Friday, February 24, 2023

জীবিকা এবং জীবন- ১ঃ সন্তান কোন স্ট্রিমে পড়াশোনা করবে? তার ফিউচার কি?

 সন্তান কোন স্ট্রিমে পড়াশোনা করবে? তার ফিউচার কি?

বিপ্লব পাল, ২৪শে ফেব্রুয়ারী
(১)
আমি ফেসবুক ইনবক্সে, এই প্রশ্নটাই সব থেকে বেশী পাই। অবশ্যই বাবা-মাদের কাছ থেকে। ভারত বা বাংলাদেশে বাবা-মা ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নিয়ে অনেক বেশী চিন্তিত। আমেরিকাতে এই ধরনের সন্তানচাপ অনেক কম।
এখন মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে- আপনি যখন জিজ্ঞেস করছেন আপনার ছেলে বা মেয়ে কি নিয়ে পড়াশোনা করলে "ভাল" হয়, তখন আপনি আসলেই কি জানতে চাইছেন?
#১ কি নিয়ে পড়াশোনা করলে আপনার সন্তান অনেক বেশী রোজগার করবে?
# ২ কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়লে আপনার সন্তানের চাকরির নিরাপত্তা জীবনের নিরাপত্তা সব থেকে বেশী?
# ৩ কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়লে আপনার সন্তানের নামডাক হবে? সে একটা লেগাসি ছেড়ে যেতে পারবে?
আমি যদ্দুর বুঝি, অধিকাংশ অভিভাবক #১ এবং # ২ চাইছেন। # ৩ কোন কোন ক্ষেত্রে।
দুঃখের ব্যাপার, কোন অভিভাবক বোধ হয় জানতেও চান না, কোন কেরিয়ারে গেলে তার সন্তান মনেপ্রাণে সুখী হবে। জীবনে পূর্নতা পাবে।
(২)
এই #১ এবং #২ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে, ছেলেমেয়ে মানুষ করার ব্যপারে আমার নিজস্ব বক্তব্যটা বলা জরুরী।
"সফল" মানুষ কে, তার ব্যাখ্যা একেকজনের কাছে একেক রকম। আই আই টি খরগপুরে আমার অনেক বন্ধুই বৈবাহিক জীবনে ডিভোর্স মামলা ইত্যাদিতে এত ঘেঁটে আছে হয়ত তাদের থেকে অনেক নিম্নমেধার অতিসাধারন ছেলেমেয়েরা হয়ত গ্রামে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক বা সাধারন চাকরি করে অনেক ভাল আছে। আমেরিকাতে আমার একদা এক সহকর্মী- এখানকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় এম আই টির গ্রাজুয়েট ছিল। লোকটি যথাযত মেধাবী। কিন্ত সে কিছুতেই কাজে মন দিতে পারত না। তার চতুর্থ বিয়ে চলছে-এর আগের সব ডিভোর্সে জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়েছে। এবার ছেলেমেয়ের কাস্টডি-ইত্যাদি নিয়ে প্রায় সব এক্স-ওয়াইফদের সাথে এত ঝামেলা, লোকটাকে আমি কিছুতেই প্রোডাক্টিভ করতে পারি নি। এগুলো ব্যতিক্রম কেস না। আই আই টিতে প্রচুর সুইসাইড কেস নিজে দেখেছি। এখনো হচ্ছে।
পয়েন্ট টু নোট- জীবনে লেখাপড়া, ভাল বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির থেকেও বেশী জরুরী-
-- সঠিক সিদ্ধান্ত নিওয়ার ক্ষমতা। রাইট জাজমেন্ট। এটি শুধু পড়াশোনার সাবজেক্ট নিয়ে বসে থাকলে হবে না। সাথে সাথে দর্শন, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি-সব কিছুরই ভাল ফাউন্ডেশন দরকার।
- সুস্থ থাকা। মানসিক এবং শারীরিক দিয়ে। এর জন্য শরীরচর্চা, মনের চর্চা, ঘুম ইত্যাদির দরকার। আজকের ছেলেমেয়ের হাতে স্মার্টফোন, অর্ডার করলে পিজ্জা-আর ঘর থেকে বেড়োলেই দূষন। স্মার্টফোনে চ্যাট করে, গেম খেলে ঘুমের বারোটা বেজে গেছে প্রায় সবার। ফার্স্টফুডের দৌলতে খাবার ও আনহেলদি। ফলে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে। এক্সট্রিম কেসে সুইসাইড। এগুলো হত না যদি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের শরীর চর্চা অর্থাৎ ফিল্ডগেম বা মনের চর্চা-যেমন সঙ্গীত, আর্টস, সাহিত্য এগুলোও মনোযোগ দিয়ে শেখাতেন।
প্লেটোর শিক্ষাচন্তায় এই দুটিদিক খুব আলোচিত। আমি বুঝতে পারি না, ২৪০০ বছর বাদে যখন ভারতে একটা শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে সেখানে স্কুলে কেন শরীর এবং মন উপেক্ষিত? কারন যেটুকু বুঝি, ভারতের শিক্ষা থেকে পুলিশ, আই এ এস থেকে রেইল-সবই বৃটিশ কলোনিয়াল দান। দাসবৃত্তির পরস্পরা।
ফলে এই শিক্ষায় শরীর এবং মন গঠন করার বদলে কে কম্পিউটার সায়েন্স- কে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়বে-তাই নিয়ে বাবা-মারা বেশী চিন্তিত!
আমার কাছে শরীর এবং মন তৈরী করাটাই আসল। কি সাবজেক্ট শিখল সেটার গুরুত্ব তারপর। কারন শরীর এবং মন হচ্ছে শিক্ষার আধার। শরীর আর মন ঠিক না থাকলে-শিখবেই বা কি করে? ডিপ্রেশনে গিয়ে সুইসাইড করে ফেলবে ত!
(৩)
এবার আসি কোন সাবজেক্ট-কোথায় কি পড়বে। ভাল জায়গায় যদি চান্স না পায়!!!!!
এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে ভবিষ্যতই বা কি?
এবার কিছু প্রাক্টিক্যাল দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করি। মানে কিছু ফ্যাক্ট লিখি
-আজকে অধিকাংশ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আই টি বা সফটওয়ারের চাকরি করে খাচ্ছে। এই চাকরিগুলি আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে বাজারে ছিল না। আপনার ছেলেমেয়েরা যে চাকরি গুলি করবে সেগুলি এখনো জন্মায় নি।
- এই মুহুর্তে জব মার্কেটে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষা সম্পূর্ন "ইউজলেস"। শিক্ষকতা আর সরকারি চাকরি ছাড়া-এগুলো কাজে আসবে না। গুগুল, ফেসবুক, টেসলা-আমেরিকার সব বড়বড় কোম্পানীগুলি বর্তমানে "ডিগ্রির" বদলে নিজেদের সার্টিফিকেট প্রোগ্রাম চালু করেছে। "স্কিল" থাকলে, সেখানে পরীক্ষা দিয়ে, বা শিখে যে কেউ ডিগ্রি না নিয়েও চাকরি পেতে পারে। ভারতে টিসিএস , ইনফি এরাও একই দিকে যাচ্ছে। এটাই ভবিষ্যত। শেখাটাই আসল। সরকারি চাকরি না থাকলে, ডিগ্রি সম্পূর্ন অপ্রয়োজনীয় হতে চলেছে। শিক্ষা --> স্টান্ডাইজড টেস্ট--> ইন্টারভিঊ এই ভাবে চলবে ভবিষ্যত।
- স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটুকু জব শেখার স্কিল- তা খুব সীমিত। মূলত চাকরিতেই স্কিল শিখতে হয়। সেইজন্য জীবনের প্রথম ২-৩ টে চাকরি কোথায় করবে-তার খুব গুরুত্বপূর্ন। সেখানে স্কিল শেখা এবং শেখানোর লোক থাকা সব থেকে বেশী জরুরী।
- চাকরির ক্ষেত্রে- তা যদি সরকারি বা শিক্ষকের চাকরি না হয়-শুধু ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি বা শুধু কোডিং, বা শুধু স্টাটিসস্টিক্স শিখে হয় না। কারন তাকে অন্যদের কাজ ও বুঝতে হবে। সুতরাং সর্বদা সব সময় নতুন কিছু শেখার মনোভাব রাখতে হবে।
- কিছু কিছু জিনিস স্কুল লেভেলে ভাল না শিখলে মুশকিল। প্রথমটা হচ্ছে ভাষাজ্ঞান। কমিউনিকেশন স্কিল। এটি হচ্ছে স্কিল অব দ্যা স্কিলস। শুধু ইংরেজি গ্রামার বা শব্দ জানলেই হবে না। সঠিক ভাবে কি করে গুছিয়ে নিজের বক্তব্য রাখতে পারবে- সেটা আরো বেশী জরুরী। কমিউনিকেশন স্কিল ভাল না হলে শুধু কোন সাবজেক্ট জেনে লাভ নেই। দ্বিতীয় হচ্ছে সংখ্যাতত্ত্বের বেসিক। আর কোডিং বেসিক। যারা টেকনিক্যাল লাইনে থাকবে, তাদের এই তিনটি স্কিল মোটামুটি ৭০%। বাকী ৩০% হচ্ছে নিজেদের সাবজেক্ট।
- আই টি, কম্পিউটার সায়েন্স, ইলেকট্রনিক্স, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ, স্টাট- যেকোন সাবজেক্ট শিখলেই ভাল চাকরি পাবে। যদি বাকি তিনটে প্রাথমিক স্কিল থাকে। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে কেউ শেখে না। সবাই মার্কস পাচ্ছে। ডিগ্রি পাচ্ছে। এসব বোগাস । ভারতের ৯৮% গ্রাজুয়েট এম্পয়েবল না।
-কেন শেখে না-সেই প্রশ্ন ওঠাও জরুরী। কারন সে ত নিজে থেকে এটা করছে না। বাবা-মা চাপ দিয়ে পড়তে পাঠাচ্ছে। যে শিক্ষক শিক্ষিকা পড়াচ্ছে, তারাও সেই চাপের প্রোডাক্ট। আমার নিজের অভিজ্ঞতা শিক্ষক এর ও ৯৭%+ ইউজলেস। কিন্ত এটা ইউ টিউব, উইকিপেডিয়া এখন চ্যাট জিপিটির যুগ। ইউ টিউবে শেখা যেকোন ক্লাশে শেখার থেকে অনেক গুন ভাল। কিন্ত সেই প্রশ্ন- একজন শিখবে কেন? কোথা থেকে সেই অনুপ্রেরণা পাবে?
এখানেই বুঝতে হবে আপনার সন্তানকে না চাপ দিয়ে, "ভাল লাগতে" শেখান। তার গান, ছবি, কবিতা ভাল লাগুক। গান, ছবি কবিতা এসব ভাল লাগলে, তবেই সে ফিজিক্স কেমিস্ট্রি এলগোরিদমের মধ্যে ছবি এবং ছন্দ দুই খুঁজে পাবে। তবে না সে একটা সাবজেক্টকে ভালবাসতে পারবে!
-শিখতে ভাল লাগা কেন জরুরী? কারনটা আগেই লিখেছি। স্কিল দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন নতুন চাকরি আসছে। পুরাতন চাকরির বাজার ছোট হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন শেখার নেশা না থাকলে, ভবিষ্যতের মার্কেটে সে টিকতে পারবে না।
৪)
ভবিষ্যত কি?
সরকারি চাকরি, স্কুলের চাকরি এসব থাকবে বলে আমার মনে হয় না। কারন গণতন্ত্রে এখন জনগনকে সরাসরি ঘুঁশ দিয়ে ভোট টানার কাল। সুতরাং বাজেট যাবে ইউ বি আই বা উনিভার্সাল বেসিক ইনকামের দিকে। ফলে সরকারি কাজে অটোমেশন আসছে- আরো বেশী আসবে। এতে সরকারের দক্ষতা বাড়বে। বাজেট কমবে। সরকার জনগনের একাউন্টে আরো বেশি টাকা দিতে পারবে। ফলে সরকারি চাকরির স্কোপ কমতেই থাকবে।
আর বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও ক্রমাগত কম লোক লাগবে। কারন অটোমেশন এ আই।
কিন্ত নতুন নতুন বেসরকারি ক্ষেত্র খুলতেই থাকবে। যেমন আজ থেকে ২০ বছর আগেও শরীরচর্চা বা জিম ইন্সট্রাকটর যে একটা পেশা হতে পারে সেটাই কেউ ভাবে নি। কিন্ত এখন দেখুন পাড়ায় পাড়ায় জিমের দরকার। মনোবিদদের কাজ ও দ্রুত বাড়ছে। ফলিত গবেষনার ক্ষেত্র আরো অনেক বাড়বে।
যারা মানুষের হেলথ নিয়ে কনস্যাল্টন্সি করে-শুধু ডাক্তার না- মনোবিদ, ডায়েটিশিয়ান, জিম ইন্সট্রাকটর এসবের চাহিতা হু হু করে বাড়বে।
আন্তারপ্রেনারদের চাহিদাও বাড়বে। কারন তা না হলে, নতুন ব্যবসা তৈরী হবে না। নতুন ফিল্ডে, নতুন চাকরি তৈরী হবে না। ভবিষ্যতে ব্যবসার স্কিলটাও বেসিক স্কিল হিসাবেই ধরতে হবে।
জীবন আসলেই খুব জটিল। শুধু চাকরি করে, টাকা উপার্জন করে জীবন তৈরী হয় না। কবিতা গান প্রেম ভ্রুমন এসব বাদ দিয়ে শুধু টাকা উপার্জন হচ্ছে কলুর বলদগিরি।

Sunday, February 19, 2023

ভাষা দিবসের প্রাক্কালে- আমার বাংলা ভাষা ভাবনা

 ভাষা দিবসের প্রাক্কালে- আমার বাংলা ভাষা ভাবনা

বিপ্লব পাল, ২০ই ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

(১)
ভাষা আবেগের অন্য নাম। আপনি যখন স্বপ্ন দেখেন বা যখন অবচেতন মনের দৈত্য, আপনার সাথে একান্তে নিভৃতে কথা বলতে চায়-তখন আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন? সেই ভাষাটি চিনেছেন কি যে ভাষায় আপনি স্বপ্নে কথা বলেন?

 ওটিই আপনার আসল ভাষা!

আমি ভাষাবিদ নই। ভাষার গঠন এবং গ্রামার নিয়েও আমার ধারনা দুর্বল। তবে ওয়েবে বাংলায় লিখছি বহুদিন। লেখার মধ্যে অসংখ্য বানান এবং ব্যাকারন-দুই এরই মা-মাসি করে লিখি। আসলে বিশুদ্ধ বাংলা বা বিশুদ্ধ ভাষায় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি চর্চা হতে পারে- কিন্ত সাহিত্য, গান- বা সাধারনের জন্য লেখালেখির ক্ষেত্রে অশুদ্ধ বা আঞ্চলিক ভাষা অনেক বেশী কার্যকরী। আমি এই লেখা লিখছি মূলত একজন প্রযুক্তিবিদ হিসাবে এবং ইতিহাস যেটুকু বুঝি, তার প্রেক্ষিতে। ভাষার সাথে ইতিহাস দর্শন মনস্তত্ব সাহিত্য পুঁজি রাজনীতি প্রযুক্তি-সবকিছুই জড়িত। তাই শুধু গ্রামার বা শুধুই সাহিত্যের ইতিহাস দিয়ে একটা ভাষাকে দেখা-নেহাতই মায়োপিক চিন্তা। যা শুধু ভাষাভিত্তিক সঙ্কীর্নতার ধাত্রীগৃহ।

তাছারা এই চ্যাটজিপিটির যুগে ভাষার ভবিষ্যতই বা কি?  

(২)
প্রথমে ইতিহাসে দেখি। প্রথম লিখিত ভাষার উদ্ভব  মেসোপটেমিয়াতে। সুমেরু সভ্যতার ট্যাবলেট। ইজিপ্সিয়ানরাও লিখতে জানত। হরপ্পানরাও জানত। একটা ব্যাপারত পরিস্কার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সেই ব্রোঞ্জযুগেও ছিল। আজ থেকে চার হাজার বছর আগেও ভারত ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্য করছে। একে অন্যের ভাষা না জানলে সেটা সম্ভব হত?

আরেকটা টুইস্ট দিই ইতিহাস থেকে। বৃটিশ বা ইউরোপিয়ানরা ভারতে বাণিজ্য শুরু করে মোটামুটি মুঘল আমলের শুরু থেকে। মুঘল আমলের শেষের দিক থেকে তারা রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। আচ্ছা আজ থেকে ৩০০ বছর আগে, একটা বিদেশীদের দল-যারা গোটা ভারতে সংখায় ২০,০০০ ও ছিল না- তারা কি করে ভারতের মতন একটা ভূখন্ড দখল করে বসল? তারা কিভাবে ভারতের স্থানীয় ভাষা শিখল? কি ভাবে কোন ভাষাতে ভারতীয়দের সাথে ব্যবসা করত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমি তিনটে তথ্য উপস্থাপন করব

#১- বাংলা ভাষার অভিধান, মানে প্রথম ডিকশনারি কে লেখে? কবে লেখা হয়? বাংলা ভাষার প্রথম ডিকশনারি "Vocabulario em Idioma Bengalla e Portuguez " বাংলা-পর্তুগীজ-ফ্রেঞ্চ। প্রকাশিত পতুগালের লিসবন থেকে ১৭৪৩। সংকলক একজন পাদ্রী- ফাদার মানোয়েল ডে এদামকাম। যিনি ঢাকা এলাকায় দীর্ঘদিন ছিলেন। বইটি ছোটখাট না- ৬০৮ পৃষ্ঠার। মূলত বাংলায় ব্যবসা করতে আসা ইউরোপিয়ান বণিকদের জন্য এটি লেখা। বাংলা শব্দগুলি রোমান হরফে মুদ্রিত।

#২  বৃটিশরা যখন পলাশীর যুদ্ধেরপর গোটা ভারতে ক্ষমতা দখল করছে-তখন বাংলার যেসব ব্যক্তিরা তাদের সহায়ক ছিলেন-বা তখন যে শ্রেনীটি ফুলেফেঁপে ওঠে- যেমন বাবু নবকৃষ্ণ, রাজা রামমোহন, প্রিন্স দ্বারকানাথ-এদের "মূল" কোয়ালিফিকেশন কি?  একটা সাধারন প্যাটার্ন আপনারা দেখতে পারেন। ইনারা সবাই ফার্সি, ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দুস্থানী -একাধিক ভাষা বলতে এবং লিখতে পারতেন। 

# ৩ আজকে হিন্দি এবং বাংলা ভাষার যে রূপ দেখছি- উভয়ের রূপকার বৃটিশরা।  বিদ্যাসাগরকে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা তৈরীর ঠিকেদারি বা হিন্দুস্থানী ভাষাকে ভারতের যোগসূত্র হিসাবে গড়ে তোলা-যা মুঘল আমল থেকে শুরু হয়েছিল- এসব কিছুই বৃটিশ প্রশাসকদের দান। কিন্ত কেন? কারন একটাই। ভাষার স্টান্ডার্ডাইজেশন ছাড়া, প্রশাসন চালানো মুশকিল। বৃটিশরা এটা বুঝতেন। কেননা তাদের ইউরোপের অভিজ্ঞতা। গোটা ইউরোপের অধিকাংশ তখন হ্যাসবার্গ রাজন্যবর্গদের অধীনে। এই সমস্যাটা তারাও বুঝতেন বলে, অস্ট্রোহ্যাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য থেকে জারের সাম্রাজের ভাষা পলিসিতে "রাজভাষার" পলিসি খুব গুরুত্বপূর্ন ছিল। বৃটিশরা যার জন্যে ভারতে "সাম্রাজ্য" প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই বাংলা বা হিন্দি ভাষার গ্রামার থেকে স্টান্ডাডাইজশনে টাকা খরচ করে। বিদ্যসাগর সেই কলোনিয়াল পুঁজির ইচ্ছা পূরন করেছিলেন মাত্র। 

                 (৩)
 সুতরাং...।

  ভাষার আসল চালিকা শক্তি পুঁজি, এবং পুঁজির সব থেকে বড় ইঞ্জিন শাসক কূলের প্রশাসন।  সাহিত্য গান  পৃথিবীর হাজার হাজার ভাষায় লেখা হয়েছে। তাদের ৯৯% আজ বিলুপ্ত। কারন তাদের পেছনে কোন পুঁজি নেই।  ভাষাকে একটা বিজনেস মডেলের অংশ হতেই হবে। নইলে সে বিলুপ্ত হবেই। যেসব ভাষা পৃথিবীতে এখনো বৃহৎ ভাষা হিসাবে টিকে আছে-তাদের পেছনে পুঁজি এবং রাজন্যবর্গের ভূমিকা আছে। বাংলা ভাষা হিসাবে যে একটা বড় ভাষা- তার মূল কারন মুঘল আমলে বাংলা বানিজ্য। বাংলার সমৃদ্ধি। যার টানে গোটা ইউরোপের বণিকরা বাংলায় একদিন বানিজ্য করতে এসেছে। পশ্চিম থেকে মারোয়ারি সহ বেনিয়া সম্প্রদায় এসেছে।  বাংলার পুঁজির টানেই ফাদার মানোয়েল বাংলা-পর্তুগীজ অভিধান লিখেছেন ইউরোপিয়ান বণিকদের জন্য। এবং তা লিসবন থেকে ছাপা হয়েছে। ৬০৮ পৃষ্টার একটা  বাংলা অভিধান  ছাপানোর খরচ ১৭৪৩ সালে কি হতে পারে? তার খরচ কে এবং কেন দিয়েছিল?  
 
কোলকাতার বইমেলা সবে শেষ।  প্রচুর বাঙালী লেখক এখন। ১০০ টা বই বিক্রি হয়েছে এমন বাঙালী লেখকের সংখ্যা আঙুলে গোনা যাবে।  বাংলার পাঠক নেই? ইউটিউবে কোন কোন বাংলা গান দুই থেকে পাঁচকোটি বার লোকে শুনেছে-তাও দেখি। 

আসলে দুটো ব্যপার লক্ষ্য করুন। 

#১  ফেসবুকের লেখা, ইউটিউবের বাংলা গান বা বাংলা নাটক-এসবের প্রচুর পাঠক আছে। কারন ফ্রি।  এর মধ্যে ইউটিউব বা ওটিটির দৌলতে তাও গান বা সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের একটা ইকনমি আছে- মানে- লোকে দেখে-তাতে এডসাপোর্টেড রেভিনিউ বা সাবস্কিপশন রেভিনিউএর জন্য বাংলার কনটেন্ট ক্রিয়েটররা কিছু হলেও পাচ্ছে। কিন্ত যারা বাংলাই উপন্যাস বা গল্প লিখছেন-সবাই এখন সৌখিন লেখক। কোন মার্কেট নেই। ইকনমি নেই। ইকোসিস্টেম নেই। 


  নেটফ্লিক্সে বা আমাজন প্রাইমে গোটা ভারত এবং বিদেশ মিলিয়ে ধরুন ৫ লাখ বাঙালী সাবসস্ক্রাইবার আছে। হয়চই প্ল্যাটফর্মে হয়ত বেশী। এই ৫ লাখ হয়ত কিছুই না-নেটফ্লিক্সের মোট ৭৫০ লাখ সাবস্ক্রাইবারের মধ্যে। এমন কি ভারতের ৫০ লাখ সাবস্ক্রাইবার  ও নস্যি। 

# ২ কিন্ত এই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম গুলোর আন্তর্জাতিক এক্সেসের কারনেই, আজ বাংলায় ওয়েব সিরিজ করে গোটা বিশ্বে দেওয়া সম্ভব ইংরেজি ডাবিং করে। কারন ৫ লাখ  বাঙালী সাবস্ক্রাইবার থেকে নেটফ্লিক্সের আয় খুব বেশী হলে ৩০-৪০ কোটি ( বাৎসরিক)। যা কিছুই না। সেই জন্য হিন্দি ওয়েব সিরিজ ও আজকাল ইংরেজিতে ডাব করা হচ্ছে-আর স্টোরি লাইন গুলো আন্তর্জাতিক। এটা হচ্ছে যাতে এগুলি ওই ৭৫০ লাখ সাবসক্রাইবারদের মধ্যে অন্তত যদি ১০০ লাখ দেখে-যাদের মাতৃভাষা হয়ত বাংলা বা হিন্দি না। তাহলে ওয়েব সিরিজ বানানোর ৩০-৫০ কোটি খরচ উঠে আসবে। 

 এখন প্রশ্ন উঠবে এই মাস মার্কেটের জন্য লিখে কি নোবেল প্রাইজ তুল্য সাহিত্য হবে?  মার্কোয়েজের অনেক উপন্যাসের সিনেমাটিক ভার্সন আমি নেটফ্লিক্সেই যদিও প্রথম দেখি। আন্তর্জাতিক মার্কেটের জন্য লিখলে, সেটা আর যাইহোক বর্তমান বাঙালী পাঠকের থেকে অনেক বেশী বিদ্গধ এবং ম্যাচিওরড মার্কেটের জন্য লেখা হবে। ভালোই হবে। 

 কিন্ত এখানেই সমস্যা। বাংলায় আন্তর্জাতিক মানের ওয়েব সিরিজ বানালে বিক্রির অসুবিধা নেই। কিন্ত লিখবেটা কে? বাংলায় সেই গোত্রের লেখক নেই। আর শুরুর ইনভেস্টমেন্ট প্রায় ১০-২০ কোটি টাকার। সেটাই বা কে দেবে ? আসলে পুরো সমস্যাটাই পুঁজির। দক্ষিনে পুঁজির সমস্যা নেই। ফলে তেলেগু, তামিল ভাষার ওয়েব সিরিজ দেদার আসছে আন্তর্জাতিক মার্কেটে। 

 বাংলা ভাষায় উন্নত মানের সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, উপন্যাস ( কবিতা , গান এগুলোতে কম ইনভেস্টমেন্ট-তাই অসুবিধা নেই)  এগুলোর মূল অন্তরায়-বাঙালীর পুঁজির অভাব।  ভাষা আবেগে টেকে  না। ভাষার পেছনে পুঁজির জোর দরকার। 

 ধরুন একজন বাংলা ভাষায় দুর্দান্ত একটি উপন্যাস লিখবেন।  লোকটিকে প্রচুর পড়াশোনা করে সেটি লিখতে হবে। ছমাসের ধাক্কা। এবার ছমাস খরচ করে একটি উপন্যাস লিখলে, এটলিস্ট লোকটির ১০-২৫ লাখটাকা সেই সাহিত্যকর্ম থেকে পাওয়া উচিত।  এখন একটি বই থেকে ৫০ টাকা রইয়ালিটি পেলে- অন্তত ২০,০০০-৫০,০০০ বই বিক্রি হলে, সেই টাকা উঠবে। যা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব। কিন্ত ওই উপন্যাস থেকে ওয়েব সিরিজ হলে-যার বাজেট প্রায়শ ৫-৫০ কোটি টাকার মধ্যে থাকে, ১০ লাখ টাকা রইয়াল্টি সম্ভব। 

 কিন্ত সেই ইকোসিস্টেম তৈরী না হলে-বাংলা ভাষায় সাহিত্যকর্ম সেই টিম টিম করেই চলবে। লোকে চাকরি করতে করতে হবি হিসাবে লিখবে।  এইভাবে ভাল সাহিত্য অসম্ভব। 

(৪)
ভবিষ্যত কি? 
 আমরা ট্রান্সহিউম্যান সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি। ট্রান্সহিউম্যানিজম মানে আমরা লেখা শোনা কর্মে প্রযুক্তির সাহায্য আরো বেশী নেব। যেমন--

যেমন ধরুন আমি   ফেসবুকে বাংলায় লিখলেও এখন একটা মোটামুটি ট্রান্সলেশন [ যার অধিকাংশই ভুল]-ইংরেজি ফিডে চলে আসে। কিন্ত লার্জ ল্যাঙ্গোয়েজ মডেলের দৌলতে, যা হয়ত ফেসবুকে শীঘ্রই দেখতে পাব-গুগুল ব্লগেও পাব- আমি কোন ভাষায় লিখছি-এটা গুরুত্বপূর্ন হবে না।  সবকিছুর ঠিকঠাক ইংরেজি ট্রান্সলেশন আমরা শীঘ্রই দেখতে পাব।
 
 কারন রিয়াল টাইম ট্রান্সলেশন সম্ভব হবে। অর্থাৎ কেউ জাপানী বললেও, আমরা শুনতে পাব বাংলা বা ইংরেজিতে। এমন ডিভাইস এখনই কিনতে পাওয়া যায়। লার্জ ল্যাঙ্গোয়েজ মডেলে এগুলি আরো উন্নত হবে। অর্থাৎ ধরুব ওয়েব সিরিজ বানানো হল বাংলায়- কিন্ত বিশ্বের লোক শুনতে পাবে তাদের মাতৃভাষায়।  এগুলো আর কল্পবিজ্ঞান না। এই দশকেই আমরা এর ব্যপক ইউজ দেখতে পাব।

  তাহলে বাংলায় ভাল উপন্যাস লেখায় সমস্যা কি? ওই যে বল্লাম পুঁজি।  আপনি সব কিছু ছেড়ে ছমাস ধরে যে বাংলায় একটা মারকাটারি উপন্যাস লিখবেন-যার থেকে ধরুন নার্কোস বা ওই ধরনের দুর্ধষ্য ওয়েব সিরিজ সম্ভব- সেই রিস্ক কে নেবে? রিওয়ার্ড কোথায়? 

 আমার ধারনা এটা আসবে।  লার্জ লাঙ্গোয়েজ মডেল ট্রান্সলেটর চলে আসার দিন সমাগত। 

(৫)
 হিন্দির বিরুদ্ধে আন্দোলন সময় নষ্ট। ভারতের কারুর মাতৃভাষা হিন্দি না। হিন্দি-যা হিন্দুস্থানী থেকে আগত-তাহল ভারত নামক এই রাষ্ট্রের ইতিহাসের  অবিচ্ছেদ্য অংশ।  মুঘলরা এই রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই হিন্দুস্থানী শুরু করে। বৃটিশরা সেই কাজ এগিয়ে দিয়েছে। বর্তমানের ভারত সরকার সেই কাজ সম্পূর্ন করতে চাইছে।  বলিউড যারা তৈরী করেছেন, সেইসব নায়ক নায়িকা- কারুর মাতৃভাষা হিন্দি না। আজকেও বলিউডে হিন্দি স্ক্রিপ্ট রোমানে লেখা হয়।  এটা বুঝতে হবে হিন্দির পেছনে আছে ন্যাশানাল ক্যাপিটাল।  

কিন্ত হিন্দির এই কানেক্টিং ক্ষমতাটাই অপ্রয়োজনীয় হতে চলেছে লার্জ ল্যাঙ্গোয়েজ মডেলের দৌলতে। যদি মাতৃভাষার রিয়াল টাইম ট্রান্সলেশন সম্ভব হয়-তাহলে কিভাষায় অনুষ্ঠান হচ্ছে-কিভাষার সিনেমা-কিছু যায় আসে না।  কারন শুনছি মাতৃভাষাতে। ভারতে এটা হচ্ছে। সব ন্যাশানাল সিরিয়াল আঞ্চলিক ভাষায় হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষার সিনেমা হিন্দীতে ডাব করে বলিউডের মার্কেট ধরছে। কারন? তাদের সেই "গল্প" আছে। 
 
বাঙালী পারছে না। তামিল তেলেগুরা পারছে।  কারন ওদের পুঁজি আছে। বাঙালীর নেই। পুঁজি না থাকলে আবেগে ভাষা বা জাতি কোনটাই টিকবে না। 

সুতরাং বাংলা ভাষার ভবিষ্যত বাঙালী পুঁজির ওপর নির্ভরশীল। বাঙালীর হাতে পুঁজি থাকলে এই ভাষা টিকবে। পুঁজি না থাকলে, তা সম্ভব না।  কিছু পাগোল ছাগল নিজের বই নিজেরা ছাপাবে-নিজেরাই পড়বে।  ফেসবুকের বন্ধুরা তা না পড়েই আহ কি লিখেছিস বলে চুলকে দেবে। ওই দিয়ে ভাষা টিকবে না।  বাংলা  ভাষাকে কেন্দ্র করে বৃহৎ কনটেন্ট বাণিজ্য দরকার। 



Sunday, February 12, 2023

আদানী বনাম হিন্ডেনবার্গ- নেপথ্য ভাষন-১

 আদানী বনাম হিন্ডেনবার্গ- নেপথ্য ভাষন

বিপ্লব পাল, ২৯শে জানুয়ারী
আদানী গোষ্টির বিরুদ্ধে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের জালিয়াতির অভিযোগে শুধু ভারত না, গোটা পৃথিবীই উত্তাল। হিন্ডেনবার্গের মতে আদানী পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম জালিয়াতি করেছেন। হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের রিপোর্ট নানান কারনে বিশ্বাসযোগ্য --
(১) তারা তাদের রিসার্চ জন সমকক্ষে এনেছেন এবং আদানী গ্রুপকে তা ভুল প্রমানিত করতে আহ্বান করেছেন
(২) এর আগে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ প্রায় ১৭টি কোম্পানীর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ এনেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল নিকোলা ট্রাক কোম্পানী। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোর্টে জালিয়াতি প্রমানিত। নিকোলার মালিক ট্রেভর মিল্টন এখন আমেরিকার জেলে যাওয়ার অপেক্ষায়। তার অপরাধ কোর্টে প্রমানিত। সুতরাং হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ কর্পরেট জালিয়াতি ধরার জন্য পৃথিবীর সব থেকে সমর্থ কোম্পানী। তাদের ট্রাক রেকর্ড ১০০%।
(৩) হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ, আদানীগোষ্টিকে আমেরিকান কোর্টে মামলার জন্য আহ্বান করছে প্রকাশ্যে। তারা জানে আদানীর সেই ক্ষমতা নেই। কারন সব কর্পরেটের পাছাতেই গু লেগে থাকে। তা শেয়ারহোল্ডাররা জানে না। কোর্টে গেলে, সেসব ও বেড়িয়ে আসবে। সেই রিস্ক আদানী নেবে না। সুতরাং এখনো পর্যন্ত আদানী গোষ্টী হিন্ডেনবার্গের একটি অভিযোগ ও খন্ডাতে কোর্টের দ্বারস্থ হয় নি। শুধু মিডিয়াতে বক্তব্য রেখেছে।
(৪) হিন্ডেলবার্গ রিসার্চ শর্টসেলার ফার্ম। অর্থাৎ তারা শেয়ারবাজারে বেট করেছে আদানীর শেয়ার ভ্যালু কমবে। এবং তাদের বেট ফেইল করলে হিন্ডেলবার্গ রিসার্চ হাজার হাজার কোটি টাকা হারাবে। সুতরাং, তারা সব দিক না দেখে এই রিসার্চ রিপোর্ট ছাড়ে নি। ভুল হলে, তাদের প্রচুর লসের সম্ভাবনা।
আদানী গোষ্ঠীর শেয়ার জালিয়াতি থেকে ভারতের কি কি শিক্ষা নেওয়া উচিত, সেটাও হিন্ডেল্বার্গ রিসার্চ রিপোর্টেই আছে -
(১) ভারতের শেয়ার মার্কেটে এক্টিভিস্ট শর্ট সেলার কম। ফলে ভারতের শেয়ার মার্কেটে জালিয়াতির সম্ভাবনা ১০০%। কারন ভারতের মার্কেট কন্ট্রালাররা সবাই রাজনৈতিক পার্টির সাপোর্টে ক্ষমতায় আসে। আদানির জালিয়াতি ভারতের মার্কেট কন্ত্রোলার (সেবি) ধরতে গেলে, সেবির চেয়ারম্যানের চাকরি যাবে আগে।
(২) আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। ইন্সাইডার ট্রেডিং, মানি লন্ডারিং থেকে একাউন্টিং জালিয়াতি। এগুলো সেবি দেখেও দেখে নি। তার কারন ও হিন্ডেল্বার্গ রিপোর্ট বলছে- যারাই আদানি গোষ্ঠির বিরুদ্ধে বলতে গেছে তারা চাকরি হারিয়েছে, না হলে জেলে, নইলে স্বর্গে!
(৩) সুতরাং এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে , ভারতে মার্কেট কনফিডেন্স ফেরাতে হিন্ডেল্বার্গের আহ্বান-যে ভারতে এক্টিভিস্ট শর্টসেলার আরো সক্রিয় হোক-যারা কর্পরেট জালিয়াতির ধরবে এবং তার থেকে শর্ট সেলিং করে লাভ করবে। এতে মার্কেটের ওপর বিশ্বাস আরো বাড়বে।
তবে ব্যপারট এত সহজ সরল না। এটা সামনের খেলা। এর পেছনে আছে আরো নেপথ্য সমীকরন।
#১ বিজেপির টাকার উৎস কে বা কারা সবাই জানে। এটাও সবাই জানে আগামী ১০ বছরে বিজেপিকে সরারনোর সম্ভাবনা কম। তার কারন ও সেই টাকার উৎস। তারা টাকা দিয়েই রাজনীতি মিডিয়া সব কিনে নিয়েছে। সুতরাং ভারতের বিদেশ নীতি কন্ট্রোল করতে গেলে, সেই টাকার উৎসে নিয়ন্ত্রন দরকার। ভারত প্রায় স্বাধীন ভাবে বিদেশ নীতি নির্ধারন করছিল- রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে তা প্রমানিত।
এখানে আরেকটা জিনিস অনেকেই জানে না। আদানীর ইনভেস্টর বা লোনারদের মধ্যে এখন ৬০% ই বিদেশী। দেশী ব্যাঙ্কগুলো এখন মাইনরিটি। তাদের মধ্যে অধিকাংশই মিডল ইস্টের তেলের টাকা-সভারেন ফান্ড।
ভারতের বিদেশনীতি এবং ভারতের রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করতে [ যা যে কোন বিদেশী শক্তিই চাইবে] আদানীকে নিয়ন্ত্রনে আনা জরুরী-কারনে সেক্ষেত্রে বিজেপিকে নিয়ন্ত্রন করা যাবে অনায়াসে।
# ২ যদি ধরেও নিই আদানী ১০০% জালিয়াতি করেছে শেয়ার ম্যানিপুলেট করে- যেটা দেখতে হবে, আদানীর টাকা কোথায় যাচ্ছে। এই টাকাতে ভারতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নত হচ্ছে। ভারতের বিমান বন্দর, পোর্ট, এনার্জি, গ্রিন এনার্জি এই সব সেক্টরে আদানী টাকা ঢালছে- যাতে ভারতের উন্নতি হয়। আমি মুম্বাই, দিল্লী এয়ারপোর্ট দেখে চমকে গেছি। এগুলি আদানীর তৈরী।
# ৩ পাশাপাশি এটাও ঠিক ভারতের পাবলিক ব্যাঙ্কগুলো যথা স্টেট ব্যাঙ্ক, এল আই সি, যারা আদানীকে টাকা ধার দিয়েছে- তারা বর্তমানে বিপদে। কতটা এই বিপদ তা আগামী দিনের ইতিহাস বলবে। তবে আদানী গোষ্ঠির দেউলিয়া হবার সম্ভাবনা নেই। কারন তাদের পোর্ট এনার্জি সিমেন্ট ব্যবসা বেশ লাভেই চলে। শেয়ারের দাম কম হলেও , তারা মনোপলি ব্যবসার জন্য ধার শোধ করতে এখনো সমর্থ। সুতরাং জনগনের টাকা মার যাবে-সেই ভয় এখনো নেই। আদানী কিন্ত টাকার সদ্বাব্যবহার করেছে ইনফ্রাস্টাকচারে টাকা ঢেলে।
তাহলে আদানী গোষ্ঠির উত্থানে ভারতের ক্ষতি ঠিক কোথায়? মূলত দুটো জায়গায়
(১) তারা ব্যবসা এবং রাজনীতি দুটো ক্ষেত্রেই মনোপলি তৈরী করেছে। দিদি মোদি -দুজনেই তার পকেটে। ফলে আদানীর কোন জালিয়াতি ভারতের কোন সরকারের পক্ষে চেক করা সম্ভব না।
(২) এতে বাকি ছোট ছোট অন্য শিল্প গোষ্ঠির প্রচুর অসুবিধে। তারা আদানিকে তাদের ব্যবসা বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছে এবং হবেও। এতে মার্কেটে কম্পিটিশন কমছে। যা মার্কেটের জন্য ভাল না।
(৩) ১ ও ২ কারনের জন্য ভারতে বিদেশী ইনভেস্টররা ক্রমাগত পিছু হটবে।
আদানির পজিটিভ সাইড হচ্ছে-তারা সেই সেব সেক্টরে টাকা ঢালছে- যা ভারতে সবার আগে দরকার। ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এয়ারপোর্ট সিপোর্ট এনার্জি। গণতন্ত্রের দরুন ভারতে এসব সেক্টরের অগ্রগতি খুব দুর্বল ছিল। কারন জমি অধিগ্রহন করে ইনফ্রা বানানো গণতন্ত্রে কঠিন কাজ। সেটা আদানি পারছে টাকার জোরে-সব পলিটিক্যাল পার্টিকে পকেটে পুরে। সেটা ভাল না খারাপ, তাও ইতিহাস বলবে। ইতিহাসের গতি এতটা রৈখিক ও নয়।
সুতরাং ওই ভাবে ব্ল্যাক হোয়াইট চশমা পরে, আদানীকে নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। ৩৬০ ডিগ্রি ভাবলে অনেক নতুন চিন্তা বেড়িয়ে আসবে। সবটাই আসলে ক্ষমতার লীলাখেলা। সেক্সপিয়ার ধার করে লিখি-uneasy lies the head that wears the crown
তবে হ্যা -রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে, উলুখাগরার ( রিটেল ইনভেস্টর-জনগন) প্রাণ যাবে। এত চিরকালই হয়ে এসেছে।

আদনী-হিন্ডেনবার্গ-নেপথ্য ভাষন-২

 আদানী বনাম হিন্ডেনবার্গ- নেপথ্য ভাষন-2

বিপ্লব পাল, ১২ই ফেব্রুয়ারী

(১)

আমি আগের লেখাতে আদানী কান্ডে সচেতন ভাবে রাজনীতি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এড়িয়ে গিয়েছিলাম। কিন্ত এই আদানী কান্ড বুঝতে গোটা পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাস জানা দরকার।

বিংশ শতাব্দি থেকে পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্রের সামনে উন্নতির জন্য, তিনটে রাজনৈতিক দিশা ছিল।

(১) সোভিয়েত বা সমাজতান্ত্রিক মডেল- যেখানে স্টেট ক্যাপিটাল-বা সরকারি পুঁজর সাহায্যে দেশে ইনফ্রাস্টাকচার এবং শিল্প গড়ে তোলা

(২) ওপেন মার্কেট , কম্পিটিটিভ ক্যাপিটালিস্ট মডেল- যা আমেরিকা এবং পাশ্চাত্য মডেল- যেখানে আন্তারপ্রেনার তৈরীর মাধ্যমে, মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশে নতুন নতুন ব্যবসার সৃষ্টি হয়।

(৩) জাপানী মডেল- যেখানে রাষ্ট্র কয়েকটি দেশভক্ত বিজনেস গ্রুপ/ফ্যামিলিকে ব্যবসা করার জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়। যেমন টয়োটা, মিসুবিৎসি, হন্ডা-ইত্যাদি যত জাপানি ব্র্যান্ড আমরা আজ দেখি- এগুলি সবই প্রায় ১০০ থেকে ১২০ বছর পুরাতন বিজনেস ফ্যামিলি- যাদের উত্থানের পেছনে ছিল বিংশ শতাব্দির শুরুর জাপানি জাতিয়তাবাদি সরকার। জাপানকে এখনো ওপেন মার্কেট বলা যাবে না। এটা ঘোষন কান্ডেই প্রমানিত। দক্ষিন কোরিয়ার দ্রুত উত্থান ও এই পথে। স্যামসাং, কিয়া , হোন্ডাই এগুলোও ফ্যামিলি বিজনেস, যা দক্ষিন কোরিয়ার সরকার, ১৯৬০ সাল থেকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে।

অর্থাৎ সরকার যদি ওলিয়ার্গ সিস্টেম-মানে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ী ফ্যামিলির হাতে দেশের ব্যবসা/ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ভার তুলে দেয় , তাতে কিন্ত একটা দেশ দ্রুত এগোতে পারে।

আপনি বলবেন তাহলে মোদি সরকার আদানির হাতে দেশের ইনফ্রাস্টাকচার আউটসোর্স করে ভুল কি করছে? আফটার অল, নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক মডেলে গিয়ে ভারত অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে গিয়েছিল। এবং ভারতের অন্যান্য ব্যবসায়ী ফ্যামিলিরা রাজনৈতিক ঝামেলার কারনে ইনফ্রাস্টাকচার প্রোজেক্টে খুব বেশী আসতে রাজী না।

ওয়েল, উলটো উদাহরন ও আছে। রাশিয়াতে সমগ্র বিজনেস পুতিন লইয়ালিস্ট অলিয়ার্গদের হাতে আউটসোর্স করার পরে দেশটা ডুবেছে অনেক ভাবে। সুতরাং এটা নিয়ে আরো গভীরে ভাবা দরকার। এটা নিয়ে এই প্রবন্ধের পরে আরো ডিটেলেসে লিখছি।

(২)
১৯৯১ সালে মনমোহন সিং যখন, ভারতকে সোভিয়েত ট্রাক থেকে আমেরিকান ট্রাকে ফেললেন, তখন দেশের গ্রোথ, অর্থনীতির বিকাশ হল বটে- কিন্ত ভারত আটকে গেল একটা জায়গায়। সেটা হচ্ছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার- যেমন ধরুন, রেইল লাইন, পোর্ট, ইলেক্ট্রিক পাওয়ার, রোড এগুলোতে কিন্ত সেই সরকারি পুঁজির আওতাই থেকে গেল। কেন?

কারন এই ইনফ্রাস্টাকচার প্রোজেক্ট বানাতে প্রচ্রর টাকা লাগে। মানে টাকা ধার করতে হয়। তারপর গণতান্ত্রিক দেশ। জমি দখল করে এসব প্রোজেক্ট চলে। এবং এসব থেকে ইনকাম খুব বেশী হয় তা না। যেমন ধরুন আদানী পোর্টের লাভের হার মোটে ৩-৫%। ট্রান্সমিশন লাইনে ৮%। ওই লাভ থেকে দীর্ঘমেয়াদি লোন শোধ করে নতুন ক্যাপিটাল তৈরী করা খুব মুশকিল। শেয়ার বাজারেও ইনফ্রাস্টাকচার কোম্পানীগুলির শেয়ারের পি-ই রেশিও- খুব বেশী না। মোদ্দা কথা ওপেন মার্কেট মডেলে- অর্থাৎ আমেরিকান মডেলে প্রাইভেট কোম্পানীগুলি যারা ইনফ্রাস্টাকচারে আসে- তারা শেয়ার বাজারে খুব বড় কোম্পানী না- এবং খোদ আমেরিকাতে ইনফ্রা সেক্টরে সরকারি ক্যাপিটালি এখনো লাগে। আসলে মুক্ত বাজার অর্থনীতি -যা আমেরিকান মডেল তাতে প্রাইভেট ক্যাপিটাল মোটেও দেশের ইনফ্রাস্টাকচারে উৎসাহিত হয় না। সরকারি ক্যাপিটালেই সব কিছু এখনো চলে খোদ আমেরিকাতে। আমেরিকা বহুদিন ধরে লসে চলা মূল রেল কোম্পানী আমট্রাক বেচতে পারে নি কোন প্রাইভেট অপারেটরকে। সরকারকেই চালাতে হয়। আমেরিকার প্রায় সমস্ত রেইল লাইন আগে প্রাইভেট ছিল-এখন সরকারি। উপায় নেই। আসলে মডেল-২তে ইনফ্রাস্টাকচার বিজনেসের জন্য প্রাইভেট ক্যাপিটাল টানা মুশকিল। এটা বুঝতে পারলেই আমরা আদানীকান্ড বুঝতে পারব আরো ভাল ভাবে।

(৩)
এবার আদানীর ইতিহাস দেখা যাক। আদানী কিন্ত বিজেপির লোক ছিল না। সংঘ পরিবারের ও না। আদানী ১৯৮০-২০০২ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ মোদির গুজরাত অভিষেকের আগে পর্যন্ত অত্যন্ত কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
মোদির ভাইব্রান্ট গুজরাতের আসল রূপকার আদানী নিজে। বেসিক্যালি গুজরাত থেকেই মোদি-আদানীর মডেল-৩ এর খেলা শুরু এবং যা গুজরাতে সফল ভাবে কাজ ও করে। ফলে ২০১৪ সালে যখন মোদি মসনদে বসলেন ( এবং তার জন্য যাবতীয় প্রচার এবং খরচের সিংহভাগ আদানীই জুটিয়েছিলেন) -এটা ভবিতব্য ছিল যে মডেল-৩ এর খেলা এবার গোটা দেশ জুরে হবে। অর্থাৎ মোদির ভারত মডেল-২ থেকে মডেল-৩ তে গিয়ার শিফট করবে-কারন তাতেই মোদি এবং বিজেপির লাভ বেশী। কারন তারা দেশের উন্নতি দেখাতে পারবেন আরো দ্রুত।

কিন্ত মডেল-৩, জাপান , দক্ষিন কোরিয়া এবং চীনে কাজ করলেও কিন্ত রাশিয়াতে কাজ করে নি। এর মূল কারন দক্ষিন কোরিয়ার এই ব্যবসায়ী ফ্যামিলিগুলি- এমন কি চীনেও এইসব বিলিয়ানারদের নিয়ন্ত্রন করে সরকার। রাশিয়াতে কিন্ত তা হয় নি। রাশিয়ান অলিয়ার্গরা উলটে সরকার নিয়ন্ত্রন করেছেন। অর্থাৎ মডেল-৩ তখনই কাজ করে যখন সরকার সম্পূর্ন ভাবে এইসব ফ্যামিলিগুলিকে নিয়ন্ত্রনে রাখে। যেমন ধরুন জ্যাক মাকে চীন সরকার এখন সম্পূর্ন পকেটে পুরে নিয়েছে। স্যামসাং এর ইতিহাস ও তাই। স্যামসাং ও তাই। সরকার নির্ধারন করে স্যামসাং ফ্যামিলির কে সিইও হবে। আর জাপানের দীর্ঘ ইতিহাস সম্পূর্ন ভাবেই তাই- হন্ডা, টয়োটা, মিসুবিৎসি এসব গোষ্ঠির ওপর সরকারে নিয়ন্ত্রন ছিল ১০০%।

আদানীর উত্থান ভারতের ভাল হতে পারে যদি ভারতীয় সরকার আদানী গোষ্ঠিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে। কিন্ত গত তিন বছরে দেখা যাচ্ছে আদানী ঘোষ্ঠির মরিশাসের শেল কোম্পানী থেকে শেয়ার ঘোটালা করা থেকে মুম্বাই এয়ারপোর্ট অধিকরনের কলঙ্কিত কান্ডে সরকারি নিয়ন্ত্রকরা অন্ধ যুধিষ্ঠীরের ভূমিকাতে। অর্থাৎ আদানীর কর্মকান্ড মোটেই স্যামসাং বা হন্ডাদের মতন না- বরং কোরাপ্ট রাশিয়ান অলিয়ার্গদের মতন। যাদের সরকার নিয়ন্ত্রন করে না। বরং এরাই সরকারকে নিয়ন্ত্রন করছে।

(৪)
কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে আদানী গোষ্ঠি নিজেদের শেয়ারের দাম মরিশাসে ৩৩ টা কোম্পানি খুলে কৃত্রিম ভাবে "এত" বাড়াতে গেল কেন? ইনফ্রা কোম্পানীগুলির যেখানে পি-এই রেশিও ৭-১০ এর বেশী হয় না, আদানীর ক্ষেত্রে ১০০- ১৫০ কোন জাদুবলে? নাকি পুরোটাই নগ্ন কোরাপশন?

আমেরিকাতে এগুলো ক্রিমিনাল অপরাধ। কোম্পানি ত শেয়ার বাজার থেকে ডিলিস্টেড হবেই -প্রমোটার ও জেলে যাওয়ার কথা। ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এসব অভিযোগ পাওয়া সত্ত্বেও সেবি, ইডি আদানির কোন কোম্পানীর বিরুদ্ধেই কোন অভিযোগের ঠিকঠাক ইনভেস্টিগেশন করে নি। বিরোধিরা যখন জয়েন্ট পার্লামেন্টারী কমিটি চাইছেন আদানীর বিরুদ্ধে ইনভেস্টিগেশনের জন্য, তখন মোদি নারাজ। অসময়ের বন্ধু বলে কথা। অর্থাৎ ভারতে আদানীকে কেউ ছুঁতে পারবে না।

কিন্ত গৌতম আদানী "রেপুটেশনের" এই রিস্ক নিলেন কেন? কারন আদানী গোষ্ঠির ৭৩% ( ৭৫% ম্যাক্সিমাম হতে পারে ) স্টক নিজের হাতে। বাকী ২৭% এর ১৫% বিদেশী ইনভেস্টর- যারা কিনা ইন্সটিউশনাল ইনভেস্টর মূলত আরব, আমেরিকা এবং ইউরোপে, তাদের হাতে। সুতরাং এই অপরাধ বিদেশী, বিশেষত আমেরিকান শর্ট সেলাররা কোন না কোন দিন ধরতই। ভারতে না হয়, হাজার অপরাধ করলেও তাকে ধরার কেউ নেই।

এখানেই আদানী কেলেঙ্কারির মূল সূত্র। আসলে ইনফ্রাস্টাকচার প্রোজেক্টে টাকা লাগে অনেক বেশী। তার প্রচুর সুদ। কিন্ত ইনকাম খুব কম। ৩-৪% প্রফিট। আদানী গোষ্টির মোট প্রফিটের পরিমান তার সমস্ত ধারের তুলনায় কিছুই না। বেশীক্যালি হাজার কোটি টাকা প্রফিট-আর দুশো হাজার কোটি টাকার ধার। মানে এই রেটে চললে, দুশো বছর লাগবে প্রিন্সিপাল শোধ করতে যদি ধারের টাকা কোম্পানীর প্রফিট থেকে শোধ করতে হয়!

তাহলে আদানী কিভাবে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করবেন? কারন এমন অবস্থায় ত কেউ ধার দেবে না। ফলে হিন্ডেনবার্গের অভিযোগ তিনি তারা বড়ভাইকে মরিসাসে পাঠিয়ে সেখানে ৩৩ টা বেনামী কোম্পানী খুলে আদানী স্টক পাম্প করা শুরু করলেন। নিজেরাই কিনে, নিজেরাই বেচে শেয়ার ভ্যালু বাড়ালেন। এসবের বিরুদ্ধে শেয়ার মার্কেটে অনেক আইন আছে। কিন্ত তাতে কি? ভারতের কোন রেগুলেটর তাকে আটকাবে? এবার সেইসব শেয়ারের বিরুদ্ধে লোন নেওয়া শুরু করলেন!

(৪)
ভারতের কি ক্ষতি হল?

ভারতের মার্কেটের ওপর বিদেশী বিনিয়োগকারিদের ভরসা উঠে গেছে। কারন মার্কেটে কারচুপি না আটকাতে পারলে, সাধারন ইনভেস্টরা টাকা হারাবেন। আর এই পুলিশি কাজের দ্বায়িত্ব সেবির। দেখা যাচ্ছে আদানী গ্রুপের ওপর ভারতের সেবির কোন নিয়ন্ত্রন নেই। অর্থাৎ ভারতের মার্কেটের ওপর বিশ্বাস উঠে গেছে বিদেশী ইনভেস্টরদের। যার জন্য নরওয়ের সভারেন ফান্ড সব শেয়ার বেচে দিয়েছে।

এতে যেটা হবে, ভারতের শেয়ার মার্কেট তার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বিদেশী ইনভেস্টরদের কাছে যে প্রিমিয়াম পেত সেটা হারাবে। এটা খুচরো ইনভেস্টরদের লস।

এবার দেখা যাক এল আই সি, এস বি আই এর এক্সপোজারে। ভারতে আমার বাবা-মায়ের মতন মধ্যবিত্তদের শেষ দিনের সম্পদ এখানেই গচ্ছিত। আদানী শেয়ার পড়ে গেলে, মর্টগেজের মূল্য থাকবে না। যেহেতু আদানী লাভে চলে, সেহেতু বেস্ট কেস সিচুয়েশন হচ্ছে এখনো আদানী স্টক বেচে এই কোম্পানীগুলি, প্রচুর প্রফিট সহ টাকা তুলে নিয়ে এক্সপোজার কমিয়ে দিতে পারে। তবে সেটা করলে আদানীর স্টক প্রাইস কমবে। আদানীর বিপদ বাড়বে। মোদি সরকার তা করবে না। তারা আদানীর এত নুন খেয়েছে, আদানীর ক্ষতি করে দেশের লোকের সেবা তারা করবে না। সুতরাং এক্ষেত্রে আমি সব থেকে ক্ষতিকর পরিস্থিতিটার হিসাব নিচ্ছি। সেটা হচ্ছে, তারা আদানী কোম্পানীর কন্ট্রোল নিতে পারে -লোন ডিফল্টের ক্ষেত্রে। এগুলো যেহেতু ইনফ্রা প্রোজেক্ট সেহেতু এইসব কোম্পানীর দাম কিন্ত বিপুল। তারা এক্ষেত্রেও ড্রিসট্রেস সেলে খুব লাভ না করলেও, টাকা তুলে নিতে পারবে বলেই মনে হয়। কারন আদানী গোষ্ঠির কোম্পানীগুলির ফান্ডামেন্টাল ভালোই।

আসল সমস্যা হচ্ছে শেয়ার মার্কেটে খেলে, প্রাইভেটে টাকা ধার নিয়ে ইনফ্রা প্রোজেক্ট করা যায় না। অত লাভ ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্টে নেই। ইনফ্রাতে সরকারি পুজি লাগবেই। অর্থাৎ সরকারি কন্ট্রোল লাগবেই।

(৫)
শেয়ার মার্কেটে আইন ভেঙে শেয়ার প্রাইস বাড়ানো নতুন কিছু না। বলতে গেলে সব গেমই রিগড। পেটিম, ন্যাকা ইত্যাদি সব নতুন আই পিও ভারতের শেয়ার বাজারে শুয়ে গেছে। অপেনিং এর থেকে ৫০%, ৮০% নীচে নেমে গেছে। তাহলে এই শেয়ার গুলোই বা এত প্রিমিয়াম পেল কি করে? সেবি কি এসব কিছু দেখে নি?

আসলে শেয়ার মার্কেট জুয়ারীদের আড্ডা। প্রায় সব দেশেই। সবটাই রিগড গেম। আদানী খারাপ, আম্বানী ভাল-টাটা ভাল এসব না ভাবাই ঠিক। কেউ বেশী। কেউ কম। আসল সত্য হচ্ছে ক্যাপিটালিজমে আমাদের চাকরি, আমাদের চিকিৎসা, আমাদের ভবিষ্যত-সব কিছুই জুয়ারীদের হাতে। মানুষের হাতে নেই। এটা ভারত-আমেরিকা দুটো দেশের জন্যই সত্য। এবার যারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রক, তারা যদি অন্ধ যুধিষ্ঠির হয় বা সরকার যদি তাদের ঠুটো জগন্নাথ করে বসিয়ে দেয় জন সাধারন ভুগবে।

ধরুন গুগল একদিনে ১০০ বিলিয়ান মার্কেট ভালু হারাল,। কি না, চ্যাট জিপিটির প্রতিযোগি আনতে গিয়ে, এমন ডেমো দেখাল-সবাই দেখল, সেখানে ভুল তথ্য আসছে। ব্যস একটা ছোট্ট ভুলে ১০০ বিলিয়ান হাওয়া। 

সুতরাং সবটাই জুয়া।

আরো মিনিংফুল সমাজ রাষ্ট্র কি সম্ভব। অবশ্যই সম্ভব। তবে তার ক্যাপিটালিজম বা কমিনিউজম কোন পথেই আশার আলো নেই। কারন আমদের সমাজে ক্ষমতার পিরামিড আছে। ওটা ছাড়া সিস্টেম কাজ করবে না। কমিনিউজমে ক্ষমতা যায় খুনী শাসকদের কাছে, যারা দেশের লোককে ক্রীতদাস বানায়। সবচেয়ে বাজে সিস্টেম। আর ক্যাপিটালিজমে ক্ষমতার শীর্ষে বসে আছে জুয়ারীরা। তাও ক্যাপিটালিজম মন্দের ভাল যদি রাষ্ট্র এইসব জুয়ারীদের নিয়ন্ত্রন করতে পারে। নাহলে এখানেও ভোগান্তি ।

দুঃখ একটাই ।  ছোটবেলা থেকে কত নীতিশিক্ষা পেয়ে বড় হই আমরা । ছেমেয়েয়েদের ও সৎ পথে থাকতে বলি। মনে হয় সৎপথে থাকার এই লবনের বস্তাটার সব গুরুদ্বায়িত্ব সবদেশের মধ্যবিত্তদের। যারা আমাদের মালিক- সেই পলিটিক্যাল বা ক্যাপিটালিস্ট ক্লাসের কোন দ্বায়বদ্ধতা নেই ওসব মধ্যবিত্তসুলভ নীতিগর্ভতা নিয়ে বেঁচে থাকার! এটাই দুঃখের!

Thursday, November 10, 2022

বিজ্ঞান এবং ধর্ম ঃ সমন্বয় না সংঘাত ?

                                                                            (১)
বিজ্ঞান এবং ধর্ম কি ১৮০ ডিগ্রি আলাদা? নাকি হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি চলতে পারে মানবতার উত্তরনে?  বিজ্ঞানমনস্ক হতে গেলে কি ধর্মকে আঘাত করতে হবে? 

 এটি প্রবাহমান বিতর্ক যার উদ্ভব উনবিংশ শতাব্দির শেষে। এবং কমবেশী যেখানেই যুক্তিবাদি উদার সমাজের উদ্ভব হয়েছে সেই সময় (ইনক্লুডিং বাংলা),  এই বিতর্ক হয়েছে সর্বত্র।  আজকের দিনেও এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ন।  যদি একজন বিজ্ঞানমনস্ক হয়, সেকি সামাজিক লৌকিক ধর্মাচারন থেকে ১০০ মাইলদূরে থাকবে?  নাকি ল্যাবেরটরির গবেষনা এবং পূজোয় কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া একই সাথে সিদ্ধ? 

                                                                         (২)
 আমাদের যাবতীয়   প্রশ্ন/সৃজন/ চিন্তাধারা/জ্ঞান-বিজ্ঞান-যুক্তি- অর্থাৎ সামগ্রিক দর্শন দুইভাগে বিভক্ত।

ন্যারারালিজম/বিজ্ঞান  এবং নীতি/এথিক্স। 

 ন্যাচারালিজম কি?  যেসব প্রশ্নের  উত্তর বিজ্ঞানে আছে বা বিজ্ঞান থেকে পাওয়া সম্ভব। এটি হচ্ছে বিজ্ঞান থেকে পাওয়া জ্ঞান। প্রশ্ন এবং উত্তর। 

মানে যা পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব ( টেস্টেবিলিটি)। এটাকে বলব বিজ্ঞানের ডোমেন বা বিজ্ঞানের বলয়।  যার সংজ্ঞা দিয়েছিলেন স্যার কার্লপপার। 

 সংজ্ঞাটি অতি সাধারন কিন্ত পাওয়ারফুল। মোদ্দা ভাষায় বিজ্ঞানে পরম সত্য নেই।  সবসত্যই ত্রুটিপূর্ন। এবং এই ত্রুটিকে কমাতে গেলে- সেটির মেথডিক্যাল কন্ট্রোল দরকার।  সেইজন্য দরকার ফলসিফিকেশন। অর্থাৎ নেগেটিভ ডেটা যা প্রমান করবে সেই তত্ত্বের মধ্যে/সত্যের মধ্যে ত্রুটি আছে। বিজ্ঞানের গবেষনাতে এটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ন। কারন কোন তত্ত্বে ত্রুটির কত % আছে- সেটির সঠিক নির্নয়ের মাধ্যমেই তত্ত্বটির নির্মান হয়। 

 বিজ্ঞানের যাবতীয় জার্নাল, স্যার পপারের সংজ্ঞা মেনেই নির্নয় করেন কোন কাজ বিজ্ঞানের সংজ্ঞাভুক্ত হওয়ার যোগ্য কি না। 

 এস্ট্রোলজি, হোমিওপাথি, মার্ক্সবাদ কেন বিজ্ঞান না-তা এই সংজ্ঞা নিয়ে সহযে বোঝা যায়। 

 দ্বিতীয় চিন্তা/প্রশ্নের ধারাটি হচ্ছে নীতি বা এথিক্স।  জীবনে  কি করিতে হইবে। কি করা উচিত টাইপের প্রশ্ন। যে প্রশ্নের টেস্টেবিলিটি হয় না। যেমন  আপনি কাউকে ভালবাসেন। এবার তাকে ভালোবাসা উচিত না উচিত না- তা পরীক্ষা করা বার করা সম্ভব না। 

আপনি বলতেই পারেন। দূর মশাই। হাগা উচিত না উচিত না- এটা কোন প্রশ্ন হল? পেটে বেগ দিলেই হাগা উচিত। কিন্ত যদি রাস্তায় পায়খানা চাপে? আসলে ব্যক্তিগত জীবনে কি করা উচিত-আর কি করা উচিত না-এগুলির পরীক্ষা সম্ভব না। এগুলি নির্নয়ের জন্য সাধারনত পাশ্চাত্য দর্শনের দুটি ভাগ আছে- একটি ইমানুয়েল কান্টের ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ। যেখানে মোদ্দা কথা, যা আপনার আমার সবারজন্য ভাল, তাই শুধু ভাল। শুধু আমার জন্য ভাল, আপনার জন্য খারাপ-এটি হলে মুশকিল আছে। আবার ওই রাস্তায় পায়খানার বেগ পেলে কি করা উচিত- সেই প্রশ্নে ফিরে আসি।  হাগা পেয়েছে বলে আপনি রাস্তায় নিশ্চয় হাগতে বসে যান না। কেন? সেটা করলে আপনার ভাল হত। কিন্ত রাস্তার লোক আর হাঁটতে পারত না। অর্থাৎ আপনার জন্য ভাল, কিন্ত রাস্তার লোকেদের জন্য গেরো। তাই সেটি উচিত না। আর আপনি তা করেন ও না! পরকীয়ার প্রশ্নেও ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ আসে।  পরকীয়াতে আপনি এবং আপনার প্রেমিকা না হয় স্ফূর্তি করলেন। কিন্ত আপনাদের কমিটেড পার্টনারের কি হবে? এক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে, যারা ওপেন রিলেশনশিপে, তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রশ্নই না। সুতরাং সার্বিক এবং সার্ব্জনীন -বা ইউনিভার্সাল উত্তর নেই। সব স্থান-কাল-ক্ষেত্র বিশেষে বদলাচ্ছে ।

দ্বিতীয় নীতির প্রশ্নটি দেশ এবং সমাজের নীতি কি হবে? কারন এর ওপর নির্ভর করে দেশের আইন। এক্ষেত্রে প্রায় সব ধর্মনিরেপেক্ষদেশ বৃটিশ আইনের অনুশীলন করে। যার ভিত্তি জেরেমি বেন্থামের ইউলিটারিনিজম -বা যে আইন যাতে সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক উপকার হয়।  ইসলামিক দেশগুলি শরিয়া আইন নির্ভর।  ধর্মীয় আইন কোন বৈজ্ঞানিক সার্ভে বা গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্মিত না। যেমন আমেরিকাতে এই মিডটার্মে মেরীল্যান্ডে মারিজুয়ানা সেবন আইনসম্মত হল।  এবং তা হয়েছে ব্যালটে। কোন ধর্মীয় নেতা বা বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিতে তা হয় নি। 

 মোদ্দা কথা নীতির প্রশ্নগুলির অধিকাংশই বিজ্ঞানের বলয়ের বাইরে। এবং আজ পর্যন্ত অধিকাংশ লোক নীতির প্রশ্নে ধর্মের অনুসারী। যদিও সেই সক্রেটিসের দিন থেকে দার্শনিকরা বলে এসেছেন ধর্ম থেকে আগত নীতিমালা-টেরিবল। দেশ এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। যার জন্য যেকোন সভ্য ধর্ম নিরেপেক্ষ রাষ্ট্রে আইনের ভিত্তি ধর্ম নয়। 
  
                                                                         (৩)

 তাহলে ধর্ম আসলে কি? মানুষের কোন কাজে আসে? 
 
 ধর্ম মানেই ঈশ্বর না। ইহুদি, মুসলমান, খ্রীষ্ঠানদের ঈশ্বর আছে। হিন্দু ধর্মের কিছু সেক্টে ঈশ্বর আছেন-যারা দ্বৈতবাদি। আবার অনেক সেক্টেই নেই। বৌদ্ধ জৈনদের ঈশ্বর নেই। জাপানের সিন্টো, চীনের কনফুসিয়াসিজম-এগুলি ইশ্বর বিহীন ওয়ে অব লাইফ। কমিউনিজম হচ্ছে লেটেস্ট ধর্ম-এখানেও মন্দির ( পার্টি অফিস), ক্যানন বা ধর্মগ্রন্থ ( দাস ক্যাপিটাল), ধর্মগুরঢ়, স্বর্গ ( শ্রেনীমুক্ত সমাজ)  -ইত্যাদি ধর্মের সব লক্ষনই আছে। 

সুতরাং ঈশ্বর উপাসনা কুসংস্কার ইত্যাদি দিয়ে ধর্মকে বোঝা সম্ভব না। পৃথিবীর সব দেশের সব ধর্মকে বুঝতে একটা সামগ্রিক দার্শনিক ফ্রেমওয়ার্ক দরকার। আর এটি দিয়েছিলেন জার্মান দার্শনিক ফ্রেড্রিক নিৎসে। তার ব্যকগ্রাউন্ডটাও বোঝা দরকার। 

 উনবিংশ শতাব্দির শেষে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির জন্য, মানুষ তাদের বহুদিনের প্রশ্ন, আমি কোথা হইতে আসিলাম, পৃথিবী এবং সূর্য্যের জন্ম-ইত্যাদি নিয়ে জানতে শুরু করেছে। ডারুইনের বিবর্তনবাদ প্রতিষ্ঠিত। ক্ল্যাসিক্যাল ফিজিক্সে অধিকাংশ কার্যকারনের ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।   ধর্মগ্রন্থের জেনেসিস-উৎপত্তি তত্ত্ব সম্পূর্ন ভাবেই বাতিল। নিৎসে [ এবং হাইডগার] বললেন ঈশ্বর না হয় মরিলেন। কিন্ত ঈশ্বর এবং ধর্ম ছাড়া মানুষ বাঁচবে কি করে? কারন এদ্দিন পর্যন্ত মানুষকে ভাবতে হয় নি তার জীবনের কর্তব্য কি।  চার্চের অনুশাসনে সে জন্ম থেকে বিবাহ, বিবাহ থেকে সন্তানপালন, সামাজিক কর্তব্য, ইত্যাদি করে এসেছে। 

 এখন হঠাৎ করে আপনি বল্লেন ধর্মীয় অনুশাসন অর্থহীন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসবের মানে নেই। 
 
  তাহলে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জীবনের উদ্দেশ্য কি? সমস্যা হচ্ছে এই প্রশ্নটি সেই নীতির প্রশ্ন। বিজ্ঞানের বলয়ের অন্তর্ভুক্ত না। কারন যদি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখি- এই মহাবিশ্বের বিপুল আয়তন এবং বিশাল সময়ের সামনে আমরা অতি ক্ষুদ্র এক উপস্থিতি। আমাদের বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়াতে এই মহাবিশ্বের কিছু হোলদোল হবে না। একদিন সূর্য্য, পৃথিবী-সবই ধ্বংস হবে।  তাহলে বাঁচার উদ্দেশ্য কি?

 বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে সত্যিই কোন উদ্দেশ্য নেই। একেই বলে নিহিলিজম। উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি।
 
  কিন্ত মানুষকে বাঁচতে হবে।  প্রতিটা মুহুর্তে আমরা যা করি, তার পেছনে জীবনের সার্থকতার উদ্দেশ্য আছেই বলে আমরা বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।  এটি এক্সিস্টেন্সিয়ালিজমের  [অস্তিত্ববাদ] মূল সমস্যা। আসলেই জীবনের কোন পরম উদ্দেশ্য নেই। লক্ষ্য নেই। তবু বেঁচে থাকতে হবে। এবং তা করতে গেলে একটি উদ্দেশ্য লাগবে! 

 নিৎসে ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মের ইতিহাস পর্যবেক্ষন করে সিদ্ধান্তে এলেন-আসলে এই উদ্দেশ্যহীন বিশ্বে ধর্মগুলি মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য রূপকথা শোনাচ্ছে- আশা ভরসা দিচ্ছে-ভাল কাজে উৎসাহিত করছে ( আবার খারাপ কাজেও করছে)।  স্বর্গ, পরের জন্ম এসব ধারনা ধর্মে এসবের জন্যই এসেছে যাতে সাধারন জনগন বেঁচে থাকার জন্য রসদ পায়। কারন জীবন বিরাট কঠিন এক পথ।  রোগ, শত্রু, দারিদ্র, অনিশ্চয়তা,  ফ্যামিলি, রাজনীতি-কতকিছুর বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করে মানুষ বেঁচে থাকে।  এই কঠিন জীবনের মধ্যে বেঁচে থাকার ইচ্ছা তখনই থাকে-যখন আমরা একটা বড় কিছু দ্বারা অনুপ্রানিত হয়!  

 এটিকে বলা হল পজিটিভ নিহিলিজম। উদ্দেশ্য আসলেই নেই-তাই মানুষের সামনে ভাল উদ্দেশ্য তৈরী করতে হবে। কেন তারা বেঁচে থাকবে এবং বেঁচে থেকে মানুষের জন্য ভাল কাজ করবে। ধর্ম, ন্যাশানালিজম, কমিউনিজম, সমাজসেবা, আন্তারপ্রেনারশিপ-এসব কিছুই ওই পজিটিভি নিহিলিজমের বৃত্তে। 

                                                   (৪)
তাহলে  ধর্মের  ভবিষ্যত কি? 

 পজিটিভ নিহিলিজম মানুষের জীবনের একটি মৌলিক চাহিদা। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এদ্দিন সেটা ধর্ম মিটিয়েছে। কমিউনিজম, ন্যাশানালিজম-ইত্যাদি নানান রাজনৈতিক আদর্শও সেটি দিতে পারে। যারা সমাজসেবী-তারা মানুষের উপকার করে তার মধ্যে দিয়ে, জীবনে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য খুঁজছেন। যারা আন্তারপ্রেনার, নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে অনুপ্রানিত করছেন। 

 ইদানিং নানান গুরুকুল এই "পজিটিভ নিহিলিজম"  প্রোডাক্টটি সাপ্লাই করছে।  স্যোশাল মিডিয়া সেই কাজটি সহজ করে দিয়েছে।  আমেরিকা, ভারত, ইউরোপে প্রচুর আধুনিক গুরু। আমেরিকাতে একার্ট, জর্ডন পিটারসন। ভারতে সদগুরু,  রবিশঙ্কর। ইস্কন, রামকৃষ্ণ মিশনের প্রচারকরাও আছেন।  এর মধ্যে জর্ডন পিটারসন ছাড়া বাকীদের দর্শন এবং বিজ্ঞানে জ্ঞান বেশ দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রেই ত্রুটিপূর্ন। 

  উল্লেখ্য আমেরিকা এবং ইউরোপের নতুন প্রজন্ম ধর্ম থেকে দ্রুত সরে আসছে। এর মূল কারন এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা- যা ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। আমেরিকাতে ১৯৮০ সালে নিধার্মিকদের সংখ্যা ছিল ৯%। বর্তমানে তা প্রায় ২৫% ছাড়িয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের সব দেশেই এই সংখ্যাটি ৫০% এর বেশী।  ভারত এবং মুসলমান দেশগুলিতে এমনটি হচ্ছে না। কারন স্কুলে মুখস্থ করিয়ে কিছু যন্ত্র তৈরী হচ্ছে। যারা স্বাধীন চিন্তায় অক্ষম। 

  তবে পৃথিবী বিশাল পরিবেশ বিপর্যয়ের সামনে। আবহাওয়ার পরিবর্তনে খাদ্যের উৎপাদন এখন ক্রমাগত কমবে। খাবারের দাম বাড়তেই থাকবে।  ফলে রাজনৈতিক চাপে, বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ বিজ্ঞানমুখী হবে। আর বিজ্ঞানমুখী হলে তার পজিটিভ নিহিলিজমের চাহিদা বদলাবে।  সব ধর্মের সেরা প্রোডাক্ট গুলি নিয়েই হয়ত আরো উন্নত ধার্মিক চেতনার জন্ম হবে- যা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না। 

       কিন্ত পজিটিভ নিহিলিজমের মৃত্যু নেই।  ওটি ছাড়া এই কঠিন জীবনে  মানুষ বেঁচে থাকতেই পারবে না।



                                                               

Saturday, September 24, 2022

আশেপাশের নারীবাদি ইতিহাস-

 আশেপাশের নারীবাদি ইতিহাস----

বিপ্লব পাল, ২৩শে সেপ্টেম্বর
#১ মাশা আমিনির হিজাবের মাপ----
ফ্যাশন পুলিশের লাঠির ঘা খেয়ে মাশা আমিনির মৃত্যুতে ইরান জ্বলছে। ইরানে মোল্লাতন্ত্র বনাম নারীবাদিদের লড়াই ইসলামিক বিপ্লবের শুরু থেকেই। ১৯৭৮ সালে শাহ রেজা পল্লভীকে সরানোর লড়াই একসাথে লড়েছিলেন মোল্লা এবং নারীবাদিরা ( পড়ুন বামেরা)। তারাই মোল্লাদের আদর করে এনেছিলেন । কারন বামেদের কাছে শাহ ছিলেন পশ্চিমের প্রতিনিধি! মোল্লারা ১২ মাসের মধ্যে প্রায় লাখ খানেকের বেশী কমিনিউস্ট হত্যা করে, সহবিপ্লবীদের আগেই সঠিক জন্নতে পাঠিয়েদিয়েছিলেন। নারীবাদিদের কয়েদ করা হয়েছিল। জঘন্য শরিয়া আইন চাপিয়ে দেওয়া হয় মেয়েদের বিরুদ্ধে। যার একটি হচ্ছে, সন্তানের ওপর একমাত্র বাবার অধিকার স্বীকৃত। অর্থাৎ ডিভোর্স আইনে ছেলেমেয়েদের ওপর মায়ের কোন অধিকার নেই। পাঁচ মাসের শিশু হলেও নেই। শরিয়া আইনে মেয়েরা সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন।
এর বিরুদ্ধে আজ না, গত চল্লিশ বছর ধরেই ইরানের মহিলারা লড়ছেন। প্রচুর মহিলা নেত্রীকে কয়েদ করে মেরে ফেলা হয়েছে ইরানে।
ইরানের নারীবাদি আন্দোলন নিয়ে, গত দুই দশক মুক্তমনাতে অনেক লিখেছি। এসব লিখতে গেলে আপনি বাংলার বামেদের কাছে হবেন সিয়ার এজেন্ট। আর মুসলমানদের কাছে মোদির এজেন্ট।
এইসব বাম, ইসলামিস্ট, হিন্দুত্ববাদিদের কাছে শত্রু হচ্ছে পশ্চিম-ওয়েস্ট! ওয়েস্টার্ন কালচার। যদিও শাহ পল্লভীর আমলে ইরান ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রগুলির থেকেই শিক্ষা এবং সমৃদ্ধিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। বাম এবং মোল্লাদের বিপ্লব তাকে উৎখাত করে, কারন শাহ ছিলেন "পশ্চিমের" এজেন্ট! পশ্চিম ঘেঁসা কোরাপ্ট নেতা। তার নেতৃত্বে ইরানের মহিলারা স্বাধীন জীবনের স্বাদ পাচ্ছিল-ইসলামিক সমাজে তা ছিল কোরাপশনতুল্য!
শাহ অন্যান্য শাসকের মতন ফাইন্যান্সিয়ালি কোরাপ্ট ছিলেন বটে-কিন্ত ইরানকে ইংল্যান্ডের সমকক্ষ করে তুলেছিলেন। এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল নারীশিক্ষার ব্যপক প্রসারের জন্যই। কিন্ত মুসলমান সমাজে তা পাপের কাজ!
পশ্চিমের বিরুদ্ধে একাধারে বাম-ইসলামিক-হিন্দুত্ববাদিদের জিহাদ ব্যপারটা আমার ব্যপক লাগে। যদিও আমি গত বাইশ বছর আমেরিকা প্রবাসী, পশ্চিমা সংস্কৃতির আলাদা কোন অস্তিত্ব আমি খুঁজে পাই নি। মানুষ এবং তার চাওয়া পাওয়া পৃথিবীর সব দেশেই এক। কিন্ত মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা না থাকলে, তার মানসিক বিকাশ সম্ভব না। ব্যক্তি স্বাধীনতা= পশ্চিমা সংস্কৃতি, এটা হাস্যকর দাবী। ভারতের ইতিহাস বলে, আজ থেকে ২৫০০ বছর পূর্বে ব্যক্তিস্বাধীনতা না থাকলে, এই আর্য্যভূমে একই সাথে জৈন, চার্বাক, বৌদ্ধ, অভাজিকার মতন নাস্তিক্য ধর্মের বিকাশ অসম্ভব ছিল।
ইতিহাস পড়ে আমি নিশ্চিত, অতীত ভারতে যে চিন্তার স্বাধীনতা, আচরনের স্বাধীনতা মানুষ ভোগ করত-তা উনবিংশ শতাব্দির ইউরোপেও ছিল না। উনবিংশ শতাব্দির ইউরোপে ইমানুয়েল কান্ট থেকে ফ্রেডরিক নিৎসে-সবাই দর্শন চর্চা করেছেন, বা করতে বাধ্য হয়েছেন পর্দার আড়ালে। সেখানে আড়াই হাজার বছর আগে, এই ভারতভূমে বুদ্ধ এবং মহাভীর নির্ভয়ে তাদের বৈপ্লবিক চিন্তা প্রচার করেছেন। রাজানুগ্রহও পেয়েছেন। বুদ্ধের শেষযাত্রায় ভারতের ৭২ জন রাজা অংশ নিয়েছিলেন। আর ব্যক্তিস্বাধীনতার রাজনৈতিক দাবী প্রথম তোলেন লাউৎসে-চীনের দার্শনিক যিনি প্রায় বুদ্ধের সমসাময়িক।
সুতরাং এই ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, আচরনের স্বাধীনতা, নারীর স্বাধীনতা মোটেও ওয়েস্টার্ন কালচার না। এ আমাদের প্রাচ্যের ঐতিহ্য। ভারতের ঐতিহ্য। দীর্ঘদিন বিদেশী শাসকের পায়ের তলায় থাকার জন্য, চিন্তার স্বাধীনতার এই ঐতিহ্য এ অঞ্চলের লোকজন ভুলে গেছে।
#২ বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ান মহিলা ফুটবল টিম
যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে প্রাক্টিস করে বাংলাদেশের মহিলা টিম সাফ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে নেপাল এবং ভারতকে দুরমুশ করে-তার জন্য কোন প্রসংশাই যথেষ্ট না। একদিকে তৃতীয় বিশ্বের সীমাহীন দারিদ্র, অন্যদিকে মোল্লাদের রক্তচক্ষু- এইদুই সাঁড়াশি আক্রমনের সামনে কৃষ্ণারানীদের টি্মের পারফর্মান্স শুধু হলিউড বা বলিউডের সিনেমাতেই দেখেছি। বাস্তবে না।
ইরান এবং বাংলাদেশ-দুটি ক্ষেত্রেই লড়াই নারীবাদি বনাম মোল্লাতন্ত্র। আমি একথা বহুদিন থেকেই লিখে আসছি-আসলে মোল্লাতন্ত্র বলে কিছু নেই। পুরুষতন্ত্রের অনেক রাবনমুখের একটি হচ্ছে মোল্লাতন্ত্র। সুতরাং মেয়েদের সাথে মোল্লাদের গৃহযুদ্ধ অনিবার্য্য। মেয়েদের ঝাঁটা ছাড়া মোল্লাদের মৃত্যু নেই। বাম রাজনীতি বরাবর নারীবাদিদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে- সে সোভিয়েত, ইরান বা বাংলাদেশ- যেদেশের ইতিহাসই আপনি দেখুন না কেন। সুতরাং বাম রাজনীতির স্পর্ষে অহল্যার শাপমোচন হবে, মেয়েরা মোল্লাদের কাছ থেকে তাদের রাজনৈতিক অধিকার পাবে, তা কোন দেশে হয় নি। হবেও না। ওই লড়াইটা মেয়েদের নিজেদেরই করতে হবে!
# ৩ রাধাতত্ত্ব ইসলামিক ষড়যন্ত্র!
এটা হোয়াটসাপ ইউনিভার্সিটির লেটেস্ট পিএইচডি থিসিস যা হোয়াটসাপে বাঙালী হিন্দুদের গ্রুপগুলোতে খুব জনপ্রিয় হয়েছে!
এর মোদ্দা কথা- মহাভারতে কৃষ্ণের কোন রাধা উপাখ্যান নেই! তাহলে কৃষ্ণের নাম কেন এই পরকীয়ার "পাপের" সাথে জড়ালো? কে বাজারে আমদানী করেছে রাধাকৃষ্ণের এই অবৈধ প্রেমকাহিনী? নিশ্চয় সুলতানী আমলের হিন্দু পন্ডিতরা! সুতরাং নিশ্চয় এটাও সেই ইসলামিক চক্রান্তের ফসল---
যাকগে, হিন্দু মোল্লারা যে এদ্দিন বাদে আবিস্কার করেছে রাধাচরিত্র মহাভারতে নেই- সেটাই আশ্চর্য্য। তবে আরেকটু রিসার্চ করলে উনারা জানতে পারতেন, রাধা বৈষ্ণব ধর্মের সাধনমার্গ এবং বৈষ্ণব ধর্মটাই ১০০% বৈদিক না! সুতরাং বৈদিক সমগ্রে রাধাকাহিনী থাকার কথা না!
যারা বৈষ্ণব তারা ভালোই জানেন, রাধা রূপক। সব ভক্তই রাধারূপে কৃষ্ণকে ভালবাসে-কারন এ ভক্তিমার্গ। আর এপ্রেম পরকিয়া। পরকিয়া প্রেমে যেমন সমাজ সংসারকে তুচ্ছ করে, প্রেমরসে ডুবতে হয়-রাধাভাব মানেই সেই গভীররস -ভক্ত যেন সমাজ সংসারের বাঁধন ভুলে কৃষ্ণপ্রেমে ডুবে যায়! আর বৈষ্ণব দর্শনে কৃষ্ণ হচ্ছে সুপার কনসাসনেস বা বিশ্বচৈতন্য।
বৈষ্ণব ধর্মের উৎপত্তি নিয়ে হাজার হাজার গবেষনাপত্র আছে। এর উৎপত্তি ইসলাম আসার অনেক আগে। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শতাব্দি। মূলত দাক্ষিনাত্যে। আর্য্য অনার্য্য ধর্মের সব থেকে বড় সিন্থেসিস বৈষ্ণব ভক্তিবাদ।
গোটা বিশ্বের হিন্দুদের ৬০% বৈষ্ণব। বাংলায় সেটা ৯০% হবে। দাক্ষিনাত্যেও তাই। আর বিদেশী হিন্দুদের মধ্যে প্রায় ৯৯% ইস্কনের বৈষ্ণব-বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব।
বৈষ্ণব ধর্ম আসলে উত্তরের জাতপাত সম্বলিত ব্রাহ্মন্য ধর্মের বিরুদ্ধে দক্ষিন এবং পূর্বভারতের প্রতিবাদি আন্দোলন-যেখানে জাতপাত নেই। সংস্কৃত মন্ত্রর বদলে হৃদয়ের ভালোবাসার মন্ত্রে কৃষ্ণ পূজিত হন। শ্রী চৈতন্য গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রতিষ্ঠা না করলে, আজকে সব বাঙালীই মুসলমান হত।
সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিজেপির লোকজন এখন বৈষ্ণব ধর্মের পেছনে লেগেছে। এটা হওয়ারই ছিল। ব্রাহ্মন্য ধর্মের প্রতিনিধিরা একদিন না একদিন বৈষ্ণবদের পেছনে লাগতই। এটা কেন এত দেরীতে হল, সেটাই ভাবছি।
বিজেপির হিন্দুত্ববাদি লোকজন হিন্দু দর্শন , প্রাচীন ভারতীয় দর্শন কি বোঝে আমি জানি না। তাদের এবং ভারতের লোকেদের দুটো জিনিস জানা উচিত।
১) ভারতে ইসলাম এবং খৃষ্ঠান রাজশক্তি ৮০০ বছর থাকা সত্ত্বেও, হিন্দু ধর্ম টিকে গেছে। আফ্রিকা বা ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়াতে কিন্ত স্থানীয় ধর্মের লোকেরা টেকে নি। তারা মুসলমান বা খৃষ্টান হয়ে গেছে। এই হিন্দু ধর্ম ভারতে টিকে যাওয়ার মূল কারন বৈষ্ণব ধর্ম। তার ভক্তিরস, তার অহিংসা এবং মানবতার তীব্রতাই হিন্দুধর্মকে টিকিছে বিদেশী রাজশক্তির বিরুদ্ধে। তারজন্য কোন হিন্দুত্ববাদি রাজশক্তি লাগে নি। আজ ইস্কন গোটা বিশ্বে জনপ্রিয়। তারজন্য কোন মোদি-আমিত শায়ের পেশী শক্তির দরকার লাগে নি।
২) ধর্মকে রাজনীতির সাথে জড়ালে, সেই ধর্মের কি হাল হয়, তা মুসলমানদের দিকে তাকালে বোঝা যায়।
ইসলামে বিশ্বাস করে লোকে বিন লাদেন ও হয়, আবার দাতা আগাখান ও হয়।
ইসলামের ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, একদা সব থেকে প্রগতিশীল ধর্মটি কিভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতালোভীদের হাতে নষ্ট হয়েছে-কারন তারা ইসলামের জনপ্রিয়তা বেচে রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছেন।
হিন্দুত্ববাদি রাজনৈতিক শক্তিও ঠিক এই কাজটিই করছে।
জীবনে কঠিন মুহুর্তগুলোর মোকাবিলায় আমি নিজেই উপনিষদের স্বরণ নিই। আবার পাশ্চাত্য দর্শনের আলোতেই হিন্দু এবং বৌদ্ধ দর্শনকে বুঝেছি। এ একান্তই ব্যক্তিগত- একান্তই নিজের রিয়ালাইজেশন। এগুলিকে রাজনীতিতে ঢোকালে, তা পচতে বাধ্য।

Friday, September 9, 2022

রাণীকাহিনী

 রাণীকাহিনী

-বিপ্লব পাল, ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২২

(১)

বৃটেনের রানীকাহিনীর সব থেকে আকর্ষক দিক-অন্যান্য দেশে রাজা, বৃটেনে রাণী কেন? আরো খোলসা করে বললে, একটা দেশের রাজকন্যা-তার বাবার রাজত্ব পাচ্ছেন- এটা বৃটেনেই দেখা যায়। ভারতের ইতিহাসে মাত্র চার বছর রিজিয়া সুলতানা শাসক ছিলেন। মহাভারতে শিখন্ডী সব থেকে ভাল এবং অভিজ্ঞ সেনানায়ক হওয়া সত্ত্বেও তিনি দ্রুপদ রাজ্যের দাবিদার ছিলেন না। বা তাকে তখন পান্ডব পক্ষের সেনাপতি নির্বাচন করা হয়, কৌরবরা মেনে নেয় নি।

পৃথিবীর সব দেশেই রাজকন্যাদের ভবিষ্যত বাপের রাজত্ব ছেরে, অন্য রাজ্যের রাণী হওয়া। সে রাণী কিন্ত শাসক নন। বৃটেনে "রাণী" অফিশিয়াল শাসক। তার পিতা বা মাতা যদি বৃটেনের কিং বা কুইন হন, তবেই তিনি, কুইন পদের দাবিদার। রাজপরিবারে বিয়ে করে কুইন হওয়া যায় না। রাজা যদি বৃটেনের শাসক হন, যেমন এখন হলেন চার্লস (৩), তার স্ত্রী ক্যামিলা কিন্ত কুইন নন। কুইন কনসর্ট।

কুইন এলিজাবেথ ও কিন্ত বৃটিশ রাজপরিবারের বিবাহিত স্ত্রী না। তিনি ছিলেন রাজা জর্জ-৬ এর কন্যা। জর্জ-৬ এর তিন কন্যা। তার মধ্যে এলিজাবেথ-২ বড়বোন। তাই বৃটেনের সিংহাসন গেছে তার কাছে। তার স্বামী ফিলিপ বরং রাজপরিবারে বিয়ে করেছেন। তাই কুইনের স্বামী-কিং নন। ফিলিপকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল ডিউক অব এডিনবরা। শুধু তাই না। পাবলিক সমক্ষে ফিলিপকে মাথা নত করতে হত কুইন এলিজাবেথের সামনে। চলতে হত তার পেছনে পেছনে। অবশ্যই রাজ সিংহাসনে এলিজাবেথ বসার পর। ফিলিপ এসব মেনে নিতে পারেন নি। মনের দুঃখে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এক বছর বৈরাগী হয়ে পৃথিবী ঘুরেছেন। আবার ফিরে এসেছেন তার ভালোবাসার নারীর কাছে। যাইহোক ঠিক একই কারনে ডায়না কোন দিনই বৃটেনের রানী পদের দাবীদার ছিলেন না। তিনি হতেন কুইন কন্সর্স্ট । যিনি কিন্ত শাসক নন।

এতটা কিচ্ছার দরকার ছিল না। আমার লেখাটা ছিল রানীর শাসন নিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বৃটেন আর রাশিয়ার রোমানভ বংশের জারের ফ্যামিলিতেই রানীর শাসন ছিল।

আর কোথাও পুরুষতন্ত্রের জন্য, রাজকন্যা বা রানীরা শাসক হতে পারতেন না। হ্যা ঝাঁসির রানী লক্ষীবাই বা চীনের কুইন মাদার দোগের কি- এরাও শাসক ছিলেন। কিন্ত স্বীকৃত শাসক না। নিজের নাবালক পুত্রকে নামেমাত্র রাজা করেই এরা পর্দার পেছনে শাসন করেছেন। কারন পুরুষতন্ত্র নারী শাসককে মেনে নেয় নি। প্রায় কোন দেশেই না। বাংলার ইতিহাসই দেখুন। কোন নারী শাসক নেই। শেখ হাসিনা না মমতা ব্যানার্জি এরা আধুনিক গণতন্ত্রের ফসল। কিন্ত রাজতন্ত্রে রাজকুমারী রাজা হচ্ছেন- এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কোথাও ছিল না। ব্যতিক্রম শুধু বৃটেন এবং রাশিয়া-বা আরো বিস্তারিত বললে পূর্বের শ্লাভ রাজ্যগুলির মধ্যে।

কিন্ত কেন? শুধু তাই না। আমার ইংল্যান্ডের ইতিহাস পড়ে এটাই মনে হয়েছে- বৃটেন যে গোটা পৃথিবী শাসন করেছে-এর মূল কারন বৃটেনের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। যেখানে মেয়েরা শাসক হতে পারে। যার জন্য ১০০,০০০ বৃটিশ, ৩০ কোটি ভারতীয়কে শাসন করেছে। কেন? এটা আমার নিজস্ব মতামত। আমি পরে ব্যখ্যা করছি।

(২)
বৃটেনের ইতিহাসে রানীর শাসন বহুপুরাতন। যেই যবে থেকে রোমান ঐতিহাসিকরা ইংল্যান্ডের ইতিহাস লিখছেন। প্রথম শতাব্দিতে বৃটেন ছিল রোমের অধীন। ইংল্যান্ড বিভক্ত ছিল অসংখ্য করদ রাজ্যে। তারা প্রায় রোমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত। এমন এক করদ রাজ্যের রাজা ছিলেন কসুতোগাস। আসিনি উপজাতিদের সর্দার। তার স্ত্রী বোদিকা। তার দুই কন্যা। পুত্র ছিল না। রাজা কসুতোগাস রোমের সাথেই ছিলেন। তিনি উইল করে যান তার মৃত্যুতে তার বড় কন্যা হবে, সেই রাজ্যের শাসক। রোমের লোকাল কনসাল তা মানে নি। উলটে তার দুই কন্যাকে ধর্ষন করা হয়। রানী বোদিকাকে চাবুক মারা হয়। বোদিকা আত্মসমর্পন করেন নি। এই ঘটনায় বৃটেনের সব রাজ্যের শাসকরাই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে রোমের বিরুদ্ধে। তারা বোদিকার নেতৃত্বে প্রথম বারের মতন ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহী সেনাবাহিনী গঠন করে। সেটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম ইংলিশ সেনাবাহিনী। বোদিকা রোমের সাথে যুদ্ধে পরাস্ত হোন ('৬১ খৃষ্টাব্দ) ।

কিন্ত এই বিদ্রোহের ঘটনা সুদূরপ্রসারী। ইংল্যান্ডের জনমানসে, রোমান পিতৃতান্ত্রিক শাসকদের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের বিদ্রোহী জনগনের কাছে "মাতৃতান্ত্রিক শাসন এবং রাজকুমারীদের উত্তরাধারিকার" একটা বড় ইস্যু ছিল। ফলে ইংল্যান্ড যখন রোমান সাম্রাজ্য থেকে মুক্তিপেল- ইংল্যান্ডের আদিবাসী আইনে রাজকুমারীদের শাসক হওয়া কিন্ত ট্রাডিশন হয়ে গেছে। সেটা বোদিকার ওই বিদ্রোহকে স্বরণ করেই। এবং তারপর ও ইংল্যান্ডে ভাইকিং দের রেইড চলতেই থাকবে। এবং ভাইকিং রাজারাও রাজকুমারীর উত্তরাধিকার মেনে নেয়। যদিও ভাইকিংদের মধ্যে এই চল ছিল না।

কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে সেক্ষেত্রে ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাইএর ক্ষেত্রে বৃটিশরা উলটো পথে গেল কেন? এত সেই বৃটেনের বিরুদ্ধে রোম যা করেছিল, তারই ফ্ল্যাশব্যাক। কেননা ঝাঁসির রাজা আমৃত্য বৃটিশ অনুগতই ছিলেন। সেক্ষেত্রে ঝাঁসির রানীর শাসন কোম্পানীর লোকের মানে নি কেন? সোজা উত্তর হচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সেই রাজ্য বেচে আরো বেশী লাভের আশায় ছিল। যাইহোক ১৮৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর এসব দুরাচারের কারনেই রাণী ভিক্টোরিয়া কোম্পানীর হাতে আর ভারতের শাসনভার রাখেন নি। নিজের হাতে নেন।

এবং একটা হার্ড ট্রুথ হচ্ছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনে ভারতের জিডিপি ছিল নিম্নগামী। যবে থেকে ভারতের রানীর শাসন শুরু হয়, তবে থেকে ভারতের লোকেরা অনেক বেশী আইন সুরক্ষা পেয়েছে এবং জিডিপি গ্রোথ ও এই সময় আবার পজিটিভ হয়। ভারতের বৃটিশ কলোনিয়াল ইতিহাসের দুটো অধ্যায়। একটা রানীর শাসনের আগে। কোম্পানীর শাসন। যে সময় লুঠ হয়েছে অবাধে। ভারতের জিডিপি নেগেটিভে ছিল। অন্যটা রাণীর শাসন। যেখানে জিডিপি গ্রোথ ছিল। আইনি সুরক্ষা ছিল অনেক বেশী। ডেটা থেকে খুব পরিস্কার আলাদা করা যায় এই দুই অধ্যায়। মনে রাখবেন ওই সুরক্ষা থাকার কারনেই, রানীর শাসন শুরু হওয়ার পরেই একমাত্র টাটা বা বিড়লারা শিল্পপতি হিসাবে উঠতে থাকেন। যদিও অর্থের সোর্স ছিল চীনে আফিম বেচা।

আপনি বলতেই পারেন তাতে কি? ভারতীয়দের কি অধিকার ছিল রানীর শাসনের বিরুদ্ধে কিছু বলার? কিন্ত সেই প্রশ্ন ত আজও উঠবে। বর্তমানেও দিল্লী বা কোলকাতার শাসকদের সমালোচনা করা বিপজ্জনকই বটে!

তবে কলোনিয়াল শাসন ভাল না খারাপ এটা এই প্রবন্ধের আলোচ্য না। আমার একটা উত্তর দেওয়া বাকি আছে। কেন বৃটেনে এই রানীর শাসনের ঐতিহ্য, এই জাতটিকে মাস্টাররেস করে তোলে।

বৃটেনে রাজকুমারী এবং মেয়েদের প্রায় ছেলেদের সমানই শিক্ষা দেওয়া হত। তলোয়ার খেলা, ঘোড়ায় চড়া বা শিক্ষা। প্রায় সবক্ষেত্রেই মেয়েরা ছেলেদের সমকক্ষ ছিল। সেটা বৃটেনের সেই আদিবাসী সমাজ থেকেই চলে আসছে।

যে দেশে মায়েরা শিক্ষিত এবং যুদ্ধবিদ্যায় স্কিল্ড হবে, সেই দেশে বীর এবং নেতার সংখ্যাও বেশী হবে। যার জন্য ইংল্যান্ডে নেতার অভাব কখনো হয় নি ইতিহাসে ( তবে আজ হচ্ছে! )। বৃটিশরা যে বীরত্ব এবং নেতৃত্বে অনেক এগিয়েছিল-সেই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কারন ক্লাইভ যখন ৩০০০ সৈন্য নিয়ে সিরাজকে আক্রমন করেন-তখনো তিনি জানেন না মীরজাফর কোন দলে। আদৌ গদ্দারি করবে কি না। ফলে পলাশী যুদ্ধের দুপুর বেলা থেকে, তার সৈন্যরা মীরজাফরের সৈন্যদলকেও আক্রমন করে ছত্রভঙ্গ করে। মীরজাফর গদ্দারি করবেই এই ভরসাই ক্লাইভ আক্রমন করেন নি। করেছিলেন নিজেদের উন্নত কামান এবং যুদ্ধবিদ্যার জোরেই। ক্লাইভের সমকক্ষ স্ট্রাটেজিস্ট এবং সেনাপতি-সেই সময় ভারতে কেউ ছিল না। পলাশীর যুদ্ধের আগে দাক্ষিনাত্যে ক্লাইভ আরো দুটো যুদ্ধ জিতেছেন। যেখানে তার সেনা বাহিনী ছিল নবাবাদের থেকে অনেক ছোট। এবার প্রশ্ন করুন লর্ড ক্লাইভের মা কে ছিলেন?

তার মায়ের নাম রেবেকা। যদিও ক্লাইভ ম্যাঞ্চেস্টারে তার মাসি এবং মেসোমশাইএর কাছে বড় হয়েছিলেন। তিনি তার মাসীর কাছ থেকেই প্রাথমিক যুদ্ধবিদ্যার পাঠ নেন। এবং সমস্ত স্কুল জীবনে মারপিট করতে অভ্যস্থ ছিলেন। যাকে বলে এডিটেক্ট টু ওয়ার । এটি এসেছিল, তার মাসীর কাছ থেকেই।

আমি জানি ভারতে বৃটিশ উপনিবেশের ইতিহাস যেভাবে পড়ানো হয়, তাতে ভারতীয়রা লর্ড ক্লাইভ ইত্যাদি চরিত্রগুলিকে ঘৃনা করতে শেখে। তার নিশ্চয় সঙ্গত কারন আছে। কিন্ত কেউ একবার ও ইতিহাসে খোঁজ নেয়-কি করে ১০০,০০০ বৃটিশ ৩০ কোটি ভারতীয়কে দাবিয়ে রেখেছিল? কি করে ক্লাইভ প্রায় সব যুদ্ধে অনেক কম সেনানী নিয়ে নবাবদের বিরাট বিরাট বাহিনীকে হারিয়েছেন?

ক্লাইভ এবং তার সমসাময়িক বৃটিশ জেনারেলদের যুদ্ধকুশলতা বুঝতে ইতিহাসের অনেক গভীরে যেতে হবে। কিন্ত মনে রাখা দরকার এইসব যুদ্ধ বিশারদ ক্লাইভদের জন্যেই গোটা বিশ্বে বৃটিশ সাম্রাজ্য ছড়িয়ে যায় । কারন দেশীয় রাজারা বা নবাররা যুদ্ধে বা রাজনীতিতে ক্লাইভদের সমকক্ষ ছিলেন না। কিন্ত কেন ?

কারন ক্লাইভ সহ বৃটিশ জেনারেলরা আসতেন বৃটেনের এলিট ফিউডাল পরিবারগুলি থেকে। যেখানে তারা বীরত্বের শিক্ষা, যুদ্ধের শিক্ষা মা বা মাসী পিশীদের কাছ থেকে পেতেন। মেকস এ লটস অব ডিফারেন্স।

ইতিহাসের গভীরে গেলে অনেক কিছুই শেখা যায়। আর শুধু স্কুলের বই পড়লে কিছু কিছু লোকের প্রতি একগাদা ঘৃনা তৈরী হবে-যা সম্পূর্ন সিস্টেম ম্যানুফাকচারড।