Tuesday, April 21, 2020

কোভিড নিয়ন্ত্রনে জার্মানীর সাফল্য এবং বিজ্ঞানী এঞ্জেলা মর্কেল -

কোভিড নিয়ন্ত্রনে জার্মানীর সাফল্য এবং বিজ্ঞানী এঞ্জেলা মর্কেল -
****
(১)
ইউরোপের স্কোর এই রকম [ আজ অব্দি]
আক্রান্ত ('০০০) মৃতস্পেন ২০৪ ২১,২৮৪
ইটালি ১৮৩ ২৪, ৬৪৮
ইংল্যান্ড ১২৯ ১৭, ৩৩৭
ফ্রান্স ১৫৮ ২০,৭৯৬
জার্মানী ১৪৮ ৫,০৩৩

আমেরিকার কথা বাদ দিলাম। আউট অব কন্ট্রোল। ৮১৭,০০০ আক্রান্ত, ৪৫,২২২ মৃত।
পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ইউরোপের হার্টল্যান্ডে স্পেইন, ইটালি, ফ্রান্সের আশেপাশে থেকেও, জার্মানীতে কিন্ত করোনাতে মৃত অনেক কম। যদিও আক্রান্তের সংখ্যা সমান।
জার্মানীর এই সাফল্যের কারন কি?
(২)
ঘুরেফিরে, চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মর্কেলের নেতৃত্বর স্টাইল সামনে আসছে। কেন সেটা ব্যখ্যা করি। তার আগে এঞ্জেলা মর্কেল সম্মন্ধে জানা যাক।
উনার জন্ম পূর্ব জার্মানীতে, কমিনিউস্ট শাসনের জমানায় ১৯৫৬ সালে। বাবা ছিলেন পাদ্রী। ফলে কমিনিউস্টরা কখনোই ভাল চোখে দেখে নি এই ফ্যামিলিকে। এঞ্জেলা, বার্লিন ওয়ালের পতন পর্যন্ত রাজনীতির ধারে কাছে যান নি। কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রিতে পি এই চ ডি করে, গবেষক ছিলেন।
বার্লিন ওয়ালের পতনের সাথে সাথে,পূর্ব জামানীর লোকেরা গণতন্ত্রের স্বাদ পেল। পূর্ব জামানি তখন কমিনিউস্ট অপশাসনে তৃতীয় বিশ্বের সমতুল্য ( যদিও কমিনিউস্ট ব্লকের মধ্যে এদের অবস্থায় সর্বাধিক ভাল(!) ছিল । এঞ্জেলা মর্কেল তখনই রাজনীতিতে যোগ দেন এবং তার উত্থান ঈর্ষানীয়।
এঞ্জেলা মর্কেলে চরিত্রে অদ্ভুত গুন আছে। বহুদিন বিজ্ঞানী ছিলেন বলে, তথ্য প্রমান নাম্বার ছাড়া সিদ্ধান্ত নেন না আবেগের বশে। আবার কমিনিউস্ট নিপীড়নের মধ্যে বড় হয়েছেন বলে, রাষ্ট্র যাতে জোর করে নাগরিকদের ওপর না সিদ্ধান্ত চাপায়-সেই ব্যাপারেও সজাগ।
এবার দেখুন জার্মানী কি করেছে যা আমেরিকা বা প্রথম বিশ্বের লোকেরা করতে ব্যর্থ
- প্রচুর টেস্টিং। জার্মানী দুই মিলিয়ানের বেশী টেস্টিং করেছে। গণহারে। কোভিড-১৯ এর টেস্ট কিট ও প্রথম তৈরী হয়েছে জার্মানীতে। সরকারি খরচে গণহারে টেস্টিং করানো হয়েছে
- অন্যান্য দেশের মতন করোনা হাসপাতাল করে ফটো শেসন বা সেনসেশনের দিকে যায় নি জার্মানি। এরা যেহেতু তথ্য এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিরোধ সিস্টেম গড়তে চেয়েছে, সেহেতু দ্বিস্তরীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরী করেছে। করোনা আক্রান্ত রুগীদের প্রথমে দেখছে প্রথম স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীরা- ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এখানে আই সি ইউ বা ভেন্টিলেশন নেই। প্রাথমিক চিকিৎসা করে বড় হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে বা বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকাতে বিশাল মৃত্যুর বড় কারন এই যে যখন হাসপাতালে রুগী আসছে, তখন তার মরার চান্স বিশাল। দ্বিস্তরীয় ব্যবস্থা থাকায়, জার্মানীতে ক্রিটিক্যাল পেশেন্টদের আরো আগে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। সেখানেই প্রচুর প্রান বেঁচেছে। ভারতের দিকে তাকান। এক সমস্যা। অনেক রুগীর মারা যাওয়ার পর জানছে ( স্বর্গে বসে অবশ্যই), তারা করোনা আক্রান্ত।
- লক ডাউন করাতেও জার্মানীর সাফল্য বেশী।
তবে প্রচুর টেস্টিং এবং দ্বিস্তরীয় রেসপন্স জার্মানীকে সব থেকে বেশী সাফল্য দিয়েছে।
(৩)
এবার ট্রাম্প, মোদি মমতায় আসি। এই বিপুল জনপ্রিয় নেতারা এখনো হেডলেস চিকেনের মতন নাচানাচি করছেন। জার্মানী যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ট্রাম্প কিস্যুই করে নি। মোদিও আগে থেকে ইন্টান্যাশানাল ফ্লাইট রধ করে নি। ভারতে ডাক্তারদের জন্য পি পি এই পর্যন্ত নেই। কিন্ত এখনো পর্যন্ত ভারতে সেই ভাবে টেস্টিং ই শুরু করা যায় নি। মমতাদির কথা ছেড়েই দিলাম। পাবলিক হেলথ সিস্টেম ছাড়া করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করা অসম্ভব। ডিসেম্বর মাস থেকেই ভারতের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। যেহেতু ভারত এবং পশ্চিম বঙ্গে পাবলিক হেলথের অবস্থা খুব খারাপ। ভারতে শুনি এত এত আবিস্কার হচ্ছে, কিন্ত শেষে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ফল্টি টেস্ট কিট!
পশ্চিম বঙ্গে করোনায় মৃত্যু ছেড়ে দিলাম। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যা অবস্থা, কোন বয়স্ক লোকের হার্ট এটাক বা স্ট্রোক বা অন্য কোন কঠিন রোগ হলে মৃত্যু অবধারিত। যেসব মহিলাদের ডেলিভারী হবে, তাদের কথা, তাদের সন্তানদের কথা ভেবে ভয় হচ্ছে।
প্লেটোর রিপাবলিকে গুরু সক্রেটিস গনতন্ত্রের বেহাল দশাকে জাহাজের সাথে তুলনা করেছিলেন ( বুক-৬) । করোনা প্যানডেমিকে আমেরিকা ভারত পশ্চিম বঙ্গে যা নাটক দেখছি-গনতন্ত্রে যে এমনটাই হয়, সক্রেটিস আড়াই হাজার বছর আগেই লিখেছেন।
যেমন সক্রেটিস বলছেন-গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে সেই জাহাজের মতন-যেখানে জাহাজের ক্যাপ্টেনের ( বুরোক্রাট) ভাল জ্ঞান থাকলেও তাকে সেলরদের ( রাজনীতিবিদ) কথা শুনে চলতে হয়। যারা নিজেদের সব জান্তা বলে দাবী করে -কারন সেলররা মদ এবং গাঁজা খাইয়ে জাহাজের মালিকদের (জনগন ) হাত করেছে এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন ( বুরোক্রাটরা, এডমিনিস্ট্রেটররা ) যতই দক্ষ হোন না কেন, তাকে সেলরদের ভুলভাল নির্দেশেই জাহাজ চালাতে হবে।
গণতন্ত্রের সমস্যা এটাই যে এখানে ভোট পেতে গেলে, মানে যে নেতা হতে চাইবে- তাকে জনগনের নেতা হওয়ার জন্য -জনতাকে ঘুঁশ দেওয়া, ধর্ম জাতির আফিং খাওয়ানো এইসবই করতে হয়।
ফলে ট্রাম্প, মোদি, মমতা যারা ওই জনমোহনের কাজটি ভাল পারেন, তারাই নেতা। বিজ্ঞানীরা কি করে নেতা হবেন?
কিন্ত কোভিড-১৯ এর মতন অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়তে গেলে বিজ্ঞান ছাড়া গতি নেই। তখন দেশের লাগে একজন বিজ্ঞানী কম্যান্ডার ইন চিফ। যিনি জানবেন তথ্যকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে দেশ বাঁচাতে হয়। এঞ্জেলা মর্কেল সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন। রাজনীতিবিদের সাথে একজন বিজ্ঞানীর পার্থক্য কি।
মোদি ট্রাম্প মমতা? এখনো চিত্রনাট্য উপহার দিচ্ছেন। উনারা ওটাই ভাল পারেন। জনগন সেই জন্যে এদেরই ভোট দেয়। কিন্ত দুর্ভাগ্য নাটক সাজানো গল্পই। বাস্তব না। আপনে বিশ্বাস করলেও না।
( বিপ্লব পাল, ২১ শে এপ্রিল, ২০২০)

Thursday, April 16, 2020

মিথ বনাম বাস্তব-করোনার প্রকোপ

(1) হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন কি করোনার সংক্রমন নিরসনে কাজ করবে?
এই কোটি টাকার প্রশ্নে, চীনের এক গবেষনাদল, প্রথম একটা প্রপার ক্লিনিকাল রিলিজ করেছে [১] । তাতে দেখা যাচ্ছে ওভারল কোন লাভ নেই। বরং সাইড এফেক্টে ক্ষতি হতে পারে [ আমি রেফারেন্স দিচ্ছি]। কিন্ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেখানে ব্যাক্টেরিয়াল সংক্রমন ও ছড়ায়, সেখানে ক্লোরোকুইন ভাল কাজ করেছে।
অর্থাৎ এটি মুড়িমুরকির মতন খেলে ক্ষতি হবে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া একদম নেওয়া উচিত না।
(২) করোনা টেস্ট রেজাল্ট কতটা বিশ্বাসযোগ্য? একদমই না। দেখা যাচ্ছে ২০-৩০% ভুল। বয়স্কদের জন্য আরো ভুল। সুতরাং টেস্ট করলেই করোনা সমস্যা সমাধানের দিকে এগোবে, এটাও রাজনৈতিক মিথ [২]। আমি তথ্যসূত্র দিলাম। বিজ্ঞান এখানেও খুব বেশী সুরাহা করতে ব্যর্থ। এক্ষেত্রে এফেক্টিভ সেই একটাই স্ট্রাটেজি-ধরে নিতে হবে আমাদের সবার করোনা ভাইরাসে ধরেছে। সেই ভাবেই স্যোশাল ডিসটান্স মেইন্টেইন করতে হবে।

টেস্ট হচ্ছে না বলে রাজনীতি করে লাভ নেই। টেস্ট হলেই যে সুরাহা হবে, তথ্য কিন্ত তা বলছে না। তবুও বেশী টেস্ট করা উচিত। কারন নাই মামার থেকে কানা মামা ভাল। কিন্ত টেস্ট করলেই সব মুশকিল আসান-তা কিন্ত না।

(৩) কতটা স্যোশাল ডিসটান্স মেইন্টেইন করবেন অন্যজন্যের কাছ থেকে?
অন্যকেউ ভাইরাস এফেক্টেড হলে তার মুখ থেকে নির্গত হাঁচি এবং নিশ্বাসে থাকা ভাইরাস ২২ ফুট অব্দি যেতে পারে [৩]। তাও পরিস্কার বাতাসে। কোলকাতার দূষিত বাতাসে যেখানে পার্টিকুলেট অনেক কনসেন্ট্রেশন বেশী-এটা আরো দূর যেতে পারে। সুতরাং স্যোশাল ডিস্টান্সিং এর সাথে মাস্কও দরকার। ২২ ফুট দূরত্ব মেইন্টেইন করা অবান্তর। মাস্ক, ভাল এন-৯৫ মাস্ক দরকার। না হলে গামছা। কয়েকটা লেয়ারে।

Monday, April 13, 2020

একটি আষাঢ়ে গল্পের খসড়া

একটি আষাঢ়ে গল্পের খসড়া
-বিপ্লব পাল, ১৪ই এপ্রিল
*****
-নিমতলা? বস লম্বা লাইন আছে। অনেকে ডেডবডি নিয়ে তিনদিন বসে। বরফ দিয়ে রাখতে হচ্ছে। পাক্কা খবর। মিঠুর বাবা মারা গেল বেস্পত্তিবার। এখন রবিবার রাত। এখনো নাম্বার আসে নি মনে হচ্ছে
-তাহলে কাশীপুর, গার্ডেনরিচ, ওখানে কত দিন ?
-কি বলবো মলয়দা। সব এক। তিনশো চারশো বডি। তিন চার দিনের লাইন। তবে একটা ফোন দিতে পারি। কিছু বেকার ছেলে পিলে মিলে খুলেছে। আগে সুইগির হয়ে খাবার দিত। এখন ডেডবডি চুল্লীতে পৌছে দিচ্ছে। তবে হ্যা, তিনদিন বডি আগলে থাকতে পারবে না। প্রচুর ডিমান্ড বুঝতেই পারছ। পার বডি এখন পঞ্চাশ হাজার চাইছে। পাঁচে শুরু করেছিল। পাঁচমিনিট ও দাঁড়াবে না। গাড়ি নিয়ে আসবে। হেভি প্রোটেক্টিভ গিয়ার ওদের। চুল্লীর লাইনে ফেলে দেবে। বরফের জোগার ওরাই করবে। তিন চারদিনের আগে নাম্বার আসবে না। বুঝতেই পারছ। আর হ্যা, তোমাকে ত আবার মুখাগ্নি করতে হবে- তোমার প্রোটেক্টিভ গিয়ার আছে ত? করোনার টেস্ট করিয়েছ? চিন্তা করোনা। আরো দশ হাজার ফেললে ওরাই তোমাকে হেবি প্রোটেক্টিভ গিয়ার দিয়ে দেবে। মানে বুঝতেই পারছ, ক্রিমেটোরিয়ামের মানে দুশো তিনশো করোনার লাশ। চারিদিকে ভাইরাস। হেবি গিয়ার চায়। দেখছ না এখন ডাক্তারদেরও পাত্তা পাওয়া যচ্ছে না। সবাই করোনাতে টসে গিয়ে নিজেরাই বাড়িতে কোরান্টাইন।
দুলাল যাকে বলে পাড়ার সব থেকে ডাকাবুকো ছেলে। সিপিএম, তৃনমূল বদলেছে। কিন্ত পাড়ার মুশকিল আসান বদলায় নি। এ তল্লাটে সব কাজে কাউন্সিলার থেকে এম এল এ দুলালকেই চেনে।
প্রথম প্রথম পাড়ায় সপ্তাহে দু তিনজন বৃদ্ধ বৃদ্ধা টসকাচ্ছিল। অজানা জ্বর। করোনা টেস্টিং নেই। আজকাল জ্বরে টসকালে লোকে ধরে নেয় করোনা। শ্বশান বন্ধু পাওয়া যায় না। ভাই, বোন কেউই যাচ্ছে না। পাড়ার বন্ধুবান্ধবরা কেউ আসবে না। টাকা দিয়ে বডি পাঠাতে হচ্ছে। ওই ভাড়াটে ছেলেছোকরারা ফেসবুক লাইভে আত্মীয় স্বজনদের শেষ যাত্রা দেখিয়ে দিচ্ছে। অনেকের ছেলেমেয়েই কোলকাতার বাইরে। ফলে শেষ যাত্রায় ফেসবুক লাইভই এখন দ্যা ট্রেন্ড। সেটা আবার ঘন্টায় হাজার টাকার আলাদা কনট্রাক্ট। এটাই এখন নিয়ম।
পাড়াতে ডেইলি ছ থেকে দশজন মারা যাচ্ছে। এহাত ওহাত ঘুরে দুলালের নাম্বারেই কল আসে। সবাই দুলালকেই ডাকে। আগে দুলাল কমিশন নিত না। এখন ওই নিমতলা পেশাদার শ্বশানবন্ধু কোম্পানী থেকে কাট নিচ্ছে। শালা এত হেবী ব্যবসা। বছরে এ পাড়াতে খুব বেশী হলে তিন চারটে বাড়ি বিক্রি হয়। একটা ফ্ল্যাট ওঠে। একে ওকে দিয়ে আর কত থাকে? আজকাল দুটো পার্টি শশ্বানবন্ধু কোম্পানীকে পাইয়ে দিতে পারলেই দিনে কুড়ি হাজার! পুরো ক্যাশ!
অবশ্য ক্যাশ দেখলেই যে মন ভাল হচ্ছে তা না। বাড়িতে সত্তর বছরের বাবা মা। কালকেই বাবার কাশি উঠেছিল। ভাবছিল টেস্টিংটা করিয়ে নিয়ে আসে। হাসপাতালে যাওয়ার উপায় নেই। করোনাতে ডাক্তার নার্সরাই বোল্ড হয়ে বাড়িতে বসে গেছে! তাছারা হাসপাতাল থেকে করোনা ছড়াচ্ছে আরো বেশী। ডাক্তাররা রুগী দেখা বহুদিন বন্ধ করেছেন। বাবার হাইপ্রেসার। এখন কিছু হলে ডাক্তারবাবুকে ফোন করে ওষুধ নিয়ে আসা। ব্যবস্থা এইটুকুই। আজ মলয়ের বাবা দেহ রেখেছেন। কাল কার বাবাকে নিতে পেশাদার শ্বশান বন্ধুরা এ পাড়ায় আসবে কেউ জানে না। টাকা, দাদা সবকিছু থেকেও লাভ নেই। অজানা ভয় গ্রাস করছে দুলালকে।
ও প্রান্তে মলয় নির্বাক। দুলালই বলে চলল
-মলয়দা তাহলে ওই শ্বশানবন্ধু পার্টিকে বলে দিই। ওদের সিইইও আমার খুব চেনা। আমি একটা ফোন করে দিলেই হবে।
-ইয়ে দুলাল, ওরা কি পুরো পঞ্চাশই নিচ্ছে? মানে বুঝতেই পারছ। লকডাউনের বাজারে গত তিনমাসে আমার ওই দোকান থেকে কোন ইনকাম নেই। এদিকে ছেলের টিউশুনি অনলাইনে নিতে হচ্ছে। তুমি ত বলছিলে ওদের মালিককে চেন...
-কি বলব মলয়দা। দুসপ্তাহ আগেও পাঁচ ছিল। কিন্ত ওরাইবা কি করবে বল। ডেইলি সত্তর আশিটা বডি। তিনটে মাত্র গাড়ি। মেরেকেটে দশটা ছেলে। কে আসবে বলত এই কাজ করতে? প্রানের ভয়ত আছে। তবে বুঝলে সুইগি, ফুড পান্ডার ছেলেগুলোত বেকার এখন। ওদের অনেকেই খুব নীডি বুঝলে। তাদেরই কেউ কেউ আসছে। কিন্ত হেবী ডেইলি রেট দিতে হচ্ছে । দিনে দু হাজার।
- আচ্ছা দুলাল । দিনে দুহাজার দিলেই বডি পৌছানোর লোক পাওয়া যাচ্ছে? তা তুই এক কাজ কর না । আমি তোকে পঁচিশ হাজার দিচ্ছি, তুই গাড়ি আর চারটে ছেলে জোগার করে দে। পঞ্চাশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। বাড়িতে মাও আছে। যা অবস্থা । আজ পঞ্চাশ দিলে, কাল লাগলে আর কিছু থাকবে না রে ভাই।
দুলাল এতটা ভাবে নি। আসলে দালালি করে অভ্যেস। দ্বায়িত্ব নেওয়ার ঝামেলায় থাকে না। মলয়দার প্রস্তাবটা খারাপ না। সত্যিই ত- ছেলেপুলের ত অভাব নেই। লোক ডাউনের বাজারে সবাই বেকার। কিছু ছেলেপুলে জুটে যাবে। পার্টি প্রতি ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা লাভ।
-মলয়দা, ইয়ে যা বলছেন। তাছাড়া কাকুর শেষ যাত্রা বলে কথা। ঠিক আছে। আমিই দেখছি। তোমাকে আর অন্যকোন খানে দেখতে হবে না। আমি ম্যানেজ করে নেব।
সাপ্লাই লাইন যে কখন কেউরাতলার লাইনে মিশে গেছে, কেইই বুঝে উঠতে পারে নি।

Saturday, March 21, 2020

১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্ল যে শিক্ষা নিতে পারি

মহামারীর ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য পেলাম। যার থেকে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছি। ভুল হতে পারে। কিন্ত এগুলো ফারদার ইগনোর করলে মুশকিল।
(১) ১৯১৮-১৯ সালে উত্তর ফ্রান্স থেকে যে স্প্যানিশ ফ্ল ছড়িয়েছিল, তাতে সব থেকে বেশী মারা যায় ভারতে। প্রায় ১ কোটি সত্তর লক্ষ। দেশভাগ বা কোন যুদ্ধে ভারতে এত লোক মারা যায় নি। গঙ্গা ভরে গিয়েছিল ভেসে ওঠা পচাগলা মৃতদেহে। অথচ ইতিহাসের এই পর্বটি সম্পূর্ন গায়েব।
এটির উৎপত্তিও মুর্গী থেকে। উত্তর ফ্রান্সে। প্রথম যুদ্ধ শেষে ফ্রান্স ফেরত ২০০ জন সৈনিক বোম্বেতে অবতরন থেকে এটা ভারতে ছড়ায়।
আস্তে আস্তে গঙ্গা ভেসে ওঠে মৃতদেহে। পোড়ানোর লোক পর্যন্ত ছিল না। কেশব বালিরাম হেজগাওগারের জীবনী পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম ১৯১৯ সালে মহামারী হয়েছিল। কারন এই মহামারীর বিরুদ্ধে তার স্বেচ্ছাসেবকদের কাজের সাথে পরবর্তীকালে ১৯২৫ সালে আর এস এসের জন্মের একটা সম্পর্ক আছে। ঠিক একই সময় খিলাফত আন্দোলন শুরু হয়। পাকিস্থানের জন্মের বীজ ছিল খিলাফত আন্দোলনে। সুতরাং ১৯১৯ সালের মহামারীর ইতিহাস প্রায় মৃত, সব সার্চ লাইট খেয়েছে খিলাফত আন্দোলন। অথচ গান্ধীজি সহ কংগ্রেস নেতৃত্বের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছিলেন এই স্প্যানিশ জ্বরে।
মহামারীতে এত বিশাল মৃত্যু ভারত কেন কোন দেশই কোনদিন দেখে নি। অথচ, স্প্যানিশ ফ্ল ভারতের ইতিহাস থেকে উধাও!
কারন এই মৃত্যুর পেছনে যেহেতু ভাইরাস-সেহেতু ইতিহাসে ঢুকিয়ে কি হবে? পাওয়ার লবির পলিটিক্যাল গেইন নেই। বুঝুন কি অবস্থা। কিভাবে ইতিহাস লিখেছে কংগ্রেসের শিক্ষিত স্যাঙাত বাহিনী।
ইতিহাস পড়ার একটাই কারন। যাতে একই ভুল দুবার না হয়। এই ইতিহাস পড়া থাকলে শাহীনবাগ আর পার্ক সার্কাসে রাজনৈতিক সার্কাস নামাতে কেউ সাহস পেত না। আবার সরকারের উচিত ছিল আন্তর্জাতিক উড়ান অনেকদিন আগে বন্ধ করা। ট্রেইন বাস ও বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কিন্ত যে প্রজন্মের ১৯১৯ সালে মহামারীর ইতিহাস জানা নেই, তাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব কি হতে পারে।
(২) অধিকাংশ ভাইরাসের জন্ম জীবজন্তর শরীরে। মানুষের ত্বক ভাইরাসের ঢোকার জন্য সাধারন ভাবে পুরু। সেই জন্য ভাইরাস ত্বকের দুর্বল অংশ দিয়ে ঢুকবে। এইচ আই ভি, ইবোলা, স্প্যানিশ ফ্ল ছাড়া , অধিকাংশ ঐতিহাসিক ভাইরাসের জন্ম চীনে। কারনটাও বোধগোম্য। যেহেতু তারা নানাবিধ পশু খায়। চোদ্দশ শতাব্দির ব্ল্যাক ডেথ ও চীন থেকে।
কিন্ত একটা ব্যাপার ভাবার আছে। উত্তর ফ্রান্স এবং ভারতের আবহাওয়া এক না। তাহলে স্প্যানিশ ফ্ল কিভাবে ভারতে বিধ্বংশী হয়? সাধারনত ভাইরাস যে আবহাওয়াতে জন্মেছে, তাতেই সক্রিয় থাকে বেশী। যেমন এখন যত কোভিড-১৯ স্ট্রেইন পাওয়া যাবে, সবই মেইড ইন চাইনা স্ট্যাম্প। এবং এগুলো ১০-২০ ডিগ্রি তামমাত্রায় বেশী এফেক্টিভ। ২৫+ হলে, এদের ওয়াল গলতে শুরু করে দেবে।
কিন্ত তার মানে কি ভারত নিরাপদ বেশী? উত্তর হ্যা এবং না।
যেটা হবে, ভারতে যে কোভিড-১৯ এল, এটা ভারতীয়দের দেহে মিউটেট করবে। অধিকাংশ মিউটেশন খতরনাক না। কিন্ত একটা বা দুটো মিউটেশন এমন হবে, যে তার ফলে যে নতুন ভাইরাস এল, সে কিন্ত ভারতের আবহাওয়াতে মানিয়ে নেবে। ফলে ডেঞ্জারেস ভাবে ছড়িয়ে যাবে ভারতে।
তার সম্ভাবনা কত? পুরোটাই নির্ভর করছে কত লোকে সংক্রামিত হচ্ছে। যদি কম লোক এফেক্টেড হয়, প্রোবাবিলিটিই বলে দেবে সেক্ষেত্রে কোভিড-১৯ ভারতের ওয়েদারে মিউটেট করার সুযোগ পাবে না। কিন্ত যদি বেশী লোকে এফেক্টেড হয়, এটা মিউটেট করে , ভারতের ওয়েদারেও খতরনাক হবে।
এই জন্যেই স্যোশাল ডিস্টান্সিং, লকডাউন দরকার। যাতে করোনা মিউটেট করে ভারতের ওয়েদারে ডেঞ্জারেস না হয়। হলে আরেকটা ১৯১৯ অপেক্ষা করছে। কারন ১৯১৯ সাল যে স্প্যানিশ জ্বরে ভারতে বিধ্বংশী হয়, খুব নিশ্চিত ভাবেই তা মিউটেড। না হলে উত্তর ফ্রান্সের ঠান্ডা ওয়েদারের ভাইরাস গাঙ্গেয় উপত্যকার গরম সহ্য করে তান্ডব নৃত্য করতে পারে না।

করোনাতে আশার আলো--

করোনাসন্ত্রাসের সবটাই কি নেগেটিভ? আমি কিন্ত পজিটিভ সাইডই বেশী দেখছি।
১) প্রথমে রাষ্ট্রের হেলথকেয়ার সিস্টেম দেখুন। ভারত এবং আমেরিকা দুটো দেশেই এটি ডিফাংক্ট সিস্টেম। আমেরিকাতে উচ্চকোয়ালিটির চিকিৎসা আছে-কিন্ত দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফার্মা আর ইন্সিওরেন্স কোম্পানীগুলো রাজনীতিবিদদের পকেটে ঢুকিয়ে দিনে ডাকাতি করছে। ডাকাতরাও এত নির্লজ্জ হয় না।
ভারতে সমস্যা অন্য। সরকার চিকিৎসা খাতে খরচই করতে চায় না। বাজেটের ১-২% স্বাস্থ্যখাতে আসে। যেখানে আমেরিকাতে ওটা ২০%। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান বা অন্যান্যদেশ যেখানে সরকারই সমস্ত চিকিৎসার দ্বায়িত্ব নিচ্ছে, সেখানে ৩০%+।
কোভিড-১৯ কে এইজন্য ধন্যবাদ যে এই প্রথম আমাদের প্রজন্ম বুঝছে চিকিৎসা একটা কমিউনিটি সার্ভিস। আমার টাকা আছে, চিকিৎসার সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে আমি সুস্থ থাকতে পারি না। আমার পাশের গরীবলোকটির ও নিরোগ থাকার দরকার। আমার নিজের স্বার্থেই। কারন তা না হলে-তার সংক্রামক রোগ আমার মধ্যেও আসবে।
অর্থাৎ চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য একটা মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের টাকা ফার্মা মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের মালিকদের পকেটে না গিয়ে, জনগনের সুস্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় হওয়া উচিত।
প্রাইভেট হাসপাতাল, প্রাইভেট ইন্সিওরেন্স থাকাই উচিত না। কারন সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দর্শনটা হচ্ছে ফেল কড়ি নেও চিকিৎসা। এই মডেলে গরীবদের চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব না। আর তারা যদি চিকিৎসা না পায়, কোভিডের মতন মহামারীর সামনে ধনীরাও সুস্থ থাকবে না।
আমেরিকাতে করোনাক্রান্ত রুগীর সংখ্যা ১০০,০০০ ছাড়ালে সিস্টেম পুরো ধ্বসে যাবে। ভারতের অবস্থা আরো বাজে হবে।
(২) বহুদিন বাদে দেখছি লোকে রাম-রাহিমের ঝগড়া, মুসলমানদের প্রতি ঘৃনা থেকে উৎরে, কিভাবে করোনার হাত থেকে বাঁচা যায়, তাই নিয়ে একটু হলেও প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষাটুকু নিচ্ছে। যারা গোমূত্রকে মহৌষধি মনে করে, তাদের বোধবুদ্ধি যে প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি ডিঙোয় নি-সেটা আমি আপনি বুঝি। তারা কিন্ত তাদের অন্ধত্বে বিভোর। কে হরি ভজনা করবে আর কে আল্লাকে আজান দেবে, তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। সমস্যা এখানেই ভারতের শাসনভার এদের হাতে। আর ধর্মটাও ভাইরাসের মতন সংক্রামক রোগ। কাউকে হিন্দুত্বের ভাইরাসে ধরলে, অন্যপার্টিকে ইসলামিক ভাইরাসে ধরবেই। উল্টোটাও সত্য। একটা "আসল" সংক্রামক ভাইরাসের সামনে আলতো করে হলেও ধর্মের ভাইরাসের সংক্রমন একটু কমেছে। নিজেকে এবং ফ্যামিলিকে বাঁচাতে, বিজ্ঞান প্রযুক্তির স্মরণাপন্ন হওয়া ছাড়া এদের উপায় নেই। লোকে যে ধর্ম চেতনা থেকে বিজ্ঞান চেতনার দিকে সামান্য হলেও এগোল, এটাই যথেষ্ট।
(৩) করোনা অর্থনৈতিক বিপর্যয় আনবে। এটা মোটেও খারাপ না। দরকার ছিল। কারন জমি বাড়ির দাম কৃত্রিম ভাবে বাড়িয়ে, বাতাস ধোঁয়াতে ধুয়ে, শুধু জিডিপির নাম্বার বাড়ে। দেশের উন্নতির থেকে অবনতি হয় বেশী। এখন লোকে অন্যভাবে ভাববে। চিকিৎসা স্বাস্থ্যে, জনস্বাস্থ্যে উন্নতি হয় এমন স্টার্টাপের কথা ভাবতে হবে। বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের কথা আগে ভাববে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাটের কথা ভাববে। রেগুলার এক্সারসাইজ, ঘুমের কথা ভাববে। ঠিক ঠাক খাবার কিভাবে পাওয়া যায় তার কথা ভাববে। কারন কোভিড-১৯ এর কোন চিকিৎসা নেই। ইমিউনিটি বাড়িয়ে রাখা ছাড়া আর কোন প্রতিরোধ নেই। ফলে লোকে অসুস্থ লাইফস্টাইল থেকে সুস্থ লাইফস্টাইলের দিকে যাচ্ছে। এর জিডিপি ভ্যালু অনেক অনেক বেশী।
(৪) আই টি কোম্পানীগুলো ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করেছে। আমরাও করে দিয়েছি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম এফেক্টিভ, আরো বেশী প্রোডাক্টিভ হতে পারে যদি কর্মীরা সৎ হয়। এতে কার্বন এমিশন, দূষন কমবে।
সঙ্কট সব সময় সম্ভবনার জন্ম দেয়। আমি আশাবাদি। করোনাত্তর পৃথিবী আরো ভাল সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্ম দেবে। কয়েক লাখ লোকের মৃত্যু হবে। কিন্ত মৃত্যুত নিয়তি। উন্নততর রাষ্ট্র এবং সমাজ কিন্ত নিয়তি না-সেটার জন্য এই ধাক্কাটা লাগে।

Wednesday, February 12, 2020

অটোমেশন , জীবিকা এবং চাকরি

অটোমেশনের ফলে ধর্ম কর্পূরের ন্যায় উবে যাবে-এটা লিখেছিলাম, দুদিন আগে। প্রচুর প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। যার অধিকাংশই এই রকম- অটোমেশনের ফলে "চাকরি" গেলে খাব কি?
একদম জ্যোতিবাবুর মতন ভয়। ভীত বাম পশ্চিম বঙ্গে কম্পিঊটার ঢুকতে দেয় নি। ফলে কোলকাতা ব্যাঙ্গালোর হয়ে উঠতে পারে নি। বাঙালীরা ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে আই টি শিল্প গড়েছে। ভারত বর্ষে সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এই মুহুর্তে প্রচুর ভারতীয়র চাকরি (41 লাখ) দিচ্ছে। যার একটির ও অস্তিত্ব ১৯৯০ সালে ছিল না। আমাদের বেড়ে ওঠার স্কুলের দিন দিনগুলিতে [১৯৮০-৯০]-চাকরি বলতে মধ্যবিত্ত বাঙালী বুঝত - সরকারি কেরানী/আমলা/রেল, শিক্ষকতা। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ভাল ছেলেমেয়েদের জন্য। সব বদলে গেছে। এখন তাদের বড় অংশটাই আই টি শিল্পের সাথে যুক্ত।
কিন্ত এর পরে যে এ আই, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ৪-০, আই ও টি, ব্লকচেইন আসছে, তার ফলে কি হবে?
এটা নিয়ে আগেও লিখেছিলাম। চাকরি থাকবে না। কিন্ত তার মানেই জীবিকা থাকবে না-তা না। চাকরি = জীবিকা না।
চাকরি ব্যপারটা মানুষের বিবর্তনে নতুন। উনবিংশ শতাব্দির আবিস্কার যে মানুষকে ৯-৫ টা কাজ করতে হবে। এটি শিল্প বিপ্লবের দান। কিন্ত শিল্পের প্যাটার্ন চেঞ্জ হতেই, চাকরির মৃত্যুও আসন্ন। তার মানে এই না যে জীবিকার মৃত্যু হবে।
উদাহরন দিচ্ছি। তিনটে।
এক। ম্যানুফ্যাকচারিং। যে কারখানাতে একসাথে প্রচুর লেবার কাজ করে, প্রোডাক্ট তৈরী করে। বর্তমানে আসছে থ্রিডি প্রিন্টিং বেসড এডিডিভ ম্যানুফাকচারিং। যেসব দোকানি, ডিস্ট্রিবিউটাররা আগে ফ্যাক্টরি থেকে জুতো কিনে লোককে বিক্রি করত-এখন থ্রিডি প্রিন্টার কিনে , তারা নিজেরাই জুতো তৈরী করতে পারবে। ফার্নিচার থেকে পোষাক-সব কিছুই এই এডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং আসছে। ফলে প্রত্যেকে বাড়িতে বসেই অনেক কিছু তৈরী করতে পারবে। দরকার সামান্য ক্যাপিটাল এবং ডিজাইন ট্রেনিং। ফলে ম্যানুফ্যাকচারিং এর লেবারদের ডিমান্ড থাকবে না। কিন্ত সাধারন লোকজন নিজেরাই ম্যানুফাকচারিং করতে পারবে। সেটা দোকান বা ইকমার্স-যে ভাবে খুশি বিক্রি করতে পারে।
দুই। সফটোয়ার শিল্প। গতি যেদিকে, বড় কোম্পানীগুলি খুব বেশীদিন আর নেই। আস্তে আস্তে সব কিছুই মড্যুউল্যার ইকোসিস্টেমের দিকে যাচ্ছে। মাইক্রোসফট, গুগল, আমাজন -বিরাট ইকোসিস্টেম বানাচ্ছে। মূল খাঁচাটা তাদের। এবার তাদের ইকোসিস্টেমে প্রোডাক্ট বানাও। এক্ষেত্রে যেটা হবে- ৪-৫জন বন্ধু মিলে-কোন একটা মড্যুউল আপ করে ইকোসিস্টেমে দিয়ে দিল। এই ভাবে প্রচুর ছোট ছোট সফটোয়ারর দল মিলে, কমপ্লিট ইকোসিস্টেম বানাবে। সিস্টেম ইন্ট্রিগ্রেশন হবে লেগো লাগানোর মতন। বড় কোম্পানী থাকবে না। ফলে ছোট ছোট এন্টারপ্রাইজ সিস্টেম খুব সহযে, ইকোসিস্টেম থেকেই লোকে বানিয়ে নেবে। এতে যেটা সুবিধা হবে, ছোট ছোট ইনোভেটিভ সফটোয়ার কোম্পানীগুলোর ব্যবসা বাড়বে- যেহেতু মার্কেটিং বটলনেক হবে না। বড় সফটোওয়ার কোম্পানীর দরকার হবে না। এক ওই মাইক্রোসফট-গুগুল- এমাজন বাদে। যারা মূল ইকোসিস্টেম -ইনফ্রাটা দেবে।
তিন। কৃষি। এখন যেভাবে ভারতে চাষ হয়-সেটা দশ বছরে যদি না ওঠে, দেশটাই উঠে যাবে। কারন এই চাষে প্রচুর জল লাগে । প্রচুর খরচ। ফলে ভারতে কৃষিজ পন্যের দাম বেশী। মাটির অবস্থা খুব খারাপ। এই চাষ সাসটেনেবল না। ফলে সমবায় করে বড় জমি বানিয়ে আধুনিক কৃষি আনতেই হবে। এতে জমির মালিক- এবং চাষ করার কোম্পানী হবে আলাদা। আমেরিকাতে আমরা এদের কর্পরেট ফার্মিং বলি। এক্ষেত্রেও এখন চাষি পেশাটাই উঠে যাবে। তার বলে কৃষি হবে শিল্প। এবং সেখানে ছোট ছোট টিম কাজ করবে।
সুতরাং জীবিকার বিবর্তন হচ্ছে এবং হবে। চাকরি জীবিকার একটা রূপ। যা দুশো বছর টিকেছে। আর টিকবে না।

অটোমেশন এবং ধর্ম

(১)
কাল বাংলাদেশের তরুন ক্রিকেটটিমকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে অদ্ভুত সব মন্তব্যের সম্মুখীন হলাম।
আমাদের পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু বাঙালী এবং বাংলাদেশের মুসলমান বাঙালীদের অনেকেই আমাকে জানালেন-আমি বৃথাই বাঙালী জাতিয়তাবাদের প্রসঙ্গ আনছি। কারন বাংলাদেশ এই মুহুর্তে ইসলামিক নেশন। বাঙালীত্ব দেশটির ভিত্তি না। অবশ্যই সব হিন্দু এবং মুসলমান বাঙালী এই মত পোষন করেন না। কিন্ত যে জাতি বাঙলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে নতুন দেশ ছিনিয়ে নিল, তাদের সিটিজেনরা,ভারতের সিটিজেনদের অধিকাংশই যদি মনে করে বাঙলাদেশের ভিত্তি বাঙালী জাতি গোষ্টি না-তাহলে হয় আমি অন্ধকারে আছি- নাহলে তারা ঘৃণার রাজত্বে বাস করছে।
(২)
ধর্মের যে উৎপাত বাংলাদেশ এবং ভারতে দেখা যাচ্ছে সেটা বেশীদিন থাকবে না। খুব বেশী হলে আরেক প্রজন্ম। কারন সেই অটোমেশন।
আসলে কৃষিভিত্তিক সমাজে উত্তোরনের পর, আমাদের সিস্টেমটা এমন ভাবে তৈরী, এখানে একদম নিরেট মাথামোটা, মানে যাদের আই কিউ ৮০ এর নীচে, তারাও চাকরি পায়। কোন না কোন ভাবে করে খেতে পারে। এই ব্যপারটা আর থাকবে না। আস্তে আস্তে চাকরি বা পেশার বিবর্তনটাই এমন ভাবে হবে- শুধু মাত্র যারা চিন্তা করতে পারে, কবিতা গল্প লিখতে পারে-সৃজনশীল লোকজন তারাই করে খেতে পারবে। কারন বাকী কাজ করবে সফটোয়ার-রোবট-নানাবিধ বট।
আমরা আলরেডী সেই বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা যারা এই লাইনে আছি-তারা এটা এখন বুঝছি। বাকীরা আস্তে আস্তে বুঝবে।
ফলে "মার্কেটের" নিয়মেই স্বাধীন চিন্তার লোকজনের চাহিদা বাড়বে হু হু করে।
এখন মার্কেটের চাহিদা এই যে ভারত-বাংলাদেশের লোকজন ধর্মপ্রান হোক। কারন এই মার্কেট ব্ল লেবার মার্কেট। সস্তা লেবারের মার্কেট। এখানে ইঞ্জিনিয়ার -ডাক্তার-বুদ্ধীজীবি-কবি, আসলে সবাই ক্লার্ক। এরা ধার্মিক হবে-এতে আশ্চর্য্য কি। স্বাধীন চিন্তা কাউকে করতে হয় না।
আস্তে আস্তে সেটা বদলাচ্ছে। চোখের সামনেই। কৃষি, টেক্সটাইল, সব শিল্পেই অটোমেশনের জন্য লেবারদের চাহিদা কমছে। আগে ভারতে আই টির কাজ মানে তৃতীয় শ্রেনীর মেইন্টেনান্সের কাজ ছিল। আই টি কুলীর কাজ। বর্তমানে প্রচুর উন্নত স্টার্টাপ তৈরী হচ্ছে। চাহিদা আছে টালেন্টেড লোকেদের। জোগান নেই। মার্কেটে ভ্যাকুয়াম থাকে না। ট্যালেন্টেড লোকেদের চাহিদা থাকলে, উৎপাদন ও হবে।
সুতরাং ম্যান পাওয়ারের এই বিপ্লব অথবা বিবর্তন সাধিত হলে, বাংলাদেশ এবং ভারতে ধর্মের এই প্রাবল্য ফিকে হতে বাধ্য। কতদিন লাগবে সেটা প্রশ্ন। ২০ বছর ও হতে পারে। ৫০ বছর ও লাগতে পারে।
কিন্ত এটা হবেই।
(৩)
এখন একটা প্রশ্ন ওঠে যে ভারত-বাংলাদেশে ডাক্তার ইঞ্জিয়ার বিজ্ঞানীদের মধ্যেই ধর্মের প্রাবল্য বেশী। তথ্য বলে, ভারতের ৫৪% বিজ্ঞানী ধর্মে বিশ্বাসী। মুসলমান বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই সংখ্যাটা ৯০%। আবদুস সালামের মতন পদার্থবিজ্ঞানীও ধার্মিক ছিলেন। তাহলে কি গ্যারান্টি আছে- যে যত উন্নত ম্যানপাওয়ারের দরকার হবে, তত ভারত বাংলাদেশের লোকজন নির্ধামিক হবে?
এর উত্তর অনেক ভাবেই দেওয়া যায়।
প্রথমত আমেরিকাতে বিজ্ঞানীদের ৯৫%+ নিধার্মিক বা ঈশ্বর বিশ্বাসী না। কিন্ত ভারত বাংলাদেশে এর উলটো। এর কারন সার্বিক সমাজ। এখানে নিধার্মিক হলে সমাজে "ফিট" করা মুশকিল। কারন গোটা সমাজটার নির্মানই হয়েছে ধর্মের ওপরে। অর্থাৎ "ধার্মিক" হও বা না হও, ভারত বাংলাদেশে ধর্মিক দেখানোর একটার "পজিটিভ" ইকনমিক ভ্যালু আছে। নির্ধামিক হওয়াটা মুসলিম দেশগুলিতে চূড়ান্ত নেগেটিভ ইকনমিক ইনটেন্সিভ।
দ্বিতীয়ত শিক্ষা ব্যবস্থা । ঈশ্বরে, ধর্মে বিশ্বাস সেদিন যাবে-যেদিন "প্রশ্ন" করার সাহস পাবে। এই উপমহাদেশে ক্লাসে প্রশ্ন করলে ছেলেদের ঠাং ভেঙে দেওয়া হয়। অঙ্ক ভুল করলে মারা হয়। ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদের মাথায় অসংখ্য ভীতি ঢোকানো হচ্ছে- অঙ্ক ভুল করার ভয়, বানান ভুলের ভয়, পরীক্ষায় ফেল করার ভয়- এত ভয়পূর্ন যাদের মাথা- তাদের মাথায় ভূত এবং ভগবান যে স্থায়ী বাসিন্দা হবেন-তাতে সন্দেহ নেই।
তৃতীয় হচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা- মানুষকে শাসন করতে ধর্মের চেয়ে ভাল টুল আর নেই।
অটোমেশনের সামনে এর তিনটেই আস্তে আস্তে ডাইল্যুউট হবে। স্বাধীন চিন্তার লোকেদের কদর বাড়বে- কারন মার্কেট। শিক্ষা ব্যবস্থা ভীতিপূর্ন হলে, সৃজনশীল ঊচ্চচিন্তার মানুষ কোত্থেকে আসবে? ফলে সেখানেও সংস্কার, আজ না হলে কালকে হবে। মার্কেটের চাপেই হবে। আর যত অটোমেশন আসবে-আস্তে আস্তে রাষ্ট্রের ভূমিকাও আস্তে আস্তে অনেক কমবে । ভারত এবং বাংলাদেশের ব্যবসা এবং মার্কেটের অনেকটাই সরকারের নিয়ন্ত্রনে। মার্কেট রেগুলেশনে অটোমেশন এসে গেলে ( যা আসছে )- রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এসবের নীট ফল, রাষ্ট্রের প্রয়োজন কমবে। ফলে ধর্মের দরকার ও কমবে। ভারত এবং বাংলাদেশের ধর্মের এত বাড়বাড়ন্তের মূল কারন রাষ্ট্র- এবং যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করতে উৎসুক। তারাই পয়সা দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘৃণা চাষ করে। সবাই যাতে নিজেকে হিন্দু মুসলমান হিসাবে গর্বিত মানুষ ভাবে, সেটাও পয়সা দিয়ে " ম্যানুফাকচারড"। অধিকাংশ মানুষ সেটা বোঝে না। কারন শিক্ষা-মিডিয়া- এখন স্যোশাল মিডিয়া-পুলিশ-আমলা- এসব কিছুর দখল নিয়ে এসব ঘৃনা তৈরী করা হয়। দুই দেশেই এক অবস্থা।
আপনি বলবেন কেন? বাইবেল, ইসলাম, হিন্দু ধর্ম সর্বত্রই ঘৃনার প্রচুর ছত্র আছে। সেখান থেকেই লোকে শিখছে। এটা ভূল ধারনা। কোরান গীতা কেউ পড়ে না-আর পড়লেও তা বোঝার ক্ষমতা খুব কমলোকের আছে। ফলে ধর্মের ন্যারেটিভ ও পয়সা দিয়েই তৈরী হয়-ক্ষমতা দখলের জন্যই। কালকে যদি বাংলাদেশের সরকার বলে ইসলাম মানে এই এই এই- তাহলে সেই দেশের ইসলাম তাই হবে। কোরানে কি আছে তা কেউ দেখবে না । মোল্লারাও না । কারন শহীদ হওয়ার ইচ্ছা তাদের ও নেই। সুতরাং ধর্ম আসলে কি- ধর্ম বলতে লোকে কি বুঝবে-সেটাও রাষ্ট্র আর মার্কেটই ঠিক করে দেয়।
ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্বল করতে না পারলে- ধর্ম দুর্বল হবে না।
(৪)
আমি সেই বাংলাদেশের , ভারতের স্বপ্ন দেখি- যেখানে বর্ডার নেই। সেনা নেই। পুলিশ নেই। বা নামে মাত্র আছে। রাষ্ট্র দুর্বল। ফলে ধর্মও দুর্বল। কিন্ত মানুষ সবল।
সেটা ২০৩০ হতে পারে। ২০৫০ হতে পারে। কিন্ত হবেই। যেদিন ভারত এবং বাংলাদেশের বাঙালীর মার্কেট-শিক্ষা-সংস্কৃতি, একসাথে মিশে যাবে।
ধর্ম নিয়ে লোকজন বৃথায় চিন্তা করছে। ওসব আর বেশীদিন থাকবে না। শুধু মার্কেটকে তার নিজের হাতে ছেড়ে দিন। মার্কেট তার নিজের প্রয়োজনে, নিজের বিবর্তনেই ধর্মকে ডাইল্যুট করবে।