Saturday, January 23, 2016

ঐতিহাসিক বীরপূজো বন্ধ হৌক

আমেরিকান লেখক উইল ডুরান্টের হিরোস অব হিস্ট্রি বা ইতিহাসের নায়ক বলে একটা বিখ্যাত বই আছে। বইটিতে ইতিহাসের সকল মহানায়কদের জীবন দর্শন এবং ইতিহাস পাবেন। ডুরান্ট দর্শনের ইতিহাস লিখে বিশ্বখ্যাত হন।

বইটির মুখবন্ধে ডুরান্ট রবীন্দ্রনাথের ওরা কাজ করে থেকে কবিতার লাইন গুলি তুলে দেন। উনি নিজে ছিলেন প্রগতিশীল বামপন্থী। ওই বইতে স্টালিন লেনিন থেকে খীষ্ট, মহম্মদ সবার সমালোচনা পাবেন। উনি লিখেছেন, মানুষের মধ্যে যদ্দিন এই ঐতিহাসিক বীরপূজো চালু থাকবে-তদ্দিন মানুষ সঠিক ইতিহাসের সন্ধান পাবে না। কারন ইতিহাস তৈরী করে সাধারন মানুষ, বিজ্ঞানী শিল্পীরা।

এক সাক্ষাতকারে ডুরান্টকে একজন জিজ্ঞেস করলেন-আছা উনবিংশ শতাব্দিতে কোন ব্যক্তিকে আপনি প্রকৃত হিরো মনে করেন? ডুরান্ট বল্লেন এডিসন। কারন ওর আবিস্কৃত বিদ্যুতেই পৃথিবী পাল্টেছে। সাংবাদিকটি একটু ঢোঁক গিলে বললো-আচ্ছা তাহলে চিন্তার জগতে নিশ্চয় আপনি কার্ল মার্ক্সের নাম নেবেন? ডুরান্ট বল্লেন না আমি ডারুইনের নাম নেব। কারন মার্ক্সের থিসিস পুরোটাই বিবর্তনের ওপরে দাঁড়িয়ে-আর সেই ধারনার বৈজ্ঞানিক জনকই আসল ঐতিহাসিক ব্যক্তি।

এই জন্য আমেরিকান ইতিহাসে জীবনী গ্রন্থে বীরপূজো থেকে বাচ্চাদের রেহাই দেওয়া হয়। আমার ছেলেকে গত এক সপ্তাহ ধরে আমেরিকান সংবিধানের জনক থমাস জেফারসনের জীবনী গ্রন্থ পড়াচ্ছি। সেই বইতে পদে পদে জেফারসনের সমালোচনা। যেমন উনি সংবিধানে লিখলেন সব মানুষ সমান-কিন্ত যখন প্রেসিডেন্ট হলেন, রেড ইন্ডিয়ানদের নিধন করার জন্য ডিক্রি জারি করেছিলেন। নিজের দাসের ও মুক্তি দেন নি।

আমার বাবাও আমাকে সেই ক্লাস ফোর থেকে নেতাজির বই দিয়েছে। বাড়িতে কম বেশী ১০ টা নেতাজির বই ছিল। একটা বইতেও পাই নি নেতাজি আন্দামান নিকোরর দ্বীপপুঞ্জে জাপানীদের খুন ধর্ষন ঠেকাতে সম্পূর্ন ব্যর্থ ছিলেন!! কারন উনি উনার প্রভুদের বিরুদ্ধে যেতে পারেন নি স্ট্রাটেজীক কারনে! ইন্টারনেটের মাধ্যমেই সেটা জানতে হয়েছে।

বীরপূজো বাজে জিনিস। দেশপ্রেমিকদের নিয়ে চর্চা হোক। আরো বেশী হোক। কিন্ত একজন মানুষ মানুষই। তার দোষ, দুর্বলতা থাকবে না-তা অসম্ভব। তাকে ভগবান হিসাবে পূজো করটা আসলেই এক ধরনের রাজনৈতিক খেলা। এবং তাতে জনগন আরো বেশী করে রাজনীতির বোরেতে পরিণত হয়। নেতাজি পূজো নয়, তাকে মানুষ হিসাবেই মুল্যায়ন করা হৌক।

Thursday, January 21, 2016

দলিত রাজনীতি এবং বর্ণবাদের উপকথা

http://biplabbangla.blogspot.com/2016/01/blog-post_21.html
(১)
  রোহিত ভেমুলার মৃত্যুতে ভারতের জাতপাতের রাজনীতি উত্তাল । আরো খোলসা করে লিখলে, ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে গেছে সব রাজনৈতিক পার্টি।

     প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের এই দলিত শ্রেনীটির উৎপত্তি কোথায় ?  ব্রাহ্মণ্যবাদ, ব্যাদে আছে-অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্ত এটাও সত্য পৃথিবীর সব দেশের ইতিহাসেই দলিতরা ছিল-এখনো আছে। খোদ আমেরিকাতেই কালোদের স্থান, ভারতের দলিতদের মতন। শুদ্রদের অস্তিত্বের কারন মনুবাদি হিন্দুধর্ম-এমন মনে করাটা সরলীকরন। কারন এই দাসশ্রেনীর অস্তিত্ব ইতিহাস জুরে পৃথিবীর সকল দেশে । শুধু ভারতেই এটার ওপর ধর্মীয় সীলমোহর মারা আছে।  সুতরাং এই বর্ণবাদের একটা সঠিক ঐতিহাসিক নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষন দরকার। কেন কোন দেশে দলিত বা বর্ণবাদের জন্ম হয়?

       পৃথিবীর প্রাচীন তিনটি সভ্যতা-ইজিপ্ট, মেসোপটেমিয়া এবং সিন্ধু সভ্যতা। এই তিনটি সমাজে দাসেরা এল কি করে? মানুষ যখন প্যালিওলিথিক স্টেজে, বনেবাদারে ঘুরছে-সেই হান্টার গ্যাদারার সমাজে ত দাসেরা ছিল না। দাসেদের উৎপত্তি হল কৃষিকাজ শুরুর সাথে সাথে?

  সত্যিই কি তাই ? কৃষিভিত্তিক সমাজ শুরু হতেই কি সভ্যতাতে মানুষ "ক্রীতদাস" দের দেখলো?

   এটা বুঝতে প্রথমেই এই তিন অতীত নদী সভ্যতা-যা উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল-তাদের দিকে তাকাতে হবে।

  সিন্ধু সভ্যতাতে দুটো জিনিসের সন্ধান পাওয়া যায় নি। এক, অস্ত্র। দুই দাস প্রথা। পাশাপাশি রাজা বা রাজপ্রাসাদের ও সন্ধান পান নি প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

    মিশরের প্রাচীন সভ্যতা-তিন ভাগে বিভক্ত। ওল্ড, মিডল এবং নিউ কিংডম।  বিখ্যাত পিরামিডের জন্ম এই ওল্ড কিংডমে ( খৃঃ পূ ২৬৮৬-২১৮১)।   পিরামিড করতে হাজারে হাজারে শ্রমিক লেগেছে-কিন্ত তাদের কেউ ক্রীতদাস ছিল না। এই সময়ে মিশরে ক্রীতদাসের নজির নেই। তবে ৮০% লোক ছিল ভূমিদাস। কিন্ত মিডল কিংডমের ( খৃঃ ২০৫৫-১৬৫০) সময় থেকে ফারাওরা নুবিয়া, কানান এবং সিরিয়া আক্রমন এবং আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন।  এই সময় থেকেই মিশরীয় সভ্যতাতে ক্রীতদাসের দেখা পাওয়া যাবে-যুদ্ধে পরাজিত জাতির লোকেদের ক্রীতদাস হিসাবে রেখে দেওয়া হত। এছাড়াও ধার শোধ করতে না পারলে, লোকে ক্রীতদাস হতে বাধ্য হত-তবে সারা জন্মের মতন না। ধার শোধ করতে যদ্দিন থাকতে হয়।

   কিন্ত নিউ কিংডমে মিশরে ক্রীতদাস ব্যবসার রমরমা শুরু।  ফারাও তৃতীয় টিসমোস অসংখ্য ক্রীতদাসের মালিক ছিলেন-যা উনি মূলত হাইতি এবং ন্যুবিয়ানদের  যুদ্ধে হারিয়ে পেয়েছিলেন।

  মোদ্দা কথা, মিশর সাম্রাজ্য যেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রূপ নেওয়া শুরু করে-বাণিজ্যের শুরু হয়-ঠিক সেই সময় থেকেই ক্রীতদাস বা আজন্ম দাসবৃত্তির ধারনা মিশরীয় সভ্যতায় আসতে শুরু করে।
 শুধু কৃষিভিত্তিক সমাজে ক্রীতদাস আসে না। যখন সেই সমাজ আস্তে আস্তে সাম্রাজ্যবাদি হয় বা সাম্রাজ্যবাদি শক্তির পদানত হয়-ঠিক তখনই সভ্যতার মধ্যে ক্রীতদাসের জন্ম। এটা আরো পরিস্কার হয় মেসোপটেমিয়ার ইতিহাস থেকে।

      ইনফ্যাক্ট ভারতে  যখন হরপ্পা মহেঞ্জোদারোতে ক্রীতদাসহীন, শ্রেনীহীন কৃষিসমাজ চলছে-সমসাময়িক ( খ্মৃঃপূ ২৩০০) মেসোপটেমিয়ার উরু, আকাদ এবং মারী শহরে ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মন, বৈশ্য, শূদ্র -এই চারটি শ্রেণীর পরিস্কার অবস্থান।  তার সাথে ছিল ক্রীতদাস, তবে বৈশ্য আর শুদ্র শ্রেনীকে আকাডেমিয়ান সম্রাজ্যে বলত আপার আর লোয়ার কাস্ট।

    (২)
 তাহলে ভারতে বর্নবাদ এলো কোথা থেকে?  সিন্ধু সভ্যতায় বর্ণবাদ ছিল না-এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। কিন্ত ওই সময়,  মেসোপটেমিয়াতে একদম বর্তমান ভারতের বর্নবাদ চালু ছিল। সেটাও বহুল প্রমানিত।  তাহলে কি কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে এই বর্ণবাদ ভারতের বাইরে থেকেই এসেছে?

  বর্তমানের হিন্দুত্ববাদিরা মানতে চান না আর্য্য সভ্যতা -যা ঋকবেদ নিয়ে ভারতে ঢুকলো-তারা ভারতের বাইরের ! ঋকবেদে ত চারটে শ্রেনীর পরিস্কার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে-যা সিন্ধু সভ্যতায় নেই।  যদি হিন্দুত্ববাদি ঐতিহাসিকদের কথা সত্য হয় যে আর্য্যরা বা ঋকবেদ ভারতের বাইরে থেকে আসে নি -তাহলে ঋকবেদের সমসাময়িক সময়ে ( ৩০০০-১৫০০ খৃঃপূ )  ভারতে কেন বর্নবাদের সাপেক্ষে কোন প্রত্নতাত্বিক উদাহরন নেই -যেখানে ঋকবেদে বর্নবাদের উল্লেখ আছে প্রায় সর্বত্র?

  স্যার উইলিয়াম জোন্স এরিয়ান ইনভেশন তত্ত্বের জনক। সংস্কৃত শিখতে গিয়ে উনিই প্রথম লক্ষ্য করেন ঋকবেদের আদি সংস্কৃতের ভাষার সাথে ল্যাটিনের অসংখ্য মিল। ইনফ্যাক্ট ইটালীয়ান শিখতে গিয়ে, আমিও অবাক হয়েছিলাম ল্যাটিনের সাথে সংস্কৃতের এত অজস্র মিল আছে দেখে। এর পরে এই নিয়ে ঐতিহাসিকদের অজস্র কাজ আছে- প্রোটো ইন্ডো ইরানিয়ান সংস্কৃতির সাথে মেলে এমন দুটি মধ্য এশিয়ার সভ্যতাও আবিস্কৃত [  সিন্থাস্থা এবং আন্দ্রনোভো কালচার] । আর্য্যরা যে বহিরাগত সংস্কৃতি-তার অজস্র আধুনিক ইতিহাস উইকিপেডিয়াতেই পাওয়া যাবে ( https://en.wikipedia.org/wiki/Indo-Aryan_migration_theory ) ।

 তবে হিন্দুত্ববাদিদের আশা ভরসাতে শেষ পেরেক  ঠুকেছে জেনেটিক্স রিসার্চ। দেখা যাচ্ছে ভারতের ব্রাহ্মনদের সাথে ইউরোপিয়ান ওয়াই জিনের মিল খুব সাংঘাতিক রকমের বেশী। শুদ্রদের সাথে কিন্ত সেই মিল নেই!  হার্ভাডের মাইকেল উইজেল এই ব্যপারে কাজ করেছেন-যাতে দেখা যাচ্ছে ভারতীয়দের দুটী জেনেটিক গ্রুপ স্পষ্ট।  একটি ভারতীয় এবোরিজিনাল-অন্যটি ককেশিয়ান বা মধ্য এশিয়ান অরিজিন। এই আর্টীকলে সব ডিটেলেসে পাবেন ( http://www.livescience.com/38751-genetic-study-reveals-caste-system-origins.html )।  আরো দুটি আর্টিকল দেখে নিতে পারেন আর্য্য এবং বর্নবাদি সিস্টেমের উৎস কিভাবে জেনেটিক্স রিসার্চের মাধ্যমে জানা হয়েছে

   ক) Time Magazine :http://world.time.com/2013/08/27/what-dna-testing-reveals-about-indias-caste-system/

   খ)  Link of the original paper : http://www.cell.com/AJHG/abstract/S0002-9297%2813%2900324-8

  " Most Indian groups descend from a mixture of two genetically divergent populations: Ancestral North Indians (ANI) related to Central Asians, Middle Easterners, Caucasians, and Europeans; and Ancestral South Indians (ASI) not closely related to groups outside the subcontinent. The date of mixture is unknown but has implications for understanding Indian history. We report genome-wide data from 73 groups from the Indian subcontinent and analyze linkage disequilibrium to estimate ANI-ASI mixture dates ranging from about 1,900 to 4,200 years ago. In a subset of groups, 100% of the mixture is consistent with having occurred during this period. These results show that India experienced a demographic transformation several thousand years ago, from a region in which major population mixture was common to one in which mixture even between closely related groups became rare because of a shift to endogamy."

 অবশ্য ভারতে হিন্দুত্ববাদিরা অতীতে প্লেইন এট্মবোম ইত্যাদি ছিল বলেও বিশ্বাস করেন! যাদের ঘিলুর দৌঁড় ক্লাস ফোরের বেশী না-তাদের এত কিছু মাথায় ঢুকবে বলে মনে হয় না।

 (৩)
 এবার ইতিহাস থেকে আসি বর্তমানে। বলা হচ্ছে আই আই টি গুলোতে নাকি সিডিউলড কাস্টের ওপর অনেক অত্যাচার অবিচার হয়। তা হয়। সে নিজের চোখেই দেখেছি। কিন্ত তার কারন দলিত রাজনীতি। এই নয় যে আই আই টির অধিকাংশ ছেলেরা বর্ণবাদি। কোটা সিস্টেমের মাধ্যমে, দলিতদের প্রতি ঘৃণা তৈরী হয় অটোমেটিক্যালি।

 কারনটা লিখি। আই আই টিতে মুসলমান-হিন্দু জেনারেল কাস্টের মধ্যে ভাই ভাই সম্পর্ক। কিন্ত দলিতদের প্রতি উষ্মা । কেন ? কেন হবে না ? আপনি যদি দেখেন, আপনার বাবা একজন সাধারন চাকুরে-একটা ছেলে বহু খেটে কোন রকমে আই আই টিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, আর পাশের ঘরে একটা ছেলে, এসসি কোটাতে কম্পুটার সায়েন্স পড়ছে-তার সাথে তার খাওয়া থাকা ফ্রি-এবং তার বাবা আই এ এস অফিসার। আপনার রাগ হবে না? রাগ না হওয়াটা কি অস্বাভাবিক?  এগুলোর জন্যেই আই আই টি ক্যাম্পাসে দলিতদের ওপরে  বাকীদের রাগ। যদি এই কোটা সিস্টেমে অর্থনৈতিক ক্রাইটেরিয়া থাকত যে গরীব দলিতের ছেলে মেয়েদের জন্য এই কোটা-আমি গ্যারান্টি দিয়ে লিখতে পারি, আই আই টি ক্যম্পাসে এমন এন্টি দলিত ফিলিংস থাকত না। কিন্ত যখন একজন ছেলে দেখছে, তার থেকে অনেক বড়লোকের ছেলে এস সি কোটাতে  বিনা পয়সায় পড়ছে, সে রাগতে বাধ্য। আই আই টিতে এস টি কোটাতে যেসব ছেলেরা আসে তারা খুব গরীব। কীন্তু দলিত কোটাতে আসা ছেলে মেয়েদের মধ্যে ৯০% বেশ বড়লোক ঘরের।

  এর মধ্যে দলিত ছাত্রদের মধ্যে একটা ক্ষুদ্র শ্রেনী আছে, যাদের চির জীবনের ধারনা, তারা এস সি বলে মার্কস পায় না। স্যারেরা ফেইল করিয়ে দিচ্ছে!!  তারা নির্যাতিত!  এদের সবাই প্রায় জীবনে ব্যর্থ হয়েছে।  আমরা দলিত, তাই ভিক্টিমাইজ - এই ভাবে সর্বত্র ভিক্টিমাইজেশন তত্ত্ব নিয়ে চললে, তাদের মেন্টাল ব্রেইক ডাউন হতেই পারে।  কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু বর্ণবাদি প্রফেসর থাকেন-সেটাও সত্য। কিন্ত তারা ব্যতিক্রম। নিয়ম কখনোই না।

 এবার বলবেন মশাই আপনি দলিত না-দলিতদের ব্যথা কি বুঝবেন? আমি উত্তর দেব আপনি বুলশিট বকছেন। আমি উঁচু কাস্টের লোক নই-বরং দলিত না হলেও নীচু কাস্টেই আমার জন্ম।  কিন্ত তাতে কি? সমাজে কখনো কি কিছু ঘটেছে, যাতে আমার কাস্ট সামনে এসেছে?  আসল কাস্ট সামাজিক অবস্থান। আমার দাদু ছিল প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার, ঠাকুর্দা পাট ব্যবসায়ী। বাবা-মা দুজনেই হাইস্কুলের টিচার। সেই সামাজিক অবস্থানই আমার আসল কাস্ট।  স্কুল কলেজে একজন ব্রাহ্মন ও জেনারেল কোটাতে ঢুকেছে-আমিও জেনারেল কোটাতে ঢুকেছি -ফলে একজন ব্রাহ্মনের সাথে আমার কখনোই কোন দূরত্ব তৈরী হয় নি। কিন্ত এটাই হত-যদি কোটাতে ঢুকতাম। তাহলে এই এন্টি দলিত ফিলিংস জেনারেল  ছাত্রদের মধ্যে ঢোকানোর জন্য দায়ী কে? দলিত রাজনীতি। যারা অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্রাইরেটিয়া না রেখে কোটা সিস্টেম তৈরী করেছে।  একজন ধনী বা উচ্চশিক্ষিত এস সি ছেলে মেয়েদের জন্য কেন কোটা সিস্টেম থাকবে? তাতেত গরীব হরিজনদের পথই বন্ধ করা হচ্ছে!!!

  আমাদের প্রত্যন্ত নদী শহর করিমপুরে ব্রাহ্মন ছিল মাত্র কয়েকঘর। তিনটে পুরুত বামুন ফ্যামিলি ছিল। তারা এবং আমাদের ঝি রা -দুই পক্ষই থাকত শহরের ধারে কলোনীতে যেখানে গরীবেরা থাকে। ফলে আমিও ছোট বেলাতে ভাবতাম বামুনরা মানে  ঝি চাকরদের মতন গরীব শ্রেনী!

 এই সেন্স অব ভিক্টিমাইজেশনের আবহ তৈরী করাটা খুব বাজে-রাজনীতি। এবং তাতে আসলেই দলিত ছাত্রদের ও ধ্বংস করা হয়।

      আমার ছেলে এখানে ফুটবল খেলে। মাঠে বেশ রেশিয়াল স্লার এবং বুলিং হয়-মাঝে মাঝে আমার ছেলে এসে অভিযোগ করেছে আগে।  আমি ওকে কি বলবো ?  আমি পরিস্কার বলেছি-যারা এসব রেশিয়াল স্লারিং করে তারা অশিক্ষিত, অজ্ঞ। ইগনোর। তাদের প্রতি রাগলে, খেলায় ফোকাস নষ্ট হবে। আর ও যেহেতু গোলকীপার খেলে, বিরোধি টিমের উদ্দেশ্যই থাকে গোলকিপারের মনঃসংযোগ নষ্ট করা।  যদি বেশী করে, বা ফিজিক্যালি কিছু হয়-তার জন্যে রেফারি আছেই। আমি এটাও তাকে বলেছি-এগুলো জীবন এবং খেলার অংশ। লোকে ফোকাস নষ্ট করার চেষ্টা করবে-কিন্ত নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে সাফল্যের জন্য।  পৃথিবীর প্রায় সব মহান ব্যক্তিই অন্যায় অবিচার বুলিং এর শিকার হয়েছে ছাত্র বা পেশাদার জীবনে। কিন্ত তারা সেটা নিয়ে ওবসেসড হয়ে বসে থাকে নি। নিজেদের কাজটা ভাল ভাবে করে গেছে।


 ফেসবুকে কিছু লোকজন সেটাই দেখছি সারাদিন  দলিত ছাত্রদের জন্য সেন্স অভ ভিক্টিমাইজেশন ফিলিং তৈরী করছে। তাতে কি দলিত বিরোধিতা কমবে? কিছু কমবে না। দলিত বিরোধিতা কমাতে গেলে দলিত কোটাতে অর্থনৈতিক অবস্থানের ক্রাইটেরিয়া ঢোকাতেই হবে।










    

Thursday, January 14, 2016

ডাক্তার এবং

ডঃ অভিষেক ঝাঁকে পেটানো কেন্দ্র করে যে পোষ্ট দিয়েছিলাম, তাতে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে জনরোষ টের পেলাম, তা রীতিমত ভয়বহ। অনেকেই মনে হল ডাক্তার পেটানোতে খুশী হয়েছে!! কি ভয়ংকর । একজন লিখেছে-আপনি কি জানেন পেশেন্ট হিসাবে ভোগার কি অসহ্য যন্ত্রনা? আরেক জন লিখেছেন-আপনি কি জানেন কোলকাতার ডাক্তাররা রুগীকে মুর্গী বলে?

  কোন সন্দেহ নেই শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের বাণিজ্যায়নের জন্য নার্সিং হোম এবং ডাক্তার নিয়ে লোকের অভিজ্ঞতা তিক্ত। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকারের মধ্যে না ফেলে যদি বাণিজ্যিক পন্য হিসাবে দেখা হয়-এই সমস্যাগুলো আসবে। কিন্ত তার জন্যে ডাক্তাররা কতটুকু দায়ী?  কিছু অসৎ ডাক্তার অবশ্যই আছে-কিন্ত সেটাত সব পেশাতেই আছে। তার জন্যে সব ডাক্তারকে পেটাতে হবে? এগুলোত সামাজিক ব্যধিতে পরিনত আজ।

 এবার আরেকটা মৌলিক প্রশ্নে আসি। অধিকাংশই মত প্রকাশ করেছেন, ডাক্তারদের কাজে তারা খুশী নন।

 এবার উলটো দিকটাও দেখা যাক।

 (১) আজকালকার দিনে সহজ কোন কারনে কেউ ডাক্তারের কাছে যায় না। যায় যখন সব ওষুধ ট্রাই করেও কিছু হচ্ছে না। মুশকিল হচ্ছে একজন রুগীকে সঠিক ভাবে ডায়াগনোজ করতে-যা যা টেস্ট দরকার বা ডাক্তারের যে সময় দেওয়া উচিত সেটা একজন ডাক্তার দেয় কি না। আমি যেটা দেখেছি, ভারতে ডাক্তারের সংখ্যা এত কম, একজন ডাক্তারকে এত রুগী দেখতে হয়-সেটা সম্ভব না।

 (২) দ্বিতীয় সমস্যা-ডাক্তার মানেই সমাধান-রুগী সুস্থ হবে-এই ধারনা ছাড়তে হবে। চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি হয়েছে সন্দেহ নেই-কিন্ত এখনো তা শৈশবেই। একটা ওষুধ একজনের জন্য কী ভাবে কাজ করবে-তা নির্ভর করে সেই মানুষটির জেনেটিক গঠন, লাইফ স্টাইলের ওপরে। একজন ডাক্তার এখন যে ডাক্তারী করেন, তা অনেকটাই আন্দাজে-ট্রায়াল এন্ড এররে।  একটা প্রেসক্রিপশন আদৌ কাজ করবে কি না-তার জন্যে যে ডেটা বা রেকোমেন্ডেশন সিস্টেম দরকার-যা মানুষের জেনেটিক গঠন,  লোকটির পাস্ট হিস্ট্রি এবং লাইফস্টাইল জেনে কাজ করবে-সেটা এখনো আমেরিকাতেও গবেষনার পর্যায়ে আছে। যদ্দিন না মেডিকাল সায়েন্স ওই লেভেল না যাচ্ছে, একজন ডাক্তার তার অভিজ্ঞতা দিয়ে যা করা সম্ভব তাই করছেন। সেটা নাও কাজ করতে পারে। তার জন্যে হালার ডাক্তার বলাটা নেহাত মূর্খামি এবং অজ্ঞতা। মেডিক্যাল সায়েন্সের বর্তমান লিমিটেশন না বুঝলে মুশকিল আছে।

 (৩)  মেডিক্যাল সায়েন্স দ্রুত চেঞ্জ হচ্ছে। পাঁচ বছরে বদলে যাচ্ছে। ডাক্তারদের অনেকেই সেই চেঞ্জের সাথে নিজেদের আপডেট করেন না। তাদের আপডেট বলতে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মেডিকেল রেপরা যা বোঝাচ্ছেন।  ওই ভাবে ত হয় না। মুশকিল হচ্ছে তারা নিজেদের আপডেট করবেন না ই বা কি করে?  কোলকাতায় ত শুনলাম অর্থাভাবে ভালো জার্নাল আসাও বন্ধ। এই ভাবে কি কিছু হয় না কি?

 (৪) আরো একটা বিরাট চেঞ্জ আসছে মেডিক্যাল সায়েন্সে। সেটা হচ্ছে এখন আমাদের সব "রান টু ফেলিউর" মডেল। মানে রুগীর রোগ হলে-তবে ডাক্তারের কাছে আসা। কিন্ত রোগ ত এমনি এমনি হয় না-তার ও পূর্বলক্ষণ থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পূর্বলক্ষন পর্যাতে রোগ ধরতে পারলে চিকিৎসার খরচ কমে। আগে থেকেই রোগটা আটকানো যায়। ভবিষ্যতের যে মেডিক্যাল আওটি সিস্টেম আসছে, তাতে একজন লোক অন্তত ১০ টা থেকে ২০টা সেন্সর তার দেহেই প্লাগ ইন করে ঘুরবে-এবং তার কিছু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আগেই জেনে যাবে। এতে ডাক্তারদের কাজটা অনেক সহজ হবে।

  মোদ্দা কথা ডাক্তার মানেই রোগ সেরে যাবে- এই ধরনের এটিচুড বদলাতে হবে। মেডিক্যাল সায়েন্সের বর্তমান লিমিটেশন না বুঝলে মুশকিল ।

 প্রশ্ন হচ্ছে আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ডাক্তারদের হয়ে বলছি কেন ?  এমন ভাবার কারন নেই আমি ভুক্তভোগী নই। আমার মার, বাবার ভুল চিকিৎসা হয়েছে। আমেরিকাতে আমার স্ত্রীর ও ভুল চিকিৎসা হয়েছে।  যদিও আমি মেডিক্যাল লাইনে খুব কমই জানি-তবুও আই ও টি ফিল্ডে পেশাগত কারনে, মেডিক্যাল সায়েন্সের ভবিষ্যত এবং বর্তমান গবেষনাতে কিছু পড়াশোনা করে এটাই বুঝেছি-এই ডায়াগনোসিসটা যদিও মোটামুটি করা যায়, প্রেসক্রিপশনটা এখনো হাতুড়ে পর্যায়েই আছে। যদ্দিনা মেডিক্যাল ডেটাসায়েন্স এবং আই ও টির উন্নতি না হচ্ছে, ডাক্তারদের কাছ থেকে খুব বেশী  নির্ভুল প্রেসক্রিপশন আশা করাটাই অন্যায়।  ওটা সম্ভবই না। যদি কোন ডাক্তার নিজের প্রেসক্রিপশন নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী থাকেন-তিনিও অজ্ঞ-আর যে রুগী ভাবছে  প্রেসক্রিপশন মানেই রোগ সেরে যাবে সেও অজ্ঞ। এই অজ্ঞতা যত দ্রুত দূর হয় তত সবার মঙ্গল। 

Thursday, January 7, 2016

কালিয়াচকে দাঙ্গা

কালিয়াচকের দাঙ্গার এত ছবি-এত আস্ফালন চারিদিকে-এই প্রবন্ধটা লিখতে বাধ্য হলাম।

 মালদহের ওই দাঙ্গা নিয়ে লিখছি না। লিখছি-কিশোর বয়সে নদীয়া মুর্শিদাবাদ বর্ডারে দাঙ্গার অভিজ্ঞতা নিয়ে। কারন এই পরজীবি কোলকাতাবাসীদের ন্যাকামো আর সহ্য করা যাচ্ছে না।

 সেটা বোধ হয় ১৯৮৬ বা ৮৭। আমি ক্লাস সেভেন এইটে পড়ি।

 আমার বাড়ি ছিল করিমপুরে। এটা বর্ডার এরিয়ার স্মাগলিং টাউন। তুলো চিনি প্রতিদিন পাচার হত বাংলাদেশে। মুসলমানরা বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারে মাল-এপার -ওপার করে । হিন্দুরা তাদের বিজনেসে টাকা খাটায়।  এমনিতে স্মাগলাররা ভাই ভাই। কিন্ত বাটোয়ারা নিয়ে বাওয়াল হলে দুচার পিস লাশ থানায় ঢোকে।

  এইভাবে এক হিন্দু ব্যবসায়ীর লাশ ফেলল একদিন। মোস্ট লাইকলি লোকটা স্মাগলিং এ টাকা খাটাত-আমাদের করিমপুরের খরে নদী পেরিয়েই মুর্শিদাবাদ। সেখানে ১০০% মুসলিমদের বাস। লোকটার বোধ হয় টাকা মার গেছিল-সে আদায় করতে গিয়ে ঝগড়া বা কিছু একটা গন্ডোগল হয়-এবং কিছুদিন বাদে বক্সীপুরের গ্রামগুলো থেকে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার । ফলে প্রাথমিক ভাবে একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিছুদিন ধরে শহরে চলছিল। এদিকে করিমপুর শহরে যারা দিন মজুর, বিজনেসে ডেইলি লেবার-তারা সবাই মুসলমান এবং আসে ওপার থেকেই। করিমপুর শহরে আবার একটাও মুসলিম নেই। আমাদের সময় তিন হাজার দোকান ছিল-একটা মুসলমানের দোকান ও দেখি নি। ফলে শহরের মধ্যে মুসলিম লেবাররা ছিল ভালনারেবল। এই উত্তেজনা চলার তিন দিনের মাথায়-করিমপুর শহরে কোথাও জনাচারেক মুসলিম লেবারকে পেটানো হয়-ওই খুনের প্রতিশোধ হিসাবে। ওই সময় ওখানে আর এস এস বা হিন্দুদের কোন সংগঠন ছিল না।

 সেই চারটে লোক কোন রকমে নদী পেরিয়ে পালিয়ে যায় প্রাণে বেঁচে। বাকী লেবারাও সেদিন পালিয়েছিল। কিন্ত পরের দিন পুরো উত্তেজনা হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার রূপ নেয়।

 এদিকে আমাদের বাড়ি হচ্ছে নদীর ধারে। যেদিন প্রচুর গন্ডোগল হচ্ছে-বাড়ির তিনতালার ছাদের উঠে দেখি-যদ্দুর চোখ যায় নদী পেরিয়ে পাটক্ষেত্রে শুধু লোক আর লোক -লাঠি, হেঁসো নিয়ে নদীর ওপারে দাঁড়িয়। আমার ধারনা অন্তত দশ হাজার লোক লাঠি আর হেঁসো নিয়ে ওপারে আস্ফালন করছে। এপারে দুই জীপ পুলিশ। বলা বাহুল্য লোকগুলো নদী পার করা শুরু করলে-ওই কটা পুলিশে কিছু হত না। আমাদের পালাতে হত। বাড়ি পুড়ত। না পালালে, আমাদের লাশ পড়ত।  আমি সাধারনত ভয় পাওয়ার পাবলিক না। তবে সেদিন বেদম ভয় পেয়েছিলাম। কারন নদীর ধারে বাড়ি হওয়াতে প্রথম কোপটা আমাদের বাড়ির ওপরেই আসত।

 তবে সেই দাঙ্গা থামে সিপিএমের  হস্তক্ষেপে। ততক্ষনে এপার আর ওপারের বিধায়করা এসে গেছেন। ডোমকল আর করিমপুরের বিধায়ক সিপিএম হওয়াতে লাভ হয় এই যে উনারা পরিস্থিতি সামাল দেন। এরপরে অবশ্য এমন বাজে অবস্থা কোনদিন হয় নি। পার্টি ম্যানেজ করত দুই সাইড।

কিন্ত টেনশন ছিল পাক্কা একবছর । বাবার স্কুল ছিল মুর্শিদাবাদে-বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে । কিন্ত সাইকেলে যেতে হত মুসলিম অধ্যুশিত গ্রাম পেরিয়ে। এইপার থেকে তিনজন হিন্দু শিক্ষক যেতেন। তাদের লাশ হওয়ার সম্ভাবনা তখন প্রবল। সেই জন্যে বাবারা ১০ মাইল ঘুরে যেতেন স্কুলে। প্রায় একবছর । সব থেকে দুর্ভাগ্য-বাবা ওই জোনেই পার্টি করেছেন সিপিএমের জন্মদিন থেকে। কিন্ত বাবার সিপিএম বন্ধুরাই পরামর্শ দিয়েছিল ঘুরে যেতে। কারন একজন বদলোকই লাশ ফেলার জন্য যথেষ্ঠ। আবার প্রায় একমাস ধরে ওপার থেকে মুসলিম লেবারদের এপারে আসা বন্ধ ছিল। যা আস্তে আস্তে খোলে।

  না। এসব ঘটনা কোনদিন কোন পেপারে আসে নি। সেকালে ফেসবুকও ছিল না।

  তবে ওই দশ হাজার লোক লাঠি আর দা নিয়ে কোপাতে আসছে-সেই দৃশ্য ভুলবো না। সেই জন্য আমার কাছে দাঙ্গা বাস্তব-ভীষন রকমের বাস্তব।

 কোলকাতার বাবুরা বা বুদ্ধিজীবিরা চিরকাল পরজীবি। তারা বামপন্থী? এগুলো ভুল্ভাল ধারনা। বৃটিশ আমলে তারা ছিল বৃটিশ অনুগ্রহের দাস। ১৯৭৭ সালে সিপিএম যখন জেতে গোটা রাজ্যে-কোলকাতায় সিপিএমের ফল ভাল হয় নি। কোলকাতা আস্তে আস্তে বাম হয়েছে যখন বামেরা ক্ষমতায় গিয়ে, অনুগ্রহ বিতরন শুরু করেছে। কোলকাতার বুদ্ধিজীবিরা শ্রেফ পাওয়ার আশাতে বাম ছিল। এখন পাওয়ার আশাতে মমোপন্থী। যেদিন বিজেপি আসবে ক্ষমতায়-কোলকাতার সংখ্যাগরিষ্ঠ বুদ্ধিজীবির আলখাল্লার রঙ গেরুয়া হবে। এখন যারা " এই ইসলামফোবিয়া ভালো নয়" বলছেন ( ওই শান্তিনিকেতনী স্টাইলে এই গরু সরে যা না )-বিজেপি ক্ষমতায় এলে, তারাই দেখবেন বলছে-বাট আপনারা কি দেখতে পারছেন না শান্তির ধর্মের লোকেদের উৎপাত?

 তাই এইসব কলকাতাবাসী বুদ্ধিজীবি পরচুলাগুলোকে ফেলে দিতে হবে সামনের দিকে তাকাতে গেলে। মোদ্দা কথা হিন্দু এবং মুসলিমদের মধ্যে সমস্যা আছে স্বীকার করতে হবে। মুসলিম প্রধান এলাকাতে হিন্দুদের বাস করা অসম্ভব এবং হিন্দু প্রধান এলাকাতে মুসলিমদের ঘর ভাড়া দেওয়া হয় না-এগুলো করুন বাস্তব। সিপিএমের ৩৪ বছরে সাম্প্রদায়িকতা চাপা দেওয়া হয়েছিল । কমে নি। কারন ধর্মের ভিত্তিতে আঘাত হানতে ভয় পেতেন কমরেডরা । পাছে ভোটাটা হারন। এখন অবশ্য আম এবং ছালা-দুটোই হারিয়েছেন তারা।

 ধর্মকে আঘাত না করতে পারলে কিছু হবে না। ইসলাম আরবদের ট্রাইবাল কালচার-আবার হিন্দু ধর্মের অতীত ও সেই ট্রাইবাল কালচার। ইসলাম ভাল মানলে, ইসলামের প্রফেটের লুঠতরাজ , ৮০ টি যুদ্ধ, যৌনদাসী রাখা-সব কিছুই ভাল হয়ে যায়। মানছি সেকালে ওগুলো ছিল আরবের প্রথা। কিন্ত একালের মুসলমানেরা যে সেই আদিম আরব সমাজের আইনে বিশ্বাস রাখে এটাও ত বাস্তব!  যে ধর্মের নবীই ৮০টা যুদ্ধ করেছেন বিধর্মীদের বিরুদ্ধে, সেই ধর্মের লোকেরা অস্ত্র ধরবে না? ইয়ার্কি নাকি?  ঠিক তেমন হিন্দু ধর্ম ভাল-এটা মানলে জাতপাতের অত্যাচার সহ আরো অনেক মনুবাদি সংস্কারকে ভাল বলে মানতে হয়। এবং এই যে লোকে এত বেদ বেদ করে। কোন  হিন্দু ঋক বেদ পড়ে নি। ঋক বেদের অনেক ছত্রেই আর্য্যদের উস্কে দেওয়া হয়েছে অনার্য্যদের ওপরে লুঠপাট করার জন্য। দুই ধর্মের ভিত্তিতেই যেখানে দাঙ্গা, যুদ্ধ, হিংসা-সেখানে তারা পাশাপাশি থাকলে দাঙ্গাত হবেই। দুই ধর্মেই দাঙ্গা লাগানোতে এলাহি সমর্থন আছে। থামাবেন কি করে?  এই ধরনের গোঁজামিল দিয়ে হিন্দু মুসলমানের ঐক্য হবে না।

 বৈদিক হিন্দু ধর্ম এবং ইসলাম-এই দুটোই বাঙালীর জীবনে, বহিরাগত। বাঙালীরা যেদিন বুঝবে, তাদের পূর্বপুরুষদের একটা উন্নত ধর্ম ছিল-যা বৈদিক বা ইসলাম না। যা আউল বাউলে গানে মুখরিত করত বাংলার মাঠ, ঘাট, নদী-সেই সহজিয়া ধর্মের স্বাদ যেদিন প্রতিটা বাঙালী পাবে-অনুভব করবে, তারা হিন্দু বা মুসলমান না-গর্বিত বাঙালী-সেইদিন সাম্প্রদায়িকতার ভূত এই সমাজ থেকে নামবে।  স্পেডকে স্পেড বলা শিখতে হবে। সিপিএমের ৩৪ বছরের ব্যর্থতা থেকে কবে শিখব আমরা? সাম্প্রদায়িকতা দূর করার একটাই রাস্তা-হিন্দুত্ব, ইসলামিৎ ছেড়ে শুধু ভাষাতে না-জীবন দর্শনেও বাঙালী হতে হবে।










Saturday, January 2, 2016

সঙ্গীনী নির্বাচন-বিজ্ঞান ও আধুনিক বাস্তবতা

সঙ্গীনী নির্বাচন-বিজ্ঞান ও আধুনিক বাস্তবতা
******************
(১)
 প্রাণের সংজ্ঞার মূলেই প্রজনন।
 জীবনের কোন পরম উদ্দেশ্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে নেই। কিন্ত  জীবের আছে। সেটা হচ্ছে সন্তানের প্রতিপালনে সৃষ্টিকে বা নিজের স্পেসিসকে টিকিয়ে রাখা।

  রুক্ষ নিরস বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব থাক। বাস্তব হচ্ছে নরনারীর মেটিং সিলেকশন বা এই সঙ্গী বা সঙ্গিনী নির্বাচন নিয়ে অসংখ্য গবেষনা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষনার খুব উর্বর ক্ষেত্র এটি।  আমি এই ফিল্ডের এক্সপার্ট নই-কিছু রিভিঊ পেপার পড়েছি এই মাত্র।

  এই প্রবন্ধ লেখার কাজটা বেশ জটিল। কারন বাঙালী বা ভারতীয়দের মধ্যে মেটিং সিলেকশন নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ আগে ত কিছুই ছিল না । বর্তমানে কিছু চোখে আসে।

 তবে বৈজ্ঞানিক কাজ দিয়ে বিরক্ত করবো না। আমার মূল বক্তব্য সময় এবং সমাজ বদলাচ্ছে। ফলে সঙ্গী এবং সঙ্গীনী নির্বাচনের কাজটা কিন্ত আরো কঠিন হচ্ছে। কেন কঠিন হচ্ছে এবং কিভাবে এগোলে "সাফল্য" আসবে-এটা বুঝতেও  সঙ্গী সঙ্গিনী নির্বাচনের বিজ্ঞানটা জানা থাকলে সুবিধাই হবে।

সমস্যা হচ্ছে আমাদের সমাজে একজন ছেলে গাঁতিয়ে পড়াশোনা করে ইঞ্জিনিয়ার বা পেশাদার কিছু একটা হল। এরপরে বাবা মা এরেঞ্জড মেরেজ দিয়ে দিচ্ছে। ছেলেটিকে স্ত্রী নির্বাচনের জন্য প্রায় খাটতেই হল না। সে পনেরো থেকে কুড়িটা বছর ধরে গাঁতিয়ে কেরিয়ার তৈরী করছে কিন্ত মেট সিলেকশনে তার ইনভেস্টমেন্ট প্রায় শুন্য।  বৌ খোঁজার জন্য বাবা-মা একটু খেটে পেপারে এড দিচ্ছে-তারাই খাটছে- ছেলেটি গলায় ঝোলাচ্ছে।

এটা খুব অবাস্তব  অবৈজ্ঞানিক একটা সিস্টেম যা বেশীদিন চলার কথা না-এবং চলছেও না। আমার অধিকাংশ আই আই টির ব্যাচমেটরা আজ উচ্চপদে সমাজে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত। এদের মধ্যে বৈবাহিক অসন্তোষে অনেকের জীবনই আজ নরক।  আমি সেইসব কাদা না ঘেঁটে এটাই বলতে চাইছি-জীবনে ভাল কলেজ, ইউনিভার্সিটি বা চাকরি যতটা গুরুত্বপূর্ণ -তার থেকেও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন সঠিক সঙ্গী বা সঙ্গিনী নির্বাচন। আমার এইসব বন্ধুরা সেটা করে নি। ভেবেছে পেপারে বিজ্ঞাপন দিলেই আই আই টির ছাত্রদের কি আর পাত্রীর অভাব হবে? এই ধরনের সরলীকৃত ভুল ধারনার খেসারত দিচ্ছে আমার অনেক বন্ধু।

 সঙ্গী বা সঙ্গীনী নির্বাচনে ভুল মানে ভাল কেরিয়ার সম্পূর্ন মুল্যহীন-ফালতু। এটা না বুঝলে ভবিষ্যতে আরো দুঃখ আছে কপালে।
[ ওয়েব ঃ http://biplabbangla.blogspot.com/2016/01/blog-post.html ]

                               (২)

 পার্টনার সিলেকশনের বেসিক সায়েন্সটা এবার একটু শেখা যাক। আমি কিছু কিছু টার্ম ব্যবহার করব-যা একাডেমিক্সে স্বীকৃত।যারা আরো ডিটেলেস জানতে চান-তারা মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের  ডেভিড গিয়ারীর এই রিভিউ পেপারটা পড়ে নিন -মানব সঙ্গী নির্বাচনের বিবর্তন (http://web.missouri.edu/~gearyd/MatechoicePDF.pdf)। এতে ভাল সার সংক্ষেপ পাবেন।

পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট বা ছেলেমেয়ে বড় করার বিনিয়োগ ঃ মেট সিলেকশনের মূল অধিকাংশ সিদ্ধান্তই হয় ছেলে মেয়েকে বড় করতে বাবা বা মা কি করছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জগতে মা যেহেতু বহুদিন শিশুকে গর্ভে রাখে, এক্ষেত্রে মেয়েদের ভূমিকা এবং ইনভেস্টমেন্ট অনেক বেশী। এছারাও বাকি ইনভেস্টমেন্ট হচ্ছ সন্তান মানুষ করতে তাদের খাদ্য, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা দেওয়া। যেটা মানব জগতে কৃষিভিত্তিক সমাজে পিতার দ্বায়িত্ব। তবে আধুনিক শিল্পোন্নত সমাজে না।

 সন্তানের ক্ষেত্রে মেয়েদের যেহেতু বিনিয়োগ বেশী-সেহেতু অধিকাংশ স্তন্যপায়ীদের মতন মানব সমাজেও মেয়েরাই নির্বাচন করে তাদের পুরুষ সঙ্গী। মূলত তারাই সিলেক্তটর -তবে এর দুটো ব্যাতিক্রম হয়-

 (১) অপারেশনাল সেক্স রেশিও ( OSR) -অর্থাৎ মেটিং এর জন্য পাওয়া যাচ্ছে এমন যৌনক্ষম নারী ও পুরুষের সংখ্যা। অধিকাংশ সমাজেই এটি মেয়েদের পক্ষেই থাকে। অর্থাৎ মেয়ে কম থাকে।  কারন মেয়েরা গর্ভধারনক্ষম থাকে চল্লিশ পর্যন্ত। সেখানে পুরুষের বীর্য্য সক্ষম প্রায় সত্তর পর্যন্ত। কিন্ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধ বা রোগের জন্য এর ব্যতিক্রম হয়েছে।

(২) আরেকটা হচ্ছে প্র্যাক্টিক্যাল ওপেরাশনাল সেক্স রেশিও। যেমন ধরুন পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশী থাকলেও, কৃষিভিত্তিক সমাজে খুব কম সংখ্যক পুরুষের পর্যাপ্ত জমি থাকে। অর্থাৎ যারা এই পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট ঠিক ঠাক করার ক্ষমতা রাখে।  সেই ক্ষেত্রে সমাজে এই উচ্চশ্রেণীর পুরুষরাই সিলেক্টর ।

  আমাদের বাংলা এবং ভারতের মেটিং সিলেকশন, পণপ্রথা আগে যা ছিল-তা বুঝতে (২) নাম্বার পয়েন্টটা সাহায্য করবে।

 কিন্ত আমাদের দেশের সমাজ এখন কৃষিভিত্তিক থেকে শিল্প সমাজের পথে।  যখন একটা সমাজ কৃষিভিত্তিক থেকে শিল্প ভিত্তিক হচ্ছে-যেখানে জমি না, পুরুষের চাকরিটাই মুখ্য -- তখন মেটিং সিলেকশনের ভিত্তি কি?

  এক্ষেত্রে প্রাক্টিক্যাল রেশিও মেয়েদের ফেবারে চলে যাবে। অর্থাৎ তারাই হবে নির্বাচক। যেহেতু পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট করতে পারে এমন পুরুষের সংখ্যা অনেক বাড়ছে।

 সুতরাং এই আধুনিক সমাজে কোন পুরুষ, সঙ্গীনী নির্বাচনে সফল হবে?

 কালচারালি সাকসেস্ফুল মেল বা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সফল পুরুষ।  যারা এই ধণতান্ত্রিক সমাজে মই এর উচ্চধাপে উঠছেন। অর্থাৎ যারা উচ্চপদে ভাল চাকরি করছেন বা বানিজ্যিক দিয়ে সফল বা রাজনৈতিক ভাবে সফল, মেয়েদের কাছে তারাই পাত্তা পাবেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা সত্য হলেও কিছু ব্যতিক্রম থাকবে-সেটাও লিখছি।

 শিল্পভিত্তিক সমাজেও দুটো ভাগ আছে। যে রাষ্ট্রগুলি প্রচুর সামাজিক নিরাপত্তা দেয়, যেমন ইউরোপের রাষ্ট্রগুলির ক্ষেত্রে -অর্থাৎ রাষ্ট্রই পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট করে  অনেকটা--- সেক্ষেত্রে পুরুষ সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেয়েরা এই কালচারালি সাকসেস্ফুল পুরুষ বলতে ঠিক কি নির্বাচন করবে?

 ইনফ্যাক্ট এই একটি ক্ষেত্রেই প্রেম বা রোমান্সের ভূমিকা থাকছে। মেটিং সিলেকশনের ক্ষেত্রে রোম্যান্সের ভূমিকা নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই ( লি-২০০২) দেখিয়েছেন পার্টনার সিলেকশনের ক্ষেত্রে রোম্যান্স একটি লাক্সারী আইটেম-তবে যে সমাজে রাষ্ট্র সন্তানের অনেকটা দ্বায়িত্ব নিচ্ছে-সেই ক্ষেত্রে পার্টনার সিলেকশনের ক্ষেত্রে রোম্যান্টিক পুরুষরা কল্কে পায়। যেমন ইউরোপিয়ান সমাজে।

কিন্ত আমেরিকার ক্ষেত্রে এটা সম্ভব না-ভারতের ক্ষেত্রেত একদম ই না। কারন এসব দেশে ছেলে মেয়ে পড়ানোর খরচ বা চিকিৎসার খরচ খুব বেশী।  ফলে এইসব দেশে রোম্যান্টিক পুরুষের থেকে যারা ফাইনান্সিয়াল নিরাপত্তা বেশী দিতে পারবে, তাদেরই নির্বাচন করবে মেয়েরা। সুতরাং ভারত বা বাংলাদেশের সমাজে রোম্যান্টিক পুরুষ প্রেম হয়ত পাবে-কিন্ত স্ত্রী পাবে না। যদ্দিন না এই দেশগুলি শিশুনিরাপত্তে দিতে না পারছে।

 দেখতে কেমন পুরুষ মেয়েরা নির্বাচন করে-কেন করে? এটি খুব সুপ্রতিষ্ঠিত -যহেতু এই নিয়ে প্রচুর গবেষনা হয়েছে।

"Women prefer men who are somewhat taller than average, and have an athletic (but not too muscular) and symmetric body shape, including a 0.9 waist-to-hip ratio (WHR), and shoulders that are somewhat wider than their hips (Barber, 1995; Beck, Ward-Hull, & McClear, 1976; Cunningham, Barbee, & Pike, 1990; Gangestad et al., 1994; Hatfield & Sprecher, 1995; Oda, 2001; Pierce, 1996; Singh, 1995a). The facial features that women rate as attractive include somewhat larger than average eyes, a large smile area, and prominent cheek bones and chin (Barber, 1995; Cunningham et al., 1990; Scheib, Gangestad, & Thornhill, 1999). These physical traits appear to be good indicators of genetic variability (which is important for disease resistance), a lack of illness during development, and current physical health (Barber, 1995; Thornhill & Gangestad, 1993). For instance, the development of prominent cheek bones and a masculine chin is related to androgen levels and androgen/estrogen ratios during puberty (Fink & PentonVoak, 2002; Tanner, 1990). Chronic illness during this time can suppress androgen secretion, which would result in the development of less prominent cheekbones, a more feminine-looking chin, and, as a result, lower rated physical attractiveness (Thornhill & Gangestad, 1993)."

 নতুন কিছু গবেষনাতে বলছে না। সেই টল ডার্ক হ্যান্ডসামের গল্প। চওড়া কাঁধ, চাবুকে চিবুক, লম্বা চোখ। কেননা এগুলো শক্তিশালী জিনের লক্ষণ। শক্তিশালী জিন মানে যে জিন রোগ প্রতিরোধে সক্ষম।

 সুতরাং মেয়েরা যে সুন্দর পুরুষ খোঁজে সেটা এমনি এমনি না। সুন্দর পুরুষ সুস্বাস্থ্যের লক্ষন।

 কিন্ত সব কিছু ত একসাথে পাওয়া যায় না-সুন্দর পুরুষ-আবার প্রচুর কামাচ্ছে বা সমাজ উচ্চপ্রতিষ্ঠিত। সেক্ষেত্রে মেয়েরা কি করে?

 অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েরা উচ্চপ্রতিষ্ঠিত পাত্রই বেচে নেবে সুন্দর দেখতে গরীব পাত্রর থেকে। একাধিক গবেষনা আছে এই নিয়ে

তবে ব্যতিক্রম আছে

  (১) ইউরোপিয়ান ওয়েল ফেয়ার স্টেটে  যেখানে রাষ্ট্র পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট করে
  (২) যেক্ষেত্রে মেয়েটি ধনী পরিবারের বা মেয়েটি নিজেই উচ্চপ্রতিষ্ঠিত।

 আরো একটা গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার জেনে নেওয়া ভাল।  বিয়ের সঠিক সময়। এটাও কঠিন প্রশ্ন । হাঙ্গেরীতে হওয়া একটা সামাজিক গবেষনাতে দেখা যাচ্ছে যেসব মেয়েরা উচ্চশিক্ষা নিয়েছে, এবং উচ্চশিক্ষিত ছেলেদের বিয়ে করেছে-এতে অবশ্য একটু বিয়ে করতে লেট হয়েছে-তাদের মধ্যে ডিভোর্স কম এবং তারা বিবাহিত জীবনে অনেক বেশী সফল। এটা আমেরিকাতেও প্রমানিত।  একই ফান্ডা "স্ট্রেইট"  ভারতে লাগাতে গেলে, উলটো বিপদের সম্ভবনা আছে।  সুতরাং বুঝেসুঝে । মোটামুটি যেটা সত্য -সেটা হচ্ছে- বৈবাহিক জীবনে সফল হতে গেলে ছেলে মেয়ে দুজনেরই উচ্চশিক্ষিত হওয়া আবশ্যক। এটাই শিল্পোন্নত সমাজের বাস্তব। কিন্ত নারী বা পুরুষ যদি উচ্চশিক্ষা শেষ করে ধরুন ২৫ বা ২৭ বছর বয়সে বাজারে নামে-তখন ভাল মালত উঠে গেছে!! সুতরাং দুটোর মধ্যে কম্প্রোমাইজ দরকার। একটা অপশন পার্টনার সিলেকশন করে বহুদিন এনগেজড থেকে উচ্চশিক্ষার শেষে বিয়ে করা। যাতে শিক্ষা শেষে পাত্র পাত্রীর জন্য ভিক্ষা করতে না হয় !! আরেকটা অপশন বিয়ে করে উচ্চশিক্ষা চালানো। কোন অবস্থাতেই মেয়েদের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা উচিত না। উচ্চশিক্ষিত মা, একজন সন্তানের জন্য বেস্ট পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট।

   (৩)
এবার বিজ্ঞানকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু বাস্তবিক কথা লিখি।

 মোদ্দা কথা আগামী দিনে বাঙালী মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজে মেয়েরাই ছেলেদের সিলেক্ট করবে। উল্টোটা হবে না-কারন প্রাক্টিক্যাল ওপারেশনাল সেক্স রেশিও এখন মেয়েদের ফেবারে। যেসব ছেলে ওইসব এরেঞ্জড মেরেজের আশাতে বসে থাকবে, তাদের কপালে ভাল কিছু জোটার চান্স কম। সুতরাং একজন ছেলে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের জন্য বা ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন বা ভাল কোম্পানীতে চাকরির জন্য যেভাবে কষ্ট এবং পরিশ্রম করে, লাইফ পার্টনার তোলার জন্য সেই পরিশ্রম না করলে-তার সব কেরিয়ারই জলে যাবে। ভাল কেরিয়ারের জন্য, ভাল পার্টনার আবশ্যক।
মুশকিল হচ্ছে পরীক্ষার জন্য ত কোচিং সেন্টার আছে- পাত্রী তোলার শিক্ষাটা কে দেবে?

এটা আমাদের সমাজে বিরাট সমস্যা। আমি কিছু টিপস দিতে পারি মাত্র।

 প্রথমত স্টার্ট আর্লি। উচ্চমাধ্যমিক বা কলেজ থেকেই শুরু করা উচিত।  আমার বন্ধুদের মধ্যে যাদের বাল্যপ্রেম, তারা কেরিয়ারেও সফল। এর একটা বড় কারন ইমোশনাল স্টেবিলিটি। তবে প্রেমে পড়েই উচ্চশিক্ষা না সেরে বিয়ে করার জন্য লাফালে বিপদ বেশী। উচ্চশিক্ষার সাথে কম্প্রোমাইজ কখনোই না।

 দ্বিতীয়ত স্যোশালাইজেশন স্কিল খুব জরুরী। এটার জন্য স্কুল কলেজের কালচারাল সব ফেস্টে অংশ নিতে হবে।
 নাটকে অংশগ্রহণ করতে হবে। আবৃত্তি, সঙ্গীত, অঙ্কন এগুলো অবহেলা করে পরীক্ষার জন্য পড়লে কিছু হবে না। নিজেকে প্রকাশ করার সব কলা শিখতে হবে-এ ব্যপারে নাটক খুব সাহায্য করে।

 তৃতীয়ত খেলাধুলাতে অংশ নিয়ে শরীর বানাতে হবে। মেয়েরা কি ধরনের  পুরুষ শরীর কেন পছন্দ করে-তা আগেই লিখেছি। পেটে ভুঁড়ি থাকবে, আর মেয়েরা আকৃষ্ট হবে-এমন ভাবা মূর্খামি।

 চতুর্থত ভাল সাহিত্য পড়া খুব জরুরী। সাহিত্য না পড়লে একজন মেয়ের মনের গঠন বুঝবে না-তার সমস্যা গুলো বুঝবে না। এটা শুধু ইম্প্রেস করার ব্যপার না। একজনকে গভীরে না বুঝতে পারলে-সেই বা তোমাকে পাত্তা দেবে কেন?


পঞ্চমত -কিভাবে এপ্রোচ করতে হয়। ধর একটা মেয়েকে ভাল লেগে গেল। তাকে কি ডিরেক্ট গিয়ে বলবে?
একদমই না। তাতে ১০০% ব্যর্থ হবে। মনে রাখবে কেউ ওই ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না। প্রথমেই বন্ধু হয়ে মিশতে হবে।
এরপরে আস্তে আস্তে তাকে বুঝতে হবে। এখানেই সাহিত্য এবং বাচিক ভঙ্গী খুব কাজের।

ষষ্টত রান্না, ঘর সংসারের কাজ। এগুলো মেয়েলি কাজ বলেই চলে আমাদের সমাজে। মেয়েরা যখন নির্বাচনে ভূমিকায়, তখন তারা অবশ্যই জানতে চাইবে ছেলেটি রান্না করে কি না। রান্না করা ভাল আর্ট। এগুলো ছেলেদের ও শেখা উচিত।

 এবং শেষে সাহস ও অধ্যাবসায়।  মেয়েরা "না"  বললেও হাল ছাড়লে চলবে না। ব্যারাক ওবামাকেও মিশেল ওবামা প্রথমে না বলছিল। ফ্রেডরিক রুজভেল্টের স্ত্রীও তাই। তবে দেখতে হবে যেন মেয়েটি দ্বিধায় আছে। লেগে থাকার নামে বিরক্ত করাটাও উচিত না। তাতে হিতে বিপরীত হবে।

 আবার অনেক ক্ষেত্রেই হতে পারে মেয়েটির হয়ত একটি বয়ফ্রেন্ড আছে । সেক্ষেত্রে কি এপ্রোচ করা উচিত? অবশ্যই। কারন হতেই পারে, অপশন নেই বলে মেয়েটি ওই ছেলেটির সাথে ঘোরে। হয়ত সে তাকে চায় না। বিবর্তনের নিয়মেই নারী চায় পুরুষ তার জন্য প্রতিদ্বন্দিতাতে নামুক।  তুমি জয়েন্টের টপ র‍্যাঙ্কের জন্য কম্পিট করবে-আর একজন ভাল মেয়ের জন্য প্রতিযোগিতা থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। সেই জন্যেই ১-৪টে পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ন।

দিন বদলাচ্ছে। যেসব পুরুষ এই বদলানো দিনের সাথে নিজেকে বদলাতে পারবে, তারাই সফল হবে জীবনসঙ্গীনীর ক্ষেত্রে।

 আমি যা লিখলাম, তা খুব সরলীকরন। বেদবাক্য একদম না। বুঝেসুঝে।















Wednesday, December 30, 2015

বর্ষ শেষের বেদনা

                                                                   (১)
আমার বাংলা বানান এবং গঠন রীতি সত্যই এট্রোসিয়াস। যাকে বলে যাতা।

 ভাল লিখতে গেলে যত্ন আত্তি করতে হয়-শুধু লেখার আবেগে হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে লিখতে গেলে, লেখাগুলোর অবস্থা যে ফকিরবাবার ছেঁড়া ফতুয়ার বেশী কিছু হবে না-তা বিলক্ষণ সত্য।  আবার এটাও সত্য সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়াতে -কমিউনিকেশন স্টাইলটাই মুখ্য।

      বানান বা ভাষার বিশুদ্ধরীতি পান্ডিত্য দেখানোর নাট্যমঞ্চ হতে পারে-কিন্ত পাঠকের সাথে হৃদয় বিনিময়ের অন্তরায়।  স্যোশাল মিডিয়ার সাথে মেইন স্ট্রিমের পার্থক্য হচ্ছে-এখানে পাঠকের রেসপন্সটা সব থেকে বেশী জরুরী। পাঠককে কমেন্ট করতে উৎসাহিত করে লেখাটিকে সমৃদ্ধ করা লেখকের মূল দায়িত্ব। লেখক যদি বিশুদ্ধ ভাষাচর্চা এবং অন্তহীন গবেষনা করে সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখা নামান-পাঠকের ভূমিকা হয় গৌণ। সেটা মেইন স্ট্রিমে চলে-সোশ্যাল মিডিয়াতে চলে না। স্যোশাল মিডিয়াতে লেখকের মূল কাজ হচ্ছে নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়া- বাকীটা লেখাটা গড়ে উঠুক পাঠকের হাতে।

 অভিজিত রায় এবং তার মুক্তমনা এই কাজটা খুব সাফল্যের সাথে করেছে। তার ফলও আমরা পেয়েছি হাতে নাতে। ২০১৫ সালে মুক্তমনার পাঁচজন ব্লগার খুন বা আক্রান্ত। এই নাড়া দিতে গিয়ে অভিজিত নিজেও শহীদ। মেইন স্ট্রিমের লেখকরা আছে বহাল তবিয়তে।
 
      বহুদিন আগে থেকেই লিখে এসেছি-স্যোশাল মিডিয়ার আগমনের ফলে রাজনৈতিক পার্টি এবং ক্ষমতাসীনদের বিছানাসঙ্গী হওয়া ছাড়া মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার আর  বিশেষকিছু করনীয় নেই। তাদের বহুমূল্য পত্রিকার সাজগোজ, লে-আউট-গ্রাফিক্স-সবকিছুই সোনাগাছির রঙচং মাখা মেয়েগুলোকে মনে করিয়ে দেয়। হ্যা-প্রকারভেদত আছেই- কেউ হাই সোশাইটি কলগার্ল-কেও সরাসরি রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আনন্দবাজারের সাথে ৩৬৫ দিনের পার্থক্য ওইটুকুই।

                                                         (২)
তবুও এটা ধ্রুব সত্য আমার বাংলা খুব খারাপ। আশ্চর্য্য নই। কারন প্রতিভাতে বিশ্বাসী নই। চর্চায় আস্থা। যা চর্চা করি না-তার স্টান্ডার্ড খুব ভাল হওয়ার কথাও না।

আমি যে বাংলায় দুলাইন লিখতে পারি-সেটা আমার কাছে পরম আশ্চর্য্যের। কেন সেই গল্পটাই লিখি। কারন অনেকেই দেখে আমি দিস্তার পর দিস্তা ভুল বানানে ভর্তি বাংলা লিখে চলেছি। অবিরাম, অফুরন্ত। কিন্ত কেউ এখনো জানে না-আমি কে-কোন পরিস্থিতিতে লিখি।  কেনই বা লিখি।

ছোটবেলায় বাংলা, সাহিত্য বা লেখালেখি-এসবে উৎসাহ ছিল না। কবিতা লাগত দুর্বোধ্য। বই প্রচুর কিনতাম। সব অঙ্ক বা বিজ্ঞানের বই। পরীক্ষার জন্য সেসব বই না। নিখাদ বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই কিনতাম সেসব বই। আর বাবা ছিল ব্যার্থ রিটার্ড রাজনীতিবিদ। নিজে বাম রাজনীতিতে ব্যর্থ হয়ে, বোধ হয় মনে কোথাও আশাছিল ছেলে রাজনীতিতে কিছু করবে। ফলে বাবা ছোটবেলাতে এনে দিত অনেক ইতিহাসের বই।  বিজ্ঞানের পাশাপাশি ইতিহাসেও তৈরী হয় গভীর অনুরাগ। সাহিত্য, লেখালেখির ধারে কাছ দিয়ে যাই নি কোনদিন। বড়জোর শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলো পড়ে ফেলেছিলাম গরমের ছুটিগুলোতে।

          শরৎচন্দ্র ত বেশ একঘেঁয়ে লাগত। সেই শালার পাঠশালা আর ক্ষেতক্ষামারিতে বাল্যপ্রেম-জাত ফাতের সমস্যা-ফলে প্রেমিকার বিয়ে বয়স্ক লোকের সাথে-আর তারপরে বিধবা হয়ে ফিরে এসে- দেহহীন, পাপবিদ্ধ পরকীয়া। বিধবাকে নিয়ে পালালেও বেশ রোমাঞ্চকর কিছুর সম্ভাবনা থাকে-কিন্ত সেসব কিছু নেই-শুধু জোলো ঘ্যানঘেনে প্লেটোনিক মনকষাকশি।

          উচ্চমাধ্যমিক যখন শেষ করলাম নরেন্দ্রপুর থেকে তখন একটাই সাহিত্যগ্রন্থ কিছুটা ভালো লেগেছিল-রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলী। সেই কৃতিত্বটাও সত্যদার ( স্বামী সূপর্নানন্দ মহারাজ) প্রাপ্য। উনি উপনিষদ দর্শন এত সুন্দর বুঝিয়েছিলেন, গীতাঞ্জলীর প্রতিটা লাইন মাথায় রেজোনেট করত।

  তাছাড়া আশেপাশেও যে খুব একটা বাংলা সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুদের ভীর তাও না। গ্রামে দুএকজন সাহিত্যপ্রেমী কাকু ছিল-তাদের বাড়িতে দেশ পত্রিকা আসত। আধুনিক সাহিত্য বা বুদ্ধিচর্চার সাথে যোগ ওই ছোট্টা পাক্ষিকটা দিয়েই। তাও বুঝতাম খুব সামান্য।  নাটক গাণ বাজনার চর্চা ভালোই ছিল করিমপুরে-কিন্ত ওভারওল ওই ভাবে গভীর সাহিত্যপ্রেমী বন্ধু ছিল না। থাকার কথাও না।

        বাল্যবন্ধুদের অধিকাংশের বাবারই করিমপুর বাজারে বিজনেস। ক্লাস এইটে উঠতেই দেখলাম, অনেকেই বাবার দোকানে বসছে নিয়মিত।  ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সাহিত্যিক বিজ্ঞানী হওয়ার এস্পিরেশন আশেপাশে ছিল না। তবে ক্রিকেট নাটকে সবার প্রবল উৎসাহ।  আমার বড় হয়ে ওঠা ইন্টেলেকচুয়াল সেন্টার থেকে অনেক অনেক দূরে।

           আর নরেন্দ্রপুরে উচ্চমাধ্যমিকে যখন ভর্তি হলাম,  চারিদিকে কেরিয়ারিস্ট ছেলেপুলে। সবাই আই আই টি বা বেঙ্গল জেইইতে ভাল র‍্যাঙ্ক করতে চব্বিশঘন্টা খাটছে। বন্ধুদের সাথে অধিকাংশ সময় আলোচনা-ওই ইরোডভের প্রব্লেমটা হল কি না -এই ইঙ্ক্যোয়ালিটিটার সল্যুউশন কেউ জানে কিনা! সবাই সোনামাণিকের মতন অঙ্ক আর ফিজিক্সের প্রব্লেমের সল্যুউশন খুঁজছে। সাহিত্য ফাহিত্য ছায়াপথের জিনিস। পরীক্ষার দুদিন আগে বাংলা নোটমুখস্থ করে উচ্চমাধ্যমিকে উৎরাতে হবে-ওই নোট সাহিত্যই সার জীবনে। নরেন্দ্রপুরের স্পেকট্রামটা হল মফঃশহর থেকে আসা গাঁতানো কেরিয়ারিস্ট পাব্লিক। জনতা জি এই এই জনার্দন।

                                                         (৩)
 উচ্চমাধ্যমিকের পর যখন আই আই টি খরগপুরে ঢুকছি-তখন আমি সাহিত্যে বেশ অশিক্ষিত।  তখনো মাথার মধ্যে বিজ্ঞানী হওয়ার উদোম ইচ্ছা। যদিও আই আই টি খরগপুরে সাহিত্য অনুরাগী ছাত্র ছিল অনেক-তবে বাংলা সাহিত্যে নয়।

সাহিত্যানুরাগের শুরু সেকেন্ড ইয়ার থেকে। থাকতাম আজাদ হলে। এটা আই আই টির প্রাচীনতম হোস্টেল।  আজাদ হলের লাইব্রেরীতে বিশ্বসাহিত্যের বিরাট ভান্ডার। সমৃদ্ধ কালেকশন।

           বাংলা নাটকের প্রতিযোগিতা হত বছরে দুবার। সেই সূত্রেই একবার  হলের নাটকের গ্রুপের ছাত্ররা মিলে ঠিক করলাম-নিজেরা স্ক্রিপ্ট নামাবো। অন্যহলে তখন বাদল সরকারের ভোমা বনাম এবং ইন্দ্রজিত। বাদল সরকারে মগ্ন প্রায় সব হলের ছেলেরা। আমার উইঙ্গের পাবলিকগুলো একটু এন্টি বাম। বলে দুঃশালা -বাংলা নাটক মানেই বাম। ফলে সিদ্ধান্ত- নিজেরাই লিখব।

        মুশকিল হচ্ছে আমাদের উইংটা ছিল কোলকাতার বাঙালীতে ভর্তি। যারা শুক্কুর বার হলেই ট্রেন ধরে কোলকাতার বাড়িতে ফেরে প্রেমিকাদের সাথে দেখা করার জন্য। আমিই একমাত্র গ্রাম থেকে আসা ছেলে। বাড়ি হোস্টেল থেকে অন্তত নঘন্টার পথ। ফলে উইকেন্ডে হোস্টেলেই থাকতে হয়। ওরা বলল্লো-এই তুই ত উইকেন্ডে কোথাও যাস না- তুই একটা স্ক্রিপ্ট নামিয়ে দে।

  আমি ভাবলাম দেখি ট্রাই মেরে।  নিজে নতুন লিখব-এমন ক্যাপা নেই। ফলে একটা বিদেশী নাটকের ভাবানুবাদ নামানোটা হবে সেফ খেলা। কিন্ত কার নাটক নামানো যায়?

  সাহিত্যে তখনও আমার জ্ঞান খুব লিমিটেড। উচ্চমাধ্যমিকে বাংলায় মার্কস তোলার জন্য ছোটগল্প প্রসঙ্গে চেকভের নামটা ঠুকতে হত। ওই বাঙালীর দুচারটে নাম ড্রপ না করলে-মার্কস ওঠে না আর কি। ভাবলাম বাংলা ছোট গল্প থেকে স্ক্রিপ্ট নামালে ত চোতা ধরা খেয়ে যাব। ফলে চেকভের কোন গল্প থেকে নামিয়ে দিই। হলের লাইব্রেরীতে চেকভের পাঁচটা ভল্যুমের সম্পূর্ন কালেকশন।

 লেখক সিলেকশন ?  ডান। কিন্ত কোন গল্প? চেকভের কোন গল্পই পড়ি নি কোনদিন । অগত্যা এক হপ্তা ধরে চেকভ পড়ি। এই একটা সপ্তাহ-আমার জীবনের গতিপথটাই বদলে যায়। ফরেভার। কোন গল্পটা এখন নাম মনে আসছে না-কিন্ত গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক কিশোর-সকাল থেকে বিকেল জানালার দিকে তাকিয়ে। জানালা দিয়ে বাইরে ছোট্ট নদী বন্দর। চাষীরা মাল নামাচ্ছে-ফরেরা নৌকা থেকে মাল নামা মাত্র হাঁকডাক করছে নিলামে সেগুলি তক্ষুনি কিনে নেবে।

আমি তখন ঘোরে মধ্যে। করিমপুরে আমার বাড়ির সামনে খড়ে নদী-সামনে বক্সীপুরের ঘাট। নদীটা তখনো বেঁচে- কত নৌকার আনাগোনা। কতদিন গেছে বই খুলে শুধু নদীর সামনে তাকিয়ে নৌকা থেকে মাল ওঠা নামা দেখেই কাটিয়ে দিয়েছে আমার ভাবুক কৈশোর।  একজন লেখক -যে ভারতীয়ও না-জন্মেছে আমার দেড়শো বছর আগে কত দূরে রাশিয়াতে-সে যে আমার শৈশবকে ওমন নিঃখুত ভাবে টাচ করে যাবে-এসব কোনদিন কল্পনাতেও ছিল না।

 ওই যে চেকভ থেকে শুরু হল-আস্তে আস্তে গোর্কি, টলস্টয়, ডস্টভয়েস্কি সব কিছুতেই ডুব দিতে থাকলাম। রাশিয়ান সাহিত্য ছাড়াও  ইটালিয়ান, জার্মান, ল্যাটিন সাহিত্যে হাতখড়ি হল। ইটালিয়ান লেখক আলবার্টো মোরাভিয়া বিরাট ভালো লেগে গেল। কাফকার মেটামরফোসিস সম্পূর্ন অন্য অভিজ্ঞতা। ওক্টোভিও পাজ এবং পাবলো নেরুদার লেখাতে অন্য স্বাদ। আবার স্ক্যান্ডেনেভিয়ান সাহিত্যর গভীরতা মনোমুগ্ধকর । ইবসেন, হামসান, গুস্টাফ ফ্রডিং এরা অন্য জগতের বাসিন্দা। নো ওয়ান্ডার স্ক্যান্ডেনেভিয়ান সাহিত্য সব থেকে বেশী নোবেল প্রাইজ পেয়েছে।

 ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত ফিজিক্সটাও মোটামুটি সিরিয়াসলি পড়ছিলাম। ব্যাচের বাকী সবাই এর মতন জি এর ই, টোয়েফেল দিয়ে পি এই চ ডি করতে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়-এই ছিল আমাদের বিশ্ববিভূবন।

 যদ্দিন ফিজিক্স পড়তে হয়েছে, মাথা তাও ঠিক ছিল। আমাদের ব্যাচটাও ছিল খুব ভাল। আমার ডিপার্টমেন্টের ব্যাচমেটদের প্রায় সবাই আমেরিকা বা ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত নামকরা ডাকসাইটে অধ্যাপক এখন। নিজেদের মধ্যে নানান বিষয়ের চর্চা ছিল ব্যপক। ফিজিক্স পড়ার ওই একটা পজিটিভ সাইড-ব্যাচমেটরা ছিল বিজ্ঞানের জন্য ডেডিকেডেড প্রাণ।

   কিন্ত যেই আমেরিকা যাওয়ার সময় এগিয়ে আসে- ফাইনাল ইয়ার থেকে বিজ্ঞান চর্চা বাদ দিয়ে জি আর ই তে পারফেক্ট স্কোরের পেছনে ছুটতে হল, কিছুতেই ফোকাস করতে পারলাম না।  কোন ইন্টারেস্ট পেলাম না।

 ফাইনাল ইয়ারে- সব বিষয়ে ইন্টারেস্ট হারিয়ে  ঝেঁটিয়ে বিশ্বসাহিত্যের নেশায় পেয়ে বসল। জি আর ই র দুদিন আগেও আমি চুটিয়ে ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট পড়ছি। আমেরিকা, ফিজিক্সের নেশা গেছে কেটে।  এক অদ্ভুত ঘোরের দুনিয়ায়  কাটিয়েছি ফাইনাল ইয়ারে। ইনফ্যাক্ট আমি তখন ঠিক করেই ফেলেছি-আর নিজেকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। ইনকাম করাটা ফ্যাক্টর না-যেহেতু আই আই টি জেইই এর জন্য ফিজিক্স এবং ম্যাথ আমি পড়াতাম।  আই আই টির টিউটোরিয়াল গুলোতে পড়ালে, ইঞ্জিনিয়ারিং এর থেকেও বেশী ইনকাম।  ফলে আরো সাহিত্যের নেশা পেয়ে বসল। তবে আমি কিছু লিখছি না তখনো। শুধুই পড়ছি-আর প্রত্যেকটা লেখক এক অজানা অচেনা দুনিয়া খুলে দিচ্ছে।

    বাড়িতে জানালাম-আমি আমেরিকাতেও যাচ্ছি না-পি এই চ ডিও করছি না। আই আই টির জন্য টিউটোরিয়াল খুলে পড়াব। কারন ও কাজটা আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকে করছি-আর ফালতু ঝামেলা করে কি হবে!  বাবা মা এসব শুনে ভীষন আপসেট।

  এমন সময় এস বি আই ব্যাঙ্কের কাউন্টারে প্রফেসার রঞ্জন গাঙ্গুলীর সাথে দেখা। উনি আমার বন্ধু সম্রাটের বাবা। টেলিকম ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক। বল্লেন -কোন ইউনিভার্সিটিতে পি এই চ ডি করতে যাচ্ছ!

 খাইছে কাজ। আসলেই আমি ওসব কিছু করছি না। করার ইচ্ছাও ছিল না। শুধু বল্লাম এখনো কিছু প্ল্যান করি নি।

 ফলে উনি বল্লেন উনার কাছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের একটা প্রজেক্ট আছে-যাতে অপটিক্স ভাল জানা একজন দরকার। টেলিকমটা উনি শিখিয়ে দেবেন।  অপটিকাল কমিনিউকেশন সেই ১৯৯৬ সালে উঠতি একটা ইঞ্জিনিয়ারিং এরিয়া- সর্বত্র ইন্টারনেট আসছে-আর অপটিক্যাল কমিউনিকেশন ছাড়া ইন্টারনেট সম্ভব না। ভাল ফিউচার।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্ল্যান ছিল না। কোন কালেই ছিল না। সাহিত্য চর্চার জন্য কোলকাতায় ফিরব। টিউশন করতে গেলেও থাকার একটা জায়গা চাই।   আই এই এস আই তে কম্পু সায়েন্সের এম টেকের এডমিশন টেস্টটা উতরে গেছি। ভাবছিলাম ওখানেই এডমিশন নিই।  এমন অবস্থায় স্যারের অফারটা নিয়ে ভাবলাম। মোদ্দা কথা যেটা টানল-এদ্দিন ফিজিক্স যা শিখেছি-তা ফেলে দিতে হবে না-আবার ফিজিক্স নিয়ে পি এই চ ডিও করতে হচ্ছে না-অপটিক্যাল কমিনিউকেশন সাবজেক্টটা তখন টপ গিয়ারে। আই আই টির হোষ্টেল ছাড়তে হচ্ছে না। আর টিউটোরিয়ালের জন্য হলদিয়ার মতন উঠতি টাউনশিপ থেকে অফার খোলা। ফলে সব ভেবে দেখলাম, খরগপুরেই থেকে যায়। সাহিত্যের বই টই ও এখানেই পাওয়া অনেক সহজ!

   পি এই চ ডি শুরুর প্রথম ছমাস কেটেছে রাজকীয়। শুধুমাত্র রোব্বারে আই আই টির জন্য পড়িয়ে, ফেলোশিপের থেকে তিনগুন ইনকাম । আর হাতে কাঁচা টাকা আসলে প্রেমিকাও জুটবে। ফলে প্রেমিকা, নাটক, কবিতা, টিউটোরিয়াল-ইত্যাদি নিয়ে রিসার্চের কাজ হয়ে গেল গৌন। আর স্যারও থাকতেন প্রজেক্টের কাজে ইটালিতে। ফলে প্রথম ছমাস প্রেম, প্রেমের কবিতা আর নাটকটাই হল বেশী।

  এবার ছমাস বাদে স্যার দেখলেন কাজ এগোয় নি। যেহেতু আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট-ছমাস অন্তর অন্তর লন্ডন,  ইটালির পার্মা শহর আর খরগপুরে মিটিং বসত- নিজেদের অগ্রগতি নিয়ে ডিটেলেসএ আলোচনা, আদন প্রদান ইত্যাদি। উনি বল্লেন এইভাবে কাজ করলে পি এই চ ডি ছেড়ে দাও। আমিও দেখলাম-বড্ড ফাঁকি মারছি। এখন যেভাবে লেখালেখি করি আর কি।

 তবে প্রেমিকাকে ত আর ছাড়া যায় না, বাকী এক্টিভিটি গুলোই ছাড়তে হল। বহুদিন বাদে আবার সিরিয়াসলি অঙ্ক, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে ব্যাক। পরবর্তী দুই বছরে আমি দুটো গুরুত্বপূর্ন কাজ করি-যার থেকে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পেপার হয়ে গেল সহজেই।  ইটালিয়ান কাউন্টারপার্টরা বললো ওদের দেশে এসে পি এই চ ডির বাকী কাজ করতে। তবে সেটা হয় নি। কিন্ত ইটালিতে একটা কোম্পানী যারা আমার ফিল্ডেই সফটোয়ার বানাচ্ছিল-তারা ইন্টার্নশিপ দেয়। যেহেতু আমার নিজের ফিল্ডেই কাজ- ইটালির তুরিন শহরে চলে গেলাম ১৯৯৯ সালে। ওখানেই প্রথম ইন্ড্রাস্টি এক্সপোজার। বুঝালাম একাডেমিক্স এবং ইন্ডাস্ট্রি পুরো আলাদা। পি এই চডির শেষের কাজগুলো করি তুরিন শহরেই-তুরিন পলিটেকনিকের পাইরোলুইজি ছিলেন আমার লোক্যাল গাইড-এই লোকটা শুধু বিখ্যাতই না-মানুষ হিসাবেও ছিলেন অসাধারন।

 কিন্ত যা হয়-একটা ভাল পেশাদারি বৃত্তে ঢুকলে-চারিদিকে লোকজন ভীষন সিরিয়াস। দারুন সব কাজ করছে। ফলে তাল রাখতে নিজেকেও ফোকাসে রাখতে হয়। ফলে আস্তে আস্তে কবে সাহিত্যের নেশাটা ঘুচে গেছে টের পাই নি। আসলে তখন অপটিক্যাল কম্যুনিকেশনে বিশাল ইনভেস্টমেন্ট-বিরাট সম্ভাবনা।  সিকামোর, সিয়েনা, করভিসের মতন কোম্পানীগুলো-কোনরকমে প্রযুক্তি বার করে একটা ফিল্ড ট্রায়াল দিয়েই বিলিয়ানার হতে শুরু করে। আর যেখানে টাকা সেখানে প্রতিযোগিতাও  তীব্র।

 পি এই চ ডি শেষ করার আগেই আমেরিকাতে দুটো চাকরি পেলাম। দুটোই সিক্স ডিজিট স্যালারি। আমাদের সময় ইন্ডিয়াতে পি এই চ ডি করে এসব ভাবা যেত না। এখন অবশ্য গুগলে বিটেকের ছেলেরাও ওই ধরনের অফার পাচ্ছে।  আমাদের ফিল্ডে প্রচুর টাকা- ব্যাঙের ছাতার মতন স্টার্টাপ-কিন্ত ট্রেইন্ড লোক নেই।  এবং প্রত্যেকের দাবী পরের দিন যোগ দিতে হবে। যাইহোক, আমি থিসিস সাবমিট করে পরের দিন বিয়ে করি। সেই দিন রাতেই আমেরিকার প্লেনে।

    ভাববেন না উপন্যাস লিখছি। তখন সবাই টেলিকম স্টার্টাপ খুলে ভাবছে মিলিয়ানার বিলিয়ানার হবে। অনেকে হয়েও গেছে। আমি ইটালির আর্টিস কোম্পানীটার হয়ে যাদের জন্য সিমুলেশন মডেলিং করতাম-তাদের অনেকেই আমেরিকান স্টার্টাপ এবং স্টকঅপশনে মিলিয়ানার । আমি তখন অন্য ঘোরের জগতে। ভাবছি এরা যদি আমেরিকান স্বর্গরাজ্যে মিলিয়ান কামাতে পারে স্টার্টাপে-আমিও পারি!! ফলে রেজিস্ট্রি বিয়েটা সেরে, সেই রাতেই আমেরিকান স্টার্টাপে দৌঁড়  ইস্টকোষ্টে ফেব্রুয়ারী মাসের ঠান্ডায়।

    তখন কোথায় সাহিত্য! সপ্তাহে সাতদিনই খাটি।  বারো থেকে চোদ্দঘন্টা। আশা আগামী বছরেই স্টার্টাপটা কেউ কিনে নেবে বা আই পি ও হবে। ইনফ্যাক্ট একদম প্রথম দিকের কর্মী হওয়াতে প্রচুর স্টক অপশন ছিল আমার। সাকসেসফুল হলেই লটারী টিকিট-কয়েকশোকোটি টাকার স্বপ্ন ।  আর সেই  লোভে প্রচুর গাধার খাটুনি।

   ঘোর ভাংল ২০০২ সালেই। কোম্পানীর অর্ধেক লোক ছাঁটাই-কারন সেকেন্ড রাউন্ড ইনভেস্টমেন্ট তুলতে পারল না।  তখন সব টেলিকম স্টক গাধার ঘারে। মোহভঙ্গের বৃত্ত সম্পূর্ন হয় ২০০৩ সালের এপ্রিলে।  আমাদের কোম্পানিটা সেকেন্ড রাউন্ডের অভাবে ভেরাইজনে ট্রায়ালে যেতে পারল না। মিলিয়ান ডলার দিয়ে যেসব সুইচ বানানো হয়েছিল-সেসব লোকেরা খুলে নিয়ে চলে গেল! কি অদ্ভুত ঘটনা। একেকটা অপ্টিক্যাল আমপ্লিফ্যায়ারের দাম দশ বিশ লাখের ওপরে। বেমালুম যে যা পারছে খুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে।  আমি অবশ্য দুটো সিস্টেম তুলে নিয়ে গিয়ে আই আই টি চেন্নাইকে দান করে দিয়েছিলাম। এত খেটে যেগুলো বানিয়েছি-অন্তত কিছু ছাত্ররা তার থেকে উপকার পাক।

 দুশো কোটি টাকা দিয়ে বানানো একটা সিস্টেম লোকে আস্তে আস্তে খুলে নিয়ে যাচ্ছে-ওই দৃশ্য কোনদিন ভুলবো না। ক্যাপিটালিজম কত নিষ্ঠুর হতে পারে -তার ফার্স্টহ্যান্ড অভিজ্ঞতা। ওটাত শুধু দুশোকোটি টাকার গল্প না- গত দুই বছরে আমি এবং আমার চল্লিশজন কলিগের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে গড়ে উঠেছিল সেটা। রাত চারটে পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করতাম কজনে মিলে।  ওটাই ছিল আমাদের কোটি কোটি টাকার স্বপ্নের সৌধ। একদিনে  দুঘন্টায় সব শেষ। আমি যেন উপনিষদের গল্পের নারদ। নারায়ণ আমাকে দেখাচ্ছেন-একদিন আমি সম্রাট -পরের দিন  যুদ্ধে হেরে হঠাৎ ভিখিরি-সবটাই স্বপ্নে।   " মায়া" কি বস্তু-সেই শিক্ষা দিতে নারদকে স্বপ্নের জগতের সম্রাট বানিয়েছিলেন নারায়ন।

বুঝলাম ধণতন্ত্রে সবই মায়া।  আবেগ, প্যাশন এসব থাকা ভাল-কিন্ত শেষ কথা বলবে মার্কেট। ধণতন্ত্র আসলেই জঙ্গল। শিকার উঠতেও পারে। আবার শিকার করতে গিয়ে জঙ্গলের নিয়মে লাশ হওয়াটাও বিচিত্র না।

                                                                 (৪)
 ভগ্ন হৃদয়ে নতুন চাকরি নিয়ে আসি ক্যালিফোর্নিয়াতে ২০০৩ সালের শেষে। ক্যালিফোর্নিয়া স্বর্গরাজ্য। প্রকৃত অর্থেই। তখন আর মিলিয়ান বিলিয়ানের স্বপ্ন দেখি না। বহুদিন গান সাহিত্য প্রকৃতি কোন কিছুই উপভোগ করি্নি। স্টার্টাপ আসলে প্রেসারকুকার । ওখানে শুধু সিদ্ধ হয়েছি।

   নতুন চাকরিটা সেই সুযোগ করে দিল। চাকরি সূত্রে গোটা ক্যালিফোর্নিয়া ঘুরতে হত। ফলে কোম্পানীর পয়সায় ঘোরার এলাহি সুযোগ।  ক্যালিফোর্নিয়া এমন এক রাজ্য-যার প্রতিটা কর্নারে আমি ঘুরেছি কর্মসূত্রে।  ক্যালিফোর্নিয়ার অপার সৌন্দর্য্য এবং আবহাওয়াতে আবার একটু একটু করে নিজেকে ফিরে পাচ্ছিলাম।

 জীবনের এই সন্ধিক্ষণে অভিজিত রায় এর সাথে অনলাইনে দেখা। আসলে বড় কোম্পানী-প্রায় মনোপলি-প্রচুর লাভ-কাজের চাপ কম-হাতে অঢেল সময়-বৌ দেশে গেছে মাস্টার্স কমপ্লিট করতে-এমন সুলুক্ষুনে সময়ে আমার জীবনে এল অভি।  দেখলাম ছেলেটা অনলাইনে লড়ে যাচ্ছে। কখনো ইসলামের বিরুদ্ধে, কখনো কমিনিউস্টদের বিরুদ্ধে, কখনো হিন্দুত্ববাদিদের বিরুদ্ধে। ওদের একটা ছোট ওয়েব সাইট ও আছে।

 ১৯৯১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে ২০০৪ সালে অভির সাথে দেখা হওয়ার আগে কবার বাংলা লিখেছি -বোধ হয় হাতে গুনতে পারি। সেই পি এই চ ডির প্রথম বছরে যে নাটক লিখেছিলাম-সেটাই আমার শেষ লেখা। এরপরে দীর্ঘ আট বছর বাংলায় একটা শব্দও লিখি নি। বাংলা সফটোয়ার গুলো বিধঘুটে লাগত। ফলে মুক্তমনাতে প্রথম বছরে ইংরেজিতেই লিখতাম।  অভি আমাকে বর্নসফট বলে একটা সফটোয়ার দিল। বললো ওটাতে চেষ্টা করে দেখ।

 ফ্রাংকলি স্পিকিং আমি ভাবিও নি-এত দীর্ঘদিনের অনভ্যাস কাটিয়ে কি করে বাংলায় লিখব। আদৌ লিখতে পারব কি না। দেখলাম লিখতে পারছি। কিন্ত বানানের বাবা মা এক করে দিয়েছি । অভিকে বল্লাম এই অবস্থা। ও বললো-আরে ছাড় ত-বাংলায় আমরা লিখছি-এটাই আসল কথা। সোশ্যাল মিডিয়াতে যারা বানানের খুঁত ধরে তাদের ধান্দা অন্য। যাদের মধ্যে জ্ঞান পিপাসা আছে, তারা নিশ্চয় পড়বে। এইভাবে আমার বানান ভুলে ভরা একটা প্রবন্ধ ও মুক্তমনা সাইটে ছেপে দিল।

 ব্যস সেই শুরু। বানানের চাপ নেই দেখে, প্রাণ খুলে লিখতে লাগলাম। তখন হাতে সময় ছিল- ফলে অনেক পড়াশুনো করে পি ডি এফ গুলো নামাতাম। বানান ভুল থাকত। তবে এখনকার মতন ফাঁকিবাজি ছিল না। ইনফ্যাক্ট ২০০৫-২০০৬ পর্যন্ত মুক্তমনাতে সব থেকে বেশী লিখেছি আমি। অভির থেকেও অনেক বেশী। ও ঠাট্টা করে বলত তুমিই মুক্তমনা চালাচ্ছ। ওর ওটা পি এই চ ডি শেষ করার বছর। ও খুব একটা বেশী লিখত না তখন পি এই চ ডি শেষ করার চাপে। আমাকেই লিখতে বলত নানান ইস্যুতে।

  এই সময় আরেকটা ঘটনা -জনাব কুদ্দুস খানের সাথে পরিচয়। উনি ক্যালিফোর্নিয়ার বাংলাদেশীদের জন্য ভিন্নমত নামে একটা পাক্ষিক প্রিন্ট ম্যাগাজিন চালাতেন। একটা ওয়েব এডিশন ও ছিল। ২০০৫ সালের সেপটেম্বর মাসে উনি প্রস্তাব দিলেন চল দুজনে মিলে এটা চালায়-আরো বড় করি। তখন বাংলা লেখার এক বছর পূর্ন হয়েছে-ভরপুর কনফিডেন্স -আমিও লিখতে পারি।  ফলে আমরা দুজনে মিলে ভিন্নমতকে ভারতীয় বাঙালী এবং বাংলাদেশীদের জন্য পাক্ষিক ম্যাগাজিন হিসাবে গড়ে তুলি। ক্যালিফোর্নিয়া, এরিজোনা এবং নেভাদার প্রতিটা বাঙালী গ্রসারি স্টোরেই পাওয়া যেত। ৩২ পাতার নিউজ ট্যাবলয়েড। কুড়ি পাতার বিজ্ঞাপন -সব বাংলাদেশ গ্রসারীর। তিন হাজার কপি ছাপাতাম।  লাভ হত না। আবার লস ও হত না।

এ এক বিরল অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ কমিউনিটিকে ক্লোজ থেকে জানার। আমি দেখেছি বেশ কিছু বাংলাদেশী মুদিখানার দোকানী এবং রিয়াল এস্টেটের এজেন্ট সাধ্যের বাইরে গিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাহায্য করেছেন-যে প্রবাসে একটা বাঙালী নিউজ পেপার টিকে থাকুক। আবার লস এঞ্জেলেসের বাংলাদেশী মসজিদে ভিন্নমত ম্যাগাজিন পোড়ানো হয়েছে,  মহম্মদ আসগার কোরান নিয়ে প্রশ্ন তোলায়।

সব বিজ্ঞাপন আসত বাংলাদেশীদের কাছ থেকে। ফলে প্রশ্ন উঠল-তাহলে পশ্চিম বঙ্গ বা ভারতের জন্য ৫০% পেজ ছাড়া হবে কেন? ভারতীয় বাঙালীরাত সব চাকরিজীবি।  জনাব খান হাই হাই করে উঠলেন। বল্লেন আরে ওটাই ত ইউ এস পি। আমাদের প্রতিযোগী ছিল নিউয়ার্ক থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী ম্যাগাজিন ঠিকানা। তারা ১০০% বাংলাদেশী ফোকাস। ১০,০০০ সার্কুলেশন।  কিন্ত আমাদের যারা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, সেই বাংলাদেশী গ্রসারদের কাস্টমার আবার ভারতীয় বাঙালীরা। তারা ত চাইছে এমন পেপার যা দুই দিকের বাঙালীদের কাছেই যাক।

আমি সেই দিন বুঝেছিলাম একমাত্র মার্কেটই পারে জাতি ধর্মকে মেশাতে! ব্যবসার একমাত্র জ্ঞাতি, জাতি, ধর্ম হচ্ছে কাস্টমার।

ইনফ্যাক্ট সেখান থেকেই আমার সখের জার্নালিজমের শুরু। সম্পাদকের নেশা বড় নেশা।  বাংলাদেশীদের মধ্যে আমি অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠি। আসলে ওরা হিন্দু বলতে বুঝত-রক্ষণশীল কিছু লোক-যারা বাংলাদেশী মুসলমানদের সামনে চুপসে থাকে-পেছনে গালি দেয়-গরু খায় না। সব বাংলাদেশী প্রোগ্রামে আমার আমন্ত্রন ছিল-এগুলো কভার করার কথা ছিল কুদ্দুস ভাই এর। কিন্ত উনি বল্লেন, এদের মধ্যে এত দলাদলি-আমি লিখলে সমস্যা আছে। তুমি বাইরের লোক। তোমার রিপোর্টিং হবে সেফ। সম্পাদক হিসাবে খাতির, পার্টি-খাওয়া দাওয়া-বৌদিদের কাছে এক্সেস। তাদের আবদার যেন তাদের সেরা ফটোটা যায় ম্যাগাজিনে।  এসব বৌদি সুন্দরীদের মধুময়ী হাঁসি কি আর স্টার্টাপ করে পাওয়া যায়?  বৌদিদের জীবনের চাইচাপা যৌবনের আগুন সম্পাদক না হলে থোরিই না বুঝতাম!

সত্যিই এ এক অন্য জীবন। করিমপুর ছাড়ার পর থেকে একাডেমিক এলিটদের আশেপাশেই জীবন কেটেছে। আবার ব্যাক টু নর্মাল।

 তবে আসল যে শিক্ষাটা পেলাম সেটা হচ্ছে এই যে মুসলমান -হিন্দু সম্প্রদায়ের মিলন সম্ভব। কিন্ত দুটো সম্প্রদায়ের লোকজনকেই উদার হতে হবে। আমেরিকাতে আমার অধিকাংশ বন্ধুই কিন্ত বাংলাদেশী মুসলমান।

 কুদ্দুস খানে স্ত্রীর অসুস্থতা শুরু হলে নানান কারনে ভিন্নমত চালানো কঠিন হয়ে ওঠে। উনিই ছিলেন আসল কম্পোজার। আমার বানান আর বাংলা উনিই ঠিক করে দিতেন। তাছারা আমি আস্তে আস্তে অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিনেই মন দেওয়া শুরু করি। আমার মনে হয়েছিল প্রবাসে প্রিন্টের ভবিষ্যত নেই।

                                                       (৫)

মিডিয়া এমন ভাবে আমাকে টানতে থাকল, মিডিয়া প্রযুক্তি আরো ভাল করে শেখার জন্য ২০০৭ সালে হলিউডের একটা স্টার্টাপে যোগ দিই। বারবাঙ্কে ডিজনি স্টুডিওর পাশেই ছিল আমাদের অফিস। প্রযুক্তিবিদ হিসাবেই কাজে যোগ দিয়েছিলাম। এখানে প্রথম ভিডিও অডীও এডিটিং শিখি ভাসা ভাসা। কাজ করতাম সেই প্রযুক্তিবিদ হিসাবে-কিন্ত কাজের ফাঁকে ফাঁকে এডিটরদের লাঞ্চ খাইয়ে শেখার চেষ্টার করতাম। যার ফলশ্রুতি ইউটিউবে আমার আমেচ্যার ভিডিও ব্লগিং।  একই সাথে আমি দুটি মিডিয়া স্টার্টাপ খুলি। একটা বিনোদন টিভি-যেটা বাংলা সিনেমা স্ট্রিমিং এর জন্য। অন্যটা ফসাক টিভি-ভারতীয়দের জন্য ইন্টারনেট টিভি। প্রথমটা তিনমাস বাদেই বন্ধ করে দিতে হয়-কারন সেই সময় বাংলা সিনেমার ইন্টারনেট ডিস্ট্রিবিউশন রাইট বলে কিছু ছিল না। ফলে মুভি চাইতে গেলে লোক এবসার্ড টাকা চাইত। যেটা কোন বিজনেস মডেলই হতে পারে না।তাছাড়া ইউটিউবে সব পাইরেটেড মুভি পাওয়া  যেত। ফলে ওই স্টার্টাপের কোন ভবিষ্যত ছিল না। আমি এবং জনাব খান, প্রচুর টাকা লস করে মাস তিনেকের মধ্যেই বন্ধ করে দিই।


ফসাক টিভির ভাল ফাইন্সান্সিয়াল ব্যাকাপ ছিল প্রথমে।  ভারতীয় ধনী ব্যবসায়ীর অভাব নেই দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়াতে। তারা বিজ্ঞাপন, টাকা নিয়ে সাপোর্ট করতে এগিয়ে এসেছিল। মূল প্যাট্রন ছিলেন একজন দক্ষিন ভারতীয় হেজ ফান্ড ম্যানেজার। ২০০৮ এর রিশেশন শুরু হতে সব ব্যবসায়ীরা এত লস করা শুরু করল- সব স্পনসর গায়েব। ফলে ফসাক টিভি বন্ধ করা ছাড়া উপায় ছিল না।

 ২০০৮ এর রিশেসন শুরু হয় ২০০৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে। হলিউডের স্টার্টাপটাও রাউন্ড টু ফান্ডিং পাবে না এটাও বুঝে গেছিলাম। ফসাক টিভির স্পন্সরদের বিজনেসে ভরাডুবি।   নতুন চাকরিতে জয়েন করা ছাড়া আমার উপায় ছিল না।

 এই ভাবেই মেরীল্যান্ডের সিয়েনাতে চলে আসি ২০০৮ সালের প্রথমে। সেই রিশেশনের বাজার অত ভাল অফার ফেরানো সম্ভব ছিল না।

ইনফ্যাক্ট সিয়েনা আমাদের লাইনে টপ কোম্পানী। এখানে আর এন্ডিতে যোগ দিয়ে আবার বিজ্ঞান প্রযুক্তির কাজে মন দেওয়ার সুযোগ পেলাম বহুদিন বাদে।  হাতে লেখার সময় ও এল কিছুটা। ২০০৬-২০০৭ এ লিখেছি খুব অল্প। সিয়েনাতে যোগ দেওয়ার পরে আবার লেখালেখির সেকেন্ড ফেজ শুরু।

কিন্ত ধণতন্ত্রে কি কোন কিছুর নিশ্চয়তা আছে? সিয়েনাতে বেশ ভাল চলছে-প্রমোশন পেয়ে হায়েস্ট ইন্ডিভিজ্যুয়াল র‍্যাঙ্কে পৌছে গিয়েছি -সব চেয়ে জটিল নেটওয়ার্ক ডিজাইনের কাজ আমার কাছেই আসত।  এমন সময় সিয়েনা কিনে বসল নর্টেলের লসে চলা অপটিক্যাল নেটোয়ার্ক ডিভিশনকে। যার কর্মী সংখ্যা সিয়েনার তিনগুন। হেলেসাপের খোরগোশ খাওয়ার গল্প। তখন থেকে আমরা সবাই জানতাম এক বা দুবছর বাদে মেরীল্যান্ডে আমাদের আর এন্ডি আর থাকবে না।

     সামনে দুটো অপশন । চাকরি চেঞ্জ বা নিজেই স্টার্টাপ খোলা। আমি অন্য চাকরি পেলাম-সিয়েনারা প্রতিযোগী কোম্পানী চিনের হুয়েই এর কাছ থেকে। ওরা অনেক বেশী টাকা দিয়ে ডাকল টেক্সাসে। ইনফ্যাক্ট হুয়েই আমেরিকার সিটিও আমার প্রাত্তন বস।  অফার পেয়ে একবার ভাবলাম। এইভাবে ধণতন্ত্রের বোরে হয়ে আর কতদিন?  বয়স তখন আটত্রিশ। কদ্দিন আর ভলি বলের মতন এ কোর্ট থেকে ওই কোর্ট? এটা কি জীবন হতে পারে? কর্পরেট লাইফের অন্তসার শুন্যতায় বেশ ক্লান্ত -অথচ কি করবো ঠিক নেই।

ধনতন্ত্রই যখন সমস্যার কারন-হাতের সামনে দুটো অপশন থাকে। ধণতন্ত্রকেই সমাধান হিসাবে ব্যবহার করা। অথবা ধণতন্ত্রকে গালি দিয়ে বামেদের দলে নাম লিখিয়ে এক্টিভিস্ট হওয়া। ক্যাপিটালিজমের জন্যই আমার জীবনের সব দুর্দশা-কারন দাবার বোর্ডে রাজা মন্ত্রী হয়েও লাভ নেই। যে খেলছে সে ভুল খেললে পতন কেউ আটকাতে পারবে না। ফলে ধনতন্ত্রে খেলোয়ার হতে হবে-গুটি হয়ে লাভ নেই। আমার কাছে সেটাই সমাধান। ফলে ধনতন্ত্রকেই আমি ব্যবহার করছি, উত্তোরনে জন্য।

দুহাজার বারোসালের জানুয়ারী মাসে সিয়েনা মেরিল্যান্ডের আর এন্ডি সেন্টার প্রায় তুলে দেয়। ওই দিন আসবে আগেই জানতাম। তার  এক বছর আগে থেকেই প্রথম বিজনেসটা দাঁড় করিয়েছি। ইনফ্যাক্ট তখনই বিজনেস থেকে সংসার চালানোর টাকা আসছে। ফলে চাকরি খোঁজার প্রয়োজন হল না। যদিও ওটাই আমার জীবনের সব থেকে সাহসী সিদ্ধান্ত। তবে সাফল্য আসবে জানতাম। ইন্ড্রাস্টিয়াল সেন্সর মার্কেট চিনি তালুর মতন। ওই  মার্কেটে একটা আউটসোর্সিং মডেল দাঁড় করাতে পারবো সেই বিশ্বাস ছিল।

                                               (৬)

ব্যবসার প্রথম আড়াই বছর মোটেও ভাল কাটে নি। ভুলভাল পার্টনার, কাস্টমার, স্ট্রাটেজি, যথেষ্ট পুঁজি নেই-অনেক কিছু নিয়ে ভুগেছি। আস্তে আস্তে ভুলভাল পার্টনার সরিয়ে, ঠিক ঠাক কাস্টমার এবং ইনভেস্টর পেতে আমার বছর আড়াই লেগেছে।  ২০১৪ সালের আগস্টের পরে অবশ্য আমাকে ফিরে তাকাতে হয় নি।  ইনফ্যাক্ট ২০১৫ আমার সেরা বছর । এই বছরেই সেক্টর ফাইভে দুটো দুহাজার স্কোয়ার ফিটের অফিস, ব্যাঙ্গালোরে দুহাজার স্কোয়ার ফিটের অফিস এবং জয়পুরে আরেকটা অফিস খুলেছি আমরা। হেড কাউন্ট পৌঁছেছে চল্লিশে। সবচেয়ে আনন্দের কথা আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা এ বছর প্রায় বারোটা ইউ এস পেটেন্ট ফাইল করেছে।  রেভিনিউ বেড়েছে তিনগুন।  আশা করছি ২০১৬ তেও একই গতি বজায় রেখে হেড কাউন্ট একশো ছাড়াবে।

 কিন্ত এতকিছু ত এমনি এমনি হয় নি। এই বছর একটা দিনের জন্যও ছুটি নিই নি। কোথাও বেড়াতেও যায় নি। আমার কোন শনি রবিবার নেই। রিক্রিয়েশন বলতে মাঝে সাঝে একটু ঝাঁট জ্বালানো বাংলা লিখি। একদম ফ্রি মাইন্ডে। বানানের চাপ নেই।

আগে অনেক কিছু পড়াশোনা করে, গবেষনা করে লিখতাম। ইনফ্যাক্ট রাজনৈতিক নেতা না অভিনেতা সিরিজটা লেখার জন্য অনেক কিছু রিসার্চ করেছি। কিন্ত লেখার সময় নেই। কাজের ফাঁকে, কনফারেন্সের ফাঁকে দুচার লাইন লিখে হাল্কা হওয়া।  বছরে শ দুয়েক সিনেমা বা ডকু ফিল্ম দেখার অভ্যেস। এবছর চারটে ভালো সিনেমা দেখেছি কি না মনে নেই।  কিছু পেতে গেলে কিছু হারতে হবে-এটাই মহাজাগতিক নিয়ম।

 এর মধ্যেই ২০১৫ সালে অভিকে হারানো। সাথে আরো পাঁচজন সহব্লগার।  দুঃখ ক্ষোপ আক্ষেপ সব ঢাকা পরে যায় কাজের চাপে। অভিকে খুব মিস করি। বাঙালীদের মধ্যে সত্যিকারের মুক্তমনের ত কেউ নেই যার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। ২০১৬ সালের রং মশালগুলোর মধ্যে কোথাও না কোন অদৃশ অন্ধকার।









 

   










Friday, December 25, 2015

ক্রীসমাস ও পাপার গল্প

আমাদের গ্রামের দিকে নব্বই এর দশকে ক্রীসমাস বলতে কিছু ছিল না। একটা দিন ছুটি। রাস্তায় সারি সারি কেকের পসার। হলদে কাহজে মোরা -সস্তা কেক। কেক ফেক গ্রামের দিকে অন্য কোনদিন কেউ খেত না। শুধু জানত ওটা বড়দিনের ডেলিকেসি। আমাদের করিমপুরে আবার কোন চার্চ ও ছিল না। কাছাকাছি চার্চ বলতে চাপড়া-না হলে কৃষ্ণনগরে । কৃষ্ণনগরে অবশ্য খুব ঘটা করে বড় দিন হত।

খ্রীষ্ঠান ইভ্যাঞ্জেলিক্যালরা মাঝে মাঝে আসত বড়দিনে। রাস্তার মোরে প্রোজেক্টর ফেলে যীশুর সিনেমা দেখাত।

বড়দিন প্রথম বিরাট আকারে পালন করি নরেন্দ্রপুরে এসে-ক্লাস ইলেভেনে। এই দিনটাই স্পেশাল খাওয়া দাওয়া, বাইবেল থেকে পাঠ হত।  মহারাজরা যীশুর বানী নিয়ে গুরু গম্ভীর আলোচনা করতেন। সেটা শেষ হলেই অবশ্য প্রাচীর ডিঙিয়ে এক্স রেটেড সিনেমা বা প্রফেসার কোয়ার্টারে ঝাড়ি মারত সদ্য গোঁফ ওঠা ছাত্রদের দল।

 আমার সেরা ক্রীসমাস  ১৯৯৯ সালে ইটালিতে। তুরিন শহরে।  ওই সময় একটা ক্যাথোলিক হোস্টেলে থাকতাম । দক্ষিন ইটালী থেকে আসা  পলিটেকনিক ডি তুরিনোর ছেলে মেয়েরাই মূল বাসিন্দা। কোয়েড হোস্টেল-কিন্ত ছেলে মেয়েদের জন্য আলাদা বিল্ডিং।  ইটালিয়ান কিছু বুঝি না। কিন্ত ওই দিন হোস্টেলেরই বিরাট চার্চে বিরাট উৎসব। ভালো ভালো ইটালিয়ান ওয়াইন।  মিউজিক, ওর্কেস্ট্রা-ওপেরা। না জানি ইটালিয়ান, না মিউজিক--

এমন অবস্থায় সুন্দরী ইটালিয়ান মেয়েগুলোকে দেখে ঝাড়ি মারা ছাড়া আর  সময় কাটানোর বিকল্প নেই। সাথে টুক টুক করে ওয়াইন, নাও, খাও।

 রাত বারোটার সময় হোস্টেলের ওয়ার্ডেন-যিনি নিজেও পাদ্রী-তিনি এবং আমি দুজনেই প্রচুর ওয়াইন খেয়ে আউট। তিনি যীশুর দুঃখে, আমি ভাল মাল খাওয়ার আনন্দে। উনার পাশেই ছিল আমার রুম। তারপরেই শুরু হত মেয়েদের উইং। মেয়ে গুলোকে ওই অফিসের সামনে দিয়ে হেঁটে ঘরে ঢুকতে হোত।

 উনি আমাকে ডাকলেন-পুরো আউট। বোঝাচ্ছেন

-এই জন্যেই আমি খৃষ্ট ধর্মে। মাল খাওয়ায় বাধা নেই। ইসলামে বা তোমাদের হিন্দু ধর্মে এই সুযোগ নেই-

বলে খ্যাঁক খ্যাঁক উচ্ছাস।

 আমি বল্লাম
 -পাপা ( ফাদারকে ইটালিয়ানে পাপা বলে ), হিন্দু ধর্মেও সন্ন্যাসীদের ওয়াইন খাওয়াতে বাধা ছিল না। উদাহরন ঋকবেদ।  কিন্ত গরম ওয়েদার ত- মাল খেয়েই মাগীদের পেছনে ছুটে সব কেলেঙ্কারী বাধাত। ফলে আস্তে আস্তে হিন্দু সন্ন্যাসীরা নির্জলা নীরস হতে থাকে।
 এমন বড় দিনের ঠান্ডায় খেলে, ঠিক হজম করে ফেলত!

 হোস্টেলের মেয়েগুলো তখন টসকাতে, টলকাতে টলকাতে পাপার অফিসের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা দুজনেই ফ্যালফেলে চোখে তাকিয়ে।