Saturday, October 10, 2009

ওবামাকে নোবেল শান্তি পুরষ্কার-কমিটিকে তিরষ্কার করবে কে?

ওবামা যখন পৃথিবীর সর্বাধিক শক্তিশালী মসনদটিতে আসীন হইয়াছিলেন, আমাদিগের ন্যায় বাদামী হইতে কালো চামড়ার জনসমুদয় আহ্লাদিত হৃদয়ে মহামানবকে গ্রহণ করিয়াছিলাম। সাদা রঙের আধিপত্য শেষ হইবার মহেন্দ্রক্ষন উপস্থিত -উপরি পাওনা, তিনি বিশ্বে শান্তি স্থাপন করিবার আপ্রান চেষ্ঠা চালাইবেন এবং আমেরিকা অর্থনৈতিক মন্দা হইতে উদ্ধার পাইয়া হাডসন নদীর সীলগুলির ন্যায় ডাও জোন্সে ওঠা-নামা করিবে এমন দিব্যভ্রমে দিন গুজরান হইতেছিল।

সহসা প্রত্যুষে খবর পাইলাম ওবামা নোবেল শান্তি প্রাইজে ভূষিত হইয়াছেন! ভিরমি খাই নাই। যে শান্তি প্রাইজ মহত্মা গান্ধীর ও অধরা এবং হেনরি কিসিঞ্জিরারের ন্যায় যুদ্ধাপরাধিদের শোভামাল্য-তাহা কে পাইবেন বা কে পাইবেন না, ইহা লইয়া ইহকালে মাথাব্যাথা করিব- মেগাপ্যাস্কেল মিডিয়া উর্দ্ধচাপেও এমন বৃহৎ আহাম্মকি অসম্ভব। আমি কূপিত হইতেছিলাম এই সনের পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজেতা চার্লস কাওএর দুর্ভাগ্যে। বেচারী ১৯৭৮ সালে অপটিক্যাল ফাইবার আবিস্কার করিয়াছিল-ইহার পর টানা ৩১ টি শরৎকাল অতিবাহিত করিয়া নোবেল কমিটি বুঝিলেন, অপটিক্যাল ফাইবার মানব সভ্যতার কল্যান সাধন করিতেছে! ব্যাবসায়ীরা অবশ্য বুঝিতে দেরী করেন নাই-১৯৯০ সন হইতেই টন টন ফাইবার ভুতলে গ্রথিত হইতেছিল-শুধু নোবেল কমিটির দক্ষুদোয় হইতে ৩১ বৎসর লাগিল! ইহাই প্রথা হইলে কূপিত হইতাম না-কিন্ত ছয় মাস ধরিয়া গোটা ছয়েক ভাষন প্রদান করিয়া যদি কেও নোবেল শান্তি প্রাইজ পাইতে থাকেন, তাহা অপেক্ষা আমাদের পাড়ার ক্লাবের শারদীয়া পুরস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা বেশী হইবে, ইহা লইয়া সন্দেহ নাই!

ওবামা শান্তির জন্যে চেষ্টা চালাইতেছেন-ইহা অস্বীকার করিতেছি না! প্রশ্ন হইতেছে আমিও লেখনীর মাধ্যমে শান্তি প্রচেষ্টা চালাইতেছি-তাহা হইলে আমি নোবেল প্রাইজ হইতে বঞ্চিত হইব কেন? সাফল্য নাই বলিয়া? ওবামা কি সাফল্য পাইয়াছেন? ইরান বা ইস্রায়েলের যুদ্ধংদেহী রূপ কমিয়াছে? হামাস রকেট হানা বন্ধ করিয়াছে? ইস্রায়েল নতুন সেটলমেন্ট স্থগিত করিয়াছে? জাতি সংগে বোমা মারিয়া তালিবানরা শান্তির পথে হাঁটিতেছে? ইরাক হইতে কবে আমেরিকা সম্পূর্ণরূপে পালাইবে?
জনাব যুদ্ধ-মন্ত্রী রবার্টগেটের মন্ত্রনাই উনি আফগানিস্থানে আমেরিকান সেনা উপস্থিতি বাড়াইতেছেন। পাছে চীন কূপিত হয়, তাই উনি দলাই লামার সাথে দেখা করিতে পর্যন্ত অস্বীকার করিলেন! বস্তুত ওবামা শান্তির প্রচেষ্টার নামে যাহা করিতেছেন, তাহা হইল বাক্য সাজাইয়া ডায়ালোগবাজি। ইহাতে তালিবান, ইরান, হামাস, ইস্রায়েল-কাহারও কিছু বদলাইতেছে না-বদলাইবেও না। মিডিয়া ম্যাজিকের দৌলতে, ডুগডুগি বাজাইয়া ওবামা নামক মহামানবটি শান্তিজল ছিটাইতেছেন-কিন্ত শান্তি শান্তি ও শান্তি বলিয়া মন্ত্র উচ্চারনেই যদি শান্তি আসিত, আপামর হিন্দু পুরোহিতকূল নোবেল হইতে বঞ্চিত হইবেন কেন?

আলফ্রেড নোবেল জানিতেন শান্তিপুরষ্কারে রাজনীতি হইবে। তৎকালে নরওয়ে এবং ডেনমার্ক একটিই রাষ্ট্র ছিল এবং ডেনমার্ক বিদেশনীতি দেখিত। নোবেল শান্তি প্রাইজ, বিদেশনীতির কালো গহ্ববরে গড়াইতে পারে-ইহা তিনি বিলক্ষন জানিতেন। তাই উইলে লিখিয়াছিলেন নরওয়ের পার্লামেন্ট শান্তি পুরস্কারের সিদ্ধান্ত লইবে। ইহাতেও তিনি নোবেল শান্তি তরীটি বাঁচাইতে পারেন নাই-গান্ধী চারবার মনোনীত হইয়াছিলেন। কিন্ত একবারও নোবেল শান্তি প্রাইজ পান নাই-কারন বৃটিশদের ভয়ে নরওয়ের পার্লামেন্ট চাপিয়াছিল। গান্ধীকে শান্তি নোবেল প্রাইজ হইতে বঞ্চিত করিয়া -প্রাইজটি এমনিতেই খোরাকে পরিনত হইয়াছিল। ইহার পর কিসিঞ্জার বা আরাফতের ন্যায় যুদ্ধব্যাবসায়ী ( আরাফত লইয়া আমার কোন ভ্রুম নাই। বাঙ্গালীদের অনেকেই তাহাকে বিপ্লবী যোদ্ধা বলিয়া সন্মান করে। আমি অক্ষম। কারন যে ব্যাক্তি বিপ্লব ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নামে অস্ত্র স্মাগলিং করিয়া বিদেশে দুই বিলিয়ান ডলারের সম্পত্তি কামাইতে পারে-তাহার জন্যে যুদ্ধাপরাধীই সঠিক ্বিশেষন। ) যেদিন হইতে শান্তি প্রাইজ পাইতেছে, সেদিন হইতে নোবেল শান্তি পুরস্কার সম্পূর্ণ রূপে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইয়াছে। ডঃ ইউনুস অর্থনীতিতে নোবেল পাইলেই খুশী হইতাম-কারন এই খোরাক প্রাইজ তাহার যথাযোগ্য সন্মান নহে।

আপাতত মনে হইতেছে ওবামা খোরাকি উপহারটি না গ্রহন করিলেই ভাল করিবেন। ওবামা ওবামাই থাকুন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ন্যায় খোরাকি না গ্রহন করিলেই তাহার মর্যাদা বাড়িবে।


Tuesday, September 15, 2009

ধর্ম, অধর্ম ও রক্ষনশীল জীবন

(১)
গোকুর নাথ। না তিনি বাঙালী নন। ফ্লোরিডা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের ছাত্র ছিলেন- অতীতে নিজেকে র‌্যাশানালিস্ট বলে দাবী করতেন। গত দুই দশক ধরে ইস্কনের শিষ্য। আজ তিনি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কেন তিনি, ধর্মে বিশ্বাস হারিয়ে আবার ধর্মে ফিরে এলেন। এখানে আস্তিকতা বা নাস্তিকতা অপ্রাসঙ্গিক। কারন বৈষ্ণব ধর্ম ও এক ধরনের অদ্বৈতবাদ-তাই ঈশ্বর বিশ্বাস ফিরে পাওয়া কথাটা ব্যাবহার করাটা টেকনিক্যালি ভুল। কিন্তু ব্যাবহারিক দিক দিয়ে ঠিক।

আগে বাংলাদেশী ফোরামে কিছু ধার্মিকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। যারা এক সময়ে র‌্যাশানিলিস্ট ছিলেন, কিন্ত আবার ইসলামে আস্থা ফিরে পেয়েছেন। একাধিক উদাহরন আমি নিজেই দেখেছি।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞান ভিত্তিক, যুক্তি ভিত্তিক একটা জীবন শুরু করেও অনেকে আবার সেই ধর্মের কোলেই ফিরে যাচ্ছে। যুক্তিবাদ কি তাহলে অসার? প্রবীর ঘোষের সংঠন সেই মুষ্টিমেয় কজন। তার থেকে রাম-শ্যাম যদু মার্কা গুরুদের ও অনেক বেশী বড় সংগঠন। ব্যাপারটাকে আমরা যুক্তিবাদিরা -ভাল জিনিসের কদর কম, বা খুব কম লোক বোঝে ইত্যাদি দিয়ে আত্মশান্তনা দিয়ে থাকি।

কিন্ত কেন লোকে ধর্ম ছাড়ছে না?

আমরা কি ঠিক বুঝছি? ঈশ্বরের সপক্ষে যুক্তিগুলো এতই হাস্যকর-সেটা আমি একদম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বুঝে আসছি। আমার মাথার ওপর ঈশ্বরের দশমনি বোঝা কেও চাপায় নি ছোটবেলা থেকে। ফলে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আদৌ কোন দিন আমি ঈস্বরে বিশ্বাস করতাম কিনা জানি না। ফলে আমার জীবনে ঈশ্বরের বিশ্বাস হারানোর হ্যাপা পোহাতে হয় নি কোনদিন-কারন ঈশ্বর বাবাজী কোনদিনই আমার বুদ্ধির প্রাচীর ভেদ করে ঢুকতে পারলেন না। ঈশ্বরের অনস্তিত্বের এই সামান্য যুক্তিগুলো সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকে বুঝবে না-এটা কোন যুক্তিতে বুঝবো? বেঁচে থাকতে গেলে যথেষ্টই বুদ্ধির দরকার হয়। সাধারন মানুষের বুদ্ধি এত কম না, যে তারা বুঝবে না ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। এতবড় গোজামিল, চোখে না পড়ার কিছু নেই।

তারপরেও কিছু কিছু যুক্তিবাদি আবার ধর্মে ফিরে আসছে কি করে? প্রশ্নটা নিয়ে আমাদের গভীরে ভাবা উচিত।

(২)
মানুষের নির্মানের মূলে যৌক্তিকতা না অযৌক্তিকতাবাদ? না মানবতাবাদ? শুধু যুক্তিবাদ দিয়ে কি জীবন ধারন করা সম্ভব? পৃথিবীর সেরা সেরা গান, সাহিত্য-সব কিছুই ত ঈশ্বরকেন্দ্রীক। যার পেছনে কোন যুক্তি নেই। অঙ্কুর নাথ যেমন বললেন, আমি হরে কৃষ্ণ নাম উচ্চারন করি হাজার বার-তাতে নাকি আষাঢ়ের বর্ষন ধারার মতন নেমে আসে পরম শান্তি। দুঃখ নেই। সে নাকি সচ্চিদানন্দ ( সদাই যে আনন্দে থাকে) । ধর্মপ্রান মুসলমানদের কাছেও, নামাজটা সেই সিগারেট বিড়ি টানার মতন অভ্যেস। একটু টান দিলে, মনটা চাঙ্গা থাকে। তার কি যাই আসে, ঈশ্বর আছে কি নেই? সেত প্রাণে খুশী। আর মৃত্যুত সবারই নিয়তি। সে যদি খুশী মনে মর‌তে পারে-ক্ষতি কি। মঠে থাকে, কোন কেলেঙ্কারী নেই জীবনে, নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী। আমি যুক্তিবাদি, সে সচ্চিদানন্দ-আলটিমেটলি দুজনেই মারা যাব। ১৩ বিলিয়ান বছরের মহাবিশ্বে কি পার্থক্য হবে এতে? জীবনের উদ্দেশ্য যদি অন্যমানুষের ক্ষতির কারন না হয়, তাহলে কেন তার জীবনের উদ্দেশ্যে যুক্তিবাদ আসবে?

ইয়াং জেনেরাশনে অধিকাংশই যুক্তিবাদি হয় তাদের জীবনের স্বাধীনতার ওপর ধর্মের খবরদারি দেখে। কয়েকজন ব্রিলিয়ান্ট ইরানিয়ান ছাত্রকে চিনতাম-তারা যথেচ্চার মদ্যপান করত, আর শুয়োরের মাংস খেতে খেতে মোল্লাদের গালাগাল দিত। অনুমান করি, তাদের মূল ক্ষোভের কারন, মোল্লা ব্যাটাদের জন্যে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না-যৌবনে প্রেমটেম করাও ছিল রাষ্ট্রের চোখে ভয়ংকর। অর্থাৎ ধর্মের কুপ্রভাবে, তারা যৌবন ধর্ম ঠিকটঠাক পালন করতে পারে নি বলে রাগ। দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়াতে বেশ কিছু বাংলাদেশী মেয়ে ধর্মকে গুলি মেরে আমেরিকান মেয়েদের মতন জীবন যাপন করত। তারা আস্তিক না নাস্তিক জানি না-তবে মোল্লাদের খপ্পর থেকে বেড়তে পেরে খুব খুশী।আবার ইন্টারনেটের কিছু পৌঢ় ধার্মিক দাবী করেন-তারা এককালে বামপন্থী যুক্তিবাদি প্রগতিশীল ছিলেন-ইদানিং ইসলামের মাহাত্ম্য বুঝে, আবার হাড়িকাঠে গলা দিয়েছেন। এর মধ্যে তারা নাকি পরম শান্তির সন্ধান পাচ্ছেন! হিন্দু বামপন্থীদের মধ্যেও এমন আকছার ঘটে। যৌবনে মার্ক্সিট ( অবশ্য সেটা মাছভাতের থেকে কি আলাদা জিনিস তা অধিকাংশ বাঙালী কমিনিউস্টই জানে না) , মধ্যযৌবনে সেনস্ট্রিস্ট, সেখান থেকে বার্ধক্যে রক্ষনশীল জ্যাঠামশাইদের সর্বত্রই দেখি।

ধর্ম সংক্রান্ত এই পরিবর্তনগুলো আমাদের জীবনে কেন আসে?
(৩)
এর সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনস্তিত্বের সম্পর্ক নেই। আসলে সবাই একটা বস্তুবাদি 'কমফর্ট জোন' বা সুখের সন্ধানে। এর মূলে অবশ্যই আমি কে বা জীবনের উদ্দেশ্যকি এই প্রশ্নগুলি। তবে এইসব প্রশ্ন বিদ্ধ হয়ে কোন প্রানী কিছু করে না। সমাজ আর পরিবেশ এর উত্তরগুলো আমাদের জোর করে গিলিয়ে দিয়ে থাকে। মৌমাছিদের জৈবচক্রে "জীবনের উদ্দেশ্য কি" তাই নিয়ে নিশ্চয় প্সশ্ন ওঠে না। হাজারে হাজারে সবাই যা করছে, তারাও তাই করে। ক্যানোনিক্যাল ধর্মগুলো-মানে যে ধর্ম গুলো কখন কি করিতে হইবে তাহা লিপিবদ্ধ করিয়াছে-তাদের অনুসারিরা আচরনে পুরুষ মৌমাছি। "ব্যাক্তি-স্বাতন্ত্রের" প্রশ্ন সেখানে নেই-স্বাধীন অস্তিত্বের কথা সেখানে ভাবা নিষিদ্ধ-পুরুষ মৌমাছির মতন আচরনই সেখানে সিদ্ধ।

শিল্প বিপ্লবের আগে এসব নিয়ে সমস্যা ছিল না। নাস্তিক ছিল না যে তা না-কিন্ত যুথবদ্ধ জীবন ছাড়া একাকী বেঁচে থাকা ছিল অসম্ভব। অথচ আজ আমেরিকার যেকোন শহরে ৩০ বছরের নীচে অধিকাংশ নারী বা পুরুষ একাই থাকে। সবারই প্রায় একাধিক যৌন সঙ্গী। তাই নিয়ে কেও চিন্তিতও নয়। এবং এইসমস্ত দেশ সমূহ, প্রোডক্টিভিটিতে পৃথিবীর সবার ওপরে। পাশ্চাত্যের এই সব দেশ সমূহের সমস্যা হল-জন সংখ্যা হ্রাস। কারন, অনেক মেয়েরাই সন্তান ধারনে অনিচ্ছুক। তবে রাশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে সেটাও সমস্যা না। মূল কথা ফার্টালিটি রেট ২ এর ওপরে থাকা দরকার। রাশিয়াতে ১৯৯৫ সালে ১ এর নীচে নেমে গিয়েছিল। বর্তমান রাশিয়ান সরকার, মা হওয়ার জন্যে বিভিন্ন ইনসেন্টিভ চালু করে। তিন সন্তান হলে এস ইউ ভি, চার সন্তান হলে বিনা পয়সায় ফ্ল্যাট--এসব করে, বর্তমানে রাশিয়াতে ফার্টিলিটি রেট আবার দুই এর কাছাকাছি। সুতরাং ধর্মের ভয় দেখিয়ে, শুধু রক্ষনশীলতার মাধ্যমেই রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস ধরে রাখা যায়, তা ঠিক না। মেয়েদের দোখজের ভয় না দেখিয়ে, শরিয়ার চাবুক না মেরে, লোভ দেখিয়েও রাষ্ট্রের জন সংখ্যা ধরে রাখা যায়।

তবে সন্তানের জন্ম দিলেই ত হল না-তাদের মানুষ করার ব্যাপারও আছে। রক্ষনশীলদের ধারনা, শক্তিশালী পরিবার থেকেই ভবিষ্যতের শক্তিশালী নাগরিক বেড়োবে। কথাটা আংশিক সত্য। ভারত বা চীনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এখান কার ছাত্রদের সাফল্যের মূল কারন, তাদের পরিবার ছেলে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে অনেক বেশী যত্নবান। সেই তুলনায় পাশ্চাত্য সমাজ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে এশিয়ানরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ।

কিন্তু এর সাথে ধর্মের সম্পর্ক কোথায়? চীনারা ত ধর্ম মানে না। ভারতের সেরা ছাত্ররা-[যারা বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিতে নিজেদের ছাপ রেখেছে]-তারা হয় নাস্তিক বা নাস্তিক্য হিন্দুধর্মের অনুসারী। আমি অবশ্য ভারতীয় সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের এই ক্যাটেগরীতে রাখছি না-এদের অধিকাংশই বৌদ্ধিক বিষয়গুলিতে নিরক্ষর। মোদ্দাকথা পারিবারিক রক্ষনশীলতাকে ধর্মের সাথে গোলানো উচিত না। ধর্মহীন মানেই রক্কনশীলতার বিরোধিতা-এই ধারনাকে আমি ভূল বলে মনে করি। নাস্তিক চীনারাও রক্ষনশীল-আমি নিজেও ব্যাক্তিগত জীবনে রক্ষনশীল। কারন মূল কারন অনেক-
(১) আমাদের দেহ-মনের সিস্টেমটা একটা মেশিন-যা বিবর্তনের ফলে এসেছে। এবং আমাদের বিবর্তন হয়েছে সমাজবদ্ধ ডিসিপ্লিন্ড জীব হিসাবেই। ফলে দেহ বা মনের সঠিক যত্ন না নিলে-বা ডিসিপ্লিনড জীবন, যেমন অত্যাধিক মদ্যপান না করা, ধূমপান বা নেশা না করা, যথেষ্ঠ নিদ্রা, ঠিক ঠাক আহার-শারীরিক কসরৎ -ইত্যাদি না করলে, আমরা শীঘ্রই অসুস্থ হয়ে পড়ব। এর সাথে সাথে অহঙ্কারহীন, ক্ষমাশীল জীবন পালন করলে, আমাদের রক্তচাপটাও ঠিক থাকে। এতে কেও ধর্মের গন্ধ পেলে মুশকিল। আবার কেও যদি মনে করে এর জন্যে ধর্মে ফিরে যেতে হবে সেটাও মুর্খামি। খুব স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক যুক্রিতেই আসে আমাদের অহঙ্কারহীন থাকা উচিত। কারন, আমরা যে 'আমি' 'আমি' করছি-সেটা ত স্বতন্ত্র কিছু না। বাবা-মা-বন্ধু-শিক্ষক-পুস্তক-লেখক-সমাজ-পরিবেশ আমাদের যা শিখিয়েছে তার থেকে একটা 'আমি' তৈরী হয়েছে। তাছারা সেই 'আমি' বাঁচেই বা কদ্দিন? ১০০ বছর? ১৩ বিলিয়ান বছরের মহাবিশ্বের কাছে, তা কতটুকু সময়? পলকের ও কম।
(২) অনেক লিব্যারালদের ধারনা-অন্যের ক্ষতি না হলে বা অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন না হলে, আমাদের সব কিছু করার স্বাধীনতা আছে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারনা। কারন এখানে ভাবা হচ্ছে ব্যাক্তি আমির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে। অর্থাৎ আমি বা আপনি সমাজ থেকে পৃথক এক স্বতন্ত্র সামাজিক জীব। এটি সম্পূর্ণ বস্তুবাদ বিরোধি আদর্শবাদি ধারনা-কারন সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট খাওয়া থেকে রাতে শুতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমার প্রতিটি কাজের জন্যে সমাজ এবং রাষ্ট্রকে দরকার হয়। আমার খাদ্য, শিক্ষা, চাকরি, বাসস্থান-এই ইন্টারনেট-সব কিছুই সমাজ বা রাষ্ট্রের উৎপাদন থেকে এসেছে। আমি নিজেও এই উৎপাদন ব্যাবস্থার অংশ-তার বাইরে আমার অস্তিত্বই নেই। সুতরাং এই উৎপাদন ব্যাবস্থাকে ক্ষতি করে, এমন কিছু করার স্বাধীনতা আমার থাকতে পারে না। এই উৎপাদন ব্যাবস্থাকে ক্ষতি না করে, সব কিছুই আমরা করতে পারি।

এই প্রসঙ্গে যেসব দম্পত্তি ইচ্ছা করে চাইল্ডলেস বাই চয়েস থাকেন বা সন্তান নিচ্ছেন না-তাদের স্বাধীনতার বিশ্লেষনে আসা যেতে পারে। এর অধিকার কি থাকা উচিত? কারন তারা এই উৎপাদন ব্যাবস্থার শরিক হয়েও, নিজেদের কর্তব্য করছেন না। লিব্যারালদের মতে, এই স্বাধীনতা থাকা উচিত পূর্ণাঙ্গ। এখন ভারত বা বাংলাদেশে দম্পতিরা এমন করলে, তাদের ট্যাক্স মকুব করা উচিত-কারন তারা জনসংখ্যা কমিয়ে রাষ্ট্রের সেবা করছেন। অন্যদিকে ইউরোপে এমন করলে, তাদের ওপর প্রচুর ট্যাক্স চাপানো উচিত। কারন সেখানে জনসংখ্যা হ্রাস হচ্ছে। বাস্তবে সেটাই হচ্ছে-ইউরোপে সন্তান না থাকলে প্রচুর ট্যাক্স দিতে হয়-স্বাধীনতা থাকলেও, পেনল্টি দিতে হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে এই স্বাধীনতার ব্যাপারটা ভীষন ভাবে পোষ্ট-মডার্ণ। ধার্মিকদের মতন কোরান বা বাইবেলের ম্যানুয়াল ধরে এ খর্ব করা যায় না-আবার স্থান কাল পাত্র না বিবেচনা করে-এই নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ভারতের মতন জন বহুল দেশে, মুসলিমদের জন্মহার খুবই বেশী-যে কারনে-তারা সন্তান ঠিক ঠাক মানুষ করতে পারেন না। এবং বর্তমানে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষার হার ভারতের আদিবাসিদের থেকেও খারাপ। আমেরিকান মুসলিমদের মধ্যেও এই ধরনের গোঁড়া মুসলিম আছে-তবে তারা ব্যাতিক্রম। সেই জন্যে আমেরিকাতে মুসলিমরা , সাদা আমারিকানদের থেকেও ভাল করছে। কিন্ত ইউরোপ বা ভারতে তারা নিদারুন ভাবে পিছিয়ে। একই ধর্মের লোকেরা দুই দেশে দুই ধরনের পার্ফমান্স দিচ্ছে-কারন, ধর্মের আসলেই কোন ভূমিকা নেই। মূল কথা হল দেশ-কাল-পরিস্থিতি বুঝে লোকেরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কি না। সেটাই আসল কথা।

অর্থাৎ এই রক্ষনশীলতার ব্যাপারটা আমরা আমাদের সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমের ফিটনেসের জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। সেটাকে ত্যাগ করা বা গ্রহন করাটা-সম্পূর্ণ ভাবেই পরিস্থিতি নির্ভর সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। সার্বজনীন সর্বকালীন ধর্ম বা উদারপন্থা-এর কোনটারই কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই। যেকারনে কোরান বা বাইবেল, বর্তমান মানুষের জীবনে অর্থহীন-ঠিক একই কারনে উদারনৈতিক চিন্তাধারা বা লিব্যারালিজমও অর্থহীন। কারন প্রতিটি পরিস্থিতি স্থান কাল পাত্র ভেদে আলাদা। তাদের জন্যে কোন সার্বজনীন, সর্বকালীন আইন বা গাইডেন্স থাকতে পারে না।

কিন্তু তাহলে রাষ্ট্রের আইন কি হবে? সেখানে ত এই পোষ্টমডার্ন দর্শন চলবে না। তাহলে আইনের বই এর সাইজ, বহুতল বাড়ির সাইজকে ছাড়িয়ে যাবে! সেখানে কিছু গাইডেন্স আনতেই হবে। অর্থাৎ কিছুটা এম্পিরিসিজম বা সমাজবিজ্ঞানের গবেষনাকে কাজে লাগিয়ে, রাষ্ট্রকে তার স্বার্থের জন্যে পজিশন নিতেই হবে। সামাজিক আইনগুলি থেকে ধর্মের বিসর্জন একান্ত ভাবেই দরকার। সেখানে বিজ্ঞানের গবেষনা আসুক। আমাদের উদ্দেশ্যত নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মঙ্গল।সেখানে পাশ্চাত্যের আইন, শরিয়া আইন এসব না বলে, সমাজ বিজ্ঞানের গবেষনার ওপর ভিত্তি করে আইন আনা হৌক। আমেরিকাতে আস্তে আস্তে তাই হচ্ছে। গোটা বিশ্বের যেকোন উন্নত দেশেই তাই হচ্ছে আস্তে আস্তে। সেখানে আল্লার আইনের নামে এক অন্ধকারযুগকে আনার কোন মানে নেই। অথচ মুসলীম বিশ্বে এই ভাবেই পুরুষের হাতে নিগৃহীত হচ্ছে অসংখ্য নারী। বিয়ার খাওয়ার জন্য যদি কোন নারীকে বেত্রাঘাত মারা হয়-তাহলে মানতেই হবে, মেয়েদের জন্যে শরিয়া আইনের চেয়ে জঙ্গলে গিয়ে বাস করা ভাল। সেখানে স্বাধীনতাটুকুত আছে। ভারতে হিন্দু পুরুষের হাতেও একই ব্যাপার আগে হত-কিন্ত রাষ্ট্র যেহেতু নারী পক্ষে, গত দুই দশকে শহরের কিন্ত অনেক পরিবর্তন এসেছে। গ্রামে অবশ্য এসব প্রগতি অনেক দূর। মৌলবাদিরা পাশ্চাত্যের আইন, পাশ্চাত্যের নগ্ন নারী-নারীর যৌনতার স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদি ধুয়ো তুলে, শরিয়া আইনকে টেকাতে চাই। কিন্ত বাস্তব সত্য হচ্ছে পাশ্চাত্যে আইন গুলি আস্তে আস্তে সমাজ বিজ্ঞান নির্ভর হচ্ছে। এটা ঠিকই নারী স্বাধীনতার সাথে সাথে নারীদের মা হওয়ার ইচ্ছা কমেছে। কিন্ত তাতে ধর্মের মতন অন্ধযুগকে ফেরাতে হবে কেন? রাশিয়ার মতন ইন্সেন্টিভ স্কীম চালু করলেই ত মিটে যায়। আবার এটাও দেখা গেছে, কিছু কিছু আমেরিকান পরিবার, নিজেদের স্বার্থের জন্যে ছেলে মেয়েদের যথেষ্ট যত্ন নিচ্ছেন না। ওবামার বাবা ওবামাকে ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আমেরিকায় বাবা-মা ছেড়ে পালানো খুব সাধারন ব্যাপার। কিন্ত এই ব্যাপারে মিডিয়া খুব সরব এবং আইনও সেই সব বাবা মাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে থাকে, যদি দোষী প্রমানিত হয়। এর জন্যে কি ধর্মের আইন লাগে? জীবনের একটা পরিস্কার উদ্দেশ্য থাকলেই এসব এমনিতেই আসে। ধর্মের আফিং খাইয়ে দিয়ে এইসব করানো অর্থহীন। তাতে সাইড এফেক্ট অনেক বেশী।

(৪)

যাইহোক এবার কিছু ব্যাক্তিগত সমস্যার কথায় আসি। আমাদের উপমহাদেশে নাস্তিক হিসাবে পরিবার পরিজনদের মধ্যে বেশ অসুবিধায় থাকি প্রায় সকলেই। কোন মাসিমা পুজোর প্রসাদ দিলে, আমি নাস্তিক, তাই প্রসাদ খাই না-এমন সাধারনত আমি বা কোন বোধ সম্পন্ন নাস্তিকই বলবে না-কারন আমরা তাকে আঘাত করতে চাই না। কোন ধার্মিক মুসলমান বন্ধু যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে, তাদেরকেও নিশ্চয় বলা ঠিক না, আল্লা নেই, তুমি বোকামো করছ। হ্যা, সে যদি আল্লার সপক্ষে প্রমান দিতে চাই, আমি তাকে পরিস্কার ভাবেই গাধা বলব। কিন্ত সে যদি মানসিক শান্তির জন্যে বা তার নিত্য কাজের মধ্যে স্বস্তির জন্যে নামাজ পড়ে, তাকে যেচে গিয়ে গাধা নিশ্চয় আমরা কেওই বলি না। উচিত ও না। পূজোর ব্যাপারটাও তাই। তিথি নক্ষত্র মেনে অনেকে পুজো করেন-আমেরিকায় যে এতটা হিন্দু রয়েেন, সেই নিয়েও অনেকে গর্ব করেন। আমি হাঁসি। হ্যাঁ বা না বলি না। কি বলব? এসব অনর্থক তর্কে জড়ানো অর্থহীন। এত ধেড়ে বয়সে যাদের বুদ্ধি হয় নি, তার বুদ্ধি কোনদিন হবে বলে আমার মনে হয় না। সে যদি তার তিথি নক্ষত্র নিয়ে সুখে থাকে, থাকুক। সুখী থাকাটাই যখন জীবনের ধর্ম, তথন কেও বোকামো করে সুখে আছে না বুঝে সুখে আছে-তা দেখে কি হবে? শুধু তার সুখের কারনে অন্যের দুঃখ না হলেই হল।

তবে হ্যাঁ কেও যদি তার ধর্ম পৃথিবীর সেরা বলে গর্ব করে, আনন্দ পেয়ে থাকে, তাতেও আমার আপত্তি নেই। যতক্ষন সেই আনন্দ, ব্যাক্তিটি নিজের মনের মধ্যে রাখতে পারবেন। যখন সে নিজের ধর্ম সেরা-এইসব নিয়ে বলতে আসবে, তাকে পরিস্কার বলা উচিত, আপনার বিষ্টার গন্ধ শুঁকে আপনি সচ্চিদানন্দ হোন-সেই দুর্গন্ধ আর বেশী ছড়াবেন না, তাহলেই হল। আমার ধর্ম আপনার ধর্মের চেয়ে ভাল-এই ধরনের যুক্তিগুলোর ভিত্তি আমার বিষ্ঠা আপনার থেকে ভাল-এই স্তরের। এইসব অর্থহীন সময় নষ্ট না করে, ধর্ম বা বিজ্ঞান, বিষয় যাই হোক না কেন-তা কি করে আরো মানব কল্যানে লাগানো যায়, সেই নিয়েই চর্চা করা উচিত।

Wednesday, September 2, 2009

দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বের আলোকে ধর্মগ্রন্থ সমূহের ব্যাখ্যা!

(১)
খ্যাপা রামকৃষ্ণ বলতেন যত মত তত পথ। আজকের দুনিয়াই টিভি, ইউটিউব এবং ইন্টারনেটের নানান ধর্মীয় বিতর্কে যোগ দিলে বিলক্ষন মনে হতে পারে সফটওয়ার প্রোডাক্ট ভার্সনের ন্যায় কোরান-গীতা-বাইবেল ইত্যাদি গ্রন্থ সমূহের 700.0, 800.0....1900.0., 2000.0 ইতাদি ভার্সন সহজলভ্য। যেমন যুগ, যেমন জ্ঞান, তেমন ভার্সান! আবার একই যুগে নানান প্রকৃতি এবং দেশের ওপর নির্ভর করে কোরানের কোন ভার্সন চলবে! হিন্দু ধর্মগ্রন্থ এবং বাইবেলের ক্ষেত্রে এই ট্রেন্ড আবার অনেক দিনের পুরানো ইতিহাস।

ইউ টিউবে 'জোকার' জাকিরের কোরানিক ভার্সান ইংরেজী শিক্ষিত মুসলিমদের জন্যে, সৌদি আরবে আবার অন্য রকম-আমেরিকার চাপ খেয়ে পাশ্চাত্যে কোরান অনেক লিব্যালার-সেখানে পন্ডিতরা যুক্তি খোঁজেন উদারতান্ত্রিক ভার্সনের কমপ্যাটিবল কোরান কিভাবে রচনা করা যায়! গীতা বা বাইবেল বা হিন্দু ধর্ম গ্রন্থগুলির ও একই বেহাল অবস্থা!

বই সেই একটাই-আল কোরান। মহম্মদ নিজের কুকীর্তি বা সুকীর্তি, অভিজ্ঞতালদ্ধ জ্ঞান সুপার মাফিয়া আল্লার নামে চালিয়ে কোরান রচনা করেন। মহম্মদের ইতিহাস আর কোরান পাশাপাশি রেখে পড়লে, যেকোন বুদ্ধিমান লোক খুব সহজেই বুঝবে কোরানে কি এবং কেন লেখা হয়েছিল। অবশ্য সে যুক্তিবাদের পথে ধার্মিকরা হাঁটবেন না-কারন অতটা হাঁটার কষ্ট নিতে জানলে, তারা ধার্মিক হবেন ই বা কেন!

হজরত মহম্মদ যা করেছেন, তাতে আমার আপত্তি নেই। ৪০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের অর্থশাস্ত্রে কৌটিল্য উপদেশ দিয়েছিলেন রাজন্যবর্গ দেশ শাসন করতে, নিজের আইনকে ঈশ্বর কতৃক স্বপ্নে প্রদত্ত আইন বলে চালাবে। রাজাকে রাজ্য শাসন এবং বিস্তারের জন্যে নিজের আদেশকে ঈশ্বরের আদেশ বলে চালানোর সুচতুর কৌশল কৌটিল্য মহম্মদের জন্মের ১০০০ বছর আগেই দিয়ে গিয়েছিলেন। কৌটিল্যসুত্র মেনেই ভারত ও ইউরোপের রাজন্যবর্গ নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবেই রাজত্ব করেছে পৃথিবীর সর্বত্র। তবুও মহম্মদ কৌটিল্যের সেরা ছাত্র হিসাবে ইতিহাসে আবির্ভূত হলেন-কারন অন্যান্য রাজন্য বর্গ ঈশ্বরকে কাজে লাগিয়েছেন নিজেদের পারিবারিক রাজত্ব কায়েম করতে। সেখানে হজরত মহম্মদ সেই ঐশ্বরিক স্কীমকে হাতিয়ার করে মানব সমাজের আরো পূর্নাঙ্গ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন। লক্ষ্য - মানব সাম্যের ওপর ভিত্তি করে গরীব দরদী এবং একটি শক্তিশালী সমাজের বিকাশ। তবে হ্যাঁ সেখানেও দাশ প্রথার বিলোপ, নারীর জন্যে সমানাধিকার তিনি আল্লার নামে নামালেন না। কারন সেই যুগে যখন শিশু মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশী, নারীর গর্ভে ছয় থেকে সাতটি সন্তান না এলে, জনসংখ্যার বিলোপ ছিল অবসম্ভ্যাবী-তখন নারীকে প্রজননের মেশিন ছাড়া অন্য কিছু ভাবা ছিল অসম্ভব। কোরান এবং হিন্দু গ্রন্থ সমূহে তাই একই কারনে নারী সেই প্রজনন মেশিন । যাইহোক, এই ইসলামের ওপর ভিত্তি করেই আরবের প্যাগান সমাজ পরবর্ত্তী তিন শতকে পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী এবং জ্ঞানী সমাজে পরিণত হল। কারন ইসলাম তৎকালীন সময় অনুসারে আরো উন্নত সামাজিক আইন এবং চিন্তা বলবৎ করতে সক্ষম হয়।

মনে রাখতে হবে নৃতত্ত্ববিজ্ঞান এবং বিবর্তনের দৃষ্টিতে ঈশ্বরের উৎপত্তির মূল কারন গোষ্ঠিবদ্ধ জীবন। প্রকৃতির ভয় থেকে ঈশ্বরের উৎপত্তি অতিসরলীকরন। পশু পাখীরাও ঝড় বাদলাকে ভয় পায়-কিন্ত তাদের ঈশ্বর নেই। ঈশ্বর আদিম সমাজে গোষ্ঠিবদ্ধ জীবনের জন্যে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ন প্রয়োজন হিসাবেই বিবর্তিত হয়েছে। একটি সমাজ কিছু আইনের ভিত্তিতে গোষ্টিবদ্ধ হয়-সেই আইন গুলির উৎপত্তিকে সমাজ বিজ্ঞানে বলে 'সেলফ অর্গানাইজেশন'। অর্থাৎ কিছু অনু পরামানু যেমন নিজেদের আনবিক শক্তিক্ষেত্রের আওতাই এসে আস্তে আস্তে একটি শক্তিশালী ক্রীস্টাল তৈরী করে-তেমন ই মানুষ নিজেদের মধ্যে পারস্পারিক আইন তৈরীর মাধ্যমে একটি গোষ্ঠিবদ্ধ সমাজের জন্ম দিয়ে থাকে। এই আইন যত সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের উপযোগী হয়, সমাজ তত শক্তিশালী হয়। অর্থাৎ যেসব সমাজের আইনগুলিতে সামরিক শক্তি বা মিলিটারিজম, পরোপকার বা আলট্রুইজম এবং প্রজননের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়-সেই সমাজ বিবর্তনের শক্তিতে ভবিষ্যতে সব থেকে প্রসার লাভ করে। মিলিটারিজম, আলট্রুইজম এবং রিপ্রোডাকশন -যেকোন প্রানীকূলের মূল সারভাইভার স্ট্রাটেজি। যদি ভিনগ্রহের কোন মানুষ আমাকে কোরান বা গীতাকে এক কথায় প্রকাশ করতে বলে-আমি লিখব এই বই গুলি মানব সমাজের সারভাইভাল স্ট্রাটেজির ম্যানুয়াল ছিল মধ্যযুগে।

কোরান বর্নিত সামাজিক নির্দেশাবলী এক শক্তিশালী আরব সমাজের জন্ম দিয়েছিল। কিন্ত ১২০০ শতাব্দি থেকে সেই সমাজ দুর্বল হতে শুরু করে। কেন? আরবরা বিজ্ঞানে যখন এত এগিয়ে ছিল, তখন তাদের মধ্যে থেকেই গ্যালিলিও বা কোপার্নিকাসের জন্ম হওয়া উচিত। কেন এমন হল না? এ প্রসঙ্গে স্যার কার্ল পপারের একটি বক্তব্য প্রাণিধানযোগ্য--যেকোন দর্শনের সব থেকে শক্তিশালী দিকটিই তার দুর্বলতম অধ্যায়। অর্থাৎ ইসলামের দর্শনের সব থেকে শক্তিশালী দিক- এক অভূতপূর্ব সামাজিক শক্তি যা কঠোর সামাজিক আইন এবং সমাজের জন্যে ব্যাক্তির আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি হতে পারে না। সেখানে উদার নৈতিক ব্যাক্তি কেন্দ্রিক ভোগ্য সমাজ দরকার। ১৫০০-১৮০০ সালের ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যাবে, শিল্প বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির পেছনে-সামরিক এবং বাজারের ( মূলত উপনিবেশিক) ভূমিকা ছিল মূখ্য। ওই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিস্কারক, লিও নার্ডো দ্যা ভিঞ্চি, তৎকালীন নগর সম্রাজ্যের অধীশ্বর দের চিঠি লিখতেন -তার আবিস্কার দিয়ে আরো উন্নত অস্ত্র বানানো সম্ভব, তাই তাকে অর্থ দেওয়া হৌক সেসব বানাতে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত আবিস্কার গুলির পেছনে ( বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের কথা বলছি না) , বাজার থেকে ফয়দা তোলার ব্যাক্তিগত লোভ সেকালেও আবিস্কারদের ছিল-একালেও আছে। রেডীও থেকে ইন্টারনেট -বাজার ভিত্তিক সমস্ত প্রযুক্তির আবিস্কার এবং তার ব্যাপক বাজারীকরন আবিস্কারকদের ব্যাক্তিগত লোভ থেকেই উদ্ভুত। বাজারের অনুপস্থিতির কারনেই ভুতপূর্ব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি মারণাস্ত্র এবং মিলিটারি প্রযুক্তি ছাড়া আর কিছুই বিশ্বকে দিতে পারে নি। কোন জীবনদায়ক্ ঔষুধ সেখানে আবিস্কার হয় নি-সব হয়েছে আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে বা জার্মানীতে।

অর্থাৎ আমি যেটা বলতে চাইছি, ইসলামে সামাজিক শক্তির ব্যাপক চাপ থাকার জন্যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি সত্ত্বেও আরব সমাজ সামন্ততান্ত্রিক থেকে ধনতান্ত্রিক সমাজে বিকশিত হল না। সেই ঘটনা ঘটল ইউরোপে-কারন সেখানকার রাজন্য বর্গ নিজ স্বার্থেই পোপ হতে মুক্ত হতে এবং উন্নত তর অস্ত্র ও উৎপাদনের জন্য ধর্মের ডানা ছেঁটে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগোলেন। আরবে শিল্প বিপ্লবের জন্যে ইসলামের ডানা ছাঁটা দরকার ছিল দ্বাদশ শতাব্দিতে। কিন্ত তা সম্ভব হল না ইসলামের দুর্বার সামাজিক শক্তির জন্যে। ফলে শিল্প বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের উন্নতির সামনে ইসলামের সব থেকে শক্তিশালী ফিচারটিই তাদের পিছিয়ে পরার মূল কারন হিসাবে উদ্ভুত হচ্ছে ক্রমাগত ভাবে সেই দ্বাদশ শতাব্দি থেকে।

কিন্ত ধান ভাঙতে শিবের গীত গাইছি কেন? কারন মুসলমান সমাজের বিদ্বান ব্যাক্তিরাও বোঝেন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান নির্ভর সমাজ না গড়ে তোলার জন্যে আজ পৃথিবীর ৫১ টি মুসলিম দেশই পাশ্চাত্যের থেকে অনেক বেশী পিছিয়ে পড়েছে। সামন্ততন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রের উত্তোরন একমাত্র তুরস্ক ছাড়া কোথাও সেই ভাবে হয় নি। মিশর, ইন্দোনেশিয়া এবং মালেশিয়ার সাফল্য আংশিক। ফলে মুসলিম সমাজে বিজ্ঞানের প্রসার ঘটাতে গিয়ে এক অদ্ভুত সার্কাসের চলছে। সেখানে বিজ্ঞানের প্রসারের বদলে ইসলাম ধর্ম কত বৈজ্ঞানিক, সেটা প্রচার করতে রাষ্ট্র এবং মিডিয়া "স্ব কিছুই কোরানে আছে" টাইপের অপবিজ্ঞানের জন্ম দিচ্ছে। এমন নয় যে হিন্দু বা খ্রীষ্ঠান ধর্মে এটা হচ্ছে না। ব্যাপক ভাবেই হচ্ছে। কিন্ত তার পেছনে রাষ্ট্রের মদত নেই। কিন্ত ইসলামের ক্ষেত্রে এই অপবিজ্ঞান রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় এক ভয়ংকর দূষনের রূপ নিয়েছে। আমি এই প্রবন্ধে দেখাবো কি ভাবে এই কুকীর্তি সাধিত হয় । কিভাবে একই আয়াত যা সপ্তম শতাব্দির আরবে ছিল রূপকথা, তা অপবিজ্ঞানীদের হাতে পড়ে, "বৈজ্ঞানিক সত্যের" দাবী করে।

(২)

একটি বাক্যের অর্থ কত প্রকার হতে পারে, এবং তা নিয়ে কি কি ঢপবাজি করা যায়, সেটা বুঝতে জ্যাকুস দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্ব খুবই উপযোগী।

ডিকনস্ট্রাকশন পাঠ করার একটি পদ্ধতি। দেরিদা দেখান

  • প্রতিটা বাক্যের একাধিক অর্থ হতে পারে
  • সেই অর্থগুলি পরস্পর বিরোধী হতে পারে
  • একই বাক্যের নানা ব্যাখ্যা গুলির পরস্পর বিরোধিতা কমানোর কোন উপায় নেই
  • তাই ব্যাখ্যা মূলক পাঠের সীমাবদ্ধতা আছে-এটাকে এপোরিয়া বলে
ডিকনস্ট্রাশনের মুলে আছে ডিফারেন্স (Différance)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী
  • একটি শব্দের নির্দিষ্ট কোন অর্থ নেই-এক টি শব্দের অর্থ তার কাছাকাছি সে সমার্থক শব্দগুলি আছে, তার সাথে পার্থক্য করে নির্নয় করতে হয়। বাড়ি শব্দটির অর্থ নির্নয় করতে আমদের দেখতে হবে কি করে এই শব্দটি ঘর, গৃহ, বাটিকা, প্রাসাদ, অট্টালিকা ইত্যাদি শব্দের থেকে আলাদা।
  • যেহেতু প্রতিটি শন্দ একটি ইমেজ বা ছবি ( আসল বা এবস্ট্রাক্ট) কে প্রতিনিধিত্ব করে সেহেতু বাড়ির সাথে গৃহ, বাটিকা, অট্টালিকা ইত্যাদি শব্দগুলির পার্থক্য নিরূপন করতে, একই সাথে সমার্থক শব্দগুলির ইমেজ, সামাজিক, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেও ভাবতে হবে ।

একটি বিতর্কিত সুরা ধরে উত্তর দিচ্ছিঃ

9:5 But when the forbidden months are past, then fight and slay the Pagans wherever ye find them, an seize them, beleaguer them, and lie in wait for them in every stratagem (of war); but if they repent, and establish regular prayers and practise regular charity, then open the way for them: for Allah is Oft-forgiving, Most Merciful.

এই আয়াতে সমস্ত গন্ডোগলের উৎপত্তি প্যাগান শব্দের অর্থ থেকে। আলি সিনা এটিকে বিধর্মীদের বি্রুদ্ধে যুদ্ধ বলেও ঘোষনা করতে পারেন-কারন কনটেক্সটুয়ালি মানেত তাই। আবার কেও ঐতিহাসিক দৃষ্টিতেও বলতে পারে, প্যাগান মানে তখনকার মক্কাবাসী ্যারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত ছিল। তাই বর্তমানে আয়াতটির কোন মূল্য নেই। সেটাও ঠিক। আবার কেও প্যাগান বলতে অমুসলিম ধরেও অর্থ করতে পারেন। আবার প্যাগান বলতে এখানে ইসলামের শত্রুও বোঝানো যেত পারে। ব্যাখ্যাগুলি পরস্পর বিরোধি অর্থের জন্ম দিচ্ছে-কিন্ত কোন ব্যাখ্যাকেই ভুল বলা যাবে না । এটার কারন প্যাগান শব্দটার "ডিফ্যারান্স"। কনটেক্সটুয়ালি শব্দটির একাধিক পরস্পর বিরোধি অর্থ হতে পারে-যার কোনটিকেই অস্বীকার করা যাবে না।

প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ম গ্রন্থগুলিকে যখন আমরা ব্যাখ্যা করছি-সেই ব্যাখ্যামূলক অর্থের কোনটি ঠিক-আর কোন টি বেঠিক কে নির্নয় করবে? দেরিদার ডিকনস্টাকশন অনুযায়ী-এই ঠিক না বেঠিক ব্যাখ্যা এই প্রশ্নটিই অর্থহীন। কারন বাক্যের বাখ্যার সীমাবদ্ধতা আছে এবং একাধিক ব্যাখ্যাই কনটেক্সুয়াল কারনে ঠিক হতে পারে। একই বাক্য কখনোই একটিই মাত্র অর্থ বহন করে না।

এবার ত তাহলে বিশাল গেরো হল। দেরিদার মূল কথা হল একটি বাক্য দিয়ে একটি না একাধিক অর্থ পাঠকের কাছে সব সময় পৌছে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কোরানের ১২০০ ইন্টারপ্রেটেশন থাকলে ১২০০ টিই ঠিক হতে পারে। তাহলে কি সিদ্ধান্তে আসা যায়?

অ) আল্লা বা ঈশ্বরকে যত্ই বুদ্ধিমান ভাব না কেন-একটি গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে তার বক্তব্যকে পৃথিবীতে পাঠানোর মতন বোকামী আর হতে পারে না! কারন সেই বই এর হাজার হাজার ভাবার্থ হতে পারে, ফলে আল্লা বা ঈশ্বর ঠিক কি চাইছেন, তা কোনদিনই জানা সম্ভব না। অর্থাৎ হীরক রাজার দেশের অবস্থা--ব্যাখ্যার কোন শেষ নাই-ব্যাখ্যার চেষ্টা বৃথা তাই। সুতরাং একজন চোর, ডাকাত, মাস্টারমশাই, ব্যাবসায়ী, যোদ্ধা-একই বই পড়লেও এদের কাছে কোরানের ব্যাখ্যা হবে আলাদা। মোদ্দাকথা ১৫০০ মিলিয়ান মুসলিম কোরান পড়ে ১৫০০ মিলিয়ান ব্যাখ্যা তুলে নিয়ে আসতে পারে-যার অনেক গুলিই পরস্পর বিরোধি হবে-কিছু মিল থাকবে। এবং সেটাই বাস্তব। আল্লা বা ঈশ্বর বুদ্ধিমান হলে বই এর মাধ্যমে, ইনস্ট্রাকশন পাঠানোর রামপাঁঠামো কাজটি করতেন না। উনি ত সৃষ্টির মা-বাপ। একদম মানুষের মস্তিস্কের মধ্যে কোরানটাকে জেনেটিক্যালি ওয়ারড করে পাঠিয়ে দিলেই লেঠা চুকে যেত! আল্লা কি চান? তার আইনের সাম্রাজ্য! সেটা ত মানুষের জেনেটিক কোডে ঢুকিয়ে দিলেই অনায়াসেই হয়ে যেত! উনিই ত মানুষ তৈরী করেছেন! সেটা না করে বই এর মাধ্যমে তার ইচ্ছা বা আইনের কথা জানানোর গাধামো কেন তিনি করলেন তা সত্যই খুব গোলমেলে! একবার ভেবে দেখুন। একটি প্রতিষ্ঠিত আইনের ও হাজার ব্যাখ্যা হয়-আইন বাক্যটি কিন্ত বদলায় না। সুতরাং কিছু আইন সংকলন করে ছেড়ে দিলেই আইনের সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় না-সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে সেই একই আইনের ব্যাখ্যাও বদলে যায়। সুতরাং একটি গ্রন্থের মাধ্যমে সর্বকালীন সার্বজনীন একটি ধর্মের প্রতিষ্টা করার ধারনাটাই ডাঁহা ভুল। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা আল্লার যদি সত্যিই অস্তিত্ব থাকত -ধর্ম রাজ্য বানাতে ধর্ম গ্রন্থ বাজারে ছাড়ার মতন বোকামি তিনি করতেন না। জেনেটিক কোডে সামান্য রদ-বদল করে তিনি তার ধর্ম রাজ্য বানাতে পারতেন! ধর্মগ্রন্থ বাজারে ছেড়ে ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্টার খোয়াব মানবিক ক্রিয়া-কলাপ, যা এই বান্দা বর্তমান প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে করে চলেছে। কারন মানুষের জেনেটিক কোড বদল করার ক্ষমতা আমার হাতে নেই!
আ) ধর্মের ব্যাখ্যা মূলক বিতর্কগুলি অর্থহীন জঞ্জালের সৃষ্টি করছে। কারন কোন ব্যাখ্যাই আসলে বেঠিক না। যে কোরানে বিজ্ঞান পাচ্ছে সেও ঠিক ব্যাখ্যা করছে-যে পাচ্ছে না-বা উলটো পাচ্ছে সেও ঠিক ব্যাখ্যা করছে। কারন ওই রকম দুর্বল বাক্যের একটি মাত্র ভাবার্থ থাকতে পারে না। সুতরাং যারা কোরানে বিষ্ঠা এবং মূত্র পাচ্ছে তারাও যেমন ঠিক-আবার যারা ফুল ফলের শোভিত গন্ধ পাচ্ছে তারাও ঠিক। দেরিদার কথা মানতে গেলে ব্যাখ্যা মূলক বিতর্ক সম্পূর্ন অর্থহীন-একাধিক পরস্পর বিরোধি ব্যাখ্যা থাকাটাই বাক্যের ধর্ম!

(৩)

তাহলে কি আমরা জাকির নায়েকের এই ধরনের ধরনের ধাপ্পাবাজির সামনে অসহায়? মোটেও না। আসল সমস্যার মুলেই আঘাত করতে হবে। ডিকনস্ট্রাকশন জনিত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ধর্মকে মানবিক বা যুগোপযোগী করে তোলার চেষ্টাকে বলে "উইক থিওলজি" বা "দুর্বল ধর্মতত্ত্ব"। এটাই ধর্মতত্ত্বের পোষ্টমডার্নিজম-যে কোন ধর্মতত্ত্বের একটি ই মাত্র ব্যাখ্যা থাকতে হবে তার মানে নেই। কারন ধর্মের টেক্সট বা বাক্যগুলির গঠন খুব দুর্বল। গোদের ওপর বিষফোরার মতন মধ্যযুগীয় শব্দ। ফলে আইসক্রীমের বা চালের যেমন গার্ডেন ভ্যারাইটি প্রোডাক্ট লাইন থাকতে পারে-ইসলাম বা হিন্দু ধর্ম মানেও যে একটিই মাত্র ধর্ম বোঝাতে হবে, তারই বা মানে কি আছে? আসল সত্য ত এটাই ১৫০০ মিলিয়ান মুসলমান ১৫০০ মিলিয়ান রকমের ইসলাম ধর্ম পালন করে। হিন্দু দের মধ্যেও তাই-এক বিলিয়ান হিন্দুর জন্যে এক বিলিয়ান হিন্দু ধর্ম। ভারতে বা পাকিস্থানে যে ধরনের ইসলাম পালন করা সহজ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, আমেরিকাতে তাত হবে না। তাই এখানে, আমেরিকাতে ইসলামের বিবর্তন বা হিন্দু ধর্মের বিবর্তন ও অন্যভাবে হবে। এবং এই ভাবেই ধর্মের উদারনৈতিক ব্যাখ্যাগুলি ক্রমশ গোঁড়া বা রক্ষনশীল ব্যাখ্যাকে কোনঠাসা করতে সক্ষম হবে, সেই বিবর্তনের পথেই। এই ভাবেই ত হিন্দু সংস্কার আন্দোলন সফল হয়েছে। তাই ইসলামের যত বেশী ব্যাখ্যা বাজারে আসবে ধর্মটার বিবর্তন হবে তত দ্রুত-কারন মানুষ তার যুগোপযোগী ব্যাখ্যাটাই খুঁজে নেবে। এই ভাবে বিবেকানন্দের হিন্দু ধর্ম সংস্কার আন্দোলন কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। ভারতের ইসলাম আর আরবের ইসলাম এক না। বাংলার ইসলাম, বাংলার মাটির সাথে কথা বলেই তার ভাবার্থ খুঁজেছিল এক সময়-এখন আবার আরবী হওয়ার চেষ্টা করছে। যা অতীব হাস্যকর কারন বাংলার ইসলামও এই ধরনের উইক থিওলজি থেকে বাংলা সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিবর্তিত ধর্ম। সেই বিবর্তনকে উপেক্ষা করে, আরবের ইসলাম বাংলায় চালাতে গেলে, বাংলা ভাই টাইপের চরিত্রই ভবিষ্যত।

আবার ধর্মীয় মৌলবাদিরা ডিকনস্ট্রাকশনের ভাষায় স্ট্রং থিওলজিস্ট-কারন তারা বিশ্বাস করে ধর্মীয় বাক্যের একটিই মাত্র ব্যাখ্যা আছে -যা তারা মানে। কিন্ত আমরা দেখালাম, তা অবৈজ্ঞানিক ধারনা। ধর্মীয় বাক্যের একাধিক অর্থ থাকাটাই বাস্তবে সত্য। মূলত এদের জন্যেই মৌলবাদি জঞ্জালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে গোটা পৃথিবী।

কিন্ত ধর্মে বিজ্ঞান খুঁজে পাওয়া অপবিজ্ঞানীদের কি হবে? ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কির মতে এই ধরনের উৎপাতের কারন ধর্মগ্রন্থগুলির বাক্য উইক টেক্সট বা দুর্বল ভাবে গঠিত বাক্য যা বিজ্ঞানের ভাষা হতে পারে না। রিচার্ড ডকিন্স ও এই ব্যাপারে সহমত। অর্থাৎ নিউটনের তৃতীয় সূত্র বিজ্ঞান যে ভাষায় লেখে, সেখানে একটি বাক্যের একাধিক মানে নেই। বিজ্ঞান ভাষ্যে বাক্যকে ভীষন ভাবে অবজেক্টিভ হতে হবে যাতে একটিই মাত্র অর্থ হয় এবং সেই অর্থ অনুসরন করে তার পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান সম্ভব। কোন বাক্যের একাধিক পরস্পর বিরোধি অর্থ থাকলে, সেই বাক্যকে আমরা বলব উইকটেক্সট ( দুর্বল বাক্য) এবং সেই বাক্যটি বিজ্ঞানের জগতে গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। সুতরাং আমাদের স্ট্যান্ডার্ড উত্তর হওয়া উচিত-কোরান বা গীতায় বিজ্ঞান আছে কি নেই-তাই নিয়ে ধার্মিক রা যত খুশী মাথা ঘামাক। তাতে বিজ্ঞানীদের কিছু যায় আসে না-কারন ওই গ্রন্থ গুলির টেক্সট এত দুর্বল -তা একাধিক অর্থ বহন করে, তাই তা বিজ্ঞানের বিবেচ্য নয়। কেও যদি কোরানে বিজ্ঞান আছে বলে গর্বিত বা খুশী হয়। তাতে কি যায় আসে। হিরোইন বা কোকেন খেয়েও লোকে আপাত ভাবে খুবী উজ্জীবিত থাকে। সেটা তাদের চয়েস-কিন্ত বিজ্ঞানী মহলে তা অর্থহীন প্রলাপ ছাড়া কিছুই না।

মোদ্দা কথা আল্লা নিজের ভেলকি বা কেরামতি দেখাতে চাইলে, মানুষের জেনেটিক কোডেই সেটা করতে পারতেন-বই এর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্ত্তনের চেষ্টাটা আমাদের মতন নশ্বর মানুষের কাজ!






Friday, August 21, 2009

জিন্না কি ধর্ম নিরেপেক্ষ ছিলেন?


জিন্নার ভূত ভারতের ঘারে চিরকুমার। কায়েদ-ই-আজমকে ধর্ম নিরেপেক্ষ বলে দাবী করে ভারতের প্রাত্তন বিদেশমন্ত্রী যশোবন্ত সিং বিজেপি থেকে বিতাড়িত হলেন। যশোবন্ত বিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাণপুরুষ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং থেকে নির্বাচিত সাংসদ। এর আগে আদবানী জিন্নাকে ধর্ম নিরেপেক্ষ বলায় বিপাকে ছিলেন কিছুদিন। এসব কথা যাক। ভারতে বিজেপি এবং সিপিএম-সাংঘাতিক ভাবেই ফ্যাসিস্ট পার্টি। পার্টি মেম্বারদের আদর্শগত ভিন্নমত প্রকাশের অনুমতি নেই। এর আগে সিপিএম স্পীকার সোমনাথ মুখার্জিকে একই ভাবে তাড়িয়েছে। উদার গণতন্ত্রের শত্রু এইসব পার্টিগুলি এমনিতেই এখন ডুবন্ত নৌকা। ভারতীয় ভোটারদের কাছে প্রত্যাখ্যাত। তাই সাক্ষাত সলিলে ডুবন্ত ফ্যাসিস্ট পার্টিগুলির হারিকিরির ওপর টর্চলাইট ফেলার জন্যে এই লেখা নয়। মহম্মদ আলি জিন্না এবং ভারতভাগ-সেটা নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে চাইছি মাত্র।

কায়েদি আজম জিন্না দক্ষিন এশিয়ার সম্ভবত সব থেকে জটিল রাজনৈতিক চরিত্র। আর ধর্ম নিরেপেক্ষতা, আমাদের অভিধানের সর্বাধিক বিতর্কিত শব্দ। সুতরাং এই দুটি ককটেলকে একত্রিত করলে যে জটিল বিশ্লেষন পাওয়া যাবে-সেটা ব্যাক্তিনিরেপেক্ষ হওয়া অসম্ভব। তাই এই ব্যাপারে ভিন্নমত থাকবেই-এবং সেটা ধরে নিয়েই আমি নিজের দৃষ্টিভংগীতে জিন্নার রাজনৈতিক দর্শনের ওপর আলোকপাত করব।

কোন মানুষের জীবনেই তার রাজনৈতিক দর্শন স্থিতিশীল না। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তা বিবর্তিত হতে থাকে। এই বিবর্তনের মূলে থাকে অর্জিত জ্ঞানের সাথে বাস্তবতার পার্থক্য। জিন্নার জীবনে এটা হয়েছে সব থেকে বেশী। এবং সেই দৃষ্টিতে জিন্নাকে না বুঝলে কোন সত্যে উপনীত হওয়া খুব কঠিন।

প্রথমেই যে প্রশ্নটি আমাদের গভীর ভাবে বিশ্লেষন করতে হবে সেটা হচ্ছে ১৯০৬ সালে যখন মুসলীম লীগের জন্ম হল-জিন্না সেখানে যোগদানের বদলে-তাদের খুব অবজ্ঞার চোখে দেখেছিলেন।লীগের নেতাদের সম্মন্ধে তার উক্তি " ওরা অত্যন্ত বেশী মুসলমান"। অর্থাৎ ১৯০৬ সালে জিন্না নিজেই বলেছিলেন, তার মতন আধুনিক লিব্যারাল ডেমোক্রাটদের জন্যে লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বেমানান। প্রশ্ন হচ্ছে পরবর্তী দশকে কি এমন ঘটল তার জীবনে এবং ভারতের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যে তিনি লীগে যোগ দিলেন (১৯১৩) এবং তার প্রেসিডেন্ট ও হলেন লখনো অধিবেশনে (১৯১৬)। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে তিনি ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসে যোগ দেন। কংগ্রেসে ফিরোজ শা মেহেতা, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এবং গোপাল কৃষ্ণ গোখলে -এরাই ছিলেন জিন্নার ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহচর। বৃটেনের তার ছাত্র জীবন থেকে তিনি মূলত হিন্দু এবং পার্শী জাতিয়তাবাদি নেতাদের সাথেই ওঠাবসা করেছেন। ব্যারিষ্টার হিসাবে তার ক্লায়েন্ট বেস ছিল মুম্বাই এর পার্শীরা। জিন্নার সামাজিক জীবনে কোন মুসলিম বন্ধুর পর্যন্ত দেখা পাওয়া যাচ্ছে না এই সময়। পোষাকে এবং খাদ্যে ১০০% সাহেব ছিলেন জিন্না। ইসলামে নিশিদ্ধ শুয়োরের মাংস এবং দৈনিক মদ্যপান-কোন কিছুতেই অরুচি ছিল না জিন্নার। এই সময় মুসলিমদের জন্যে একটি কাজই করেছেন। ওয়াকফ বা ধর্মীয় কারনে মুসলিমরা যে জমিদান করে-সেটাকে আইনসিদ্ধ করিয়েছেন। কিন্ত তার থেকেও তিনি বেশী সক্রিয় ছিলেন বাল্যবিবাহ নিরোধক আইন আনতে। মনে রাখতে হবে এটা সেই সময়- যখন রবীন্দ্রনাথ অক্লেশে তার কন্যাদের বাল্যবিবাহ দিয়েছেন। জিন্নার হিন্দু মক্কেলরা যথা গোখলে বা তিলক, আধুনিকতার প্রশ্নে তার থেকে অনেক পিছিয়ে-এরা বাল্যবিবাহের সমর্থক ছিলেন। তাহলে কি এমন ঘটল জিন্নার মতন একজন আধুনিক এবং ইসলাম থেকে শত যোজনদূরে অবস্থান করা সাংঘাতিক বুদ্ধিমান ব্যাক্তিত্ব লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পাঁকে ডুবলেন?

দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি আমরা কোনদিন করি নি-সেটা হচ্ছে আবুল কালাম আজাদের সাথে জিন্নার রাজনৈতিক দর্শনের পার্থক্যের উৎস কি? এটাত আমার কাছে বিরাট ধাঁধা। জিন্না ছিলেন ১০০% বৃটিশ। মনে, প্রানে এবং দর্শনে। সেখানে আবুল কালাম আজাদ ছিলেন ১০০% ধর্মভীরু মুসলমান। আজাদের পরিবার ছিল কলকাতার বিখ্যাত ইসলামিক শিক্ষকদের পরিবার। বলতে গেলে একরকম মসজিদেই মানুষ হয়েছেন তিনি। সুতরাং আজাদের মতন মুসলীমরা লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করবে এবং জিন্নার মতন বৃটিশ শিক্ষিত মুসলিমরা কংগ্রেসের ধর্ম নিরেপেক্ষতাকে গ্রহন করবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্ত হল উলটো। মৌলনা আজাদ হয়ে উঠলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কান্ডারী। আর জিন্না হিন্দু-মুসলমানে ভারত ভাগের ভগীরথ। এই ধাঁধার সমাধান কি? এদের দুজনেরই ব্যাক্তিগত জীবনের অলিগলিতে না ঢুকলে, আমরা বুঝবো না জিন্না কেন লীগ রাজনীতিতে ঢুকলেন। যাদের সম্মন্ধে প্রথমদিকে তার একছত্র অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্থান বা বাংলাদেশের ইতিহাস যেভাবে লেখা হয় সেটা হচ্ছে, জিন্না কংগ্রেসকে হিন্দুদের সংগঠন বলে মনে করতেন। হিন্দুদের কাছ থেকে তিনি প্রাপ্য মর্যাদা পান নি। এটাও একধরনের সরলীকরন। তিলকের মতন হিন্দুজাতিয়তাবাদি নেতা জিন্নাকেই বৃটিশদের বিরুদ্ধে তার উকিল হিসাবে নিয়োগ করেছেন। মুসলীম লীগ এবং কংগ্রেস যাতে একসাথে বৃটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম করতে পারে তার জন্যে জিন্না ১৯৩০ সাল পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন অক্লান্ত।

কিন্ত আসল ফাটলটা এসেছে কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের কীর্তিকলাপে। কংগ্রেস নিয়ে জিন্নার মোহভঙ্গের প্রথম এবং প্রধান কারন অবশ্যই গান্ধী। এবং এর সুত্রপাত গান্ধীর খিলাফত আন্দোলনের সমর্থনের মধ্যে দিয়ে।

তাহলে জিন্নাকি ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলন (১৯২১) সমর্থন করতেন না? প্রশ্নই ওঠে না। জিন্না খুব পরিষ্কার ভাবেই বুঝেছিলেন এ আসলে ইসলামিক মৌলবাদিদের বৃটিশ বিরোধিতা যা হবে ইসলামিক সমাজের আধুনিকরনের অন্তরায়। গান্ধী এসব কিছু না বুঝেই কুখ্যাত আলি ভাতৃদ্বয়কে ( মৌলনা মহম্মদ আলি এবং সৈকত আলি) সমর্থন জানালেন। জিন্নার অমত স্বত্ত্বেও তিলক স্বরাজ ফান্ড থেকে গান্ধী এই আলি ভাতৃদ্বয়কে টাকা জোগালেন আন্দোলন শুরু করার জন্যে।

যে খিলাফত আন্দোলন ছিল বৃটিশদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আন্দোলন, তা অচিরেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার রূপ নিল মালাবারে এবং নোয়াখালিতে। আসলে খিলাফত আন্দোলন হয়ে উঠল মুসলমান প্রজাবিদ্রোহ। হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে। আলি ভাতৃদ্বয় হিন্দু নিধনের ডাক দিলেন এবং গান্ধীকেও হিন্দুনেতা বলে অবজ্ঞা করার উপদেশ দিলেন। গান্ধীকে ত এবার গিলতে হয়। ফলে গান্ধী তার মহান সত্যবাদি ঢ্যামনামো অব্যাহত রাখলেন--" আলি ভাতৃদ্বয়ের কীর্তি জিহাদের অপব্যাখ্যা" বলে দুবাটি কেঁদে নিলেন।

খিলাফত আন্দোলন যে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার রুপ নেবে, তা নিয়ে জিন্না আগেই গান্ধীকে সাবধান করেছিলেন। কারন জিন্নার ঘটে বুদ্ধিসুদ্ধি ছিল গান্ধীর চেয়ে কিছু বেশী। যাইহোক জিন্না বুঝলেন গান্ধী এবং কংগ্রেস ইসলামিক মৌলবাদকে নিজের সন্তানের মতন করে লালন করতে চাইছে। মৌলবাদিদের ইসলামিক সমাজের নেতা বানাতে চাইছে কংগ্রেস যা মুসলিমদের হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে দেবে। কংগ্রেসের ইসলামিক মৌলবাদি তোষনের সেই ট্রাডিশন আজও চলছে। এবং কি আশ্চর্য্য কংগ্রেসের এই মৌলবাদি তোষন যে মুসলমান সমাজের জন্য ভয়ংকর এবং ক্ষতিকর তা প্রথম বলেন জিন্না-কোন হিন্দু নেতা না। এবং ধর্মনিরেপেক্ষতার প্রতীক মৌলনা আবুল কালাম আজাদও কংগ্রেসের মৌলবাদি তোষনের বিরুদ্ধে কিছু বলেন নি। কারন মৌলনা আজাদ ছিলেন ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষনশীল অংশেরই প্রতিনিধি। আহা করি ধাঁধাটি পাঠকদের কাছে কিছুটা পরিষ্কার হচ্ছে।

সংখ্যালঘুদের জন্যে আলাদা আইন-একমাত্র সংখ্যালঘু মৌলবাদিদের মুসলীম সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে গণ্য করার দীর্ঘ ভারতীয় ট্রাডিশন গান্ধীই শুরু করেন। ভারতীয় বল্লাম এই কারনে, ভারতের প্রতিটি পার্টি-সিপিএম থেকে কংগ্রেস-এই দোষে দুষ্ট। জিন্না স্বাধীনত্তোর ভারতে কংগ্রেসের এই ধরনের সংখ্যালঘু নীতির জন্যে মুসলীমদের কি সাংঘাতিক ক্ষতি হবে সেই নিয়ে নিশ্চিত ভাবেই চিন্তিত ছিলেন।


তবে ১৯২৯ সালেও জিন্না মোটেও পাকিস্থানের কথা ভাবছেন না। বরং ঐক্যবদ্ধ ভারতে মুসলীমদের স্বার্থরক্ষার জন্যে ১৪ দফা দাবী জানালেন। কংগ্রেস সেই দাবীগুলি প্রত্যাখ্যাত করলে, পাকিস্থানের দাবী করা ব্যাতীত জিন্নার হাতে আর কোন উপায় থাকল না।

কিন্ত কংগ্রেস কেন মানল না সেই ১৪ দফা দাবী? ১৪ টি দাবীর মধ্যে ১১ টি দাবী ছিল সাম্প্রদায়িক। কিন্ত সেগুলি সবই স্বাধীনত্তোর ভারত বর্ষে মুসলমানদের জন্যে মানা হয়েছে। তাহলে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে স্পেসিফিক দাবীগুলিতে কংগ্রেসের আপত্তি ছিল না। ছিল প্রথম তিনটি দাবী নিয়ে যা মূলত ভারতে কেন্দ্র বনাম রাজ্যের ভূমিকা কি হবে তাই নিয়ে। সেখানে জিন্না খুব পরিষ্কার ভাবেই রাজ্যগুলির হাতে অধিক ক্ষমতা দাবী করলেন। যা ভারতের মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য পার্টি বহুদিন থেকে করে এসেছে এবং ১৯৯০ সালের আগেও কংগ্রেস শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দোহাই দিয়ে বিকেন্দ্রীকরনের দাবী মানে নি। ১৯৯০ সালের পরে কংগ্রেস দুর্বল হতে থাকে। ফলত আস্তে আস্তে রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতা আসতে থাকে। অবশ্য আমেরিকার কাঠামোর সাথে তুলনা করলে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে, আরো অনেক বেশী বিকেন্দ্রীকরন হওয়া উচিত।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন কংগ্রেস বিকেন্দ্রীকরনের দাবীগুলি মানল না? এর পেছনে নেহেরুর ভূমিকা কি?
আসল গল্পটা হল নেহেরু ১৯২৮ সালে ডমিনিয়ান স্ট্যাটাসের জন্যে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কি হবে তার একটা খসরা পেশ করেছিলেন। সেখানে রাজ্যগুলির হাতে সীমিত ক্ষমতা দেওয়ার কথা ছিল যা পরবর্ত্তীকালে ভারতের সংবিধান স্বীকৃত হয়। ভারতে ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরন হলে কংগ্রেসের নেতাদের ক্ষমতা নিশ্চিত ভাবেই হ্রাস পেত। একালেও যেমন-সেকালেও কংগ্রেসের অনেক বড় নেতারই কোন প্রদেশিক ভিত্তি ছিল না। তারা ছিল দিল্লীকেন্দ্রীক রাজনীতি করে গোটা ভারতের ওপর ছড়ি ঘোরানোর লোক। সুতরাং সম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের স্বার্থের জন্যেই নেহেরু এবং তার অনুগামীরা জিন্নার দাবীগুলি প্রত্যাখ্যান করলেন ও জিন্নাকে পাকিস্থানের দাবী তুলতে বাধ্য করালেন। যশোবন্ত সিং এর বইটিতে নেহেরু বনাম জিন্নার এই দ্বৈরথকেই পাকিস্থান সৃষ্টির ভিত্তিভূমি বলে দাবী করা হয়েছে। এবং এই দৃষ্টি ভংগী মেনে নিলে, দেখা যাচ্ছে পাকিস্থান সৃষ্টির জন্যে নেহেরুর ক্ষমতার লোভই মূলত দায়ী।

জিন্না পাকিস্থান চান নি। নেহেরু তাকে বাধ্য করেছিলেন। ঠিক এই কথাটাই যশোবন্ত সিং লিখেছেন।আমি যতটুকু ইতিহাস পড়েছি, তাতে এই দাবীর কোন ত্রুটি দেখছি না। কারন ১৯৩০ সালের পর লীগ বা জিন্নার ইতিহাস থেকে বোঝা যাবে না, জিন্না কেন পাকিস্থান চাইতে বাধ্য হলেন। তার ডিরেক্ট একশন বা ডেলিভারেন্স ডে ছিল কংগ্রেসের কেন্দ্রীকতা রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই। যা হয়ে উঠলো হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। হতে পারে দাঙ্গায় অনেক হিন্দু প্রান হারিয়েছিলেন-এবং সেই দায়ভার জিন্না কখনোই এড়াতে পারেন না। কিন্ত যে নেহেরু-কংগ্রেস তাকে এই কাজে বাধ্য করেছিল, তাদের কি কোন দায় নেই??

ভাগ্যের কি পরিহাস। আজ ২০০৯ সালে দেখতে পাচ্ছি জিন্নার ১৪ দফা দাবীর সব কিছুই স্বাধীন ভারতে মানা হচ্ছে, কারন ভারতে কেন্দ্রীয় পার্টিগুলি এখন অনেক দুর্বল। আঞ্চলিক দলগুলির ওপর নির্ভরশীল। অথচ ১৯২৯ সালে নেহেরু মানলেন না জিন্নার দাবী। নিজের ক্ষমতার লোভকে সরিয়ে যদি ভারত বর্ষের ভবিষ্যতের কথা ভাবতেন নেহেরু, তাহলে পাকিস্থানের জন্মই হয় না আজ।

এই কঠোর সত্যটি ভারতবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে যশোবন্ত সিং কে জানাই অশেষ ধন্যবাদ। দেশভাগের জন্যে গান্ধী এবং নেহেরুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ঐতিহাসিক বিচার করা উচিত আপামর ভারতীয়দের।






Friday, August 14, 2009

মুসলমানদের জীবনে সব থেকে বড় প্রাপ্তি কোরান?

আজকের আজকালেই পড়লাম। সিপিএমের বিতর্কিত মন্ত্রী আব্দুল রেজ্জাক মোল্লা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তিমূলক পেশাদারি শাখার উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন-মুসলমানরা ভাগ্যবান-কারন তাদের জীবনের পরম প্রাপ্তি কোরানে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ আছে।

মন্ত্রী বলতেই পারতেন ইসলাম জ্ঞানার্জন করতে নির্দেশ দিয়ে থাকে। আমাদের ও মাথাব্যাথা থাকত না। কিন্ত ভোটের বাজারে সংখ্যালঘু তোষনের তাড়নায় এই প্রবীন কমিনিউস্ট নেতাটিও বলে বসলেন মুসলীমদের জীবনে সব থেকে বড় প্রাপ্তি কোরান! কোরান যেহেতু খাবার জন্য কোন মিস্টি না বা পাছা মোছার ন্যাপকিন না-এই কথাটির একটিই মাত্র অর্থ হয়। মুসলমানদের কোরান অনুসরন করে জীবন ধারন করা উচিত-এবং তারা খুবই ভাগ্যবান যে তাদের জীবনাদর্শ ঠিক করার জন্যে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ তাদের আছে!

জামাত বা বুর্জোয়া পার্টির নেতারা ইসলামি মনন তোষন করে ভোট পাওয়ার জন্যে এরকম কথাবার্ত্তা এই উপমহাদশে আবাহমানকাল থেকে বলে আসেন। কিন্ত যখন কোন বর্ষীয়ান কমিনিউস্ট নেতা এবং মন্ত্রী এই ধরনের প্রতিক্রিয়শীল কথাবার্ত্তা বলেন তখন বিষয়টি একটু গভীরে না গেলে বোঝা যাবে না কিভাবে এইধরনের ধর্মীয় তোষন দক্ষিনএশিয়ার রাজনীতিকে সাম্প্রদায়িক কুম্ভীপাকে আবদ্ধ রাখে। এবং ধর্মীয় ধারনাগুলির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই মৌলবাদের আসল আঁতুর ঘর।

ক্ষমতার উৎস কি? কিসের বলে কোরান বা ধর্মগ্রন্থগুলি আজ বলীয়ান? বা সভ্যতার চাকা উলটোদিকে ঘোরাতে চাইছে? এই প্রশ্নটির মূলে আমাদের আঘাত করতে হবে। এইসব গুটিকয় মৌলবাদিদের এত ক্ষমতা আসে কি করে?

গত শতাব্দিতে "ক্ষমতা" এবং তার উৎ স নিয়ে সব থেকে বেশী দার্শনিক কাজ করেছেন মাইকেল ফুঁকো। তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম "ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ" । ফুকোর কাজের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জ্ঞান এবং ক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক। ফুকো এই প্রসঙ্গে "সাধারন জ্ঞান" বলে একটি সামাজিক প্যারামিটার চালু করেন-যার অর্থ- যত বেশী লোক কোন একটা বিলিফ সিস্টেমের ( ধরুন এই হিন্দুত্ববাদি, ইসলামিস্ট বা কমিনিউজম) বিশ্বাসগুলিকে সাধারন জ্ঞান হিসাবে গ্রহন করবে, সেই বিলিফ সিস্টেম সমাজের ওপর তত ছড়ি ঘোরাবে। এমন নয় যে ব্যাপারটা আমরা জানি না। কিন্ত এইসব বিলিফ সিস্টেমের ক্ষমতার উৎস সন্ধান করতে হলে-আমাদের ইতিহাস থেকে দেখতে হবে কি ভাবে একটি বিলিফ সিস্টেমের কিছু বিশ্বাস সাধারন জ্ঞানে পরিণত হচ্ছে। সাধারন জ্ঞান বলতে এক্ষেত্রে আমরা বুঝবো-জন সাধারন যে জ্ঞানগুলিকে নর্ম বা স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করেছে।

যেমন ধরুন -কমিনিউস্টদের রাজনৈতিক বিশ্বাস হচ্ছে একদিন সাম্যবাদি কমিনিউস্ট সমাজ আসবে। যতবেশী লোক এটাকে বিশ্বাস করবে-প্রমান্য সত্য হিসাবে দেখবে, কমিনিউস্টদের তত শক্তি বৃদ্ধি হবে। সোভিয়েতের পতনের আগে, অনেক অনেক বেশী লোকের কাছে এটা ছিল একটি স্বতসিদ্ধ প্রমানিত বিশ্বাস-তাই সাধারন জ্ঞান। কারন তারা মনে করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ানে সত্যিকারের সমাজতন্ত্র -সাম্যবাদি সমাজ আছে। কিন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ান ভেঙে গিয়ে সাম্যবাদের নরকগুলজার ক্রমশ প্রকাশ্য হতে, আজকের সমাজের খুব অল্প লোকের কাছেই এটা বিশ্বাস্য যে কমিনিউজম বলে আদৌ কোন সমাজ কোন দিন আসতে পারে। ফলে ধণতন্ত্রের এই চরম দুর্দিনেও কমিনিউস্টরা প্রতিটা দেশে মাটি হারাচ্ছে! কারন সেই সাধারন জ্ঞানের ভিত্তিটা-অর্থাৎ জনসারাধন যে মনে করত সাম্যবাদী স্বর্গীয় সমাজের অস্তিত্ব আছে-সেই জায়গাটাই আজ ভীষন দুর্বল। কোন তত্ত্বের নির্ভুলতা বা বৈজ্ঞানিক সত্য সেই তত্ত্বের শক্তির উৎস না। তত্ত্বের পেছনের ক্ষমতার উৎসের আসল নাম মানুষ। তারা বিশ্বাস করেছিল বলেই একদিন কমিনিউস্ট গাঙে জোয়ার ছিল।

ঠিক একই ব্যাপার কোরানের জন্যেও সত্য। কোরান আল্লা প্রেরিত নির্ভুল এবং শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন--এটাই মুসলমান সমাজের সাধারন জ্ঞান। বিশ্বাস না। কারন ইসলামের জন্ম লগ্ন থেকেই যেসব বুদ্ধিজীবিরা এই বিশ্বাসের বিরোধিতা করতে গেছে, তাদের প্রায় সবাইকেই খুন করা হয়েছে। কোরানে অবিশ্বাসীদের প্রতি অভিশাপ, ঘৃণা, ভয়দেখানো কি নেই! দাস প্রথার সমর্থন থেকে বৌ পেটানোর অনুমতি সব কিছুই পাওয়া যাবে। আবার বিদ্যান, বুদ্ধিমান দয়ালু ক্ষমাশীল হওয়ার উপদেশ ও আছে। বাকী ধর্মগ্রন্থগুলির মতন কোরান ও একটি ভাল-খারাপ উপদেশের ককটেল। এবং বাকী ধর্মগ্রন্থগুলির মতন এটিও একটি প্রতিক্রিয়াশীল গ্রন্থ কারন এর রাজনৈতিক তত্ত্বগুলি সপ্তম শতকের আরবদেশের উপযোগী। মোদ্দা কথা বাকী ধর্মগ্রন্থগুলির ন্যায় অতীতের নৃতাত্ত্বিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যেই কোরান লিখেছিলেন সম্ভবত ২০ জন জ্ঞানী ব্যাক্তি। কিন্তু এইসব সত্য ইসলামিক ব্যাটারীর চার্জার হতে পারে না। "কোরান শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন" এটাকে বিশ্বাস না-একদম সাধারন জ্ঞানের পর্যায়ে নিয়ে এলে তবেই এই ইসলামি মৌলবাদের আসল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এবং মাননীয় কমিনিউস্ট মন্ত্রী মহোদয় ঠিক সেটিই করলেন-তিনিও সেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে মৌলবাদিদের ক্ষমতার উৎসেই রাবার স্ট্যাম্প মারলেন। মুসলামানদের শিক্ষিত করতে যদি এই ভাবে কোরানের সাহায্য নিতে হয় তাহলে প্রক্ষান্তরে সেই মৌলবাদেরই বীজ চাষাবাদ করা হয়। কারন "কোরান শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন" সেই তত্ত্বকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে যা মৌলবাদের আসল শক্তি। বা ঘাঁটি।

Saturday, August 8, 2009

মায়ান সভ্যতা-মিথ এবং বাস্তব





টুলুমের সূর্য্য মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ

ইচ্ছাটা ছিল বহুদিন থেকেই। মায়াবী মায়ান সভ্যতার স্বাপত্য কীর্তি ঘুরে দেখার। মন্দার বাজারে সুযোগ জুটে গেল। এখন সব ট্র্যাভেল প্যাকেজে বাম্পার ডিল পাওয়া যাচ্ছে! ফ্লাইট খরচ থেকে ফাইভ স্টার হোটেল, অঢেল খানা পিনা-সব মিলিয়ে এত সস্তায় এই দশকে কোন প্যাকেজ পাওয়া যেত না! তাছাড়া মায়ান সভ্যতার ধ্বংশাবশেষ মেক্সিকোর ইকাকুনটন পেনিনসুলাতে সব থেকে ভাল ভাবে সংরক্ষিত। যেটি মেক্সিকোর সেরা ক্যারিবিয়ান বিচ ডিস্ট্রিক্ট। সবুজ সমুদ্রজলের ক্যাঙ্কুন। বছরে ৪০ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক এখানে আসে একই সাথে ক্যারিবিয়ানের সুবজ সমুদ্র আর মায়ান সভ্যতা ঘুরে দেখার জন্যে।

এই প্রসঙ্গে মায়ানদের সম্মন্ধে দুচার কথা বলে রাখি। আজকের মেস্কিকানরা ( বা আমরা আমেরিকায় বাঙালীরা যাদের ঠাট্টা করে হোজে মামা বলি) মায়ানদের উত্তরপুরুষ। আনুমানিক ১০০০ খৃষ্ঠপূর্বাব্দে মেক্সিকো বা এই পুরো ক্যারিবিয়ান বেল্টে মায়ান সভ্যতার শুরু। বর্তমানে সে মায়ান স্থাপত্যের ধ্বংশাবশেষ আমরা দেখি, তার সবটাই পোষ্ট ক্ল্যাসিক্যাল মায়া সভ্যতার। আনুমানিক ৭০০-১০০০ খৃষ্ঠাব্দ এই স্থাপত্যগুলির ইতিহাসকাল । মায়ানরা লিখতে জানত-তাদের অক্ষরের সংখ্যা ১০,০০০। প্রাকটেলিস্কোপহীন জ্যোর্তিবিদ্যার নানান নমুনার সাক্ষর তাদের স্থাপত্যে। রাজনৈতিক সিস্টেম ছিল রেনেসাস সাময়িক ইউরোপের মতন-নগর রাষ্ট্র। আনুমানিক শতাধিক নগর রাজ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল মায়ান সাম্রাজ্য। যা স্প্যানিশ আক্রমনে ১৬৮০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংশ হয়। যদিও মায়ানরা ১৭০ বছর ধরে ইউরোপিয়ান হার্মাদ দস্যুদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই লড়ে গেছে। কিন্ত ক্রমাগত বিদ্রোহ এবং গেরিলা যুদ্ধ করেও হার মেনেছে বন্দুক এবং কামানের কাছে। স্প্যানিশরা এদের দাশ হিসাবে ক্যারিবিয়ানের অন্যান্য দ্বীপে চালান করত। মায়ান পুরুষদের মেরে ফেলে নারীর গর্ভে ইউরোপিয়ান বীজ বপন করেছিল স্প্যানিশ জলদস্যুরা যার ফলশ্রুতিতে আজকের মিশ্র মেক্সিক্যান জাতির জন্ম। মেক্সিকানদের মধ্যে কাওকে মায়ান আদিবাসীদের মতন দেখতে-আবার কেও কেও দেখতে পুরো ককেশিয়ান। তবে অধিকাংশ মেক্সিকানদের দেখতে মায়ান এবং স্প্যানিশদের মাঝামাঝি।

মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের পাশে হলেও অনেক বেশী সমাজতান্ত্রিক। ক্যাঙ্কুন এয়ারপোর্টে নামতেই সেটা টের পেলাম। মেক্সিকোর টুরিজম কতৃপক্ষ, নানান টুরিস্ট এজেন্সি এখানে কিভাবে কাষ্টমারদের পকেট মারে, সেই ব্যাপারে সাবধান করার জন্যে লোক রেখেছ! শুধু তাই না, নানান টুরে, এখানে কিভাবে পয়সা বাঁচাতে হয়, সেই ব্যাপারে সরকারী কর্মচারিদের কাছ থেকে নানান টিপস পেলাম। সরকারি কর্মচারিরা কাজ করে না-বসে বসে মাইনা চুরি করে, এই স্টিরিওটাইপ ধারনায় যারা ভোগেন তাদের মেক্সিকোতে ঘোর উচিত। শুধু টুরিজম ডিপার্টমেন্টের কর্মীরাই না, এখানে সরকার এবং সাধারন মানুষও সরকারী উদ্যোগের ওপর অনেক ভরসা রাখে। এর অনেক উদাহরন গোটা ট্যুর জুরেই পেলাম।

ক্যাঙ্কুন আমেরিকান পর্যটকদের কাছে ভীষন জনপ্রিয় কারন এখানকার হোটেলগুলো সব অল-ইক্লুসিভ প্যাকেজ দেয় অর্থাৎ খানা-পিনা হোটেল ভাড়ার মধ্যেই ধরে নিচ্ছে খাওয়া মানে, তিন কোর্স মিল বা মাত্র তিনটে ড্রিংস এমন না সকাল আটটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যতখুশি খাও যতখুশি পান কর সব ধরনের ককটেল আমাদের রিসর্টেই ছিল ১১টা বার আর ৫ টা রেস্টুরেন্ট! তার সাথে সন্ধ্যায় লোকনৃত্যের জমাটি আসর! আসলে এই ১০০ মাইল সৈকতরেখা জুরে যেখানে এককালে মায়ান সভ্যতা ছিল-সেখানে আজও কোন সভ্যতা গড়ে ওঠে নি শুধু কিছু প্রাসাদসম হোটেল ( কিছু কিছু রিসর্ট ১০,০০০ একর জমির ওপর তৈরী!) আর বনজঙ্গল বাইরে বেড়িয়ে রেস্টুরেন্টে খাওয়া এখানে অসম্ভব অল-ইনক্লুসিভ প্যাকেজগুলো পৃথিবীর অনেক টুরিস্ট স্পটেই রিসর্টগুলি চাইছে কিন্ত স্থানীয় ব্যাবসায়ীদের বিরোধিতায় সম্ভব হচ্ছে না কারন সেক্ষেত্রে টুরিষ্ট স্পটের রেস্টুরেন্ট ব্যাবসা লাঠে উঠবে

এখান কার রিসর্টগুলির বৈশিষ্ট সমুদ্রর সাথে প্রায় মিশে যাওয়া বিরাট বিরাট সুইমিং পুল এত বড় সুইমিং পুল আমি লাস ভেগাসের বেলাজিও বা সিজারেও দেখি নি সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে কাটতেই ক্যারিবিয়ানের সবুজাভ নীল দেখা যায় যদিও সমুদ্র সৈকত এখানে প্রাইভেট পানপ্রিয় পর্যটকদের জন্য এ স্বর্গরাজ্য- বীচেই ককটেল বার সম্পূর্ণ ফ্রি বীচটি অবশ্য অত ভাল না বীচের তলায় কোরাল রীফের জন্যে পায়ে বেশ লাগে ঢেও কিছু উঁচু না ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের সব থেকে ভাল বীচ আছে কিউবাতে মধ্যাহ্ন এবং অপরাহ্নের প্রচন্ড দাবাদহে অনেকেই বাইরে বেড়োতে চাইছিল না। অধিকাংশ টুরিস্টই সুইমিংপুলে বসে শুধু ককটেল পান করে আর জলের তলায় গা ডুবিয়ে শুয়ে থাকে যারা একটু এডভেঞ্চারপ্রেমী-তারা সার্ফিং বা স্নটলিং করে
সমুদ্র আর সুইমিং পুল যেখানে একসাথে মিশে থাকে!

ক্যাঙ্কুন এলাকায় মায়ান সভ্যতার দুটি বিখ্যাত ধ্বংশাবশেষ আছে। টুলুম আর চিচেনিটজা। টুলুমে আছে সূর্য্যমন্দির। অনেকটা আমাদের কোনার্কের মতন। আর চিচেনিটজাতে আছে পিরামিড। টুলুমের সুর্য্য মন্দির অবশ্য আমাদের কোনার্কের মন্দিরটির চেয়ে অনেক ছোট। স্থাপত্য এবং কারুকার্যও তেমন কিছু না। যদিও কোনার্ক এবং টুলুমের সূর্যমন্দিরের বয়স প্রায় সমসাময়িক। তবে কোরাল রিফের ওপর তৈরী এই মন্দিরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দুর্দান্ত।

ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের কোরাল রীফের ধারে গড়ে উঠেছিল মায়ানদের বিখ্যাত সূর্যমন্দির
টুলুম মানে দেওয়াল ঘেরা শহর মায়ানদের সব রাজ়্যই ছিল নগর-রাজ্য তবে নগরে থাকত শদুয়েক বনিক এবং রাজা শ্রেনী বিভক্ত মায়ান সমাজে, নীচু শ্রেনীর মায়ানদের বাস ছিল দেওয়ালের বাইরে গ্রামে সূর্য্যমন্দিরে বছরে চারবার নরবলি হওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। মূলত অপরাধীদের দেবতার কাছে বলি দিত মায়ানরাতাদের নরখুলি মন্দিরেগাত্রের শোভা বর্ধনের কাজে লাগানো হত বলে জানা যায়। কোনার্কের সূর্যমন্দিরের মতন এখানেও একাধিক সূর্যঘরির সন্ধান পাওয়া যায়। আহ্নিক গতি পর্যবেক্ষনের জন্যে পিনহোল তৈরী করে দরজার ওপর ফেলাটা গ্রীক, মিশর এবং ভারতের মতন এখানেও চালু ছিল তবে মায়ানদের সমস্যা হচ্ছে এরা ঘোড়া বা পুলির ব্যাবহার জানত না ফলে ভারী পাথর বেশী ওপরে তুলতে পারে নি-কেন না সব কিছুই মানুষদের গায়ের জোরে করা। ফলত এরা মিশরের মতন বড় পিরামিড বা কোনার্কের মতন বড় সুর্য্য মন্দির বানাতে পারে নি
অতীতের টুলুম নগরী-যা 1000বছর আগে ছিল অনেকটা এই নীচের ছবির মতন


যেটা সব থেকে ভাল লাগল সেটা হচ্ছে মেক্সিকান সরকারের সমাজতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা এখানে আইন আছে গ্রামবাসীরা হোটেলের মধ্যে ঢুকে তাদের কুটির শিল্প বেচতে পারবে যেহেতু হোটেলগুলিতে প্রচুর টুরিস্ট আসে এবং স্থানীয় গ্রামবাসিরা তা থেকে উপকৃত হতে পারে সেই জন্যেই এহেন আইন তার জন্যে হোটেল কতৃপক্ষ লবিতে গ্রামের লোকেদের পসরা সাজিয়ে বসতে দিচ্ছে আমাদের দেশের ফাইফ স্টার হোটেল বা রিসর্ট গুলির কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই শুধু তাই না, টুলুমে আমাদের যে টুর গাইড ছিল সে আরো জানাল, সমস্ত টুরবাসগুলিকে সরকারী হান্ডিক্রাফটের এক বিশাল দোকানের সামনে ৩০ মিনিট নুন্যতম থামতে হয় যাতে স্থানীর গ্রামবাসীদের তৈরী কুটির শিল্পের কিছু সুরাহা হয় এমন কি সেই গাইড ভদ্রলোক আমাদের বার বার অনুরোধ করছিলেন, তাকে টিপস দেওয়ার বদলে যেন, আমরা কিছু কিনি সেই সরকারী দোকান থেকে কারন স্থানীয় আদিবাসিরা এই সরকারী সাহায্যেই বেঁচে থাকে আমার ধারনা এই আইনগুলি আমাদের দেশেও চালু করা উচিত

হোটেলের মধ্যেই পসরা সাজিয়েছে গ্রামের লোকেরা-সরকারি আইন!

তবে আমেরিকান টুরিস্টরা সত্যি আমাকে অবাক করেছে এখানে খাওয়ার জন্যে এলাহি আয়োজন সব সময় এত হাজার রকমের মেক্সিকান খাবার-দুদিনেই দশকিলো ভুঁড়ি বাড়তে পারে কিন্ত অধিকাংশ আমেরিকান সেই বার্গার হটডগ আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এর বাইরে কিছু খাবে না কূপমুন্ডকতা আর কাকে বলে! আগেকার দিনের বাঙালীরাও ছিল ঠিক এই রকম ভারতের অন্যরাজ্যে বেড়াতে গিয়েও বাঙালী রেস্টুরেন্ট খুঁজবে এখানেও হোটেল কতৃপক্ষ আমেরিকানদের ফার্স্ট ফুড প্রীতিকে সন্মান জানিয়ে, গোটা দুয়েক ফার্স্টফুড কর্নার বানিয়ে দিয়েছে! ডলারের জোরে এই ভাবেই আমেরিকান সংস্কৃতি সর্বত্র ছড়াচ্ছে এমনকি টুলুমেও কোন মেক্সিক্যান রেস্টুরেন্ট নেই-আছে সেই ম্যাকডোনাল্ড আর সাবওয়ে!

মেক্সিক্যান সংস্কৃতিতেও সেই অবক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট। এখানে রাতে লোকনৃত্যের আসর বসত। সালসা নৃত্য ত গোটা পৃথিবী জুরেই সমাদৃত। তা সত্ত্বেও এখানে আমেরিকান টুরিস্টদের খুশী করতে হিপ হপ,জ্যাজ, রাপ সব স্ট্যাইলের আমেরিকান এন্টারটেইনমেন্টই চলছে। কারন তা না হলে আমেরিকান দের মন ভরবে না।

শুধু ডলারের জোরে কিভাবে তৃতীয় শ্রেনীর খাবার আর সংস্কৃতি আমেরিকা গোটা পৃথিবী জুরে রপ্তানী করছে-তা ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে। দেখে মনে হয় ভাল সংস্কৃ্তি পৃথিবীতে টেকে না-বিজয়ী জনগোষ্ঠি গুলির সংস্কৃতিই ক্রমশ ছড়িয়ে যায়। যেমন, মায়ানদের মধ্যে কিছু স্প্যানিশ প্রথম আসে ১৫১৪ সালে। একটি জাহাজ ভেঙে ওরা উপকুলে পৌছালে মায়ানরা তাদের উদ্ধার করে। পরবর্ত্তীকালে সেই ১৪ জন স্প্যানিশ মায়ান মহিলা বিবাহ করে, সেখানেই ঘর সংসার পাতে। মায়ানরা স্প্যানিশদের নিজের আপনজন করে নিয়েছিল। কিন্ত ১৫২৬ সালে স্প্যানিশরা আবার এই উপকূলে হানা দিল-মায়ান আদিবাসিদের দাস বানানোর জন্যে। এই ছিল উন্নত ইউরোপিয়ান সভ্যতা! অথচ তাদের বন্দুক আর কামানের জোরে আজকের মেক্সিকো প্যানিশ কলোনী।

উন্নততর সভ্যতা ব্যাপারটা পুরোটাই গল্প--অথবা উন্নততর সভ্যতা মানে উন্নততর হিংস্র মানবপশুদের পাশবিক আস্ফালন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাস। সেকালেও ছিল। একালেও তাই। নইলে অথিতিপরায়ন মায়ান সভ্যতাকে হারিয়ে মানুষকে দাস বানানো স্প্যানিশ সভ্যতা মেক্সিওর নিয়তি হয় কি করে?


Monday, July 20, 2009

সমকামিতা কি জ়ৈবিক দিয়ে স্বাভাবিক ?

যৌনতার প্রশ্নে কি স্বাভাবিক আর কি অস্বাভাবিক তার বিচার খুব কঠিন। যেমন বালকদের মধ্যে তাদের থেকে অনেক বেশী বয়সের মহিলাদের প্রতি যৌন আকর্ষন দেখা যায়। যা অসামাজিক মনে হলেও জৈবিক দিয়ে স্বাভাবিক।

সমকামি বিবাহ এবং সমকামীতাকে আইন সিদ্ধ করতে আগের দুই দশক ঘোরতর আন্দোলন হয়েছে। এবং এই বিতর্কে একটি ভরকেন্দ্র হচ্ছে সমকামিতা প্রকৃতিসিদ্ধ না প্রকৃতিবিরুদ্ধে? নাকি পরিবেশ জনিত শুধু একটি বিশেষ মানসিক গঠন? অর্থাৎ সমকামীদের মস্তিস্ক বা দেহের গঠন বা জেনেটিক্সে এমন কিছু আছে যার জন্যে তারা সমকামী? এটি যদি হয়ে থাকে তাহলে সমকামিতার আইগত অধিকার পাওয়া সহজ হয়। যদি না হয়, তাহলে প্রমানিত হবে, সমকামী লোকেদের স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফেরানো সম্ভব।

এটি বিলিয়ান ডলারের প্রশ্ন। এই নিয়ে গত দুই দশকে বহু গবেষনা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এই সাবজেক্ট নিয়ে লেখার সব থেকে বড় অসুবিধা হচ্ছে এই লাইনের অধিকাংশ গবেষনাই এক দশকের বেশী টেকে নি। পরবর্ত্তীতে দেখা গেছে সেই রেজাল্ট ভুল ছিল বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল গবেষনায়। সুতরাং কোথাও কোন জার্নালে পেপার ছাপিয়েছে মানেই সেটা ফ্যাক্ট এবং ট্রুথ-ধ্রুব সত্য-এমন না ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই ব্যাপারে ২০০৮ এর কাজ ২০০৯ সালে ভুল প্রমানিত হয়েছে এমনও আছে। পদ্ধতিগত সব থেকে বড় সমস্যা হচ্ছে বিশুদ্ধ গে বা লেসবিয়ান পাওয়া। বিশেষত নারী সমকামীদের প্রায় সবাই উভকামী বা বাই-সেক্সুয়াল[১]। তাই সাবধানে আমরা দেখব আদৌ এই ব্যাপারে আমরা নির্দিষ্ট করে কিছু জানতে পেরেছি কি না। এই ব্যাপারে জেনেটিক্স, ফর্মোন, জমজ বালক-বালিকা , হমোসেক্সুয়ালদের মাতৃকূল নিয়ে গবেষনা, মস্তিস্কের গঠন-এবং আরো অনেক কিছু নিয়েই গবেষনা হয়েছে। এই প্রবন্ধে সব কিছু লেখা সম্ভব না। আমি একটি ওভারভিউ দেবার চেষ্টা করব মাত্র।

  • ফর্মোনঃ সুইডেনে এ ব্যাপারে সব থেকে বিখ্যাত নাম ডঃইভাঙ্কা স্যাভিক। ডঃ স্যাভিকের কাজ সমকামী আন্দোলনকারীরা খুব ব্যবহার করে থাকেন। সুতরাং সত্যটা জানা উচিত। ডঃ স্যাভিক ছেলেদের ঘাম আর মেয়েদের প্রশ্বাব থেকে এক জ়াতীয় জৈব আবিস্কার করেন। হর্মোনের নির্জাস এই জৈবকে উনি ফর্মোন বলছেন। দেখা গেছে গে এবং নারীরা পুরুষ ফর্মোনে একই ভাবে আকৃষ্ট হয়। এর থেকে উনি সিদ্ধান্তে আসেন সমকামিতা 'অর্জিত ব্যাবহার' নয়-তার জৈবিক ভিত্তি আছে [২]।
    এর পরে ডঃ ওয়ারেন থ্রম্পটন প্রশ্ন তোলেন কিভাবে এই পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব যে ফর্মন সিলেকশনের পেছনে অর্জিত জ্ঞান বা ব্যাবহারের ভিত্তি নেই? জন্মের থেকেই গে দের ওই ফর্মোনই পছন্দ ছিল? এই ব্যাপারে ডঃস্যাভিকও স্বীকার করেন-গে দের নারীরদের মতন ফর্মন প্রীতি জন্মগত না অর্জিত কিছুই বলা সম্ভব না। ফলে এতদ্বারা প্রমান হইল সমকামী ব্যাবহারের পেছনে জৈবিক ভিত্তি আছে-এমন সিদ্ধান্ত ডঃ স্যাভিকের কোন গবেষনা থেকেই আসা যায় না-এবং ডঃ স্যাভিক তা নিজে বারন করছেন! [৩] **********************
    Dr. Savic:
    The Associated Press story came out today about your study and I think they have reported it incorrectly.

    First I am wondering if you can help me understand things more clearly. I am enclosing a link to the AP report: http://www.forbes.com/entrepreneurs/feeds/ap/2006/05/08/ap2729698.html

    First, in the report the reporter writes: "It's a finding that adds weight to the idea that homosexuality has a physical underpinning and is not learned behavior."

    THIS IS INCORRECT AND NOT STATED IN THE PAPER

    As I understand your article in PNAS, you specifically offer learning as a hypothesis for your findings. Isn't this true? I believe the reporter is misleading on that point.

    THIS IS VERY UNFORTUNATE; AND YOU ARE ABSOLUTELY RIGHT

    Second, the AP report says: "In lesbians, both male and female hormones were processed the same, in the basic odor processing circuits, Savic and her team reported." I understand that the study did show that AND (male condition) was processed akin to other odors by lesbians. But wasn't there also some hypothalamic processing of EST (female condition) by lesbians?

    YES! AND ALSO CONJUNCTIONAL ANALYSIS SHOWED A COMMON HYPOTHALAMIC CLUSTER IN THE HYPOTHALAMUS:

    It was weaker and apparently not in the anterior hypothalamus but didn't you also find dorsomedial and paraventricular hypothalamic activation? So it would be inaccurate, would it not, to say "both male and female hormones were processed the same?"

    YOU ARE FULLY CORRECT
    ্যাইহোক ফর্মনের সাথে সমকামীদের গঠন জ়ৈবিক কি না, তা নিয়ে কোন সম্পর্ক নেই। সেই রকম কিছু গবেষকরাও দাবী করেন নি।

  • গে জীনঃ জেনেটিক্সের সাথে সমকামিতার সম্পর্ক আরেক্ট ধোয়াশাপূর্ণ বিতর্ক। এই ব্যাপারে কোন প্রমানিত বৈজ্ঞানিক সত্য নেই। সবটাই হয় ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস বা হাইপোথিসিস। এই ব্যাপারে মূলত দুটী ব্যাপার নিয়ে গবেষনা হয়েছে ক) আইডেন্টিক্যাল টুইন খ) সমকামী পুরুষের মাতৃকূল নিয়ে। এই ব্যাপারে গে এবং লেসবিয়ানদের আলাদা করে নিয়ে গবেষনা করা হয়। কারন এই ধরনের এম্পিরিক্যাল স্ট্যাডি করে মেয়েদের মধ্যে কিছু পাওয়া যায় নি বা গেলেও সেহেতু মেয়েদের মধ্যে বাই সেক্সুয়ালের সংখ্যা অনেক বেশী নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। আইডেন্টিক্যাল টুইন এর ওপর গবেষনা নিয়ে কিছু আলোকপাত করা দরকার। এদের জেনেটিক গঠন একই রকম সুতরাং টুইনদের দুজনেই যদি গে হয়, তাহলে বোঝা যাবে হয় একই ধরনের জেনেটিক্স ফ্যাক্টর থেকে গে তৈরী হচ্ছে বা মাতৃজঠরে কোন পরিবর্তন থেকে এরা গে হচ্ছেন। এই ব্যাপারে সব থেকে বৃহত্তম স্যাম্পল নিয়ে কাজ হয়েছে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে-প্রায় ১৪০০০ আইডেন্টিক্যাল টুইন নিয়ে। দেখা গেছে এক ভাই গে হলে অন্যভাই এর গে হওয়ার সম্ভাবনা ৩৪%। লেসবিয়ানদের ক্ষেত্রে এটা ৩০%। অন্যান্য স্টাডিতেও এর কাছাকাছি ফল পাওয়া গেছে [৪]। ১০০% বা তার ধারে কাছেও নেই এই সংখ্যা। তবুও ৩০% সংযোগ যথেষ্ঠ বেশী এবং ডঃ বেইলীর মত বিজ্ঞানীরা মনে করেন সেহেতু আইডেন্টিক্যাল টুইনরা একই ফ্যামিলি বা সমাজ বা যৌন পরিবেশে মানুষ হয়েছে, ৩০% ক্ষেত্রে দুই ভ্রাতাই সমকামী হয়েছে। এটি প্রমান করার জন্যে ডঃ বেইলী আরেকটি পরীক্ষা করেন। তাতে দুই জমজ ভ্রাতার মধ্যে একটি সমকামী এবং অন্যজন স্বাভাবিক ছিল। দেখা গেছে একই সমাজ এবং পরিবারে থেকেও তাদের শিশু বয়েসে বেড়ে ওঠার ঘটনা দুজনে আলাদা ভাবে নিয়েছে [৫]। অর্থাৎ দেখা আচ্ছে একই পরিবেশে মানুষ, একই জেনেটিক গঠনের হলেও দুজনের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন আলাদা হতে পারে-শুধু যদি বিশেষ কোন ঘটনা-যেমন বয়স্ক পুরুষ দ্বারা ধর্ষন ইত্যাদি তাদের জীবনে আলাদা হয়। পৃথিবীর বৃহত্তম টুইন স্টাডিগুলি সমকামিতার সাথে জীনের সম্পর্ক নস্যাত করে [৬]।
আরেকটি ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছেন ডীন হ্যামার। উনি ১৯৯৪ সালে ৭৬ টি গেএর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন গে দের মাতৃকূলে সমকামীর সংখ্যা বেশী। উনারা সেই থেকে Xq28 একটি জেনেটিক মার্কার প্রস্তবনা করেন যা গে-জ়িন নামে জনপ্রিয় হয়। পরবর্ত্তীকালে বেইলী এবং ম্যাকনাইট একই পরীক্ষা চালিয়ে হ্যামারে রেজাল্ট পান নি এবং তারা এই গেজীন তত্ত্বকে ভুল বলে প্রমান করেন [৭]। রাইস এবং এন্ডারসন সায়েন্সে প্রকাশিত একটি পত্রে ৫৭ টি গের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে Xq28 জীনতত্ত্বকে সম্পূর্ণ বাতিল প্রমান করেন [৮]। পরবর্ত্তীকালে জেনোম প্রজেক্টে দেখা গেছে সমকামীদের মাতৃকূলের সাথে সম্পর্কের জন্যে Xq28 ছারা আরো অনেক মার্কার দায়ী-যেমন 8p12, 7q36 and 10q26। কিন্ত ইনারাও বলছেন এর থেকে মোটেও বলা যায় না এই মার্কার গুলির জন্যে সমকামিতা হয়ে থাকে! কারন তাদের স্ট্যাটিস্টিক্যাল সাম্পলিং স্পেস খুব ছোট! পরবর্ত্তীকালে এই নিয়ে হিউমান জেনোম প্রজেক্টে আরো কাজ হয়েছে-কিন্ত কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় নি। হেরিডিটিক্যাল ট্রেটের ইনহেরিটান্স নিয়ে ডঃ কলিনস (২০০৭) জেনোম প্রজেক্টের ফলাফল বিশ্লেষন করতে গিয়ে মন্তব্য করেন-মানব জাতির সব অভিব্যাক্তির মধ্যেই (রাগ, গোয়াত্তুমি, আবগ) জেনেটিক্সের জটিল ছাপ খুঁজে পাওয়া যাবে-কিন্ত তার মানে এই নয়-এইসব অভিব্যাক্তির সব কিছুই জেনেটিক্স নিয়ন্ত্রন করছে। বরং তা পরিবেশ এবং সমাজ দ্বারাই বেশী নিয়ন্ত্রিত [৯]। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে ডঃ কলিন্স হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টের অধিকর্তা ছিলেন বহুদিন।

অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াল এই-আমাদের রাগ ভালোবাসার জন্যেও নিশ্চয় জীনেরাই দ্বায়ী। কিন্ত সেটাই সব না। পরিবেশ এবং সমাজই শেষ নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়। আরো ভাল ভাবে বললে-এই সমকামিতা ব্যাপারটা হয়ত সবার মধ্যেই সুপ্ত ভাবে আছে-বিশেষ কিছু সামাজিক পরিবেশ বা ঘটনা, তা ট্রিগার করতে পারে। আবার রাগ বা আবেগের মতনই এ চিরস্থায়ী নয়। চিকিৎসা করলে সেরে যাবে।

এছারাও আরো কিছু দাবী ঊঠেছে মস্তিস্কের গঠন এবং সমকামিতা নিয়ে। তৃতীয় ইন্টারস্টিয়াল নিউক্লিয়াস-এন্টারিয়াল হাইপোথ্যালামাস (INAH3) এর গঠনে মেয়ে এবং গেদের কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় (সিমন ল্যাভে,১৯৯১) [৮]। কিন্তু বাইনের (২০০১) কাজ থেকে জানা যায় গেদের INAH3 ছোট হলেও নিউরনের সংখ্যা স্বাভাবিক পুরুষদের সমান যা নারীর ক্ষেত্রে কিছু কম থাকে [৮]। তাছাড়া সিমন ল্যাভের পরীক্ষায় স্যাম্পল সাইজ ছিল ৩৭-তার মধ্যে তিনজন গের INAH3 স্বাভাবিক পুরুষদের মতনই ছিল। আবার তিনজন স্বাভাবিক পুরুষের INAH3 মেয়েদের মতন ছোট ছিল। সুতরাং INAH3 স্টাডি থেকেও নিশ্চিত ভাবে কিছুই বলা যায় না। সব থেকে বড় কথা IANH3 মানুষের ব্যাবহারের ফলেও বদলায়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে এখনো পর্যন্ত যতটুকু আবিস্কার হয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায় সমকামীদের পেছনে জীন বা পরিবেশের চেয়েও, অর্জিত গুনাবলীর ভূমিকা বেশী। সমকামীদের এক্সক্লুসিভ জিন বলে কিছু নেই-সেটা জেনোম প্রজেক্ট থেকেই প্রমানিত। সুতরাং চিকিৎসার মাধ্যমে সমকামীদের স্বাভবিক যৌনজীবনের ফেরানো সম্ভব-এটির দিকেই বিজ্ঞানের পাল্লা আপাতত ভারী।


[১] Murray, B. (2000). Sexual identity is far from fixed in women who aren't exclusively heterosexual. Monitor on Psychology, 32(3), pp. 64-67.
[২] http://www.nytimes.com/2005/05/10/science/10smell.html?_r=1&incamp=article_popular
[৩]http://www.narth.com/docs/smell.html
[৪]Bailey, JM; Dunne,MP; Martin,NG (2000): Genetic and Environmental influences on sexual orientation and its correlates in an Australian twin sample. J. Pers. Social Psychology 78, 524-536
[৫]Bailey, NM; Pillard,RC (1995): Genetics of human sexual orientation. Ann. Rev. Sex Research 6, 126-150.
[৬] Hershberger, SL (1997): A twin registry study of male and female sexual orientation. J. of Sex Research 34, 212-222.
[৭] Wilson, G.D., & Rahman, Q. (2005). Born Gay: The Biology of Sex Orientation. London: Peter Owen Publishers
[৮] Rice, Anderson, Risch and Ebers (1999)
Male Homosexuality: Absence of Linkage to Microsatellite Markers at Xq28. Science 23(5414): pp. 665-667. Retrieved 2007-01-18
http://mypage.iu.edu/~bmustans/Mustanski_etal_2005.pdf
[৯] http://www.lifesitenews.com/ldn/2007/mar/07032003
.html