Monday, November 23, 2020

বাঙালী নেতা এবং নেতৃত্ব- বাস্তব বনাম কল্পনা

 

বাঙালী নেতা এবং নেতৃত্ব- বাস্তব বনাম কল্পনা

   -বিপ্লব পাল, ১১/২৪/২০২০

 

()

বাঙালীদের মধ্যে নেতৃত্বের অভাব শুধু রাজনীতিতে না। ব্যবসা, খেলাধূলা, প্রশাসন সর্বত্রইতা প্রকট। ব্যতিক্রম কিছুটা বিজ্ঞান এবং গবেষনায়। সৌরভ গাঙ্গুলী বাঙালীদের মধ্যে নেহাতই বেমানান।

 

 নেতা কে?

 

 কেউ একজন সৎ, মহান দরদী মানুষ, আদর্শবাদি মানুষ হলেই মহান নেতা হন না। বরং ইতিহাস যারা বদলেছেন, একটা জাতিকে অন্ধকার থেকে তুলে বিশ্বের শ্রেষ্ট প্রভুর জাতে তুলেছেন, তারা অধিকাংশই ছিলেন নিষ্ঠুর, কঠোর। কিন্ত বুদ্ধিমান, সাহসী এবং দূরদর্শী।

 

যেমন ধরুন চেঙ্গিস খান। চীনের উত্তর-পূর্বের একটা ছোট জায়গা। ভারতের অরুনাচলের মতন। চেঙ্গিস খানের আগে ওদের না কেউ চিনত, না পুঁচত। কিন্ত এক চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা এশিয়া ইউরোপের অর্ধেক দখল করে বসল মাত্র পঞ্চাশ বছরে। আবার চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর একশো বছরের মধ্যে ইতিহাস থেকে মঙ্গোলরা হারিয়ে গেল। নেতা ছিল, তাই জাতিটা জাতে উঠে ছিল। চেঙ্গিস খান কোন মহান উদার লোক ছিলেন না। ছিলেন নিষ্ঠুর বুদ্ধিমান কর্মঠ দূরদর্শী।

 

অথবা আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট। গ্রীসে ম্যাসেডোনিয়াকে কেউ চিনত না। স্পার্টা এবং এথেন্স ছিল শ্রেষ্ঠ সিটি স্টেট। কিন্ত সেই ম্যাসেডোনিয়ার এক ছোট রাজা ফিলিপ এবং তার পুত্র আলেক্সান্ডার একদিন গোটা বিশ্ব জয় করে বসলেন। আলেক্সান্ডার সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে "গোল্ড" স্টান্ডার্ড। কাছাকাছি আসবেন জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়ান, কার্থিজের সেনাপতি হ্যানিবল, খালিদ ইবন আল ওয়ালিদ ( রসিদুন খিলাফতের প্রবাদ সেনাপতি ), এডমিরাল সান সিন ( কোরিয়া) এরা সবাই ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিলেন।

 

এদের নিজেদের আদর্শ অবশ্যই ছিল- জীবনের সামনে একটা আদর্শ না থাকলে নেতা কেন, একজন সাধারন মানুষ পথ চলতে পারে না। কিন্ত তাই দিয়ে নেতা হওয়া যায় না। ইনারা নেতা হতে পেরেছিলেন, কারন জনগন এইসব নেতাদের জন্য নিজের প্রান দিতে প্রস্তুত ছিল। নেতৃত্বের এটা হচ্ছে প্রথম গুন যে তারা তাদের ফলোয়ার বেস তৈরী করতে পারেন, যারা রক্ত এবং ঘাম ঝরানোর জন্য তৈরী থাকে। পরের ধাপ হচ্ছে যে তিনি তার জাতি এবং দেশকে উন্নত শিখরে নিয়ে যান।

 

রাজনৈতিক নেতার মুল্যায়নের    ক্ষেত্রে "রাজনীতি" এবং "দেশ"-এই দুটি আলাদা। কেউ তার আদর্শের রাজনীতিতে সফল হলেই, ইতিহাস তাকে সফল নেতা নাও বলতে পারে, যদি তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হোন।

 

আমি এক্ষেত্রে চীনের উদাহরন সামনে আনব। চীনে গত একশো বছরের নেতৃত্ব ছিল চার প্রবাদ প্রতিম ঐতিহাসিক নেতার কাছে-

সান ইয়াত সেন

চিয়াং কাইসেক

মাও যে দঙ

ডেঙ জিয়াও পিং

 

এর মধ্যে সান ইয়াত সেন এবং দেঙ, দুজনে রাজনীতি এবং দেশনেতা হিসাবে সফল। মাও শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রে সফল কারন তিনি চীনে কমিনিউস্ট বিপ্লবের জনক। কিন্ত রাষ্ট্রনেতা হিসাবে ব্যর্থ। তার কমিনিউস্ট পলিসির দরুন দুর্ভিক্ষে না খেতে পেতে পেয়ে অন্তত ৬০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ডেঙ জিয়াও পিং এর নেতৃত্বে, চিন আজ প্রযুক্তি এবং ব্যবসায় বিশ্বনেতা। মাত্র ত্রিশ বছরে পৃথিবীর বৃহত্তম দরিদ্র জনগনকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত করে বিশ্বনেতৃত্বে টেনেছেন।  নিরেপেক্ষ বিচারে শুধু চীন না, দেং সম্ভবত বিংশ শতাব্দির সেরা নেতা। তার যেতৃত্বে চীন    বিশ্বের অনুন্নত দেশ থেকে,  শ্রেষ্ঠ উন্নত দেশ হিসাবে উঠে এল।

 

ভারতে নেতা নেত্রীদের নিমোর্হ বিশ্লেষন করার সুযোগ কম। আবেগের মুলো খাওয়ার জন্য এত গরুছাগলের চাষ হয়েছে ভারতের এডুকেশন সিস্টেমে , কটু নির্মোহ সত্য এদের পেটে হজম হবে না।

 

                                                    (২)

 

আলেক্সান্ডারকে গোল্ড স্টান্ডার্ড ধরলে ভারতে সিলভার স্টান্ডার্ড সামরিক নেতা খুব বেশী খুঁজে পাওয়া যাবে না। শিবাজি, বালাজি বাজিরাও-, রঞ্জিত সিং, এরা ছিলেন। কিন্ত পৃথিবীর সর্বকালের সেরা মিলিটারি লিডারদের লিস্টে প্রথম ১০০ এর মধ্যে কোন ভারতীয়র দেখা পাওয়া যাবে না। শিবাজি মহারাজ একটি লিস্টে দেখলাম ১০২ নাম্বারে, আরেকটিতে ৯৩ নাম্বারে। ভারত থেকে আর কেউ নেই। এগুলো আমার বানানো লিস্ট না-যারা মিলিটারি ইতিহাসের চর্চা করেন, আমার থেকেও সামরিক ইতিহাস অনেক ভাল জানেন, তাদের বানানো লিস্ট।

 

কিন্ত সামরিক নেতৃত্বে না হোক, ভারত আধ্যাত্মিক ধার্মিক নেতৃত্বে অবশ্যই এগিয়ে। গৌতম বুদ্ধ, শ্রী চৈতন্য এবং মহত্মা গান্ধীর ফলোয়ার গোটা বিশ্বে এবং তারা বর্তমান বিশ্বের এক বিশাল অংশের মানুষকে প্রভাবিত করেছেন।

 

মুশকিল হচ্ছে, আমি এই আধ্যাত্মিক ললিপপ গিলতে রাজী না। ভারত ইসলাম এবং বৃটিশদের হাতে পদানত হয়েছে তার কারন ভারতে সমর্থ মিলিটারি জেনারেল ছিল না। বাংলা মোঘল এবং বৃটিশদের হাতে পরাধীন ছিল -কারন বাংলায় সামরিক নেতা ছিল না। ভারত এবং বাংলাকে এর খেয়ারত দিতে হয়েছে প্রচুর।  এই কঠিন সত্যকে  স্বীকার না করলে,   বাঙালী জাতি একদিন নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলবে।

 

কেন বলছি? আকবরের সময়ে গোটা বিশ্বের ২৭% জিডিপি ছিল ভারতের। আবার ভারতের জিডিপির ২৫% আসত বাংলা সুবা থেকে।  বাংলা শিল্পে ইউরোপের থেকে উন্নত ছিল। গোটা বাংলার জিডিপি ছিল ইউরোপের বেশী।

 

তাহলে ইউরোপের শিল্প বিপ্লব বাংলায় হওয়ার কথা? এশিয়ার জার্মানি হতে পারত বাংলা। কেন হল না? কেন বাংলা জার্মানি হয়ে উঠল না? ইতিহাসে গতিতে সেটাই হওয়া উচিত ছিল ?

 

কিন্ত হয় নি। কারন কোন সামরিক নেতা, নেতৃত্ব সেকালেও আসে নি- আজও নেই। ফলে বাংলা র‍য়ে গেছে মোঘল এবং বৃটিশদের হাতে। একটা জাতির উন্নয়নের জন্য তার স্বাধীনতার দরকার হয়। প্রুশিয়াতে বিসমার্ক না জন্মালে, আজকে জার্মান রাষ্ট্রের বদলে, জার্মানির একেক টুকরো ইউরোপের অন্য রাষ্ট্রের হত। বাংলায় বিসমার্কের মতন নেতা জন্মায় নি। ফলে বাঙালী জাতির ভাগ্য নিয়ে অন্যরা খেলা করেছে মাত্র। সেই ট্রাডিশন এখনো চলছে।

 

এই জন্যেই মুক্তমনে চিন্তার দরকার।  ভাবার দরকার কেন বাংলা নেতৃত্বের অভাবে ডুবে গেল। পরাধীন জাতির কোন ভবিষ্যত থাকতে পারে না। থাকেও নি।  

 

নেতাজি নেতা হিসাবে এক পর্যায়ে সফল যে উনার জন্য সবাই রক্ত দিতে তৈরী ছিল। আবার সফল নন -কারন বৃটিশ অধীনস্থ ভারতীয় সেনারা, তার ডাকে মোটেও বিদ্রোহ করে, আজাদ হিন্দ ফৌজে আসে নি। আগের দিন মাস্টারদা সূর্য্য সেনের প্রসঙ্গ উঠল। মাস্টারদা অসম্ভব সাহসী, জেদি, আদর্শবাদি দেশপ্রেমিক। এই নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্ত তাকে এবং তার দলবলকে বাঙালী গোয়েন্দা এবং দারোগারাই ধরেছিল। তার লং টার্ম প্ল্যানিং বা ভিশন -কোনটাই ছিল না। এটা ভগত সিং এর জন্যও সত্য। বাকী ভারতীয়দের সাথে ইনাদের যোগ ছিল সামান্যই।

 

সি আর দাশ, বি সি রায়-এরা আদর্শবাদি ভাল লোক। ব্যক্তি হিসাবে এরা তুলনাহীন। কিন্ত শুধু তাই দিয়ে নেতা হয় না। নেতা হতে সাহস লাগে। নিষ্ঠুর ভাবে লক্ষ্যের দিকে এগোতে হয়। স্বাধীনতার অগ্নিযুগের বাঙালী নেতাদের গুনগানে ভর্তি ইতিহাস বই পড়ে, বোঝা যাবে না বাঙালীর নেতৃত্বহীনতার ইতিহাস। তার জন্য পড়তে হবে বাঙালীর ব্যর্থতার ইতিহাস। তা হচ্ছে দেশভাগ।

 

এই প্রশ্নটা কেউ করে নাস্বাধীনতার সময় এত বড় বড় নেতা থাকতে বাংলা ভাগ হল কি করে??? কেউ বাঙালীর স্বার্থ দেখল না কেন? প্রায় এক কোটি বাঙালী হিন্দু এবং ১৫ লাখ বাঙালী মুসলমান এই বাংলাভাগে তাদের আদি ভিটেমাটি হারিয়ে ভিখিরি হল। বিসি রায়, জ্যোতিবোস- এরা ছিলেন !!! কিন্ত বাস্তব এটাই এইসব মহান নেতাদের সবাই ভৃত্যসুল্ভ নেতা। সাহস বা দম কারুর ছিল না। বৃটিশ ভাগকে মেনে নিল! এদের নেতৃত্বের পাশাপাশি ইস্রায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ানের জীবনী পড়ুন। বুঝবেন বাঙালীর এই সব মহান নেতারা কেন বেনগুরিয়ানের পায়ের যোগ্য না। প্যালেস্টাইনকে ভাগ বৃটিশরা করেছিল! কিন্ত বেনগুরিয়ান সেটা অগ্রাহ্য করলেন যুদ্ধ করেই। কারন তার কুড়ি বছরের প্রিপারেশন ছিল। বাংলার এইসব মহান নেতাদের ( পড়ুন জ্যোতি বসু, বিসিরায়) দেশভাগের বিরুদ্ধে কোন প্রিপারেশনই ছিল না!

 

            (৩)

 নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, বাজপেয়ী, মনমোহন, নরেন্দ্রমোদি-এদের নেতৃত্ব বিচার করব কি করে?

 

  যদি রাজনৈতিক সফলতা দিয়ে বিচার করি, তাহলে মোদি সব থেকে বেশী এগিয়ে। কারন উনি গোটা ভারতে আর এস এসের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।  এক বিশাল ভারত তার ফলোয়ার। বাকীরা রাজনীতির ক্ষেত্রে মোদির কাছাকাছিও সফল নন।

 

  কিন্ত তারমানে কি উনি রাষ্ট্রনেতা হিসাবে সফল ?  ডেং এর সাথে তুলনা করলে বোঝা যাবে, মোদি বরং মাও এর সাথে তুলনীয়। যিনি দেশে নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন-কিন্ত দেশকে টানতে পারেন নি। মোদি বিরাট বিরাট স্বপ্ন দেখেছেন-কিন্ত এটা বোঝেন নি ভারতের ইনফ্রাস্টাকচার দুর্বল। আমলাতন্ত্র, বেনিয়া পুজির রিফর্ম না হলে ভারতকে পেছনের সিটে বসতেই হবে। এখানেই ডেং তাকে বিরাট গোল দেবেন। ডেং এর রিফর্ম ছিল মৌলিক। উনি বুঝেছিলেন স্লোগান না- চীনকে বদলাতে হলে, গোড়ায় ধাক্কা দিতে হবে।

 

 অন্যদিকে মনমোহন সিং হয়ত রাজনীতিতে ব্যর্থ- রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ব্যর্থ। কিন্ত ভারত আজকে যেটুকু এগিয়েছে, সেটা তার সংস্কারের জন্যই। রাষ্ট্র নেতৃত্বের প্রশ্নে মনমোহন এদের সবার থেকেই এগিয়ে থাকবেন। কিন্ত রাজনীতি বিহীন রাষ্ট্রনেত্বত্ব সোনার পাথর বাটি।

 

ভারতের বাম নেতৃত্বের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। এরা রাজনীতি এবং রাষ্ট্র নেতৃত্ব দুই দিক দিয়েই ব্যর্থ। ভারতের মতন গরীব দেশের অন্তত ৩০% সিট বামেদের পাওয়ার কথা। ভারতের পার্লামেন্টে এদের সিটের সংখ্যা ১% ও না বর্তমানে। ঐতিহাসিক হায়েস্ট ১০% । ভারতের কমিনিউস্ট পার্টিতে আগেও নেতা ছিল না, এখনো নেই। আমি ভারতের কমিনিউস্ট পার্টির ইতিহাস যত পড়েছি, তত এই ধারনা আমার মধ্যে বদ্ধমূল হয়েছে, এরা চিরকালই নেতাবিহীন- র‍্যাডারলেস শিপ।

 

(৪)

 

নেতা এবং নেতৃত্বের ধারনা, একজন শিশু বা কিশোর তার ফর্মেটিভ এজে- কিভাবে পায়?

 

বাঙালীদের জন্য ( হয়ত সবার জন্য) মূলত পাঁচটা সোর্স

 

() খেলার মাঠে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া বা টিভিতে খেলা দেখার সময় নেতৃত্ব দিতে দেখা

 

() বাড়িতে বাবা কাকা জেঠা যদি নেতৃত্ব পজিশনে থাকে- সে অফিস, ব্যবসা বা রাজনীতি-যায় হোক না কেন-সেটা দেখে বড় হওয়া

 

() কলেজের ছাত্র রাজনীতি, জিমখানা, ক্লাব -ইত্যাদিতে জড়ানো

 

() টিভি, নিউজপেপারের সমকালীন রাজনৈতিক নেতা এবং নেতৃত্বকে দেখে শেখে তরুনরা

() ইতিহাসের নেতাদের দেখে শেখে।

 

পাঁচ নাম্বারটা গুরুত্বপূর্ন। বাম রাজনীতিতে অনেকেই আসতে পারেন, ফিদেল কিম্বা লেনিনের ইতিহাসে আকৃষ্ট হয়ে। আবার ডান রাজনীতিতে অনেকেই আসেন হেডগাউকরের আদর্শে আকৃষ্ঠ হয়ে।

 

সুতরাং স্কুলে ইতিহাস কিভাবে পড়াচ্ছে তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে, একজন শিশু বড় হয়ে নেতা বলতে কি বুঝবে।

 

ভারতে যেভাবে ইতিহাস পড়ানো হয়-তাতে একজন নায়ক, একজন ভিলেন। পুরোটাই বলিউডি একমাত্রিক ইতিহাস। ফলে ভারতের ইতিহাসে নায়ক কি ভিলেন, কারুরই নেতৃত্বের কাঁটাছাড়া হয় না। এর জন্য নেতৃত্ব নিয়ে আজন্ম ভুল ধারনা থেকে যায়। আমি শুধু দুটো উদাহরন দেব

 

লর্ড ক্লাইভ। ইনি ভারতে ভিলেন, ইংল্যান্ডে মহানায়ক। কিন্ত দুপক্ষই মানবেন তিনি একজন ঐতিহাসিক নেতা। ক্লাইভের ইতিহাস পুরো পড়লে, যে কেউ বুঝবেন এই একটা লোক তার বুদ্ধি সাহস দূরদর্শিতা দিয়ে সেইকাজ করেছিল যা আর কেউ করতে পারে নি। ইংল্যান্ডের মতন একটা ছোট দ্বীপের মাত্র কয়েক হাজার লোক, কোটি কোটি ভারতবাসীর রাজা হয়ে গেল! খুব মোটা দাগেও বোঝা যায় কাজটি খুবই কঠিন ছিল। এবং ক্লাইভ সেটা করেছিলেন। অথচ, ভারতের ইতিহাস পড়লে মনে হবে ক্লাইভ ছল চাতুরো করে ভোলামেলা সিরাজকে হারিয়ে দিলেন! ভারতের ৯০% ছাত্ররাই জানে না, পলাশীর যুদ্ধের আগে দুবার ক্লাইভ সিরাজকে হারান এবং সিরাজ আলি নগরের সন্ধী করতে বাধ্য হোন। উভয় ক্ষেত্রেই ক্লাইভের সেনার সংখ্যা ছিল হাজারের কাছেকাছি, আর সিরাজের ৫০ হাজারের বেশী। এবং দুই ক্ষেত্রেই ক্লাইভের মিরজাফরের প্রয়োজন হয় নি।    ৯৯% লোক এটা জানে না, কলকাতায় আসার আগে ক্লাইভ দাক্ষিনাত্যে দুটি বড় যুদ্ধ জিতেছেন এবং মাদ্রাসে বৃটিশ আধপত্য স্থাপন করেছেন ফ্রেঞ্চ এবং কর্নাটকের রাজাকে হারিয়ে ( প্রথম কর্নাটকের যুদ্ধ)।এবং সেখানেও ক্লাইভের হাতে বিপক্ষের তুলনায় মোটে ১০% সেনা ছিল!

 

মুষ্টিমেয় কিছু সৈনিক নিয়ে তার থেকেও দশগুন বেশী শক্তির রাজা নবাবদের কিভাবে হারাতে লর্ড ক্লাইভ? কারন বুদ্ধি। শত্রু পক্ষের প্রতিটি শক্তি দুর্বলতা, তার নখ দর্পনে থাকত। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন কঠিন সময়ে। মুর্শিদাবাদ থেকে কর্নাটক -সর্বত্রই মসনদের রাজনীতির সব কিছুর ডিটেলস দিতে তার গোয়েন্দারা। এর বিপরীতে ভারতের রাজা মহারাজা নবাররা ছিল নেহাত দুগ্ধপোষ্য শিশু। রাজনৈতিক সামরিক নেতৃত্ব শিখতে গেলে, ববার্ট ক্লাইভের কাছ থেকেই শেখা উচিত।  কারন ভারতের ইতিহাসে উনার সমতুল্য কেউ নেই। বালখিল্যএর মতন ইতিহাস চর্চা না করে- এই অপ্রিয় সত্যগুলো স্বীকার করার সময় এসেছে।

 

দুই,  মহম্মদ ঘোরি। সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করার জন্য ইনি ভারতের ইতিহাসের আরেক ফেবারিট ভিলেন। কিন্ত এই লোকটার ইতিহাস ভারতে ডিটেলেসএ কেউই পড়ে না। অথচ ভারতের মুসলমান শাসনের আদি পুরুষ ইনিই। ব্যপারটা খুব সহজ ছিল না। ভারতের পশ্চিম প্রান্তে তখন চালুক্য এবং চৌহানদের শক্তিশালী রাজ্য। ঘোরি প্রথমে চালুক্যদের কাছে পরাজিত হোন কেয়াদারার যুদ্ধে তার প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর তরাইনের প্রথম যুদ্ধে, পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে ঘোরি আহত হয়ে প্রায় মরতে যাচ্ছিলেন।

 

দুবার ঘোহারা হারার পর কিভাবে মহম্মদ ঘোরি তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে জিতে ভারতে ইসলামিক শাসন শুরু করলেন?

 

না ভারতীয় রাজাদের বদান্যতা, উদারতায় ঘোরি বেঁচে যান নি। ঘোরিকে মারার জন্য তার পেছন পেছন দৌড়ে লাভ হয় নি। কারন তুর্কীর এই ট্রাইবরা ছিল দ্রুত ঘোরসোয়ার। এরা হিট এন্ড রান টাইপের যুদ্ধ করত। যুদ্ধে হারা শুরু হলেই এরা দ্রুত পালাত। আবার ফিরে আসত। কিন্ত বিপক্ষ হেরে গেলে এরা কচুকাটা করত। বিপক্ষ পালানোর সুযোগ পেত না। কারন ঘোরার পিঠে এরা ছিল দুর্ধস্ব দ্রুত। এই ধরনের লুঠেরা হিট এন্ড রান টাইপের ট্রাইবাল আক্রমনেই রোমান সম্রাজ্য ধ্বংস হয়। প্রথম তরাইনের যুদ্ধের পরই পৃথ্বিরাজের সাবধান হওয়া উচিত ছিল-তাদের সনাতন যুদ্ধ পদ্ধতি খুব বেশীদিন চলবে না। তিনি কোন সামরিক রিফর্ম করেন নি। এখানেই একজন মহান নেতার সাথে তার পার্থক্য। আলেক্সান্ডারের পিতা ফিলিপ, তার সেনাবাহিনীর দুর্বলতা বুঝে প্রথমেই সামরিক টাকটিস, অস্ত্রের পরিবর্তন করেন। ফলে ম্যাডিসনের সেনাবাহিনী গ্রীসের সেরা সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে।

 


 ইতিহাসে শিক্ষা এটাই বাংলা, ইউরোপের জার্মানী হয়ে উঠতে পারত। পারে নি কারন বাংলায় সামরিক নেতা এবং নেতৃত্ব ছিল না। কোন জাতি রাজনৈতিক ভাবে পরাধীন থাকলে তাদের পক্ষে জার্মান হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।  যাদেরকে বাঙালীর মহান নেতা হিসাবে মূলোর মতন ঝোলানো হচ্ছে ( এবং সেই মূলো খাবার মতন গরু ছাগলরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ) , ইতিহাসের একটু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যাবে তাদের কেউই মহান নেতা নন। কারন তারা মহান হলে বাংলা ভাগ হত না। বাংলার ইতিহাস তারা বদলাতে পারতেন।

 

 এই কটু অপ্রিয় সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

Thursday, November 19, 2020

বাঙালী ভাবাবেগে সুড়সুরি কাটা

 গণতন্ত্রে বাঙালী শুধুই মুর্গী হয়েছে- ডিম খেয়েছে অন্যরা!

     বিপ্লব পাল  - ১১/১৯/২০২০ 


আনন্দবাজারের আজ তিনটে খবর-তিনটেই বাঙালী ভাবাবেগে সুড়সুরি কাটা 

 

   (১)বাইডেন বাঙালির মাহাত্ম্য বোঝেন, দিল্লি বোঝে না - এর উত্তর আমি কাল দিয়েছিলাম। ক্যাপিটালিজমে পুঁজিই সব। পজিশনগুলি বোরে মাত্র।  শুধু আজকের প্রতিবেদনে প্রণব মুখার্জির নাম এসেছে  দিল্লীতে  বাঙালীর মুখ হিসাবে। উনি বাংলার জন্য গণিখানের মতন বিশেষ কিছু করেছেন বলে জানা নেই। উনার থেকে প্রতিভাবান রাজনীতিবিদ বাংলায় অনেকেই ছিলেন । কিন্ত কেউ আম্বানীর দাক্ষিন্য পায় নি। ধিরুভাইকে প্রণব টেনেছেন। আম্বানীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তারাও প্রণব আঙ্কলকে দিল্লীতে রেখেছে।  ভারতের পুঁজিবাদিদের কাছে প্রণব বড়ই কাছের লোক ছিলেন।  ফলে তার উত্থান এবং চেয়ারে টান পড়ে নি। শুধু প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন নি। কারন গান্ধী ফ্যামিলি এমন কাউকে বসাবে না, যাতে তাদের চেয়ার টলে। আম্বানী থেকে গান্ধী-সবটাই হিসাব মত চলে উঠেছেন প্রণব। এতে আম্বানীর বিস্তর লাভ হয়েছে। কিন্ত    বাঙালীর কি লাভ হয়েছে -আম বাঙালী জানে বলে আমার মনে হয় না। কিন্ত আনন্দবাজার জানে। 


 (২)  দুই বিজ্ঞানী মৃনাল কান্তি দাশগুপ্তকে নিয়ে। মৃনালবাবু-অমল রায় চৌধুরীর মতন প্রতিভাবান কেউ নন। উনার গাইড ছিলেন রবার্ট হ্যানএব্রি ব্রাউন -যিনি একজন বিখ্যাত রেডিও এস্ট্রোফিজিসিস্ট ।   ইংল্যান্ডে ম্যাঞ্চেস্টর বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এই চ ডি করার সময়, উনার গ্রুপ রেডিও এস্ট্রনমির ওপর একটি গুরুত্বপূর্ন আবিস্কার করে-যার ব্যাখ্যা আমরা খুব সম্প্রতিই পেয়েছি-কিভাবে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যকহোল র‍্যাডিয়াল জেটের মাধ্যমে রেডিও বিপুল রেডিও তরঙ্গ বিকিরন করে।  এই ভদ্রলোককে নিয়ে দুটো সমস্যা আছে। এক, উনি ওই পিইএচডির তিন বছরে যা করেছেন, তাই উনার সারা জীবনের রিসার্চ!   কোলকাতায় ফিরে আর বলার মতন  কিছুই করতে পারেন নি। কিছু করতে পারেন নি বললে ভুল হবে। সিপিএমের লেজুড় হয়ে রাজ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ন পদে ছিলেন।  এবং দুই,  আরেকজন বাঙালীকে নোবেল প্রাইজ থেকে বঞ্চিত করেছেন। তিনি হচ্ছেন ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়। যিনি ১৯৭৮ সালে প্রথম টেস্ট টিউব বেবি দুর্গার জন্ম দেন। কিন্ত সেই সময় সিপিএম সরকার তার কাজ মৌলিক না ঢপের সেটা বিশ্লেষনের জন্য এক কমিটি বসায়। এই কমিটিতে ছিলেন মৃনাল দাশগুপ্ত। কমিটি কোন কিছু ভাল করে ইনভেস্টিগেট না করেই নাকচ করে দেয় সুভাষ বাবুর কৃতিত্ব। অপমানে অবহেলায় আত্মহত্যা করেন সুভাষ বাবু।  


বাকীটা পাঠকই বিচার করুন। 


(৩) তৃতীয় সুড়সুরি স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম ২% বিজ্ঞানীর নামের একটা লিস্ট বার করেছে। সেই লিস্টে ১ লাখ ৬০ হাজার বিজ্ঞানীর নাম আছে। এর মধ্যে ১৪৬০জন বিজ্ঞানী ভারতের। তাদের মধ্যে শ দুইয়েক বাঙালী আছেন। 


   পুরো ব্যপারটা এইভাবে ভাবুন 

ভারতের জন সংখ্যা পৃথিবীর ২০%, অথচ টপ বিজ্ঞানীর লিস্টে ১% ও নেই।


 আরেকটা লিস্ট আছে প্রথম ৫০০ জন বিজ্ঞানীর। সেই লিস্টে ভারতের ৩ জন ও নেই। 


এগুলো বাদই দিলাম। লিস্ট জিনিসটাই ঢপের। কিন্ত এখনো ভারতকে তার ৯০% প্রযুক্তি বিদেশ থেকে কিনতে হয়।  কৃষকদের জন্য কতটুকু আবিস্কার হয়েছে? সর্বত্র যে টোটো চলে তার ব্যাটারি আসে চীন থেকে। 


যে বিজ্ঞান সমাজের কাজে লাগে না, দেশের কৃষক মজুরদের কাজে আসে না, তাতে কি লাভ? কিছু মৌলিক গবেষনা অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্ত আরেকটা অমল রায়চৌধুরী বা সত্যেন বোস কি তৈরী হচ্ছে?  এক সবেধনমনি অশোক সেন আছেন। কিন্ত তারও বয়স হল। 

                                     

                                     (১)


এবার আরেকটু ভাবুন- আনন্দবাজার কোনদিন লেখে নি

 

 ১) বাঙালীর দুই আবেগের জায়গা মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল। এই দুটো ক্লাবের মালিকানার জন্য কোন বাঙালী শিল্পপতি পাওয়া গেল না।   কি করে পাওয়া যাবে? কোন বাঙালী শিল্পপতিই নেই!  এদের মালিকানা এখন মারোয়াড়িদের হাতে।  


 ২) সব ভাল বাংলা সিনেমা তৈরী হয় শ্রীকান্ত মোহতা, শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্ম। বাংলার সংস্কৃতিও সম্পূর্ন মারোয়ারিদের হাতে


 ৩) ভারতের প্রথম ১০০ টি বিজনেসম্যান ( নেট ওয়ার্থে) এর মধ্যে মাত্র একজনও বাঙালী নেই।  ৫৪ নাম্বারের কিরন মজুমদার শ আছেন-কিন্ত তিনি নিজেকে গুজরাতি বলেই দাবী করেন ( যদিও তাদের ফ্যামিলি বহুদিন পূর্বে বাংলা থেকেই গুজরাতে গেছিল ) 

 

 আমি যে ১-৩ পয়েন্ট দিলাম, তাতে সত্যিই বোঝা যায় বাঙালী সম্পূর্ন পুঁজিহীন ভিখিরীর জাতে পরিনত হয়েছে বহুদিন।  বাংলা ভাগ হল কেন ?  দিল্লীতে বাংলার স্বার্থ দেখার কেউ সেদিন ছিল না ? কারন বাঙালীর পুঁজি ছিল না।  ফলে নেতাজির পর, বাংলা থেকে ন্যাশানাল লেভেলের কোন নেতা ওঠে নি। শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা বাংলাতেই ভোট পায় নি। 


আজ গুজরাতের পুঁজি আছে বলেই   বর্তমান  ভারতের সব থেকে শক্তিশালী দুই নেতা গুজরাতি।  গান্ধীজি শুধু নিজের ক্যালিতে গান্ধী হোন নি- তার গান্ধী করে তোলার পেছনে বিড়লার পুঁজির বিরাট ভূমিকা ছিল। শুধু সেটা নিয়েই আমি আরেকটা লম্বা লেখা লিখতে পারি। এখানে শুধু একটা খুচরো উদাহরন দিচ্ছি।  রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী গড়তে গিয়ে একদা প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। ভারতে ঘুরে ঘুরে নাচের শো করে টাকা তুলছিলেন। তার এই কষ্টের কথা জানতে পেরে, সেই যুগে ৬০,০০০ টাকা পাঠান গান্ধী। সেই টাকা দিয়েছিল বিড়লারা।  গান্ধীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ধারনা /লেখা এই ঘটনার আগে এবং পরে একটু চেক করে দেখবেন।  নেতা বানাতে হয়। তাতে টাকা লাগে। 


 বল্লভ ভাই প্যাটেলের পেছনে গুজরাটি পার্শি পুঁজি ছিল। 

 নেহেরুর পেছনে পার্শী, সিন্ধ্রী, কাশ্মীরি পুঁজি ছিল।

  নেতাজির পেছনে কিস্যু ছিল না। টাটাদের ব্যাকাপ পেতে উনি চেষ্টা করেছিলেন। পান নি। ফলে উনার প্রবল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, কংগ্রেস তাড়িয়ে দিল। 

  প্রনব মুখার্জির পেছনে ছিল আম্বানীর পুঁজি।

   এখন মোদি , শাহের পেছনে  আদানী আম্বানীর পুঁজি।


    শুধু ক্যারিশমাতে কেউ নেতা হয় না। পেছনে পুঁজির সাপোর্ট ও লাগে। গণতন্ত্রে সেটাই বাস্তব। বাঙালীর পুঁজি নেই। ফলে  ন্যাশানাল লেভেলে নেতা নেই। 


  কিন্ত সুরসুড়ি আছে। যারা নেতাজি, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ইত্যাদিদের নিয়ে বাঙালীর আবেগকে ১০০% এক্সপ্লয়েট করে ভুলিয়ে দেবে একটা জাতির মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা , রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য সবার আগে দরকার পুঁজি।    ফাঁকা আবেগ না।   পুঁজি যদি না থাকে,  ডজন খানেক নোবেল লরিয়েট, আর সৌমিত্রর মতন এক্টর থেকেও কিস্যু হবে না। 


সৌমিত্ররা দিনের শেষে সেই হনুমান চল্লিশার বিজ্ঞাপনই করবে।

Friday, November 13, 2020

ভূত চতুর্দশী-তেনারাই আসল, আমরা নিমিত্তমাত্র!

 আজ ভূত চতুর্দশী। আমাদের বর্তমান  আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  ভোটার লিস্টে ভূত খোঁজার জন্য বাজারে বাঘা বাঘা উকিল নামিয়েছেন। কিন্ত  তেনাদের দেখা নেই।  সে ভোটার ভুতেদের  সময় ছিল এককালে ।  প্রাক ইলেকশন মেশিনযুগে। বিপুল বিক্রমে তখন সিপিএম।  যেকোন বুথে ভূত, মানুষ, শিশু, বালক -সবাই একসাথে ভোট দিত পার্টির দাপটে। টিএন শেষন ওঝা হয়ে না এলে, ভূতেদের দাপটে এদ্দিন ভারতে গণতন্ত্র টিকত কি না কে জানে!


ভূত কোথায় নেই? পুলিশ, মিউনিসিপালিটি, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, ব্যাঙ্কে ভূতেদের দাপটই বেশী।  ভারতে ভূতেরাই সরকারি অফিস চালায়। আর আমেরিকাতে ভূতেরা চালায়  সরকার ।  দুইগণতন্ত্রেই মানুষ গৌণ। ভূতেরাই সব। 
 কোথায় গণতন্ত্র? আমি ত চারিদিকে ভূততন্ত্রই দেখি! 

শুধু গণতন্ত্র কেন, এই গোটা মহাবিশ্বেই চলছে ভূতের কারবার। উনিভার্সের ৮৫% হচ্ছে ভূতুরে ডার্কম্যাটার। তাদের ধরা ছোঁয়া যায় না, টেলিস্কোপে দেখা যায় না- কিন্ত বোঝা যায় তেনারা আছেন-নইলে গ্রহ নক্ষত্রদের যাত্রাপথের ব্যখ্যা মেলেনা। 

যেদিকেই তাকাবেন, সেদিকেই ভূত। প্রেমে ভূত, জলে ভূত, দুধে ভূত, ওষুধে ভুত, অঙ্কে ভূত, বিজ্ঞানে ভূত! ভূত ছাড়া, জীবনের কোন অঙ্কই আসলে মেলে না। 

সুতরাং ভুতেদের ইগনোর করে কোন শালা? এই নশ্বর জীবনে ভুতেদের না মানলে, কোনদিন নিজেরাই ভুত হয়ে যাব, টের ও পাব না!

Saturday, November 7, 2020

আমেরিকার নির্বাচন পদ্ধতি, রাজনীতি এবং এবারের রেজাল্ট (২০২০)

                                              (১)

 আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে গোটা বিশ্বেই এবার তুমুল উন্মাদনা। রিয়ালিটিশোর একজন বড় শিল্পী যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, তখন  এটা অপ্রত্যাশিত কিছুই না। কিন্ত ভারতের অনেকেই আমেরিকার নির্বাচনী সিস্টেম,  পলিটিক্যাল সিস্টেম বুঝতে পারছেন না। এই লেখা মূলত তাদের জন্য। আমেরিকার সংবিধান, রাজনীতি, ভোটিং সিস্টেম এত জটিল, সেটা একটা মেইড-ইন-ইজি সামারি টাইপের লেখাতে ঝেড়ে দেওয়া মুশকিল। লোকে খেই হারিয়ে ফেলবে। সেই জন্যে শুধু গুরুত্বপূর্ন ব্যপারগুলোই লিখছি।

আমেরিকার পলিটিক্যাল সিস্টেম বুঝতে গেলে, মূলত ইতিহাসে ফিরতে হবে--

     কিভাবে ১৩ টা বৃটিশ কলোনিয়াল রাজ্য মিলে একটা "দেশের" জন্ম দিল। কেন দিল। তারা কি চাইছিল? তাদের সামনের রাজনৈতিক সমস্যা কি কি ছিল?  এগুলো বুঝলে আমেরিকার সিস্টেম "কেন" - এই প্রশ্নের ৮০% এর জবাব পাওয়া যাবে। 

      আমেরিকা বৃটেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল কেন?  কাল চামড়ার ভারতীয়দের  মতন এরা সাদা বৃটিশদের কাছে সেকন্ড ক্লাস সিটিজেন ছিল না। তারাও ইউরোপিয়ান। একই রক্ত। একই স্কিন কালার।  তাহলে কেন ১৩ টি বৃটিশ কলোনি বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করল? এটা বুঝলেই, আমেরিকার আত্মাকে বুঝতে পারবেন। এর মূল কারন ফ্রেঞ্চ-ইন্ডিয়ান যুদ্ধের ধার মেটাতে বৃটেন আমেরিকার ১৩ টি কলোনির ওপর বর্ধিত ট্যাক্স বসায়। হঠাত করে আমেরিকান কলোনীবাসীরা দেখল তাদের মতামত গ্রাহ্য না করেই, তাদের পকেট খালি করা হচ্ছে। ট্যাক্সের টাকা যাচ্ছে লন্ডনে। ট্যাক্স বিরোধি অসন্তোষ থেকে  ১৭৭৫ সালে যে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তা এক অর্থে জনযুদ্ধও বটে।  এই যুদ্ধে ১৩টি কলোনী একসাথে বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে যাতে করে যার মূল উদ্দেশ্য দুটি

     -সেলফ গর্ভমেন্ট। ট্যাক্স থেকে পুলিশ-প্রতিটি ব্যাপারে যাতে নাগরিকদের গ্রহনযোগ্যতা থাকে

    -  কোন সরকার যাতে জনগনের ওপর স্বেচ্ছাচারী না হয়ে উঠতে পারে।  দ্বিতীয় ইস্যুটি আমেরিকার সংবিধানের হার্ট এন্ড সোল। 

  এই যে ১৩ কলোনি একসাথে বৃটিশরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করল-তার মানে ত এই না যে যুদ্ধে জিতলে ১৩টা কলোনিকে একসাথে একটি দেশে গঠন করতে হবে! প্রতিটা কলোনির আলাদা আইন। আলাদা মিলিটারি। সবাই একেকটা দেশ। তারা সবাই মিলে একটা নতুন দেশ ঘোষনা করতে যাবেই বা কেন? বিশেষতন উত্তরের কলোনিগুলি অনেক বেশী শিল্প নির্ভর। সেখানে দাসপ্রথা চলে না, বা চললেও আইন খুব কড়া। অথচ দক্ষিনের কলোনিগুলি কৃষি নির্ভর। সেখানে দাসপ্রথার পক্ষে আইন শক্তিশালী। 

 কিন্ত বৃটিশ  কলোনিয়াল পাওয়ার  বিশ্বের সব থেকে শক্তিশালী সাম্রাজ্য। যুদ্ধে  ফ্রান্সের সাহায্য দরকার। সুতরাং একটি জয়েন্ট মিলিটারি, জয়েন্ট বিদেশনীতি ছাড়া স্বাধীনতার যুদ্ধ সম্ভব ছিল  না। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা এদ্দিন ১৩ টা কলোনিতেই অবাধে ব্যবসা করেছে। তারাও চাইছে সব কলোনী মিলে একটা নতুন দেশ হোক। এদের পরে বলা হবে ফেডারেলিস্ট। যারা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে। অন্যদিকে দক্ষিনের তুলো চাষ করা রাজ্যগুলি- সর্বদায় ভয়ে থাকত। উত্তরের এলিট শিক্ষিতরা দেশ গঠন করে, দাসপ্রথা তুলে দিতে পারে।  এছারা ভার্জিনিয়া , ম্যাসাচুসেটস, নিউয়ার্ক এগুলি বেশ বড় আকারের কলোনি। অন্যদিকে ডেলোয়ার বা মেরীল্যান্ড ছোট। লোক সংখ্যা কম। এদের ভয়, একসাথে দেশ হয়ে গেলে, বড় রাজ্যগুলোই আইন ঠিক করবে। ছোট রাজ্যগুলো পাত্তা পাবে না। 

 সুতরাং আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদারদের সামনে ১৩টা কলোনি একসাথে জুরে একট নতুন দেশ গঠন করা ছিল বেশ কঠিন কাজ। নুন্যতম যেটুকু ক্ষমতা না দিলে একটি দেশ গঠন করা সম্ভব না, সেটুকুই করা হল। অর্থাৎ কেন্দ্রের হাতে শুধু মিলিটারি, বিদেশনীতি, ডলার ছাপানো, পোষ্টাল সার্ভিস এটুকুই থাকে। ট্যাক্স বসানোর অধিকার পর্যন্ত প্রথমে কেন্দ্রের হাতে ছিল না। পরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চালানোর খরচ ওঠাতে ওটা ঢোকে।  ব্যবসা , ন্যাচারাল রিসোর্স,  পারিবারিক, ক্রিমিন্যাল আইন , শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ট্যাক্স, পুলিশ, কোর্ট কাছারি- এমন কি ছোট মিলিটারি সব কিছুই থাকল রাজ্যের হাতে। 

  ফলে আমেরিকান সিস্টেমে রাজ্যগুলি প্রায় স্বাধীন দেশের মতন। ভারতের রাজ্যগুলি থেকে আমেরিকার রাজ্যগুলির ক্ষমতা অনেক অনেক বেশী। যদিও ১৯৩০ সালে ফ্রেডরিক রুজভেল্টের ্নিউ ডিলের ফলে কেন্দ্রের হাতে অনেক বেশী ক্ষমতা আসে। আমেরিকান প্রেসিডেন্টও সংবিধান বহির্ভুত অনেক ক্ষমতার অধিকারি হোন যেগুলির সংবিধানে সরাসরি কোন নির্দেশ নেই। 

 এবার এই যে নতুন দেশ তৈরী হল- তার সরকার কেমন হবে? আমেরিকান সংবিধানে বলা হল, সরকারের তিনটে ব্রাঞ্চ থাকবে। 

 এক্সিকিউটিভ- যারা  মিলিটারি, অর্থনীতি এবং অন্যান্য কাজ পরিচালনা করবে সংবিধান এবং আইন অনুযায়ী।  এর সর্বাধিনায়ক হবেন প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে এসে   তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বানিজ্য ইত্যাদি সেক্রেটারিদের নিয়োগ করেন। আমেরিকাতে সেক্ট্রেটারীরা  ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমান। পার্থক্য হচ্ছে ভারতের মন্ত্রীরা নির্বাচিত রাজনীতিবিদ। আর আমেরিকাতে সেক্টেটারিরা হচ্ছে দক্ষ পেশাদার যাদের প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেন সেনেটের অনুমতি ক্রমে। শুধু চার বছরের জন্য।  এইজন্যে আমেরিকান সিস্টেমে আই এ এস লাগে না। কারন প্রেসিডেন্টের পরিষদ তৈরীই হয়, পেশাদারি দক্ষ লোকেদের দিয়ে। প্রেসিডেন্ট সুপ্রীম কোর্ট এবং ফেডারেল কোর্টের জাজেদের ও নিয়োগ করেন। 


 আমেরিকার সংবিধান অনু্যায়ী জনগনের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে লেজিসলেটিভ ব্রাঞ্চ- যারা আইন প্রনয়ন করবেন। ট্যাক্স , বাজেট, খরচ এদের হাতে। এরা টাকা দিলে তবে প্রেসিডেন্ট খরচ করতে পারবেন।  এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চের কাজকর্ম ঠিক ঠাক হচ্ছে কিনা দেখাশোনা করবেন।এরা জনগনের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত।  লেজিসলেটিভ   ব্রাঞ্চ বা আমেরিকান কংগ্রেসের  এর দুটি শাখা- হাউস অব রিপ্রেসেন্টেটিভ ( সংক্ষেপে হাউস) এবং সেনেট।  হাউস রেপ ব্যপারটা ঠিক ভারতের লোকসভার মতন। প্রতিটা রাজ্যের জনসংখ্যা অনুয়ারী হাউস রিপ্রেসেন্টিভ কজন হবে ঠিক করে দেওয়া আছে । হাউস রিপ্রেসেন্টেটিভদের বলে কংগ্রেসম্যান।  আমেরিকান কংগ্রেসম্যান এবং ভারতের এম পি একই জিনিস।  ভারতের এমপিদের মতন আমেরিকার কংগ্রেস ম্যানেদের নির্দিষ্ট কনস্টিয়ুএন্সি আছে। আমেরিকাতে এটিকে কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট বলে। মোট রিপ্রেসেন্টেটিভদের সংখ্যা ৪৩৫। নুন্যতম ২৫ বছর বয়স এবং ৬ বছর সিটিজেন থাকার রেকর্ড থাকা চাই। হাউসের নির্বাচন হয় দুবছরে একবার। 

আমেরিকার যে লেজিসলেটিভ ব্র্যাঞ্চ ভারতের থেকে সম্পূর্ন আলাদা-সেটি হচ্ছে সেনেট। আমেরিকাতে ৫০টি রাজ্য। প্রতিটি রাজ্যে থেকে দুজন সেনেটর নির্বাচিত হন। ফলে মোট সেনেটর ১০০ জন।  আগে আমেরিকার সেনেট নির্বাচন ছিল,  ভারতের রাজ্যসভার মতন। অর্থাৎ রাজ্যের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেনেটর নির্বাচিত করতেন। বর্তমানে রাজ্যের লোকেদের ভোটে সরাসরি সেনেটর নির্বাচিত হোন। সেনেটর হওয়ার নুন্যতম বয়স ৩০। সাত বছর সিটিজেন হওয়া দরকার।  সেনেটরদের ছ বছরে একবার র্নিবাচনে যেতে হয়।  দুবছর অন্তর অন্তর ৩৩% সেনেট সিটের নির্বাচন হয়। 

প্রশ্ন হচ্ছে হাউস অব রিপ্রেসেন্টিভ থাকতে সেনেটের দরকার হল কেন? আপনি বলবেন কেন, ভারতেও ত   আপার হাউস রাজ্যসভা আছে। পার্থক্য কি? বিরাট পার্থক্য। সেটা হচ্ছে সেনেটররা জনগন দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত। এবং সব রাজ্যের দুটি সেনেটর।  এর মূল কারন আমেরিকা যখন তৈরী হচ্ছিল ছোট ছোট রাজ্যগুলি হাউস অব রিপ্রেসেন্টিভ ফর্মুলা মানতে চাইছিল না। সেই সময়ের হিসাবে, ভার্জিনিয়ার ১৫ জন প্রতিনিধি হাউসে গেলে, ডেলওয়ারের যাচ্ছিল মোটে ১ জন! ফলে ছোট ছোট রাজ্যগুলি প্রতিবাদ করে।  তারা বলে এই সিস্টেম চললে ছোট ছোট রাজ্যগুলোর কথা কেউ শুনবে না। এই জন্য কানেক্টিকাটের প্রতিনিধি রজার সারমন (১৭৮৯) প্রস্তাব দেন তাহলে সেনেট চালুহোক যেখানে প্রতিটা রাজ্যের দুজন প্রতিনিধি থাকবে।  সেনেট মূলত প্রেসিডেন্ট এবং হাউস-দুটোরই ক্ষমতা "চেক" করবে। অর্থাৎ এই যে মন্ত্রী পরিশদ প্রেসিডেন্ট বানাবেন, তার অনুমতি কিন্ত সেনেট থেকে নিতে হবে। বিদেশনীতির ট্রিটি-সেগুলোও সেনেটের অনুমোদন লাগে।  ইনফ্যাক্ট প্রেসিডেন্টের প্রায় প্রতিটি কাজেই সেনেটের অনুমোদন লাগে। 

অন্যদিকে সমস্ত নতুন আইন প্রনয়ন, ট্যাক্স ইত্যাদি তৈরী হয় হাউসে। সেটিও সেনেটে পাশ হয়ে আসতে হয়। 

সুতরাং আমেরিকাতে সেনেট হচ্ছে সব থেকে বড় বাঁশ। এটি না জিতলে পারলে, বাকী প্রেসিডেন্সি এবং হাউস জিতে লাভ নেই।  যেমন ধরুন গত চার বছর ট্রাম্প খুব আনন্দে কাজ করেছেন। কারন সেনেটে রিপাবলিকান মেজরিটি ছিল। অন্যদিকে ওবামার ৮ বছরের মধ্যে  ৬ বছর সেনেট ছিল রিপাবলিকানদের হাতে। যাদের নেতা ছিলেন মিচ মিকোনেল।  মিচ ওবামার সব কিছু আটকে দিয়ে তাকে ঠুটো জগন্নাথে পরিনত করেছিলেন। ওবামা যা কিছু করার তার প্রেসিডেন্সির প্রথম দু বছর করেছেন। এবার ও সেনেটে ডেমোক্রাটরা না জিতলে বাইডেন বিশেষ কিছু করতে পারবেন না। এখন সেটা নির্ভর করছে জর্জিয়ার ওপরে। আশা কম। 

লাস্ট ব্রাঞ্চ জুডিয়াশিয়ারী। কোর্ট। যারা বিবাদের ঠিক করবে, আসলে সংবিধান কি বলেছে। এই প্রবন্ধে ওটি উহ্য থাকল।


                                                 (২)

আবার আসি আমেরিকার নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। শুধু প্রেসিডেন্ট না, একই সাথে হাউস অব রিপ্রেসেন্টেটিভ, সেনেটর ( যদি সেই বছর টার্ম আসে) এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাচন চলে। ভারতের মতন আমেরিকাতে কোন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নেই।  প্রতিটি রাজ্যের আলাদা নির্বাচন কমিশন যা ওই রাজ্যের গর্ভনররা তৈরী করেন। এখানে মনে রাখতে হবে আমেরিকাতে গর্ভনর হচ্ছে রাজ্যের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ভারতের মতন দিল্লী থেকে পাঠানো বাঁশ না যা বৃটিশ কলোনিয়াল হ্যাঙ্গোওভার।  সুতরাং রাজ্যের নির্বাচন কমিশন প্রেসিডেন্ট বা সেনেটের  কোন কথা শুনতে বাধ্য না। যার জন্যে পেনসিলভেনিয়ার নির্বাচন কমিশনার টিভিতে ট্রাম্পকে মিথ্যুক বলার সরাসরি সাহস রাখেন। ট্রাম্প ও নির্বাচন চুরি হচ্ছে বলেই খালাস-কোন রাজ্যের  নির্বাচন কমিশনের ওপর তার নিয়ন্ত্রন নেই। 

আমেরিকাতে প্রেসিডেন্ট সরাসরি নির্বাচিত হয় না। তারজন্য ইলেক্টোরাল কলেজ আছে। প্রতিটা রাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজে কটা ভোট তা ফর্মুলা অনুযায়ী নির্ধারিত। যেমন মেরীল্যান্ডে ৮ টি হাউস প্রতিনিধি, ২ টি সেনেটর। সেইজন্যে মেরীলান্ডের ভোট ১০ টি। এইভাবে ৫০ টি রাজ্যের টোটাল ইলেক্টরাল কলেজ ভোট হয় ৫৩৮ টি। 

নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার আমেরিকাতে ভোট হয়। প্রতিটা রাজ্যে কারা ভোট দেবে, কিভাবে ভোট দেবে, পোষ্টাল ব্যালটে দেবে না বুথে দেবে, কখন দেবে-এসব ঠিক করে সেই রাজ্যের নির্বাচন কমিশন। কিভাবে তারা তাদের ইলেক্টরাল কলেজ তৈরি করবে,সটাও ঠিক করে সেই রাজ্যের সংবিধান। যেমন আমেরিকার ৪৮ টি রাজ্যের নিয়ম ( মেইন এবং নাব্রাস্কা বাদে)- সেই রাজ্যে যে প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যান্ডিডেট সব থেকে বেশী ভোট পাবে, সে রাজ্যের সবকটি ইলেক্টরাল কলেজ ভোটপাবে। যেমন ধরুন টেক্সাসে বাইডেন পাঁচ মিলিয়ানের ( ৫০ লক্ষ)  কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন। ট্রাম্প তার থেকে মোটে ৬ লাখ বেশী পেয়েছেন। কিন্ত টেক্সাসের ৩৮ টি ইলেক্টরাল কলেজ ভোট ট্রাম্পএর কাছেই যাবে।  অর্থাৎ সেই পঞ্চাশ লাখ ডেমোক্রাটিক ভোট গ্রাহ্যই হল না। মেইন এবং নাব্রাস্কাতে ডিস্ট্রিক্ট ধরে ইলেক্টরাল কলেজ ভোট আছে।  অর্থাৎ এই ডিস্ট্রিক্ট জিতলে তুমি একটা ইলেক্টরাল ভোট পেলে। এমন ব্যপার। 

সুতরাং এই সিস্টেম খুবই বাজে। শুধু তাই না আমেরিকার ৪০ টা রাজ্য সম্পূর্ন ভাবে ডেমোক্রাট বা রিপাবলিকানের কব্জায়। আসল ভোট হয় ১০ টা রাজ্যে। কারন সেখানে একবার ডেমোক্রাট, আরেকবার রিপাবলিকানরা জেতে। যেমন ফ্লোরিডা, ওহায়ো, পেনসিলভেনিইয়া, এরিজোনা। আমেরিকার নির্বাচন এই দশটি রাজ্যের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এই রাজ্যের অধিবাসীরাই ঠিক করে কে হবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। বাকী সব রাজ্য ফাউ। কারন তাদের রাজ্যে কে জিতবে তা আগে থেকেই বলে দেওয়া যায় যেহেতু বাকি ৪০ টি রাজ্যের অধিবাসীরা হয় নীল ( ডেমোক্রাট) নইলে লাল( রিপাবলিকান)। এইজন্যে আমেরিকার ইলেক্টরাল কলেজ তুলে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে বারেবারে। তুলে দেওয়ার জন্য কংগ্রেসে ভোটাভুটি  হয়েছে ৪ বার। তবে প্রতিটা রাজ্য ইলেক্টরাল কলেজ ভোট কিভাবে ভাগ করবে-তা  বদলাতে পারে। যেমন ক্যালিফোর্নিয়াতে বা টেক্সাসের ৩৮ টি যদি অনুপাতে ভাগ করে দেওয়া হত, তাহলে ট্রাম্প পেতেন ২০, বাইডেন ১৮।  কিন্ত টেক্সাস বা ক্যালিফর্নিয়ার হাউস বা সেনেট ( এখানে প্রতিটা রাজ্যের আলাদা হাউস এবং সেনেট আছে কেন্দ্রের আদলে)  যেহেতু বিজয়ী পার্টির, তারা চাইছে সবকটা ইলেক্টরাল ভোট। তারা ইচ্ছা করলেই এটা প্রোপশনাল করতে পারে। কিন্ত করলে তাদের ক্ষতি। ফলে এই বিদিগিচ্ছিরি দুশো বছরের ব্যাপারটা চলেই আসছে।

১৬ ই ডিসেম্বর এই  ইলেক্টরাল কলেজই সরকারি ভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে বা এবার করবে যদি রাজ্যের গর্ভনররা তার রাজ্যের ভোটটি ইলেক্টরাল কলেজকে পাঠিয়ে দেন। ২০০ বছর ধরে এর কোন ব্যতিক্রম হয় নি।  ৪ ই জানুয়ারী নতুন সেনেট এবং হাউস শপথ নেবে। তারপর ৬ ই জানুয়ারী সেনেট ইলেক্টরাল কলেজের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে মেনে নেবে এবং ভাইএস প্রেসিডেন্ট সেনেটের স্পিকার নির্বাচিত হবেন। 

এগুলো এদ্দিন সবই ফর্মালিটি ছিল। এবার ট্রাম্প এখনো হার স্বীকার করেন নি। এমনটা আমেরিকার ইতিহাসে হয় নি। এবার ফর্মালিটি ফুলফিল হবে কি না বলা যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে হাউসের হাতে ক্ষমতা আছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার। 


                        (৩)

এবারের ইলেকশনের বিতর্কের মূল কারন পোষ্টাল ব্যালট।  ১৫০ মিলিয়ান ভোটদাতাদের মধ্যে ৯০ মিলিয়ান পোষ্টাল ভোট দিয়েছে। প্যান্ডেমিকের জন্য সব রাজ্যই এবার নো ফল্ট পোষ্টাল ব্যালট ইস্যু করে। পোষ্টাল ব্যালটের ৭৮% ভোট গেছে ডেমোক্রাটদের দখলে।  যার জন্য ট্রাম্প কারচুপির অভিযোগ এনেছেন। যদিও এখনো প্রমান দিতে পারেন নি।  

এবার দেখা যাক সুইং স্টেটের যেখানে নন পোষ্টাল ব্যালটে ট্রাম্প এগিয়েছিল, সেখানে পোষ্টাল ব্যালটে বাইডেন এত বেশী পেতে পারেন কি না। নাকি কারচুপি হয়েছে।

নির্বাচন যদি পেপার ব্যালটে হয়, তাও পোষ্টালে-তাহলে কারচুপি হবেই। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে কতটা ফ্রড হতে পারে, যাতে ট্রাম্প যদি ৫০,০০০ বা ১০০,০০০ ভোটে হারেন, তাহলে সেই হারের জন্য কারচুপিকে দায়ী করা যায় কি না।  এবার আমরা দুই দিকের দাবীকেই পর্যবেক্ষন করব

  বাইডেন ক্যাম্পের দাবী 

           -পোষ্টাল ব্যালটে ৬৬% গেছে রেজিস্টারড ডেমোক্রাটদের কাছে। সুতরাং রেজিস্টার্ড এবং ইন্ডিপেন্ডেবন্ট মিলিয়ে ৭৮% হতেই পারে

            - পোষ্টাল ভোটের কারচুপির সরাসরি প্রমান এখনো নেই

           - ট্রাম্প নিজেই রিপাবলিকানদের পোষ্টাল ভোট দিতে মানা করেছেন। সুতরাং বুথে গিয়ে রিপাবলিকানরাই ভোট দিয়েছে বেশী। 


 ট্রাম্প ক্যাম্পের দাবী -যার ভিত্তিতে ট্রাম্পের আইনজ্ঞরা এবং নিউয়ার্কের প্রাত্তন মেয়র রুডি জুলিয়ানি সোমবার মামলা করবেন 


         - পোষ্টাল ব্যালটে জালি হয় বলে, পোষ্টাল ব্যালটে অনেক চেক এন্ড ব্যালান্স থাকে।  এর একটি হচ্ছে সিগনেচার না মিললে ব্যালট ক্যান্সেল হয়। এবারের প্রাইমারীতে প্রায় এক মিলিয়ান ব্যালট বাতিল হয়েছিল । অথচ এই ব্যটল গ্রাউন্ড স্টেটে কত বাতিল ব্যালট, কিভাবে বাতিল হচ্ছে, ক্যাম্পেইন ম্যানেজারদের জানানো হচ্ছে না।

      -পোষ্টাল ব্যালট গননার ধারে কাছে , তাদের প্রতিনিধিদের যেতে দেওয়া হয় নি। 

এখনো পর্যন্ত ট্রাম্পের করা তিনটি মামলা কোর্ট গ্রহনই করে নি। প্রমান নেই বলে। দেখা যাক মঙ্গলবার কি হয়। বাইডেনের পক্ষে ওয়ার্স্ট কেস সিচুয়েশন- পেনসিল্ভেনিয়ার সুপ্রীম কোর্ট  সেই রাজ্যে রিইলেকশন ডিক্লেয়ার করতে পারে। কিন্ত তাতেও ক্ষতি নেই। কারন বাইডেন প্রচুর রাজ্য জিতেছেন। অন্তত চারটি রাজ্যের সুপ্রীম কোর্টে ট্রাম্প না জিতলে এবং চারটি রাজ্যে পুন নির্বাচন না হলে, রেজাল্ট বদলাবে না। তিনি ২৭০ এর ওপরে ইলেক্টরাল ভোট পেলেই জিতে যাচ্ছেন।  


                         (৪)

এবার আসি আমেরিকার পার্টি সিস্টেমে। এখানে মূল পার্টি দুটি। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রাট।  যা প্রায় ১৬০ বছর ধরে চলে আসছে। এছারাও গ্রীন পার্টি লিবার্টারিয়ান পার্টি আছে। যা ১-২% ভোট টানে। প্রশ্ন হচ্ছে এক্ষেত্রে ভারতের মতন একাধিক পার্টি নেই কেন। কেন রাজ্য ভিত্তিক পার্টি নেই?

 এর কারন দুটো। 

  এক, পার্টি প্রাইমারী। আমেরিকাতে পার্থী কে হবে, তা পার্টি  ঠিক করে না, পার্টির রেজিস্টার্ড ভোটাররা "প্রাইমারী" বলে আরেকটি নির্বাচনের মাধ্যমে করে।  যেমন ধরুন এবারের ডেমোক্রাটি প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাইমারীতে বাইডেন ছাড়াও আরো ৭জন ছিলেন। এর মধ্যে লড়াই দাঁড়িয়েছিল বাইডেন বনাম বার্নির মধ্যে। অর্থাৎ পার্টির মধ্যপন্থী বনাম বামপন্থীদের মধ্যে। এই ভোটের লড়াইতে মধ্যপন্থী বাইডেন জেতেন। হারলেও বামপন্থীদের আলাদা পার্টির দরকার হচ্ছে না -কারন   মেইন ইলেকশনে বামেদের ভোট পেতে বাইডেনকে অনেক বামপন্থী ইস্যু গ্রহন করতে হয়েছে। বামেরা একা লড়াই করলে ভারতের সিপিএমের মতন হাল হত। খুঁজে পাওয়া যেত না ন্যাশানাল স্কেলে।  বরং একসাথে থাকায়, মধ্যপন্থীদের মাধ্যমে তাদের ইস্যুগুলি ন্যাশানাল ইস্যু হচ্ছে। 


 দুই এখানকার দুই রাজ্যের মধ্যে কোন জাতিগত ভাষাগত পার্থক্য নেই। ফলে স্টেট ন্যাশানালিজম বা আঞ্চলিকতাবাদ-যা ভারতের রাজনীতিতে আছে, তা এখানে নেই।  ফলে ভাষাগত, জাতিগত পার্টি গড়ার সুযোগ নেই। 


 এখানে ডেমোক্রাটদের বামপন্থী এবং রিপাবলিকানদের দক্ষিনপন্থী লবি পার্টির মধ্যে পার্টি-এবং এরা প্রাইমারীতে খুব সক্রিয় ও কট্টরপন্থী। এদের মধ্যে মারকাটকাট সম্পর্ক।  কিন্ত মধ্যপন্থী রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রাটদের নীতি প্রায় এক।  ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির কট্টর অংশের এবং বাইডেন ডেমোক্রাটিক পার্টির মধ্যপন্থার লোক। ফলে বাইডেনের বন্ধু এবং ভোটবেস অনেক বেশী। অনেক রিপাবলিকান এবার বাইডেনকে ভোট দিয়েছে। 


                         (৫)

বাইদেন প্রেসিডেন্সিতে নতুন কি হবে?

সেনেটে ডেমোক্রাটরা না জিতলে, বাইদেন আভ্যন্তরীন কোন নীতির কিছু পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমি আগেই লিখেছি কেন সেনেট হাতে না থাকলে প্রেসিডেন্সি হচ্ছে নিধিরাম সর্দার।  কিন্ত বিদেশনীতি তার হাতে।  সেখানেও ট্রাম্প মূলত শান্তিবাদি নীতি নিয়েই চলছিলেন।  বরং বাইডেন আরো বেশী যুদ্ধবাজ। 


সেনেটে ডেমোক্রাটরা জিতলে বাইডেন অনেক কিছু করে দেখাতে পারবেন। কিন্ত ডেমোক্রাটদের সেনেট দখলের সম্ভাবনা কম। 


করোনা মোকাবিলা আরেকটু ভাল ভাবে করতে পারবেন। কিন্ত সেটিও রাজ্যের গর্ভনরদের হাতে। প্রেসিডেন্টের হাতে নেই। 

   শুধু হোয়াইট হাউসের ক্যাওস , নাটক কমবে। হোয়াইট হাউস ভদ্র হবে। 

বাইডেন মোদিকে ক্যা এবং কাশ্মীর নিয়ে চাপ দিতে পারেন। কারন বাইডেন তার ভোট সঙ্গী হিসাবে সমস্ত আমেরিকান মুসলিম কোয়ালিশনকে পাশে পেয়েছেন। এরপর স্কোয়াড, অর্থাৎ চারজন অতিবিপ্লবী বাম ইস্লামিক মহিলা হাউস রিপ্রেসেন্টেটিভ ( রশিদা তালিব, ইলহান ওমর, আলেক্সান্ডিয়া কোর্তেসিও কর্টেজ ( এওসি) এবং আয়ানা প্রিসলে ) এবারো কংগ্রেসে জিতেছেন। এরা কট্টর মোদি বিরোধি। এর মধ্যে ইলহান ওমর প্রতিটি মুসলিম ইস্যুতেই ইলামিক উম্মাহর আমেরিকান মুখ। এদ্দিন ট্রাম্প এদের বিরোধি থাকায়,  আমেরিকান রাষ্ট্রের চাপ মোদির ওপর ছিল না। কিন্ত এবার ব্যাপার আলাদা। তবে সেই সেনেট। সেনেট হাতে না থাকলে  স্কোয়াড বা বাইডেন কেউ ভারতকে চাপ দিতে পারবে না।  সেই আশা নেই। 

কিন্ত ভবিষ্যতে সমস্যা আছে। আমেরিকার কিশোর তরুন সমাজ বামপন্থা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে। তারা জার্মানি, ডেনমার্কের মতন সিস্টেম চাইছে। এরা আমেরিকান ক্যাপিটালিজম এবং তার উদ্ভাবনী শক্তিতে বিশ্বাসী না। এর মূল কারন অধিকাংশ নতুন প্রজন্ম কঠিন পরিশ্রমের সাথে পরিচিত না। এরা ভিডিও গেম খেলা পার্টি।  এরা মূলত বার্নির দিকে ঝুঁকছে। আর বার্নির সব থেকে উপযুক্ত শিষ্যা হচ্ছে এওসি। 

সুতরাং এর পরেরবার প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে এওসি দাঁড়াচ্ছেন।  এবং তরুনদের ভোটে গ্রাসরুটে সাপোর্টে তার জেতার চান্স ও বেশী।  এওসি সিপিয়াইএম নেতাদের মতন কট্টর বামপন্থী। কারন এই বর্তমান প্রজন্মের তরুনরা ফ্রি এডুকেশন ফ্রি হেলথকেয়ার চাইছে। সেক্ষেত্রে আমেরিকাতে গৃহযুদ্ধ লাগার ভাল চান্স আছে।  কারন এওসি এতটাই র‍্যাডিক্যাল সে আমেরিকান মিলিটারি স্পেন্ডিং খুবই কমিয়ে দেবে। বিলিয়ানদের সম্পদের  ওপর ৯০% রেটে ট্যাক্স বসাবে। আমাজন তার দ্বিতীয় হেডকোয়াটার নিউয়ার্কে করতে চেয়েছিল। এওসির বাধাতে তা হয় নি। এতে ২৫,০০০ নতুন চাকরি তৈরী হত। বেসিক্যালি সেই জঙ্গী সিটুনেতাদের গল্প যাদের জন্য কোলকাতা শিল্প শ্বশান হয়েছিল, এইসব বামেরা আসলেও তাই হবে। কিন্ত বিলাসী বাঙালী তরুনদের যেমব বেসিক সেন্স ছিল না-তারা বামপন্থায় একদা আকৃষ্ট হয়ে রাজ্যের বারোটা বাজিয়েছে। রাজ্য শিল্পশুন্য হয়েছে, বর্তমান আমেরিকাও সেই দিকেই এগোতে পারে যেভাবে বামপন্থার অলীক মোহ তরুনদের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে। 

প্রতিটা পার্টিতেই কোন না কোন তরুনের সাথে কথা বলছি। সবাই বার্নি সাপোর্টার। অথচ এই যে আরামের জীবনে তারা আছে-তার জন্য যে খাদ্য তৈরী হচ্ছে, ইনফ্রাস্টাকচার তৈরী হচ্ছে, তারা যে ভিডিও গেম খেলছে-সেই লেবার কোত্থেকে আসে- উৎপাদন না হলে ডলারের ভ্যালু কি হবে-এসব নিয়ে এদের কোন আইডিয়া নেই। আমি সেই সত্তরের দশকের বাঙালী তরুনদের দেখতে পাচ্ছি।  আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়ে আমি আশাবাদি নই। 

  









Sunday, November 1, 2020

ইসলাম বনাম ওয়েস্ট-আপনি কোন পক্ষে?

(1) 

ইসলাম বনাম ফ্রান্সের যুদ্ধ বর্তমান সময়ের কালচারাল কুরুক্ষেত্র। এই ধর্মযুদ্ধে নিরেপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। নিরেপেক্ষ থাকা মানে, আপনি সমস্যাটা বোঝেন নি।


খুব সংক্ষেপে বোঝালে- ধর্ম পালনের অধিকার যে মৌলিক অধিকার সেটা বিশ্বের সব সভ্য সংবিধানেই স্বীকৃত।

কিন্ত ধর্মপালন না করার অধিকার ও সব সভ্য সংবিধানে স্বীকৃত। ভারতে ও স্বীকৃত। কিন্ত অধিকাংশ মুসলমান দেশগুলির সংবিধানে অস্বীকৃত। এর মধ্যে চারটি মুসলমানদেশে ইসলাম ছাড়া ( এবং ইসলামের শুধু স্বীকৃত শাখা ) অন্য সব ধর্ম পালন নিশিদ্ধ। এইসব দেশগুলি এখনো মধ্যযুগীয় বর্বর চিন্তাধারা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে নি।

সুতরাং এইসব মুসলিম দেশথেকে পাশ্চাত্যে আগত মুসলমান অভিবাসীরা তাদের নবীকে নিয়ে কার্টুন ঠাট্টা হচ্ছে এসব দেখতে অভ্যস্থ না। তারা জানে তাদের ধর্ম নিয়ে হাসিঠাট্টা মস্করার শাস্তি মৃত্যু। তারা জানে ধর্মের জন্য অন্যের গর্দান নিলে তারা তাদের কমিউনিটিতে তারা সন্ত্রাসবাদি না মহানায়ক হিরো। শহীদ।

মধ্যযুগে ধর্মররক্ষার্তে বিধর্মীকে গলাকাটার ব্যাপারে ইসলাম, খ্রীষ্টভক্ত, ভাইকিং প্যাগান, হিন্দুধর্মের কিছুকিছু সেক্ট-সবাই প্রায় সিদ্ধহস্থ ছিল। তারা বদলেছে। তারা সবাই বদলেছে। কিছু ঐতিহাসিক কারনে মুসলমানরা সভ্যতার আলো থেকে পিছিয়ে গেছে-

(২)

মূলত তিনটি ঐতিহাসিক কারন -কেন ইসলামে প্রগতিশীল আলো ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। শুরুতে এমন ছিল না।

(১) আবসিড খালিফা আবদুস কাদের প্রথম ইসলামে মুক্ত চিন্তা বন্ধ করার জন্য আইন পাশ করেন। সেটা কিন্ত দশম শতাব্দিতে। প্রফেটের মৃত্যুর প্রায় তিনশো বছর বাদে । ইসলামের প্রথম তিনশো বছরে ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ হাসি ঠাট্টা সবই চলত এবং প্রথম দিকের খিলাফতে ধর্ম নিয়ে ব্যাঙ্গ নিশিদ্ধ ছিল না। ফলে এই সময় প্রচুর নিদর্শন পাওয়া যাবে ইসলামের সমালোচনার।

যেমন আরবের আবু ইসা আল ঔয়ারক। যিনি আল্লার অস্তিত্বকে কাল্পনিক, এবং প্রফেট মহম্মদকে সাধারন জ্ঞানী মানুষ হিসাবে ধরতেন। তার গলা কেউ কাটেনি। তার ওপর কোন অত্যাচার ও হয় নি।

পার্সিয়ান দার্শনিক ইবন-আল-হাসান ইসলামের যাবতীয় রীতিনীতি ( নামাজ, জাকাত, হজ ইত্যাদি) সব কিছুই হাস্যকর বলে লিখে গেছিলেন। তার মতে প্রফেট মহম্মদের জীবনীই প্রমান করে, জাঁকজমক করে ধম্মোচর্চা অর্থহীন। কারন প্রফেট ইসলামের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্যাগান জাকজমকপূর্ন আচরন থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে।

আমি আরো কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার উল্লেখ করতে পারি। আসলে ইসলামের উৎপত্তির আদিতে ছিল মক্কার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। যারা ব্যবসার কারনে রোমান, গ্রীস, সিরিয়া, ভারতের দর্শনের সাথে পরিচিত ছিল। পরিচিত ছিল নানান রাষ্টবিজ্ঞানের সাথে। ফলে কোরানে যা লিপিবদ্ধ আছে, তা মূলত সেই সময়ের নানান দেশ এবং দর্শন থেকে সংগ্রহ এবং সংশ্লেষন করে একটি একেশ্বরবাদি প্রগতিশীল ( তখনকার সময়ের তুলনায় ) ধর্ম আন্দোলন। প্রায় কয়েক শতাব্দি ধরে এই সংশ্লেষন পক্রিয়াটি চলেছে। সেই সময় প্রফেট মহম্মদ এবং তার বাণী আনচ্যালেঞ্জড মিথ হয়ে যায় নি। বরং অনেক বিরোধী ধারনারই সংশ্লেষন হয়েছে, এবং তাতে ইসলাম সমৃদ্ধ হয়েছে। যেটা হিন্দু ধর্মে সব সময় হয়। যা ধর্মটাকে যুগোপযোগী করে রাখে। ইসলাম অপরিবর্তনীয় শিলাপাথর, এই ব্যপারটা প্রথম তিন শতাব্দিতে ছিল না। ইসলামের প্রথম তিনশো বছর, যখন তারা জ্ঞান বিজ্ঞানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, তখন ইসলামে সংশ্লেষন হয়েছে। সে নদী ছিল প্রবাহমান । বদ্ধ জলাশয় হয়ে ওঠে নি।

কিন্ত তাহলে প্রফেট মহম্মদের মিথ মিশ্রিত জীবন এবং বানীকে অভ্রান্ত এবং তা না মানলে কল্লা কাটা শুরু করল কারা এবং কেন? এটা শুরু হয়েছে খালিফা আবদুস কাদেরের সময় থেকে। এবং কারন রাজনৈতিক। মূলত খালিফার গদি বাচানো। এর কারন শিয়াদের মধ্যে ইসমাইলদের উতপত্তি এবং জনপ্রিয়তা খিলাফতের একছত্র ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দি হয়ে উঠছিল। ইসমাইলিরা আড়ম্বরহীন নিরাকার আল্লার সাধনায় বিশ্বাসী-যা মসজিদ, খিলাফত ইত্যাদি বাহ্যিক আড়ম্বর থেকে ইসলামকে উদ্ধার করার আন্দোলন। ইসমাইলিরা যে বিশুদ্ধ মুসলমান না-সেটা রাজনৈতিক ভাবে প্রতিপন্ন করার দরকার হয়ে ওঠে খালিফা আবদুল কাদেরের। এছাড়াও পূর্বদিকে মহম্মদ ঘোরি তখন পশ্চিম ভারত দখল করার অভিযানে নেমেছেন। এরা ছিল তুর্কী উপজাতি এবং ইসলামের প্রতি এদের লয়াল্টি ছিল দুর্বল। এরাও খালিফাকে মানছিল না। ফলে ইসলামের মধ্যে থেকে উঠে আসা নানান সেক্টের ধর্মীয় মতবাদকে প্রশয় দিলে খালিফার কেন্দ্রীয় শক্তি দূর্বল হত।

ভারতে নানান হিন্দু সেক্ট উঠে এসেছে কেন? কারন কোন রাজবংশই ধর্মের কারনে সাম্রাজ্য স্থাপন করে নি। খালিফার শাসন কিন্ত তা না । তাদের অস্তিত্বই ইসলামের কারনে। ফলে ইসলামের নানান সেক্ট, উপসেক্ট তৈরী হলে খালিফার ভিত্তিই দূর্বল হত। এইজন্য আব্দুল কাদের আইন করে ইসলামকে বিশুদ্ধ রাখার দিকে মন দিলেন। পুরো কারন রাজনৈতিক। ফলে একাদশ শতাব্দিতেই ইসলামের বিকাশ বন্ধ হয়ে, তা এক বদ্ধ জলাশয়ে পরিনত হয়। সুতরাং সেখানে মশার চাষত হবেই!!

(২) ইসলামকে বদ্ধ জলাশয় বানানোর ফলে গোটা বিশ্বজুরেই মুসলমানদের মিলিটারি শক্তি হ্রাস পায়। কারন তাদের ইনোভেশন বা আবিস্কার করার ক্ষমতা কমে যায়। মুক্তচিন্তা ছাড়া জ্ঞান বিজ্ঞান সম্ভব না, আর তা না হলে মিলিটারি দুর্বল হবে। ফলে সপ্তদশ শতকে যখন ইউরোপ জ্ঞান বিজ্ঞানের কেন্দ্র হয়ে উঠল, তখন ইসলামের বিজ্ঞান সূর্য্য অস্ত গেছে। এর পরের শতাব্দিতে ইউরোপিয়ান কলোনিয়াল শক্তিগুলি ( ডাচ, ফ্রান্স, বৃটিশ ) আস্তে আস্তে সমস্ত ইসলামিক রাষ্ট্রগুলিকে পরাস্ত করে, তারা ইসলামিক বিশ্বের নতুন মাস্টার হলেন। প্রফেট বা ইসলামকে অপমান করলে শাস্তি হবে-এই ব্লেসফেমী আইন বৃটিশদের তৈরী। কেন বৃটিশরা মুসলমানদের সেকুলার বা প্রগতিশীল বানানোর চেষ্টা করে নি? বৃটিশরা বরাবর চেয়েছে হিন্দু মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় অন্ধকারে থাকুক। কারন সেক্ষেত্রে তাদের প্রভুত্ব টিকিয়ে রাখার সুবিধা। শিক্ষিত মানুষেরা বিদ্রোহ করে। অন্ধত্ব দাসত্ব টিকিয়ে রাখার সহায়। এটাই ছিল বৃটিশ স্ট্রাটেজী। এটা তারা ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও চালু রাখার চেষ্টা করে। কিন্ত হিন্দুদের মধ্যে একটা বিদ্যাসাগর, একপিস রামমোহন থাকায়, এবং গর্ভনর জেনারেলদের অনেকেই লিব্যারাল ট্রাডিশনে মানুষ হওয়ায়, বৃটিশরা লিব্যারাল হিন্দুদের পক্ষ নেয়। লর্ড বেন্টিঙ্ক প্রিভি কাউন্সিলের বিরুদ্ধে গিয়েই হিন্দু ধর্মের সংস্কারকদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। ফলে বৃটিশ শাসনে মুসলমানরা আরো অন্ধত্বে ডুবে যায়।

(৩) স্বাধীনতা দেওয়ার পর, বৃটিশরা তাদের অনুগত রাজবংশ বা পলিটিক্যাল ক্লাসদের মুসলমান বিশ্বে বসিয়ে যায়। এইসব মুসলিম দেশগুলিতে কোন স্বাধীনতা আন্দোলন হয় নি। জাতীয়তাবাদি আন্দোলন ছিল। এখন এইসব দেশগুলিতে তেলের সন্ধান থাকায় এবং কোল্ড ওয়ারে সোভিয়েত ইউনিয়ানের বিরুদ্ধে জোট বাঁধার জন্য, আমেরিকা গোটা মুসলিম বিশ্বের ধর্মান্ধতাকে প্রশয় দিয়েছে। সেই ইতিহাস বিরাট দীর্ঘ। ৯/১১ নিজেদের পোষা বিষধর সাপের ছোবল। বেসিক্যালি ফর্মুলা সেই এক। ধর্মান্ধ লোকেদের "কন্ট্রোল" করা সুবিধা। ফলে মুসলমানদের অন্ধকারে রাখ। আমি দুটি উদাহরন দেব। এক আফগানিস্থান। দুই ইরান। এই ইতিহাস অনেকেই জানে না। আফগানিস্তানে ১৯৭৮ সালে পিডিপিএ ক্ষমতায় আসে। তারা ভূমি সংস্কার করে। ছেলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করে। সমস্ত চাকরি মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত হয়। সমস্ত রাজনৈতিক পজিশন থেকে মোল্লাদের সড়ানো হয়। কিন্ত তারা সোভিয়েত ইউনিয়ানের অনুসারী কমিনিউস্ট পার্টি ছিল। ফলে আমেরিকা বিরাট টাকার থলি নিয়ে, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে এদের বিরুদ্ধে মুজাহিদের ক্ষেপিয়ে তোলে। আফফানিস্থানে আবার ধর্মান্ধতা জাঁকিয়ে বসে।

দ্বিতীয়কেস ইরানে। শাহের ইরান শিক্ষা বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে এত দ্রুত গতিতে এগোচ্ছিল, অনুমান করা হচ্ছিল, তারা একবিংশ শতাব্দিতে ফ্রান্স এবং বৃটেনকে জিডিপি এবং সব সূচকেই হারিয়ে দেবে। ১৯৭৮সালে ইরানের মোল্লা বিপ্লবের সময় শাহকে বাঁচাতে আমেরিকা এগিয়ে এল না কেন? আমেরিকা সেনা পাঠালেই, বাকিটা শাহের পুলিশ বুঝে নিত । কিন্ত আমেরিকাই বলে দিল, শাহ তুমি গদি ছাড়? কেন অন্ধ মোল্লাদের হাতে ইরানকে ঢেলে দিয়েছিল আমেরিকা? যেখানে ইরান ছিল আমেরিকার সব থেকে বড় বন্ধু? এটা বুঝতে পরের দৃশ্যটি দেখুন। মোল্লা আসার সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল ইরান ইরাক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সব থেকে বেশী অস্ত্র বেচেছে আমেরিকা। শাহের আমলে যুদ্ধ হওয়ার চান্স ছিল না। সাদ্দাম জানত শাহ আমেরিকা সমর্থিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক ইস্রায়েল ছাড়া অন্য অশান্তি ছিল না। ইচ্ছা করে আমেরিকা শাহের পতনের অনুমোদন দেয় যাতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লাগে, এবং অস্ত্র বেচা শুরু হয়।

(৩)
কেউ মুসলমান হয়ে জন্মায় না। সবাই মানুষ হয়ে জন্মায়। পরিবেশ, সমাজ রাষ্ট্র তাকে ব্রেইন ওয়াশ করে ধর্মান্ধ মুসলমান বানায়। এটা একটা প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র চাইলেই এটাকে রিভার্স করতে পারে। কামাল আতার্তুক দেখিয়েছিলেন। আবার ভারতের কংগ্রেস -সিপিএম দেখিয়েছে কিভাবে রাষ্ট্রের স্বার্থে ভারতের মুসলমানদের ধর্মান্ধ করে রাখা যায়। পাকিস্তানের জিয়া উল হক, তার নিজের স্বার্থে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে উগ্র ইসলাম নিয়ে আসেন। যাতে পাকিস্তানিরা ধর্মান্ধ হয়। বাংলাদেশে এটা শুরু হয়েছিল এরশাদের সময় থেকে। রাষ্ট্রীয় মদতেই গোটা বাংলাদেশজুরে এক বিরাট ধর্মান্ধ মুসলমান জনগোষ্ঠি তৈরী হল। কেন হল ? কারন জন্ম থেকেই বাংলাদেশ প্রায় ডিক্টেটরশিপের কবলে। কন্ট্রোল করছে দুটি ফ্যামিলি। লোকজন শিক্ষিত সেকুলার হলে, এদের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। তার থেকে দেশের লোকজনকে ধর্মান্ধ করে রাখলে বাংলাদেশের রুলিং ক্লাসের শোষন এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা অনেক সহজ। এরা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মাঠে নামবে। রাস্তায় নামবে । কিন্ত রুলিং ক্লাস দু চারটে খুন ধর্ষন চুরি ডাকাতি করলে চুপ করে থাকবে।

এমন সোনার হাঁসকে কেউ কাটে? ফলে পাঠ্যপুস্তক, নিউজপেপার, রেডিও টিভি-বাংলাদেশের সর্বত্রই এখন ধর্মান্ধতার চর্চা। আসল কারন, এতে ক্ষমতাসীনদের হাতে আরো ক্ষমতা আসছে। অবারিত লুঠ তরাজের।

ভারতকে বাদ দিচ্ছি না। ভারতে হিন্দু ধর্মকে কেন্দ্রকরে একই জিনিস হচ্ছে। যে হিন্দু ধর্মের কোন লিখিত আইন নেই, লিখিত পথ নেই, নতুন ধারনা, নতুন দর্শনকে সংগ্রহ করে সে চিরকাল এগিয়ে গেছে-সেই হিন্দু ধর্মকে এখন ইসলাম বা খ্রীষ্টানদের মতন আরেকটা ধর্ম বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। যাদের কাছ থেকে অন্ধত্ব ছাড়া আর কিছুই পাবার নেই এই একবিংশ শতাব্দিতে।

(৪)

একজন ধর্মান্ধ মুসলমান কেন কার্টুনিস্ট লেখকদের গলা কাটতে যায়? কেন বোম ফাটায়? কেন আত্মঘাতি জঙ্গী হয়?

ছিয়াত্তরজন হুরের গল্প নেহাত গল্প। মূল সমস্যা বুঝতে মানব দর্শনের আরো গভীরে যেতে হবে।

ভেবে দেখুন। আমাদের জীবন কি কঠিন। প্রতি পদে সংগ্রাম বাচার জন্য। জীবনের কোন উদ্দেশ্য না থাকলে এত কঠিন পৃথিবীতে অনেকের বাঁচার ইচ্ছাই থাকবে না। অধিকাংশ মানুষ নিজের ছেলে মেয়েদের মানুষ করার জন্য বাঁচে। সে একটা ভাল জীবনের জন্য বাঁচে।

এবার ধরুন ছোটবেলা থেকে আপনাকে শেখানো হচ্ছে তুমি একজন বঞ্চিত কারন তোমার শত্রুরা তোমার এই অবস্থার জন্য দায়ী। ইসলামের শত্রুরা দায়ী। সহী ইসলাম কায়েম হলে তুমি স্বর্গরাজ্য পাবে। জাস্টিস পাবে। এইভাবে আস্তে আস্তে সে ইসলামের মধ্যে জীবনের বেঁচে থাকার রসদ পাচ্ছে। কারন ইসলাম তাকে জাস্টিস, মিনিংফুল লাইফ- বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে। সে ইসলাম ছাড়া নিজের কোন অস্তিত্বই ভাবতে পারে না। এটাই তার এমপাওয়ারমেন্ট।

ওপরের এই পুরো ব্যাপারটা- রাষ্ট্রের ইন্ধনে হয়। রাষ্ট্র যদি চাইত, এইসব মুসলমান ছেলেমেয়েরা সেকুলার স্কুলে যাক, সেকুলার সিলেবাসে বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ক্রিটিক্যালি শেখানো হোক, তাহলে এরা আরো উন্নততর জীবনে অর্থ খুঁজে পেত।

ভারতীয় ট্রাডিশনে কোন ধর্ম জীবনের পরম অর্থ বলে দেয় না। একজন মানুষকে তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজের পথ নিজেকে খুঁজে নিতে হয়। প্রাচীন ভারতে এটাই ছিল রীতি। কিন্ত আব্রাহামিক ধর্মগুলো ক্যানোনিক্যাল। অর্থাৎ সেখানে জীবনে উদ্দেশ্য বিধেয় সব কিছুই ক্যানন অর্থাৎ আইন করে লিখে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ইসলাম এবং খ্রীষ্টান ধর্মের ইতিহাস মানুষের মুক্তিবুদ্ধির চর্চাকে রুদ্ধ করার ইতিহাস। রাষ্ট্র এবং সমাজের সব আইনই যদি কোরানে থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের দরকার কি? কেন মানুষ আইন বানাবে? এই কথা আমার না। এটি বলেছিলেন ইরানের ধর্মগুরু আয়াতোল্লা খেমেইনি।


(৫)
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য একজন কার্টুনিস্ট, এক শিক্ষকের গলা কেটে ফেলা যায়? বাংলাদেশ তুর্কী, পাকিস্তানের সব পত্রপত্রিকাতে, অধিকাংশ মুসলমান ধর্মীদের ফেসবুকীয় লেখাতে ইনিয়ে বিনিয়ে এর সমর্থন চলছে। কেন? কারন ইসলামিক ভাবাবেগকে আরো গাড় করে লোকজনকে ধর্মান্ধ বানিয়ে রাখার চেষ্টা। এতে শেখ হাসিনা, ইমরান খান এদের গুষ্টিদের লুঠেপুটে খাওয়ার সুবিধা আরো বেশী। ধর্মান্ধ হয়ে কেউ জন্মায় না। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ধর্মান্ধত্বতার চাষ করা হয়।

ভেবে দেখুন। চেচেন একসময় সোভিয়েত কমিনিউস্ট ব্লকে ছিল। সেখান থেকে ইসলামিক জঙ্গী তৈরী হচ্ছে কেন? বস্টনের ম্যারাথন বম্বার চেচেন অভিবাসী। স্যামুয়েল প্যাটির খুনীও তাই। দুটো ক্ষেত্রেই একটা মিল আছে। উভয় ক্ষেত্রেই ছেলেকে মুসলমান সন্ত্রাসবাদি হিসাবে গড়ে তোলার পেছনে তাদের বাবা-মায়ের ভূমিকা ছিল।

কেন এইসব ক্ষেত্রে একজন মুসলমান অভিবাসি ফ্যামিলি তাদের ছেলেমেয়েদের ইসলামিক সন্ত্রাসবাদে উস্কে দিচ্ছে? চেচেনের ইতিহাস দেখলে তা পরিস্কার হবে। রুশ চেচেন যুদ্ধে- চেচেনিয়াকে সাহায্য করেছে একমাত্র মুসলমান মুজাহিদরা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য চেচেনে জেহাদি তৈরী করতে হয়েছে। পুরোটাই ম্যানুফাকচারড। এর পেছনে আর কাদের মদত ছিল সেই প্রশ্নে গেলাম না। মোদ্দা কথা একটা জাতিগোষ্টিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ধর্মান্ধ জেহাদি হিসাবে আমি ট্রেনিং দিচ্ছি-তারপরে ভাল মানুষের মতন প্রশ্ন করছি- এত জেহাদি কেন? এটা সম্পূর্ন বেয়াকুফি।

এবার আসা যাক ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের ভূমিকা নিয়ে। তিনি রাষ্ট্রীয় মদতে ফ্রান্সের সর্বত্র মহম্মদের কার্টুন বিলি করছেন। এথিক্যাল প্রশ্ন। এটি সমর্থনযোগ্য না সমর্থনযোগ্য না?

এর উত্তর আমি আগেই দিয়েছি। কান্টিয়ান ক্যাটেগরিগ্যাল ইম্পারেটিভ কাজে লাগালেই উত্তর পাবেন। যদি মহম্মদের কার্টূনের প্রচার সমর্থনযোগ্য না হয়, তাহলে ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কোরান ও বন্ধ করে দিতে হয় সেই যুক্তিতে। কারন কোরানে প্যাগানদের আচার আচরনের বিরুদ্ধে, বিধর্মীদের বিরুদ্ধে প্রচুর কটুক্তি আছে। তোমার ধর্মীয় অনুভূতির দাম আছে, আর আমার ধর্মীয় অনুভূতি খেলো-এই মামার বাড়ির আবদার ত অমুসলমান দেশে চলবে না। ওই পজিশন নিলে গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে।

সুতরাং পজিশন দুটো। এক সব ধরনের অনুভূতিকে প্রোটেক্ট করার জন্য আইন হোক। যা এবসার্ড। কারন সেই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধিদের জেলে ভরা খুব সহজ।

দুই মত প্রকাশের স্বাধীনতা "এবস্যোলিউট"। সেখানে কোন কম্প্রোমাইজ না। তা পাশ্চাত্যে এদ্দিন হয়ে এসেছে। এবং এছাড়া আর কোন দ্বিতীয় উপায় নেই।

অর্থাৎ এবার আপনিই ঠিক করুন, আপনি কোন দিকে।












Saturday, October 24, 2020

করোনা টেস্ট নিয়ে ভুল তথ্য এবং ব্যাখ্যা দিয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন

 করোনা টেস্ট নিয়ে ভুল তথ্য এবং ব্যাখ্যা দিয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন

******
বেলুড় মঠের কুমারী পূজোয় রামকৃষ্ণ মিশন পুরোহিত এবং কুমারী বালিকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করে নি। কাজটি সরকারি বিধি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের নির্দেশ লঙ্ঘন করেছে। নিজেদের কীর্তির সাফাই গাইতে গিয়ে মিশনের বক্তব্য ( সূঃ আনন্দবাজার পত্রিকা)

"সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটাগরিকদের প্রশ্ন এবং উদ্বেগ নিয়ে সুবীরানন্দজির জবাব, ‘‘প্রশ্ন করার জন্য এক ধরনের লোক থাকেন। বিনা কারণেই প্রশ্ন করেন। সব প্রশ্নের উত্তর তো আমরা দেব না! আর যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁরা সকলে কি পুজোর মণ্ডপে যাওয়ার আগে করোনা পরীক্ষা করিয়েছেন? মাস্ক হল সেকেন্ডারি। পরীক্ষাটাই আসল। সেটা আমরা করিয়েছি।’’ পাশাপাশিই তাঁর প্রশ্ন, ‘‘কারও যদি করোনা হয়ে থাকে, তবে তাঁর সামনে মাস্ক পরে যাওয়াও কি নিরাপদ? আমরা তাই কুমারী মা-সহ সকলের করোনা পরীক্ষা করিয়েছি। অন্য কোনও পুজো কমিটি এটা করেছে কি না জানি না। শুধু কুমারী পুজোই নয়, দুর্গামায়ের পুজো যাঁরা করেছেন, পুরোহিত, তন্ত্রধারক থেকে ঢাকি— সকলের করোনা পরীক্ষা করিয়েছি।’’

****
সুবীরানন্দজী বিরাট ভুল যুক্তি দিয়েছেন যা সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। উনার মতে করোনা টেস্টে নেগেটিভ হলেই মাস্ক ছাড়া থাকা যায়। কারন উনার ধারনা করোনা টেস্টে নেগেটীভ আসা মানেই, ব্যক্তির মধ্যে করোনা ভাইরাস নেই। এটি তার অজ্ঞতা এবং সেই জন্যেই আমার এই লেখা।


কোভিড-১৯ এর মূলত তিন ধরনের টেস্ট হয়। কুইক র‍্যাপিড টেস্ট হচ্ছে এন্টিজেন টেস্ট। এতে "ফলস নেগেটিভ" অর্থাৎ কোভিডে আক্রান্ত কিন্ত টেস্ট বলছে কোভিড হয় নি -তার সম্ভাবনা ৫০% এর কাছাকাছি। ( সূত্র-১ ঃ হার্ভাড হেলথ , আমি লিংক পোষ্ট করছি ) ।

দ্বিতীয় টেস্ট, মলিকিউলার পিসিয়ার টেস্ট, যার রেজাল্ট আসতে কিছুদিন সময় লাগে এবং ন্যাজাল বা থ্রোট সোয়াব স্যাম্পলের আর এন এ থেকে দেখা হয়, তাতে এই ফলস নেগেটিভের সম্ভাবনা ২%-৩৭% ( ( সূত্র-১ ঃ হার্ভাড হেলথ)। কোলকাতায় এই টেস্টই মূলত করা হয়।

পিসিয়ার টেস্টে ফলস নেগেটিভ আসার সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি আমেরিকার ন্যাশানাল ইন্সটিউট অব হেলথ একটি পূর্নাঙ্গ কাজ পাবলিশ করেছে ( সূত্র -২ ,এটাও পোষ্ট করছি)। এই পেপারে করোনা টেস্টের নির্ভুলতা নিয়ে প্রকাশিত সব কাজের ( ১৯ শে জুনের আগে পর্যন্ত প্রায় ১০০০ পেপারের ) এক দীর্ঘ সামারি পাবেন। এতে দেখা যাচ্ছে পি সি আর এ ফলস নেগেটিভ খুব কম ও হতে পারে ( বেস্ট কেস ২%)। কিন্ত লো কোয়ালিটির পিসিয়ার মেশিন ব্যবহার করলে ফলস নেগেটিভ ৩৭% ও নানান পাবলিকেশন রিপোর্ট করেছে। মিডিয়ান ২০-২৫%। কোলকাতায় পিসিয়ার বেসড মলিকিউলার টেস্টিং এর রেজাল্ট যে রিলায়াবল না, সেটা সব ডাক্তারই জানেন। আমি এই হাই রেফারেন্স গুলি ব্যবহার না করলেও সবাই এটা এখন জেনে গেছে কোভিড টেস্ট প্রায় ফালতু। কিন্ত ডাক্তাররা এটা নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য করেন না। কাটমানি, সহজ মানি আর কে ছাড়তে চাইবে!

অর্থাৎ মহারাজ জানেন না, কোভিড-১৯ এর পিসিয়ার টেস্ট খুবই আনরিয়ালেবল। ওর ভিত্তিতে আর যাইহোক মাস্ক এবং সামাজিক বিধি ভঙ্গ করা যায় না।

মাস্ক আসলেই টেস্টের থেকে অনেক বেশী রিয়ায়েবল। মহারাজ যা বলেছেন তার উল্টোটাই সত্য। মাস্ক কতটা এফেক্টিভ তাই নিয়ে প্রচুর কাজ প্রকাশিত এখন। এর একটা সামারি ৬ ই অক্টবর নেচার জার্নালে প্রকাশিত পেপারে পাবেন ( সূত্র-৩-নেচার অনেক কাজের ক্রস রেফারেন্স আছে)। মোটামুটি সামারি হচ্ছে

- ভাইরাস যখন মুখ থেকে বেড়োচ্ছে তখন তা থাকে ওয়াটার ড্রপলেটের মধ্যে-যা কিন্ত খুব সাধারন ক্লোদিং মাস্কেও অনেকটাই আটকায়। ভাইরাসের সাইজ ১০০ ন্যানোমিটার-কিন্ত ওই সাইজে ফ্রি ভাইরাস থাকে না। ফলে সাধারন ক্লোদিং মাস্ক ও ভালোই ভাইরাস আটকায় যেহেতু ড্রপলেটগুলি পাঁচ মাইক্রনের বেশী সাইজের হয়।
- কোভিড-১৯ পেশেন্ট থেকে কোন ডোজে আপনি ভাইরাস পেয়েছেন সেটা গুরুত্বপূর্ন। আপনি মাস্ক পড়ে থাকলে ভাইরাস ঢুকলেও তার পরিমান কম হবে। এতে রোগ হলেও সম্ভাবনা বেশী যে তা এসিম্পটোম্যাটিক হবে ।

নেচারের এই পেপারে আরো দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশ মাস্কএর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিল, তাদের মৃত্যুহার প্রায় ১/৪ বা তার আরো কম।

রামকৃষ্ণ মিশনকে অপমান করা আমার এই পোষ্টের উদ্দেশ্য না। আমি নরেন্দ্রপুরে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র ছিলাম। মিশন যেমন মানুষের জন্য ভাল কাজ করে-ঠিক তেমনই তারা অনেক অবৈজ্ঞানিক ধারনা নিয়েও চলে। মিশনের ভালকাজ সমর্থনযোগ্য। অনেক মহারাজের সাথেই আমার ভাল পরিচয় আছে-তাদের ভাল কাজে সাথে থাকারও চেষ্টা করি।

কিন্ত যা ভুল, তা ভুল এবং সমাজের জন্য মারাত্মক। অধিকাংশ বাঙালীই অশিক্ষিত এবং এরা গেরুয়াধারীদের অভ্রান্ত মেসিয়া ভাবেন। সুতরাং তারা এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক ধারনা যেন না ছড়ান, সেটাই আমার অনুরোধ।

[১] হার্ভাড হেলথ - Which test is best for COVID-19?
POSTED AUGUST 10, 2020, 10:30 AM , UPDATED SEPTEMBER 30, 2020, 3:17 PM
Robert H. Shmerling, MDRobert H. Shmerling, MD
Senior Faculty Editor, Harvard Health Publishing
[২] The estimation of diagnostic accuracy of tests for COVID-19: A scoping review
Dierdre B. Axell-House,a Richa Lavingia,b,c,d Megan Rafferty,c,d Eva Clark,a,e E. Susan Amirian,c and Elizabeth Y. Chiaof,⁎
[৩]
Nature
Face masks: what the data say
The science supports that face coverings are saving lives during the coronavirus pandemic, and yet the debate trundles on. How much evidence is enough?

Saturday, October 17, 2020

রায়চৌধুরী সমীকরন থেকে পেনরোজ হকিং সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব -পর্ব-৩

                                                                                (৬)

সিঙ্গুরালিটিই বা কি? আর এই সিঙ্গুলারিটি থেকে উদ্ভুত ব্ল্যাকহোলই বা কি? কেন ব্ল্যাকহোল নিয়ে এত হইচই? সত্যিইকি কোন রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল আমাদের সৌরজগতটা কোনদিন খেয়ে ফেলতে পারে? একদম সাপের ব্যাঙগোলার মতন ? আস্তে আস্তে সূর্য্যসহ গোটা সমস্ত গ্রহ ব্ল্যাকহোল শুষে নিতে পারে?

তারআগে ব্ল্যাকহোল কি আমরা জেনে নিই।  আসলে নিউটনের অভিকর্ষের সূত্রেই সিঙ্গুলারিটি ছিল। মানে ব্ল্যাকহোলের সংকেত ছিল।  নিউটনের সূত্র দিয়েই বোঝা যায়, দুটি বস্তুর মধ্যে দূরত্ব শুন্য হলে, তাদের মধ্যে অভিকর্ষজ বল অসীম!  তাছাড়া নিউটনের সূত্র এটাও বলছে, পৃথিবী থেকে ১২ কিমি/ প্রতি সেকেন্ডে ঢিল ছুঁড়লে তা অসীম মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে। যারে কয় এসকেপ ভেলোসিটি। মুক্তিবেগ।  পৃথিবীর ভর যদি সমান থাকে এবং তার ব্যাসার্ধ কমতে থাকে-তাহলে এই মুক্তিবেগের মান বাড়তেই থাকবে! ধরুন পৃথিবীর ব্যাসার্ধকে কমিয়ে ৯ মিলিমিটারে নামিয়ে আনা হল। তাহলে মুক্তিবেগ কত হবে? তিনলাখ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড! অর্থাৎ আলোর গতিবেগের বেশী! মানে সেক্ষেত্রে আলোও আটকে যাবে সেই ক্ষুদ্র পৃথিবীতে! আলো পৃথিবীর অভিকর্ষজ বেগ ছাড়াতে পারবে না।

আলোর যে একটি নির্দিষ্ট বেগ আছে এবং তা আড়াই লাখ কিমি প্রতি সেকেন্ডের কাছাকাছি-এটি আবিস্কার করেছিলেন ডাচ এস্ট্রোনমার ওলে রোমার। অনেকদিন আগে ১৬৭৬ সালে। নিউটনের অভিকর্ষ আবিস্কারের ও আগে। বৃহস্পতির উপগ্রহ আয়োর গ্রহণ প্রায় ১৪ বছর ধরে পর্যবেক্ষন করে উনি বুঝতে পারেন, আলোর গতিবেগ মোটেও অসীম না।  নিউটন অভিকর্ষের সূত্র দিলেন এগারো বছর পর।  ১৬৮৭ সালে। এবং অলে রোমারের কাজ নিউটনের অজানা ছিল না।  কিন্ত এর পরে প্রায় ১০০ বছর ধরে এটা কারোর কল্পনায় আসে নি-আচ্ছা যদি গ্রহ নক্ষত্রের ঘনত্ব  এত বেশী হয়, যে সেখানে মুক্তিবেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় ( যা নিউটনের সূত্র দিয়েই বার করা যায়)  তাহলে সেখানে আলো সহ সব কিছু আটকে যাবে- সৃষ্টি হবে সম্পূর্ন এক কালো গহ্বর !

এটা প্রথম মাথায় আসে এক বৃটিশ  পাদ্রির -জন মিচেল। ২৭শে নভেম্বর ১৭৮৩ সালে রয়াল সোসাইটিতে পেশ করা এক পেপারে তিনি অঙ্ক কষে দেখালেন সূর্য্যের ব্যাসার্ধ্য যদি ছোট হত বা ভর বেশী হত-সেখান থেকে আলো আসত না। উনি তখনো ব্ল্যাক হোল বলেন নি। একে বল্লেন ডার্ক স্টার। অন্ধকার সূর্য্য!

  অদ্ভুত ! মিশেল আরো বল্লেন এই গ্যালাক্সিতেই আছে আরো অনেক অন্ধকার সূর্য্য-যাদের ভর বিরাট- যাদের দেখা যায়। এবং তারা জোড়ায় জোড়ায় ঘোরে ( বাইনারী ব্ল্যাকহোল সিস্টেম )!

  ব্ল্যাকহোল নিয়ে মিশেলের  সব প্রেডিকশন আজ একবিংশ শতাব্দিতে মিলে গেছে। বাইনারি ব্ল্যাকহোল সিস্টেম এই গ্যালাক্সিতে প্রচুর-যার থেকে এক্স রে বিকরিত হয়। কারন আজ আমাদের হাতে স্যাটেলাইট টেলিস্কোপ আছে। গামারে টেলিস্কোপ আছে। এক্সরে টেলিস্কোপ আছে। আমরা পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলি জেনেছি। 

আর মিশেলের হাতে ছিল নিউটনের সূত্র এবং ত্রিশ ইঞ্চির এক টেলিস্কোপ। যা তিনি নিজেই বানিয়েছিলেন আকাশ দেখবেন বলে। 

মিশেল ভূমিকম্পবিদ্যার জনক। আবার প্রথম ইলেক্ট্রোম্যাগনেট তিনিই বানিয়েছিলেন। 

 এহেন লোকের না ছিল কোন বিজ্ঞানের ডিগ্রি-না বিজ্ঞানীর সন্মান। সবাই ভাবত এক পাগল ধর্ম যাজক।  তার একটা পোট্রেট পর্যন্ত কোথাও নেই।  অথচ ব্ল্যাকহোলের ধারনা প্রকৃত আদি জনক তিনিই। 

 অর্থাৎ আমরা দেখলাম, নিউটনের অভিকর্ষের সূত্রের মধ্যেই ব্ল্যাকহোল লুকিয়ে ছিল এবং আইনস্টাইনের জন্মের অনেক আগে,  প্রায় দেড় শতাব্দি আগে ব্ল্যাকহোলের ধারনা, ইভেন্ট হরাইজনের ধারনা ( অর্থাৎ যে রেডিয়াসের মধ্যে সব আলো শুষে নেবে)  সব কিছুই জনমিচেল দিয়ে গিয়েছিলেন। 

আইনস্টাইনের সমীকরনের সোয়ার্জচাইল্ড সমাধান থেকে ব্ল্যাকহোলের ধারনার জন্ম, ইভেন্ট হরাইজনের জন্ম-এটা সম্পূর্ন ভুল ধারনা এবং "হাইজ্যাকড"  ন্যারেটিভ!  আইনস্টাইনের সমীকরন এবং সোয়ার্জচাইল্ড সমাধান আসলে মিচেলের ধারনাটিকে একটি পোক্ট গণিতিক ফ্রেমওয়ার্কের ওপর দাঁড় করালো-আর সেই ফ্রেমওয়ার্কই আরো উন্নত করলেন অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরী। 

মুশকিল হচ্ছে জন মিচেল ছিলেন আপন ভোলা গবেষক। নিজের ঢাক পেটান নি। আবার অধ্যাপক মহল, গবেষক মহলের লোক না। ফলে তার মতন অসামান্য প্রতিভা নিয়ে কোন লেখাপত্তর পর্যন্ত পাবেন না।  আমাদের অধ্যাপক রায়চৌধুরিও কিছুটা এই জন মিচেলের মতন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াতেন- মানে বিশ্ববিজ্ঞানী মহলের সার্কলে নেই-ফলে তার নাম ও খুব কম লোকেই শুনেছে। এমন কি পেনরোজ তার সমীকরন ব্যবহার করলেও , প্রথম পেপারে ওটিকে রায় চৌধুরী ইকোয়েশন বলে উল্লেখ করেন নি।  জন মিচেল এবং অমল রায়চৌধুরী উজ্জ্বল উদাহরন- বিজ্ঞানীদের ও কিছুটা ঢাক বাজাতে হয়!


                                                              (৭)

ব্ল্যাকহোলের ফিজিক্স কি আসলেই খুব জটিল? মজার ব্যপার হচ্ছে ব্ল্যাকহোলের যেটুকু বোধগোম্য, আমাদের "জানা" ফিজিক্সের মধ্যে সেটি বেশ সহজ সরল। আর যার উত্তর নেই,  সেখানে আমাদের জানা ফিজিক্স ও বাতিল। 

ধরুন পৃথিবীটা গ্রাভিটেশনাল কোলাপ্সে একবিন্দু হয়ে গেল। যদিও তা হবার না। সূর্য্যের ভরের প্রায় দশগুন ভরের তারার মৃত্যু হলে তা  গ্রাভিটেশনাল কোলাপ্সে একবিন্দুতে মিশে যাবে।

ভর না হয় কোলাপ্স করে এক বিন্দুতে চলে এল। কিন্ত ওই বিন্দুকে কেন্দ্র করে সোয়ার্জ চাইল্ড রেডিয়াসের একটি গোলকের মধ্যে আমাদের জানা পদার্থবিদ্যা সব ফেইল্ড। কারন সূর্য্য বা লাখে লাখে সূর্য্যের ভর যদি একটি বিন্দুতে কোলাপ্স করে তাহলে তাহলে সেই বিন্দু বা বিন্দু থেকে সোয়ার্জ চাইল্ড রেডিয়াসের মধ্যে ( ইভেন্ট হরাইজনের মধ্যে) স্পেস টাইম পার্টিকল -এদের কি হবে- কেউ জানে না। জানবে কি করে?  ইভেন্ট হরাইজনের মধ্যের কোন খবর ( ইনফর্মেশন)ই বাইরের বিশ্বে আসে না! ব্ল্যাকহোল নিয়ে আমাদের যাকিছু জানা, মানি পরীক্ষিত সত্য, কাল্পনিক তত্ত্ব না, তার সবকিছুই ইভেন্ট হরাইজনের আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিরীক্ষন। ইভেন্ট হরাইজনের মধ্যে আমাদের জানা কোন বিজ্ঞানই কাজ করে না। 

ইভেন্ট হরাইজনে  আমাদের বিশ্ব থেকে দেখলে মনে হবে সময় থেমে গেছে। ব্যপারটা এমন। যদি কোন স্পেসশাটল স্পেস ক্রাফট থেকে ইভেন্ট হরাইজনের দিকে যাত্রা করে- তাহলে শাটলের লোকটির মাত্র কয়েক ঘন্টা, স্পেস ক্রাফটে বসে থাকা লোকেদের কয়েক বছর হয়ে যাবে। এমন একটা দৃশ্য আপনারা দেখবেন ক্রিষ্টোফার নোলানের ইন্টারস্টেলার সিনেমায়। স্পেশ শাটলের যাত্রী যখন ইভেন্ট হরাইজনের কাছ থেকে আবার স্পেস ক্রাফটে ফিরে এল, তখন স্পেস ক্রাফটের সবাই বুড়ো হয়ে গেছে! 

মৃত্যু যেহেতু অবধারিত-সেহেতু ইভেন্ট হরাইজনের গিয়ে মরলে খারাপ হয় না। কেন জানেন? কারন এই সৌরজগত আর পাঁচ বিলিয়ান বছর বাদে মারা যাবে-কিন্ত ওই পাঁচ বিলিয়ান বছর ইভেন্ট হরাইজনে ১ সেকেন্ড  ও না! ফলে একবার ইভেন্ট হরাইজনে পৌছাতে পারলে-এবং সেখানকার বিভৎস গ্রাভিটেশন  এক সেকেন্ড ও  সহ্য করতে পারলে, অমরত্ব একেবারে গ্যারান্টিড! মরলেও! 

কত ধরনের ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা ?  মূলত দুই ধরনের ( এর বাইরেও কিছু আছে-সে ডিটেলেস যাচ্ছি না )। এক, ভারী নক্ষত্রের মৃত্যু হলে তার পরিনতি হয় নিউট্রন স্টার  আর তার থেকেও ভারী হলে এক বিন্দুতে কোলাপ্স করে তা হয় ব্ল্যাকহোল। আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতেই ওমন প্রায় এক কোটি ব্ল্যাকহোল আছে-যারা মৃত নক্ষত্র।   এদের মধ্যে অধিকাংশ কোথায় লুকিয়ে আছে কেউ জানে না। শুধু সেই সব ব্ল্যাকহোলদেরই সনাক্ত করা সম্ভব যারা একটি নক্ষত্রকে বা আশেপাশের গ্যাসপুঞ্জকে  গিলে খাচ্ছে আস্তে আস্তে। মানে ব্ল্যাকহোলের প্রবল মহাকর্ষের টানে নক্ষত্র থেকে প্ল্যাজমা স্পাইরাল আকারে ইভেন্ট হরাইজনে ঢুকে যায়-আর প্ল্যাজমা থেকে নির্গত হয় এক্সরে। কখনো আরো শক্তিশালি গ্যামারে। যখন ব্ল্যাকহোল কোন নিউট্রন স্টারকে টেনে খায়। এগুলি এক্সরে বা গামা রে টেলিস্কোপে ধরা পরে। যেগুলি আছে আমাদের মহাকাশে , নানান স্যাটেলাইটে । আবার কখনো দুটী ব্ল্যাকহোল একে অন্যকে টেনে নিয়ে একটি বিন্দুতে অন্য ব্ল্যাকহোল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন তৈরী হয় প্রচন্ড শক্তিশালী গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ। যা হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের পৃথিবীর স্পেসটাইমকে বাঁকিয়ে দেয়। সেটাই প্রথম ধরা পরে লিগো ইন্ট্রারফেরোমিটারে ২০১৫ সালে। যা পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির যুগ্ম বিষ্ময় !  একটি প্রোটনের দৈর্ঘ্য কত?  এক সেন্টিমিটারকে এককোটি ভাগে ভেঙে, আবার তাকে এককোটি বার ভাংলে যে দৈর্ঘ্য হবে তার থেকেও ছোট । লিগোর ইন্টারফেরোমিটারের দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার। গ্রাভিটেশনার ওয়েভ, যা হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূর থেকে আসছে- তা এই চারকিলোমিটার দৈর্ঘ্যকে খুব সামান্য কমিয়ে দেয়- যার পরিমান প্রোটনের ব্যাসার্ধ্যের সমান।  এত ছোট পরিবর্তন ধরে নিচ্ছে লিগো! 


দ্বিতীয় টাইপের ব্ল্যাকহোল গুলো রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল। এরা একটা গোটা গ্যালাক্সি গিলে ফেলতে পারে। এগুলি থাকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। ইনফ্যাক্ট এই বড় ভরের ব্ল্যাকহোলগুলি- যা সূর্য্যের ভরের কোটিগুন -বা তারও বেশী- হয়ত গ্যালাক্সি সৃষ্টির মূলকারন।  যেমন আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আছে এমন এক ব্ল্যাকহোল যার ভর সূর্য্যের ভরের চল্লিশ লক্ষগুন। কি করে এর সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা ( যেকাজের জন্য এবার নোবেল প্রাইজ দেওয়া হল এন্ড্রিয়া গেইজ এবং রেইন হার্ড গেঞ্জেলকে)?

এন্ড্রিয়াগেইজের কাজ নিয়ে পুরো একটা পর্ব লিখব পরে- আপাতত এটা জানা যাক, এই কাজ করতে তার লেগেছে প্রায় ১৫ বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারটি নক্ষত্রের উপবৃত্তকার কক্ষপথ পর্যবেক্ষন করেছেন।  এর মধ্যে একটি হচ্ছে এস-২ , আরেকটি এস-৫৫। এস-২ এর কক্ষপথ আমাদের সূর্য্য থেকে নেপচুনের কক্ষপথের চারগুন, কিন্ত প্রদক্ষিন করে ১৬ বছরে। যা বৃহস্পতি সূর্য্যের চারদিকে পাক দিতে যা সময় নেয় তার থেকে কিছু বেশী। অন্যদিকে এস-৫৫ নেয় ১৪ বছর। মুশকিল হচ্ছে এরাত গ্রহ না, নক্ষত্র। সূর্য্যের থেকেও দশ-কুড়িগুন বেশী ভারী। এত ভারী ভারী নক্ষত্র কোন এক অদৃশ্যকেন্দ্রে লুকায়িত বিপুল ভরের প্রভাবে ঘুরে চলেছে-খুব দ্রুত-প্রায় ৫০০০ কিমি প্রতি সেকেন্ডে। আইনস্টাইনের তত্ত্বের দরকার নেই-শুধু নিউটনের সূত্র লাগালেই দেখাযাবে এই অদৃশ্য ভরের মান সূর্য্যের ভরের চল্লিশগুন! 

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে খুব শক্তিশালী রেডিও ওয়েভ পাওয়া যায়-তা বহুদিন আগেই আবিস্কার করেছিলেন কার্ল জানস্কি ( ১৯৩১)। এই অঞ্চলটিকে বলে স্যাগিটেরিয়াস এ। এবারের নোবেল বিজেতা রেইনার্ড গেঞ্জেল ২০০২ সালে এই অঞ্চলের ইনফ্রারেড স্পেকট্রাম পর্যবেক্ষন করে প্রথম বলেন, এর কাছাকাছি ব্ল্যাকহোল আছে-না হলে অনেক স্পেক্ট্রামের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব না। আসলে এই রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি কখনো সখনো চলে আসে কোন গ্যাসপুঞ্জ, কখনো বা নক্ষত্র। বা নিউটন স্টার। বা ছোট ব্ল্যাকহোল। তখন রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল গিলে খায় তাদের। আর এই খাওয়ার সময় নক্ষত্রের গ্যাস, ম্যাটার সব প্রবল বেগে উচ্চতাপমাত্রায় ঢুকে যায় ইভেন্ট হরাইজনে। তাপ এত বেশী থাকে যে নিউক্লিয়ার ফিশন চলতে থাকে অবিরত। ফলে তৈরী হয় হরেক রকমের ইলেকত্রোমাগনেটিক স্পেকট্রাম। এক্সরে। গামারে। ইনফ্রারাড। 

আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের এই রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল কি আমাদের একদিন খেয়ে ফেলবে ? 

 সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও তারা ২৫,০০০ অলোক বর্ষ দূরে।  প্রায় ৩৫ লাখ বছর আগে, এক বিশাল হাইড্রোজেন গ্যাসপুঞ্জ ( যার ভর সূর্য্যের ভরের ১০০,০০০ হাজারগুন। এগুলি হচ্ছে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্র তৈরীর উপাদান )  এই রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের কাছে এসে যায়। ফলে ব্ল্যাকহোল এই গ্যাস শুষে নেয়। এই গ্যাস সম্পূর্ন শুষে নিতে সময় লেগেছিল দশলাখ বছর। আর  ব্ল্যাকহোলের প্রবল গ্রাভিটেশনের টানে, হাইড্রোজেন পরমানুর ইলেকট্রন বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্ম হয় এক উচ্চতাপমাত্রার প্লাজমা-যার থেকে তৈরী হয় হাইড্রোজেন ফিউশন চুল্লী। যা সূর্য্যের রান্নাঘর। 

অর্থাৎ যেই আমাদের রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল যখন এই হাইড্রোজেন গ্যাস শুষে নেওয়া শুরু করল, তার প্রবল টানে এবং চাপে এক সাময়িক সূর্য্যের জন্ম হয়। তার ব্যপ্তি বিশাল। আমাদের সৌরজগতের যে আকার তার থেকেও বড়। ভাবুন আমাদের সৌর জগতের সবটা জুড়েই সূর্য্য। কি প্রবল হবে তার আলোর তাপ ?  এই ঘটনায় যে উজ্জ্বলতা এবং  আলোর সৃষ্টি হয়েছিল, তার মান দশকোটি সূর্য্যের সমান। পৃথিবী থেকে ২৫,০০০ অলোক বর্ষদূরে এই উজ্জ্বল আলোকে দেখাযেত আমাদের আকাশে-যা চাঁদের আলোকেও হার মানাত সেই সময়। 


 কিন্ত তাতে কি কিছু ক্ষতি হতে পারত আমাদের পৃথিবীর? এখানে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে। সূর্য্য কিন্ত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে স্থির না। সেও সেই রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোলের টানে  23 কোটি বছরে তার কক্ষপথ পূর্ন করে। এবং এই কক্ষপথ উপবৃত্তাকার।  বর্তমানে আমরা এই কক্ষপথের একদম দীর্ঘতম দূরত্বে আছি। যা আমাদের গ্যালাক্সির একদম বাইরের দিক। যেখানে নক্ষত্র খুব বেশী নেই। সব শান্ত। আগামি ত্রিশ মিলিয়ান বছরের মধ্যে আমাদের সূর্য্য আস্তে আস্তে গ্যালাক্সির ভেতরের দিকে ঢুকে যাবে।  যেখানে নক্ষত্রের সংখ্যা বেশী। ফলে মৃত নক্ষত্র থেকে জন্ম নেওয়া লুকিয়ে থাকা ব্ল্যাকহোলের সংখ্যাও বেশী।

 তারা কি আমাদের পৃথিবীকে খেয়ে নেবে?

সেই সম্ভাবনা কম। কিন্ত ক্ষতি হতে পারে অন্যদিক থেকে। আমাদের সৌর জগতের একদম বাইরের দিকটা হচ্ছে কুইপার বেল্ট।  এখানে আছে অসংখ্য গ্রহানু-যারা এমোনিয়া জল আর মিথেনের বরফে তৈরী।  এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ গ্রহানু আছে যাদের ব্যাস ১০০ কিমির বেশী।  সূর্য্য যখন আস্তে আস্তে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরের দিকে যাবে তখন এই সব লুকিয়ে থাকা ব্ল্যাকহোল বা অন্য নক্ষত্রদের প্রভাবে বা ধরুন হঠাত করে যদি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল আবার বিশাল কোন গ্যাসপুঞ্জ খাওয়া শুরু করে- নানান কারনেই এই কুইপার বেল্টের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা কক্ষচ্যুত হয়ে ধূমকেতু হিসাবে সূর্য্যের দিকে ধাওয়া করবে।  এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কারন এই ধরনের অধিকাংশ দলছুট গ্রহানু বৃহস্পতির অভিকর্ষের টানে, বৃহস্পতি পিঠেই ঝড়ে যায়। কিন্ত ধরুন যদি ওই ধরনের রাক্ষুসে খাওয়ার সময় আমাদের সৌর জগত  ৫-১০,০০০ আলোক বর্ষ দূরেও থাকে, কুইপার বেল্ট ধ্বসে গিয়ে  দলে দলে ধূমকেতু তৈরী হবে। সেক্ষেত্রে কয়েকটি বৃহস্পতিকে ডজ করে পৃথিবীর দিকে ধাওয়া করতেই পারে।  বেসিক্যালি এখন চারমাসে একটি বড় এস্টারয়েড পৃথিবীকে ধাক্কা মারে। কিন্ত তা আমাদের বায়ুমন্ডলে পুড়ে যায়।  সূর্য্য যখন মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছাকাছি যাবে, তখন ব্ল্যাকহোলের সামনে ওমুন গ্যাসীয় খাবার আবার এসে গেলে, তার থেকে যে আলো তৈরী হবে, তার ্বিকিরন চাপেই  ভেঙে যেতে পারে কুইপার বেল্ট!  তখন দেখা যাবে প্রতি সপ্তাহে একটি করে বড় এস্টারয়েড ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে।

কিন্ত এমন ঘটনা কি অতীতে ঘটেছে? পৃথিবীতে প্রানের বয়স ৫০০ মিলিয়ান বছরের বেশী। এর মধ্যে  অনেকবার সূর্য্য  গ্যালাক্সির সব থেকে ঘন এলাকা পার করে এসেছে। তাহলে তখন আমাদের প্রানী মন্ডল ধ্বংস হয় নি কেন? 

হয়েছে। প্রায় ছবার পৃথিবীর প্রানী জগত প্রায় ধ্বংস হতে চলেছিল। লাস্ট টাইম যখন ডাইনোসররা ধ্বংস হল। সেই সময় সূর্য্য ছিল, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সব থেকে ঘন এলাকাতে । যেখানে নক্ষত্র, গ্যাসপিন্ড আর মৃত তারাদের কবরস্থল। মানে ব্ল্যাকহোল কিলবিল করছে। 

নিউয়ার্ক উনিভার্সিটির মাইকেল রাম্পিনো দেখিয়েছেন প্রতি ২৬ মিলিয়ান বছর অন্তর অন্তর, পৃথিবী বৃহৎ মাস এক্সটিংশনের সম্মুখীন হয়েছে। বিজ্ঞানীরদের একটি বড় অনুমান এর কারন ২৬ মিলিয়ান ( দুই কোটি ষাটলাখ) বছর অন্তর অন্তর সূর্য্য আসলেই গ্যালাক্সির ঘন অঞ্চলে চলে আসে। যেখানে লুকিয়ে আছে অনেক ব্ল্যাকহোল। মৃত নক্ষত্র।  সংঘর্ষ হলে, সূর্য্যই চলে যাবে ব্ল্যাকহোলের পেটে। কিন্ত সংঘর্ষ না হয়ে, খুব দূর থেকেও প্রবল অভিকর্ষের টানে বা ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনে ঘটা গ্যাস নির্গত প্রবল আলো থেকে ঘেঁটে যেতে পারে কুইপার বেল্ট। তখন বড় বড় পাথর আছড়ে পড়বে পৃথিবীর বুকে।  

তবে এই তত্ত্ব এখনো পরীক্ষিত না। 

তাহলে ব্ল্যাক হোল মানেই কি মৃত্যু?  সাক্ষাত যমরাজ? 

মোটেও না। ব্ল্যাকহোল আমাদের আশার আলোও বটে। আস্তে আস্তে সব গ্যালাক্সি, সব নক্ষত্রের মৃত্যু হবে। কিন্ত ব্ল্যাকহোলদের মৃত্যু হয় খুব আস্তে। এই মহাবিশ্ব মরে ভূত হলেও ব্ল্যাকহোলরা আরো অনেকদিন থেকে যাবে। কেন?

 ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন থেকে নির্গত হয় হকিং রেডিয়েশন।  ইভেন্ট হরাইজনের কাছে,  শুন্যস্থানের স্পেস টাইম ঘেঁটে দেওয়া জন্য তৈরী হয় পার্টিকল-এন্টিপার্টিকল। যাদের ধ্বংসে তৈরী হয় দুটী ফোটন কনা। একটি মহাবিশ্বে ছড়িয়ে যাবে, অন্যদিকে ব্ল্যাকহোলে চিরকালের জন্য আটকে থাকবে।

অর্থাৎ ব্ল্যাকহোল সম্পূর্ন কালো না- তার ইভেন্ট হরাইজন থেকে কিছু এনার্জি পাওয়া যায়। কিন্ত ভাবছেন সেখানে মানুষ থাকবে কি করে? গ্রাভিটি এত শক্তিশালী? সেত মানুষকে পাস্তা ( স্পাগোটি) বানিয়ে ছেড়ে দেবে? 


ওয়েল এখানেই মজা আছে।  ধরুন পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬৪০০ কিলোমিটার। এবার ধরুন হঠাৎ করে সেই ব্যাসার্ধের মান অর্ধেক করে দিলেন-সঙ্গে সঙ্গে "জি" মানে ভূপৃষ্টে টানের পরিমান বাড়বে ৪ গুন। এইটুকু সহ্য করে নিতে পারে মানুষ। কিন্ত যদি পৃথিবীর ব্যাসার্ধকে   ১/১০ ভাগ মানে, ৬৪০ কিমি করে দেওয়া হয়? সেক্ষেত্রে  ভূপৃষ্টে টানের পরিমান হবে ১০০ জি। যা মানুষ ২ সেকেন্ডের বেশী সহ্য করতে পারবে না। মারা যাবে।  এবার যদি ব্যাসার্ধ্য ৬৪ কিমি করে দেওয়া হয়? তখন ভূপৃষ্টে জি এর মান ১০,০০০ জি। ওই শক্তিদিলে, আমাদের দেহ একদম মাটিতে মিশে যাবে দশ সেকেন্ডের মধ্যে। দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটিতে।  এবার যদি পৃথিবীকে ১ কিমির গোলকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই? তখন সেই প্রবল বলে দেহের কোষ শুধু না, নানান জৈব অনুগুলি পর্যন্ত ভেঙে গ্যাস হয়ে যাবে। 

আর যদি পৃথিবীকে ৯ মিলিমিটারের গোলকের মধ্যে ঢোকায়-তখন সেই ইভেন্ট হরাইজনে ফোর্সের পরিমান? কল্পনার অতীত। ওই বলে পরমানু কোলাপ্স করে নিউট্রন হয়ে যায়!

তাহলে ইভেন্ট হরাইজনে সভ্যতা বাঁচবে কি ককরে? আমরা বাঁচব কিভাবে? 

 হ্যা, এই রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোলগুলোই তখন হবে ভরসা। কেন সেটাও নিউটন দিয়েই বলেদেওয়া যায়, আইনস্টাইন লাগে না।  ধরুন আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোল। সূর্য্যের ভরের চল্লিশ লাখগুন তার ওজন। তাহলে তার ইভেন্ট হরাইজন হবে ৬০/৮০ লাখ কিমি। সেখানে অভিকর্ষজ বল প্রবল, কিন্ত অত বেশীও না। 

তবে কিনা তদ্দিনে আমাদের "দেহ" থাকবে না । এই মানব দেহ যেটুকু কাজ করে, চিন্তা করে তার তুলনায় প্রচুর এনার্জি খায়।  যেকোন উন্নত সভ্যতায় "দেহ" থাকার সম্ভাবনা কম। দেহ মানেই মৃত্যু। প্রচুর এনার্জি খরচ। আর  আমরা যেটুকু চিন্তা করতে পারি, এক সেন্টিমিটারের ছোট সিলিকন চিপ তার থেকেও বেশি  ভাবতে পারে!  সুতরাং ভবিষ্যতে কাজের জন্য থাকবে রোবট- আর মানবচেতনা, চিন্তা হয়ত ঢুকে যাবে চিপের মধ্যে।  এই মানবদেহ মেইনটেইন করতে আমরা এত কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরী করছি, গোটা পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে। আমার ধারন আগামী কয়েক শতাব্দির মধ্যেই দেহ ব্যাপারটাই থাকবে না। শুধু মন রয়ে যাবে। 

 সেই সভ্যতা কিন্ত এই ব্ল্যাকহোলের গ্রাভিটির সাথে কিছুটা হলেও সহবস্থান করতে পারবে। 

কিন্ত এই গ্যালাক্সিতে যে এক কোটি ব্ল্যাকহোল এখানে ওখানে লুকিয়ে আছে-সেগুলো হচ্ছে যুদ্ধের ফিল্ড মাইন । সূর্য্য কিন্ত এই গ্যালাক্সি প্রদক্ষিন করছে। সুতরাং ওমন এক ব্ল্যাকহোলে পা দিলেই কুইক স্যান্ড। সূর্য্য চলে যাবে ব্ল্যাকহোলের পেটে। 

তাহলে সেইসব ব্ল্যাকহোলদের আগে থেকে আমরা সনাক্ত করতে পারি না? যারা ঘাপটি মেরে পরে আছে? যাদের ইভেন্ট হরাইজনে কোন গ্যাস নেই, তারা নেই-ফলে সবকিছুতে মৃত্যুর শান্তি? 

 উত্তর হচ্ছে-সম্ভব। গ্রাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিংর মাধ্যমে। ১৯৯২ সালেই আবিস্কৃত হয়েছে এই মাইক্রোলেন্সিং। সেটা বুঝতে আমাদের আবার আইন স্টাইনের সমীকরন এবং হকিং পেনরোজে ফিরে যেতে হবে। যারা রায় চৌধুরী সমীকরন কাজে লাগিয়ে ব্ল্যাকহোল সংক্রান্ত অনেক ফিজিক্সের আগে থেকেই নির্ভুল ভাবে বলে গেছেন। সেটাই পরের পর্বে লিখছি।