত সমাজতান্ত্রিক দেশ। মিলিটারি বাজেট সীমিত। ভারতের মিলিটারি হার্ডোয়ার খুব পুরাতন। ইনফাক্ট ডিসেম্বর মাসে যখন পাকিস্তান বনাম ভারতের যুদ্ধ শুরু হয় সেটা মিলিটারি হার্ডোয়ারের পরিপ্রেক্ষিতে কানা বনাম খোঁড়ার যুদ্ধ। ৩ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বিমান বাহিনী ভারতের পশ্চিম উত্তর প্রান্তের সব বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালায়। একটি ক্ষেত্রেও ভারতীয় র‍্যাডার সেই বিমানের আগমন ধরতে পারে নি। কিন্ত সেই বিমান হামলায় ভারতের ক্ষতিও খুব কম হয়। কারন অধিকাংশ পাকিস্তানি বোম যা বিমান ঘাঁটিতে নিক্ষেপিত হয়েছিল, তা ফাটেই নি!! কারন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দুর্নীতি এবং বাজেটের অভাব। অর্থাৎ ৭১ এর যুদ্ধ ছিল কানা বনাম খোঁড়ার যুদ্ধ।
সেই জন্য ২৮ শে এপ্রিল ইন্দিরা গান্ধী যখন ম্যাকেনশকে জিজ্ঞেস করলেন সেনা অভিযান এখুনি হবে কি না-ম্যাকেনশ নাকচ করে দেন। কারন ভারতীয় সেনা বাহিনীর কোন প্রস্তুতিই ছিল না। মিলিটারি হার্ডোয়ার ছিল অত্যন্ত পুরাতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের।
যুদ্ধে গিয়ে হারলে ইন্দিরার রাজনৈতিক জীবন সেখানেই শেষ হয়ে যেত। সুতরাং তিনিও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের মাধ্যমে ধীরে চলার নীতি নেন।
(৪)
কিন্ত রিফিউজি ক্যাম্পে তখন বাংলাদেশ থেকে আসা স্বরনার্থীরা উপচে পরছে। ভারতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি ২৭ শে মার্চই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষনা দেয়। জনসঙ্ঘ কমিনিউস্ট সহ সকল বিরোধিদের চাপেই ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের জন্য সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে বাধ্য হোন এপ্রিল মাসে।
ইন্দিরা গান্ধির নিজের গদি নড়বরে ছিল। কিন্ত যখন দেখলেন গোটা ভারতই বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইছে-তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকেই নিজের পলিটিক্যাল ক্যাপিটালে পরিনত করলেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল এই কারনেই যে অটল বিহারী বাজপেয়ী, জ্যোতি বসুর মতন বিরোধিরা ইন্দিরা গান্ধীকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে গেছেন। ঠিক সেই কারনেই অটলজি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতির জন্য ১০ দিনের সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেন।
সেই সময় পৃথিবীর বাকি ৫০ টা ( তখন ৪০) মুসলমানদেশের ভূমিকা কি ছিল? তারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। পাকিস্থানি মিলিটারিকে অর্থ এবং অস্ত্র দিয়ে নানান ভাবে সাহায্য করেছে-যাতে ইসলামের জয় হয়!! ইরান তার বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সুলতানরা পাকিস্থানী মিলিটারিকে অর্থ সাহায্য দিয়েছিল যাতে তারা বাংলাদেশের আরো অনেক লোক মারতে পারে। এগুলোও নথিবদ্ধ ইতিহাস!!
আর আজকে মোদি হলেন বাংলাদেশ বিরোধি-আর যাবতীয় আরবের মুসলমানরা বাংলাদেশের পেয়ারের লোক!! এটাও ইতিহাসের আইরনি হিসাবেই লেখা থাকুক!
জয় বাংলা!
ফুটনোট
***
ফুটনোটে আরো দুটো ইতিহাস ক্লিয়ার করা দরকার। একটি জেনারেল ম্যাকেনশর ইন্টারভিউ। যে বর্ষার সময় তিনি বাংলাদেশ আক্রমন করতে চান নি। কারন ট্যঙ্ক নিয়ে ঢোকা যেত না। এটি উনি গল্প দিয়েছেন। কারন বাংলাদেশে পাকিস্তান আর্মির সর্ব সাকুল্যে ছিল চারটি ফাইটার জেট। আর চারটি আর্মি বোট। ইনফ্যাক্ট মনসুনই ছিল বাংলাদেশ আক্রমনের উপযুক্ত সময়। যেহেতু পাকি আর্মির কোন গানবোট ছিল না। কিন্ত আসল সত্য হচ্ছে ভারতের মিলিটারি হার্ডোউয়ারের ছিল আরো খারাপ অবস্থা। এপ্রিল-নভেম্বর-ভারত প্রচুর মিলিটারি অস্ত্র কিনেছে গোপনে। ১২ ই ডিসেম্বর ভারত কি ট্যাঙ্ক নিয়ে ঢাকায় ঢোকে? প্যারাড্রপিং হয়! বাংলাদেশে নর্মাল সময়তেই ট্যাঙ্ক চালানো মুশকিল!!
দ্বিতীয় এই যে ১৯৬৮ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাঙার জন্য গুপ্তচর সংস্থা র সক্রিয় ছিল। ১৩ ই এপ্রিল মেহেরপুরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার স্থাপিত হয়। এর মানে ভারত সরকার বরাবরই সাহায্য করেছে। উত্তর হচ্ছে । হ্যা। কিন্ত গোপনে। কারন ওই অস্থায়ী সরকারকে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দিতে ৪ ই ডিসেম্বর লাগে। আর ২৫ শে মার্চের জন্য র বা মুক্তিযোদ্ধারা তৈরী ছিলেন না। তৈরী থাকলে ৩ লাখ লোক এক রাতে পাকি আর্মি মারতে পারে না। আসলে বাংলাদেশ গড়ার জন্য র এর তত্ত্ববধানে আস্তে আস্তে প্রস্তুতি চলছিল। কিন্ত কেউ ভাবে নি ২৫ ই মার্চ পাকিস্তানি আর্মি ক্রাক ডাউন শুরু করবে। সুতরাং ভারত সরকার ও এই ২৫ শে মার্চের ঘটনায় হঠাতই বুঝতে পারে এবার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আরেকটা সত্য হচ্ছে রিফিউজিদের জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল কম । ভারতের সাধারন মানুষের ভিক্ষায় টিকেছে তাদের জীবন। এমন কি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের মান ও ছিল নীচু মানের। কারন ভারত সরকারের সাহায্য ছিল খুবই কম। যেহেতু ভারত সরকারি ভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল না আন্তর্জাতিক চাপে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধিদের চাপ খুবই দরকার ছিল।

জনসঙ্ঘের সত্যাগ্রহ এবং জেল ভরোর একটি ভিডিও হাতে এসেছে। দেখুন সেখানে খাঁকি প্যান্ট সাদা শার্টের সঙ্ঘীরা কারাবরন করছে ( ১২ ই আগষ্ট, ১৯৭১)। ফলস ভিডিও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারন এটি এসোসিয়েট প্রেসের ভিডিও। দেখলেই বুঝতে পারবেন, ভারত সরকার কেন তখনো স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয় নি, তাই নিয়ে জনসঙ্ঘ আন্দোলন করছে। আশাকরি আপনার সবাই বুঝবেন, নিজেদের আদর্শ নিজেদের ঘৃনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে সত্যকে আপনার মিথ্যে করতে পারবেন না। সত্য দিনের সূর্য্যের মতন প্রকাশ পাবেই। https://www.youtube.com/watch?v=0RomY1OQI0M

Sunday, March 21, 2021

প্রতিশ্রুতি- না আসল কাজ-ভোটে জিততে কোনটা বেশী দরকার?

 প্রতিশ্রুতি- না আসল কাজ-ভোটে জিততে কোনটা বেশী দরকার?

- বিপ্লব পাল, ২২/৩/২০২১
ভারত এবং আমেরিকার রাজনীতিতে একটা মৌলিক পার্থক্য, রাজনৈতিক পার্টিগুলির গঠন এবং বিবর্তন।
ভারতের রাজনীতিতে সব পার্টিই একটা আদর্শের রূপরেখাতে চলার চেষ্টা করে- সেই আদর্শের ভিত্তিতে জনগণকে স্বপ্ন দেখায় তারা পরিবর্তন আনবে ।
এবার জনগণ সেটা বিশ্বাস করবে কি না, সেটা নির্ভর করছে, সেই পার্টিটি টেস্টেড স্পেন্ট ফোর্স না নতুন ফোর্স । যেমন ধরুন সিপিএম ইস্তাহারে যতই ভাল কথা লিখুক বা বাম রাজনীতি কেন উপাদেয় এই নিয়ে লেখালেখি করুক না কেন, তাদের কথাকে বিশ্বাস করার মতন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারন তারা যে অপদার্থ তা জনগণ গত ৩৪ বছর বুঝে নিয়েছে। কংগ্রেসের ও প্রায় তাই এক অবস্থা। তুলনামূলক ভাবে তৃনমূল এবং বিজেপি বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন ফোর্স। এর মধ্যে ১০ বছর রাজত্ব করার জন্য তৃনমূলের প্রতিশ্রুতিও অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। আবার অনেকেই আছে যারা মনে করেন দিদি কথা রেখেছেন। মূলত এই পটভূমিকাতেই বিজেপির পোয়াবারো। যেহেতু বাংলায় তারা টেস্টেড ফোর্স না। অনেক বাম সমর্থকই বিজেপিকে সুযোগ দিতে চান যদি বিজেপি বাংলার জন্য ভাল কিছু করে । কিন্ত বিজেপি যেহেতু দেশের গদিতে গত সাত বছর-সেহেতু অনেকেরই মোহভঙ্গ হয়েছে যে চাইলেই বিজেপি ম্যাজিক্যালি কিছু করতে পারবে না। এবং ভারতের অর্থনীতি এখন ধুঁকছে। যারা ভারতের অর্থনীতি ভাল ভাবে চালাতে পারে নি, তারা বাংলার অর্থনীতি ঘোরাবে, এই বিশ্বাস অনেকেই হারিয়েছেন।
অর্থাৎ নতুন "আশা" এবং "দিশা" ভারতের রাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন। জনগণকে বোঝাতে হবে আপনি নতুন কিছুতে সক্ষম। বামেদের ব্যর্থ হওয়ার মুল কারন, তারা যতক্ষন না পর্যন্ত সব কিছু খোল নলচ বদলে নতুন ধরনের পার্টি হওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিচ্ছে, কেউ তাদের বিশ্বাস করবে না। কিন্ত আব্বাসের হাত ধরে বা ঐশীদের নামিয়ে তারা প্রমান করেছেন, বাংলার বাম, আরো পচাগলা বামে পরিনত হচ্ছে। ফলে যেকোন গণতন্ত্রে যেখানে হেসে খেলে ২০-৩০% বাম ভোট পাওয়া যায়, তারা ৫% পাবেন কি না সন্দেহ। এবং সেটাই তৃনমূলের গলার ফাঁস এখন। কারন বামেরা তাদের ২০% ভোট ব্যাঙ্ক না রাখতে পারলে, সেটা বিজেপির কাছে যাবে।
আমেরিকার গণতন্ত্রেও এই "হোপ" বা আশা খুব গুরুত্বপূর্ন। কিন্ত সেক্ষেত্রে পার্টি না ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ন। আমেরিকার পার্টিগুলো একটি টেন্ট। সেই টেন্টে সব আদর্শের লোক থাকে। ডেমোক্রাটদের মধ্যেও বিদেন এবং বার্নির মত পথের পার্থক্য অনেকটাই-কংগ্রেস বনাম সিপিএমের সমান। এখানে সুবিধা হচ্ছে এই হোপ বা আশা দেন নতুন পার্থী। যেহেতু পার্টি পার্থীর আদর্শকে সেন্সর করে না বা করতে পারে না। সেহেতু পার্টির আদর্শ বলে কিছু হয় না। নতুন নতুন পার্থীরা নতুন আদর্শ নতুন আশার আলো দেখান।
আমি আরেকটু গভীরে ব্যখ্যা করি। আসলেই আমাদের জীবন খুব কঠিন, এবং রাফ। এই জীবন আগেও কঠিন ছিল, ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। স্টয়িক দর্শনের এটাই ভিত্তি।
যদিও জীবন খুবই কঠিন, এবং সেটাই বাস্তব- সেই ভাবে ভেবে গেলে কিন্ত আবার বাঁচার ইচ্ছাটাই চলে যাবে। মানুষ সব সময় বেঁচে থাকে সামনে ভাল দিন দেখবে বলে। প্যারাডক্স এটাই, সেই ভাল দিন আর আসে না। কিন্ত অতীতের দিন গুলো যা তখন মনে হত খারাপ, কত কঠিন, তার স্মৃতি চারনেই মানুষ বোঝে সেই দিনগুলি হয়ত ভালোই ছিল।
সেইজন্যে গণতন্ত্রে স্টয়িক দর্শন চলে না। আসলে মানুষযে এত গান শোনে, সিনেমা দেখে- এর একটাই কারন। এই কঠিন জীবনে বেঁচে থাকার জন্য দরকার "আশা" বা "হোপ"। Light at the end of the tunnel. সেই জন্য সব গণতন্ত্রেই প্রতিটা পার্টি দাবি করে , সাধারনের দুর্দশার জন্য অন্য পার্টি দায়ী আর তারাই "হোপ"-তারাই ভবিষ্যতের আশা।
মানুষও এই ভাবেই ভাবতে ভালবাসে। ফলে ভারতের গণতন্ত্রে ক্ষমতাশীল দলগুলি বা যারা আগে ক্ষমতায় ছিল-তারা যদি নতুন মুখ, নতুন ফর্মে নিজেদের রিনোভেট না করে, তাদের প্রতিশ্রুতিতে কেউ বিশ্বাস করবে না। এখানেই বাংলার রাজনীতিতে বাম এবং কংগ্রেস ব্যর্থ সম্পূর্ন। তৃনমূল পিকে কে এনে কিছুটা রিনোভেশন করেছে। সবটা না। বিজেপির রিনোভেশনের দরকার এখনো পড়ে নি যেহেতু বাংলায় তারা নতুন এবং ডেমোগ্রাফিক এনেক্সজাইটি তাদের ফেবারে। কিন্ত আস্তে আস্তে তাদের হিন্দুত্ববাদের এপিল ও ফিকে হবে। যেমন বামেদের গরিব দরদি এপিলে এখন লোকহাঁসাহাসি ছাড়া কিছু পাওয়ার নেই।
মোদ্দা কথা স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং জনগন সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করবে। এই ভাবেই চলে গণতন্ত্র। মোদি স্বপ্ন দেখাতে ওস্তাদ এবং তার জন্যেই ক্ষমতায়। কিন্ত যত দিন যাবে লোকে স্বপ্ন এবং স্বপ্নদোষের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হবে। এটাও সব পার্টিকেই মাথায় রাখতে হবে।
আসলে আমরা ব্যর্থ রাজনীতির ভিক্টিম- এটা ভেবে শান্তনা পাওয়া যায় যে আমাদের দুর্দশা, কঠিন জীবনের জন্য অন্য কেউ দায়ী। তাকে হটালেই স্বর্গ নেমে আসবে। এটা এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল টনিক। যা মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে । রাজনীতি সেটার প্রতিফলন মাত্র।

Sunday, February 28, 2021

ঈর্ষা এবং বামপন্থা- সমাজ ধ্বংসের সিঁড়ি

 ঈর্ষা এবং বামপন্থা- সমাজ ধ্বংসের সিঁড়ি

(১)
খ্রীষ্ঠান ধর্মের জনপ্রিয়তা বা কিভাবে আস্তে আস্তে রোমান সম্রাজ্যে খীষ্ঠান ধর্ম জনপ্রিয় হয়, তা নিয়ে জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিৎসের খুব গুরুত্বপূর্ন একটি তত্ত্ব আছে। উনার মতে এর মূল কারন ঈর্ষা। খ্রীষ্ঠান ধর্ম রোমান সম্রাজ্যের গরীব এবং দাসেদের মধ্যে প্রথমে জনপ্রিয় হয়। নিৎসের তত্ত্বে গরীব বঞ্চিত ব্যক্তিরা ধনীদের যে প্রাচুর্য্যের জীবন চোখের সামনে দেখে, তাতে ঈর্ষান্বিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিৎসে বলছেন এই ঈর্ষা ভাল। কারন এর জন্যেই গরীব লোকেরা পরিশ্রম করে , রিস্ক নিয়ে থাকে- ধন সম্পদ আহরনের চেষ্টা করে। নিজের ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়। যাতে এটলিস্ট পরের প্রজন্ম ভাল থাকে।

কিন্ত যেকারনে নিৎসে খাপ্পা ছিলেন খ্রীষ্ঠান ধর্মের প্রতি- এই খৃষ্ট ধর্মে বলা হল ঈর্ষা পাপ। বড়লোক হওয়া পাপ, যৌনইচ্ছা পাপ। ফলে খৃষ্টধর্মের জনপ্রিয় হওয়ার আগে , ইউরোপের গরীবলোকেরা যে বড়লোকদের দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে আরো ধন সম্পত্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করত -সেই ইচ্ছাটাই সমাজ থেকে চলে যায়। খ্রীষ্ঠান ধর্মের উত্থানের সাথে সাথে -বিশেষত যবে থেকে সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রীষ্ঠধর্মকে রোমান রাষ্ট্রধর্ম বানালেন -তবে থেকে ইউরোপের পতন হয় দ্রুত। বিশেষত যেটাকে আমরা ক্ল্যাসিক্যাল যুগ বলি-তার পতন শুরু হয়।

কারন ঈর্ষা একটি পজিটিভ চালিকা শক্তি। গোটা সমাজের জন্যই। প্রতিটা গরীব, ধন সম্পদ উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করে বলেই সমাজে নতুন ব্যবসা, নতুন উৎপাদিকা শক্তি বজায় থাকে।
ধনসম্পত্তি এবং বড়লোক হওয়া হারাম ঘোষনা করে গোটা ইউরোপের চালিকা শক্তি একদা ধ্বংস করেছিল খ্রীষ্ঠান ধর্ম। ইউরোপ আবার গোটা বিশ্বের নেতা হবে সেই পঞ্চদশ শতকে যখন ইউরোপীয় বণিকরা খ্রীষ্টধর্মকে আবার গীর্জার গারাজে ঢুকিয়ে ঠূঁটো জগন্নাথ বানাবে।

(২)
পশ্চিম বাংলার বামপন্থা যেভাবে বাংলাকে ধ্বংস করেছে, তার সাথে নিৎসের ঈর্ষার তত্ত্বের সম্পর্ক কি?
কারন গোটা পশ্চিম বঙ্গের সমাজ যেভাবে ধনী এবং ধনকে ঘৃনা করতে শিখেছে, তাতে এক অদ্ভুত বাঙালী ধর্মের দেখা পাই পশ্চিম বঙ্গে।

এখানকার অধিকাংশ ছেলেপুলের কোন উচ্চাশাই নেই। কোন রকমে একটা ভদ্রস্থ মাইনের চাকর। যদি চা সিঙাড়া খেয়ে মোহনবাঙান ইস্টবেঙ্গল, ইন্ডিয়া-পাকিস্তান- আম্বানি আদানির গুষ্টির তুষ্টি করে দিন কাটানো যায়, এরা তাতেই সন্তষ্ট। কারন অধুনা বাঙালী ধর্মে শেখানো হয়েছে ধন সম্পত্তি বাজে জিনিস না হলেও ধনী মানেই চালচোর কিম্বা গরুচোর।


সিপিএমের টুম্পাগান দেখুন! যেন চাকরি করাই জীবনের পরম উদ্দেশ্য। মুশকিল হচ্ছে দুশো বছর আগে চাকরির অস্তিত্বই ছিল না। প্রায় সবাই ছিল স্বাধীনজীবি-সে কৃষকই হোক, আর শিক্ষকই হোক।

যেকোন সমাজের চালিকা শক্তি হচ্ছে দরিদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেনী। এদের মধ্যে যে উচ্চাশা জাগে, তার উৎস কিন্ত সেই ঈর্ষা- এই গরীব শ্রেনীটির ধন্যাট্য জীবনজাপনের জন্য উচ্চাশা থেকেই বিরাট অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি তৈরী হয় ( আবার চিটফান্ডের মতন ফ্রড ও হবে। কিন্ত ফ্রড বেশী দিন টেকে না। ফিল্টার হয়ে সৎ ব্যপারীটাই একমাত্র টিকে থাকে)।

উদাহরন দেওয়া যেতে পারে। গুজরাতে গেলে দেখবেন, যে মাসে ২০,০০০ টাকার কেরানী-তার উদ্দেশ্য চল্লিশ বছর বয়সের মধ্যে পুঁজি জমিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করা। বাঙালীদের মধ্যে এই ড্রাইভটাই নেই-কারন ধনের ঈর্ষা ব্যপারটা লুপ্ত।

কিন্ত এটা এলো কোত্থেকে? বাংলা মুঘল যুগে একদা সব থেকে সমৃদ্ধশালী রাজ্য ছিল। বাংলার শিল্প এবং বনিকেরা পৃথিবীতে বিখ্যাত ছিল। অথচ, ভারতচন্দ্রের কাব্যে দেখতে পাবেন , বাঙলার পিতামাতার একমাত্র স্বপ্ন-আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।

আমার ধারনা বাংলা যত স্বাধীনতা হারিয়েছে- দিল্লীর মুঘল শাসক, ইংরেজরা যত বাংলাকে শোষন করেছে, বাংলার মানুষ তত বেশী হত দরিদ্র অবস্থার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। যেহেতু বাংলা আস্তে আস্তে সামরিক শৌর্য্য বীর্য্যও হারিয়েছে, সেহেতু এই হতাশ দারিদ্রর মানসিক শান্তনা হিসাবে বাংলায় নানান ভাববাদি ধর্ম শিকড় নেয়। যারা ভাবতে শেখায় দারিদ্রে আর কি ক্ষতি আছে-যাতে মানুষ অন্তত প্রচন্ড দরিদ্র অবস্থাকে স্বাভাবিক এবং বড়লোকদের বঞ্চনা বলে মেনে নেয়। দারিদ্রের জয়গান গায়। জাস্ট লাইক ক্রিষ্টিয়ানিটি। কমিনিউজম খ্রিষ্টানিটি ইসলামের আধুনিক সংস্করন।

ফলে এতে আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই যে ভারতে বাংলায় প্রথম কমিনিউস্ট আন্দোলন শক্ত মাটি পায়। বাঙালীরা প্রথমে ইংরেজি শিক্ষিত ছিল-সেটাই শুধু কারন না। বাংলার মাটিতে শ্রীচৈতন্যের ভাববাদি সাম্য বহুদিন আগে থেকেই ছিল। এই ধরনের ভাববাদ বাঙালীর ঈর্ষাকে ধ্বংস করেছে-ফলে বাঙালী অল্পেই সন্তুষ্ট। বাঙালী গরীবদের মধ্যে বড়লোক হবার জন্য আগ্রাসী যুবক কম। আনফরচুনেটলি ওটাই সমাজের উন্নয়নের আসল চালিকা শক্তি। যেটা পৃথিবীর সর্বত্র ধনতন্ত্রে প্রমানিত।

আরেকটা ছোট্ট উদাহরন দিই। বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর নাম অনেকেই শুনেছেন। কিন্ত কজন শুনেছেন ব্যারিস্টার রাসবিহারী ঘোষের নাম? রাসবিহারী ঘোষের ১৫ লাখ টাকা দান থেকেই শুরু হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। অথবা তারকনাথ পালিতের নাম কজন জানেন? যার দানের টাকায় সায়েন্স কলেজ তৈরী হয়। এদের অপরাধ এরা ধনী ব্যক্তি ছিলেন-তাই দানধ্যান করতেই পারেন। বাঙালী এদের মনে রাখে নি। যারা যাদবপুর বা কোলকাতার সায়েন্স কলেজের ছাত্র-তারা এই দুজনের নাম জানে কি না সন্দেহ। এর একটাই কারন। বাঙালী সমাজে এবং সংস্কৃতিতে ধনের গুরুত্ব এবং অবদান নিয়ে কোন আলোচনাই নেই। শুধু শুধু ত্যাগ এবং দারিদ্রকে মহিমান্বিত করা হয়। ফলে বাঙালী যুবক যুবতীদের মধ্যে ধনী হবার জন্য কঠিন পরিশ্রমী ছেলে মেয়ে পাওয়া শক্ত। যেটা ছাড়া ধনতান্ত্রিক কাঠামোতে একটা সমাজ এগোতে পারে না।




Saturday, February 20, 2021

মঙ্গল গ্রহের রোভার অভিযান - প্রযুক্তি বিদ্যার ম্যাজিক

                                                               (১)

 ১৮ই ফ্রেব্রূয়ারী মঙ্গলে নামল নাসার রোভার পারসিভারেন্স।  অভিযান মারস ২০২০।  এটি পঞ্চম মঙ্গলরোবটযান। এর আগের রোভারগুলি - মারস পাথ ফাইন্ডার ( ১৯৯৭),  স্পিরিট (২০০৪), অপার্চুনিটি (২০০৪)  এবং কিউরোসিটি (২০১২)।  এর মধ্যে কিউরোসিটি এখনো জীবন্ত এবং পৃথিবীতে ডেটা পাঠাচ্ছে।  প্রতিটি রোভার আগেরটি থেকে উন্নত এবং অনেক বেশী সক্ষম।  আগের রোভারের সমস্যাগুলি সমাধান করে পরের রোভার মডেল তৈরী হয় সার্দান ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রপালসন ল্যাবেরেটরীতে ( জেপিএল)।  প্রায় একটনের কাছাকাছি ওজন। এস ইউ ভি গাড়ীর সাইজ। এটি চলমান ল্যাবেরটরি। 

                                       

                                       ( ১৮ই ফ্রেব্রুয়ারী মঙ্গলে নেমেছে রোভার )

আগের রোভার মডেল, কিউরোসিটি যথেষ্ট উন্নত ছিল। কিন্ত অটোনোমি বা নিজে নিজে চলার "ব্রেইন" ছিল কম। বর্তমানে গত দশকে অটোনোমাস ভেহিকলে অভূতপূর্ব উন্নতির হয়েছে। টেসলা, এপল, গুগল এরা কি করে একটা গাড়ী নিজেই চলতে পারবে, তা নিয়ে প্রচুর নতুন প্রযুক্তি এনেছে। ফলে   কর্মাশিয়াল অটোনোমাস টেকনোলজি পারসিভারেন্সে আছে। এর মানে হচ্ছে মঙ্গলের ধূলিঝড়, শীত গ্রীষ্ম, গর্তে পড়লে, পৃথিবী থেকে মানুষের ব্রেইন খাটিয়ে আর রোভারকে উদ্ধার করতে হবে না। যদিও বর্তমান রোভারের ব্রেইন ও খুব ছোট -মাত্র ৪ গিগাবাইটের ফ্ল্যাশ, ১২৮ মেগা মাইটের ডির‍্যাম, ৬৬ মেগা হার্জের স্পীড। প্রশ্ন উঠতে পারে  প্রায় একটন ওজনের রোভারের এত ছোট মেমরী বা মাথা কেন?

 এর মূলকারন মঙ্গলের হিমেল ঠান্ডা ।  ওই  প্রচন্ড ঠান্ডায় ইলেক্ট্রনিক্স চালাতে কৃত্রিম হিটিং দরকার। কারন অত ঠান্ডায় ইলেক্ট্রনিক্স জমে যাবে। মঙ্গলের গ্রীষ্মে  বিষুব রেখায় ( ইকোয়েটরে) তাপমান ২০ সেন্টিগ্রেড উঠতে পারে। কিউরোসিটি রোভার গ্রীষ্মের   দুপুরে কখনো সখনো ৪-৬ সেন্টিগ্রেডের দেখা পায় । কিন্ত রাতে তাপমান -৭০ সেন্টিগ্রেডে নেমে যায়।  শীতকালে দিনের বেলায় তাপমাত্রা থাকে -৩০ সেন্টিগ্রেডের নীচে।  এছাড়া মঙ্গল পৃথিবীর থেকে ৬০% কম সূর্য্যরশ্মি পাচ্ছে ।  ফলে খুব বেশী ঠান্ডা দেখলে রোভার হাইবারনেট করে। নইলে এনার্জি ক্রাইসিসে ভুগে কোলাপ্স করে যাবে। এর আগে স্পিরিট রোভারে এই ক্রাইসিস বার দুয়েক দেখা গেছে। 

 সমস্যা হচ্ছে ওই ইন্টারন্যাল হিটিং চালু রাখা - ইলেকট্রানিক্স চালাতে। এছাড়া মটোর এবং ইলেক্ট্রিক্যাল চালাতেও পাওয়ার দরকার। এই পাওয়ার আসবে কোত্থেকে? 

 অনেকের ধারনা এটা আসবে রোভারের স্যোলার প্যানেল থেকে।  সোলার প্যানেল থেকে  বিদ্যুৎ শক্তি  জমা হবে, লিথিয়াম ব্যাটারিতে। দিনের বেলায়। সেই ব্যাটারি পাওয়ারে  চলবে রোভার। কিন্ত তা ঠিক না!

  আগের রোভারের সোলার  এক্সপেরিয়েন্স যাকে বলে ডিজাস্টারাস-বিপজ্জনক।  বিজ্ঞানীরা দেখেছেন মঙ্গলে সোলার পাওয়ারের ওপর নির্ভর করলে বিরাট বিপদ। এর কারন মঙ্গলের ধুলোবালি। এই ধূলোতে প্যানেল প্রায় ঢেকে যায়। আবার ঝড় উঠলে প্যানেল পরিস্কার হয়।  মঙ্গলে সোলার পাওয়ার হার্ভেস্ট করা টোটালি আনরিলায়েবল। একে শুধু গ্রীষ্মের দুপুরে কিছু পাওয়ার পাওয়া যায়-তাও যদি স্যোলার প্যানেল পরিস্কার থাকে! 

  সেই জন্য পারসিভারেন্স রোভারে আছে  ১১০ ওয়াটের থার্মোইলেক্ট্রিক পাওয়ার জেনারেটর। যা চলে ৫ কিলো রেডিওএক্টিভ প্লুটোনিয়াম ওক্সাইডে।  পাওয়ার তৈরী হয় সিবেক এফেক্টের জন্য।  রেডিওএক্টিভ প্লুটোনিয়াম ওক্সাইড আলফা কনা বিকিরন করে,  এর কনটেনারকে উচ্চতাপমাত্রায় রাখে। রোভারের বাইরে যেহেতু বিশাল ঠান্ডা-ওই গরম আর ঠান্ডার গ্রাডিয়েন্ট থেকে তৈরী হয় বিদ্যুৎ প্রবাহ। যার থেকে প্রায় সর্বোচ্চ ১১০ ওয়াট পাওয়া যায়। কিন্ত মঙ্গলের বুকে দিনে তাপমাত্রা বাড়লে  এই প্রবাহ কমে যাবে। যেহেতু থার্মাল গ্রাডিয়েন্ট কম হবে। কিন্ত তখন আবার সোলার পাওয়ার জেনারেশন বেড়ে যাবে। ফলে সোলার এবং থার্মাল মিলিয়ে পার্সিভারেন্সে মোটামুটি ধারাবাহিক পাওয়ার সোর্স রাখে। কিন্ত ওই ১১০ ওয়াট পাওয়ারে ১ টনের একটি গাড়িকে চালানো বেশ মুশকিল। থেমে থেমে চালাতে হয়  ( সমান ওজনের  টেসলার গাড়ি  চলে  ২০,০০০ ওয়াটে)। ফলে রোভারের গতি খুব কম রাখতে হয়। প্রায় কয়েক সেন্টিমিটার সেকেন্ডে।  সেই জন্য রোভার স্পিরিট ছ বছরে ঘুরেছে মোটে সাত কিলোমিটার। অপর্চুনিটি ১৫ বছরে চলেছে টোটাল ৪৬ কিলোমিটার। 

এছাড়াও এবারের পার্সিভারেন্স রোভারের ছটি চাকার টায়ারে বৈচিত্র আনা হয়েছে। এদের টায়ার মানে টাইটেনিয়াম-এলুমিনিয়াল এলয়ের তৈরী। আগের সব রোভারের চাকা বসে যেত।   কারন চাকার তলপৃষ্টে প্রচুর ড্যামেজ হয় দ্রুত।  এর মূল কারন মঙ্গলে ভূপৃষ্টে প্রচুর এমন সব শীলা আছে যাদের মুখ বর্শার মতন সরু এবং সূক্ষ্য।  এবার রোভারের নিজের দৃষ্টি আছে বেশী-সে এইসব জায়গা গুলো এড়িয়ে যাবে-শুধু তায় না-তারা চাকার প্যাটার্ন এমন করা হয়েছে যে ওইসব বর্শামুখী শীলাগুলি ( শার্প রক) কোন ক্ষতি করতে পারবে না। 

 এবার আসি আসল প্রশ্নে। কিউরোসিটি রোভার চালু থাকতে, কেন পারসিভারেন্স রোভারকে মঙ্গলে ছাড়া হল? পারসিভারেন্সে কি আছে যা কিউরোসিটিতে নেই? 


 পার্সিভারেন্সের মূল উদ্দেশ্য মঙ্গলে অতীতে প্রান ছিল কি না তা খুঁজে বার করা। এর জন্য পারসিভারেন্স নেমেছে জেজেরো ক্রাটার বা জ্বলামুখে। যেখানে অতীতে ৩০-৪০ কিমি দীর্ঘ লেক বা হ্রদ ছিল। নদী ছিল। অতীতে সূর্য্যের তাপ ছিল ২৫% বেশী। মঙ্গলের বায়ূ ছিল আরো গভীর। ফলে বর্তমানে মঙ্গল যেমন শীতল, অতীতের মঙ্গল কিন্ত তা না। সেই গ্রহ ছিল পৃথিবীর থেকে হাল্কা ঠান্ডা। আজকের মঙ্গলের চেয়ে, সে অতীতের দিনে  গড়ে ২০ ডিগ্রি বেশী গরম থাকত -প্রায় ১০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড ছিল গড়ে ( বিষুব রেখায়)।  জল, মিথেন, এত কার্বন ডাই অক্সাইডে প্রান থাকবে না?? 


                                                           (২)

পারসিভারেন্স রোভারের মূল উদ্দেশ্য দুটি

  -মঙ্গলের বুকে আদিতে কোন জীবানুকনা ছিল কিনা তা খুঁজে বার করা। কারন আগের রোভার অভিযানেই স্পষ্ট যে মঙ্গলের বুকে প্রান জন্মানোর জন্য যেসব জৈব অনু বা অর্গানিক মলিকিউল থাকার দরকার সবই আছে বা এক্কালে ছিল। অতীতে মঙ্গলে জলের নদী হ্রদ সব কিছুই ছিল। কারন আগের রোভার অভিযানগুলি প্রমান করেছে সেইসব  রক বা শীলার অস্তিত্ব ( যেমন হেমাটাইট) যারা জল ছাড়া জন্মাতে পারে না।  সুতরাং পারসিভারেন্স প্রথমেই  খুঁজবে পাথর, শীলার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই সব অর্গানিক মলিকিউল যা প্রান ছাড়া তৈরী হতে পারে না। অর্থাৎ রকের মধ্যে বায়োসিগ্নেচার আছে কিনা। এর জন্যে পারসিভারেন্সে আছে তিনটি যন্ত্র-যা চলমান ল্যাবেরটরি। এক্সরে লিথোকেমিস্ট্রি, সুপারক্যাম এবং একটি নতুন যন্ত্র শার্লক- যা আল্ট্রাভায়োলেট রমন স্পেক্ট্রোস্কোপি। এই তিনটি যন্ত্র কিভাবে অতীতে প্রানের সন্ধান করবে-তা নিয়ে সংক্ষেপে লিখছি। 

  

                        (শার্লক -মঙ্গলের বুকে জৈব অনুর সন্ধানে )

-দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ন উদ্দেশ্য মঙ্গলে অক্সিজেন তৈরী করা। এটা করবে মক্সি বলে একটা যন্ত্র। মঙ্গলের কার্বন ডাই ওক্সাইড ভেঙে অক্সিজেন এবং কার্বন মনোক্সাইড তৈরী করবে মক্সি। তবে ঘন্টায় ১০-২০ গ্রামের মতন। কিন্ত এই পরীক্ষা সফল হলে, মক্সির ১০০ গুন বড় যন্ত্র পাঠানো হবে মঙ্গলে যা ঘন্টায় ২ কিলো অক্সিজেন তৈরী করবে। এই ভাবে দুই বছরে কয়েকশোটন অক্সিজেন তৈরী করে রাখবে যাতে ভবিষ্যতে যখন মঙ্গল থেকে পৃথিবীর বুকে রিটার্ন ফ্লাইটের দরকার হবে, তখন সেই অক্সিজেন ব্যবহার করা হবে। এটা নিয়েও সংক্ষেপে লিখছি। 

প্রথমেই আসি রোভারের শার্লক নামক যন্ত্রটির কথায়। যা আল্ট্রাভায়োলেট রমন স্পেক্ট্রোস্কোপ। বোঝা যাক বায়োসিগনেচার খুঁজতে আল্ট্রাভায়োলেট রমন স্পেক্ট্রোস্কোপ কি করবে। শার্লক আসলে একই সাথে চলা দুটো ইন্সট্রুমেন্ট। এটি একই সাথে ২৪৮ ন্যানোমিটার আল্ট্রাভায়োলেট লাইটে ইমেজিং ( অর্থাৎ ফটো তোলা ) এবং ২৪৮ ন্যানো  ফ্লুরোসেন্স স্পেক্ট্রোস্কোপি ( অর্থাৎ সেই ২৪৮ ন্যানোমিটার আল্ট্রাভায়োলেট লাইট অর্গানিক মলিকিউলগুলিকে এক্সাইট করে যে অন্য আলোক তরঙ্গে বিভাসিত হবে তা বার করবে)। কিন্ত ২৪৮ ন্যানোমিটার কেন? কারন  প্রোটিনের কার্বন -হাইড্রোজেন বন্ডিং ওই তরঙ্গ শোষন করতে পারে। শার্লক যেটা দেখবে-সেটা হচ্ছে কোন রকের   ১/১০ মিলিমিটারেরও ক্ষুদ্র জায়গায় যদি একই সাথে ছবি এবং স্পেক্ট্রোস্কোপ সাজেস্ট করে, সেখানে স্পেশাল বায়োমলিকিউল পাওয়া যাচ্ছে ( যেমন আমাইনো এসিড বা অন্য যেকোন বায়ো মনোমার) তাহলে বুঝতে হবে অতীতে প্রানের অস্তিত্ব ছিল। 

শার্লক ছাড়াও, আরো দুভাবে বায়ো সিগনেচার খুঁজবে রোভার। প্রথমটি সুপারক্যাম। সুপারক্যাম লেজার ইন্ডিসড ব্রেইকডাউন স্পেক্ট্রোস্কোপি বা লিবস ।  লিবস মানে কি?  এর মানে ধরুন রোভারের ৫-৭ মিটার দূরে কোন রক বা শীলা আছে। সেখানে রোভারের যাওয়া সম্ভব না। সুপারক্যাম কি করবে? ১০২৪ আই আর বা ইনফ্রারেড লেজারবিম ছুঁড়ে মারবে সেখানে। যেখানে লেজারের উত্তপ্ত বীম পড়বে, খুব ছোট্ট জায়গায় ( চালের মতন ক্ষুদ্র), রক ভেপারাইজড হবে-হ্যা, শীলটি জ্যন্ত গলে বাস্প হবে লেজারের উত্তাপে। তারপরে সুপারক্যাম ছুঁড়ে দেবে ৫৩২ ন্যানোমিটারের গ্রীন লেজার। ভিজিবল বা দৃশ্যমান আলোর রমন স্পেক্ত্রোক্সোপির জন্য। এছাড়াও সুপার ক্যাম দৃশ্যমান এবং ইনফ্রারেড স্পেক্ট্রোস্কোপিও করবে। রমন , ভিজিবল এবং আই আর স্পেক্ট্রোস্কোপি সব কিছুই অর্গানিক বা জৈব অনুর অস্তিত্ব বুঝতে। মানে রক বা শিলা টুকরোটি যখন বাস্পীভূত হবে তখন সেই রকে জমা হয়ে থাকা কোটি কোটি বছরের জৈবঅনু গুলিও অহল্যার শাপমোচনের মতন বাস্প হয়ে বেড়িয়ে আসবে।  সেই বাস্পের জৈব অনুগুলিই বলে দেবে ওই পাথরের মধ্যে জৈব অনু ছিল কি না। 

      

                                          ( রোভারের সুপার ক্যাম)

এছারাও থাকছে এক্সরে লিথোকেমিস্ট্রি- এক্স রে আল্ট্রাভায়োলেটে লাইটের থেকে আরো ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যে। এটি একই সাথে ক্রিস্টালের স্ট্রাকচার এবং অনুর গঠন বলে দেয়। কঠিন অবস্থায় জৈব অনুর গঠন জানতে এই ইনস্ট্রুমেন্টটি কাজে আসবে। 

                                         (৩)

এবার আসি মক্সি অর্থাৎ ছোট্ট অক্সিজেন তৈরী করার পরীক্ষামূল যন্ত্রটির গঠনে। 

 মক্সি তৈরী করেছে বিশ্ববিখ্যাত এম আই টি বা ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিউট অব টেকনোলজি। মঙ্গলের আবহাওয়া খুব পাতলা, পৃথিবীর ১%। মানে পৃথিবী পৃষ্টে ৮০ কিমি উচ্চে বাতাস যত পাতলা, মঙ্গলগ্রহের সারফেসের বাতাস ততটা ঘন! এই বাতাসের ৯৬% কার্বন ডাই ওক্সাইড।

  কার্বন ডাই অক্সাইডে দুটি অক্সিজেন পরমানু আছে- যারা কিন্ত খুব শক্তভাবে কার্বন পরমানুটাকে ধরে থাকে। মক্সি  সলিড স্টেট ক্যাটালিসিস করে। কার্বন ডাই অক্সাইডকে চালান করে দিচ্ছে জার্কোনিয়া দিয়ে তৈরী ইলেক্ট্রোডের মধ্যে-এখানে কার্বন ডাই অক্সাইড ভেঙে তৈরী হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড এবং অক্সিজেন।


                          ( মঙ্গলের বুকে প্রথম অক্সিজেন জেনারেটর -মক্সি)

মক্সি খুবই ছোট স্কেলে অক্সিজেন তৈরী করে-মাত্র ১০-২০ গ্রাম ঘন্টায়। শুধু এটুকু করতেই ৩০০ ওয়াট পাওয়ার লাগে! আমি আগেই লিখেছি রোভারের রেডিওএক্টিভ পাওয়ার জেনারেটর মোটে ১১০ ওয়াট।  তাহলে এত পাওয়ার পাবে কোথায়? কেন ? সোলার প্যানেল। কিন্ত তা গ্রীষ্মের দুপুর ছাড়া এত পাওয়ার জেনারেট করতে পারবে না!  সব মিলিয়ে ১২০০ ঘন্টা সক্রিয় থাকবে মক্সি। কিন্ত ওইটুকু চালাতেই হয়ত ৫-১০ বছর কেটে যাবে। কারন  ৩০০ ওয়াট পাওয়ার জমা করতে করতেই বেশ কয়েকদিন লাগবে। তারপর এক ঘন্টা হয়ত অক্সিজেন প্ল্যান্ট চলবে। 

 কিন্ত তাহলে মক্সির ১০০ গুন বড় যে অক্সিজেন জেনারেটর বানানোর কথা হচ্ছে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ফেরার জন্য, তা কি করে সম্ভব হবে যেখানে ঘন্টায় দুই কিলো অক্সিজেন বানানোর প্ল্যান??  আরো গুরুত্বপূর্ন এই যে একজন মানুষের দিনে ৫৫০ লিটার মানে ঘন্টায় প্রায় ৩০-৪০ গ্রাম অক্সিজেন লাগে।  অর্থাৎ মক্সিযে অক্সিজেন তৈরী হবে তার একজন মানুষের জন্যও পর্যাপ্ত না এবং তাও তৈরী হবে শুধু গ্রীষ্মের দুপুরে?  অতেব মঙ্গলে মানুষ গিয়ে অক্সিজেন পাবে কোথায় বা ফিরে আসার রকেটে জ্বালানীই বা তৈরী হবে কি করে?

এক্সরে লিথোগ্রাফি- রোভার 

 সূর্যলোক বা স্যোলার প্যানেলের ভরসা করছেন না বিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যতে ১০০ গুন বড় যে অক্সিজেন জেনারেশন প্ল্যান্ট মঙ্গলে বসানো হবে, তার জন্য দরকার ৩০ কিলোওয়াটের প্ল্যান্ট। সেটির জন্য সেই রেডিওএক্টিভ থামোইল্কট্রিক ব্যাটারিই লাগবে। কিন্ত অত বড় ব্যাটারি মহাকাশযানে পাঠাবে কি করে?  

সমাধান। যদি মঙ্গলেই পাওয়া যায় রেডিওএক্টিভ রক। তাহলেই উপনিবেশ বানানোর পথ পোয়াবারো। কিন্ত শুধু সূর্যালোকের ভরসায়, মঙ্গলে  মানুষ কেন, রোবট পাঠানোও অসম্ভব। 

                   (৪)

রোভারের সাথে মার্স ২০২০ অভিযানে আছে একটা ক্ষুদ্র হেলিকপ্টার ইনজেনুইটি। ওজন মোটে দুকিলো। চলে সোলার পাওয়ারে। ব্যাটারি ফুল চার্জ হলে উড়বে মোটে ৯০ সেকেন্ড। মঙ্গলে হেলিকপ্টার চালানো খুব কঠিন কাজ। কারন পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলের বায়ুমন্ডল মোটে ১%।  অন্যদিকে মঙ্গলে গ্রাভিটি ৬০% কম। ফলে হেলিকপ্টারে ব্লেডগুলি এত বড় হতে হবে যাতে পৃথিবীর তুলনায় এটলিস্ট ৪০গুন বেশী থ্রাস্ট তৈরী হয়। এদিকে সেটা চালাতে শক্তি লাগবে তো? পাওয়ার নেই রোভারে। ফলে স্যোলার ব্যাটারি ভরসা। এদিকে ব্যাটারির ওজন বেশী হয়ে গেলে মুশকিল। তারপরে আগেই বলেছি গ্রীষ্মের দুপুর ছাড়া মঙ্গলে স্যোলার ভাল চলে না। ফলে ইনজেনুইউটি একটা এক্সপেরিমেন্ট- এক্সপ্লোরেশনের কাজে খুব বেশী আসবে না। কারন দশদিন চার্জ দিলে একদিনে এক মিনিট চলবে। 



                                  ( মঙ্গলের বুকে প্রথম হেলিকপ্টার ইনজেনুইটি) 

 তবে আমরা আশায় আছি। অতীতে মঙ্গলে প্রান ছিল, আশা করা যায় এই বছরই আবিস্কার হবে। হলে তা হবে পৃথিবীর বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক
আবিস্কার।