Friday, November 14, 2014

বাঙালীরা কি কোন কালে হিন্দু ছিল?

                                                                    (১)
হিন্দু শব্দটা গোলমেলে, বিতর্কিত এবং বিটকেলে। তাই বিতর্ক, ধন্দ এবং ধান্দা এড়াতে প্রথমেই একটা সহজ সংজ্ঞা দিই। আমি হিন্দু ধর্ম বলতে কোন তাত্ত্বিক কথকথা, শাস্ত্র, ইতিহাস-কিছুই টানছি না এখানে। বাংলায় হিন্দুধর্ম বলতে আমি তাদের কথা বলছি-যারা মূর্তিপূজো যেমন দূর্গাপূজো, কালীপূজো করে, ঘরে দু একটি দেব দেবীর ছবি রাখে। বাপ মায়ের মৃত্যু হলে শ্রাদ্ধশ্রান্তি। বিয়েতে বামুন ডেকে মন্ত্র মার্জনা।  কীর্ত্তনে, গাজন, জন্মাষ্ঠমীর বারো মাসে তেরো পার্বন। আমি সেই হিন্দু ধর্মের কথা বলছি এখানে, যা সবাই বোঝে। জানে।  এর একটা দিক বৈদিক হিন্দুধর্ম -অন্যটা লোকায়েত প্যাগানিজম। ধরুন দুই এর মিশেল। ককটেল ধর্ম।

প্রশ্ন হচ্ছে এই যে বাঙালীগুলো ইদানিং নিজেদের হিন্দু হিন্দু বলে হর হর মহাদেব গাইছে সকাল বিকেল আর বিদেশী বলে মুসলিমদের তাড়াতে চাইছে-তা জানতে ইচ্ছে হয়, তাদের এই হিন্দু ধর্মটা কতটা স্বদেশী?

 নিজেদের মধ্যে  এদেরএই প্রকট হিন্দুত্বের ভাবটা যদি ইসলামের হাত থেকে বাঁচতে, একটা সারভাইভাল স্ট্রাট্রেজি হয়-তাহলে আমার কিছু বলার নেই । কারন সেক্ষেত্রে সেটা এক্সজিস্টেন্টিয়াল-অস্তিত্ববাদি অবস্থান- যুক্তির থেকে বাঁচার দায় বেশী। গ্রান্টেড।

কিন্ত এই সব বাঙালীরা যদি সত্য সত্যই ভেবে থাকে এই হিন্দু ধর্মটা তাদের আদি পুরুষের ধর্ম-ইসলামের মতন ইম্পোটেড মাদক না-সেটা হবে সত্যের ছয়লাপ।  কারন এই "হিন্দু ধর্মের" প্রায় সবটাই বাঙালীর জীবনে বিদেশী আমদানী। একদম মুসলমানদের মতন ।

                                                   (২)
বাংলায় এই হিন্দু ধর্ম বুঝতে আমাদের একটু মহাভারত ঘাঁটতে হবে।

 আচ্ছা মহাভারত যারা পরেছেন-তারা কি দেখেছেন মহাভারতের কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র মন্দিরে গিয়ে পূজো দিচ্ছে?  মূর্তিপূজো করছে? কালীপূজো বা দূর্গাপূজো বা কোন পূজো করছে?

 গোটা মহাভারতটাই ধর্ম বনাম অধর্মের যুদ্ধ। সেই যুগে ধর্ম বলতে কি বোঝাত, মহাভারতের ছত্রে ছত্রে পরিস্কার। তার জিস্ট হচ্ছে যক্ষপ্রশ্নের সংকলন । যক্ষ যখন যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেন ধর্ম কি?  যুদ্ধিষ্ঠির কোথাও কি বলেছিলেন ধর্মপালন মানে মন্দিরে গিয়ে যজ্ঞ করা? পূজো করা?

 যুধিষ্ঠির উত্তর দেন বুদ্ধিমান লোকের কর্মই ধর্ম।  এবং গোটা মহাভারত জুরে কোথাও মূর্তিপূজো পাওয়া যাবে না । অশ্বমেধ যজ্ঞের উল্লেখ আছে অনেকবার। কিন্ত যাগ যজ্ঞ পূজা অর্চনাকে কেও  ধর্মের সাথে গোলান নি। যুষ্ঠিষ্ঠির যক্ষরাজকে যে উত্তর দিয়েছিলেন -অর্থাৎ বুদ্ধিমান লোকের মতন কর্মপালনই ধর্ম-তাই আমরা দেখবো মহাভারত জুরে। ভীষ্ম তার প্রতিজ্ঞাপালনে সুবদ্ধ-কর্ন তার দানকর্মের মগ্ন। কেও বর্ণভেদ মানছেন-কেও বর্ণভেদের বিরোধিতা করছেন কারন তা অমানবিক। সেগুলোই ছিল তাদের ধর্ম। লক্ষ্যনীয় যে মহাভারতের কথাকার "ধর্ম পালনের" প্রসঙ্গে বর্নভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহেও উস্কানি দিয়েছেন-আবার প্রধান চরিত্রদের বর্নভেদ মানিয়েওছেন।

কোথায় মূর্তিপূজো বা পূজো অর্চনা আছে মহাভারতে?  কোথাও নেই ।

আসল সত্য হল এই  মূর্তিতুলে পূজো অর্চনাটাও ভারতে ইম্পোর্টেড। বহিরাগত হুনদের কাছ থেকে শেখা (০০৭০-০০৮০) । সেটা মহাভারতের যুগের অনেক পরে এসেছে। মহেঞ্জোদারোতে যে যোগী মূর্তি পাওয়া গেছে, সেটা সম্ভবত জৈন যোগগুরুর। এবং আরেকটা ভুল ধারনা মন থেকে ভাঙা দরকার। জৈন ধর্ম ভারত কেন পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম। ঋকবেদের ও আগে এর অস্তিত্ব ছিল। এটি মোটেও হিন্দু ধর্মসংস্কার বা বৈদিক ব্রাহ্মন্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না। উৎসাহী পাঠকরা জৈন ধর্ম নিয়ে আমার আগের লেখাটা দেখতে পারেন (  http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=28847   )। সুতরাং বৈদিক হিন্দু ধর্ম, ঋকবেদের ধর্ম আদি সনাতন ধর্ম -এসব ভুল ধারনা ভাঙা দরকার।

  বৈদিক হিন্দু ধর্মের মূল চারযোগে। অথচ এই যোগ এবং সাধনার কোন ধারনাই ঋকবেদে নেই। ঋকবেদে শুধুই আচার অনুষ্ঠান, স্তোত্র, মন্ত্র। যোগ সাধনা নিঃসন্দেহে জৈন ধর্ম থেকে বৈদিক ধর্মে ঢুকেছে। ঠিক যেমন বৌদ্ধ পন্ডিতদের চাপে বৈদিক ধর্মের সব থেকে সুন্দর সাহিত্য উপনিষদের জন্ম হয়।

  প্রায় দেখি বাংলাদেশের অনেক হিন্দু নিজেদের সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী বলে গর্ব করেন।  তা এই সনাতন ধর্ম বলতে তারা যা পালন করেন, তা কতটা দেশী আর কতটা বিদেশী মাল? যদি ধরে নিই সনাতম ধর্মের একটা রূপরেখা আমরা মহাভারতে পাই-তাহলে তারা যেসব মূর্তি তুলে পূজো অর্চনা করছেন, পালা পার্বনে অংশ নিচ্ছেন-তা কি আদৌ কোনদিন সনাতন ধর্মে ছিল?

একটু পড়াশোনা করলেই জানা যেত যে বাংলায় যেসব দেবদেবী পূজিত হয়-শিব, দূর্গা কালী ইত্যাদি-এদের অধিকাংশই শংকর প্রজাতির দেবতা। কিছুটা দেশী, কিছুটা বৈদিক পুরান-সব ঘেঁটে ঘ হয়ে এই সব দেবদেবীরা বিবর্তিত। এর সাথে মহাভারতের সনাতন ধর্মের সম্পর্ক নেই ।

                                                                      (৩)
বল্লাল সেনের (1160–1179) আগে বাংলায় বৈদিক ধর্মের অস্তিত্ব ছিল না।  কোন ব্রাহ্মন ক্ষত্রিয় ছিল না বাংলায়। অনেকে বলবেন প্রথম গৌড়ীয় রাজা শশাঙ্ক ছিলেন শৈব। এই ব্যপারটা গোলমেলে। এটা ঠিক শশাঙ্কের আমলের এবং তার আগের অনেক শৈব মূর্তি বাংলার মাটি খুঁড়লে এখনো ওঠে। আমি যেখানে থাকতাম সেখান থেকেও দেখতাম মাটির তলা থেকে প্রাচীন শৈব মূর্তি উদ্ধার হত। কিন্ত ইনি বৈদিক শিব নন। ঠিক যেমন মহেঞ্জোদারোর যোগী বৈদিক শিব নন। শিব আসলে উর্বরাশক্তির লিঙ্গ দেবতা এবং যোগী দেবতার শংকঢ়।   জায়গায় এর নানা ভ্যারিয়েশন। পরে ইনি বৈদিক দেবতাদের মধ্যে ঢুকে যান। লিঙ্গ দেবতার ধারনা পৃথিবীর সব দেশের প্যাগানদের মধ্যে ছিল । মেসোপটেমিয়া থেকে রোম সর্বত্র লিঙ্গ দেবতার ধারনা ছিল। সুতরাং কোন লিঙ্গ দেবতা কেও পূজো করতো মানেই সে বৈদিক ধর্মের অনুসারী তা কিন্ত নয়। লিঙ্গদেবতার ধারনা সর্বব্যাপী।

বল্লাল সেনের আগে পাল রাজাদের আমলে বাংলাতে বৌদ্ধ এবং লোকায়েত অনেক ধর্মই ছিল-যার মধ্যে তান্ত্রিক, কালীভক্ত এবং নানান স্থানীয় প্যাগান সংস্কৃতিই পাওয়া যাবে। বৌদ্ধ ছিল রাজধর্ম। কিন্ত কোন জাতিভেদ পাওয়া যাবে না ।

সেন রাজারা এসে প্রথমে বাংলার সব প্রজাদের শুদ্র বানাইলেন!  কনৌজ থেকে ব্রাহ্মন ধরে এনে তাদের গ্রাম দিয়ে বাংলায় ব্রাহ্মন্য ধর্ম, বৈদিক মতে পূজা অর্চনা চালু করলেন। ব্রাহ্মনদের বংশ বৃদ্ধি করতে এদেরকে অনেকগুলি গ্রাম দিলেন। কুলীন ব্রাহ্মনদের অসংখ্য বিবাহে উৎসাহ দেওয়া হল যাতে ব্রাহ্মনদের বংশ বৃদ্ধি হয়। এরাই আজকের চট্টোপাধ্যায় ( যারা চিটাগঞ্জের কাছে গ্রাম পেয়েছিলেন ) বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি উপাধ্যায়।

এক অদ্ভুত হিন্দু যুগের সুচনা হল বাংলায়। কিছু ব্রাহ্মন। বাকী সবাই শুদ্র। বাংলাতে আজো ক্ষত্রিয় বৈশ্য নেই । বাংলার ব্যবসায়ী শ্রেনী সাহারাও শুদ্র আবার বোসের মতন রাজকরনিক শ্রেনীও শুদ্র!!

পাল রাজাদের আমলে যারা ধর্মীয় সাম্য উপভোগ করছিলেন, তারা হঠাৎ করে বর্নহিন্দুর এই শুদ্র স্টাটাসটা মানবেন কেন ? না । বাংলা কখনোই সেন রাজাদের মেনে নেয় নি। বল্লাল সেনের আমলে তার এই জোর করে ব্রাহ্মন্য হিন্দুধর্ম চাপানোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় চারিদিকে। এর মধ্যে বিখ্যাত ছিল বর্ধমানের কৃষক-জেলে বিদ্রোহ। সুন্দরবন এলাকাতে বিদ্রোহ করেন কোম্মপাল (১১৯৬) । তিনি সুন্দরবন এলাকাতে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

অবস্থা বেগতিক দেখে লক্ষণ সেন, বাংলার শুদ্রদের মধ্যে ২৭ টি কাস্টকে উত্তমর্ন শুদ্র স্টাটাস দিলেন ! কিন্ত তাতে কি আর শেষ রক্ষা হয়?  বাংলার জনগন তখন এই বহিরাগত ব্রাহ্মন আর সেনদের প্রতি বেজায় বিক্ষুব্ধ।

ফলে মাত্র দুহাজার সৈন্য নিয়ে বখতিয়াল খিলজি যখন নবদ্বীপ আক্রমন করলেন (১২০২), লক্ষন সেনের পালানো ছাড়া আর কোন পথ ছিল না ।

এর পরবর্তীকালে বাংলায় লোকজন দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে থাকে ব্রাহ্মন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণায়। হজরত শাহ জালালের (১৩০৬-) মতন সুফীদের প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে বাঙালী দলে দলে ইসলাম গ্রহন করতে থাকে চোদ্দশ শতক পর্যন্ত ( শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মের আগে পর্যন্ত)।

     তবে বাঙালীর ইসলাম ও এক অদ্ভুত ধর্ম। বাঙালী মুসলমান আরবিক জানত না কোনদিন ই -বাংলাতে লেখা কোরান ছিল না এই উনবিংশ শতকেও।  তারা মুসলমান হয়েছিল, নামে মাত্রই । অধিকাংশ বাংলা মুসলমান গৃহেই তাদের আদি ধর্ম এবং পার্বনের চল ছিল ষোল আনা। অনেক বাঙালী মুসলমান গৃহেই কালীপুজো হত এই সেদিন ও। আমি নিজেই দেখেছি এরূপ অদ্ভুত জিনিস গ্রামে।

না -বাঙালী মুসলমানদের কোরান হাদিসে উৎসাহ ছিল না কোনদিন ই। এর সব থেকে বড় উদাহরন আরাকানের রাজসভায় প্রথম বাঙালী মুসলমান কবি (১৫৯৭-১৬৭৩)  আলাউল। আলাউল বিখ্যাত পদ্মাবতী কাব্যগ্রন্থের জন্য। তার বাকী কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে বদিউজ্জামাল কাব্যগ্রন্থটি বাদ দিলে বাকীগুলি ( সতী ময়না, সপ্ত পয়কর ) সবগুলিই হিন্দু কাব্য কাহিনী থেকে নেওয়া।

আর সেই জন্যেই উনবিংশ শতাব্দি পর্যন্ত একজন ও বাঙালী মুসলমান পাওয়া গেল না যিনি কোরান বাংলায় অনুবাদ করতে উৎসাহী হবেন। বাংলায় কোরান অনুদিত হল। কিন্ত করলেন একজন ব্রাহ্ম। গিরীশ ভাই। কেশব চন্দ্র সেনের অনুরোধে। তাও তাকে যেতে হল লক্ষ্ণৌতে। কারন বাংলাতে তিনি একজন ও কোরান বিশারদ পন্ডিত পেলেন না !

অর্থাৎ বাঙালী মুসলমানরা নামেই মুসলমান ছিল-কোরানে কি আছে না আছে-এদের কেওই কোনদিন জানার চেষ্টাও করে নি।  ফলে ইসলামটা অধিকাংশ বাঙালী মুসলমানদের কাছে একটা ধর্মীয় আইডেন্টির বেশী কিছু ছিল না দীর্ঘদিন।

  যাইহোক চৈতন্যের জন্মের আগেই অধিকাংশ বাঙালী নমঃ নমঃ করে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে-যদিও তারা আদৌ জানত না কোরান হাদিস কি বা মহম্মদ কে ছিলেন! সবটাই যেটুকু সুফী ইসলামের ভাল ভাল গল্প উপদেশ তারা শুনতো-সেই টুকু ইসলামি লোকগাথাই ছিল তাদের ইসলাম।

                                                            (৪)
চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৪) গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মই প্রথম বাঙালী হিন্দুত্বের একটা প্রথম আইডেন্টিটি। তিনি জাতিভেদ তুলে দিলেন। শুদ্রদের ডেকে নিলেন। সব হিন্দু আচার বর্জনের ডাক দিলেন। ফলে ইসলামের রথ ও আটকে গেল। যদি কেও মাটির ধর্মে সাম্য পায়, যে নিশ্চয় আরবের ধর্মে সাম্য খুঁজতে যাবে না ! সেই সময় আসলেই অনেকেই  ইসলাম নিয়েছিলেন নামে মাত্রে। সেই অর্থে আরবের সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না । ফলে এক বিপুল সংখ্যক মুসলিম আবার চৈতন্যের হরি-সংকীর্তনে হিন্দু ধর্মে ফিরে এল। চৈতন্য ভাগবতে এর উল্লেখ আছে।

গ্রামে গঞ্জে বাঙালীর হিন্দু ধর্মের ভিত্তি সেই বৈষ্ণব ধর্ম। এই সব পূজো অর্চনা চিরকালই জমিদারি শ্রেনীর অনুষ্ঠান। জমিদারদের এই পূজাপার্বনে নিম্ন বর্নের হিন্দুরা অংশ নিত ঠিকই-কিন্ত তাদের প্রানের ধর্ম ছিল  হরি সংকীর্তন । এই ট্রাডিশন আজো চলছে।  গ্রাম বাংলাতে অধিকাংশ লোক এখনো শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্মেই আপ্লুত। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথ এরা ভীষন আরবান। এতটাই শহুরে, যে শহরের বাইরে এদের খুঁজতে আজও কষ্ট হবে।

                                                                (৫)

আমি শুধু এটুকুই লিখতে চেয়েছিলাম, বাঙালীর মধ্যে হিন্দুত্ব বা ইসলামিয়তের আইডেন্টিটি খুব গভীরে না । বরং বাঙালীর প্রাণের অনেক গভীরে তার বাউল গান, তার ভাটিয়ালি গান। কিন্ত গত ত্রিশ বছরে পেট্রোডলারে অসংখ্য মাদ্রাসা গজানোয় এবং মসজিদ তৈরী করে বাঙালী মুসলমানের মনে এবং রক্তে আরবের বর্বর ইসলামের বিশাক্ত বীজ বপন করা হয়েছে। ফলে পাশাপাশি থাকা হিন্দুদের জীবন হয়েছে বিপন্ন। পরিত্রানের আশায় তারাও এখন হিন্দু ধর্মে তাদের আইডেন্টি, পরিচয় খুঁজছে। বিজেপি, হিন্দু সংহতি ইত্যাদি সংগঠনের তলায় নিজেদের সংঘবদ্ধ করছে।

 সমস্যা হচ্ছে,  হিন্দু ধর্মে তারা যে আইডেন্টি খুঁজছে, তা কিন্ত তাদের নয়!

  শ্রী চৈতন্য কি মুসলমানদের ঘৃণা করতে শিখিয়েছিলেন ? হরিদাস ঠাকুর (যবন হরিদাস) প্রথম জীবনে মুসলিম ছিলেন যিনি পরে বৈষ্ণব আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতা হবেন। চৈতন্য ভাগবতে দেখা যাচ্ছে হরিদাস ঠাকুরকে যখন ইসলাম ছাড়ার জন্য মৃত্যদন্ড দিল কাজী-উনি মোটেও ইসলামকে অসন্মান করেন নি। সেই কাজীকে একটা মুল্যবান কথা বলেছিন হরিদাস ঠাকুর। প্রকৃত ভক্তের শুধু একটাই ভগবান থাকে-আর সেই ভগবানকে ধর্মের নামে আলাদা করা যায় না ।

সুতরাং বৈষ্ণব ধর্মকে যদি বাংলার মূল হিন্দুধর্ম ধরি-তা মোটেও মুসলিমদের ঘৃণা করতে শেখায় না ! বরং চৈতন্য চরিত্রামৃত এবং চৈতন্য ভাগবতে অনেক উদাহরন পাওয়া যাবে যেখানে শ্রী চৈতন্য মুসলিমদেরও ভাই হিসাবে ডেকে নিয়ে একসাথে নামসংকীর্তন করেছেন-তারাও ক্রমে বৈষ্ণব ধর্মের কোলে ফিরে এসেছে!

আজকে যারা হিন্দু হিন্দু বলে আকাশ বাতাস মুখরিত করছেন, তারা পারবেন শ্রীচৈতন্যের মতন মুসলিমদের বুকে টেনে নিতে? তারাত শুধু ম্লেচ্ছ বলে বিষ ছড়াতেই ব্যস্ত। পারলে তাদেরকে ভারত থেকে বিদেয় করতে পারলে বাঁচে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ ঘৃণাকে তারা হিন্দু ধর্ম বলে চালাতে চান। সেই ঘৃণা দেখলেও আঁতকে উঠতে হয়। এটা কোন ভবিষ্যতের পথ না । ওয়াহাবী ইসলামের কবল থেকে বাঙালী মুসলমানদের বাঁচাতে হলে, তাদেরকে চৈতন্যের প্রেমের পথই দেখাতে হবে। নইলে তারা তাদের ইসলামিক পরিচিতিটা আঁকরে ধরে আরো বেশী ওয়াহাবী মুসলমান হওয়ার চেষ্টা করবে-যার পরিনাম আরো বেশী জঙ্গী, জেহাদি ও বোমা।



Monday, November 10, 2014

বিধান রায়ের মুল্যায়ন

বিধান রায়ের মুল্যায়ন নিয়ে বামেদের সাথে আমজনতার মিলবে না -এটা সাদা কথা। এবার দেখা যাক বিধান রায়কে নিয়ে বামেদের মুল্যায়ন আদৌ ঠিক কিনা। কারন আমাদের মতন আম বাঙ্গালির চোখে উনিই বাংলার সেরা মুখ্যমন্ত্রী। সুতরাং বিধান রায়কে নিয়ে সুস্থ বিতর্ক হৌক। বামেরা তাদের যুক্তি দেখাক। আমি আমার বক্তব্য জানাচ্ছি কেন বিধান রায় বাংলার সেরা মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজনীতিবিদ
(১) উনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভে আসেন ১৯২৫ সালে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ক্যান্ডিডেট হিসাবে। ব্যারাকপুরে সুরেন ব্যানার্জিকে পরাস্থ করেছিলেন প্রথম নির্বাচনে একজন আনকোরা নির্দলীয় পার্থী হিসাবে!! কারন তদ্দিনে বাংলার মানুষ সমাজসেবী নিঃস্বার্থ বিধান রায়কে চিনে গেছে-তাই পোড় খাওয়া সুরেন ব্যানার্জি তার কাছে হেরে যান!
(২) উনি কংগ্রেসের গোষ্ঠিবাজি, দলাদলিতে কোন কালে ছিলেন না । পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হতেও চান নি। কঠিন সময়ে পশ্চিম বঙ্গের হাল ধরে ছিলেন শুধু গান্ধীজির অনুরোধে। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দেখলে দেখা যাবে তিনি গঠনমুলক কাজে জড়িয়ে ছিলেন সারা জীবন ।
শুধুত কল্যানী, হলদিয়া, দুর্গাপূর না -যাদবপুরের টিবি হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে আরো একডজন স্পেলাসিস্ট সরকারি হাসপাতাল তার হাতে তৈরী। তার জ্যোতিবসুর অবদান কি? তার আমলে রক্তচোষা প্রাইভেট আমরি, রুবি ছাড়া বলার মতন কি তৈরী হয়েছে??
(৩) সেই ১৯২৭ সালেও, বিধান রায় হুগলী নদীর দূষনের বিরুদ্ধে সরকারি স্টেপ নিতে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বিল আনার চেষ্টা করেন, দূষনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। আর তার ৭০ বছর বাদে জ্যোতি, বুদ্ধ বা মমতার কাছে এসব দূষন মাথায় ঢোকার বস্তু না । বিধান রায়ের রাজনৈতিক চেতনার মূলে ছিল সবার জন্য সুস্বাস্থ্য, সুচেতনা । মমতা, জ্যোতি বুদ্ধ এদের রাজনীতি ভোট গোনা। সুতরাং আমের সাথে আমড়ার তুলনা করে লাভ কি?
(৪) উনি একজন সফল সমাজতন্ত্রী। কোলকাতা কর্পরেশনে ১৯৩১-৩৩ সালে তিনিই প্রথম বিনা পয়সায় চিকিৎসা এবং শিক্ষার জন্য ছোট ছোট কেন্দ্র খোলেন। তার মুখ্যমন্ত্রিত্বে পশ্চিম বঙ্গে সরকারি শিক্ষা এবং সরকারি চিকিৎসার প্রসার হয়েছে। আর জ্যোতি বুদ্ধ মুখে সমাজতন্ত্রের বুলি কপচিয়ে প্রাইভেট নার্সিং হোম আর প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পেদে বেড়িয়েছে। সরকারি পরিশেবা ধ্বংস হয়েছে। সরকারি পরিশেবা ধ্বংস করে শিক্ষা এবং চিকিৎসার বেসরকারিকরন সিপিএম করেছে। সুতরাং প্রকৃত সমাজতন্ত্রী, সফল সমাজতন্ত্রীকে আপনারাই জেনে নিন।
আমি কি দিয়ে মাপবো বিধান রায় বনাম জ্যোতি বুদ্ধ মমতাকে?
মেধা? সেক্ষেত্রে এদের কেও বিধান রায়ের নোখের যোগ্যও না !! একজন এফ আর সি এস ডাক্তারের সাথে বাপের পয়সায় পড়াশোনা করা ফেইলড ব্যারিস্টারের তুলনা কি সম্ভব?
সরকারি পরিশেবা ? বিধান রায় যেটা তৈরী করেছিলেন, জ্যোতি সেটা ধ্বংস করেছিলেন। এনিয়ে আশাকরি বিতর্কে যাবেন না । কল্যানী, দূর্গাপূর আজকে শশ্বান শহর । অথচ এগুলোর প্রান প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বিধান রায়ের হাতে। সি এম সি, এন আর এস বিধান রায়ের আমলে কি ছিল, আর সিপিমের আমলে কি ছিল-সেটা যেকোন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করুন-তর্কে যেতে হবে না ।
উন্নয়ন, শিল্পায়ন নিয়ে কথা বললে বিধান রায়ের সাথে বাকীদের তুলনা করতে, মাইক্রোস্কোপ লাগবে!
ভিশন ?
১৯২৭ সালে যে লোকটা পরিবেশ দূষনের বিরুদ্ধে রাজনীতি করার দূরদর্শিতা দেখায় আর তারপরে কোনদিন কোন বাঙালী রাজনীতিবিদ দূষনের বিরুদ্ধে রাজনীতি করার দূরদর্শিতা দেখাতে পারে নি-তাহলে জ্যোতিবোসের মতন অতি সাধারন মধ্যমমেধার মানুষ যিনি পশ্চিম বঙ্গকে ধ্বংস করার রাজনীতি ছাড়া কিছু দেখাতে পারেন নি, তিনি কোন যোগ্যতায় বিধান রায়ের ত্রিসীমানাতে আসেন?
আমি বিধান রায়ের পক্ষে আরো অনেক কিছুই লিখতে পারতাম। এবার বামেরা তাদের বক্তব্য বলুক যুক্তি তথ্য দিয়ে।

অন্যেদের যুক্তি না শোনা মানে সেই জগতটাকে আরো ছোট করা

পৃথিবীতে সর্বত্র লিব্যারালদের এক সমস্যা। সবাই বিদ্রোহী। কারন ব্যক্তিগত ক্ষোভ, অভাব, অনুযোগ, অভিজ্ঞতা। কেও কমিনিউস্ট কেন? সমাজে অসাম্য, দারিদ্র, বঞ্চনার প্রতি ক্ষোভ। লিব্যারাল কেন? বাবা মা সমাজ হয়ত তাকে প্রহ্লাদ পাথরে বেঁধে বড় করতে চেয়েছিল! তাই মনে পুষে রাখে প্রবল বিক্ষোভ। হিন্দুত্ববাদি কেন? নিউজ, মিডিয়া ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তার মুসলিমদের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষোভ।
মুশকিল হচ্ছে একটা নির্মোহ যুক্তিপূর্ন অবস্থান থেকে কেও আদর্শবাদের সাথে জড়াচ্ছে না । ফলে এদের সবার মধ্যে একটা এক্সট্রিমিস্ট র‍্যাডিক্যাল অবস্থান। বিরুদ্ধ মত, ভিন্নমত সহ্য করতে পারছে না । অথচ ভিন্নমতটার মধ্যে না ঢুকলে কোন যুক্তিপূর্ন অবস্থানই সম্ভব না ।

কাল দেখলাম সমীক ময়ুখকে ব্যান করার জন্য একটা পোষ্ট দিয়েছে। ময়ূখ ছেলেটিকে গ্রুপের লিব্যারালরা অপচ্ছন্দ করে। কিন্ত সে তার নিজের মতন করে বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছে। আলটিমেটলি সেটা কুয়োর ব্যাঙের মতন পরিত্যক্ত কুয়োয় লাফানোর চেষ্টা। কিন্ত কুয়োর ব্যাঙ আমরা কে নই ? কারুর কুয়ো বড়, কারুর ছোট। কারুর জল পচা, কারুর পরিস্কার। কিন্ত আমরা যেটুকু জানি, দেখি, সেটুকুই আমাদের জগত।
অন্যেদের যুক্তি না শোনা মানে সেই জগতটাকে আরো ছোট করা।

Sunday, November 9, 2014

এমন কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবি জন্মেছেন, যার রাজনৈতিক চিন্তা পাতে দেবার যোগ্য?

জিহাদিনী রাজিয়া বিবিকে বিপ্লবী আখ্যা দেওয়াতে বাঙালী দেখলাম সুমনের পেছনে লেগেছে। সুমনের রাজনৈতিক চিন্তা থেকে সত্যিই কি কিছু পাওয়ার আছে?

সুমন কেন, আর এমন কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবি জন্মেছেন, যার রাজনৈতিক চিন্তা পাতে দেবার যোগ্য?

বিদ্যাসাগর, চৈতন্যদেব, তাজুউদ্দিন এবং বিধান রায় ছাড়া আর কোন  বাঙালীকে মনে পড়ছে না যাদের মধ্যে সত্যিকারের কিছু পরিপক্ক রাজনৈতিক চিন্তা ছিল।

বিবেকানন্দ এবং নেতাজির চিন্তাধারা বেশ ফ্যাসিস্ট। দুজনেই জাপানী ফ্যাসিজমে মুগ্ধ ছিলেন। এদের রাজনৈতিক বক্তব্যকে কখনোই পরিণত বলে মনে হয় নি-অধিকাংশটাই জাতীয়তাবাদি আবেগ বা ন্যাশালিস্টিক স্যোশালিজম ছাড়া কিছু না । গভীর কোন রাজনৈতিক চিন্তার পথ ইনারা দেখান নি।

আর গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ? মুক্তধারা এবং গোরাকে যদি তার অন্যতম মূল রাজনৈতিক থিসিস ধরি-তাহলে উহাদের মধ্যে সাহিত্য আছে-কিন্ত রাজনৈতিক চিন্তার গভীরতা নেই । মুক্তধারাতে তিনি আন্তর্জাতিক, আবার গোরাতে জাতীয়তাবাদের গোঁড়ামি।  বেসিক্যালি দশঘোঁটলা কবিত্ব। খেতে উত্তম, কিন্ত রাজনৈতিক প্রোটিন নাই।

শেখ মুজিবর রহমানের কথা ছেড়ে দিলাম। উনি দাদাগিরির সাথে রাষ্ট্রচালনাকে প্রায় গোলাতেন। বাকশালের সময়ে ওর কিছু বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছিল উনি স্টালিনকে ফলো করতে চাইছেন-কিন্ত সেটা আবার প্রকাশ্যে বলতেও পারছেন না । ইসলাম, রাশিয়া মিলিয়ে সাপের ব্যাঙ গেলার রাজনীতি-যা বাংলাদেশের ভিত্তিকেই দুর্বল করেছে।

জ্যোতিবসু, বুদ্ধদেব বা মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে কিছুই বলার নেই । এদের রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে সময় নষ্ট করে লাভ নেই । সব মগ ডাল কাটা কালিদাস-আর এদের রাজনীতির সবটাই দিল্লীর বিরুদ্ধে বেদনাবিলাস!

 বরং সফল ছিলেন চৈতন্য। জাতিভেদ প্রথা তুলে বাঙালীর ইসলামীকরন আটকানোতে তিনি ১০০% সফল । হিন্দু ধর্মের মধ্যে গোটা পৃথিবীতে তার প্রচারিত হিন্দু ধর্ম ( গৌড়িয় বৈষ্ণব-বা ইস্কন ) সব থেকে বেশী জনপ্রিয়। আমি ধর্ম মানি বা না মানি, তার রাজনৈতিক সাফল্যকে না মেনে উপায় নেই।

বিদ্যাসাগর সর্বকালের সেরা বাঙালী। হিন্দু জাতি, বাংলা ভাষা যেখানে সংস্কারে হাত লাগিয়েছেন-সফল। কারন তার সততা, কর্মনিষ্ঠতা ছিল প্রশ্নাতীত। উদ্দেশ্য সৎ, মানুষটা সৎ, যে সংস্কার কাজে হাত লাগিয়েছেন, সফলতা এসেছে।

তাজুউদ্দিন বাংলাদেশের ইতিহাসের ট্রাজিক চরিত্র। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে উনার সফল রাজনৈতিক চালনাতেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধে  উনিই ছিলেন আসল নেতা-শেখ মুজিবর তখন জেলে। আমি মনে করি সেটা ছিল বাংলাদেশের পক্ষে শাপে বর।
তাজউদ্দিন যেভাবে দক্ষহাতে মুজিবনগর সরকার চালিয়েছেন, শেখ সাহেব পারতেন না । শেখ সাহেবকে যদি পাকিস্তানিরা মেরে ফেলত, সেটা বোধ হয় বাংলাদেশের জন্য এবং শেখ সাহেবের জন্যও ভাল হত। বাংলাদেশ একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক পেত যিনি শেখ সাহেবের তাবেদার হতে পারেন নি বলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে  প্রথমে উপেক্ষিত নায়ক, তারপরে শহিদ হলেন।  শেখ সাহেবও নিজের হাতের লোকেদের হাতে খুন হওয়ার অসন্মান থেকে বেঁচে শহীদ হতেন। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে তাকে ইতিহাসের পাতায় ঘুরতে হত না ।

বিধান রায় সম্ভবত বাংলার একমাত্র সফল রাজনীতিবিদ। যিনি রাজনীতি বলতে উন্নয়নের রাজনীতি বুঝতেন -হলদিয়া, কল্যানী থেকে দুর্গাপূর-বাংলার সফল উন্নয়নের রাজনীতি তার তৈরী। যা পরবর্তীকালে বামেরা সম্পূর্ন ধ্বংস করে।

বাঙালী বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে রাজনৈতিক চিন্তার পরিপক্কতা আশা করা আর কেন্নোর সোজা পথে চলা-একই রকমের ভ্রান্ত প্রত্যাশা। সুস্থ চিন্তার রাজনীতিবিদ বাংলায় ইউনিকর্ন। 

লেখক

লেখক পরিচিতিঃ
 বিপ্লব পাল পেশায় আমেরিকা প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার। আই আই টি খরগপুরের প্রাত্তন ছাত্র, টেলিকমিউনিকেশনে পি এই চ ডি করে দীর্ঘদীন ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষনা করার পর বর্তমানে জ্রেয়াস টেকনোলজি কোম্পানীটির প্রতিষ্ঠাতা ।


 নেশায় লেখক। লিখছেন দীর্ঘদীন ধরে। উনার প্রবন্ধ ও ব্লগের বিরাট সংখ্যক পাঠক পশ্চিম বঙ্গ এবং বাংলাদেশে বিদ্যমান। মূলত সমাজ বিজ্ঞান, ধর্ম এবং রাজনীতির অন্তরঙ্গ রসরহস্য নিয়েই লিখে থাকেন এবং তার অনেকগুলি প্রবন্ধ বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বঙ্গের তরুন প্রজন্মকে নতুন ভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।

  বর্তমানের সংকলনের গল্পগুলি ২০০৫-২০০৬ সালের মধ্যে লেখা যখন লেখক ভিন্নবাসর নামে একটি ইন্টারনেট পত্রিকাতে সম্পাদক ছিলেন। মূলত এই পত্রিকাতেই বেড়িয়েছিল এই গল্পগুলি। অধিকাংশ গল্প আমেরিকাতে প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে অথবা
সায়েন্স ফিকশন ঘরানা। 

বার্লিন ওয়ালের মৃত্যুদিন

আজ বার্লিন ওয়ালের মৃত্যুদিন। দুই জার্মান জাতিকে বিভক্ত করেছিল যে কৃত্রিম বিভেদ তার ধ্বংসের দিন। 

এই দিনটাই আমি আরেকটা যন্ত্রনায় ভুগি। যখনি বাংলাদেশের লোকেদের সাথে কথা, আলাপ হয়, তখন যন্ত্রনাটা আরো বাড়ে। একমন, একদেহ-কেও যেন করাত চালিয়ে দ্বিখন্ডিত করেছে!

ইসলাম বা বৈদিক হিন্দু ধর্ম কোনটাই বাঙালীর ধর্ম নয়। ইসলাম আরবের অপসংস্কৃতি, হিন্দু ধর্ম হচ্ছে উত্তর ভারতের। আমাদের সংস্কৃতির শিকড় সেই আউল বাউলে। রবীন্দ্র নজরুলে।

অথচ বাঙালী মননশীলতায় এতই গরীব, এই দুই বিদেশী সংস্কৃতি আঁকড়ে, আমরা নিজেদের নিজেদের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তুলে দিলাম। দুটো আলাদা দেশের বাসিন্দা হলাম। আমাদের কোন নেতা মহানেতার বলার সাধ্য নেই -আমরা বাঙালী-আমরা হিন্দু মুসলমান নই। আমাদের নিজস্ব জীবন দর্শন আছে। আমাদের দরকার নেই বেদ কোরান।

বাঙালী যখন নিজেকে হিন্দু মুসলমান ভেবে ঝগড়া করে দাঙ্গা লাগায়-লজ্জিত হয় এই সব মানুষদের অজ্ঞতায়। এদের পূর্বপুরুষদের কেও হিন্দু মুসলমান ছিল না । তারা ছিল গর্বিত বাঘ বাঙালী। আর আজকের বাঙালী ইসলাম আর হিন্দু ধর্ম নামে দুই বিদেশী সংস্কৃতির নামাবলী চাপিয়ে ইঁদুরের মতন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে।

একটা জাতি যখন তার অতীতকে ভুলে যায়, তাদের এই দূরাবস্থাই হয়।

Friday, November 7, 2014

কোলকাতার চুমু খাওয়া আন্দোলন -পুরুষতন্ত্রকে থাপ্পর

চুমাচুমি আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট হিন্দুত্ববাদিদের  ( সঙ্গে দোষর বাংলাদেশের জামাতি)  গঙ্গাজল পূত গালাগালি দেখে বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ, রামমোহনের সতীদাহ উচ্ছেদ -সব ইতিহাসই চোখের সামনে ভেসে এল!  সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের দুশ বছর , হতে চলল-হিন্দুত্ববাদিদের গালাগালের ভাষা বদলাইল না !বিধবাদের পুনঃবিবাহ দেওয়ার অপরাধে বিদ্যাসাগরের মতন শ্রেষ্ঠ বাঙালীকেও অকথ্য গালাগাল এবং শারীরিক আক্রমনের শিকার হতে হয়েছে। বিরোধিতার নোংরা ভাষা এবং ভাব দুশো বছর বাদেও এক! দেশ, সমাজ রসাতলে যাবে! পাশ্চাত্যে যা শোভন, ভারতে তা হবে কেন? তখন বিদ্যাসাগরকেও আক্রমন করা হয়েছিল-আপনি কি আপনার মায়ের বিধবা বিবাহ করাবেন?? আজকে এদের ভাষাটা-আপনার মা-বাবা যদি প্রকাশ্যে চুমু খায় আপনি কি সমর্থন করবেন??

         হিন্দুবাদিদের হনুমানুত্ব দুশো বছরেরও বদলাইল না । ইতিহাস যেমন বিদ্যাসাগরের বিরোধি শোভাবাজার রাজাবাড়ির রাধাকান্ত দেবকে আস্তাকুঁড়ে ফেলেছে-আজ যেসব উগ্র বা ছুপা হিন্দুত্ববাদি ছেলে মেয়েদের প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার বিরুদ্ধে গর্জাচ্ছেন-তাদের জন্য ইতিহাসের অন্ধকার কূপই বরাদ্দ।

 তবে  ভারতে হিন্দু ধর্ম এবং সমাজের সংস্কারের ইতিহাস বেশ কিছু দুর্ভাগ্যেরও। বিংশ শতাব্দির শুরুতে মহামান্য গোখলে এবং রানাডে  মেয়েদের বিয়ের নূন্যতম বয়স বারো
করতে আইন সভাতে বিল আনার চেষ্টা করতেই উগ্র হিন্দুত্ববাদি বাল গঙ্গাধর তিলকের দলবল দাঁত নখ খুলে বেড়িয়ে আসে। কংগ্রেসে সেই সময় বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে যে ভ্রান্ত হিন্দু জাতিয়তাবাদির আন্দোলনের শুরু হয়, তার বর্তমান ধারা হচ্ছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদ। এসব জাতিয়তাবাদ, দেশ গৌরব, সংস্কারের পেছনের গল্প একটাই-মেয়েদের পুরুষতন্ত্রে আটকে রাখা।

চুমু খাওয়ার এই আন্দোলনটাকেও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একধাপ প্রগতি হিসাবে না দেখার কোন কারন নেই ।

ঋত্বিকের মেঘে ঢাকা তারার নীতাকে মনে পড়ে?  সেই নীতা-সেই বাঙালী মেয়েটা যে সংসারে দিতে দিতেই, তার জীবন, তার নিজের জীবন যৌবন সব শেষ। হিন্দুত্ববাদিদের মন্তব্য দেখে মনে হচ্ছে, তারা চাইছে মেয়েরা সবাই নীতা হোক-তারা নিজেদের মানবী না দেবী হিসাবে ভাবুক! নীতারা একই সাথে সংসার ইঞ্জিনের কয়লা এবং বাস্প-পুরুষ শুধুই সওয়ারী। সেই দেবী নীতারা প্রকাশ্যে চুমু খেলে, ইঞ্জিনের কয়লা এবং বাস্প কোথা হইতে আসিবে?

পূর্ব বাংলা থেকে উঠে আসা উদ্বাস্তু মেয়েরা সবাই এককালে মেঘে ঢাকা তারার মতন সংসারের ঘানি টেনে গেছে-গেছে বলেই হয়ত আমাদের মতন একটি প্রতিষ্ঠিত মধ্যবিত্ত নব্য সমাজ উঠে এসেছে দেশ বিভাগের শত অভিশাপের পরেও। কিন্ত তাদের মেয়েরাও নীতার মতন নিবেদিতা হবে, মানবীর মতন তাদের কামনা বাসনার পেছনে ছুটবে না - এসব আহাম্মকি, পশ্চাৎপর চিন্তা।

  আমি নিজে খুব বেশী লিব্যারাল নই -চাইল্ডলেস বাই চয়েস এসব লিব্যারাল দৃষ্টিভংগীকে সমর্থন করি না। কারন লিব্যালার বা রক্ষনশীল যাইহোক না কেন, সমাজের প্রতি সবার একটি নুন্যতম দায়বদ্ধতা থাকতেই হয়। জন স্টুয়ার্ট মিলের লিবার্টি বা ব্যাক্তি স্বাধীনতার সীমানা সেখানেই শেষ হয়। লিব্যারালিজম যদি সমাজের নুন্যতম দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে যায়-(সন্তান ধারনটাকে আমি নুন্যতম দায়বদ্ধতার মধ্যেই ফেলি) -আমি তার বিরুদ্ধেই থাকব। তবে এসব জোর করে চাপানোরো আমি বিরুদ্ধে। একজন নারীর শরীর তার একান্ত। সে কি সিদ্ধান্ত নেবে তার ব্যাপার। আমি শুধু আমার মত প্রকাশ করতে পারি, বিরক্তি প্রকাশ করতে পারি-কিন্ত জোর করে কোন মেয়ের ওপর সেই সিদ্ধান্ত চাপাতে পারি না ।

কিন্ত চুমুর বিরুদ্ধে কেন? চুমু ভালোবাসার একটি পবিত্র প্রকাশ। আমেরিকাতে রাস্তাঘাটে পার্কে তরুন তরুনীদের চুমু খেতে দেখলে মন বেশ ভাল লাগে। এতে সমাজের কোন ক্ষতি হচ্ছে না - বরং আমাদের সমাজে মেয়েদেরকে যে জোর করে নীতা বানানোর চেষ্টা করা হয়- চেষ্টা করা হয় মেয়েটির প্রতি মা, বোন ইত্যাদি স্টিকার এঁটে-তাকে দেবী বানিয়ে-ফাইনালি সেই ইঞ্জিনের কয়লা আর বাস্প বানানোর গল্পের হারিকাঠে মাথা দিতে-তার থেকে এটা মুক্তির একটা ধাপ।

আমি জানি পশ্চিম বঙ্গের অর্থনৈতিক এবং শিল্পের উন্নতি না হলে প্রগতির কথাবার্তা না বলাই ভাল। কিন্ত চুমু খেলে শিল্প স্থাপনের জন্য অনুকূল পরিস্থিতিই তৈরী হবে। কারন শিল্পোন্নত সমাজের জন্য ব্যক্তি স্বতন্ত্র্যবাদের দরকার। সরকার বা সরকারী দলগুলির গুন্ডাগর্দি শিল্প স্থাপনের অন্তরায় নয় কি?

 এই ধরনের চুমু আন্দোলন অবশ্যই সরকারি উর্দি এবং বেউর্দি ধারি গুন্ডাদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। যা ব্যক্তি স্বাধীনতাকেই সুরক্ষিত করবে। আর ব্যাক্তিস্বাধীনতা শিল্পোন্নত সমাজের প্রাথমিক শর্ত।