Monday, December 30, 2019

দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং দেশভাগের ইতিহাস - ৫ঃ বঙ্গভঙ্গ থেকে চম্পারন সত্যাগ্রহ

বৃটিশ আর্মির কিছু কিছু সৈনিকের পরম সৌভাগ্য ( বা দুর্ভাগ্য)- এরা  জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং পাঞ্জাবের রিফিউজি ক্যাম্প -ইতিহাসের দুই নির্মম অধ্যায় চাক্ষুষ দেখার সুযোগ পেয়েছেন।  ইনারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, পাঞ্জাবে রায়োটের নৃশংসতা নাৎসি জার্মানির সমস্ত অত্যাচারকেও হার মানায়!

 অথচ দুর্ভাগ্য ভারতবাসীর।  ভারতীয় লিব্যারালরা,  নাৎসী জার্মানির পুনরাবৃত্তি নিয়ে যত চিন্তিত- নিজেদের দেশে ঘটা যাওয়া দেশভাগের দুর্ভাগ্য যে আবার ফিরে আসতে পারে, সেটা নিয়ে উনারা চিন্তিত না।  যে অপশক্তি এবং দুর্বলতাগুলির জন্য দেশভাগ হয়, স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও, তার সবগুলিই বিদ্যমান।  এইজন্য নাৎসী জার্মানীতে হিটলারের ভূতের পেছনে সময় নষ্ট না করে, দেশভাগের ইতিহাস ভারতের লিব্যারালদের সব থেকে বেশী জানা উচিত। কারন ভারতের বর্তমান এবং ভবিষ্যত দেশভাগের দুঃস্বপ্নকে অস্বীকার করে এগোনো সম্ভব না।

 আগের চার পর্বে, দেশভাগের রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে আলোচনা করেছি। ওগুলো অনেকটা ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফর্মেশন।  সাদা ক্যানভাসের মতন। 

 আমি  দুটি পর্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পর্যালোচনা করব।  বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট। এই পর্বে শুধু বঙ্গভঙ্গ এবং  চম্পারন সত্যাগ্রহে গান্ধীর প্রবেশ। তারপরের পর্বে শুধুই গান্ধী।

   এই ইতিহাস অনেকেরই জানা। কিন্ত যা নিয়ে আলোচনা হয় না,  স্কুলপাঠ্য ভারতের ইতিহাস স্বীকার করে না -  প্রতিটি আন্দোলনই আস্তে আস্তে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ বাড়িয়েছে।  এর জন্য দায়ী কে? মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি? নাকি হিন্দুদের হাতে সব সম্পত্তির মালিকানা?  নাকি হিন্দুদের গোঁড়ামি? নাকি বৃটিশদের টোপ খেয়ে কিছু মুসলমান নেতার  ক্ষমতার লোভ? না কি আল দ্যা এবভ?


  ভারতে সকল সশস্ত্র এবং অহিংস আন্দোলনের উৎস এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের ক্যাটালিস্ট- বঙ্গভঙ্গ।  ১৯০৫।  বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস খুব ভাল ভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।



                                                                               (১)
 বঙ্গভঙ্গ বুঝতে, তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড জর্জ কার্জনকে একটু জানা যাক।  রাজনৈতিক কার্জনকে না জানলে, বঙ্গভঙ্গ বোঝা যাবে না।

  লর্ড কার্জন অব কেডেলস্টন, বৃটিশ রাজনীতির ইতিহাসের বর্ণাট্য চরিত্র। ভারতের ভাইসরয় ছাড়াও বৃটেনের ইতিহাসের সফলতম সেক্ট্রেটারি অব স্টেটস ( বিদেশমন্ত্রী) । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তরকালে ইংল্যান্ডের শান্তিবাদি আবহে, লেবার পার্টি এবং লিব্যারালদের রমরমার দিনে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন নি ঠিকই- কিন্ত তার সাম্রাজ্যবাদি বিদেশনীতি, তার বৃহত্তম প্রতিদ্বন্দি চার্চিলকে প্রভবিত করে।

 বঙ্গভঙ্গ কার্জনের রাজনৈতিক জীবনে নেহাৎই এক ফুটনোট- কিন্ত ভারতের ইতিহাসে যুগসন্ধিক্ষন!

  কার্জন এগারো ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। মা ব্ল্যাঙ্কে এগারো সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান।  বাবা আলফ্রেড কার্জন সার্সডেলের চতুর্থ ব্যারন। চূড়ান্ত রক্ষনশীল এই জমিদার পরিবার।

 কার্জন বড় হয়েছেন গর্ভনন্সের হাতে। তার ধাত্রীমা এলেন ম্যারী পার্মন ছিলেন কঠোর নৃশংস নিয়মানুবর্তিতায় বিশ্বাসী। ছোটবেলায় জর্জ কার্জন সামান্য কিছু অপরাধ করলে,  ম্যারী তার বুকে প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দিতেন - মিথ্যেবাদি, কাপুরুষ। সেই ভাবে তাকে গোটা গ্রাম ঘুরতে হত!


 বৃটিশ লিব্যারালিজম বা উদারনৈতিকতা তাকে আকর্ষন করে নি কোনদিন। কারন তার এই কঠোর, নিষ্ঠুর ভাবে বড় হওয়া- যেখানে তাকে শেখানো হয়েছিল- একমাত্র পানিশমেন্টই ডিসিপ্লিন দিতে পারে!
   
  মেধাবী ছাত্র ছিলেন।  অক্সফর্ড ইউনিয়ানের প্রেসিডেন্ট  হৌন। কিন্ত  তার স্বপ্নে ইংল্যান্ডের প্রাচীন গৌরব। স্যার থমাস মুরের রিচার্ড দ্যা থার্ডের পৌরানিক গাথায় তার নির্বাক বিশ্বাস।

 ফলে ১৮৮৬ সালে ল্যাঙ্কাশায়ারের এম পি হিসাবে যখন পার্লামেন্টে প্রবেশ করলেন-তিনি কট্টর সাম্রাজ্যবাদি। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের গৌরবই তার একমাত্র ধ্যান ধারনা। বৃটিশ পার্লামেন্ট তার প্রথম ভাষনই ছিল- কেন ভারতীয়দের স্বরাজ ( নিজেরদের সরকার)  দেওয়া উচিত না!

 তিনি নিজেকে অভিজাত বলেন। এদিকে তার এস্টেট খুব ছোট। আভিজাত্যের ইচ্ছা প্রচুর- অর্থনৈতিক ক্ষমতা নেই। টাকার জন্য বিয়ে করলেন আমেরিকান শিল্পপতির কন্যা - মেরী ভিক্টরিয়া লেইটারকে। টাকার জন্য বিয়ে করলেও  তার বিয়ে সুখী হয়।  তখনকার দিনে প্রায় মিলিয়ান ডলারের ওপর উপকৌটন পান শশুরের কাছ থেকে।

 রাজনৈতিক প্রতিভা ত ছিলই। শশুরের টাকায় রাজনীতিবিদদের কেনাও সহজ হল। ফলে পেলেন বৃটিশ শাসনের সব থেকে কাঙ্খিত এসাইনমেন্ট!

 ১৮৯৯ সালে তাকে ভারতের ভাইসরয় করে পাঠানো হয়!  ব্যপারটা খুব সহজ ছিল না। বৃটিশ রাজনীতিতে তিনি লিব্যারালদের চোখের দুশমন। সাম্রাজ্যবাদি বুনো মোষ। বৃটিশ রাজনীতিতে তার গ্রাফ আটকাতে আমেরিকার বৃটিশ রাষ্ট্রদূত, কার্জনের ভাবী শশুরের কাছে গিয়ে কাঠি করেন। যাতে বিয়েটা ভাঙ্গে।  কারন সবাই জানত কার্জনের হাতে শশুরের টাকা এলে, একে আর আটকানো যাবে না।

 ঘটনা ছোট্ট ।কিন্ত দেখা যাচ্ছে,  স্বয়ং বৃটিশ রাজনীতিবিদরাই তার সাম্রাজ্যবাদি আফিং নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। এতটাই যে তার বিয়ে ভাংতেও তারা পিছু হঠেন নি। বৃটিশ মহলে একটা শঙ্কা ছিলই-এই লোককে ভাইসরয় করে পাঠালে, ভারতে জাতিয়তাবাদি আন্দোলন আরো উতলা হবে!

  বৃটিশ লিব্যারালদের আশঙ্কা ১০০% সত্য । ১৯০৫ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের নেতারা পুরোপুরি কনস্টিটিউশনাল। দাদাভাই নরৌজি, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, মহামান্য গোখলে -সবাই ভাইসরয়ের কাছে পিটিশন লিখতেন।  রাস্তায় নেমে সরাসরি বৃটিশ বিরোধি রাজনীতির সময় তখনো আসে নি। কিন্ত লর্ড কাজনকে ভারতের ভাইসরয় হিসাবে পাঠানোতে সব হিসাব উল্টোপাল্টা হয়ে যায়।  অবশ্য এমনটা যে হবে-  ইংল্যান্ডে তার বিরোধি রাজনীতিবিদরা আঁচ করেছিলেন।  এতটাই যে তার ইনফ্লুয়েন্সিয়াল বিয়ে আটকাতে পর্যন্ত তারা চেষ্টা করেছেন!

 জর্জ কার্জন এক ভূগোলবিদ ও ছিলেন। রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটির ফেলো। ম্যাপ নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করা তার বহুদিনের অবশেসন।  জারের রাশিয়া যখন মধ্য এশিয়ার কলোনিগুলিকে ট্রেইন লাইন দিয়ে যুক্ত করা শুরু করে, উনি পালটা চাল দিতে ইরান এবং আফগানিস্তানে বৃটিশ প্রভাব বাড়াতে বলেন। উনার ধারনা ছিল জার যেকোন দিন ভারত দখল করতে পারে।  রাশিয়া তখন বিপ্লবীদের আড্ডাঘর। বলশেভিক বিপ্লবের বহুপূর্ব থেকেই ( ১৮৬৭), রাশিয়াতে অনেক নিহিলিস্ট বিপ্লবীদের কার্যকলাপ।  গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা গুলি ছোঁড়ার রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদ রাশিয়ার বিপ্লবীদের আবিস্কার ।  ভারতের ছেলেছোকরারা রাশিয়া থেকে যাতে বিপ্লবী তালিম না পায়, তার জন্যে কি কি করিতে হইবে, ভারতযাত্রার বহু  আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন!

 এবার সহজেই অনুমেয় উনি কোলকাতায় আসার পর কি কি কাজ করতে ছটফট করবেন।  প্রথমেই আফগানিস্তানের সাথে নিরাপত্তা বাড়াতে নর্থ ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স গঠন করলেন।

বাংলা সেই সময় বিরাট প্রদেশ। আট কোটি লোক। বর্তমানের পশ্চিম বাংলা, বাংলাদেশ, বিহার এবং উড়িষ্যার অংশ নিয়ে তৈরী।  ফলে সরকারি কাজের সুবিধার জন্য বাংলার বিভাজন বহুদিন থেকেই হওয়ার কথা।

 ১৮৭৮ সালে বাংলার প্রথম বিভাজন হয়।  তখন এডমিনিস্ট্রেটিভ কারনে আসাম বিভাজন নিয়ে কোন গন্ডগোল হয় নি।  ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন -  ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট ডিভিশন আসামের সাথে জুড়ে দিতে চাইলেন।  হিন্দু এবং মুসলমান উভয়পক্ষেই বিরোধিতা করল।

 ১৯০৪ সালে তিনি পূর্ব বঙ্গে গেলেন মুসলমানদের "মুড" বুঝতে। স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এবং সৈয়দ আমীর আলির দৌলতে তিনি ভালোভাবেই জানতেন মুসলমানরা আলাদা রাজনৈতিক ক্ষমতা চাইছে। উনি ঢাকার নবাবের সাথে দেখা করেন।  নবাবের সাথে কথা বলে বুঝলেন , পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলা আলাদা করেদিলে, পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সাপোর্ট তিনি পাবেন। এবং এই ইস্যুতে হিন্দু-মুসলমান বৈরিতা শুরু হবে। 

 ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হয়। কার্জন নিশ্চিত ছিলেন বাঙালী হিন্দুরা এর বিরোধিতা করবে, বাঙালী মুসলমানরা এর সমর্থনে থাকবে।  কার্জন জানতেন আজ না হলে কাল, ভারতের জাতিয়তাবাদি আন্দোলন গড়ে উঠবেই। আর তার বিরুদ্ধে সেফটিভালভ হচ্ছে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা। মুসলমানদের পিছিয়ে থাকা।

 আরো একটা কারন কার্জন তার ঘনিষ্ট সার্কলে বলেছিলেন। উনি দেখলেন জাতীয়তাবাদের উৎস কোলকাতা।  কোলকাতায় বাঙালী মধ্যবিত্তদের টাকার উৎস জমিদারি। এদিকে জমিদারির আয়ের অর্ধেক আসে পূর্ব বঙ্গ থেকে। উনি চাইছিলেন ঢাকায় পালটা জমিদার বসতি হোক। যাতে কোলকাতায় টাকার সাপ্লাই কমে। দ্বিধায় জাতিয়তাবাদি আন্দোলন দুর্বল হয়।

  বঙ্গভঙ্গ প্রথম ঘটনা যাতে স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের দ্বিজাতি তত্ত্ব সত্য  বলে প্রমানিত হয়।  কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা  জোর করে নিজেদের অজান্তেই স্যার সৈয়দের দ্বিজাতি তত্ত্বে স্টাম্প মারে।  কারন বঙ্গভঙ্গে বাংলার মুসলমানরা উপকৃত হত। কিন্ত হিন্দু মধ্যবত্ত শ্রেনী বাংলাকে ভাগ করা সাম্রাজ্যবাদি চক্রান্ত বলে, পথে নেমে গেল। বাঙালী মুসলমানদের সাথে আলোচনা করার ও প্রয়োজন বোধ করল না।

মুশকিল হচ্ছে এক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম দুই ন্যারেটিভই সঠিক। যেটা বেঠিক। সেটি হচ্ছে কংগ্রেসের নেতৃত্ব।  এটি আর কোন কালেই ঠিক হয় নি!

                                                     (২)
 ১৯০৫ সালে বাংলায় হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যা  ৪৪ঃ ৫৬
                                   হিন্দু           ঃ   মুসলমান
  ভাগচাষি -                    ৫                        ৯
  জমিদার                       ৭                       ৩
 উকিল                           ৯                       ১
  ডাক্তার                          ৫                      ১
 শিক্ষক                           ৭                       ২ 
  সিভিল সার্ভেন্ট            ৩                       ১
  পুলিশ                            ২                      ১   


  ইংরেজি শিক্ষিত   ১০,০০০ জনের মধ্যে   ঃ  হিন্দু ১১৫, মুসলিম  ২২
 উঁচুপদে                  হিন্দু    ১১২৫               মুসলমান      ৪৪

  এই পরিসংখ্যান থেকে পরিস্কার হিন্দুদের তুলনায় বাংলায় মুসলমানদের অবস্থা সেকালে বেশ খারাপ ছিল।   পশ্চিম বঙ্গে এখনো প্রায় তাই আছে।   সেকালেও এই পিছিয়ে থাকার কারন মুসলমানরা পাশ্চাত্য শিক্ষায় আগ্রহী ছিল না।  অধিকাংশই তাদের সম্প্রদায় এবং ধর্মকে জড়িয়ে যে ইসলামিক জীবন-সেই জীবনেই থাকতে বেশী আগ্রহী ।  এখনো তাই আছে। দেশভাগের ওটাই হচ্ছে মূল বারুদ।  অধিকাংশ  মুসলমানরা পাশ্চাত্য  শিক্ষা, রাজনীতি এবং জীবনে আগ্রহী না। তারা ইসলামক শিক্ষা, ইসলামিক জীবনধারা এবং ইসলামিক রাজনীতি ( শরিয়া) তে বেশী আগ্রহী।  ফলে এখনো গরীব মুসলমানরা তাদের ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসাতে পাঠায়। দীর্ঘদিন "কমিনিউস্ট পার্টি" করা রেজ্জাক মোল্লা বলে তার জীবনে মহম্মদ মার্ক্সের থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন।

  আমি এই জন্যেই এই অধ্যায়ের শুরুতেই লিখেছি- দেশভাগের যে বারুদ, তা এখনো তরতাজা।

   এই পরিস্থিতিতে ঢাকায় পূর্ব বাংলার রাজধানী হলে,  অনেক হিন্দু জমিদাররা ঢাকায় যেতে বাধ্য হত। অনেক হিন্দু ব্যারিস্টার উকিলকেও কলকাতা ছাড়াতে হত।  তৎকালীন নেতারা সবাই এই উকিল-ব্যারিস্টার শ্রেনীর লোক।  ফলে তারাই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে মাঠে নামলেন ।  বাকীদের ও নামালেন।

   বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকেই স্বদেশী আন্দোলনের শুরু। বৃটিশ বস্ত্র ছেড়ে দেশের খাদির কাপড় পরা -বৃটিশ দ্রব্য বর্জনের এই আন্দোলন খুব বেশী সফল হয় নি। মুসলমানরা এই বৃটিশ দ্রব্য বর্জন করে নি।  গ্রামের দিকেও এই আন্দোলন ছিল দুর্বল। শুধু তাই না। হিন্দুরা পূর্ব বাংলায় প্রায় ৫০০ টি মিটিং করে মুসলমানদের ওপর জোর করে স্বদেশী চাপাতে যায়। ফলে কিছু কিছু জায়গায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। যা রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসের পটভূমি।

  কিন্ত স্বদেশী আন্দোলনের অরাজনৈতিক দিকটা খুব উজ্জ্বল।  শুধু বঙ্গভঙ্গই কার্জনের একমাত্র কীর্তি না! বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধীনতা হরন করেন। মিউনিসিপালিটি গুলিতেও সরকারি কতৃত্ব বাড়ানো হয়! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঠাট্টা করে বলা হত - গোলদিঘির গোলামখানা! ফলে স্বাধীন শিক্ষার জন্য স্বদেশীরা জাতীয় এডুকেশন ট্রাস্ট তৈরী করলে।  তৈরী হল জাতীয়তাবাদি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

  আরেকটা উল্লেখযোগ্য পাওনা   সশস্ত্র আন্দোলন। যুগান্তর এবং অনুশীলন সমিতি। বৃটিশরা এই আন্দোলন পুলিশ দিয়ে ভাংল বটে-কিন্ত প্রমানিত হয় বাঙালী হিন্দু নপুংসক না। যা বৃটিশরা বরাবর ভেবে এসেছে। ফলে বৃটিশরা জাতীয়তাবাদিদের দাবী দাওয়া সিরিয়াসলি নেওয়া শুরু করে।

 জন স্ট্রেচি  লিখেছিলেন   --

     Bengal is the only country in the world where you can find a great population among whom personal cowardice is looked upon as in no way disgraceful... It is for such reasons that Englishmen who know Bengal, and the extraordinary effiminacy of its people, find it difficult to treat seriously many of the political decl  ( বাঙালীই  ( উনি বাঙালী হিন্দুদেরকেই বলছেন) পৃথিবীর একমাত্র জাতি যেখানে কাপুরষতাকে "মহান" বলে ধরা হয়- কোন বাঙালী পুরুষ কাপুরুষতার কাজ করলে- তাকে নিয়ে কেউ লজ্জা পায় না। ফলে এমন নারীসুলভ জাতির রাজনৈতিক দাবীকে বৃটিশরা কেন পাত্তা দেবে? )

  ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকীর বোমা, আত্মত্যাগে বাঙালীদের নিয়ে বৃটিশদের এই ধারনা বদলাতে থাকে।
এটাও মনে রাখতে হবে বিপ্লবীদের আত্মত্যাগই গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে নামার সাহস যুগিয়েছিল সাধারন ভারতবাসিদের।

 ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। এটা এই আন্দোলনের সাফল্য না ব্যর্থতা বলা মুশকিল।  কেন?



                                                         (৩)

 স্বদেশী আন্দোলনে সম্পূর্ন ব্যর্থতা এই যে- এর সাথে বাঙালী মুসলমানদের যুক্ত করা যায় নি। বরং বাঙালী মুসলমানরা এর সক্রিয় বিরোধিতা করেছে।  এ ছিল তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিরোধি। ঢাকায় প্রদেশিক রাজনীতি হলেই তাদের সুবিধা হত বেশী।
 

  সশস্ত্র  বিপ্লবীরা  বিবেকানন্দর নিঃস্বার্থ দেশসেবা , গীতার নিহিলিজম, বঙ্কিম চন্দ্রের বন্দেমাতরম, কালীর চন্ডাল মূর্তি থেকে নিজেদের অনুপ্রেনিত করেছেন। এখানে একজন মুসলমান যুবক কিভাবে যোগ দেবে? সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি গদগদে হয়ে বল্লেন, বঙ্গভঙ্গ বিরোধি আন্দোলন এক ধর্মীয়  রূপ নিয়েছে। এখন এই আন্দোলনই আমাদের ধর্ম!  একবার ও দেখলেন না, এটা হিন্দু রিজিস্টান্স মুভমেন্টের রূপ নিয়েছে, যাতে মুসলমানদের স্বার্থ নেই। সংস্কার ও নেই।  তাই তারা নেই।

 কংগ্রেস এই একই ভুল তাদের সব আন্দোলনেই পুনারবৃত্তি করবে।

  হিন্দু নেতারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করছেন। ভাল কথা। কিন্ত মুসলমানরা যে ইংরেজি শিক্ষায় পিছিয়ে আছে , সেই নিয়ে আলোচনা নেই।

ফলে অধিকাংশ মুসলমান এই বঙ্গভঙ্গ থেকে দূরে থাকলেন। অনেকে সরাসরি বিরোধিতা করলেন।

 ১৯০৬ সালে ঢাকাতে মুসলীম লিগের জন্ম হল। বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন ভারতের মুসলমানদের চোখে ( পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ইতিহাস বইতে এই ভাবেই লেখা আছে) , মুসলমান স্বার্থ বিরোধি হিন্দু আন্দোলন। ফলে মুসলীম লীগের জন্ম অনির্বায্য হয়।

  এবার একটু ঘুরে দেখি। অষ্টাদশ শতাব্দিতে, হিন্দুরাই বৃটিশদের ডেকে আনে মুসলমান শাসন থেকে মুক্তি পেতে।  গোটা উনবিংশ শতাব্দিতে বৃটিশ আনুকুল্যে হিন্দুরা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভাবে এগিয়ে যায়।  আরো এগোনোর জন্য তারা যখন বৃটিশ বিরোধি জাতিয়তাবাদি আন্দোলন সবে শুরু করেছে ( বঙ্গভঙ্গ) তারা মুসলমানদের সাথে পেল না।  মুসলমানদের  বাদ দিয়ে, কখনো বিরোধিতা করেই কংগ্রেসকে এগোতে হল। কারন তদ্দিনে মুসলমানরা দেখছে, এই হিন্দু-বৃটিশ দ্বন্দে তারা বৃটিশের পক্ষ নিলেই তাদের রাজনৈতিক লাভ। দুশো বছর আগে, হিন্দুরা বৃটিশ-মুসলিম দ্বন্দে বৃটিশ পক্ষ নিয়েছিল। একই দৃশ্যে- একই সাম্রাজ্যবাদি স্ট্রাটেজি- শুধু হিন্দু মুসলমানরা নিজেদের রেস্পেক্টীভ পজিশন বদলেছে।

 সোজা বাংলায় বললে বঙ্গভঙ্গ লর্ড কার্জনের পাতা ফাঁদ। কংগ্রেস ফাঁদে পা দিল।  তারা কার্যত সেটাই করে, যা কার্জন চেয়েছিলেন। মুসলমানদের বুঝিয়ে দেওয়া হল দ্বিজাতি তত্ত্ব আসলেই সত্য!

  কংগ্রেসের অবশ্যই অসহযোগ আন্দোলনে যাওয়া উচিত ছিল-কিন্ত সেটা বঙ্গ ভঙ্গকে কেন্দ্র করে না।  লর্ড কার্জন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা মিউনিসিপালিটির স্বয়ত্বশাসন হরন করেন। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য একশো একটা ইস্যু ছিল কংগ্রেসের হাতে। ্বঙ্গভঙ্গটাকে ইস্যু করা উচিতই হয় নি।

আমাদের যে ইতিহাস পড়ানো হয় তাতে বলা হয় বৃটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ করেন (১৯১১) । কিন্ত  ১৯১১ সালে ,  পূর্ব বাংলা - পশ্চিম বাংলা এক করা হলেও, বিহার এবং উড়িশ্যাকে বাংলা প্রভিন্স থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।  ১৯১১ সালে যে নতুন বাংলা প্রভিন্স তৈরী হল, তাতে মুসলমানরা প্রায় ২ ঃ ১ সংখ্যাগুরু।  ফলে  ১৯৩৭ সালে যখন ইন্ডিয়া এক্টের বদৌলতে বাংলা বিধানসভা ( স্টেট লেজিসলেটিভ), তৈরী হয়, তাতে প্রায় সব মন্ত্রীই মুসলমান ছিলেন। বঙ্গভঙ্গ আটকানোর ফল এটাই , পরে যখন স্বয়ত্ব শাসন দেওয়া শুরু করে বৃটিশেরা- বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে যায় মুসলমানদের হাতে।  ১৯৪৫-৪৬ সালে কলকাতা সহ গোটা বাংলায় দাঙ্গার এটাই সব থেকে বড় কারন।

ইতিহাস নির্মম এবং সুস্পষ্ট। কংগ্রেস মুসলিমদের দাবি দাওয়া, আশা আকাঙ্খা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে নি।  দ্বিজাতি তত্ত্বে সিলমোহর মেরেছে নিজেদের অজান্তে।

                                      (৩)

মহত্মা গান্ধী ভারতে এলেন ১৯১৫ সালে। কংগ্রেস তখন নরম পন্থী এবং চরমপন্থীদের কলহে দীর্ন। সর্বজন গ্রহনযোগ্য নেতা নেই।  রাজনীতির কোন দিশা নেই। জনবিচ্ছিন্ন।   এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস টেকাতে দরকার ছিল -নতুন ধরনের রাজনীতি এবং নতুন ধরনের নেতৃত্ব- যা চরমপন্থী এবং নরমপন্থীদের হাতাহাতি থেকে কংগ্রেসকে মুক্ত করে, আবার দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এপিসেন্টারে নিয়ে আসবে। ফলে "গান্ধী" র মতন একজন মধ্যমমেধার এবসার্ডলি আইডিয়ালিস্ট ব্যক্তিত্বকে বিড়াল থেকে বাঘ বানালো কংগ্রেস।  যে রাজনৈতিক মঞ্চে এই মেটামরফসিস ( গান্ধীর রাজনৈতিক উত্থান)  সমাধা হয়-তা বিহারের চম্পারন সত্যাগ্রহ (১৯১৭)।

চম্পারন সত্যাগ্রহ সম্মন্ধে স্কুলে কি পড়ানো হয় আমাদের ?
পশ্চিম বঙ্গের ক্লাস টেনের পাঠ্য বইতে যা  আছে,সেটা তুলে দিচ্ছি। তারপরে,  গভীরে গিয়ে দেখব, কিভাবে ইতিহাসে, রাজনীতিতে বিড়ালকে বাঘ বানানো হয়!

////////

চম্পারণ সত্যাগ্রহ [Champaran Satyagraha]: ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সদ্যসমাপ্ত সফল সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতে ফেরেন । তিনি প্রথমেই ব্রিটিশ সরকারকে ভাড়াটে শ্রমিক আইন রদ করতে অনুরোধ করেন । এই আইন বলে ভারত থেকে ঠিকা শ্রমিকদের দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানো হত । তিনি ঘোষণা করেন ভাড়াটে শ্রমিক আইন প্রত্যাহৃত না হলে তিনি এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করবেন । সরকার গান্ধিজির দাবি মেনে নিলে গান্ধিজি নিবৃত্ত হন । এভাবে তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রথম প্রয়াস জয়যুক্ত হয় । এরপর তিনি উত্তর বিহারের চম্পারণের কৃষকদের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ান । সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি সেখানকার নীল চাষীদের দুঃখ দুর্দশা ও অসন্তোষের কথা শোনেন । বিহারের চম্পারণে 'তিন কাঠিয়া প্রথা' অনুসারে নীলকর সাহেবরা কৃষকের জমির ৩/২০ ভাগ বা বিঘাপ্রতি তিন কাঠাতে নীল চাষ করতে বাধ্য করত ।  চম্পারণের কৃষকদের দুঃখ দুর্দশার অবসানকল্পে ও ব্রিটিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে গান্ধিজি চম্পারণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন । গান্ধিজির অসাধারণ দৃঢ়তার ফলে—
(১) সরকার নীল চাষীদের ওপর সর্বপ্রকার জুলুম বন্ধ করতে বাধ্য হন ।
(২) চম্পারণের কৃষকদের অসন্তোষের কারণ অনুসন্ধানের জন্য সরকার চম্পারণে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করতে বাধ্য হন ।
(৩) গান্ধিজি এই কমিটির সদস্য হন ।
(৪) তিন কাঠিয়া প্রথা তুলে দেওয়া হয় ।
(৫) বর্ধিত খাজনার ২০%-২৫% হ্রাস করা হয় ।
(৬) নীলকর সাহেবরা চম্পারণ ছেড়ে চলে যায় ।
এ সময় বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ, গোবিন্দবল্লভ পন্থ, জে.বি. কৃপালনী, এ.এন.সিংহ, ব্রজকিশোর প্রমুখ নেতৃবর্গ গান্ধিজির সঙ্গী হয়েছিলেন ।
এই বছর তিনি অনশন ও সত্যাগ্রহ করে আমেদাবাদের মিল মালিক এবং শ্রমিকদের বিরোধের নিষ্পত্তি করেন ।  তিনি 'মজুর মহাজন সভা' গঠন করে আন্দোলনের দ্বারা শ্রমিকদের দিনে ৮ ঘন্টা কাজের সীমা ধার্য করেন ।  
// /////////////////////////
  আমার ধারনা, আমার পাঠকদের ৯৯% , চম্পারন সত্যাগ্রহ নিয়ে এই টুকুই জানেন, যা ওপরে তুলে দিলাম। পুরো অমিতাভ বচ্চনের অন্ধাকানুন!  মালিক গুন্ডাদের হাতে চাবাগানের শ্রমিকরা শোষিত অত্যাচারিত- হঠাৎ করে ত্রাতা হিসাবে অমিতাভের উদয়!

  বিহারের চম্পারন জেলায় , নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে চাষীদের বিদ্রোহ বহুদিনের পুরাতন। ১৮৬৮ সালে চাষীরা সেখানে বিদ্রোহ করে নীলের চাষের বিরুদ্ধে।  বৃটিশ আইনের সুযোগ নিয়েই সেবার চাষীদের রক্ষা করেছিল, স্থানীয় আইনজীবিরা। ফলে ১৮৭৭ সালে বিহারের প্ল্যাণ্টার এসোশিয়েশন তৈরী হয়। এবং মোটামুটি যা রফা হয় ( যেমন তিনি কাঠিয়া প্রথা, এক বিঘার তিন কাঠায় নীল চাষ করা ) তাতে চাষী এবং নীলকর উভয়েই ভাল লাভ করতে থাকে। এই ভাবেই চম্পারন অঞ্চলে, নীল চাষকে কেন্দ্রকরে এক সমৃদ্ধ কৃষক শ্রেনীর উদ্ভব হয়।  প্রায় ৯০০,০০০ একর জমিতে নীলের চাষ হত। 
১৮৭৭-১৯০৭ সাল - তিন দশক  চম্পারন সুখেই কাটিয়েছে। যদ্দিন আন্তর্জাতিক বাজারে নীলের দাম ছিল চড়া।  জার্মানীতে রাসায়নিক নীল আবিস্কৃত হলে আন্তর্জাতিক মার্কেটে নীলের চাহিদা নষ্ট হয়।  ফলে নীলকর সাহেবরা তাদের লস, চাষীদের ওপর চালাতে চাইলেন।  চম্পারনের কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। নীলকর সাহেব ব্লমফিল্ডকে হত্যা করে রায়তরা।  এই বিদ্রোহ যথেষ্ট সংগঠিত ।  প্রায় দুশোর ওপর কৃষককে গ্রেফতার করা হয়। তাদের ছাড়াতে সমস্ত আইনি সহযোগিতা দেওয়া হত চাঁদা তুলে। "গান্ধী" আসার অনেক আগেই ( প্রায় দশ বছর)  চম্পারনের কৃষকরা  সহিংস অসহযোগ হাতে করে দেখিয়েছে।  নীলকরদের অন্যায় দাবী তারা মানেন নি।  এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন দুই কৃষক-  শীতল রায় এবং শেখ গুলাব। হিন্দু মুসলমান সব কৃষকই অংশ নিয়েছেন-কারন ইহা বঙ্গভঙ্গের ন্যায় কোলকাতার বাবুদের সৌখিন আন্দোলন ছিল না। এছিল  কৃষকদের বাঁচার লড়াই।  গ্রামে গ্রামে কমিটি গঠন করে সমগ্র আন্দোলনের একটা সেন্ট্রাল কমিটি তৈরী হয়।

  ১৯১০ সালে বৃটিশ সরকার,  চম্পারনের   কৃষকদের দাবী মেনে  এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি  গর্লে সাহেবের নেতৃত্বে একটি কমিশন বসান। কমিশন কৃষকদের দাবী মেনে তিন কাঠিয়া প্রথাকে দু কাঠিয়া প্রথায় নিয়ে আসে। এছাড়াও আরো অনেক রক্ষাকবচ দেওয়া হয় নীলকরদের বিরুদ্ধে।  এসব হয়েছে শীতল রায় এবং শেখ গুলাবের নেতৃত্বে চাষীদের অসহযোগ আন্দোলনের জন্য।  তখনো কংগ্রেস বা গান্ধীর কোন টিকি নেই!

 মুশকিল হচ্ছে আন্তর্জাতিক মার্কেটে নীলের দাম কমতেই থাকে। ফলে গর্লে কমিশন, তিন কাঠিয়া থেকে  সাময়িক স্বস্তি দিলেও, নীলকর সাহেবরা পালটা চাল দিচ্ছিলেন। পুরো লস তোলা সম্ভব না দেখে, তারা আংশিক ভাবে লস মেটানোর জন্য নতুন দুই ধরনের কনট্রাক্ট চালু করেন- তাওয়ান এবং সরাবেশী। এবার কৃষকরা বিদ্রোহ করে এবং বৃটিশ সরকার যে এ সুইনির নেতৃত্বে একটি কমিশন বসান কৃষকদের দাবি দাওয়া অভিযোগ খাতিয়ে দেখতে (১৯১৩-১৭)।  মহত্মা গান্ধী এবং কংগ্রেসের নেতৃত্ব ছাড়া, তারা নিজেরা যথেষ্ট সংগঠিত ভাবেই অসহযোগ আন্দোলন করছিলেন এবং বৃটিশদের দুটি কমিশন বসাতে বাধ্য করেছেন। 
  
 ১৯১২ সালে বিহার, বাংলা থেকে ভেঙে আলাদা প্রদেশ হিসাবে তৈরী হয়। বিহার প্রদেশ কংগ্রেসে, চম্পারনে কৃষক বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত প্রথম শোনান ব্রজ কিশোর প্রসাদ। ১৯১৫ সালে কংগ্রেসের জাতীয়  অধিবেশনে  ( চাপড়া) এই ইস্যু তুল্লেন রাজ কুমার শুক্লা - যিনি নিজেই চম্পারনের একজন কৃষক নেতা।  লখনৌ অধিবেশনে গান্ধীজিকে চম্পারনে আসার আমন্ত্রন জানান শুক্লা। গান্ধী প্রথমেই আসতেই চান নি! পরে রাজী হৌন। 

 চম্পারনের কৃষক আন্দোলন দশ বছরের পরিণত আন্দোলন।  গান্ধীজি চম্পারনে এসে আন্দোলনে নতুন কি করলেন আমি এখনো বুঝে উঠতে পারি নি!  স্থানীয় কৃষকরা যথেষ্ঠ সংগঠিত ভাবে অসহযোগ আন্দোলন চালাচ্ছিল  এবং তাদের জন্য বৃটিশরা দুবার কমিশন বসিয়েছে!   গান্ধী বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে যা দাবী আদায় করেছেন, তা এমন কিছু না- যা চম্পারনের কৃষক নেতারা নিজেরা তা পারতেন না। বা তাদের নেতৃত্বের কোন দরকার ছিল!

  কিন্ত কংগ্রেসের দরকার ছিল  ন্যাশানাল স্কেলে চম্পারন কৃষক আন্দলনকে হাইজ্যাক করে, গান্ধীকে  জাতীয় আধ্যাত্মিক নেতা হিসাবে বসানো।  গান্ধী চম্পারনে এসে স্কুল খুললেন, অসস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন, মেয়েদের আন্দোলনে টেনে নিলেন।  এসব গান্ধীকে জাতীয় নেতা বানানোর মাল মশালা। কিন্ত বাস্তবটা কি?
  নীলের যখন দাম ছিল, চম্পারনের কৃষকরা যথেষ্টই সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এবং চম্পারন জেলায় কৃষকদের শিক্ষার হার ভারতের অন্যান্য  জেলার থেকে ওপরের দিকেই।  চম্পারনের মেয়েরা বহুদিন থেকেই কৃষক বিদ্রোহে শক্ত ঘাঁটি। বাড়ির মেয়েদের সহযোগিতা ছাড়াই দশ বছর ধরে চম্পারনের কৃষকরা নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়েছে? 

বেসিক্যালি এই সব স্কুল স্থাপন, অস্পৃশ্যতা বিরোধি আন্দোলন, নারী প্রগতি গান্ধী " স্টোরি লাইনে" যুক্ত করেন। যাতে সমগ্র ভারতের সাংবাদিকরা "বেশ একটা অন্য ধরনের আন্দোলনের " স্বীকৃতি দেয়। কারন শুধু অসহযোগ আন্দোলন এখানে খেত না।   এখানকার কৃষকরা বহুদিন থেকেই অসহযোগ আন্দোলন করছে। সফল ও হয়েছে।  গান্ধীর  রাবার স্টাম্প তাদের দরকার হয় নি। 
 কিন্ত আরো একটা গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার গান্ধীর জীবনীকাররা এড়িয়ে গেছেন। এই চম্পারনে থাকার সময় দলে দলে কৃষকরা তার কাছে আসত। শুধু বসে থাকত গান্ধীর মুখ পানে চেয়ে।  গান্ধী যত না রাজনৈতিক তার থেকে আধ্যাত্মিক আলোচনা করতেন বেশী।  রাজনৈতিক নেতা হিসাবে না, আধ্যাত্মিক মুক্তির গুরু হিসাবেই তাকে দেখেছে চম্পারনের কৃষকরা। যেখানে তিনি এই রাজনৈতিক আন্দোলনকে সবার জন্য আধ্যাত্মিক মুক্তির ( স্যালভেশন ) পথ হিসাবে দেখালেন! 
 রাজনৈতিক নেতা ব্যাপারটা আসলে আপামর ভারতীয়দের কাছে "ওয়েস্টার্ন" কনসেপ্ট। ভারত ধর্মের দেশ। এখানে লোকেরা রাজনৈতিক নেতা না গুরুদেবে বিশ্বাস রাখে বেশী। গান্ধীও সেটাই বুঝলেন। ভারতের সুপ্রীম নেতা হতে গেলে, রাজনৈতিক আন্দোলনকে প্রতিটা ব্যক্তির ধর্মের সাথে, তার স্যালভেশন বা মুক্তির সাথে জুড়তে হবে।
 তিনি সফল হলেন ঠিকই। কিন্ত ভারত ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসাবে ব্যর্থ হল।  চম্পারনের অসহযোগ আন্দোলনকে রাজনৈতিক থেকে আধ্যাত্মিক পথে টেনে দ্বিজাতি তত্ত্বের মালিকদের অক্সিজেন জোগালেন। কারন তিনি আসার আগে কৃষক নেতা শেখ গুলাব এবং শীতল রায় একই সাথে বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছে।  এই প্রতিবাদি রাজনীতির মধ্যে ধর্মের আফিং খাইয়ে, তিনি শেখ গুলাবের ক্ষেত্রটাকে ছোট করে দিলেন!  যে ভুল বুঝতে পেরে তিনি, মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেবেন!  মানে একটা ভুল ঢাকতে আরো বড় ভুল করবেন গান্ধী। 
পরের অধ্যায়ে, তাই সম্পূর্ন ভাবেই গান্ধী নিয়ে আলোচনা করব। 
 কারন চম্পারনের ইতিহাসে পরিস্কার, কৃষক বিদ্রোহ বৃটিশ রাজত্বে আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। বৃটিশ আইনের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় আইনজীবিরা কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।  বৃটিশ সরকার  কৃষকদের কথা শুনতে একাধিক কমিশন ও বসিয়েছে।  এসব কিছুই হয়েছে কংগ্রেস এবং গান্ধী ছাড়া। হিন্দু -মুসলমান একসাথে জমিদার-নীলকরদের সাথে লড়েছে।  কোথায় তখন পাকিস্তান বা দ্বিজাতি তত্ত্ব?
কিন্ত এই বিশুদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে ধর্মের মদ ঢেলে, গান্ধী দেশব্যাপী বৃটিশ বিরোধি আন্দোলনকে জনপ্রিয় করলেন ঠিকই -কিন্ত একই সাথে পাকিস্তানের পথও চওড়া করে খুলে দিলেন!
  
  










   




  







  
  

  


 



















 

   
 

                                     











Friday, December 27, 2019

দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং দেশভাগ ৪- চার্চিল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি

মেইন ক্যাম্প গ্রন্থে হিটলার লিখছেন, ইতিহাস পড়া মানে, কিছু তারিখ, যুদ্ধ, ঘটনা, রাজার নাম জানা না। ইতিহাস একটি অনুসন্ধান। যেখানে ঘটনাটা গুরুত্বপূর্ন না। যে ঘটনা ঘটে গেল, পৃথিবীটা, আমাদের ঘর সংসার ওলটপালট করে দিল- তার পেছনের "শক্তি" টাকে আবিস্কার করা ইতিহাস পঠনের মূল কাজ। 

 এই সিরিজে সেটাই আমার কাজ। ঘটনা গুলো আসল না।   ওগুলো ঘটানো হয়েছে সুনিপুন পরিকল্পনায়।  দেশভাগের ঘটনা গুলো, তার তারিখ, তার যন্ত্রনা আমরা সবাই জানি। ওই পর্দার পেছনে আসল খেলাটা- সেই অশুভ শক্তি এবং তাদের দেশী এজেন্টদের খোঁজার চেষ্টা করছি। 

 চার্চিল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি কিভাবে মুসলীম লীগের পাকিস্তানের দাবীকে রাজনৈতিক বাস্তবতা দিল  -সেটা বুঝতে আমাদের চারটি সমান্তরাল ঘটনা বুঝতে হবে

   (১) আমেরিকাতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর হাতে নাকানি চোবানি খাবার পর চার্চিল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে নতজানু।  তখনো আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় নি।  ফলশ্রুতি আটলান্টিক চার্টার ( আগস্ট ১৯৪১) । যেখানে আমেরিকা বৃটেনকে এক রকম জোর করে স্বীকার করাবে বৃটেনের চল্লিশটি কলোনির স্বাধীনতার প্রশ্নে।  এর চার মাসে বাদেই,  জাপান পার্ল হার্বার ঘটানোর পর,  আমেরিকার কাছে ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নটি আমেরিকান বিদেশনীতির সব থেকে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু হয়ে ওঠে।  আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট , বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে নানান ভাবে চাপ দেওয়া শুরু করেন ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নের মিমাংসার জন্য। ক্রিপস মিশন মূলত রুজভেল্টের চাপেই চার্চিল পাঠাতে বাধ্য হোন । চার্চিল  ক্রিপস মিশনের পেছনে ছুড়ি মারেন। কিন্ত ব্যাটল অব মিড ওয়েতে আমেরিকার বিরাট নৌবিজয়ের পরে, ভারতের স্বাধীনতার গুরুত্ব আমেরিকার কাছে কমতে থাকে।  ভারত নিয়ে চার্চিলের ওপর আমেরিকান চাপ,  আস্তে আস্তে হাল্কা হয়। ফলে পাকিস্তান নিয়ে চার্চিল নিজের নক্সা বাস্তবায়নের সুযোগ পান।

  (২) চার্চিলের সাথে মুসলীম লীগের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাসটি পাকিস্তানের জন্মের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন।  মুসলীম লীগের লন্ডন শাখার মেম্বারদের সাথে চার্চিলের সখ্যতা এবং চার্চিলের ব্যক্তিগত জীবনে মুসলমানদের প্রতি দুর্বলতা, আস্তে আস্তে পাকিস্তান সৃষ্টীর কারন হয়ে দাঁড়ায়।  আফ্রিকাতে দুই ভারতীয় মুসলমান সৈনিক নিজেদের প্রানের বিনিময়ে চার্চিলকে বাঁচিয়েছিল। চার্চিল  মনে করতেন ভারতে "আশরাফি" মুসলমানরাই ( যারা তুর্কী পারস্য থেকে ভারতে এসেছিল ) আসলে রাজার জাত-অভিজাত লোক।  কংগ্রেসের গান্ধী, নেহেরু, হিন্দুয়ানীকে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। প্রকাশ্যেই গালাগাল দিয়েছেন হিন্দু ধর্ম এবং তার প্রতিনিধি কংগ্রেসদের বিরুদ্ধে।  উনি নিজে ছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের সব থেকে বড় সমর্থক। প্রকাশ্যেই বলেছেন, রুজভেল্টকেও লিখেছেন, ভারতের মুসলমাদের ভবিষ্যত হিন্দু কংগ্রেসের হাতে সুরক্ষিত না। ইনফ্যাক্ট  দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং পাকিস্তান নিয়ে চার্চিলের ভাষার সাথে জিন্নার ভাষার কোন পার্থক্য ছিল না!

 (৩) নেহেরুর অন্ধ আমেরিকান বিদ্বেশ দেশভাগের জন্য অনেকটাই দায়ী। ১৯০০-১৯৪০। এই সময়টাতে আমেরিকা ছলে বলে কৌশলে ল্যাটিন এবং সেন্ট্রাল আমেরিকার সব দেশেই প্রাধান্য বিস্তারের জন্য কাঠি করেছে।   নেহেরু ছিলেন আদর্শবাদি।  নিজেকে এন্টিকলোনিয়াল যুদ্ধের হিরো বলে মনে করতেন।  তার কাছে বৃটেন, আমেরিকা-সব সমান। সাম্রাজ্যবাদি শক্তি। অন্যদিকে স্তালিনের পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনা এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল সর্বজন বিদিত।  ফলে ১৯৪৩ সালে, যখন জাপান এবং জার্মানী পিছু হটছে।  তাদের পরাজয় সময়ের অপেক্ষা মাত্র।  স্টালিন এবং চার্চিল পৃথিবীর ম্যাপকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন "স্পেয়ার অব ইনফ্লুয়েন্স" বা কে সোভিয়েত ব্লক আর কে ওয়েস্টার্ন ব্লকে থাকবে-তখন নেহেরুর এই  কঠোর  আমেরিকা বিরোধি অবস্থানের জন্য , চার্চিল রুজভেল্টকে বোঝাতে সমর্থ হোন স্ট্রাটেজিক কারনে   "আমেরিকান-বৃটীশ" প্রতি অনুগত  পাকিস্তান সৃষ্টির দরকার।  পাকিস্তান,  আফগানিস্তান এবং সেন্ট্রাল সোভিয়েত প্রভিন্সগুলোর কাছে।  স্ট্রাটেজিক্যালি এটা এমন এক ভূখন্ড যা দিয়ে দক্ষিন দিক দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ানকে ঘেরা যায়।   চীনে তখন কমিনিউস্ট না কুয়োমিংটান- কারা জিতবে কেউ জানে না।  নেহেরুর অখন্ড ভারত যে আমেরিকা-বৃটেনের বিরুদ্ধে যাবে সেটা পাক্কা। জিন্না এবং লীগের নেতারা জন্মলগ্ন থেকেই চার্চিল এবং বৃটেনের রক্ষনশীল পার্টির বফাদার কুত্তা। সুতরাং মুসলীম লীগের পাকিস্তানকে আমেরিকা এবং বৃটেনের খুবই দরকার ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর বিশ্বে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে। চার্চিলের হিসাব নিকেশ যে আমেরিকার স্বার্থের জন্য যে ভুল ছিল না- সেটা সময়ই বলে দিয়েছে।  পাকিস্তান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে সব থেকে বড় আমেরিকান ঘাঁটি। শুধু তাই না- কেউ যদি জিন্নার ১৪ই আগস্টের  স্বাধীনতার ভাষন ইউটিউবে দেখে থাকেন- তাহলে খুব অদ্ভুত জিনিস দেখবেন। জিন্না খুল্লাম খুল্লা ভাবে দ্যর্থহীন ভাষায় জানাচ্ছেন পাকিস্তান বৃটেন এবং আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্র হিসাবে কাজ করবে!  জিন্নার চার্চিল ঘনিষ্ঠতা , চার্চিলের নেহেরু বিদ্বেশ এবং নেহেরুর আমেরিকা বিদ্বেশ- এই তিনটিই দেশভাগের জন্য ক্যাটালিস্টের কাজ করেছে!

 (৪) চীনে কমিনিউস্ট পার্টির সাফল্য।  কুয়োমিংটাং- চৈনিক জাতিয়তাবাদি শক্তি, যা ছিল বৃটেন আমেরিকার বন্ধু তারা সিপিসি বা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে গৃহযুদ্ধে ক্রমাগত হারতে থাকে। এর ফলে পাকিস্তান এবং কাশ্মীরের গিলগিটিস্থান -স্ট্রাটেজিকালি খুব গুরুত্বপূর্ন হয়ে ওঠে। চীনে যদি জাতিয়তাবাদি চিয়াং কাইসেক জিততেন, তাহলে আবার পাকিস্তানের দরকার হত না আমেরিকার।  কারন সেক্ষেত্রে দক্ষিন দিক দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ানকে ঘেরা যেত। কিন্ত চীনের মাঞ্চুরিয়াতে সোভিয়েত বাহিনী ঢুকে জাপানকে হারিয়ে, সেই অঞ্চল সিপিসির হাতে তুলে দিতেই, বৃটিশ-আমেরিকান বুঝতে পারে, চীনে তাদের ভবিষ্যত  দোদুল্যমান। ফলে পাকিস্তান, আফগানিস্থান, গিলগিটিস্থান আমেরিকা-বৃটিশদের কাছে অসম্ভব স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে - কারন দক্ষিন দিক থেকে সোভিয়েত বিরোধি কোন মিলিটারি "পুশের" দরকার হলে, সেটাই একমাত্র রাস্তা!

 মোটামুটি চার্চিলের নির্দেশে বৃটিশরা যে পন্থা নিল পাকিস্তান বানাতে

  (১) কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টের অজুহাতে সব কংগ্রেস নেতাকে জেলে পুরে দিয়ে হওয়া হল -যাতে পরে থাকে লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দু মহাসভা এবং স্থানীয় আঞ্চলিক মুসলমান পার্টিগুলো।
  (২) ইউনিয়ানিস্ট পার্টি, কেপিপি, সিন্ধের ইউনিয়ানিস্ট পার্টি- ইত্যাদি মুসলিম পার্টিগুলি যারা লীগ এবং কংগ্রেসের দুই এরই  বিরোধি ছিল- এদের নেতাদের কাছে দুটো অপশন দিল বৃটিশরা। হয় লীগের পথে এস। লীগের সাথে হাত মেলাও। না হলে জেলে।
  (৩) নর্থ ইস্টার্ন প্রভিন্সের পাঠান আবদুল গফফুর খান তীব্র লীগ বিরোধি এবং কংগ্রেস প্রেমী। তার ক্ষেত্রে দাওয়াই হল আরো কড়া। শুধু জেল না। বৃটিশ ইন্টেলিজেন্স প্রচুর টাকা ছড়ালো খান বা লোক্যাল ট্রাইবাল সর্দারদের লীগের পক্ষে কিনে নিতে।
 (৪) কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ১৯৩৭-৪১, জিন্না এবং লীগের বিরোধিতা করেছে। কিন্ত যেই জার্মানি সোভিয়েত আক্রমন করে, বৃটিশ-সোভিয়েত যৌথ সহযোগিতা শুরু হয়- সোভিয়েতের নির্দেশ ভারতের কমিনিউস্টরা ( সিপিয়াই), সম্পূর্ন ভাবে চার্চিলের দ্বিতীয় বফাদার কুত্তায় পরিনত হয়। তারা কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টে কংগ্রেসের বিরোধিতা করে।  নেতাজির আই এন এর বিরোধিতা করে। এবং লীগের সাথে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানের দাবী তোলে। এসব কিছুই তারা করেছে বৃটেনের নির্দেশে। যেহেতু স্টালিন, ভারতের কমিউনিস্টদের মিত্র বৃটেনের প্রতি বিস্বস্ত থাকতে নির্দেশ দেন।
 (৫) হিন্দু মহাসভার না ছিল নেতা, না জন সমর্থন। তারা লীগের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলা, সিন্ধ এবং নর্থ ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সে ক্ষমতায় গেল।  তারা সিন্ধে লিগের পাকিস্তান প্রস্তাব পাশের বিরোধিতা করেছে। কিন্ত ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সাপোর্ট তারা পায় নি। হিন্দুরা অন্ধভাবে কংগ্রেসকেই বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস করেছে একমাত্র কংগ্রেসই তাদের ঐক্যবদ্ধ অখন্ড ভারত দিতে পারে। কিন্ত   সম্পূর্ন ভাবে জন বিচ্ছিন্ন হওয়াতে, হিন্দুত্ববাদি নেতারা হিন্দু জনগোষ্ঠিকে লীগের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারে নি।  আর গান্ধী এবং নেহেরু - না রাজনৈতিক না মিলিটারি- কোন ভাবেই লীগের মোকাবিলা করার জন্য কোন কাউন্টার  স্ট্রাটেজিই ভাবেন নি। অসহায় ভাবে লীগের কাছে আত্মসমর্পন করেছেন।

                                   (১)
  ১৯৩৭ সালে আমেরিকাতে ভারত নিয়ে কি ভাবনা ছিল?

   মনে রাখতে হবে, আমেরিকাও বৃটিশ কলোনির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়ে স্বাধীন হয়ছে। আমেরিকার জনগন ও আজো " ব্লাডি রেডকোর্ট" বলে বৃটিশ কলোনিস্টদের গালাগাল দেয়। ভারতের বাইরে যে দেশে ভারতীয় বিপ্লবী এবং স্বাধীনতাপ্রেমীরা সব থেকে বেশী নিরাপদে কাজ করেছে, সেই দেশটা আমেরিকা।  কারন এদেশে বৃটিশ কলোনিস্টদের বিরুদ্ধে জনমত আগে থেকেই আছে।

  আমেরিকাতে ভারতী বিপ্লবী গদর পার্টির ইতিহাস আমরা সবাই জানি।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে আমেরিকার ক্যালফোর্নিয়া প্রদেশে পাঞ্জাবীদের একটা সংঘটন ছিল- প্যাসিফিক হিন্দুস্থানী সংগঠন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের দশ বছর ধরে, ভারতে বিপ্লব সংগঠনের জন্য টাকা এবং অস্ত্রের জোগান দিতে অনেক বিপ্লবী আমেরিকাতে আসেন এই সময়।  প্যাসিফিক হিন্দুস্থানী সংগঠন এদের আশ্রয় দাতা। এই ভাবেই আমেরিকাতে গিয়েছিলেন তারকনাথ দাশ, এম এন রায় , রাশ বিহারী বোস। বোস স্পিকার খ্যাত অমর বোসের বাবা নলিনী বোস।  অন্যদিকে পাঞ্জাব থেকে এলেন, লালা লাজপত রায়।

 প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশ যুদ্ধে ব্যস্ত। জার্মানী ভারতের বিপ্লবীদের আর্মস দিতে প্রস্তুত। এই সুযোগ কাজে লাগাতে গদর বিপ্লবীরা জার্মানীর সাহায্যে ভারতে অস্ত্র আনার পরিকল্পনা করেন।

 কিন্ত জার্মানদের সাথে হাত মেলানোতে হিতে বিপরীত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা জার্মানীর বিরুদ্ধে লড়ছে। সেই অবস্থায় আমেরিকান ভারতীয়রা জার্মানীর সাথে হাত মেলানোর ফল কি হবে সহজেই অনুমেয়। গদর পার্টির সব বিপ্লবীদের আমেরিকা গ্রেফতার করে (১৯১৭)। শুরু হয়  বিখ্যাত হিন্দু-জার্মান চক্রান্ত ট্রায়াল।  বৃটিশরা চেয়েছিল এসব বিপ্লবীদের যেন ভারতের পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্ত আমি আগেই লিখেছি,  আমেরিকান জনগন ভারতীয় বিপ্লবীদের সমর্থনে ছিল। ফলে আমেরিকা বৃটেনের কথা শোনে নি। গদর পার্টির নেতাদের হাল্কা দু-এক বছরের জেল দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল।

 কিন্ত আমেরিকাতে ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন থামল না।  ইন্ডিয়া লীগ অব আমেরিকা এবং ফ্রেইন্ডস অব ইন্ডিয়ান ফ্রিডম বলে দুটি রাজনৈতিক সংস্থা, আমেরিকাতে ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে প্রবল প্রচার চালাতে থাকে।

 ১৯৩৭ সাল নাগাদ আমেরিকাতে প্রায় সব গণ্যমান্য লেখক বিজ্ঞানীরা ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে নানান কাগজে লিখছেন।  চাঁদা দিচ্ছেন। স্বয়ং আইন স্টাইন  ইন্ডিয়া লীগ অব আমেরিকার এডভাইসরি কমিটিতে ছিলেন।   তিনি আমেরিকাতে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ভাষন দিয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যে আমেরিকার প্রায় সব বিখ্যাত বুদ্ধিজীবিরা   ভারতের স্বাধীনতার দাবীতে আমেরিকান মিডিয়াতে সরব।   প্রেসিডেন্ট   রুজভেল্ট    স্বয়ং ভারতের স্বাধীনতার পক্ষেই সওয়াল করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুরু হওয়ার অনেকদিন আগে থেকেই। 

 আর এই অসম্ভবকে একহাতে সম্ভব করেছিলেন এক পাঞ্চাব তনয়। নিউ ইয়ার্কের জেজে সিংহ।  ইন্ডিয়া লীগ ওব আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা।

আরো দুটো গুরুত্বপূর্ন দিক উল্লেখ করি।

 আমেরিকাতে ভারতের বিপ্লবীদের আরেক উজ্জ্বল কীর্তি, তাদের আন্দোলনের সাথে আমেরিকার  সিভিল রাইট মুভমেন্ট এবং নারীবাদি মুভমেন্টের নেতা নেত্রীদের ডিরেক্ট ইনভলভমেন্ট। গদর পার্টির নেতা তারক নাথ দাশ বিয়ে করেছিলেন মেরী কিটিংস মর্সকে।  মেরী কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান মহিলাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে উজ্বল চরিত্র।  ন্যাশানাল এসোশিয়েসন ফর এডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপল, বা সংক্ষেপে  নাকাপের প্রতিষ্ঠাতা মেম্বার। নাকাপ হচ্ছে আমেরিকার সিভিল রাইট মুভমেন্টের পুরোধা দল।

 দ্বিতীয় দিক হচ্ছে এইসব বিপ্লবীদের বীজ কিন্ত অনুশীলন সমিতি থেকে।  অর্থাৎ গীতার হিন্দু নিহিলিজম এদের আধার।   ইনারা বিপ্লবী, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নারীমুক্তিএবং সিভিল রাইটের জন্য আমেরিকাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। কিন্ত বিবেকানন্দ অরবিন্দের রিভাইভালিস্ট হিন্দুত্বের সাথে আধুনিকতার বিরোধ পান নি। শেষ দিন পর্যন্ত একহাতে বিবেকানন্দ অন্য দিকে বিপ্লবী আদর্শে কাজ করেছেন। এরা সবাই মুসলিম লীগ, ইসলামের সাম্প্রদায়িকতা  এবং পাকিস্তানের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। লীগের কাছে মাথা নোয়ানোর জন্য নেহেরু এবং  কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেছেন তারক নাথ দাশ। খুব সম্ভবত এইসব কারনে ইনাদের কথা ভারতের ইতিহাস বইতে খুব একটা দেখা যায় না। কংগ্রেসের পক্ষে সুবিধাজনক হবে না।

ইন্ডিপেন্ডেস লীগের সভাপতি জেজে সিং এর কথা ভারতের ইতিহাস ভুলে গেছে। বা কংগ্রেসের বফাদার ঐতিহাসিকদের লেখা ইতিহাস উনার অবদান স্বীকার করে নি। কিন্ত এদের কঠোর পরিশ্রমের জন্যই আমেরিকান এডমিনিস্ট্রেশনে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে অনেক লোকজন ছিল।  যার জন্য ১৯৪১ সালে আটলান্টিক চার্টারে ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট চার্চিলকে চাপ দেওয়া শুরু করবেন।  যেটা ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সব থেকে গ্রুত্বপূর্ন মাইল ফলক। কারন গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ভাংতে বৃটিশদের দুই সপ্তাহ লাগত। কিন্ত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যখন চাপ দিচ্ছেন - যে আমেরিকার সাহায্য ছাড়া বৃটেন আর এক সপ্তাহও জার্মানীর সাথে যুদ্ধে টিকতে অসমর্থ, সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই কিন্ত চার্চিল  ক্রিপস মিশন ভারতের পাঠালেন ( ১৯৪২)।  আর সেই আমেরিকান চাপ ঠেকাতে  জিন্নাকে মাঠে নামালেন চার্চিল। কিভাবে এবং কেন। লিখছি।

 এবার আসি আটলান্টিক চার্টারের ইতিহাসে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর-  ভারত সহ ৪০ টি বৃটিশ কলোনীর স্বাধীনতা যে নিশ্চিত, তা এই চার্টারেই স্বীকার করা হয়।  চার্চিলের মতন সাম্রাজ্যবাদি কি  এতটা মানতে রাজি ছিলেন? একদমই না। তবে কিনা বৃটেনের তখন মাজা ভাঙা। ফলে  রুজভেল্ট তাকে জোর  করে রাজী করালেন। আবার এটাও দেখব ১৯৪৩ এর পর-জার্মান এবং জাপানের সাথে যুদ্ধ জয় যখন নিশ্চিত- আস্তে আস্তে রুজভেল্ট ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে ইন্টারেস্ট হারাবেন। বরং  ১৯৪৩ এর পর থেকে তিনি চার্চিলের সাথেই "এলাইন্ড"। কারন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে সোভিয়েত কমিনিউস্টদের আটকাতে " স্পেয়ার অব ইনফ্লুয়েন্স" আমেরিকার কাছে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে।  মোটামুটি ভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে  প্যাসিফিক থিয়েটারের  ইতিহাসের সাথে ভারতের ভাগ্যও দুলতে থাকে।

 ১৯৩৯ সাল থেকে চার্চিল রুজভেল্টকে লিখে যাচ্ছেন যুদ্ধে বৃটেনের পাশে দাঁড়াতে। কিন্ত আমেরিকান পাবলিক বৃটেনের যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চায়।  ভারতের স্বাধীনতাকামি বিপ্লবীরা তখন আমেরিকার মিডিয়াকে বোঝাতে পেরেছে, এটা বৃটিশদের কলোনি টেকানোর যুদ্ধ। আমেরিকানরা  বৃটিশ কলোনিয়ালিস্টদের ঘৃণা করে।  তারা কেন যুদ্ধে যাবে বৃটেনের কলোনি  বাঁচাতে? চার্চিল রুজভেল্টকে লিখেই চলেছেন-কিন্ত রুজভেল্ট জনমত অগ্রাহ্য করে আমেরিকাকে যুদ্ধে জড়াবেন না। সাফ কথা!

  কিন্ত হিটলার  চালে মারাত্মক ভুল করলেন। যা তার এবং বিশ্ব ইতিহাস ঘুরিয়ে দেয়। যুদ্ধে না জড়ালে কি হবে- আমেরিকা কিন্ত বৃটেনকে খাদ্য, যুদ্ধাস্ত্র সাপ্লাই দিয়েই যাচ্ছে আটলান্টিক দিয়ে। সেই সাপ্লাই লাইন আটকাতে হিটলারের ইউ বোট, শয়ে শয়ে বৃটিশ জাহাজ ডোবাচ্ছে। হিটলারের নির্দেশ ছিল, কোন আমেরিকান জাহাজ আক্রমন না করার। কারন উনিও জানতেন আমেরিকা বৃটেনের পাশে দাঁড়ালে তার কোন চান্স নেই।  হিটলার কিন্ত রুজভেল্টের কাছে পৌছানোর চেষ্টা করলেন না।  ফোর্ড থেকে অনেক আমেরিকান কোম্পানীই জার্মানীতে ব্যবসা করত। আমেরিকার কাছে বানিজ্যের আশ্বাস দিলে, যুদ্ধের ইতিহাস কি হত, বলা যায় না।  নেহেরুর মতন হিটলার ও অন্ধ আমেরিকা এবং আমেরিকান ক্যাপিটালিজম বিরোধি এক ব্যক্তিত্ব।  ফলে চার্চিলের সুবিধা ।

১৯৪১ এর আগস্ট।   লন্ডনের আকাশে তখন ব্যাটল অব বৃটেন সবে থেমেছে। লন্ডন বিদ্ধস্ত। ইংল্যান্ড লড়েছে। কিন্ত ধুঁকছে।  রুজভেল্ট  দেখলেন এবার বৃটেনের জন্য কিছু না করলে, জার্মানীর হাতে ইংল্যান্ডের পতন হতে পারে।  কারন ২২শে জুন সোভিয়েত ইউনিয়ান আক্রমন করেছে জার্মানী। মাত্র দুমাসে মস্কোর কাছাকাছি পৌছে গেছে । সোভিয়েতের পতন আসন্ন। গোটা সোভিয়েতের তেল এবং লোহা, হিটলারের কাছে চলে এলে, জার্মানরা হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য।

 এবার চার্চিলের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন রুজভেল্ট। কিন্ত এটাও জানালেন, আমেরিকার জনমত বৃটেনের কলোনিগুলোর স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা পোলান্ডের স্বাধীনতার জন্য জার্মান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ব- আর ভারতে বৃটিশরাজকে সমর্থন করব- আমেরিকান জনগনকে এমন উল্লু বানানোর ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনটাই তার নেই! ৯ই আগস্ট (১৯৪১) উত্তর আটলান্টিকের প্যাসেন্টিয়া বেতে আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজ ইউ এস এস অগাস্টাতে দুজনের দেখা হল।

  চার্চিল তার স্বভাবমর্জিত ভঙ্গিতে, রুজভেল্টকে বল্লেন ' এট লং লাস্ট মিঃ প্রেসিডেন্ট!"

 রুজভেল্ট চার্চিলকে বোঝালেন, বস- আমেরিকান লোকেরা তোমার বৃটেনের ৪০ টা কলোনী টেকানোর যুদ্ধে নেই। আমেরিকান জনগনকে যুদ্ধটা খাওয়াতে গেলে এই কলোনিগুলোর স্বাধীনতা ঘোষনা করতেই হবে। যাতে আমেরিকান এবং সমস্ত কলোনিয়াল জনগনের সমর্থন পাওয়া যায় । নইলে এর মধ্যে আমি নেই!

চার্চিল মানতে চান নি। এটা ছিল চার্টারের তিন নাম্বার পয়েন্ট। শেষ মেশ  একটা রফা হয়। চার্টারের তিন নাম্বার পয়েন্ট এভাবে লেখা হল " All People have right to self-determination"  । ১৪ ই আগস্ট এটা গোটা বিশ্বকে জানানো হয়।

    এবার চার্টারের তিন নাম্বার পয়েন্ট নিয়ে প্রচুর নাটক। লন্ডনে ফিরে চার্চিল জানালেন, এর মানে এই যে ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলিকে জার্মানির কবল থেকে উদ্ধার করা হবে। আর আপাতত এশিয়াতে বৃটেনের কলোনীগুলোর কথা যুদ্ধের পর ভাবা যাবে!

  রুজভেল্ট এদিকে আমেরিকান মিডিয়াকে জানিয়ে দিয়েছেন, চার্টারের ঘোষনায় চার্চিলের বৃটেন তার ৪০ টি কলোনি ছেড়ে দেবে।   চার্চিলের ডিগবাজিতে প্রেসিডেন্টের প্রেস্টিজ পুরো পাংচার।   চার্চিল এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবেন রুজভেল্ট ভাবেন নি। আমেরিকান নাগরিকদের এখন কি উত্তর দেবেন রুজভেল্ট?

ফলে আমেরিকা যুদ্ধে জড়াবে কি না, সেই প্রশ্ন ঝুলে গেল!

 কিন্ত ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের সাত তারিখ সকালে জাপান , পার্ল হার্বার আক্রমন করে বসে। দুহাজার আমেরিকান মৃত ।  তিন ঘন্টায়  তিনটে তীব্র বিমান হানা। ফলে আমেরিকা যুদ্ধে যোগ দেয় পরের দিন। বৃটেনও যুদ্ধ ঘোষনা করে জাপানের বিরুদ্ধে।

 যুদ্ধে নেমেই আমেরিকা বোঝে- তারা তৈরী না। জাপান দ্রুত গতিতে মাত্র ছমাসে ( ১৯৪২ এর প্রথম ছমাস)  কোরিয়া , ভিয়েতনাম,  ফিলিপিন্স সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া - সব কিছু দখল করে ভারত দখল করতে এগিয়ে যাচ্ছে।  বৃটিশ এম্পায়ারের পাছার কাপড় খুলে গেছে। তারা জাপানের বিরুদ্ধে নুন্যতম প্রতিরোধেও অক্ষম। এদিকে আমেরিকান যুদ্ধজাহাজের প্লেন গুলোও প্রযুক্তিতে জাপানের থেকে অনেক পিছিয়ে।  বৃটিশ ক্যারিয়ার প্রিন্স অব ওয়েলেস মাত্র এক ঘন্টায় মালয় সাগরে  ডুবিয়ে দিল জাপানিরা।  চার্চিল এই খবর শুনে ভিরমি খান। এই বুঝি বৃটেনের সব কলোনি জাপান দখল করে নেয়! 

 তখন জাপান আর বৃটেনের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধু ভারত! বৃটেন সমস্ত শক্তি নিয়ে ভারতে "ফল ব্যাক" করছে। জাপান বুঝছে ভারত দখল করতে ভারতীয়দের সাহায্য দরকার। ফলে তারা প্রচার করছে , জাপান আক্রমন করলে, তারা ভারতকে পূর্নাঙ্গ স্বাধীনতা দেবে। সেই শুনে ভারতের বিপ্লবীরা উচ্ছাসিত। অন্যদিকে ভারতের  কমিনিউস্টরা তখন বৃটেনের দোসর। যেহেতু সোভিয়েত এবং বৃটেন একই পক্ষে। কংগ্রেস সম্পূর্ন দ্বিধায়। এর মূল কারন কোরিয়া থেকে মাঞ্চুরিয়াতে যেসব স্থানীয় সরকার জাপান বসিয়েছিল-তারা সবাই জাপানের পুতুল সরকার। মাত্র পাঁচ বছরেই জাপান প্রমান করে ছেড়েছে  কলোনিয়াল মাস্টার হিসাবে তারা বৃটেনের থেকে অনেক অনেক বাজে।  ফলে জাপানের ভারতের স্বাধীনতার প্রপাগান্ডা নিয়ে অনেক দ্বিধা তৈরী হয়।  তবুও বরদলুই অধিবেশনে সব দ্বিধা ছেড়ে কংগ্রেস ঘোষনা করে তারা বৃটিশদের সাহায্য করবে যুদ্ধে। যদি বৃটেন পূর্নাঙ্গ স্বরাজ দেয়।

 আমেরিকান জনতা পার্ক হার্বারের প্রতিশোধ চাইছে। কিন্ত নেবে কি করে?  পার্ল হার্বারে অনেক ডেস্ট্রয়ার ধ্বংস। শুধু  ক্যেরিয়ার গুলো বেঁচে গেছে। কিন্ত সেগুলো থেকে আক্রমন করার জন্য অনেক পুরনো মডেলের হর্নেট আর ওয়াইল্ড ক্যাট হচ্ছে আমেরিকান ফাইটার বিমান।  যেখানে জাপানের কেরিয়ারের হাতে অনেক উন্নত মানের ফাইটার প্লেন "জিরো"! এদিকে বৃটিশরা টিকতেই পারছে না জাপানের কাছে!

 সেই মুহুর্তে আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতই জাপানের বিরোধিতায় আমেরিকার আশা ভরসা।  কারন পশ্চিম দিকে জাপানকে আটকাতে ভারতে ঘাঁটি দরকার। দরকার ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্য- ভারতীয় রসদ। মানে ভারতীয় জনগনের সাহায্য।  ভারতের স্বাধীনতা না দিলে ভারত সাহায্য করবে না -জানিয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। বৃটিশদের পক্ষে আছে শুধু মাত্র মুসলীম লীগ, কেপিপি ( ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি), ইউনিয়ানিস্ট পার্টি আর কমিউনিস্টরা।  হিন্দুমহাসভা বৃটিশদের সাথে যোগ দিয়েছে।  কিন্ত এই পার্টির বিপ্লবী উইং জাপানের সাথে হাত মেলাতে চাইছে। 

 অন্যদিকে ফিলিপিন্স, মাঞ্চুরিয়া, ভিয়েতনামে স্থানীয় জাতিয়তাবাদি শক্তিগুলির সাথে জাপান বিরোধি জোট করেছে আমেরিকানরা।  ভিয়েতনামের নেতা হোচিমিন। হ্যা হোচিমিন তখন আমেরিকার বন্ধু। কিন্ত আমেরিকা যদি ভারতের জাতিয়তাবাদি শক্তি কংগ্রেসকে সাথ না দেয়, এই সব জাতিয়তাবাদি নেতারা কেন বিশ্বাস করবে আমেরিকাকে?  সেকথা কুয়োমিংটান নেতা চিয়াং কাইসেক সাফ জানিয়ে দিলেন রুজভেল্টকে।

ফলে ১৯৪২ সালের শুরুতেই আমেরিকান বিদেশনীতির টোটাল ফোকাস গেল চার্চিলকে যেভাবেই হোক  বুঝিয়ে ভারতের স্বাধীনতার ঘোষনা দরকার।

 রুজভেল্ট ভারতের স্বাধীনতার জন্য চার্চিলকে সাঁড়াশি চাপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।  ভারতে পাঠালেন  কলোনেল লুইজ জনসনকে।  ইংল্যান্ডে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ইউনেটকে বল্লেন চার্চিলকে ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে চাপ দিতে। 
 
 অন্যদিকে চার্চিল অন্য খেলায় মেতেছেন।    ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসেই রুজভেল্টের সাথে দেখা হল চার্চিলের। এবার রুজভেল্ট সরাসরিই বল্লেন ভারতের স্বাধীনতা ব্যাপারে চার্চিল কিছু অন্তত সিদ্ধান্ত নিন!  চার্চিল নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, সেই রাতে রুজভেল্টকে এত উদোম হরকেছিলেন রুজভেল্ট আর দুবার ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্ন চার্চিলকে তোলেন নি!

  কিন্ত তা বল্লেই ত হল না- সেক্ট্রেটারী অব স্টেট  বা আমেরিকার বিদেশমন্ত্রী কার্ডেল হল, ছেড়ে দেবার পাত্র না। তিনি  লন্ডনের ওপর চাপ বজায় রাখলেন। ফলে ১৯৪২ সালের মার্চ মাচে চার্চিল ঘোষনা করতে বাধ্য হলেন স্যার ক্রফোর্ড ক্রিপ্স ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নের মিমাংসা করতে ভারত যাচ্ছেন।  ক্রিপস ছিলেন লেবার পার্টির এম পি।  ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা একজন বৃটিশ লিব্যারাল।

 শুধু আমেরিকানরা চার্চিলকে ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ দিচ্ছিল -তা না। বৃটেনের লেবার পার্টি বহুদিন থেকেই ভারতের স্বাধীনতার পক্ষেই ছিল। তারাও চাপ দেয়।  ইনফ্যাক্ট ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে, বৃটেনের বামেদের রাজনৈতিক চাপ, অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল ফ্যাক্টর ছিল (১৯৪২-৪৭)।

চার্চিল ঘাগু রাজনীতিবিদ। হিটলারের থেকে কোন অংশে কম সাম্রাজ্যবাদি নন।  আমেরিকা তাকে লন্ডনের রাষ্ট্রদূত দিয়ে   ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে  চাপ দিচ্ছে। তিনি ওয়াশিংটনে বৃটেনের রাষ্ট্রদূল লর্ড হেলিফ্যাক্সকে দিয়ে রুজভেল্টকে ভারতের সমস্যা নিয়ে ভুল বোঝাতে লাগলেন।  রুজভেল্টকে বোঝানো হল, ভারতের সেনা বাহিনীর ৭৫% মুসলমান। তারা পাঠান যোদ্ধা।  তাই জিন্নার তোলা দ্বিজাতি তত্ত্বের সমাধান না করে , ভারত স্বাধীন করলে, সেনাবাহিনী আসলে বিদ্রোহ করবে!

 চার্চিল বিলক্ষন জানতেন রুজভেল্টকে তিনি  ভুল তথ্য খাওয়াচ্ছেন। কারন ভারতের সেনাবাহিনীতে ২৫% ছিল মুসলমান। আর পাঠানরা ছিল কংগ্রসসে এলায়ান্স। এই জন্য ১৯৪২ পর্বে আমরা দেখব বৃটিশ ইন্টেলিজেন্স পাঠান  এবং মুসলমান নেতাদের  মধ্যে টাকা ছড়াচ্ছে।  যাতে মুসলীম লীগের পক্ষে তারা আসে।  সাথে সাথে  লীগকে মুসলিম অধ্যুশিত প্রদেশগুলিতে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হল।  বৃটিশরা মুসলীম লীগ এবং জিন্নাকে হঠাৎ করে প্রচুর পাত্তা দিতে শুরু করে। জিন্না  মিডিয়াতে সেই সব কথাগুলিই বল্লেন, যা লর্ড হেলিফ্যাক্সের মাধ্যমে রুজভেল্টকে শুনিয়েছেন চার্চিল। যাতে রুজভেল্টের কাছে চার্চিল বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেন। ্পুরো রাজনৈতিক নাটকটা তৈরি করলেন চার্চিল। জিন্না ক্রীড়ানক মাত্র।

 অর্থাৎ জিন্না তখন চার্চিলের পুতুল। জিন্নাকে তখন চার্চিল বৃটিশ ইন্টালিজেন্সের মাধ্যমে উস্কে দিচ্ছেন যাতে জিন্না পাকিস্তানের দাবি  আরো  জোরসে তোলে।  জিন্নার পাকিস্তানের দাবী বৃটেনের মিডিয়াগুলো ফলাও করে ছাপত! এদিকে আল ইন্ডিয়া আজাদ কনফরান্স- যেখানে অন্তত আরো পাঁচগুন ভারতীয় মুসলমান জিন্নার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আছেন- সেটা বৃটিশ মিডিয়া পাত্তাই দিত না। তাদের নেতাদের ধরে জেলে পুরে দেওয়া হত।  যাতে আমেরিকানরা বোঝে ভারতের স্বাধীনতার ব্যপারটা   দ্বিজাতি তত্ত্বের কারনে,  এত জটিল, চার্চিলকে চাপ না দেওয়ায় ভাল! পুরোটাই চার্চিলের তৈরী খেলা!
 
 রুজভেল্টকে  চার্চিল জানালেন --

 " We are earnestly considering whether a declaration of Dominion status after the war carrying with it if desired the right to secede should be made at this critical juncture. We must not on any account break with the Moslems who represent a hundred million people and the main army elements on which we must rely for the immediate fighting. We have also to consider our duty towards 30 to 40 million untouchables and our treaties with the princes states [sic] of India, perhaps 80 millions. Naturally we do not"

 পাকিস্তান  ছিল ৫% মুসলমানদের  দাবী। অধিকাংশ মুসলমানই পাকিস্তান দাবীর সাথে সহমত ছিল না।  চার্চিলের কল্যানে এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ টেকানোর প্রয়োজনে, চার্চিল জিন্নাকে বিড়াল থেকে বাঘ বানালেন। 

ক্রিপস ভারতে এলেন ২৩শে মার্চ।  ৩১ এ মার্চের মধ্যে কংগ্রেস তার প্রস্তাব বাতিল করেছে। লর্ড লিনলিথগো চাইছেন, ক্রিপস ফিরে যান!

 কিন্ত  রুজভেল্টের প্রতিনিধি কর্নেল জনসন ছাড়লেন না। ক্রিপস মিশন যাতে সফল হয়, তার জন্য উনি নিজেই নেহেরু, ক্রিপস এর সাথে মধ্যস্ততা করলেন।

 ক্রিপসে মূল বক্তব্য এই যে ভারতের নেতাদের হাতেই সব কিছু থাকবে -শুধু ডিফেন্স ছাড়া! আর ভাইসরয়ের হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখা হল। গান্ধী মানলেন না। নেহেরু,  জনসন এবং ক্রিপস-একটি আপস ফর্মুলা বার করলেন যে দেশীয় নেতাদের নিয়ে একটা ওয়ার কাউন্সিল গঠন করা হবে। ডিফেন্স যুগ্ম ভাবে ভাইসরয় এবং দেশীয় নেতাদের দ্বায়িত্বে থাকবে। ফলে ৬ ই এপ্রিল নাগাদ একটা খসড়া সমঝোতা হল, যাতে কংগ্রেস এবং ক্রিপস, রাজী!



  ক্রিপস ভাবলেন তিনি সফল। আনন্দে লাফিয়ে লন্ডনে টেলিগ্রাম পাঠালেন চার্চিলের কাছে! মিশন সাকসেসফুল!

  চার্চিল দেখলেন-এত আচ্ছা উল্লুকা পাঁঠা। একে পাঠানো হয়েছিল, যাতে এই মিশন ব্যর্থ হয়। আর এ ব্যাটা লর্ড লিনলিথগোকে পাশ কাটিয়ে, আমেরিকান দূত কলোনেল জনসনকে নিয়ে সমাধান করে দিল!!

 যেহেতু কর্নেল জনসন দ্বায়িত্ব নিয়ে এই কাজ করেছেন এবং তিনি রুজভেল্টের বিশেষ প্রিয়, চার্চিল সরাসরি ক্রিপসের সাফল্যকে বাতিল করতে পারছেন না। উনি বলতেই পারেন, লর্ড লিনলিথগোকে পাশ কাটিয়ে করা এই চুক্তি বৃটিশ মানবে না। কিন্ত সেটা কি আমেরিকানদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে?

  অগত্যা উপায়?

  আছে। মুসলীম লীগ এবং জিন্না। জিন্নার কাছে বৃটিশ ইন্টালিজেন্স থেকে নির্দেশ যায়, মুসলীম লিগ যেন ক্রিপ্স মিশন না মানে। জিন্না বৃটিশদের ফেবারিট বোরে । চার্চিল তার অনেক পুরোনো বন্ধু। জিন্না জানালেন ক্রিপ্সের এই ফর্মুলা ভারতের মুসলমানরা মানবে না। কারন এতে পাকিস্তানের দাবী মানা হয় নি। বৃটিশ মিডিয়া সেটাই বড় করে দেখাল!  ভারতের মুসলমানরা ক্রিপ্স মিশন মানবে না!

 চার্চিল রুজভেল্টকে বল্লেন চেখেছ? বলেছিলাম না শুধু হিন্দু কংগ্রেসের সাথে চুক্তি করলেই হবে না। ভারতের মুসলমানরা মানবে না।  এতেব ক্রিপসকে ঘরে ফেরাচ্ছি! আমার কিন্ত কোন দোষ নেই- আমি ত চেষ্টা করেছিলাম। কিন্ত ভারতের হিন্দু-মুসলমান সমস্যার জন্য ওদের স্বাধীনতা দেওয়ার অবস্থা আসে নি!!!

কর্নেল জনসন কিন্ত দ্বিধাহীন ভাষায় রুজভেল্টকে জানালেন, চার্চিল পেছন থেকে ছুরি মেরেছে!

 কিন্ত এর মধ্যে প্যাসিফিক থিয়েটারে ঘটে যায় মিড ওয়ের যুদ্ধ। যার জন্য আমেরিকা সম্পূর্ন ভাবেই ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে ইন্টারেস্ট হারায়।

 সেটা হচ্ছে ব্যাটল অব মিডোয়ে (৪-৭ই জুন, ১৯৪২)। আমেরিকা বুড়ো হাবড়া ওয়াইল্ড ক্যাট আর হর্নেট নিয়েই মিডোয়ে দ্বিপপুঞ্জের যুদ্ধে জাপানের নৌবহর ডুবিয়ে দিল!  জাপানের "জিরো" ফাইটার প্রায় প্রতিটা ওয়ান টু ওয়ান যুদ্ধেই আমেরিকান হর্নেট এবং ওয়াইল্ড ক্যাট ফাইটারকে হারায়- আমেরিকার নৌ বিমান বহরে প্রচুর ক্ষতি হয়। জাপানী বোমারু বিমান আমেরিকান যুদ্ধজাহাজকে অনেক বেশী আঘাত করতে সক্ষম হয়। কিন্ত তবুও আমেরিকান নৌবহর সব জাপানী যুদ্ধ জাহাজ যার মধ্যে চারটি ফাইটার কেরিয়ার ও ছিল। সবাইকে ডুবিয়ে দিল!

কারন জাপানের যুদ্ধ জাহাজ এবং যুদ্ধ বিমান প্রযুক্তি উন্নত ছিল ঠিকই -কিন্ত জাপানি যুদ্ধ জাহাজগুলির একটা মারাত্মক ডিজাইন ত্রুটি জাপানকে যুদ্ধে হারিয়ে দেয়। জাপানী ডিজাইনে   জাহাজের ডেকে বোমা থেকে আগুন লাগলে, তা নেভানোর অটোমেটিক সিস্টেম বা প্রিভেনশন সিস্টেম ছিল না। ফলে আমেরিকান বোমারু বিমান মাত্র একবার আঘাত করলেই আগুন ধরে জাপানী জাহাজ গুলো ধ্বংস হয়। কিন্ত আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজ গুলো বুড়ো হাবরা হলে কি হবে- ওদের আগুন নেবানোর ক্ষমতা ছিল অনেক বেশী। একাধিক জাপানী বোমা হজম করে দিতে সক্ষম।

 আমেরিকা স্বপ্নেও  ভাবে নি  পুরাতন প্রযুক্তি নিয়ে তারা, জাপানের বিরাট নৌবহর ডুবিয়ে দেবে!   জাপানি যুদ্ধ জাহাজগুলির এই মারাত্মক দুর্বলতা প্রকাশ পেতেই আমেরিকা এবার  প্রশান্ত মহাসাগরে সরাসরি জাপানি বাকী নৌবহর খতম করার দিকে নজর দেয়।  সাথে সাথে জাপানি জিরোর থেকে ভাল ফাইটার বিমান হেলক্যাট ও আমেরিকান হাতে এসে গেছে। ্সুতরাং আমেরিকা তখন থেকে আর ভারত, ভিয়েতনামের ন্যাশালিস্ট নেতারা কি চাইছেন, তাই নিয়ে মাথা ঘামায় নি। তাদের ফোকাস- জাপানী যুদ্ধ জাহাজের সব ফ্লিট ধ্বংস কর।


 ভাবছেন এই তথ্যগুলো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ন কেন? কারন ১৯৪২ এর জুন মাসে মিডোওয়ের যুদ্ধের পরে আমেরিকা বুঝতে পারে জাপান কাগুজে বাঘ। ওদের যুদ্ধ জাহাজ ডিজাইন এত দুর্বল, প্রশান্ত মহাসাগরে বাকী জাপানি যুদ্ধজাহাজ শেষ করে দিলেই যুদ্ধ শেষ। কারন জাপান একটা দ্বীপ।

ফলে আগে যেমন ভারতকে পাশে দরকার ইত্যাদি ছিল জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে - মাত্র ছমাসেই  খেলা ঘুরে গেছে। ১৯৪২ এর জুলাই মাস থেকেই আমেরিকা ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে আর মাথা ঘামায় নি।

 এখানেই নেহেরুর নেতৃত্ব নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। গান্ধীকে ছেড়ে দিলাম। গান্ধী স্ট্রাটেজিস্ট নন।

   নেহেরু কর্নেল জনসনের প্রিয়পাত্র ছিলেন। খুব ভাল করেই জানতেন কেন আমেরিকা ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে আগ্রহী। এটাও জানতেন মুসলীম লিগকে খেলিয়ে রুজভেল্টকে ভুল বোঝাচ্ছেন চার্চিল।  সেই সময় নেহেরুর উচিত ছিল আমেরিকার সাথে সরাসরি সম্পর্কে যাওয়া এবং দ্রুত। কারন প্যাসিফিক থিয়েটারে যুদ্ধ ঘুরে গেলে, আমেরিকাও উৎসাহ হারাবে এটা বাচ্চাও বুঝবে। আমেরিকা কোন আদর্শ রাষ্ট্র না  -  তারা  নিজেদের জন্যই ভারতের স্বাধীনতা চাইছিল।

কিন্ত খুব সম্ভবত আমেরিকাকে অপছন্দ করতেন বলে, আমেরিকার কাছে ঘেঁসার চেষ্টা করেন নি নেহেরু। লীগের উৎপাত শেষ করার ওটাই ছিল ভাল উপায়।  চার্চিলকে , রুজভেল্টের টিম পালটা প্রেসার দিচ্ছে। চার্চিল জিন্নাকে খেলিয়ে, সেই প্রেসার রদ করছে। নেহেরু কি এতই বাচ্চা এসব কিছুই বোঝেন নি? লীগকে থামানোর জন্য আমেরিকার সাথে যে বন্ধুত্বের দরকার ছিল, তিনি করেন নি! কারন তিনি আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদি মনে করেন! মাঝখান থেকে মরল বাঙালী আর পাঞ্জাবীরা। নেহেরু যদি এই সময় আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারতেন, যে সুযোগ তাকে কর্নেল জনসন  দিয়েয়েছিলেন, তাহলেও দেশভাগ হয় না। কারন আমেরিকা যদি,  ঐক্যবদ্ধ ভারতকে পাশে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেত, তারা কেন শুধু পাকিস্তানের দাবীকে সমর্থন করবে?  এক আদর্শবাদি আন্টি কলোনিয়াল পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর ছিলেন পন্ডিতজি।  তিনি প্রকাশ্যে আমেরিকার বিরোধিতা করেছেন! তাহলে আমেরিকা সোভিয়েত অক্ষের বিরোধিতা করার জন্য পাকিস্তানের দাবীর সমর্থক হবেই!    বাস্তব, রিয়াল পলিটিক্সে নেহেরুর কোন দিনই কোন ইন্টারেস্ট নেই।   ভুগল বাংলা আর পাঞ্জাবের নিরীহ মানুষ যারা এসবের সাত পাঁচে নেই।

 নেহেরু দেশের লোকের কথা কোনদিনই ভাবেন নি। নিজের আদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছেন সর্বদা।
                                   
                                                                        (২)
 
 এবার আসি চার্চিল এবং জিন্নার সম্পর্কে।
 
 ১৯০৮ সালে সৈয়দ আমীর আলি, লন্ডনে মুসলীম লীগের একটি শাখা খোলেন। এই আমীর আলি একজন বিখ্যাত লোক- উনি সেন্ট্রাল  ন্যাশানাল মহামেডান এসোশিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা। লীগের বহুপূর্বেই মুসলমানদের সংগঠিত করেছিলেন এই নেতা। তাছাড়া উনি প্রথম ভারতীয়  যিনি প্রিভি কাউন্সিলে সিট পান। ইন্ডিয়ান ল কাউন্সিলের উনি দ্বিতীয় ভারতীয় মেম্বার।  বিখ্যাত ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা।

 ভারতের ইতিহাস তাকে ভুলে যেতে পারে, কিন্ত তার কার্যকলাপ, ভারতের সাম্প্রদায়িকতা এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।  ১৯০৯ সালে আইন সভায় মুসলমানদের জন্য যে স্পেশাল সংরক্ষন চালু হল, তার মূল ব্যক্তি ইনিই।  আইন সভায় মুসলমানদের জন্য আলাদা সংরক্ষন গুরুত্বপূর্ন  এই জন্যেই যে, এই মুসলিম কোটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হিন্দু মহাসভার জন্ম হয়।

 উনি লীগের যে লন্ডন ট্রাডিশন শুরু করেছিলেন, ভারতের ইতিহাসে তা বারবার গুরুত্বপূর্ন হবে। কংগ্রেসের রাজনীতি ছিল, ভারতে আইন অমান্যের রাজনীতি।  রাস্তায় আন্দোলন আবেদনের রাজনীতি। মুসলিম লীগ প্রথম থেকেই হাউস অব লর্ডস, আর হাউস অব কমন্সের মেম্বারদের সাথে সখ্যতা বাড়ায়। তাদের নির্বাচনে চাঁদা দেয়। মানে যাকে বলে লবিং। লীগ বুঝেছিল, ভারতের রাজনীতি চলে বৃটিশ পার্লামেন্ট থেকে। ফলে তারা রাজনীতিটা লন্ডন থেকেই করতেন!

  চার্চিল বুয়োর যুদ্ধ শেষে, ১৯০০ সালে দেশে ফিরে এসে মাত্র ২৫ বছর বয়সে এম পি হোন। আট বছর বয়সে গুরুত্বপূর্ন পোষ্ট পেলেন- আন্ডার সেক্রেটারি ওফ স্টেটস ফর ব্রিটিশ কলোনী। ভারত সহ ৪০ টি বৃটিশ কলোনির দেখাশোনার মন্ত্রীত্ব।

ফলে মুসলিম লীগের লবিস্টদের কাছে চার্চিলের সাথে ঘনিষ্টতা হবেই। তাছাড়া চার্চিলকে সম্ভবত বুয়োর যুদ্ধে প্রান বাঁচিয়েছিল দুই ভারতীয় মুসলিম। তিনি অটোম্যান সম্রাটদের পোষাক, আভিজাত্য, ভোগ-সব কিছু পছন্দ করতেন।   লন্ডনে মুসলিম লীগের অনেক বিখ্যাত নেতার সাথে চার্চিলে ঘনিষ্টতা হয়। এদের মধ্যে ছিল  আগা খান, ব্যারন হেডলি ( লন্ডন মুসলিম সোশাইটির প্রেসিডেন্ট),  ওয়ারিস আলি, ফিরোজ খান নুন ( পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী)।

 এর মধ্যে ওয়ারিশ আলির সাথে চার্চিলের বন্ধুত্ব এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক আমাদের স্ক্যানারে আনতে হবে। ওয়ারিশ আলি, জানতেন চার্চিল ঘোর কংগ্রেস, গান্ধী এবং নেহেরু বিরোধি। বৃটেনের লেবার পার্টি ছিল, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল।  কংগ্রেস এবং হিন্দু বিরোধি সমস্ত তথ্য ওয়ারিশ আলি চার্চিলকে দিতেন। চার্চিল হাউস অব কমন্সে সেই তথ্যে ঘায়েল করতেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল লেবার এম পিদের।

  ১২ ই এপ্রিল  ১৯৩১ কানপুরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। কিছু মুসলমান মারা যায়। ওয়ারিশ আলি এই তথ্য চার্চিলকে এমন ভাবে পেশ করেন, যেন এই ঘটনার জন্য হিন্দু এবং হিন্দুদের পার্টি কংগ্রেস দায়ি। চার্চিল আসলে কি হয়েছিল, তা স্ক্রটিনাইজ না করেই হাউস অব কমন্সে বল্লেন

"well thought-out […] programme for […] the terrorisation of the Muslim minority into submission and surrender of their demand for effective safeguards in the future constitution of India”. Within a month Churchill addressed an audience in Kent thus: “Look at what happened at Cawnpore […] A hideous primordial massacre has been perpetrated by the Hindus on the Moslems because the Moslems refused to join in the glorification of the murder of a British policeman "

লন্ডন মুসলীম লিগ বহুদিন থেকেই চার্চিলের রাজনৈতিক সঙ্গী। ফলে রুজভেল্টের চাপকে প্রতিহত করতে, তাদেরই সাহায্য নিয়েছিলেন চার্চিল।

চার্চিলের সাহায্যে মুসলিম লীগ যে বৃটিশ পার্লামেন্টে দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং পাকিস্তানের পাল্লা ভারী করছে, এত সবাই জানত। কংগ্রেস কি আদৌ এর পালটা কোন চাল দিচ্ছিল?

লন্ডনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি ইন্ডিয়ান  লীগ। ওয়ারিশ আলির পালটা হচ্ছেন ভারতের প্রথম বিদেশ মন্ত্রী ভিকে কৃষ্ণ মেনন।  উনি ১৯৩০ সালে লন্ডনে ইউসিএল থেকে সাইকোলজিতে এম এ নিয়ে পাশ করেন।  বিখ্যাত বৃটিশ কমিউনিউস্ট নেতা এবং শিক্ষক হ্যারল্ড ল্যাস্কির প্রিয়তম ছাত্র। এই হ্যারল্ড ল্যাস্কি জ্যোতিবসুর ও কমিনিউস্ট গুরু। কৃষ্ণ মেনন ইন্ডিয়ান লীগের মূল নেতা হলেন। ইন্দিরা গান্ধী এবং জ্যোতি বসুর- উভয়ের রাজনৈতিক মেন্টর এই কমিনিউস্ট কৃষ্ণ মেনন।

 লেবার পার্টী ছিল ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে। ফলে মেনন লেবার পার্টিতে সরাসরি যোগ দেন। বৃটিশ বুদ্ধিজীবি যেমন এজরা পাউন্ড, এম ফস্টার, ব্রিট্রান্ড রাশেল ইত্যাদি নামীদামী ব্যক্তিত্বরা ছিল মেননের সাথে। লেবার পার্টির নেতা ক্লিমেন্ট এটলি ১৯৪৬ সালে যখন চার্চিলকে হারিয়ে প্রধান মন্ত্রী হবেন, তখন ভারতের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে কৃষ্ণমেননের পরিশ্রম  নিশ্চয় কাজে এসেছে। এই পর্যন্ত ইতিহাস ঠিকই আছে! 

 কিন্ত কৃষ্ণমেনন এবং তার ইন্ডিয়ান লীগ,  চার্চিল ও মুসলীম লিগের দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে কিন্ত কোন মতামত তৈরী করে নি লন্ডনে।  তারা শুধুই ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নটাকেই সামনে রেখেছে। দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা এবং পাকিস্তান বিরোধিতা কৃষ্ণ মেননের এজেন্ডাতে ছিল না।  কেন?

   এর  উত্তর আমার জানে নেই।  তিনি ছিলেন কঠোর নীতিবাদি কমিউনিস্ট।  তার কমিনিউস্ট তত্ত্বের দিক দিয়ে "হয়ত" জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বের দাবি ঠিকই ছিল। তার ছাত্র জ্যোতি বসুও পাকিস্তানের দাবীর সমর্থকই ছিলেন।

 কৃষ্ণ মেননের কমিনিউস্ট এবং সোভিয়েত প্রীতির খেসারত দিতে হয়েছে অনেকটাই। ১৯৪৬ সালে তিনি সোভিয়েত বিদেশমন্ত্রী মলোটভের সাথে দেখা করেন।  বৃটিশ ইন্টেলিজেন্স এম আই ফাইভের সার্ভিলেন্সে ছিলেন। আমেরিকা এবং বৃটেনের নেতৃত্বকে তিনি বিশ্বাস করতেন না। তারাও মেনন-নেহেরুকে বিশ্বাস করে নি।

 ফলে পাকিস্তানের জন্ম বৃটেন-আমেরিকার জন্য অনির্বায্য হয়ে ওঠে।  কারন বৃটেন দেখে নেহেরু-মেনন জুটি খুব পরিস্কার ভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়ানের দিকে ঝুঁকছে। সুতরাং মুসলীম লীগের তত্ত্ববধানে আমেরিকা এবং বৃটেনের বন্ধু রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দিতে সক্রিয় হয় বৃটিশ ইন্টেলিজেন্স এবং এডমিনিস্ট্রেশন। 

 এই আন্তর্জাতিক ঘটনা সমূহের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা পরের কিস্তিতে কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টে এবং ১৯৪৫ সালের মুসলীম লীগ সংগঠিত দাংগার পর্যালোচনা করব।

 আপাতত এটা বোঝা গেল বৃটিশ কতৃপক্ষ পাকিস্তান চাইছিল। তারা চাইছিল মুসলিম লীগ দাংগা করুক এবং দেশে আগুন জ্বলুক। মুসলিম লীগ দাঙ্গা করলে বৃটিশ পুলিশ আটকাবে না এটা লীগের নেতারা জানতেন। কারন তারা পাকিস্তান গঠনের  বৃটিশ এজেন্ডা বাস্তবায়িত করছেন।

সমস্যা হচ্ছে এটা কংগ্রেস নেতারা বোঝেন নি, বৃটিশ কতৃপক্ষ এবং লীগ একই সাথে পাকিস্তানের বাস্তবায়নের কাজ করছে?  কেন বৃটিশ এই কাজ করছে, সেটাও নেহেরু-মেনন জানতেন।  নেহেরু জানতেন, তাদের সোভিয়েত প্রীতি এবং আমেরিকা বিরোধিতার  কারনেই বৃটিশ এবং মুসলিম লীগ পাকিস্তান গঠনের দিকে এগোচ্ছে। যার ফলে কোটি কোটি লোক উদ্বাস্তু হবে।

  ধরুন ধরেই নিলাম, তারা সোভিয়েত এক্সিসে থাকবেন বলে স্থির করেছিলেন । সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্ম দেবে বৃটিশ কতৃপক্ষ এটা বাচ্চাও বুঝবে।  কিন্ত তাহলে ত স্টালিনের সাহায্য নিয়ে, পাকিস্তান গঠনের বিরোধিতা করতে হয়? কারন আফগানিস্তানের তলায় আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্রের জন্ম স্টালিনের জন্যও কাম্য না!


এইখানে ইতিহাস আরো মজার। মেনন-নেহেরু জুটিকে আমেরিকা-বৃটেন সোভিয়েতের চর ভাবছে! এদিকে স্টালিন নেহেরু-মেননকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কারন নেহেরু  "নন-আলাইন্ড মুভমেন্টের " নেতা হতে চান। স্টালিন নেহেরু সম্মন্ধে বল্লেন, লোকটা যে কোন দিকে কেউই জানে না!

 মোদ্দা কথা  মেনন-নেহেরুর রোম্যান্টিক আদর্শবাদের জন্য ভারতের আম-ছালা দুই গেল। তিনি পাকিস্তান গঠনের বিরোধিতার জন্য সোভিয়েত থেকে সাহায্য চেলেন না।  আবার নেহেরু-মেননের  আমেরিকা বিরোধিতার জন্য,  মুসলীম লীগ আমেরিকা এবং বৃটেনের সম্পূর্ন সাহযোগিতা পেল।

 জেজে সিংহ এর কঠোর পরিশ্রম- যার মাধ্যমে তিনি আমেরিকার বুদ্ধিজীবিদের ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে, নেহেরুর পক্ষে সংগঠিত করেছিলেন- নেহেরুর আমেরিকা বিরোধিতা সব কিছুতেই জল ঢেলে দেয়।

 আসলে নেহেরু রিয়াল পলিটিক বুঝতেন না।  আর তার প্রতিদ্বন্দি- রিয়াল পলিটিক্সের গুরু জিন্না এবং চার্চিল!  নেহেরু ধোঁয়া ধোঁয়া আদর্শবাদকেই রাজনীতি ভেবেছেন চিরকাল। ফলে ভারতের প্রদেশ কংগ্রেসের ১৩ জন নেতা যখন ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বাছতে বসলেন-কেউ নেহেরুকে ভোট দেয় নি। ১০ টা ভোট সর্দার প্যাটেলের দিকেই যায়।  কংগ্রেসের নেতারা বিলক্ষন জানতেন নেহেরুর এই কবি কবি রাজনীতির খেসারত দিচ্ছে সমগ্র ভারত।  ফলে নেহেরুকে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তারাও দেখতে চান নি।      কিন্ত গান্ধীর ইচ্ছা নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হোন।  গান্ধীর একলব্য শিষ্য প্যাটেল প্রধানমন্ত্রীর দাবি ছেড়ে দিলেন।

 গান্ধীর মতন একজন  বিশুদ্ধ চিন্তানায়ক মোটেও রাজনীতিবিদ হতে পারেন না। তাকে কংগ্রেসের মাথায় বসিয়ে হিন্দুরা সব কিছু হারিয়েছে। কারন তিনি "রিয়াল পলিটিক্সে" বিশ্বাস করতেন না। আর এই কাজে হাতে পেলেন নেহেরুকে! যিনি আরেক রোম্যান্টিক বুদ্ধিজীবি।

 জিন্না-চার্চিলের সাথে টিট ফর ট্যাট গেমের জন্য, হিন্দুদের দরকার ছিল নেতাজি,   প্যাটেল বা শ্যামাপ্রসাদের মতন আরেকজন "রিয়াল পলিটিক্স"  এ বিশ্বাসীকে নেতা হিসাবে তুলে ধরা। রিয়াল পলিটিক্সে বিশ্বাসী নেতারা রক্ত, যুদ্ধ, জমি বোঝে।   গান্ধী-নেহেরু-মেনন, এরা আদর্শ ধুয়ে জল খাচ্ছিলেন, আর জিন্না ঘর গোছাচ্ছিলেন। পাঞ্জাব আর বাংলার নিরীহ হিন্দু-মুসলমানরা দাঙ্গায় মরছিল।

সাইমন বলিভারের কথা লিখি এই প্রসঙ্গে।   ইউরোপিয়ান কলোনিয়াল শক্তির হাত থেকে,   তিনি ল্যাটিন আমেরিকার সব দেশকেই মুক্ত করেছেন।  এন্টি কলোনিয়ালিজমের ইতিহাসে তিনিই হচ্ছে গোল্ড স্টান্ডার্ড।  উনি লিখেছিলেন - Art of Victory is learned in defeat.   এটা পরিস্কার নেহেরু কোন ইচ্ছাই ছিল না পাকিস্তানের দাবীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ঐক্যবদ্ধ ভারত গঠনে। যা পাচ্ছি নিয়ে নিয়ে নন-এলাইন্ড মুভমেন্টের নেতা হতে চাইছিলেন। নেহেরু, নিজেও সে কথা স্বীকার করেছেন যে তিনি ভীষন টায়ার্ড ছিলেন। ইতিহাস খুঁজে আমি কিছুই পেলাম না যাতে দেখতে পাই, নেহেরু জিন্না-চার্চিলের বিরুদ্ধে কোন স্ট্রাটেজি নিয়েছিলেন। বেসিক্যালি বিনা যুদ্ধেই জিন্না-চার্চিলের দাবী মেনে নিলেন নেহেরু। কারন তিনি যোদ্ধা না। তিনি ছিলেন দার্শনিক।  আর অসংখ্য ভারতবাসি, তাদের দুজনের নেতৃত্বের ভরসায় থাকল যে এরা জিন্নার বিরুদ্ধে কিছু করবেন!










 




























 









































Monday, December 23, 2019

দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং দেশভাগ - ৩ঃ ভারতীয় মুসলমানদের ভূমিকা

মহম্মদ আলি জিন্না এবং ড আল্লামা ইকবাল পাকিস্তান সৃষ্টির কৃষ্ণ বলরাম ।   কিন্ত বাকী মুসলমান নেতাদের ভূমিকা কি ছিল ?   সামগ্রিক ভাবে দেশভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টিতে অবিভক্ত ভারতে মুসলমান জনমানসের ভূমিকার বিশ্লেষন প্রয়োজন।

 দেশভাগের আগে মুসলীম লীগ মুসলমানদের বৃহত্তম পার্টি ছিল না। ইনফ্যাক্ট ইউনিয়নিস্ট পার্টি যা ছিল পাঞ্জাবে মুসলমান জমিদারদের পার্টি -তাদের মুসলমান সাপোর্টবেস ছিল আরো অনেক বেশী। বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সাপোর্ট বেস ও লীগের থেকে অনেক বেশী মজবুত ছিল। কিন্ত আমরা দেখব কোন এক "অজ্ঞাত" কারনে  ১৯৩৭ সাল থেকে আস্তে আস্তে অনেক আঞ্চলিক মুসলিম পার্টিকেই লীগ আত্মসাৎ করা শুর করে।  ইঁদুর থেকে বাঘ হয়ে উঠবে লীগ।  এইসব আঞ্চলিক মুসলিম পার্টিগুলি, যাদের মধ্যে একমাত্র বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি ছাড়া আর কেউই দেশভাগের পক্ষে ছিল না, তারা কেন জিন্নার নেতৃত্ব মানলেন ? নাকি কোন এক বৈদেশিক শক্তির অদৃশ্য ছায়াতে যারা এতদিন জিন্নার বিরোধিতা করেছেন, তারা সাপোর্টে এলেন?  এর পেছনের খেলাটা কি ? 

  এটি একটি রোমাঞ্চকর আন্তর্জাতিক ক্রাইম থ্রিলার! এবং যথারীতি ইতিহাসের এই পর্বটা হচ্ছে আমাদের উপমহাদেশে বাস্টার্ড চাইল্ড। কারন ভারতে কংগ্রেস লিখিত ইতিহাস দেখাতে চায়, কংগ্রেসে আবুল কালাম আজাদের মতন মুসলমান নেতা দেশভাগের বিরোধিতা করেছে। এরা বালুচিস্থান, নর্থ ইস্টার্ন প্রভিন্স, পাঞ্জাব, সিন্ধ বলতে গেলে বর্তমান পাকিস্তানের প্রতি্টা রাজ্যের আঞ্চলিক মুসলমান দলগুলি যে দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং দেশভাগের বিরোধিতা করেছে  সেটা ভুলিয়ে দিয়ে, কংগ্রেসের ভূমিকাকে "বড়" করে দেখাতে চায়।  কারন এই ইতিহাস যদি ঘাঁটা যায়-এক আশ্চর্য্য তথ্য উঠে আসে। এই সব আঞ্চলিক দলগুলি  ( একমাত্র পাঠান নেতা বাচা খান বাদ দিলে)  কংগ্রেস এবং লীগ -উভয়কেই তাদের জাতিসত্ত্বার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য খতরনাক মনে করত।  যদিও এদের অনেকেই গান্ধীতে বিশ্বাস রাখত। 

আর পাকিস্তান ইতিহাসের এই পর্ব একদম ভুলে যেতে চাইছে বহু দিন থেকেই। কারন নর্থ ইস্টার্ন প্রভিন্সের খুদাই খিদমতগার পাকিস্তান সৃষ্টি মেনে নেয় নি। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে তারা নিজেদের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করে।  এরা পশচুনিন্থান দাবী করে সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই । আবদুল গফফর খান যেদিন শুনলেন কংগ্রেস জিন্নার দাবী মেনে নিয়েছে, উনি পাথরের মতন নিথর। শুধু মহত্মা গান্ধীর উদ্দেশে  বল্লেন আপনি আমাদের, পাঠানদের নেকরের মুখে ( লীগ এবং জিন্না) ফেলে দিলেন।  

 খান ভুল বলেন নি। ১৯৪৮ সালের ১২ই আগস্ট পাকিস্তানের মিলিটারি পুলিশ  খুদাই খিদমতগারের অহিংস জমায়েতে গুলি চালাল। ৬০০ মৃত। ১২০০ আহত।  কাবুল নদী ছশো পাঠানের রক্তে লাল।  জালিওনাবাগ হত্যাকান্ডের থেকেও আরো ভয়ংকর ছিল- এই বাবরা হত্যাকান্ড  ।  

 পাকিস্তানের ইতিহাস এখনো এই আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন থেকে মুক্ত না। সিন্ধ, বালুচিস্তান, নর্থ ইস্টার্ন প্রভিন্স -সর্বত্রই আঞ্চলিক শক্তিগুলি পাকিস্তান থেকে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। সুতরাং পাকিস্তানের ইতিহাস এই পর্ব সম্পূর্ন ভাবেই মুছে দিয়েছে। 


 কিন্তু খুদাই খিদমতগারের ইতিহাসেই লুকিয়ে আছে সেই সূত্র যা আমি খুঁজছিলাম-কিভাবে পাকিস্তানের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠি- যারা সম্পূর্ন ভাবেই লীগ এবং জিন্না বিরোধি ছিল- তাদের মাথার ওপর ছলে বলে কৌশলে পাকিস্তান এবং জিন্নাকে চাপানো হল!   জিন্নার ক্যারিশমা? নাকি জিন্নাকে দিয়ে চার্চিল এই কাজ করালেন কারন ঠান্ডাযুদ্ধের দিনে আমেরিকান এক্সিসের জন্য পাকিস্তান সৃষ্টি দরকার ছিল? 

 ইতিহাস খুব পরিস্কার। পাকিস্তানের অধিকাংশ জনগনই চাই নি পাকিস্তান-অন্তত ১৯৪২-৪৩ সাল পর্যন্ত। পাঠানরা ১৯৪৭ সালেও ঘোর পাকিস্তান বিরোধি।  ১৯৩৭ সালে বর্তমান পাকিস্তানে লীগের ভোট ছিল ৩% এর কম! তাহলে কি করে লীগ এবং জিন্নাকে পাকিস্তানের মাথায় চাপাতে সমর্থ হল বৃটিশরা? 

   (১)
 আল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্সের নাম আপনারা কজন জানেন?  ১৯২৯ সালে সিন্ধ প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী আল্লা বক্স সুমরো,  এই আম্ব্রেলা সংগঠন বানান। সেই সব মুসলিম সংগঠন নিয়ে যারা  ঐক্যবদ্ধ ভারত চাইছিল। যারা ছিল লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বের ঘোর বিরোধি।  দিল্লীতে ১৯৩০ সালের ২৭-৩০শে জুলাই, ১৪০০ জন প্রতিনিধি এই কনফারেন্সে যোগ দেন। এর মধ্যে প্রায় সকল ধরনের মুসলিম সংগঠনই ছিল
    
   
  • সিন্ধ ইত্তেহাদ পার্টি 
  • জামাতই-উলেমাই-হিন্দ
  • মজলিসই আহার উল ইসলাম 
  • আল ইন্ডিয়া মোমিন কনফারেন্স 
  • আল ইন্ডিয়া শিয়া পলিটিক্যাল কনফারেন্স 
  • খুদাই খিদমতগার 
  • কৃষক প্রজা পার্টি (  যা ১৯৩৭ সালে লীগএর সাথে হাত মেলাবে )
  • আঞ্জুমান ই ওয়াতন বালুচিস্তান 
  • আল ইন্ডিয়া মুসলিম মজলিস 
  • জামাত আলিই হাদিস 

  আল্লা বকস সুমরো কড়া ভাষায় লীগের সমালোচনা করে বল্লেন 

 " Whatever our faiths we must live together in our country in an atmosphere of perfect amity and our relations should be the relations of the several brothers of a joint family, various members of which are free to profess their faith as they like without any let or hindrance and of whom enjoy equal benefits of their joint property

 কানাডিয়ান ঐতিহাসিক উলফ্রেড ক্যাটনহিল্ বলছেন এই সংগঠনের পেছনে মুসলমানদের সাপোর্ট ছিল লীগের থেকে অনেক বেশী। বৃটিশ প্রেস ও এই মত সমর্থন করে।  এমন কি খোদ ১৯৪৬ সালেও বোম্বে ক্রনিকল লিখছে আজাদ মুসলিম কনফারেন্সের পেছনে মুসলিম  সমর্থন  লীগের থেকে অনেক বেশী। 

 কিন্ত কি আশ্চর্য্য ! বৃটিশ সরকার এদেরকে মুসলমানদের প্রতিনিধি বলে মনেই করল না!  মুসলীমলীগ, যাদের পেছনে মুসলমানদের সমর্থন এদের থেকে অনেক কম , ১৯৪২ থেকে বৃটিশ সরকার তাদেরকেই তোল্লা দিয়ে গেল ভারতী মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে ! বৃটিশ ইন্টেলিজেন্স এবং এডমিনিস্ট্রেশন সর্বত  ভাবে সাহায্য করেছে লীগকে যাতে প্রতিটা  পাকিস্তান বিরোধি মুসলিম পার্টি দুর্বল হয় এবং তাদের সমর্থকরা লীগের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। 

  যেখানে ভারতীয় মুসলমানরা দেশ ভাগ চাইছে না, সেখানে লীগকে সামনে রেখে বৃটিশ ইন্টালিজেন্স কিভাবে দেশভাগের বাস্তবায়ন ঘটালো- কেন ঘটালো সেই ইতিহাস আমি পরের খন্ডে লিখছি। কারন সেটাই আসল ইতিহাস দেশভাগের।  কংগ্রেসের নেতৃত্বের দুর্বলতা  এবং ক্ষমতার প্রতি লোভ এই ওয়েল ডিজাইন্ড ইভেন্টের  ক্যাটালিস্ট। 

 (২)  এবার আমাদের সেই ইতিহাস বুঝতে হবে যে কেন  ১৯২০ সাল নাগাদ  লীগ এবং কংগ্রেসের বাইরে, ভারতের মুসলমানরা আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যটফর্ম খুঁজছিল।  বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি, পাঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট পার্টি, সিন্ধের ইত্তেহাদ, উত্তর পশ্চিমের পাঠানদের খুদাই খিদমতগার , বালুচিস্তানের আনজুমানই ওয়াতন বালুচিস্তান কেন কংগ্রেস এবং লীগের বাইরে গিয়ে আলাদা রাজনৈতিক পার্টির তাগিদ অনুভব করে। যদিও ইতিহাসে আমরা দেখব এদের অনেকেই কংগ্রেস বা কখনো লীগের সাথে হাত মিলিয়েছে। 

  এর উত্তর একটাই। ইসলাম বা মুসলমান আসলেই ত কোন জাতি হতে পারে না। এই যে  দ্বিজাতিতত্ত্বের  ধাপ্পাবাজির ওপর লীগ দাঁড়িয়েছিল, সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ না, ১৯২০ -১৯৩০ সালে এতগুলো প্রদেশিক মুসলিম পার্টির উত্থানেই পরিস্কার। এদের সবগুলিই প্রায় প্রাদেশিক জাতিয়তাবাদি সংগঠন। এরা দেখল লীগ এবং কংগ্রেসের উভয়ের এজেন্ডাতেই ভারতের প্রতিটা প্রদেশের যে আলাদা ডাইভার্সিটি-প্রতিটি জাতিগোষ্ঠির যে আলাদা চাহিদা , তা অনুপস্থিত। লীগ এবং কংগ্রেস -এরা উভয়েই ভীষন ভাবে  দিল্লীর কেন্দ্রিকতায় বিশ্বাসী-প্রদেশিক নেতাদের পাত্তা দেয় না।  স্বাধীনতা উত্তর ভারতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছিল, স্বাধীনতার পূর্বেও সেই একই প্রদেশিকতা বনাম কেন্দ্রিকতার লড়াই দৃশ্যমান। যবে থেকে বৃটিশ তত্ত্ববধানে ভারতে নির্বাচন হচ্ছে ( ১৯২০)। 

 প্রথমে সব থেকে গুরত্বপূর্ন দুটো প্রদেশিক মুসলিম পার্টির ইতিহাসে আসি। বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি এবং পাঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট পার্টি।  যদিও এরা নিজেদের কখনোই মুসলিম পার্টি হিসাবে দাবী করে নি, এদের নেতাদের সবাই ছিল মুসলমান। ইউনিয়নিস্ট পার্টিতে অবশ্য কিছু হিন্দু এবং শিখ নেতা ছিলেন। 

   কৃষক প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ফজলুল হক।  ১৯২৯।  প্রেক্ষাপট বাংলায় ভাগচাষিদের স্বার্থরক্ষা। যার জন্য পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট এবং ১৮৮৮ সালের বেঙ্গল টেনান্সি এক্টের পরিবর্তন দরকার হয়ে ওঠে। 

 বাংলার জমিদারদের অধিকাংশই হিন্দু। কলকাতা নিবাসি। তারা পূর্ববাংলার খাজনায় বাবু। জমিদারি দেখাশোনা করে নায়েবেরা, যারা হিন্দু।  খাজনা তোলে জোদ্দাররা যারা হিন্দু। এদিকে ভাগচাষিদের সবাই প্রায় মুসলমান। লেবার ক্লাসের ও প্রায় সবাই মুসলমান। অন্যদিকে কিছু জমিদার তখনো মুসলমান ছিল, যারা মোঘল আমল থেকেই খানদানি জমিদার।  

 কংগ্রেস তখন সম্পূর্ন ভাবেই হিন্দু জমিদার, জোদ্দারদের প্রতিনিধি । কারন তাদের টাকাতেই পার্টি চলে। এদিকে কংগ্রেসের স্যোশালিস্ট অংশ প্রগ্রেসিভ হওয়ার জন্য ভূমিসংস্কারের কথা বলছে। কিন্ত তারা পার্টির মধ্যে টাকার জোরে পাত্তা পাচ্ছে না। 

অন্যদিকে লীগ হচ্ছে উর্দুভাষী এই ্মোঘল ঐতিহ্যের মুসলমান এলিটদের প্রতিনিধি।

  বাংলার ভাগচাষীদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই।  ভারতীয় কমিনিউস্ট পার্টি তদ্দিনে তৈরী হয়েছে । কিন্ত তারা সেকালেও সোভিয়েত ইউনিয়ানের মুখাপেক্ষী । 

রাজনীতিতে ভ্যাকুয়াম বেশীদিন থাকে না। ফলে বাংলার  ভাগচাষীদের  প্রতিনিধি কৃষক প্রজা পার্টি বাংলায় লীগ এবং কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠে।  ১৯৩৫ সালে গর্ভনমেন্ট ইন্ডিয়া এক্ট পাশ হয়। এক্টের বাস্তবায়নে  ১৯৩৭ সালে বাংলায় প্রথম প্রদেশিক নির্বাচন। কৃষক প্রজা পার্টি বা কেপিপির ঝুলিতে ৩৬। লীগ ৩৭। কংগ্রেস ৫৪! 

 কংগ্রেস বৃটিশ অপশাসনের প্রতিবাদে বাংলায় সরকার গঠনে গেল না । ফলে কৃষক প্রজাপার্টি-এবং লীগ হাত মেলালো।  এটি ছিল কংগ্রেসের সব থেকে বড় ভুল যা বাঙালী মুসলমানদের লীগের দিকে ঠেকে দেয়।


 কিন্ত কেন কংগ্রেস ফজলুক হকের সমর্থনে বা তার সমর্থনে সরকার না গড়ে, মাঝখানে বয়কট করে? বৃটিশ বিরোধিতা না সেটা ছিল নেহাতই একটা অজুহাত? কারন অন্য ৬টা প্রদেশেত কংগ্রেস সরকার গড়েছিল! 

 এর মূল কারন ফজলুলহকের মূল দাবী- ভূমিসংস্কার।  ভূমি সংস্কারের দিকে হাঁটলে কংগ্রেস হিন্দু জমিদারদের সমর্থন হারাত।   মনে রাখতে হবে কলকাতার হিন্দু জমিদারদের চাঁদা ছিল কংগ্রেসের মূল চালিকা শক্তি।  আবার সরকারে গিয়ে ভূমি সংস্কারের বিরোধিতা করলে কংগ্রেসের "প্রগ্রেসিভ" ভাবমূর্তি ধাক্কা খেত। ফলে কায়দা করে কংগ্রেস এই উভয়সংকট নিরসনে সরকার গঠন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অজুহাত খাড়া করে বৃটিশ বিরোধিতা। 

 এর ফল হয় মারাত্মক। ফজলুক হক লীগের সমর্থনে সরকার গঠন করলেন। ফলে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পূর্ন ভাবেই মুসলমানদের  ( অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানরা ছিল ৫৪% )  হাতে চলে যায়।  কেপিপি এসেই ভূমিসংস্কারের দিকে মন দেয় এবং ১৯৩৮ সালের বেঙ্গল টেনান্সি এক্টের এমেন্ডমেন্ট চালু করার চেষ্টা করে। ফজলুল হক  যথারীতি লীগের জমিদারদের সমর্থন পায় নি এবং লীগ কেপিপির অধিকাংশ মেম্বারকেই ভাগিয়ে নেয়।   প্রধানমন্ত্রী হক চাকরিতেও মুসলমানদের সমানুপাতিক হারে (৫৪%) সংরক্ষন চালু করলেন। কংগ্রেস এবারও নীরব। শুধু শ্যামাপ্রসাদ প্রতিবাদ করলেন।  হিন্দুরা দেখল, কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষাতেও আগ্রহী না। ফলে বাংলায় হিন্দু মহাসভাকে নিয়ে আসলেন শ্যামা প্রসাদ। 

 কংগ্রেসের ইতিহাসের সব থেকে বড় সমস্যা এটাই যে ক্ষমতা দখল করা ছাড়া ঐতিহাসিক ভাবে এই পার্টিটার কোন আদর্শ কোনকালেই ছিল না।  ফলে তারা না মুসলমান ভাগচাষিদের সমর্থনে আসতে পারল- না হিন্দুদের সমর্থনে কিছু করতে পারল। মুসলীম লীগ-কৃষক প্রজাপার্টির গোষ্ঠিবন্ধনে বাংলায় দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং দেশভাগের ভিত পাকা হয়।  ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে যেখানে পাকিস্তানের দাবী প্রথম পাঠ হয় ( যদিও অনেকেই  তা মানতে চান না )  ফজলুল হক তা সমর্থন করলেন। 

 ইতিহাসে আইরনী। ফজলুল হক ১৯৩০ সালে আল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্স ছিলেন। অর্থাৎ তখন তিনি লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিই ছিলেন। লীগের দিকে ঝুঁকে পড়লেন শ্রেফ কংগ্রেসের ভুলে ।    হিন্দু জমিদারদের চাপে   ফজলুল হকের সাথে কংগ্রেস সরকার গঠন করল না।  বেঙ্গল টেনান্সি এক্ট সমর্থন করল না।  বাংলার মুসলমানরা এমনিতেই বঙ্গভঙ্গ বিরোধি আন্দোলনে হিন্দুদের ভূমিকায় ক্রদ্ধ -কংগ্রেসকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এই অবস্থায় বাংলায় দুই মেজর মুসলিম পার্টিকে কাছাকাছি আসতে দিলে, তার ভবিষ্যত ফল কি হতে পারে, একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝবে।  কংগ্রেসের নেতৃত্ব বোঝে নি? বুঝেছে। কিন্ত কংগ্রেস কোনদিনই জনগনের পার্টি ছিল না।  হিন্দু জমিদার এবং ব্যবসায়ীদের পয়সায় চলা পার্টিটী আরো অনেক জায়গায়তেই মুসলিম আঞ্চলিক পার্টিগুলি-যারা ছিল লীগ বিরোধি-তাদের ও বিরোধিতা করতে গিয়ে এদেরকে উলটে লীগের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। 

(৩) 
এবার আসি পাঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট পার্টির ইতিহাসে। যারা জন্মলগ্নে  কট্টর লীগ বিরোধি।  । দ্বিজাতি তত্ত্ব সমর্থন করত। কিন্ত পাকিস্তান সমর্থন করে নি।  ঐক্যবদ্ধ ভারত এরাও চেয়েছিল।   এর প্রতিষ্ঠাতা স্যার সিকান্দার হায়াত খান। উনি পাঞ্চাবের তখন অন্যতম বৃহত্তম শিল্পপতি।    পাঞ্জাবের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং লাহোর প্রস্তাবের একজন সমর্থক। ১৯৩৪ সাল থেকে ৪৬, পাঞ্চাবের সব নির্বাচনে এরা কংগ্রেস এবং লীগকে হারিয়েছে।   মনে রাখতে হবে, লাহোরে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের দাবীতে যে দুজনের সমর্থন সব থেকে গুরুত্বপূর্ন ছিল- তারা ছিলেন এই স্যার সিকান্দার হায়াত খান এবং ফজলুল হক।   ভারতের দুই সমৃদ্ধতম প্রদেশ পাঞ্জাব এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী।  অদ্ভুত ভাবে দুজনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু লীগের বিরোধিতা দিয়েই।  কিন্ত ১৯৩৭ সালে দুজনেই আবার জিন্নার সাথে হাত মেলালেন। কেন? 

 সোজা কথায় কংগ্রেসের ক্ষমতার লোভ। কংগ্রেসের নিজস্ব মুসলমান নেতা এবং ভোট দুই ছিল। কিন্ত ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে এটা পরিস্কার হয়, আঞ্চলিক মুসলমান দল গুলির দিকে মুসলমান ভোট ঝুঁকে পড়েছে। লীগ এবং এইসব আঞ্চলিক দলগুলো থেকে মুসলমান ভোট টানবার জন্য কংগ্রেস দুটো পন্থা নেয়। 


 এক, কংগ্রেসে মুসলমান নেতারা মুসলমানদের সাথে গ্রাস্রুট সংযোগ শুরু করে। উদ্দেশ্য মুসলমান ভোটকে কংগ্রেসে ফেরানো।  দুই এই কাজে তারা ভারতের মৌলবী সহ বাকি সব গুরুত্বপূর্ন ইসলামিক থিওলজিস্ট মানে সব মৌলনা, মৌলভীদের সংগঠনগুলোকে পাশে পায়।  মোমিন কনফারেন্স, জামাতই উলেমা হিন্দ , মজলিস- প্রায় সব শিয়া এবং সুন্নী মৌলনাদের সংগঠন কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ায়।  এবং এরা মুসলমানদেরকে বলে কংগ্রেস সাপোর্ট করতে।  জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং পাকিস্তানের দাবীকে না সাপোর্ট করতে।  এটাই জিন্না এবং আঞ্চলিক পার্টির নেতা যেমন ফজলুল হক এবং সিকান্দার হায়াতকে লীগের দিকে যেতে বাধ্য করে। 

 কংগ্রেসের চালে ভুল কোথায় ? 

  প্রথমে দেখতে হবে মুসলমান মৌলনা মৌল্ভীরা লীগকে সমর্থন না করে, আঞ্চলিক মুসলমান পার্টিগুলিকে সমর্থন না করে কেন কংগ্রেসকে সমর্থন করতে গেল ?

   এর কারন ও সেই মৌলনাদের  ক্ষমতার লোভ। ভারতে এইসব মৌলনা মৌলভীর ক্ষমতার কেন্দ্র হচ্ছে উত্তরপ্রদেশ। এদিকে মুসলমান পাল্লা ভারী বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধে।  মুসলিম লীগ এলিট ব্যারিস্টার জমিদার মুস্লিমদের সংগঠন। সেখানে মৌলনাদের কেউ পাত্তা দিত না। ইউনিয়নিস্ট পার্টিও সেকুলার- সেখানে তারা মুসলমান ব্যবসায়ী, জমিদারদের স্বার্থ দেখতে ব্যস্ত। ইউনিয়ানিস্ট পার্টিতেও  মৌলনাদের  কেউ পাত্তা দিত না।


  একমাত্র গান্ধী  এবং কংগ্রেস এইসব মৌলনাদের পাত্তা দিতেন গরীব মুসলমানদের কাছে ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে পৌছানোর জন্য। শুধু তাই না। ভারত স্বাধীন হলে যে মুসলমান পারসোনাল আইন চালু থাকবে, সেই প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হল তাদের।  যে প্রতিশ্রুতির কারনে ভারতে হিন্দু পারসোনাল ল বিলুপ্ত হয়, কিন্ত মুসলীম পারসোনাল ল থেকে গেছে। মুসলমান ধর্মগুরুদের তুষ্ট করা-  লীগকে কাউন্টার করার এটাই উপায় ভাবলেন কংগ্রেসের নেতারা। 

     বাংলা বা পাঞ্চাবে এই আঞ্চলিক পার্টিগুলির নেতারা স্থানীয় মুসলমানদের ওপর অনেক বেশী প্রভাব রাখত ।  পাঞ্জাবের একজন ভূমিপূত্র মুসলমান  পাঞ্জাবী ভাষায় তার মুসলমান জমিদারের কথা শুনবে, না হাজার কিলোমিটার দূরে দেওবান্দি মৌলনাদের উর্দু ফরমান শুনবে? যে উর্দু তারা নিজেরাও জানে না!

 কংগ্রেসের উচিত ছিল আঞ্চলিক নেতা সিকান্দার হায়াত খান বা ফজলুল হককে প্রতিদ্বন্দি না ভেবে, জমিদারদের স্বার্থ বাদ দিয়ে সরসরি এদের সাথে কোয়ালিশন তৈরী করা। যাতে জিন্না এদের  সাথে কোয়ালিশনে না যা যেতে পারে। বাংলা এবং পাঞ্চাব জিন্নার হাতে না গেলে, কোনদিনই পাকিস্তানের দাবি তোলার সাহস জিন্নার হত না।  এই দুটি প্রদেশ জিন্নাকে কংগ্রেস নেতৃত্ব উপহার দিল ফজলুল হক এবং সিকান্দার হায়াতের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করতে গিয়ে এবং তাদের অর্থের উৎস জমিদার শ্রেনীকে খুশী রাখার চেষ্টায়। 

(৪)
এবার দেখা যাক,  বাচা খান বা আবদুল গফফর খানের খুদাই খিদমতগারের পাঠানদের সংগ্রামের ইতিহাস । আমরা বাঙালীরা মনে করি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের থেকে আর কারুর বেশী অবদান নেই। সংগ্রামী রক্তের অনেকটাই বাঙালীরা হিন্দুদের। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে অনেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী পায় না বলে, মুসলমানরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহন করে নি বলে ধরে নেয়।  এই ভুল ভেঙে যাবে যদি কেউ খুদাই খিতমতগারের ইতিহাস চর্চা করে।  পাঠানদের এই পার্টি, বৃটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন সত্ত্বেও  যে রক্ত দিয়েছে, তা গোটা ভারতের ইতিহাসেই তুলনাহীন।  খুদাই খিদমতগার অবশ্য কংগ্রেসের প্রবল সমর্থক এবং জিন্নার ভয়ানক বিরোধি ছিল। 

১৯৩৯ সাল পর্যন্ত বৃটিশি পুলিশি দমন, জেল, গুলি কোন কিছুই  বাচা খানের সমর্থকদের দমাতে পারে নি। ১৯৩৭ এবং ৪৬ দুই নির্বাচনেই কংগ্রেসের সাথে জোটে খুদাই খিমতগার জিতেছে। বাচা খানের দাদা ড খান সাহিব নর্থ ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। 


 কিন্ত ১৯৩৯ সালের পর যখন মুসলীম লীগ এবং বৃটিশ হাত মেলালো, লীগের অনুরোধে বাচা খানের সমর্থন ভাঙার জন্য বৃটিশরা ধর্মীয় সুড়সুরি দেওয়া শুরু করে। লর্ড কানিঙ্ঘামের ১৯৪২ সালের ২৩শে সেপটেম্বর একটা খসড়া পলিসি পাওয়া যাচ্ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে লীগের ভলিউন্টিয়াদের মাধ্যমে বৃটিশরা স্থানীয় মৌলনা এবং খান (জমিদার) এর মধ্যে টাকা ছড়াচ্ছেন, যাতে তারা পাঠানদেরকে  লীগের সমর্থনে আনতে পারে।  এই স্থানীয় মৌলবাদিদের দিয়ে , লীগের সহায়তায় তারা বাচা খানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় 
     
    - বাচা খান গান্ধী তথা হিন্দুদের চর
   -   এরা জমিদারি প্রথা তুলে দেবে
   - মেয়েদের জন্য শিক্ষা চালু করবে/পর্দা প্রথা তুলে দেবে। বলা বাহুল্য এই খুদাই খিদমতগার নারী শিক্ষা এবং নারী প্রগতির পক্ষে ছিল। অনেক মেয়েরা পর্দা ছেরে বৃটিশ বিরোধি আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছিল। 

 ইনফ্যাক্ট সিন্ধ, বালুচিস্থানেও বৃটিশরা টাকা, পদ সব কিছুই দিয়েছে স্থানীয় মুসলমান নেতাদের লীগের কব্জায় আনতে। 
 
 অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বৃটিশরাজের অদম্য ইচ্ছাছিল পাকিস্তান তৈরী হৌক । জিন্না ছিল তাদের দাবার চালের মন্ত্রী।   পাকিস্তান বিরোধি সব মুসলমান রাজনৈতিক নেতা এবং দলগুলিকে ছলে বলে কৌশলে  শেষ করে দেওয়ার জন্য বৃটিশরাজ লীগের জন্য নিরলস কাজ করে গেছে । এর আরেকটা উদাহরন যেভাবে বৃটিশরা পাঞ্চাবের খাক্সার  মুভমেন্ট ধ্বংস করে। 

 ১৯৩১ সালে আল্লামা মাশরিকির নেতৃত্বে লাহোরে তৈরী হয় ্মুসলমান যুবকদের সংগঠন খাক্সার । একসময় এদের প্রায় চল্লিশ লাখ মেম্বার ছিল। আল্লামা ছিলেন তীব্র লীগ এবং জিন্না বিরোধি। এরা অনেকটা আর এস এসের ধাঁচে তৈরী সৈনিক অনুশাসনে বিশ্বাসী সংগঠন।   ইনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটেনের পক্ষে লড়ার জন্য ৩০,০০০ খাস্কার স্বেচ্ছাসেবক সৈনিক ও বৃটিশদের দিতে চেয়েছিলেন। কিন্ত এহেন বৃটিশ বফাদার মুসলমান নেতাকেও বৃটিশরা ১৯৪৩ সাল অব্দি মাদ্রাসে জেলে রাখে। কারন উনি অখন্ড ভারত চেয়েছিলেন!   তাকে জেলে রেখে, তার নেতাদের জেলে ভরে খাস্কার সংগঠন সম্পূর্ন ভেঙে দেয় বৃটিশ পুলিশ। কারন খাস্কার সংগঠন অক্ষত থাকলে পাঞ্জাবে দাঙ্গা করার সাহস পেত না লীগ।  দাঙ্গার সময় খাস্কার সংগঠনের সামান্যই বেঁচে ছিল এবং এরাই সাহায্য করেছে পাকিস্তানের হিন্দুদের এপারে আসতে। 

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের স্ট্রাটেজিক ভুল এবং বৃটিশদের টাকা, পুলিশ এডমিনিস্ট্রেশন -সব কিছু দিয়ে মুসলমান লীগ এবং পাকিস্তানের পথ পরিস্কার হয়। 

 কিন্ত চার্চিল কেন সর্বশক্তিদিয়ে পাকিস্তান চাইছিলেন ?  সেটা বুঝতে আমাদের যেতে হবে থার্ড মস্কো কনফারেন্সে - ১৯৪৩ অক্টবর ১৭-নভেম্বর ১২।  জার্মানরা সোভিয়েত ইউনিয়ানে হারছে। রেড আর্মি ওয়েস্টার্ন পুশ শুরু করে দিয়েছে।  চার্চিল-স্টালিন বৈঠকে যুদ্ধ পরবর্ত্তী পৃথিবী ম্যাপ আঁকা শুরু হয়ে গেছে। 

  ভারতের কমিউনিস্টরা কেন লীগের সাথে পাকিস্তান দাবীর সমর্থক ছিল- সেটা বুঝতেও তৃতীয় এবং চতুর্থ মস্কো বৈঠকের ইতিহাস জানা দরকার। এগুলো নিয়ে লিখব পরের কিস্তিতে।