Tuesday, December 29, 2020

লাভ জিহাদ, লাভ ম্যারেজ এবং পিছিয়ে যাওয়ার রাজনীতি

                                                                             (১) 

আজ মধ্যপ্রদেশে লাভ জিহাদ বিরোধি আইন পাশ হল ( যদিও খাতা কলমে নাম "ফ্রিডম অব রিলিওজিওন" বিল)। এর আগে আইন পাশ করেছে উত্তর প্রদেশ। আসাম, হরিয়ানা, কর্নাটক সহ বিজেপির শাসনাধীন সব রাজ্যই বলছে, তারাও আইন আনবে । পোষাকি নাম " ধর্মান্তকরন বিরোধি" বা "ধর্ম পালনের স্বাধীনতা" বিল। 

  আপাত দৃষ্টিতে বিলটি ধর্ম নিরেপেক্ষ যেহেতু তা সব ধর্মের লোকেদের জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য। বক্তব্য হচ্ছে,  কাউকে বিয়ে করে, ধর্মান্তকরন করা চলবে না।  আমি নিধার্মিক , ধর্ম তুলে দেওয়ার পক্ষের লোক। সুতরাং এই আইনে খারাপ কিছু দেখি না। কিন্ত মুশকিল হচ্ছে উত্তর প্রদেশে গত কয়েক সপ্তাহে এই নতুন আইনটি বহু মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করার কাজে লাগানো হয়েছে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাত্রীর ধর্মান্তকরন হয় নি বা হলেও তারা স্বেচ্ছায় করেছে বলে পুলিশের কাছে জানিয়েছে।  অর্থাৎ ভারতের আইনের ক্ষেত্রে যা হয়- ৯৯% ক্ষেত্রেই অপপ্রয়োগ -যেমন বধূ অত্যাচার নিবারন  আইন, আদতে বর অত্যাচার আইনে দাঁড়িয়েছে-এটিও সেই দিকেই যাচ্ছে। 


 লাভ জিহাদ ব্যাপারটা শ্রেফ গোয়েবেলিয় লেভেলের মিথ্যাচার। কেরালার খৃষ্ঠান, পাঞ্জাব, লন্ডনের সর্দার এবং কর্নাটকের হিন্দু সংগঠন গুলির যাবতীয় অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ বা নানান ইনভেস্টিগেশন থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা নেহাতই বিন্দুতে সিন্ধু। শুধু দুটো কেসের লাভ জিহাদ সাবস্টান্স আছে। প্রথমটা কেরলের     হাদিয়া কোর্ট কেস (২০১৭) । কেরালার ভাইকমের হোমিওপাথি ছাত্রী হাদিয়াকে ইসলামিক স্টেট   ব্রেইন ওয়াশ করে জেহাদি প্রেমিকা হতে।   গোটা বিশ্ব জুরেই নাবালিকাদের ভালনারাবিলিটি এক্সপ্লয়েট করেছে আই সিসিস। কিন্ত সেটা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদি কার্যকলাপ-এবং তাতে ভারতের কিছু মুসলমান ও জড়িত ছিল। কিন্ত তার সাথে প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া হিন্দু-মুসলমানের প্রেম ঘটিত বিবাহের কেসের কোন সম্পর্ক নেই।  দ্বিতীয়কেস টি জাতীয় শুটার তারা সহদেহর (২০১৮)। রাঁচিতে  রাকিবুল হাসান নামে এক মুসলমান যুবক  রঞ্জি কোহলি  হিন্দু নাম নিয়ে, তাকে বিয়ে করে। যা প্রতারনা।  এরকম কেস আরো কিছু থাকতে পারে। কিন্ত ভারতে ঘটে যাওয়া হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান বিবাহে যা ১% কেস ও না। 

কোন মুসলমান যুবক যদি হিন্দু নাম ভাঁড়িয়ে বিয়ে করে-তাহলে বর্তমান আইনের তিনটে ধারাতে তাকে জেল খাটানো যায়। আলাদা করে নতুন আনার কোন দরকার নেই। আনা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক আরো খারাপ করতে। রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে। 


                                                           (২)

এবার আসি আসল সমস্যায়।  রাজনীতি সমাজের প্রতিফলন। রাজনীতিবিদরা সেটাই করবেন, যাতে তারা ভোটারদের মন পান। তারাত মন জুগিয়ে চলার অভিনেতা।   ভারতবর্ষের অধিকাংশ হিন্দু মুসলমান পিতা মাতা, তাদের সন্তানদের অন্য ধর্মে বিয়ে দিতে চান না। কোন হিন্দু ছেলে যদি মুসলমান মেয়ে বিয়ে করে-বেশ কিছু ক্ষেত্রে তার শশুরবাড়ির লোক সেই ছেলেটি এবং মেয়েটিকে মেরে ফেলেছে হনার কিলিং হিসাবে।  একজন মুসলমান বাপ হনার কিলিং করে জেলে গিয়ে গর্ব বোধ করে যে সে ইসলামের সেবা করছে।  হিন্দু বাপেদের খুন করে জেলে যাওয়ার সাহস নেই -কিন্ত বিজেপির উত্থানে এখন রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে এসেছে। ফলে তারা আইন করে মুসলমান ছেলের সাথে তাদের মেয়ের বিয়ে আটকাচ্ছে।  এটা হচ্ছে সোজা সাপ্টা সত্য। 

 প্রশ্ন হচ্ছে এইভাবে আইন করে কি প্রেমের বিয়ে আটকানো যাবে না তা উচিত?

 ইতিহাসে তাকানো যাক।  

 প্রেম, সেক্স , বিয়ে- এই তিনটি আলাদা, সম্পূর্ন আলাদা শব্দ। 

 সেক্স হচ্ছে ইন্ট্রিগ্রাল বায়োলজিক্যাল প্রসেস-যা কালচারাল, বা লিগ্যাল না-প্রানীর সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। 

 বিয়ে হচ্ছে লিগ্যাল কনস্ট্রাক্ট-ইতিহাসে যার জন্ম মেসোপটেমিয় সভ্যতায় ৪০০০ বছর আগে।  বিয়ের উতপত্তির কারন প্রাইভেট প্রপার্টি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্থান।  ঐতিহাসিক ভাবে এবং আজ থেকে দুশো বছর আগেও বিয়ে করার একমাত্র কারন ছিল সন্তানের জন্ম-যে হবে উত্তরাধিকারি। বিয়ের সাথে প্রেমের কোন সম্পর্কই ছিল না।  বিয়ে ছিল একটা সামাজিক ডিউটি বা কর্তব্য। স্বামী স্ত্রীর প্রেম নেহাত আধুনিক ধারনা। 

  এখনো অনেক আদিবাসি সমাজ, যাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেই-সেইসব সমাজে বিয়ে বলে কোন প্রথা নেই। 

 প্রেম হচ্ছে সাংস্কৃতিক কনস্ট্রাক্ট।  প্রেম হচ্ছে অনুভূতি এবং ফুলফিলমেন্ট-অনেকটাই ডোপামিনের মোহ। প্রাচীন সাহিত্যে প্রেম পাওয়া গেলেও- " প্রেম করে বিবাহ" ব্যাপারটা গোটা পৃথিবীতেই আধুনিক ধারনা। জন্মস্থল ইংল্যান্ডের উনবিংশ শতক। তার আগে পর্যন্ত ধরা হত, প্রেম এবং বিবাহ হচ্ছে তেলে জলে। প্রেম বিবাহের ভার বইতে অক্ষম! 

 প্রেম করে বিবাহ ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের দান। এর তিনটে কারন আছে। শিল্প বিপ্লবের ফলে তিনটে পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। এক, টেক্সটাইল শিল্পে মেয়েরা শ্রমিক হিসাবে যোগ দেওয়াতে তারা পরিবার থেকে কিছুটা হলেও স্বাধীনতা পায়-যাতে তারা পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস পায়।  দ্বিতীয় হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবার থেকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির জন্ম।  নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য অনেক বেশী সময় পায়। ফলে আগে জয়েন্ট ফ্যামিলিতে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে সপ্তাহে এক ঘন্টাও পেত না। দরকার ও হত না।  বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের ভার সামলাতেই তার সময় চলে যেত। কিন্ত নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির উত্থানে নারী-পুরুষ উভয়েরই সেই পার্টনারের দরকার হল, যার সাথে তাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হবে।  তৃতীয় গুরুত্বপূর্ন বিবর্তন-শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে মানুষের জীবন সংগ্রাম কমে। শিল্প বিপ্লবের আগে প্রতিটা সাধারন মানুষকে প্রতিটা দিন প্রকৃতির সাথে, লোকাল ট্যাক্স কালেক্টরের সাথে , যুদ্ধের সাথে ঝুঝতে হত। প্রায় পশুর মতন ছিল বেঁচে থাকা। সেখানে প্রেম ঢোকা মুশকিল। সন্তান এবং সেক্স ছাড়া কিছু ছিল না। কিন্ত শিল্প বিপ্লবের ফলে যে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর উদয় হল, তাদের জীবন অনেক ইজি। তারা সাহিত্য সঙ্গীত শিল্পে জীবনকে স্পর্ষ করছে যা আগে  এক্সক্লুসিভ ছিল শুধু ধনী এবং রাজউজিরদের। ফলে জীবনে পশুর মতন বেঁচে থাকা ছাড়াও "ফুলফিলমেন্ট" বা "পূর্নতার" ধারনার সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরী হয়। 

জেন অস্টিনের রোম্যান্টিক উপন্যাসগুলির এটিই প্রেক্ষাপট। এই উনবিংশ শতাব্দিতে শুধু উপন্যাসেই না, বাস্তবেও ইংল্যান্ডে মেয়ের বাবারা, প্রেমে  খাপ্পা হয়ে জামাইকে পিটিয়েছে, মেরে ফেলেছে, তার বিস্তর উদাহরন আছে।  সুতরাং আজ যা ভারতে দেখছেন, পাকিস্তানে আফগানিস্তানে যা ক্যান্সারের মতন আছে, সেই অনার কিলিং বা লাভ জিহাদ আইন আসলে একটা প্রাচীন রক্ষনশীল সংস্কারের প্রতিফলন। যেখানে "সন্তানেরা"  পরিবারের  সম্পদ এবং তাদের "বিবাহ" সামাজিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করা ( ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যবসা, রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে রাজনীতি) । প্রাক শিল্প বিপ্লবের সমাজে এটাই হত- কারন বিবাহে প্রেমের দরকার হত না।  


                                                               (৩)

অধিকাংশ ভারতীয় উচ্চশিক্ষিত উচ্চপ্রতিষ্ঠিত মুসলমান ছেলেরা হিন্দু মেয়ে বিয়ে করে। সেটা মোটেও লাভ জিহাদ না। প্রাক্টিক্যাল ইস্যু। কারন ভারতীয় মুসলমান বাপেরা মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত উদার আধুনিক করে গড়ে তোলে না। ফলে অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত মুসলমান ছেলেদের মধ্যে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার  প্রবনতা আছে। কারন একজন পি এই চ ডি করা মুসলিম ছেলে কি করে স্কুল ড্রপ আউট একটা মুসলমান মেয়ের সাথে সারা জীবন কাটাবে????  ফলে এই বিবাহগুলি তাদের এবং  তাদের হিন্দু প্রেমিকাদের জন্য প্রাক্টিক্যাল কনসিডারেশন। এর মধ্যে দু একটি কেসে হয়ত মেয়েটিকে ইসলাম গ্রহনের জন্য শশুর বাড়ি থেকে চাপ দেয়। তবে আমার বন্ধু সার্কেলে এমন কেস দেখিনি। সুতরাং কত % কেসে ইসলাম গ্রহনের জন্য চাপ দেওয়া হয়, আমার জানা নেই। % খুব কম হবে বলেই মনে হয়। 

এখন আপনি বলবেন ইসলামিক আইনে মুসলমানরা অমুসলমানকে বিয়ে করতে পারে না। ফলে অনেক হিন্দু ছেলে বা মেয়ে ইসলাম কবুল করে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। তবে ভারতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্ত স্পেশাল ম্যারেজ এক্টেই বিয়েটা হয়।  আমিও খুব পরিস্কার ভাবেই বিয়ের জন্য ধর্ম বদলানোর বিরোধি। ধর্ম জিনিসটাই আমার কাছে বলদের খাটাল। এবার কেউ যদি বলে এক খাটাল থেকে অন্য খাটালে নাম লেখাচ্ছি-সেটা শ্রেফ নির্বুদ্ধিতা। 

এখানে ইসলাম কি বলে, হিন্দু কাস্ট সিস্টেম কি বলে তাই দিয়ে বিচার করলে সর্বনাশ।  ভারত পিছিয়ে ছিল। তাই থাকবে। পার ক্যাপিটা জিডিপিই বলুন বা হিউম্যান ডেভেল্পমেন্ট ইন্ডেক্স- ভারতের স্থান ১৮৮টা দেশের মধ্যে ১৩০-১৫০ এর মধ্যে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত পিছিয়েছে। এগোয় নি। কংগ্রেস-বিজেপি-এদের সবাই ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ। বেসিক্যালি দেশটা ধর্ম জাতের পাঁকে আটকে। মার্কেট ইকনমি ছাড়া ভারতের এগোনোর কোন পথ নেই। 

মার্কেট ইকনমি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের জন্য নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি দরকার-আর নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির জন্য লাভ ম্যারেজের সংখ্যা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাবেই।  প্রেম এবং পকেট দেখেই বিয়ে হবে। ডিভোর্স ও বাড়বে। একটা দেশের অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, হিউমান ইন্ডেক্স এগোলে- এগুলো হবেই।  লাভ ম্যারেজ একটা মার্কেট ফোর্স। একজন কর্মী এখন বাবা-মায়ের সাথে থাকে না। সে যদি মনের মতন সঙ্গী সঙ্গীনি না পায়-তার লাভ লাইফ, তার সেক্স লাইফ আনফুলফিল্ড থাকে- তার প্রোডাক্টিভিটি ক্রিয়েটিভিটি কমতে ব্যর্থ। 

আমি জানি এই লেখার জন্য প্রচুর হিন্দু আমাকে গালাগাল দেবে। বচন -আপনি মুসলমানদের চেনেন না ( মানে তারা কিরকম গোড়া, গলাকাটার জাত ইত্যাদি ইত্যাদি)। 

 তাদের জানাতে চাই -আমি ইতিহাসের পড়ে অতীতকে জানার চেষ্টা করি। আর প্রযুক্তিবিদ হিসাবে ভবিষ্যতটা দেখতে পাই। ভবিষ্যতের ছেলে মেয়েরা এইসব ইসলাম হিন্দুত্ব মানবে না। কারন গান, নাচ, সাহিত্য, সিনেমা, শিল্প মানুষকে যে জীবনের পূর্নতা দেয় -ধর্ম তা পারে না-ওটা নেহাতই মধ্যযুগীয় কনস্ট্রাক্ট। এই স্যোশাল মিডিয়ার যুগে ধর্মের  কৃত্রিম  বাঁধ সর্বত্র ভাংছে।  আগামী প্রজন্ম ওই কট্টর ধর্মে থাকবে না।  আমেরিকাতে হিন্দু এবং মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রজন্মে কট্টর ধার্মিক পাওয়া মুশকিল।   আগামী দিনের প্রজন্ম সবাই মিলে একসাথে দিওয়ালি, ইদ, ক্রীসমাস  পালন করবে-ধর্মর অনুশাসন খুব হাল্কা মানবে। কারন সেই "মার্কেট"।  আপনারা চাইলেও হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্ঠান বিবাহ আটকাতে পারবেন না। কারন আপনি নিজেকে মুসলমান, হিন্দু, খ্রীষ্ঠান মনে করেন। আপনার ছেলে মেয়েরা গুগুল জেনারেশন । তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচিতি মানবে না। কারন তারা গ্লোবালাইজেশনের সন্তান।

তাই আপনারা লাভ জিহাদ প্রতিরোধ আইনে যতই খুশী হোন-ইতিহাস এটাই বলবে -ভারত একসময় সৌদি আরব, পাকিস্তান হওয়ার চেষ্টা করেছিল। 






Monday, December 21, 2020

সান জু, প্রশান্ত কিশোর এবং ২০২১ এর বঙ্গ বিধানসভা যুদ্ধ

 

সান জু, প্রশান্ত কিশোর এবং ২০২১ এর বঙ্গ বিধানসভা যুদ্ধ

          -বিপ্লব পাল,  ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২০

                                                                        (১)

চীনে ঝাও সাম্রাজ্যের অবসানে গোটাদেশে সাতটা নতুন রাজ্য তৈরী হয়। সেটা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। রাজ্য এবং রাজা মানেই আধিপত্যকামী। ফলে রাজ্যগুলোর মধ্যে  যুদ্ধ লেগেই থাকত। এর মধ্যে চীনের পূর্বে উই প্রদেশের রাজা হেলু,  সান জু ( মাস্টার সান)  নামে এক উচ্চভিলাসী স্ট্রাটেজিস্টকে “হায়ার” করলেন। আসলে উই ছিল একটা ছোট রাজ্য। তার পাশেই বিশাল রাজ্য চু। যার সামরিক শক্তি উই এর দশগুন! চু কোন না কোনদিন উইকে আক্রমন করে, গিলে খাবে-এই দেওয়াল লিখন রাজা হেলু জানতেন। ফলে সারা চীন দেশ খুঁজে তিনি এমন একজন ধুরন্দর “স্ট্রাটেজিস্ট”কে নিয়ে আসলেন, যিনি রণকৌশলে নিপুন। সামরিক শক্তি ১ঃ ১০ হলেও ভয় পান না- সেই অনুযায়ী স্ট্রাটেজি নামান!  ইনিই হচ্ছে আর্ট অব ওয়ার গ্রন্থের লেখক সান জু। যার নাম এখন গোটা বিশ্ব মানে, আর্ট অব ওয়ার গ্রন্থের লেখক হিসাবে।

 

রাজা হেলু ভাবলেন , মাস্টার সান কেমন বিখ্যাত স্ট্রাটেজিস্ট পরীক্ষা নেওয়া যাক। হেলু বললেন, আমার প্রায় ৩৪০ জন রক্ষিতা আছে। তুমি তাদের ট্রেনিং দিয়ে সেনা বাহিনীর মতন সুশিক্ষিত ডিসিপ্লিনড আর্মি বানাতে পারবে?

 

মাস্টার সান জু বললেন পারব। তবে শর্ত হচ্ছে, আপনাকে আমার কথা শুনতে হবে। আপনি “ইন্টারফেয়ার” করতে পারবেন না।  রাজা হেলু মেনে নিলেন।

 

  সান জু সমস্ত প্রাসাদ রক্ষিতাদের দুটো দলে, দুই প্ল্যাটুনে ভাগ করে দাঁড় করালেন। দুই দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন, রাজার প্রিয়তমা দুই নারীকে। তাদেরকে করা হল প্লেটুন অফিসার। প্রথমে তাদের সেনা বাহিনীর ড্রিল শেখানো হল। যে বাদ্যের তালে তালে এই ভাবে পা ফেলতে হবে।

 

 ড্রিল শেখানোর পর বাদ্য বাজানো হল। দেখা গেল কোন রক্ষিতাই সামরিক তালে পা ফেলছে না। তারা হেসে কুটোকুটি। আর তাদের অফিসার -রাজার প্রিয় দুই রক্ষিতার ভ্রুক্ষেপ নেই। তারাও হাসছে।

 

  সান জু রাজার দুই প্রিয় মহিলাকে  বল্লেন, দেখ প্রথম বারের ব্যর্থতা -আমার ব্যর্থতা। যে হয়ত আমি শেখাতে পারি নি। পরের বার ও যদি এই ৩৪০জন সামরিক কায়দায় পা ফেলতে ব্যর্থ হয় সেটা হবে তোমাদের ব্যর্থতা।

 

 আবার সামরিক বাদ্য বাজল। এবারও মেয়েরা হেসেই আকুল।  দুই মহিলা অফিসার হাসি ঠাট্টাতেই মেতে রইলেন।

 

 সান জু, পেয়াদাকে বল্লেন তলোয়ার দিয়ে দুই মহিলা অফিসার তথা রাজার প্রিয় রক্ষিতাদ্বয়ের মাথা কেটে ফেলতে। রাজা হেলু মহা খাপ্পা। বলে, আরে মাস্টার সান কর কি। অবলার জীব। এরা মারা গেলে আমার শৃঙ্গার  প্রেমের কি হবে বাছা? আমি ত এমনি মস্করা করছিলাম। মেয়েদের দিয়ে কি আর সামরিক ড্রিল হয়?

 

  সান জু বল্লেন মহারাজ, আপনার কি মনে হয় আপনার দশ হাজার সেনা, চু এর এক লাখ সেনাকে হারাতে পারবে?  মেয়েরা সেনানী হতে পারার মতন সেটাও ত অবিশ্বাস্য না? আপনি যখন আমাকে দ্বায়িত্ব দিয়েইছেন, কাজটা করতে দিন।

 

 রাজা হেলু দেখলেন সান জুর কথায় ধক আছে। রাজার প্রিয়তমা দুই রক্ষিতার গর্দন নেওয়া হল। এবার নতুন দুজন ডেপুটিকে আনা হল নেতৃত্বের জন্য-যারা পুরো ঘটনাটা দেখেছে। আবার সামরিক বাদ্য বেজে উঠল। এবার কোন মেয়ের সামরিক তালে ভুল হল না।

 

 সান জু দেখালেন যাদের দিয়ে যুদ্ধ হবে না মনে হচ্ছে, তাদের দিয়েও সেরা সেনানী বানানো যায়, যদি “স্টাটেজি” ঠিক থাকে। বোজুর যুদ্ধে রাজা হেলুর মাত্র ২০ হাজার সেনা, চু এর দু লাখ সেনা বাহিনীকে কচুকাটা করে।

 

                                                             (২)

প্রশান্ত কিশোর এক বিংশ শতাব্দিতে ভারতের সান জু। ভোট যুদ্ধে জিততে যাকে স্ট্রাটিজিস্ট হিসাবে ভাড়া করা হয়। প্রশান্ত কিশোর ২০১৪ সালে মোদির বিজয়, ২০১৫ সালে বিহারে নীতিশ, ২০১৯ সালে জগন এবং কেজরিওয়ালকে জিতিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমান দিয়েছেন। কিন্ত তিনি উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস-সমাজবাদির জোটের হয়ে চূড়ান্ত ব্যর্থ। কারন, কংগ্রেসের মাঝারি নেতৃত্ব তার কথা শোনে নি। ডিসিপ্লিনহীন পার্টিতে তিনি কিছুই করতে পারেন নি।

 

 এবার দেখুন। যারা বিজেপিতে যাচ্ছে তারা পিকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। এবং তৃনমূলে যারা টিকে আছে তাদের অনেকেই পিকের কাজকর্মে অখুশী। কেন? কারন তাদের রিপোর্ট কার্ড, দুর্নীতি, ভালকাজ, গ্রহনযোগ্যতা সব কিছুই পিকের আইপ্যাকের মাধ্যমে দিদির কাছে পৌছে যাচ্ছে। পিকের টিম দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর, সামান্য সার্ভে করেই বুঝেছিলেন সীমাহীন দুর্নীতির কারনে তৃনমূলের মাটি সরে যাচ্ছে। ফলে তিনি তৃনমূলের নেতাদের গোপন এসেসমেন্ট চালু করেন। তাতেই নেতারা ক্ষাপ্পা।

 

পিকের বিরুদ্ধে মমতা ব্যানার্জি অনেক অভিযোগ পেয়েছেন। কিন্ত শুনলেন না কেন? কেন শুভেন্দুর সাথে একবারও দেখা করলেন না? একটু কেমন ঠেকছে না? মমতা ব্যানার্জি এবং প্রশান্ত কিশোর একটা নির্দিষ্ট স্ট্রাটেজি নিয়ে না চললে, এমনটা হওয়ার কথা না। সান জুর মতন নিশ্চিত পিকেও শর্ত রেখেছেন, যতই প্রিয়তম হোক, স্ট্রাটেজি অনুযায়ী ঘ্যাঁচাত করতে হলে করতে হবে। শুভেন্দুকে পিকের পরিকল্পনা মাফিক ঘ্যাঁচাত করা হয়েছে। নইলে শুভেন্দুকে রাখতে ম্যাডাম নিজে মাঠে নামতেন। বাকীদের ক্ষেত্রেও সেটা সত্য। কারন এরা দলে থাকা অবস্থায় পিকের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ করেছে। কিন্ত ম্যাডাম পাত্তা দিচ্ছেন না। এবং তারা দলত্যাগ করছে। ম্যাডাম কি এতই বোকা যে এর পরেও পিকের ওপর জেতার জন্য ভরসা রাখছেন?

 

এবং পিকেও হুঙ্কার ছাড়ছেন বিজেপি ১০০ পেরোতে পারবে না? ১০০ ছাড়ালে পিকে আর কোনদিন স্ট্রাটেজিস্টদের কাজ করবেন না!

 

 দাবা খেলায় জিততে হলে বোরে, নৌকা ইচ্ছা করেই অনেক সময় খাওয়াতে হয়।

 

 কিন্ত এক্ষেত্রে পিকে এবং দিদির চালটা কি সেটা বোঝা যাচ্ছে না। পিকের টিম  জেলায় জেলায় ঘুরে প্রতিটা কেন্দ্রে ভাল পার্থী খুঁজেছেন। বামেদের কাছেও গেছেন। কিন্ত ভাল পার্থী পেয়েছেন এমন জানা নেই।

 

 সব ক্যাম্পেনেই পিকের তিনটে স্ট্রাটেজি থাকে

-       ভোটের মুখ। এক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি-ফলে সমস্যা নেই। উলটো দিকে এখনো শুন্য। লোকে মমতা ব্যানার্জিকে দেখেই ভোট দেবে বা দেবে না।

 

-        দুই ডিসিপ্লিন। পার্টর মধ্যে দ্বন্দ কমিয়ে কর্পরেট স্টাকচারে আনা। নেতাদের ইগো দিয়ে পার্টি না চালানো। লক্ষ্য করলে দেখবেন পিকে আসার পর তৃনমূলে গোষ্টিদ্বন্দ মিইয়ে গেছে। কারন দিদি কোন গোষ্টির কথাই শুনছেন না। শুনছেন পিকের টিমের ফিডব্যাক। ফলে অনেক গোষ্টির লোকেরা বিজেপিতে জয়েন করছে। এতে আখেরে তৃনমূলের সুবিধাই হচ্ছে। টিম ছোট হচ্ছে-কিন্ত ইউনিটি ডিসিপ্লিন -একটা কমন টার্গেটে কাজ করার ক্ষমতা বাড়ছে। এটাও সান জুর শিক্ষা।

 

-       জন সংযোগের প্রোগ্রাম। সেটাতে পিকে যথেষ্ট সফল।

 

 কিন্ত উলটো দিক ও আছে। শোভন, মুকুল , শুভেন্দু- এরা তৃনমূলের আসল মুখ। যতই দুর্নীতিপরায়ন হোক না কেন , এদের কর্মকুশলতা নিয়ে অভিযোগ নেই।  রাজনৈতিক কর্মী এবং কর্পরেট কর্মী এক না। একজন রাজনৈতিক কর্মী দলটাকে ভালোবেসে করে। একজন কর্পরেট কর্মী কোম্পানীকে ভালবেসে কাজ করে না-করে মাইনের জন্য।  সুতরাং একজন রাজনৈতিক কর্মীর আবেগ-ইগো থাকবেই,। সেটাকে অস্বীকার করে, তারা সবই পিকের কর্পরেট স্টাইল মেনে মাইনে করা চাকরের মতন কাজ করবে, এমনটা ভাবা কি ঠিক? আবার এটাও ঠিক-এই ভালোবাসা আবেগ এবং তার সাথে কিঞ্চিত উপরিপাওনার আশাতেই কিন্ত দলে গোষ্টী দ্বন্দ তৈরী হয়।

 

 দিদিকি তা জানেন না ? তাহলে পিকের কথা মেনে নিচ্ছেন কেন? কেন মেনে নিচ্ছেন দলের রক্তক্ষরন?

আমার ধারনা  সান হু, রাজা হেলুকে যে যুক্তি দিয়েছিলেন, সেটাই মমতা ব্যানার্জিকে দিয়েছেন পিকে। বিজেপির এখন লোকবল অর্থবল অনেক বেশী। দশগুন। সুতরাং বিজেপির হাতে পশ্চিম বঙ্গের পতন প্রায় নিশ্চিত। কেবল মাত্র একটা স্ট্রাটেজিই এক্ষেত্রে তৃনমূলের পক্ষে খাটবে। যদি গোটা তৃনমূল একটা ঐক্যবদ্ধ ডিসিপ্লিন্ড  পার্টী হিসাবে স্ট্রাটেজি অনুযায়ী খেলে যেতে পারে।  বিজেপিতে এত এত নেতা ঢোকা মানেই বিজেপি শক্তিশালী হচ্ছে এটা বলা যাবে না। এমনিতেই রাজ্য বিজেপিতে অনেক দল। যত বেনোজল ঢুকবে তাতে গোষ্ঠিদ্বন্দ বাড়বে। একত্রে কাজ করার ক্ষমতা কমবে । আর্ট অব ওয়ার বলে, বড় দল না , ঐক্যবদ্ধ দলই জেতে।

 

পশ্চিম বাংলা এখন ভারতের কুরুক্ষেত্র। একদিকে ভোট চানক্য অমিত শাহ। অন্যদিকে ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর। লড়াই জমবে। আমরা খেলা দেখি।

Saturday, December 12, 2020

ভারতীয় গণতন্ত্রে মধ্যবিত্তের ভবিষ্যত

 

ভারতীয় গণতন্ত্রে মধ্যবিত্তের ভবিষ্যত

    -বিপ্লব পাল, ১২/১২/২০২০

 

 ভারতের কৃষিবিল, কৃষি আন্দোলন, রেল/এয়ার ইন্ডিয়া/ পাবলিক কোম্পানীর বেসরকারিকরন, জিএসটি, ডিমনেটাইজেশন, অধুনা বেসরকারি কর্মচারীদের বেসিক বেঁধে তাদের ইনকামে বাঁশ দেওয়া – এই সব কিছুর মধ্যেই একটা প্যাটার্ন আছে।  সেই প্যাটার্নটা ধরতে পারলেই বুঝতে পারবেন, ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর ভবিষ্যত কোন দিকে এগোচ্ছে।  বেসিক্যালি কৃষি বিল কি? সরকার বর্তমানে যে ১০০ হাজার কোটি টাকার কৃষি ভর্তুকি দিতে বাধ্য হচ্ছে- তার সিংহ ভাগ যাচ্ছে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানার কৃষকদের হাতে। এবং যারা বর্তমানে বিজেপির বড় ভোট ব্যাঙ্ক না। বরং ভর্তুকি তুলে দিলে, ওতে আরো তিনটি স্কিম হয়ে যাবে যাতে অনেক বেশী ভোট কেনা যাবে। ফলে লে আও কৃষি বিল। সিম্পল ভোটগণিত।

 

বেসিক্যালি যেটা পরিষ্কার – বর্তমান কেন্দ্রীয় মোদি সরকারের উদ্দেশ্য দুটো। সরকারের আয় বাড়ানো। খরচ সাবসিডি কমানো।  এবং সরকারের এই আয় দিয়ে, দুটো শ্রেনীকে খুশী করা।

 

  এক, গরীব ভোটার-যারা ভোট দিয়ে রাজশাহী টেকাবে। তাদেরকে চিকিৎসা, বাথরুম, ইলেক্টিসিটি ইত্যাদি নানান যোজনার মাধ্যমে সরাসরি টাকা দেওয়া। অর্থাৎ ভোটারদের ঘুঁশ দেওয়া। কিন্ত ডেমোক্রাসিতে এটাই হওয়া উচিত।

 

  দুই, আম্বানী, আদবানী সহ গুটিকয় বৃহৎ ব্যবসায়ীদের জন্য বিরাট ব্যবসাক্ষেত্রে প্রস্তুত করা। কারন এই শ্রেনীটির টাকায় পার্টি চলবে। বিধান সভায় হেরেও ঘোড়া বেচাকেনার টাকা যোগাবে এরাই।

 

 অর্থাৎ ডেমোক্রাসির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং।

  এক, নাম্বার ব্যপারটাই ক্ষতি নেই। কিন্ত তাতে টাকা যোগাবে কে?  সরকারের বিরাট টাকা যায় কৃষি, এয়ার ইন্ডিয়া, রেলে ভর্তুকি দিতে। সুতরাং সরকার প্রথমেই ওইতিনটে যায়গায় হানা দিয়েছে। এই পর্যন্তও ঠিক ছিল। যে ট্যাক্সের টাকা গরীবদের কাছেই যাক। তাতে মার্কেট বাড়বে।

 

 এরপর আছে জি এস টির মাধ্যমে ইনকাম বাড়ানো। বেসরকারী কোম্পানী গুলি একটা বড় টাকা বাঁচায়, তাদের কর্মচারীদের বেসিক কম দেখিয়ে, আলায়ান্স বেশী রাখে। কারন বেসিকের ওপর এম্পয়মেন্ট ট্যাক্স দিতে হয়। সেখানেও হানা দিয়েছে মোদি সরকার। ফলে, অধিকাংশ বেসরকারি কর্মচারীদের টেকহোম ইনকাম কমবে। কারন কোম্পানীগুলিকে ট্যাক্স ব্যালান্স করতে হবে।

 

  এই টাকার পুরোটা ঐ গরীবদের স্কিমে গেলে বা আদানী আম্বানীর পদসেবায় গেলে, ঘোরতর মুশকিল আছে। কারন আপনি আমার ব্যবসা থেকে ১৮% ট্যাক্স তুলছেন। সেটা ব্যবসার জন্য তখুনি ভাল যখন ঐ ট্যাক্সের টাকাটা ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারনে সরকার লাগাবে। কিন্ত সেটা সরকার করছে না। চীনে একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার নিজে ব্যবসা শুরু করতে গেলে কিভাবে নানান দিক থেকে সরকারি সাহায্য পায় সেটা আমার নিজের চোখে দেখা। এই জিসটির টাকায় সরকার যদি ছোট ছোট ব্যবসা, ম্যানুফাকচারিং ইউনিট গুলিকে সাহায্য করত, যা চীন আমেরিকাতে করে-তাহলে ১৮% কেন ৩০% জি এস টিও ব্যবসার বৃদ্ধিতে সাহায্য করত।  কিন্ত বর্তমানে কি অবস্থা? ১৮% জি এস টি পে করে, ভারতের টেক্সটাইল বাংলাদেশের কাছে ১০০% হেরে বসে আছে।একেই ভারতের ম্যানুফাকচারিং ইউনিটগুলোর মারোয়াড়ী গুজরাটি মালিক।  আধুনিকরন, রিসার্চে টাকা লাগায় না।  ফলে যেসব ক্ষেত্রে ভারত আগে এক্সপোর্ট করত- ইলেক্ট্রিকাল গুডস, টেক্সটাইল সর্বত্রই ভারতের ইনকাম পড়তির দিকে।  এক দিকে মারোয়ারী, অন্যদিকে মোদি ট্যাক্স। ফলে ভারতে ম্যানুফাকচারিং এর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ।

 

 এবার মধ্যবিত্তর ভবিষ্যত দেখুন। মধ্যবিত্ত চাকরি প্রেমী বা ছোট ব্যবসা করে খায়। ট্যাক্সের চোটে ছোট ব্যবসার হাল আগেই লিখেছি।  মধ্যবিত্তের চাকরির তিনটে সেক্টর

 

   -সরকারি। এখানে সংকোচন চলছে। আরো চলবে। কারন সরকার যত কম সরকারি নিয়োগ দেবে, তত বেশী টাকা বাঁচবে স্কীমের জন্য-মানে ভোট ঘুঁশের জন্য। এখানে স্কোপ জিরো হতে চলেছে বা প্রায় তাই এখন

  

   -বেসরকারি  আই টি/ সফটোয়ার । এটা ভারতের মধ্যবিত্তকে এদ্দিন বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্ত কদ্দিন? অটোমেশনের ফলে, আই টি মার্কেট এখন তুখোর ছেলে মেয়েদের দরকার। সরকারি শিক্ষা আমূল ভাবে সাজানোর দরকার। সেসব কিস্যু হয় নি। চীনের শিক্ষার মানের সাথে ভারতের শিক্ষার মানের কোন তুলনা হয় না। ভারত এখন যোজন যোজন পেছনে।  এছাড়া আমেরিকা বর্তমানে নিজেই প্রচুর সফটোয়ার কর্মী প্রডিউস করার জন্য স্কুল লেভেল থেকেই সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্পেশালিজেশন দিচ্ছে। আগামী দশ বছরে, এই ক্ষেত্রে ভারতের ছেলে মেয়েদের স্কোপ বিরাট কমবে

 

 -ম্যানুফাকচারিং।  এক্ষেত্রে ডবল প্রবলেম। মাড়োয়ারী মালিকরা মাইনে ভাল দেবে না, রিসার্চে ইনভেস্ট করবে না। আর গোদের ওপর  বিষফোঁড়া মতন মোদিট্যাক্সে এরা কাহিল। মেইড ইন্ডিয়া জাস্ট বুলি। একটা রাইফেল ও আমেরিকা থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। রাফাল বা এফ-১৬ এর যন্ত্রাংশ ভারতে এসেম্বলি হবে-তাতে চাড্ডিরা লাফাচ্ছে বটে কিন্ত এটা ভুলে যাচ্ছে, আগে কোলকাতা, পুনেতে তৈরী মটোর গোটা বিশ্বে রপ্তানী হত। বর্তমানে ওই মার্কেট সম্পূর্ন চীনের। মাত্র ত্রিশ বছরে এই হাল কি করে হয়?

 

 আর বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রের কথা বাদ দিলাম। ওখানে শিক্ষকদের যা মাইনে দেয় তার থেকে অনেক বেশী ইনকাম করে হাওড়ার কুলিরা। তাদের দরিদ্র ক্লাসে ফেলা ছাড়া উপায় নেই।

 

 তাহলে মধ্যবিত্ত কি করবে? ওয়েল তৃনমূল ও একই ফর্মুলাতেই রাজ্য চালাচ্ছে। কারন এটাই বর্তমান গণতন্ত্রের উইনিং ফর্মুলা।  বিজেপি, তৃনমূলের মধ্যে স্ট্রাটেজিগত কোন পার্থক্য নেই, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রশ্নে।  এমন কি কংগ্রেসের সাথেও নেই। সুতরাং মধ্যবিত্তর স্বার্থের প্রশ্নে মধ্যবিত্তের পাশে কোন দলই নেই।  অথচ ফেসবুক হোয়াটসাপে এদের ছেলেমেয়েরাই  এইসব পার্টিগুলোর হয়ে বুক চিরে হনুমান হচ্ছে।

 

 পরে রইল বামেরা। ভারতের বামেরা কিন্ত কৃষক-শ্রমিকদের পার্টি না- মধ্যবিত্তদের স্বার্থ, সরকারি চাকরির স্বার্থ রক্ষা করা পার্টি। কিন্ত তারা ভারতে হেরে ভুত। কারন তারা বাকী পার্টিগুলোর মতন গরীব ভোটারদের ঘুঁশ দিতে ব্যর্থ। তারা মূলত মধ্যবিত্তের স্বার্থ দেখতে গিয়ে গরীবদের থেকে বিচ্ছিন্ন।  এছাড়া তাদের নেতাদের বালখিল্যের ন্যায় চলছে না চলবে নার ফলে, ম্যান্যফাকরিং ব্যবসার প্রচুর ক্ষতি হয়। সুতরাং তাদের নেতৃত্ব, স্ট্রাটেজি সব কিছুই কোন শ্রেনীর কাছেই ( সরকারি চাকুরিজীবি ছাড়া) গ্রহণযোগ্য না। তারা প্রমানিত ব্যর্থ।

 

  তাহলে উপায় কি?

 

 ইনফ্যাক্ট উপায় দেখাতে পারত পশ্চিম বঙ্গ।  যেটা বুদ্ধদেব শুরু করেছিলেন , ডেং জিয়াও পঙের মতন সরকারি নিয়ন্ত্রনে সরকারি সাহায্যে ম্যানুফাকচারিং বাড়ানো। তথ্য দেখলেই পরিস্কার হবে ডেং জিওয়াও পং বিংশ শতাব্দির শ্রেষ্ঠ নেতা। একটা ১৪০ কোটির দেশে, যার ১০০% দরিদ্র, সেই দেশের ৯০% কে মধ্যবিত্ত স্তরে নিয়ে এসেছেন মাত্র কুড়ি বছরে। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ এটা পারে নি।  কিন্ত বুদ্ধকে বোঝার মতন কেউ ছিল না। না উনার পার্টিতে। না ভারতে। না পশ্চিম বঙ্গে।

 

 কোন পার্টি এটা করবে জানি না। কিন্ত ভারতে ডেং বা পুতিনকে দরকার।  বর্তমান গণতান্ত্রিক ধারা চলতে থাকলে,  ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর কোন ভবিষ্যত নেই। তারা ব্যাঙাচির মতন বিজেপি, তৃনমূল সিপিএম কংগ্রেসের পক্ষে ফেসবুক হোয়াটসাআপে লিখে যাবে। কিন্ত বাস্তব হচ্ছে তাদের জন্য আর কেউ নেই।